প্রতিটি ক্যালেন্ডারের পাতায় ইতিহাসের এক গভীর ভার লুকিয়ে থাকে। দিনগুলো যেন সেই সব যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং চিরবিদায়ের এক নীরব বার্ষিকী—যা তিলে তিলে আমাদের এই আধুনিক পৃথিবীকে রূপ দিয়েছে। ৩ জুলাই দিনটিও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীন বাংলার মর্মান্তিক পতন থেকে শুরু করে গেটিসবার্গের রক্তস্নাত প্রান্তর—দিনটি অনেক গভীর ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী। একই সাথে এটি এমন এক দিন, যেদিন পৃথিবীতে এসেছেন অনেক দূরদর্শী সাহিত্যিক ও মানবাধিকার নেতা এবং বিদায় নিয়েছেন অনেক কিংবদন্তি।
বাঙালি সত্তা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট—সব মিলিয়ে ৩ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক মাইলফলক, সাংস্কৃতিক তাৎপর্য এবং বিখ্যাত মানুষদের জীবনীর এক বিস্তৃত আর্কাইভ নিচে তুলে ধরা হলো।
এক নজরে: ৩ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ
দ্রুত ঘটনাগুলো মনে করার জন্য নিচে ইতিহাসের এই দিনটির একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
| সাল | ঘটনার ধরন | দেশ / অঞ্চল | ঐতিহাসিক তাৎপর্য |
| ১৬০৮ | ঐতিহাসিক ঘটনা | কুইবেক, কানাডা | স্যামুয়েল ডি চ্যামপ্লেইন কর্তৃক কুইবেক প্রতিষ্ঠিত; উত্তর আমেরিকায় ফরাসি সভ্যতার সূচনা। |
| ১৭৫৭ | ঐতিহাসিক ঘটনা | বাংলা, ভারত | নবাব সিরাজউদ্দৌলা বন্দি; ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূত্রপাত। |
| ১৭৭৫ | ঐতিহাসিক ঘটনা | যুক্তরাষ্ট্র | জর্জ ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে কন্টিনেন্টাল আর্মির সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। |
| ১৮৬৩ | সামরিক ইতিহাস | যুক্তরাষ্ট্র | গেটিসবার্গের যুদ্ধে পিকেটের চার্জ ব্যর্থ; আমেরিকান গৃহযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। |
| ১৮৬৬ | সামরিক ইতিহাস | প্রুশিয়া / অস্ট্রিয়া | কনিগ্রাটজ-এর যুদ্ধ; মধ্য ইউরোপে প্রুশিয়ার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। |
| ১৮৮৩ | বিখ্যাত জন্ম | প্রাগ, চেকিয়া | ফ্রাঞ্জ কাফকার জন্ম; ‘দ্য মেটামরফোসিস’ খ্যাত কিংবদন্তি লেখক। |
| ১৮৯৭ | বিখ্যাত জন্ম | ভারত / জাতিসংঘ | হংস জীবরাজ মেহতার জন্ম; যিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে লিঙ্গবৈষম্যহীন ভাষার প্রচলন করেন। |
| ১৯০৮ | নাগরিক প্রতিরোধ | ভারত | রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বাল গঙ্গাধর তিলক গ্রেপ্তার; বোম্বেতে গণ-ধর্মঘট শুরু। |
| ১৯০৮ | বিখ্যাত জন্ম | যুক্তরাষ্ট্র | থারগুড মার্শালের জন্ম; নাগরিক অধিকার নেতা এবং প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি। |
| ১৯৩৮ | প্রযুক্তি | যুক্তরাজ্য | ‘ম্যালার্ড’ স্টিম লোকোমোটিভ ১২৬ মাইল/ঘণ্টা বেগে বিশ্বরেকর্ড গড়ে, যা আজও অক্ষুণ্ণ। |
| ১৯৪৪ | দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ | বেলারুশ / সোভিয়েত | নাৎসি দখল থেকে মিনস্ক মুক্ত; বেলারুশের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়। |
| ১৯৬২ | উপনিবেশ মুক্তি | আলজেরিয়া / ফ্রান্স | ১৩২ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের পর আলজেরিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। |
| ১৯৬২ | বিখ্যাত জন্ম | যুক্তরাষ্ট্র | টম ক্রুজের জন্ম; বিশ্বখ্যাত হলিউড অভিনেতা ও প্রযোজক। |
| ১৯৭১ | বিখ্যাত মৃত্যু | প্যারিস, ফ্রান্স | ২৭ বছর বয়সে জিম মরিসনের মৃত্যু; ‘দ্য ডোরস’ ব্যান্ডের কিংবদন্তি গায়ক ও কবি। |
| ১৯৭৬ | সামরিক কৌশল | ইসরায়েল / উগান্ডা | ইসরায়েলি এলিট কমান্ডোদের সফল উদ্ধার অভিযান ‘অপারেশন এন্টেবে’। |
| ১৯৮৫ | কর্পোরেট ইতিহাস | বিশ্ব / যুক্তরাষ্ট্র | ভোক্তাদের ক্ষোভের মুখে কোকা-কোলা তাদের পুরোনো ফর্মুলা ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়। |
| ১৯৮৯ | বিখ্যাত মৃত্যু | সোভিয়েত ইউনিয়ন | আন্দ্রেই গ্রোমিকোর মৃত্যু; স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘস্থায়ী সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী। |
| ১৯৯৮ | বিখ্যাত মৃত্যু | কলকাতা, ভারত | সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু; বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চরিত্রাভিনেতা। |
