১৫ জানুয়ারি তারিখটি বছরের শুরুতে এমন এক দিন, যেখানে সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তন, আর আধুনিক সিস্টেমের জন্ম ও সংকট—সবকিছু একসাথে দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি সূর্য ও ফসলের মৌসুম; আবার বিশ্ব ইতিহাসে এই দিনটিকে মনে রাখা হয় ক্ষমতা, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও ন্যায়বিচার নিয়ে বড় বড় প্রশ্ন তোলার জন্য।
একদিকে আর্মি ডে, মকর সংক্রান্তি, পঙ্গল, মাঘ বিহু—যা মানুষকে মাটি, পরিবার ও বিশ্বাসের সাথে বেঁধে রাখে। অন্যদিকে উইকিপিডিয়ার জন্ম, বোস্টনের মোলাসেস বিপর্যয়, পেন্টাগন, “মিরাকল অন দ্য হাডসন”—যা প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা, সিস্টেম ডিজাইন ও ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের কথা মনে করিয়ে দেয়।
১৫ জানুয়ারি – যুগে যুগে কী ঘটেছে
| সাল | স্থান | কী ঘটেছিল | কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ |
|---|---|---|---|
| 69 | রোম | ওথো নিজেকে রোমান সম্রাট ঘোষণা করেন | দ্রুত পতনশীল ক্ষমতার রাজনীতি ও সামরিক শক্তির ভূমিকার উদাহরণ |
| 1559 | ইংল্যান্ড | এলিজাবেথ প্রথমের অভিষেক | ইংরেজ রাষ্ট্রব্যবস্থা, ধর্মীয় দ্বন্দ্ব ও সমুদ্রশক্তি গঠনের মোড় ঘোরানো রাজত্ব |
| 1759 | ইংল্যান্ড | ব্রিটিশ মিউজিয়ামের দরজা জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া | আধুনিক পাবলিক মিউজিয়াম-ধারণার শক্তিশালী সূচনা |
| 1777 | উত্তর আমেরিকা | নিউ কনেকটিকাট (বর্তমান ভেরমন্ট) নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করে | পরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য হওয়ার পথ তৈরি হয় |
| 1782 | যুক্তরাষ্ট্র | অর্থশাস্ত্রী রবার্ট মরিস কংগ্রেসে জাতীয় মুদ্রা ও দশমিক পদ্ধতি প্রস্তাব করেন | আধুনিক মুদ্রা ও দশমিক ভিত্তিক ডলার সিস্টেমের দিকে এগোনো |
| 1815 | যুক্তরাষ্ট্র–ব্রিটেন | যুদ্ধজাহাজ USS President চারটি ব্রিটিশ জাহাজের কাছে আত্মসমর্পণ করে | নৌ-সংঘাতে কৌশল, শক্তি ও কূটনীতির জটিল বাস্তবতা |
| 1865 | যুক্তরাষ্ট্র | গৃহযুদ্ধের সময় ফোর্ট ফিশার পতন, কনফেডারেসির শেষ বড় সমুদ্রবন্দর কেটে দেওয়া | দাসপ্রথা-সমাপ্তির দিকে যাত্রা ত্বরান্বিত করা সামরিক টার্নিং পয়েন্ট |
| 1867 | যুক্তরাজ্য | লন্ডনের রিজেন্টস পার্কে বরফ ভেঙে দুর্ঘটনা, কমপক্ষে ৪০ জনের মৃত্যু | জননিরাপত্তা ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার গুরুত্বের একটি পুরোনো উদাহরণ |
| 1913 | জার্মানি–যুক্তরাষ্ট্র | বার্লিন ও নিউ ইয়র্কের মধ্যে প্রথম টেলিফোন লাইন চালু | আন্তঃমহাদেশীয় যোগাযোগের নতুন যুগের সূচনা |
| 1919 | যুক্তরাষ্ট্র | বোস্টনের গ্রেট মোলাসেস ফ্লাড | শিল্প নিরাপত্তা, বিল্ডিং কোড ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নতুন ধাক্কা |
| 1919 | জার্মানি | রোজা লুক্সেমবার্গ ও কার্ল লিবকনেখট হত্যাকাণ্ড | নবীন গণতন্ত্র ও বিপ্লবী রাজনীতিতে সহিংসতার বিপদ |
