২৮ ডিসেম্বর ক্যালেন্ডারের পাতায় এমন একটি দিন যা আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও ইতিহাসের পাতায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। বড়দিন এবং নতুন বছরের উৎসবের ঠিক মাঝখানের এই দিনটিতেই বিশ্ববাসী প্রথম রূপালি পর্দার জাদুতে মুগ্ধ হয়েছিল। এই দিনেই ব্রিটিশ ভারতে রাজনীতির এক নতুন সূর্যোদয় ঘটেছিল, আবার এই দিনেই আধুনিক বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছিল।
প্যারিসের ক্যাফে থেকে শুরু করে বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বাই) রাজনৈতিক মঞ্চ এবং ঢাকার ব্যস্ত রাজপথ—২৮ ডিসেম্বর মানব সভ্যতার অগ্রগতির এক উজ্জ্বল সাক্ষী। আসুন, ইতিহাসের গভীরে ডুব দিই এবং জেনে নিই কেন এই দিনটি এত স্মরণীয়।
বাঙালি ও উপমহাদেশীয় পরিমণ্ডল: দক্ষিণ এশিয়ার বাঁক বদল
বাঙালি এবং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য ২৮ ডিসেম্বর তারিখটি বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ এবং আধুনিক অবকাঠামোর এক অনন্য দিন।
১. ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা (১৮৮৫)
১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বেতে (মুম্বাই) ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। যদিও স্থানটি ছিল মুম্বাইয়ের গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজ, তবুও এই ঘটনার প্রাণভোমরা ছিল বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা।
-
বাঙালি সংযোগ: কংগ্রেসের এই ঐতিহাসিক প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত বাঙালি ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (W.C. Bonnerjee)। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এটিই ছিল প্রথম সংগঠিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ।
-
তাৎপর্য: এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সভা ছিল না; এটি ছিল পরাধীন ভারতে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ। উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে যাত্রার শুরু, পরবর্তীতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মতো নেতাদের হাত ধরে তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
২. ঢাকা মেট্রোরেল উদ্বোধন: বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত (২০২২)
ইতিহাসের পাতা থেকে বর্তমান সময়ে ফিরে আসা যাক। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
-
ঘটনা: উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের প্রথম অংশটি সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
-
গুরুত্ব: যানজটের নগরী ঢাকার জন্য মেট্রোরেল ছিল একটি স্বপ্নের প্রকল্প। এই উদ্বোধন কেবল যাতায়াত ব্যবস্থাকেই সহজ করেনি, বরং এটি বাংলাদেশের প্রকৌশল সক্ষমতা এবং আধুনিকায়নের এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্থান করে নিয়েছে।
৩. সংস্কৃতি ও সাহিত্য
-
শীতের আমেজ ও পৌষ মেলা: শান্তিনিকেতন এবং গ্রামীণ বাংলায় এই সময়টি পৌষ মেলার বিদায়লগ্নের সাথে মিলে যায়। নতুন ধানের গন্ধে এবং পিঠা-পুলির উৎসবে মেতে ওঠে বাঙালিরা।
-
নেপালের রাজা বীরেন্দ্র (জন্ম ১৯৪৫): যদিও তিনি বাঙালি ছিলেন না, তবুও নেপালের রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেবের জন্ম এই দিনে। নেপাল-ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির স্বপক্ষে এক জোরালো কণ্ঠস্বর ছিলেন।
বিশ্ব ইতিহাস: যেদিন সিনেমার জন্ম হলো

আপনি যদি চলচ্চিত্র প্রেমী হয়ে থাকেন, তবে আজকের দিনটি আপনার জন্য উৎসবের দিন।
লুমিয়ের ব্রাদার্সের প্রথম প্রদর্শনী (১৮৯৫)
১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসের গ্র্যান্ড ক্যাফে-র বেসমেন্টে লুমিয়ের ভাইরা (লুই এবং অগাস্ট লুমিয়ের) ইতিহাসের প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী আয়োজন করেন।
-
দৃশ্যপট: মাত্র ৩৩ জন দর্শক ১ ফ্রাঙ্ক খরচ করে ১০টি ছোট ছোট নির্বাক চলচ্চিত্র দেখেন, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৫০ সেকেন্ড।
