বছরের শেষ অধ্যায়: ৩১শে ডিসেম্বর – ইতিহাস, বিখ্যাত জন্মদিন এবং বিশ্বজুড়ে পালাবদল

সর্বাধিক আলোচিত

৩১শে ডিসেম্বর দিনটিকে নিয়ে আমাদের সবারই একটা আলাদা উত্তেজনা কাজ করে। ওপর থেকে দেখলে মনে হয়, এটি শুধুই জাঁকজমক, আতশবাজি আর পুরোনো বছরকে বিদায় জানানোর দিন। সিডনি থেকে নিউইয়র্ক, ঢাকা থেকে দিল্লি—পুরো বিশ্ব যেন ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে থাকে একটা নতুন শুরুর আশায়।

কিন্তু যদি উৎসবের এই রেশটা একটু সরিয়ে ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে ৩১শে ডিসেম্বর দিনটি আসলে ইতিহাসের এক বড় ছদ্মবেশ। অদ্ভুতভাবে, ইতিহাস যেন কাজ করার জন্য এই শেষ দিনটিকেই বেছে নেয়। আমরা যখন পার্টি হ্যাট পরে নতুন বছরের রেজোলিউশন নিতে ব্যস্ত থাকি, ঠিক সেই সময়েই অতীতে এমন কিছু ঘটনা ঘটে গেছে যা বিশ্বের মানচিত্র আর আমাদের ভাগ্যকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।

ভাবুন তো, এই দিনটিতেই লন্ডনের এক প্রাসাদে বসে এক রানী এমন এক কাগজে সই করেছিলেন, যা ২০০ বছরের জন্য পরাধীন করে ফেলেছিল আমাদের এই উপমহাদেশকে। এই দিনটিতেই ইউরোপ তাদের হাজার বছরের পুরোনো মুদ্রাকে বিদায় জানিয়েছিল, আর এই দিনটিতেই রাশিয়ার টেলিভিশনে এক নাটকীয় ঘোষণা পুরো বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

তাই আজ রাতে শ্যাম্পেনের বোতল খোলার আগে বা আতশবাজি দেখার আগে, আসুন একটু হেঁটে আসি ৩১শে ডিসেম্বরের সেই “মধ্যরাতের ইতিহাসে”, যা ঠিক করে দিয়েছে আজকের পৃথিবীর গতিপথ।

বাঙালি বলয় ও উপমহাদেশ: যে স্বাক্ষর পাল্টে দিল সব

আপনি যদি বাংলাদেশ বা ভারতের বাসিন্দা হন, তবে ৩১শে ডিসেম্বর আপনার জন্য শুধুই ছুটির দিন নয়। এটি সেই দিন, যেদিন আপনার ইতিহাসের গতিপথ ঠিক করা হয়েছিল সুদূর লন্ডনে বসে।

কাগজে মোড়া সাম্রাজ্য (১৬০০ সাল)

১৬০০ সাল। লন্ডনে হাড়কাঁপানো শীত। রানী প্রথম এলিজাবেথ একটি বিশেষ সনদে স্বাক্ষর করছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি ছিল সাধারণ একটি ব্যবসায়িক অনুমতিপত্র—”গভর্নর অ্যান্ড কোম্পানি অফ মার্চেন্টস অফ লন্ডন ট্রেডিং ইনটু দ্য ইস্ট ইন্ডিজ” নামের এক বণিক গোষ্ঠীকে বাণিজ্যের অধিকার দেওয়া।

সেদিন এটি ছিল শুধুই ব্যবসা। মসলার বাজারে ডাচদের সাথে টেক্কা দেওয়াই ছিল লক্ষ্য। কিন্তু রানীর ওই একটি স্বাক্ষর জন্ম দিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-র। এটি কোনো সাধারণ কোম্পানি ছিল না; তাদের অধিকার দেওয়া হলো সৈন্য রাখার, দুর্গ বানানোর এবং প্রয়োজনে যুদ্ধ করার। সেই কালির আঁচড় শেষ পর্যন্ত পলাশীর আমবাগান হয়ে পুরো বাংলাকে এবং পরবর্তীকালে গোটা উপমহাদেশকে ২০০ বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। আজকের দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা, আমলাতন্ত্র, এমনকি আমাদের দাপ্তরিক ভাষা—সবকিছুর বীজ বোনা হয়েছিল এই ১৬০০ সালের ৩১শে ডিসেম্বরে।

মাটির কাছাকাছি এক সাহিত্যিক (১৯২৫ সাল)