| 1936–37 | স্পেন | স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারে কোরুনা রোডের দ্বিতীয় যুদ্ধ শেষে উভয় পক্ষই সরে যায় | গৃহযুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও মানবিক ক্ষতির প্রতীক |
| 1943 | সোভিয়েত ইউনিয়ন | ভোরোনেজে সোভিয়েত পাল্টা আক্রমণ শুরু | দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পূর্ব ফ্রন্টে শক্তি ফেরার ইঙ্গিত |
| 1943 | যুক্তরাষ্ট্র | পেন্টাগনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন | আধুনিক আমেরিকান প্রতিরক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় প্রতীক |
| 1949 | ভারত | প্রথমবার পালিত হয় ভারতীয় আর্মি ডে | স্বাধীনতার পর সামরিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণা |
| 1967 | যুক্তরাষ্ট্র | প্রথম সুপার বোল (Super Bowl I) অনুষ্ঠিত | খেলাধুলাকে গ্লোবাল পপ কালচারে রূপান্তরের অর্থনীতিক উদাহরণ |
| 1973 | ভিয়েতনাম যুদ্ধ | মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ভিয়েতনামে বোমাবর্ষণ স্থগিতের ঘোষণা দেন | যুদ্ধ সমাপ্তির দিকে রাজনৈতিক টার্নিং পয়েন্ট |
| 1975 | অ্যাঙ্গোলা | আলভোর চুক্তি সই, অ্যাঙ্গোলার স্বাধীনতা স্বীকৃত | আফ্রিকায় উপনিবেশ-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত |
| 2001 | অনলাইন বিশ্ব | উইকিপিডিয়ার সূচনা | ওপেন-সোর্স জ্ঞান, ক্রাউড-এডিটিং ও তথ্যপ্রবাহের নতুন ধারা |
| 2009 | যুক্তরাষ্ট্র | “Miracle on the Hudson” – US Airways Flight 1549 নিরাপদে হাডসন নদীতে অবতরণ | এভিয়েশন সেফটি, প্রশিক্ষণ ও সিদ্ধান্ত-নেতৃত্বের ক্লাসিক কেস |
| 2022 | টোঙ্গা | হুংগা টোঙ্গা-হুংগা হা’আপাই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও সুনামি | গ্লোবাল কমিউনিকেশন, জলবায়ু ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভঙ্গুরতা প্রকাশ |
ভারতীয় আর্মি ডে (১৯৪৯): স্বাধীন রাষ্ট্রের সামরিক আত্মপরিচয়
১৯৪৯ সালের ১৫ জানুয়ারি জেনারেল কে. এম. কারিয়াপ্পা ব্রিটিশ সেনাপ্রধান ফ্রান্সিস বুচারের কাছ থেকে ভারতের সেনাবাহিনীর কমান্ড গ্রহণ করেন। এটি ছিল সেই মুহূর্ত, যখন স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনী কাগজে নয়, বাস্তবে ভারতীয় হাতে আসে।
আজও আর্মি ডে শুধু সামরিক কুচকাওয়াজের দিন নয়; এটি একটি নৈতিক বার্তা—প্রফেশনাল সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির নয়, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক আদর্শের সেবা করতে হবে। এই ধারণা বাংলাদেশের মত মুক্তিযুদ্ধ-অভিজ্ঞ দেশগুলোর জন্যও অনুপ্রেরণাদায়ক, কারণ রাষ্ট্রের শক্তি শেষ পর্যন্ত পেশাদার, জনগণের জবাবদিহিমুখী প্রতিষ্ঠানের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।
ফসল, সূর্য ও উৎসব: জানুয়ারির সাংস্কৃতিক মানচিত্র