-
চলচ্চিত্র: প্রদর্শিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ছিল বিখ্যাত ‘Workers Leaving the Lumière Factory’।
-
কিংবদন্তি: বলা হয়, যখন তারা ‘ট্রেনের আগমন’ (Arrival of a Train) দৃশ্যটি দেখান, তখন দর্শকরা ভয়ে সিট ছেড়ে পালাতে শুরু করেছিলেন, কারণ তাদের মনে হয়েছিল ট্রেনটি বুঝি পর্দার বাইরে এসে তাদের পিষে ফেলবে। এটি ছিল মানুষের ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতার এক আমূল পরিবর্তন।
বিশ্বজুড়ে অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনা
টেই ব্রিজ বিপর্যয় (১৮৭৯)
স্কটল্যান্ডে এই দিনে ঘটেছিল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ১৮৭৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রবল ঝড়ের মধ্যে টেই রেল ব্রিজ ধসে পড়ে।
-
ঘটনা: একটি যাত্রীবাহী ট্রেন পার হওয়ার সময় সেতুর মাঝখানের অংশটি ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। এতে ট্রেনের ৭৫ জন আরোহীর সবাই মৃত্যুবরণ করেন।
-
ফলাফল: এই ঘটনাটি প্রকৌশল বিদ্যার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় এবং এর ফলে ব্রিজ তৈরির সুরক্ষা নীতিমালায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়।
ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে-র পবিত্রকরণ (১০৬৫)
১০৬৫ সালের এই দিনে লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে আনুষ্ঠানিকভাবে পবিত্র (Consecrated) করা হয়। রাজা এডওয়ার্ড দ্য কনফেসর এটি নির্মাণ করেছিলেন। এরপর থেকে ব্রিটেনের সব রাজ-রাজড়ার অভিষেক অনুষ্ঠান এই ঐতিহাসিক স্থানেই হয়ে আসছে।
আইওয়া-র যুক্তরাষ্ট্রে যোগদান (১৮৪৬)
প্রেসিডেন্ট জেমস কে. পোলক একটি বিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে আইওয়া (Iowa)-কে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেন। কৃষিপ্রধান এই রাজ্যটি পরবর্তীতে আমেরিকার রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিখ্যাত জন্মদিন: শিল্প ও বাণিজ্যের মহাতারকাগণ
২৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিত্বদের তালিকা দেখলে অবাক হতে হয়। বাস্তব জীবনের শিল্পপতি থেকে শুরু করে কল্পনার সুপারহিরোদের স্রষ্টা—সবাই এই দিনে জন্মেছেন।
রতন টাটা (১৯৩৭) – বিনম্র শিল্পপতি
ব্রিটিশ ভারতের বোম্বেতে জন্মগ্রহণকারী রতন নেভাল টাটা কেবল ভারতের নন, পুরো উপমহাদেশের গর্ব।
-
অবদান: টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি টাটা গ্রুপকে একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত করেন। জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের মতো ব্রিটিশ কোম্পানি অধিগ্রহণ করে তিনি বাণিজ্যের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
-
উত্তরাধিকার: ব্যবসার চেয়েও বেশি তিনি পরিচিত তাঁর সততা, নম্রতা এবং জনহিতকর কাজের জন্য। মধ্যবিত্তের স্বপ্ন পূরণে তাঁর ‘টাটা ন্যানো’ প্রকল্প আজও স্মরণীয়।
স্ট্যান লি (১৯২২) – আধুনিক রূপকথার জনক
নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণকারী স্ট্যান লি (আসল নাম স্ট্যানলি মার্টিন লিবার) কমিকস এবং পপ কালচারের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিলেন।
-
মার্ভেল বিপ্লব: স্পাইডার-ম্যান, এক্স-মেন, আয়রন ম্যান, থর, হাল্ক এবং ব্ল্যাক প্যান্থারের মতো চরিত্রের সহ-স্রষ্টা তিনি।
-
স্বাতন্ত্র্য: ডিসি কমিকসের নিখুঁত দেবতাদের বিপরীতে স্ট্যান লি সৃষ্টি করেছিলেন ‘মানবিক’ সুপারহিরোদের—যাদের জীবনেও আছে দুঃখ, দারিদ্র্য এবং ব্যর্থতা। একারণেই মার্ভেল আজ বিশ্বজুড়ে এত জনপ্রিয়।
ডেনজেল ওয়াশিংটন (১৯৫৪) – অভিনয়ের জাদুকর
হলিউডের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা ডেনজেল ওয়াশিংটন এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন।
-
অর্জন: ট্রেনিং ডে এবং গ্লোরি সিনেমার জন্য অস্কারজয়ী এই অভিনেতা পর্দায় তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং দরাজ কণ্ঠের জন্য বিখ্যাত।
আরও কিছু উল্লেখযোগ্য জন্মদিন:
-
ম্যাগি স্মিথ (১৯৩৪): বিখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেত্রী (হ্যারি পটারের প্রফেসর ম্যাকগোনাগাল)।
-
লিনুস তোরভালদস (১৯৬৯): লিনাক্স (Linux) কার্নেলের স্রষ্টা। তাঁর তৈরি অপারেটিং সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করেই আজ বিশ্বের ইন্টারনেট এবং অ্যান্ড্রয়েড ফোন চলছে।
-
জন লিজেন্ড (১৯৭৮): বিখ্যাত মার্কিন গায়ক এবং গীতিকার।
বিখ্যাত প্রয়াণ: যাদের আমরা হারিয়েছি
ডেবি রেনল্ডস (২০১৬)
হলিউডের স্বর্ণযুগের অভিনেত্রী এবং সিংগিং ইন দ্য রেইন খ্যাত ডেবি রেনল্ডস এই দিনে মারা যান।
-
ট্র্যাজেডি: তাঁর মৃত্যুটি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। তাঁর মেয়ে, বিখ্যাত অভিনেত্রী ক্যারি ফিশার (স্টার ওয়ার্স-এর প্রিন্সেস লেইয়া)-এর মৃত্যুর ঠিক এক দিন পরেই তিনি স্ট্রোক করে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, “আমি ক্যারির কাছে যেতে চাই।”
রানী দ্বিতীয় মেরি (১৬৯৪)
স্মলপক্সে আক্রান্ত হয়ে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের রানী দ্বিতীয় মেরি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর স্বামী তৃতীয় উইলিয়াম এককভাবে রাজত্ব পরিচালনা করেন।
এক নজরে: ঐতিহাসিক ঘটনা ও ব্যক্তিত্ব
পাঠকের সুবিধার্থে নিচে ছক আকারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো:
ইতিহাসের প্রধান ঘটনাবলী
| সাল | ঘটনা | স্থান | তাৎপর্য |
| ১০৬৫ | ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে পবিত্রকরণ | লন্ডন, যুক্তরাজ্য | ব্রিটিশ রাজাদের অভিষেকের স্থান। |
| ১৮৭৯ | টেই ব্রিজ বিপর্যয় | স্কটল্যান্ড | ৭৫ জনের মৃত্যু; প্রকৌশল বিদ্যায় সংস্কার। |
| ১৮৮৫ | কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা | বোম্বে, ভারত | ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা। |
| ১৮৯৫ | প্রথম সিনেমা প্রদর্শনী | প্যারিস, ফ্রান্স | বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের জন্ম। |
| ১৯০৮ | মেসিনা ভূমিকম্প | ইতালি | ৭৫,০০০+ মৃত্যু; ইউরোপের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ। |
| ১৯৭৩ | বিপন্ন প্রজাতি আইন | যুক্তরাষ্ট্র | বন্যপ্রাণী রক্ষায় ঐতিহাসিক আইন। |
| ২০২২ | ঢাকা মেট্রোরেল উদ্বোধন | ঢাকা, বাংলাদেশ | বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল ব্যবস্থা। |
আজকের দিনে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ব্যক্তিরা
| নাম | জন্মসাল | জাতীয়তা | পরিচিতি |
| উড্রো উইলসন | ১৮৫৬ | আমেরিকান | যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম প্রেসিডেন্ট। |
| স্ট্যান লি | ১৯২২ | আমেরিকান | মার্ভেল কমিকসের সহ-স্রষ্টা। |
| ম্যাগি স্মিথ | ১৯৩৪ | ব্রিটিশ | অভিনেত্রী (হ্যারি পটার খ্যাত)। |
| রতন টাটা | ১৯৩৭ | ভারতীয় | শিল্পপতি ও মানবহিতৈষী। |
| বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ | ১৯৪৫ | নেপালি | নেপালের সাবেক রাজা। |
| ডেনজেল ওয়াশিংটন | ১৯৫৪ | আমেরিকান | অস্কারজয়ী অভিনেতা। |
| লিনুস তোরভালদস | ১৯৬৯ | ফিনিশ | লিনাক্স কার্নেলের জনক। |
আন্তর্জাতিক দিবস ও পালনীয়
-
হোলি ইনোসেন্টস ডে (Holy Innocents’ Day): খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা রাজা হেরোডের আদেশে শিশুদের হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিতে দিনটি পালন করেন। স্পেন এবং ল্যাটিন আমেরিকায় এটি অনেকটা ‘এপ্রিল ফুলস ডে’-র মতো পালন করা হয়, যেখানে নানা রকম কৌতুক করা হয়।
-
কোয়ানজা (৩য় দিন): আফ্রিকান-আমেরিকান সংস্কৃতির উৎসব, আজকের প্রতিপাদ্য ‘উজিমা’ বা সমষ্টিগত দায়িত্ব।
শেষ কথা
২৮ ডিসেম্বর দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কেবল অতীতের দলিল নয়, এটি বর্তমানের ভিত্তি। ১০৬৫ সালের প্রাচীন স্থাপত্য থেকে শুরু করে ২০২২ সালের ঢাকার আধুনিক মেট্রোরেল—এই দিনটি পরিবর্তনের সাক্ষী। বছরের শেষলগ্নে দাঁড়িয়ে আজকের এই দিনটি আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায় নতুনের আবাহনে।