ইতিহাসের পাতা উল্টে এবার বিংশ শতাব্দীতে আসা যাক। ১৯২৫ সালের এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীলাল শুক্লা। আপনি যদি তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘রাগ দরবারী’ না পড়ে থাকেন, তবে ভারতীয় উপমহাদেশের গ্রামীণ রাজনীতির আসল চেহারাটা আপনার অজানা। তিনি শুধু রাজনীতি নিয়ে লেখেননি, তিনি দেখিয়েছিলেন ক্ষমতার অন্দরমহলের হাস্যরস আর দুর্নীতি। তাঁর জন্মদিনে আমরা স্মরণ করি এমন এক কলমযোদ্ধাকে, যিনি আমাদের নিজের দিকে তাকিয়ে হাসতে শিখিয়েছেন।

১৯৯৯ সালের সেই রাত: যেদিন বিশ্ব বদলে গেল

যদি আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে এমন কোনো নিউ ইয়ার্স ইভ খুঁজতে হয় যা সবকিছু ওলোট-পালট করে দিয়েছে, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ৩১শে ডিসেম্বর, ১৯৯৯। সবাই যখন ‘Y2K’ বা কম্পিউটার অচল হয়ে যাওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত, তখন বিশ্ব রাজনীতিতে ঘটে যাচ্ছিল বিশাল পালাবদল।

মস্কোর সেই নাটকীয় ঘোষণা

রাশিয়ার মানুষ সেদিন টিভির সামনে বসেছিল প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলতসিনের গতানুগতিক নববর্ষের শুভেচ্ছা শোনার জন্য। কিন্তু তিনি যা করলেন, তা ছিল অকল্পনীয়। তিনি ক্যামেরার সামনে এসে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করলেন এবং পদত্যাগ করলেন।

কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি ক্ষমা চাইলেন এবং রাশিয়ার পারমাণবিক ব্রিফকেসটি তুলে দিলেন তাঁর প্রধানমন্ত্রীর হাতে। সেই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একজন প্রাক্তন গুপ্তচর, নাম ভ্লাদিমির পুতিন। সেই মুহূর্তে কেউ ভাবেনি, কিন্তু সেদিনই রাশিয়ার বিশৃঙ্খল ৯০-এর দশকের অবসান ঘটে এবং পুতিনের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগের সূচনা হয়। আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার যে অবস্থান, তার জন্ম হয়েছিল সেই নাটকীয় রাতে।

পানামা খালের ঘরে ফেরা

একই দিনে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পানামায় চলছিল এক বিশাল উৎসব। ১৯৯৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর দুপুরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে পানামা খাল-এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পানামার কাছে হস্তান্তর করে। প্রায় এক শতাব্দী ধরে আমেরিকা এই খালটিকে নিজের সম্পত্তির মতো ব্যবহার করে আসছিল। এই হস্তান্তর শুধুই প্রশাসনিক ছিল না; এটি ছিল লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য কমে আসার এক বড় ইঙ্গিত।

অর্থনীতির জুয়া: ইউরোর জন্ম (১৯৯৮)

১৯৯৮ সালের ৩১শে ডিসেম্বর রাতটি ইউরোপের ব্যাংকারদের জন্য ছিল চরম উত্তেজনার। ঘড়ির কাঁটা মেলার সাথে সাথে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালিসহ ১১টি দেশের মুদ্রার বিনিময় হার চিরতরে লক করে দেওয়া হয়।

মার্ক, ফ্রাঙ্ক, লিরা—শত বছরের পুরোনো এই মুদ্রাগুলো কার্যত সেই রাতে মৃত্যুবরণ করে। তাদের জায়গায় জন্ম নেয় ইউরো (€)। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি আর অর্থনীতির দেশগুলো কি একই মানিব্যাগ ব্যবহার করতে পারবে? এই প্রশ্ন তখন ছিল। কিন্তু ইউরো চালু হওয়ার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক নতুন যুগে প্রবেশ করে, আর সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণটি ছিল আজকের এই দিন।

আলো এবং আঁধার: উদ্ভাবন ও সংকট

অন্ধকার দূর করার রাত (১৮৭৯)

১৮৭৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের আগে, সূর্য ডুবলেই পৃথিবী থমকে যেত। কিন্তু সেই রাতে টমাস আলভা এডিসন নিউ জার্সির মেনলো পার্কে এক জাদুর প্রদর্শনী করলেন। তিনি সুইচ টিপলেন, আর প্রথমবারের মতো রাস্তাঘাট, ল্যাবরেটরি এবং ঘরবাড়ি বৈদ্যুতিক আলোয় ঝলমল করে উঠল। এটি শুধুই একটি প্রদর্শনী ছিল না; এটি ছিল সেই মুহূর্ত যখন মানুষ রাতকে জয় করল।

