সালতামামি ২০২৫: ফিরে দেখা টেকনোলজির দুনিয়া আর এআই প্রযুক্তির উত্থান-পতন

সর্বাধিক আলোচিত

২০২৫ সাল প্রযুক্তি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ‘মহামিলন’ বা ‘কনভারজেন্স’-এর বছর হিসেবে। ২০২৪ সালে আমরা যা স্বপ্ন দেখেছিলাম—যে এআই মানুষের মতো চিন্তা করবে, হার্ডওয়্যারগুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে, কিংবা ইন্টারনেট হবে বাতাসের মতো সহজলভ্য—২০২৫ সালে তার অনেক কিছুই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। সিলিকন ভ্যালির অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি থেকে শুরু করে ঢাকার একজন ফ্রিল্যান্সারের বেডরুম পর্যন্ত, সবখানেই পরিবর্তনের এক বিশাল ঢেউ লেগেছে।

এই বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) শুধুমাত্র চ্যাটবটের স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি আমাদের অপারেটিং সিস্টেমের গভীরে ঢুকে পড়েছে। হার্ডওয়্যার জগতে আমরা দেখেছি ফোল্ডেবল ফোনের বিবর্তন এবং ল্যাপটপের সংজ্ঞায় আমূল পরিবর্তন। টেকনোলজি সালতামামি ২০২৫-এর এই গভীর বিশ্লেষণে আমরা দেখব কীভাবে এই বছরটি আমাদের ডিজিটাল জীবন, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। এটি শুধু গ্যাজেটের তালিকা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের রোডম্যাপ।

১. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: হাইপ থেকে বাস্তবে (From Hype to Utility)

২০২৩ এবং ২০২৪ সাল ছিল এআই-এর ‘হাইপ সাইকেল’ বা অতি-উত্তেজনার সময়। কিন্তু ২০২৫ সাল ছিল সেই হাইপকে বাস্তবে কাজে লাগানোর বছর। এ বছর এআই-এর বিবর্তন ঘটেছে তিনটি প্রধান এবং বৈপ্লবিক ধারায়: অটোনোমাস এজেন্ট, অন-ডিভাইস প্রসেসিং এবং রিজনিং বা যুক্তি ক্ষমতা

এজেন্টিক এআই: ডিজিটাল কর্মীর উত্থান

আগের জেনারেটিভ এআই (যেমন ChatGPT-4) ছিল প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয়—আমরা প্রশ্ন করতাম, তারা উত্তর দিত। কিন্তু ২০২৫-এ এআই হয়ে উঠেছে অ্যাক্টিভ (Active) বা ‘এজেন্টিক’। ওপেনএআই-এর ‘অপারেটর’, গুগলের ‘প্রজেক্ট অ্যাস্ট্রা’ এবং মাইক্রোসফটের ‘অটোনোমাস এজেন্ট’ ফ্রেমওয়ার্কগুলো এখন মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই জটিল কাজ সম্পন্ন করতে পারে।

  • বাস্তব জীবনের উদাহরণ: ধরুন আপনি একটি ভেকেশনে যেতে চান। ২০২৪ সালে আপনাকে আলাদাভাবে ফ্লাইট খুঁজতে হতো, হোটেল বুক করতে হতো। ২০২৫-এ আপনি আপনার এআই এজেন্টকে শুধু বলছেন, “আগামী মাসে আমার বাজেটের মধ্যে বালি (Bali) ট্যুরের ব্যবস্থা করো।” এআই এজেন্ট আপনার ক্যালেন্ডার চেক করবে, আপনার পছন্দ অনুযায়ী ফ্লাইট ও হোটেল খুঁজবে, আপনার হয়ে পেমেন্ট গেটওয়েতে গিয়ে বুকিং সম্পন্ন করবে এবং পুরো আইটিনারি আপনার মেইলে পাঠিয়ে দেবে। এটি এলএলএম (LLM) থেকে লার্জ অ্যাকশন মডেল (LAM)-এ উত্তরণের ফল।

এসএলএম (SLM) এবং অন-ডিভাইস এআই: গোপনীয়তার নতুন সুরক্ষা

সব কাজের জন্য বিশাল সার্ভার বা ক্লাউডের প্রয়োজন নেই—এই উপলব্ধি থেকে ২০২৫ সালে স্মল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (SLM)-এর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। গুগলের জেমিনি ন্যানো ২.০ বা অ্যাপলের অপ্টিমাইজড মডেলগুলো এখন সরাসরি ফোনেই রান করছে।

  • কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? যখন এআই মডেল আপনার ফোনেই থাকে, তখন আপনার ব্যক্তিগত ছবি, মেসেজ বা লোকেশন ডেটা প্রসেসিংয়ের জন্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্য কোনো সার্ভারে যায় না। এতে প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা ১০০% নিশ্চিত হয় এবং ইন্টারনেট ছাড়াও এআই কাজ করতে পারে। 

সালতামামি ২০২৫

ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে এআই: কপিরাইট ও সহাবস্থান

টেক্সট-টু-ভিডিও জেনারেটরগুলোর (যেমন Sora বা Runway Gen-4) অভাবনীয় উন্নতি ২০২৫ সালে মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এখন স্ক্রিপ্ট দিলে এআই পুরো মুভি সিন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং ভয়েসওভারসহ ভিডিও তৈরি করে দিচ্ছে। তবে এর ফলে সৃষ্ট কপিরাইট জটিলতা নিরসনে ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে নতুন ‘এআই ওয়াটারমার্কিং অ্যাক্ট’ কার্যকর হয়েছে, যা এআই কন্টেন্ট শনাক্ত করতে সাহায্য করছে।

টেবিল: এআই বিবর্তনের চিত্র ২০২৫

বৈশিষ্ট্য ২০২৪ সালের অবস্থা (হাইপ) ২০২৫ সালের অবস্থা (বাস্তবতা) প্রভাব
কাজের ধরন জেনারেটিভ (তথ্য বা ছবি তৈরি) এজেন্টিক (বাস্তব কাজ সম্পাদন) মানুষের কাজের সময় বাঁচে এবং প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে।
মডেল আর্কিটেকচার ক্লাউড নির্ভর বিশাল মডেল (LLM) হাইব্রিড (ক্লাউড + অন-ডিভাইস SLM) ডেটা প্রাইভেসি এবং অফলাইন ব্যবহারের সুবিধা।
কোডিং ক্ষমতা কোপাইলট (কোড সাজেস্ট করা) অটোনোমাস ইঞ্জিনিয়ার (বাগ ফিক্স ও রান) সফটওয়্যার তৈরির খরচ ও সময় নাটকীয়ভাবে কমেছে।
স্বচ্ছতা (Transparency) ব্ল্যাক বক্স (কীভাবে কাজ করে অজানা) এক্সপ্লেনেবল এআই (সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেয়) ফাইন্যান্স এবং হেলথ সেক্টরে এআই-এর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

২. হার্ডওয়্যার এবং কম্পিউটিং: প্রসেসরের নতুন যুগ

সফটওয়্যার বা এআই-এর এই বিশাল লোড সামলাতে হার্ডওয়্যার জগতেও ২০২৫ সালে এসেছে আমূল পরিবর্তন। গতানুগতিক ল্যাপটপ বা ফোনের ধারণা ভেঙে নতুন ফর্ম ফ্যাক্টর এবং পাওয়ারফুল প্রসেসরের দেখা মিলেছে।

এআই পিসি (AI PC) এবং চিপের যুদ্ধ: x86 বনাম ARM

২০২৫ সালকে নিঃসন্দেহে ‘এআই পিসি’-র বছর বলা যায়। মাইক্রোসফট এবং চিপ নির্মাতারা একজোট হয়ে ল্যাপটপের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে।

  • উইন্ডোজ অন এআরএম (Windows on ARM): কোয়ালকমের স্ন্যাপড্রাগন এক্স এলিট (Snapdragon X Elite) এবং এর পরবর্তী সংস্করণগুলো উইন্ডোজ ল্যাপটপকে ম্যাকবুকের মতো ব্যাটারি লাইফ (২০+ ঘণ্টা) এবং ফ্যানল্যাস (শব্দহীন) পারফরম্যান্স দিতে সক্ষম করেছে। ইন্টেলের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে এটি একটি বিশাল বাজার দখল করেছে।
  • NPU-এর গুরুত্ব: প্রতিটি নতুন প্রসেসরে এখন জিপিইউ (GPU)-এর পাশাপাশি এনপিইউ (Neural Processing Unit) থাকছে, যা লোকাল এআই টাস্কগুলো (যেমন ভিডিও কলের ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার, রিয়েল-টাইম অনুবাদ) চোখের পলকে সম্পন্ন করে।