১৫ জানুয়ারিকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় এক বিশাল “সোলার শিফট”–এর উৎসবচক্র দেখা যায়। বিভিন্ন ভাষা, ভৌগোলিক অঞ্চল ও ধর্মীয় ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও, মূল অনুভূতি একই—সূর্য শক্তিশালী হচ্ছে, দিন বড় হচ্ছে, আর মাটি তার ফসল তুলে দিচ্ছে।
মকর সংক্রান্তি (ভারত, নেপাল, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া)
মকর সংক্রান্তি সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশের প্রতীক; সাধারণত ১৪ বা ১৫ জানুয়ারি দিনটি উদযাপিত হয়, বিশেষ করে ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশে বিভিন্ন নামে।
-
তিল ও গুড় ব্যবহার করে লাড্ডু, পিঠা, চিড়া-মুড়ি দিয়ে উৎসব করা হয়; তিলকে উষ্ণতা ও গুড়কে মিষ্টতা ও স্থায়িত্বের প্রতীক ধরা হয়।
-
গঙ্গা, যমুনা বা স্থানীয় নদীতে স্নান, নতুন সূর্যালোকের স্বাগত ও দান–খয়রাত আয়োজন হয়; এতে ব্যক্তিগত পবিত্রতার পাশাপাশি সামাজিক সমতা ও দয়া প্রকাশ পায়।
পঙ্গল (তামিলনাড়ু ও বিশ্বব্যাপী তামিল প্রবাস)
তামিলনাড়ু ও শ্রীলঙ্কার তামিল জনগোষ্ঠীর কাছে “থাই” মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু হওয়া পঙ্গল ফসল কৃতজ্ঞতার উৎসব।
-
“থাই পঙ্গল”–এ বাড়ির সামনের প্রাঙ্গণে মাটির হাঁড়িতে দুধ ও চাল ফোটানো হয়; হাঁড়ি উপচে পড়া মানে নতুন বছরের সৌভাগ্য ও প্রাচুর্য।
-
“মাট্টু পঙ্গল”–এ গরু-গবাদি পশুকে রঙিন করে সাজিয়ে সম্মান দেখানো হয়, কারণ কৃষিকাজে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাঘ বিহু / ভোগালি বিহু (অসম)
অসমে মাঘ বিহু বা ভোগালি বিহু মূলত ফসল তোলার পরের আনন্দ উৎসব, যা সাধারণত ১৪–১৫ জানুয়ারির আশেপাশে উদযাপিত হয়।
-
বিহু রাতের “উরুকা”—গাছের ডাল ও খড় দিয়ে বানানো অস্থায়ী ঝুপড়ি (মেজি) ঘিরে গ্রামবাসীর একসঙ্গে রান্না-বান্না ও ভোজ।
-
বুলফাইট, কুমড়া ভাঙা, টেকেলি ভঙ্গা (মাটির কলসি ভাঙা) প্রভৃতি খেলাধুলা এই উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
লোহরি (পাঞ্জাব) ও অন্যান্য উৎসব
পাঞ্জাবে লোহরি উৎসবও সাধারণত ১৩–১৪ জানুয়ারি রাত থেকেই শুরু হয়, যা মকর সংক্রান্তিরই আরেক আঞ্চলিক রূপ। আগুনকে ঘিরে গান, নাচ, রেভড়ি-চিনাবাদাম বিলি—সব মিলিয়ে এটি শীতের বিদায় আর নতুন আলোকে স্বাগত জানানোর এক সম্মিলিত আচার।
বাংলার শীতকালীন জীবন ও ১৫ জানুয়ারি

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে জানুয়ারি মধ্যভাগ—অর্থাৎ পৌষের শেষ, মাঘের শুরু—মৌসুমি জীবনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশগুলোর একটি।
-
পিঠা উৎসব, খেজুর রস, গুড়, পাটালি, হাঁস-মুরগির বিভিন্ন পদ—এই সময় সামাজিক জীবনে প্রাকৃতিক এক স্বাদ ও গতি আনে।
-
ঢাকার পুরান শহর, বরিশাল–ফরিদপুর অঞ্চলে গুড় বানানোর মৌসুম, গ্রামীণ মেলাসহ শীতের শেষভাগের অনানুষ্ঠানিক উৎসবগুলো ১৫ জানুয়ারির আশেপাশের আবহকে এক “নামহীন উৎসবে” পরিণত করে।
আন্তর্জাতিক দিবস, রাষ্ট্র ও স্মৃতির রাজনীতি