| ২০০৮ | প্রযুক্তি | অ্যাপল ইনক. | ৫০০টি অ্যাপ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আইওএস (iOS) অ্যাপ স্টোর চালু, যা মোবাইল সফটওয়্যারের জগৎ বদলে দেয়। |
বাঙালি ও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ৩ জুলাই তারিখটি ঔপনিবেশিক শোষণের বেদনা, প্রতিরোধের তীব্র স্পৃহা এবং মানবাধিকারের অগ্রগতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত।
ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ
১৯০৮: রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বাল গঙ্গাধর তিলক গ্রেপ্তার
উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের চরম পর্যায়ে ১৯০৮ সালের ৩ জুলাই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বোম্বে থেকে জাতীয়তাবাদী নেতা বাল গঙ্গাধর তিলককে গ্রেপ্তার করে। ‘লোকমান্য’ তিলক তার মারাঠি পত্রিকা কেশরী-তে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীর পক্ষে জ্বালাময়ী প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তিলক যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ব্রিটিশ সরকারের স্বরাজ (স্বশাসন) দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই এই বিপ্লবী সহিংসতার জন্ম। ভারতীয় দণ্ডবিধির কুখ্যাত ১২৪এ ধারায় তাকে গ্রেপ্তার করে মিয়ানমারের মান্দালয় কারাগারে ছয় বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানো হয়। এই গ্রেপ্তারের ফলে বোম্বে জুড়ে শ্রমিকদের ব্যাপক ধর্মঘট শুরু হয়, যা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অংশগ্রহণের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
এই অঞ্চলের বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু
-
হংস জীবরাজ মেহতা (জন্ম — ১৮৯৭): ১৮৯৭ সালের এই দিনে সুরাটের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নেন হংস মেহতা। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মহাত্মা গান্ধীর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে তিনি ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের আন্দোলন সংগঠিত করেন। তবে তার সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক অবদান হলো মানবাধিকারের ক্ষেত্রে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি লক্ষ্য করেন যে, মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের খসড়ায় লেখা আছে: “All men are born free and equal” (সকল পুরুষ স্বাধীন ও সমান হয়ে জন্মায়)। তিনি তীব্র প্রতিবাদ করে জানান যে, এই বাক্যটি বিশ্বব্যাপী নারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার হতে পারে। তার জোরালো যুক্তির ফলেই বাক্যটি পরিবর্তন করে লেখা হয়: “All human beings are born free and equal” (সকল মানুষ স্বাধীন ও সমান হয়ে জন্মায়)।
-
সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় (মৃত্যু — ১৯৯৮): ১৯৯৮ সালের ৩ জুলাই বাংলা চলচ্চিত্র হারায় তার অন্যতম বহুমুখী চরিত্রাভিনেতা সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কলকাতা মঞ্চ এবং ধ্রুপদী বাংলা চলচ্চিত্রের এই প্রবীণ অভিনেতা উত্তম কুমার এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তিদের সাথে কাজ করেছেন। মৌচাক, চারমূর্তি এবং ওগো বধূ সুন্দরী-এর মতো চলচ্চিত্রে তার সূক্ষ্ম কমিক টাইমিং এবং আবেগপূর্ণ অভিনয় তাকে অমর করে রেখেছে।
-
কানন দেবী (জন্মগত বিতর্ক): বাংলার প্রথম সত্যিকারের সুপারস্টার কানন দেবীর জন্মতারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও, প্রায়শই ৩ জুলাই দিনটিকে তার জন্মদিন হিসেবে আঞ্চলিকভাবে উদযাপন করা হয়। চরম দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে যে অসামান্য অবদান রাখেন, তার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মানজনক ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।
আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক উদযাপন