পোস্ট-স্মার্টফোন যুগ: ট্রাই-ফোল্ড ও ওয়্যারেবল টেক

স্মার্টফোনের জগতে এ বছর সবচেয়ে বড় চমক ছিল ‘ট্রাই-ফোল্ড’ (Tri-fold) বা তিন ভাঁজের ফোন। হুয়াওয়ে এবং স্যামসাংয়ের হাত ধরে এই প্রযুক্তি বাজারে আসার ফলে ট্যাবলেট এবং ফোনের ব্যবধান ঘুচে গেছে। পকেট থেকে বের করে খুললেই এটি ১০ ইঞ্চির একটি ট্যাবলেটে পরিণত হয়, যা মাল্টিটাস্কিংয়ের জন্য আদর্শ।

অন্যদিকে, অ্যাপল ভিশন প্রো-এর ভারী ডিজাইনের বিপরীতে ২০২৫ সালে মেটা এবং স্ন্যাপচ্যাটের হালকা ওজনের ‘স্মার্ট গ্লাস’ বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এছাড়া গ্যালাক্সি রিং বা ওউরা রিং-এর মতো ‘স্মার্ট রিং’ স্বাস্থ্য সচেতনদের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে, যা ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটিয়েই স্বাস্থ্যের নিখুঁত ডেটা দিচ্ছে।

টেবিল: হার্ডওয়্যার উদ্ভাবন ও প্রভাব ২০২৫

ডিভাইসের ক্যাটাগরি সেরা উদ্ভাবন/মডেল প্রযুক্তিগত সুবিধা ব্যবহারকারীর লাভ
ল্যাপটপ স্ন্যাপড্রাগন এক্স এলিট চিপ এআরএম আর্কিটেকচার ও উচ্চ ক্ষমতার NPU সারাদিন ব্যাটারি ব্যাকআপ ও ল্যাগ-ফ্রি এআই কাজ।
স্মার্টফোন ট্রাই-ফোল্ড ডিসপ্লে (Tri-fold) মাল্টি-হিঞ্জ মেকানিজম ও আল্ট্রা-থিন গ্লাস পকেটে ট্যাবলেট বহন করার সুবিধা, প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি।
ওয়্যারেবল স্মার্ট রিং (Galaxy/Oura) মিনিয়েচার সেন্সর টেকনোলজি ঘড়ি না পরেও ২৪/৭ হার্ট রেট ও স্লিপ ট্র্যাকিং।
মিক্সড রিয়েলিটি এআর গ্লাস (Meta Orion) হলোগ্রাফিক প্রজেকশন ফোন বের না করেই চোখের সামনে নেভিগেশন ও মেসেজ দেখা।

৩. সাইবার জগত: নিরাপত্তা, প্রাইভেসি ও স্ক্যাম

প্রযুক্তি যত স্মার্ট হচ্ছে, হ্যাকাররা তত ধূর্ত হচ্ছে। এআই-এর অপব্যবহার ২০২৫ সালে সাইবার নিরাপত্তাকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ বছরের মূল মন্ত্র ছিল “কাউকে বিশ্বাস করো না” (Zero Trust Policy)

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ২.০: ডিপফেক ভিডিও কল

এ বছর সাইবার ক্রাইমের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং আলোচিত রূপ ছিল ‘ডিপফেক ভিডিও স্ক্যাম’। হ্যাকাররা এআই ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তি, সিইও বা অফিসের বস-এর হুবহু চেহারা ও কণ্ঠ নকল করে ভিডিও কলে আর্থিক প্রতারণা করেছে।

  • কেস স্টাডি: এ বছর বিশ্বের বেশ কয়েকটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ফিন্যান্স অফিসাররা ভিডিও কলে তাদের ‘বস’-এর নির্দেশ মেনে মিলিয়ন ডলার হ্যাকারদের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেছেন, যা পরে ডিপফেক প্রমাণিত হয়েছে। সাধারণ পাসওয়ার্ড বা ওটিপি (OTP) দিয়ে এটি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