১৫ জানুয়ারিতে অনেক দেশে নানা ধরনের জাতীয় দিবস বা থিম্যাটিক দিবস পালিত হয়। এগুলো বোঝায়, একই দিনকে বিভিন্ন সমাজ বিভিন্ন নৈতিক বার্তার বাহন হিসেবে ব্যবহার করে।
| দিবস | কোন দেশে | কীকে সামনে আনে |
|---|---|---|
| Army Day | ভারত | সামরিক পেশাদারিত্ব, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সেবা |
| Armed Forces Remembrance Day | নাইজেরিয়া | শহীদ সেনাদের স্মরণ ও জাতীয় ঐক্য |
| Teacher’s Day | ভেনেজুয়েলা | শিক্ষকের মর্যাদা ও নাগরিক গঠন |
| John Chilembwe Day | মালাউই | উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম ও জাতীয় আত্মপরিচয় |
| Korean Alphabet Day (Chosŏn’gŭl Day) | উত্তর কোরিয়া | ভাষা, স্বাধিকার ও জাতীয় আদর্শ |
| Arbor Day | মিশর | পরিবেশ সচেতনতা ও বৃক্ষরোপণ |
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: রাজনীতি, সমাজ ও সিস্টেম
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের জন্ম (১৯২৯)
১৯২৯ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র—যিনি পরবর্তীতে আমেরিকান সিভিল রাইটস মুভমেন্টের সবচেয়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর নেতৃত্বে অহিংস মিছিল, বয়কট ও ভাষণ জাতিগত বৈষম্যবিরোধী আইনি পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
আজও তাঁর কথা একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়: অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মানুষ কি ঘৃণার ফাঁদে পড়বে, নাকি নৈতিকতা ও মানবিকতা ধরে রাখবে? “normal” বলে মেনে নেয়া অবিচারকে ভেঙে নতুন নৈতিক মান স্থাপনের জন্য তিনি এক বিশ্বজনীন রেফারেন্স।
গ্রেট মোলাসেস ফ্লাড (১৯১৯)
বোস্টনের এক বিশাল মোলাসেস ট্যাংক ফেটে গিয়ে ঘন সিরার সুনামি শহরের রাস্তা-বাড়ি ভাসিয়ে দেয়; অন্তত ২১ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়।
-
ঘটনাটি প্রথমে “অদ্ভুত দুর্ঘটনা” মনে হলেও তদন্তে সামনে আসে নকশাগত ত্রুটি, পর্যাপ্ত পরীক্ষা না করা, আর কোম্পানির অবহেলা।
-
পরে আদালতের রায় ও ক্ষতিপূরণের মামলাগুলো শিল্প নিরাপত্তা, বিল্ডিং কোড ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ভূমিকাকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে—যার প্রভাব পরবর্তী বহু দশক ধরে শিল্প আইন প্রণয়নে ধরা পড়ে।
পেন্টাগনের উদ্বোধন (১৯৪৩)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুঙ্গে গিয়ে ১৯৪৩ সালের ১৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয় পেন্টাগন—বিশ্বের বৃহত্তম অফিস ভবনগুলোর একটি।
এটি কেবল সামরিক অফিস নয়, বরং এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক যেখানে প্রতিরক্ষা নীতি, বাজেট, আন্তর্জাতিক মিত্রতা, গোয়েন্দা তথ্য ও যুদ্ধনীতি—সবকিছু এক নেটওয়ার্কে গাঁথা। তাই আজও পেন্টাগনের নাম শুনলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে: নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ভারসাম্য কোথায়?