অদৃশ্য শত্রুর আগমন (২০১৯)

এর ঠিক ১৪০ বছর পর, ২০১৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর আমরা এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। যখন বিশ্ব ২০২০ সালকে বরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, চীনের উহান থেকে একটি ছোট রিপোর্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে পাঠানো হলো। এতে বলা হলো, সেখানে “অজানা কারণে নিউমোনিয়া”-র কিছু কেস পাওয়া গেছে। আমরা তখনো জানতাম না, এটি ছিল কোভিড-১৯ মহামারীর শুরুর ঘণ্টা। ইতিহাস এভাবেই মাঝেমধ্যে নিঃশব্দে এসে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে।

এক নজরে: ৩১শে ডিসেম্বরের খতিয়ান

৩১শে ডিসেম্বরের খতিয়ান

যারা বিস্তারিত তথ্য পছন্দ করেন, তাদের জন্য নিচে এই দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও ব্যক্তিদের তালিকা দেওয়া হলো।

বিখ্যাত জন্মদিন

নাম বছর জাতীয়তা কেন স্মরণীয়?
স্যার অ্যান্থনি হপকিন্স ১৯৩৭ ব্রিটিশ ‘সাইলেন্স অফ দ্য ল্যাম্বস’ সিনেমায় ভিলেনকেও যে কতটা আভিজাত্য দেওয়া যায়, তা তিনি দেখিয়েছিলেন।
বেন কিংসলি ১৯৪৩ ব্রিটিশ মহাত্মা গান্ধীর চরিত্রে অভিনয় করে যিনি ইতিহাস হয়ে আছেন।
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ১৯৪১ স্কটিশ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে যিনি বিশ্বসেরা ক্লাবে পরিণত করেছিলেন।
অঁরি মাতিস ১৮৬৯ ফরাসি যিনি রঙের তুলি দিয়ে ক্যানভাসে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।
সাই (Psy) ১৯৭৭ কোরিয়ান ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ দিয়ে যিনি ইন্টারনেট ভেঙে দিয়েছিলেন।

বিখ্যাত মৃত্যু

নাম বছর পরিচয় কেন স্মরণীয়?
বেটি হোয়াইট ২০২১ অভিনেত্রী কমেডি যে বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না, ১০০ বছর ছুঁই ছুঁই বয়সেও তিনি তা প্রমাণ করেছেন।
পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট ২০২২ ধর্মগুরু গত ৬০০ বছরের মধ্যে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা প্রথম পোপ।
রবার্তো ক্লেমেন্টে ১৯৭২ খেলোয়াড় ভূমিকম্প দুর্গতদের সাহায্য করতে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত মহান বেসবল খেলোয়াড়।

আপনি কি জানেন?

১. এক সেকেন্ড বেশি: ৩১শে ডিসেম্বর হলো বছরের সেই দুটি দিনের একটি (অন্যটি ৩০ জুন), যেদিন বিজ্ঞানীরা ঘড়িতে মাঝে মাঝে একটি “লিপ সেকেন্ড” (Leap Second) যোগ করেন। পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির সাথে সময়ের সামঞ্জস্য রাখতে এটি করা হয়। তাই মাঝেমধ্যে এই বছরটি গত বছরের চেয়ে এক সেকেন্ড বড় হতে পারে!

২. ব্লু মুন পার্টি: ২০০৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর আকাশে দেখা গিয়েছিল “ব্লু মুন” (মাসের দ্বিতীয় পূর্ণিমা) এবং একই সাথে চন্দ্রগ্রহণ। নিউ ইয়ার্স ইভে এমন মহাজাগতিক ঘটনা জীবনে একবারই ঘটে।

৩. ছোট শুরু, বিশাল সাম্রাজ্য: ১৬০০ সালে আজকের দিনে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুরু হয়, তখন তাদের শেয়ারহোল্ডার ছিল আধুনিক আমলের যেকোনো ছোট স্টার্টআপের চেয়েও কম। অথচ এই কোম্পানিই একসময় বিশ্বের অর্ধেক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত।

শেষ কথা

আজ রাতে যখন কাউন্টডাউন শুরু হবে, তখন উৎসবের রঙের বাইরে একটু তাকাবেন। ৩১শে ডিসেম্বর শুধুই ক্যালেন্ডারের শেষ পাতা নয়; এটি মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, উত্থান আর পতনের এক জীবন্ত দলিল। এই দিনেই আমরা বৈদ্যুতিক আলো পেয়েছি, এই দিনেই আমরা নতুন মুদ্রা পেয়েছি, আবার এই দিনেই আমরা হারিয়েছি স্বাধীনতার চাবিকাঠি।

সর্বশেষ