পাস-কি (Passkeys): পাসওয়ার্ডের আনুষ্ঠানিক বিদায়

২০২৫ সালে গুগল, অ্যাপল এবং মাইক্রোসফটের যৌথ প্রচেষ্টায় পাসওয়ার্ড মনে রাখার ঝামেলা প্রায় শেষ। এখন লগ-ইন মানেই ফেস আইডি বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট। একে বলা হচ্ছে FIDO2 স্ট্যান্ডার্ড বা পাস-কি। এটি ফিশিং অ্যাটাক (Phishing Attack) প্রতিরোধে ৯৯% কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, কারণ হ্যাকাররা আপনার বায়োমেট্রিক ডেটা নকল করতে পারে না।

কোয়ান্টাম হ্যাকিং ভীতি ও প্রস্তুতি

ভবিষ্যতের সুপার-পাওয়ারফুল কোয়ান্টাম কম্পিউটার দিয়ে যাতে আজকের এনক্রিপটেড ডেটা হ্যাক করা না যায়, সেজন্য এ বছর গুগল, অ্যাপল এবং সিগন্যাল (Signal) তাদের সিস্টেমে ‘পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি’ (PQC) অ্যালগরিদম যুক্ত করেছে। এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য একটি “ডিজিটাল ভ্যাকসিন” হিসেবে কাজ করছে।

টেবিল: সাইবার ঝুঁকি ও সমাধান ২০২৫

হুমকির ধরন (Threats) বিবরণ (Description) বাঁচার উপায় (Solution)
ডিপফেক ভিডিও কল এআই দিয়ে চেহারা ও কণ্ঠ নকল করে টাকা চাওয়া। পরিবারের বা অফিসের জন্য ‘সেফ ওয়ার্ড’ বা ‘সিক্রেট কোড’ ব্যবহার করা।
কিলওয়্যার (Killware) আইওটি ডিভাইস (যেমন পেসমেকার বা স্মার্ট কার) হ্যাক করে শারীরিক ক্ষতি। আইওটি ডিভাইসের জন্য আলাদা ও সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক ব্যবহার।
শ্যাডো এআই (Shadow AI) অফিসের অনুমতি ছাড়া কর্মীদের অনিরাপদ এআই টুল ব্যবহার। প্রাতিষ্ঠানিক স্যান্ডবক্স পরিবেশ তৈরি ও পলিসি প্রণয়ন।
পাসওয়ার্ড চুরি ফিশিং লিংকের মাধ্যমে ক্রেডেনশিয়াল চুরি। পাস-কি (Passkeys) বা হার্ডওয়্যার কি (YubiKey) ব্যবহার।

Technology Year in Review 2025

৪. বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: ডিজিটাল থেকে স্মার্ট রূপান্তর

বৈশ্বিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও ২০২৫ সালে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। যদিও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং মুদ্রাস্ফীতি ছিল, তবুও আইসিটি সেক্টর নতুন পথে হেঁটেছে।

ডিজিটাল অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটি

SEA-ME-WE 6 বা তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ সংযোগ ২০২৫ সালে ডেটা ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরেও ইন্টারনেটের গতি স্থিতিশীল হয়েছে এবং ৫জি (5G) কভারেজ প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রাম পর্যায়ে ফাইবার অপটিক সংযোগের বিস্তার ই-কমার্স এবং ই-গভর্ন্যান্স সেবাকে ত্বরান্বিত করেছে।

ফ্রিল্যান্সিং থেকে ‘মাইক্রো-এন্টারপ্রেনার’

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা ২০২৫ সালে শুধু গিগ বা ছোট কাজের ওপর নির্ভর না করে ‘এজেন্সি মডেল’-এ চলে গেছে।

  • নতুন স্কিলসেট: প্রথাগত ডেটা এন্ট্রি বা বেসিক গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ কমেছে। এর বদলে বাংলাদেশি তরুণরা এখন ‘প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং’, ‘এআই মডেল ট্রেইনিং’ এবং ‘সাইবার সিকিউরিটি অডিটিং’-এর মতো হাই-ভ্যালু স্কিল রপ্ত করছে।
  • পেমেন্ট সমাধান: পেওনিয়ার এবং ওয়াইজ-এর মতো সেবাগুলোর সাথে লোকাল ব্যাংকিংয়ের গভীর ইন্টিগ্রেশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল ওয়ালেট’ নীতির কারণে ফ্রিল্যান্সারদের টাকা আনার জটিলতা এবং সময় উভয়ই কমেছে।