উইকিপিডিয়ার জন্ম (২০০১)
২০০১ সালের ১৫ জানুয়ারি জিমি ওয়েলস ও ল্যারি স্যাঙ্গার চালু করেন উইকিপিডিয়া। প্রথমদিকে এটিকে অনেকেই কম সিরিয়াস প্রকল্প ভেবেছিলেন, কারণ যে কেউ এসে সম্পাদনা করতে পারত; কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় রেফারেন্স প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে।
এখন শিক্ষার্থী থেকে সাংবাদিক, সাধারণ পাঠক থেকে গবেষক—প্রায় সবাই কোনো নতুন টপিক নিয়ে দ্রুত ধারণা পেতে উইকিপিডিয়ার শরণাপন্ন হন। এর মাধ্যমে “জ্ঞান” শুধু লাইব্রেরি বা গেটেড ডাটাবেজের ভেতরে আটক না থেকে, দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
ইউরোপ: রাজতন্ত্র, বিপ্লব ও ক্ষমতার মূল্য
এলিজাবেথ প্রথমের অভিষেক (১৫৫৯, ইংল্যান্ড)
১৫৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতে এলিজাবেথ I–এর অভিষেক হয়। তাঁর সময়ে ইংল্যান্ডে প্রোটেস্ট্যান্ট ধারার একটা স্থায়ী ধর্মীয় সমঝোতা গড়ে ওঠে, সমুদ্রবাণিজ্য ও নৌ-বাহিনী শক্তিশালী হয় এবং “Elizabethan era” সাহিত্য ও নাটকের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিতি পায়।
এখানে মূল শিক্ষা—ক্ষমতা শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, প্রতীক, ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমেও নিজেদের স্থায়ী করতে চায়। এলিজাবেথীয় ইংল্যান্ড সেই প্রতীকের কারখানা তৈরি করেছিল।
রোজা লুক্সেমবার্গ ও কার্ল লিবকনেখটের হত্যাকাণ্ড (১৯১৯, জার্মানি)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে ১৯১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি দুটি সমাজতান্ত্রিক নেতা—রোজা লুক্সেমবার্গ ও কার্ল লিবকনেখট—হত্যা হন।
-
এই হত্যাকাণ্ড দেখিয়েছিল, রাজনৈতিক মেরুকরণ যখন চরমে পৌঁছায়, তখন বিতর্ক ও আইন গায়েব হয়ে, এর জায়গা নেয় প্রতিশোধ ও সহিংসতা।
-
আজও বামপন্থী রাজনীতি ও গণতন্ত্রের আলোচনায় রোজার নাম উঠে আসে, কারণ তিনি একই সঙ্গে বিপ্লবী ও গণতন্ত্রের সমর্থক থাকার চেষ্টা করেছিলেন—যা তাঁকে অনেক পরস্পরবিরোধী মতের মাঝখানে এক বিতর্কিত কিন্তু শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত করেছে।
বাকী বিশ্ব: এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা
বহু আফ্রিকান, এশীয় ও লাতিন আমেরিকান দেশে ১৫ জানুয়ারি দিনটি বিভিন্নভাবে স্মরণ করা হয়—কখনও জাতীয় বীরের মৃত্যুদিন হিসেবে, কখনও স্বাধীনতা সংগ্রামের মাইলফলক, কখনও বা সশস্ত্র বাহিনী স্মরণ দিবস হিসেবে।
উদাহরণ হিসেবে মালাউইর John Chilembwe Day–এর কথা ধরা যায়; তিনি ছিলেন এক পাদ্রী ও উপনিবেশবিরোধী প্রতীক, যাঁর স্মৃতি আজও আফ্রিকান আত্মপরিচয়ের আলোচনায় ফিরে আসে।
জন্মদিন: ১৫ জানুয়ারি – যারা বিশ্বকে বদলে দিয়েছেন
| নাম | জন্মসাল | জাতীয়তা | কী জন্য বিখ্যাত |
|---|---|---|---|
| মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র | 1929 | আমেরিকান | সিভিল রাইটস নেতা, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী |
| মলিয়ের | 1622 | ফরাসি | বিশ্ব নাট্যধারার এক অন্যতম ভিত্তিস্রষ্টা নাট্যকার |
| অ্যারিস্টটল ওনাসিস | 1906 | গ্রিক | শিপিং মোগল, বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়ী ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব |
| সকিচি তোয়োদা | 1867 | জাপানি | টয়োটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাম্রাজ্যের মূল উদ্ভাবক ও শিল্পপতি |
| মিহাই এমিনেস্কু | 1850 | রোমানিয়ান | জাতীয় কবি ও সাহিত্যিক, রোমানিয়ার সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় নাম |
| সোফিয়া কোভালেভস্কায়া | 1850 | রুশ-সুইডিশ | প্রথম মেয়ে গণিতবিদদের একজন, যিনি পূর্ণ প্রফেসরশিপ পান |
| রেজিনা কিং | 1971 | আমেরিকান | অস্কারজয়ী অভিনেত্রী ও পরিচালক |
| ড্রু ব্রিস | 1979 | আমেরিকান | আমেরিকান ফুটবলের অন্যতম রেকর্ডধারী কোয়ার্টারব্যাক |
| পিটবুল (আর্মান্ডো ক্রিশ্চিয়ান পেরেজ) | 1981 | কিউবান-আমেরিকান | পপ ও ড্যান্স মিউজিকের বহুল জনপ্রিয় শিল্পী |
| স্ক্রিলেক্স (সনি মুর) | 1988 | আমেরিকান | ডাবস্টেপ ও ইলেকট্রনিক মিউজিকের গ্র্যামিজয়ী প্রযোজক |
১৫ জানুয়ারির জন্মতালিকা একটি শক্তিশালী মিশ্রণ দেখায়—নীতি ও প্রতিবাদ, ব্যবসা ও শিল্প, বিজ্ঞান ও গণিত, খেলাধুলা ও পপ সংস্কৃতি—সব একসাথে উপস্থিত।
মৃত্যুবার্ষিকী: যাদের স্মৃতিতে এই দিন
| নাম | মৃত্যু বছর | জাতীয়তা | কেন প্রাসঙ্গিক |
|---|---|---|---|
| রোজা লুক্সেমবার্গ | 1919 | পোলিশ–জার্মান | বিপ্লবী ভাবুক, রাজনৈতিক শহীদ |
| কার্ল লিবকনেখট | 1919 | জার্মান | সমাজতান্ত্রিক নেতা, যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠস্বর |
| হ্যারি নিলসন | 1994 | আমেরিকান | গীতিকার ও গায়ক, যার গান আজও জনপ্রিয় |
| গুলজারিলাল নন্দা | 1998 | ভারতীয় | দু’বার ভারতে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী |
| ডোলোরেস ও’রিওরডান | 2018 | আইরিশ | দ্য ক্র্যানবেরিজ ব্যান্ডের কণ্ঠ, ৯০–এর দশকের আইকনিক ভয়েস |
| ক্যারল চ্যানিং | 2019 | আমেরিকান | ব্রডওয়ে ও মিউজিক্যাল থিয়েটারের কিংবদন্তি |
| রকি জনসন | 2020 | কানাডিয়ান | পেশাদার রেসলার, ডোয়াইন “দ্য রক” জনসনের বাবা |
শেষকথা: কেন ১৫ জানুয়ারি আজও গুরুত্বপূর্ণ
১৫ জানুয়ারি আমাদের শিখায়, ইতিহাস কখনো শুধু রাজা–রানি, যুদ্ধ ও রাষ্ট্রের গল্প নয়; এটি সমানভাবে উৎসবের, খাবারের, আচার–অনুষ্ঠানের, প্রতিবাদের, এবং জ্ঞানের মুক্ত প্রবাহের গল্প।
একদিকে—শস্য, সূর্য, পারিবারিক মিলন ও স্থানীয় উৎসব আমাদের মাটির সাথে বেঁধে রাখে। অন্যদিকে—উইকিপিডিয়া, পেন্টাগন, “মিরাকল অন দ্য হাডসন”, আর্মি ডে বা রোজা লুক্সেমবার্গের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সিস্টেম ডিজাইন, দায়বদ্ধতা, এবং মানবিক মূল্যবোধ ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সেটাও ইতিহাসের একটি মূল প্রশ্ন।