ফিনটেক ও ন্যানো লোন

বিকাশ, নগদ এবং নতুন ডিজিটাল ব্যাংকগুলো এ বছর এআই ও বিগ ডেটা ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর লেনদেন বিশ্লেষণ করে ‘ইনস্ট্যান্ট ন্যানো লোন’ বা জামানতবিহীন তাৎক্ষণিক ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া শুরু করেছে। এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ছাত্রদের জন্য অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় গতি সঞ্চার করেছে।

টেবিল: স্মার্ট বাংলাদেশ টেকনোলজি ২০২৫

খাত (Sector) ২০২৫-এর অর্জন প্রভাব ও সুবিধা
ইন্টারনেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ৩য় সাবমেরিন ক্যাবল ও ৫জি জোন নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও কম ল্যাটেন্সি, যা রিমোট জবের জন্য জরুরি।
কর্মসংস্থান (ফ্রিল্যান্সিং) এআই স্কিল অ্যাডাপ্টেশন লো-স্কিল কাজ থেকে হাই-ভ্যালু কনসালটেন্সি ও এজেন্সিতে রূপান্তর।
ফিনটেক (Fintech) ন্যানো লোন ও ক্যাশলেস সোসাইটি ব্যাংকে না গিয়েই অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ঋণ ও লেনদেন।
স্টার্টআপ এগ্রি-টেক ও হেলথ-টেক ফোকাস কৃষকদের জন্য এআই আবহাওয়া পূর্বাভাস ও টেলিমেডিসিন সেবা।

৫. গ্রিন টেকনোলজি ও বিজ্ঞান: সীমানা ছাড়িয়ে

২০২৫ সালে প্রযুক্তি শুধুমাত্র ডিজিটাল জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি পরিবেশ রক্ষা এবং মহাকাশ জয়েও বড় ভূমিকা রেখেছে।

  • সলিড স্টেট ব্যাটারি (Solid State Battery): ইলেকট্রিক গাড়ির (EV) জন্য এটি ছিল গেম চেঞ্জার। এই ব্যাটারিগুলো সাধারণ লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চেয়ে দ্বিগুণ চার্জ ধরে রাখে, অনেক হালকা এবং আগুন লাগার ঝুঁকি প্রায় শূন্য। টয়োটা এবং বিওয়াইডি এ বছর তাদের ফ্ল্যাগশিপ গাড়িতে এই প্রযুক্তি এনেছে।
  • স্পেস ট্যুরিজম ও আর্টেমিস: স্পেসএক্স-এর স্টারশিপ প্রজেক্টের সফল কার্গো মিশন এবং নাসা-র আর্টেমিস প্রোগ্রামের অগ্রগতি মঙ্গলে মানব বসতি গড়ার স্বপ্নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালে প্রথম বাণিজ্যিক স্পেস স্টেশন স্থাপনের কাজও শুরু হয়েছে।
  • বায়োটেক ও হেলথ: এআই ব্যবহার করে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার এবং জিন এডিটিং প্রযুক্তি CRISPR-এর মাধ্যমে জটিল বংশগত রোগের চিকিৎসায় এ বছর উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। ক্যানসার শনাক্তকরণে এআই ডাক্তারদের চেয়েও বেশি নির্ভুলতা দেখিয়েছে।

৬. গেমিং ও মেটাভার্স: স্পেশিয়াল কম্পিউটিং

মেটাভার্স শব্দটি কিছুটা ম্লান হলেও ‘স্পেশিয়াল কম্পিউটিং’ (Spatial Computing) শব্দটি ২০২৫ সালে গেমিং ও বিনোদনের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  • বুদ্ধিমান এনপিসি (NPC): গেমের ভেতরের চরিত্ররা এখন আর রোবটের মতো একই কথা বলে না। জেনারেটিভ এআই-এর কারণে আপনি গেমের চরিত্রের সাথে মাইক্রোফোনে কথা বললে তারা বুদ্ধিমান মানুষের মতো রিয়েল-টাইম উত্তর দেয়, যা গেমিং অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত করেছে।
  • ক্লাউড গেমিং ২.০: হাই-এন্ড গ্রাফিক্স কার্ড ছাড়াই ব্রাউজারে ভারী গেম খেলার প্রযুক্তি (যেমন GeForce Now বা Xbox Cloud) এ বছর ল্যাটেন্সি বা বাফারিংয়ের সমস্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। ৫জি এবং উন্নত ভিডিও কমপ্রেশন প্রযুক্তির কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।

৭. উপসংহার: ২০২৬ সালে কী অপেক্ষা করছে?

টেকনোলজি সালতামামি ২০২৫ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ বছরটি ছিল মূলত এআই-এর ‘অ্যাকশন’ নেওয়ার বছর এবং হার্ডওয়্যারের নতুন ফর্মে রূপান্তর। প্রযুক্তি এখন আর আমাদের হাতের জড় ‘টুল’ বা যন্ত্র নয়, এটি আমাদের বুদ্ধিমান ‘পার্টনার’।

তবে এই বিশাল ক্ষমতার সাথে বড় দায়িত্বও চলে এসেছে। ডিপফেক বা সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির লাগামহীন ব্যবহার বিপদ ডেকে আনতে পারে।

এডিটরের দৃষ্টিতে ২০২৬ সালের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ: ১. শ্যাডো এআই (Shadow AI): প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত এআই ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো। ২. মানবীয় দক্ষতা (Human Touch): সব কাজ এআই করলে মানুষের সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তি কমে যাবে কি না, সেই ভারসাম্য রক্ষা করা। ৩. ডিজিটাল বৈষম্য: প্রযুক্তি যেন শুধু ধনীদের হাতেই কুক্ষিগত না থাকে, তা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য এআই সাক্ষরতা বৃদ্ধি করা।

২০২৫ সাল আমাদের শিখিয়েছে, প্রযুক্তির স্রোতে গা ভাসালে হবে না, বরং এর হাল ধরতে শিখতে হবে। ২০২৬ সাল হবে সেই হাল ধরার এবং ‘মাল্টি-এজেন্ট’ সিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের বছর। নতুন বছরে প্রযুক্তির নিরাপদ ও মানবিক ব্যবহার নিশ্চিত হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)

১. ২০২৫ সালের সেরা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কোনটি?
অনেকের মতে, এলএলএম (LLM) থেকে ‘লার্জ অ্যাকশন মডেল’ (LAM)-এ রূপান্তর এবং ‘এজেন্টিক এআই’-এর উত্থানই ছিল এ বছরের সেরা উদ্ভাবন, যা এআই-কে কাজের উপযোগী করেছে।

২. অন-ডিভাইস এআই (On-device AI) সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অন-ডিভাইস এআই ইন্টারনেটের সাহায্য ছাড়াই কাজ করতে পারে। এটি আপনার ব্যক্তিগত ডেটা (যেমন ছবি, কন্টাক্ট বা মেসেজ) ফোনেই প্রসেস করে, ক্লাউডে পাঠায় না। ফলে আপনার প্রাইভেসি সুরক্ষিত থাকে এবং ব্যাটারি খরচ কম হয়।

৩. বাংলাদেশে কি ২০২৫ সালে পেপাল (PayPal) এসেছে?
২০২৫ সালেও পেপাল পূর্ণাঙ্গভাবে বাংলাদেশে আসেনি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল ওয়ালেট’-এর সুবিধা এবং ফ্রিল্যান্সার কার্ডের আপগ্রেডেশনের ফলে বিদেশ থেকে পেমেন্ট আনা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ ও দ্রুত হয়েছে।

৪. ২০২৫ সালে সাইবার আক্রমণ থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষের করণীয় কী?
সবচেয়ে জরুরি হলো সব অ্যাকাউন্টে ‘পাস-কি’ (Passkeys) বা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু করা। এছাড়া ভিডিও বা অডিও কলের ক্ষেত্রে সন্দেহ হলে পরিবারের সদস্যদের সাথে আগে থেকে ঠিক করা ‘সিক্রেট কোড’ বা অফলাইন ভেরিফিকেশন ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ।

সর্বশেষ