ভারতীয় খ্রিষ্টান দিবস (যীশু ভক্তি দিবস): এই দিনটি প্রাচীন সেন্ট থমাসের পরবের সাথে মিলে যায়। ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস অনুসারে, ৫২ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট থমাস সমুদ্রপথে কেরালার উপকূলে পৌঁছান এবং ভারতে খ্রিষ্টধর্মের সূচনা করেন। বর্তমানে দিনটি ভারতের সাহিত্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতীয় খ্রিষ্টানদের গভীর ঐতিহাসিক অবদানকে সম্মান জানাতে পালিত হয়।
বিশ্ব ইতিহাস: গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

উপমহাদেশের বাইরেও ৩ জুলাই দিনটি বিশাল সামরিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী।
যুক্তরাষ্ট্র
-
-
১৭৭৫ — জর্জ ওয়াশিংটনের দায়িত্ব গ্রহণ: ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজে একটি এলম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে কন্টিনেন্টাল আর্মির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি অসংগঠিত স্থানীয় মিলিশিয়াদের একটি সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনীতে পরিণত করার অসম্ভব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
-
১৮৬৩ — গেটিসবার্গের চূড়ান্ত পরিণতি (পিকেটস চার্জ): গেটিসবার্গের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের তৃতীয় দিন বিকেলে কনফেডারেট জেনারেল রবার্ট ই. লি ইউনিয়ন লাইনের মাঝখানে পদাতিক হামলার নির্দেশ দেন, যা ইতিহাসে ‘পিকেটস চার্জ’ নামে পরিচিত। এই হামলা কনফেডারেটদের জন্য এক চূড়ান্ত বিপর্যয় ডেকে আনে এবং ৫০% এরও বেশি সৈন্য হতাহত হয়। এটি ছিল আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত।
-
রাশিয়া ও সোভিয়েত অঞ্চল
-
১৯৪৪ — জার্মান আর্মি গ্রুপ সেন্টারের পতন: ‘অপারেশন ব্যাগ্রেশন‘-এর অংশ হিসেবে সোভিয়েত রেড আর্মি ৩ জুলাই মিনস্ক শহরটি পুনরুদ্ধার করে। এর ফলে জার্মান ৪র্থ ও ৯ম আর্মির প্রায় ১ লাখেরও বেশি সৈন্য শহরের পূর্বে আটকা পড়ে। এই বিজয় সোভিয়েত বাহিনীকে পোল্যান্ড সীমান্তের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা ছিল নাৎসি জার্মানির জন্য যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক পরাজয়।
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ
-
১৯৩৮ — ম্যালার্ডের গতির রেকর্ড: লন্ডনের গ্রান্থামের কাছে স্টোক ব্যাংকের ঢালু ট্র্যাকে ‘ম্যালার্ড’ (No. 4468 Mallard) নামের স্টিম লোকোমোটিভ ১২৬ মাইল/ঘণ্টা (২০২.৮ কিমি/ঘণ্টা) গতি অর্জন করে। বাষ্পচালিত ট্রেনের ক্ষেত্রে এই বিশ্বরেকর্ড আজও কেউ ভাঙতে পারেনি।
-
১৮৬৬ — কনিগ্রাটজ-এর যুদ্ধ: বোহেমিয়ার এই বিশাল যুদ্ধে প্রুশিয়ান সেনাবাহিনী তাদের উন্নত রাইফেল এবং রেলওয়ে লজিস্টিক ব্যবহার করে অস্ট্রিয়ান বাহিনীকে চূর্ণ করে দেয়। এই জয় জার্মান রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রুশিয়ার আধিপত্য শক্ত করে এবং ১৮৭১ সালে অটো ফন বিসমার্কের জার্মান সাম্রাজ্য গঠনের পথ পরিষ্কার করে।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত
-
১৯৬২ — আলজেরিয়ার স্বাধীনতা: ১৩২ বছরের ফরাসি উপনিবেশ এবং আট বছরের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৯৯.৭% মানুষের ভোটের ভিত্তিতে ফ্রান্স ৩ জুলাই আলজেরিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ঘোষণা করে।
-
১৯৭৬ — অপারেশন এন্টেবে: ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এলিট কমান্ডোরা উগান্ডার এন্টেবে বিমানবন্দরে এক দুঃসাহসিক জিম্মি উদ্ধার অভিযান চালায়। ফিলিস্তিনি ও জার্মান জঙ্গিরা এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমান ছিনতাই করে ২৪০ জনেরও বেশি যাত্রীকে স্বৈরশাসক ইদি আমিনের আশ্রয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কমান্ডোরা সফলভাবে ১০২ জন জিম্মিকে উদ্ধার করে, যা বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ দমনের কৌশল চিরতরে বদলে দেয়।
বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু (আন্তর্জাতিক)
বিখ্যাত জন্ম:
-
ফ্রাঞ্জ কাফকা (১৮৮৩ — ১৯২৪): প্রাগের এক জার্মানভাষী ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করা কাফকা আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক। দ্য ট্রায়াল, দ্য মেটামরফোসিস-এর মতো উপন্যাসে তিনি আমলাতন্ত্রের ভয়াবহতা, মানুষের বিচ্ছিন্নতা এবং অস্তিত্বের সংকট নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার সৃষ্ট অদ্ভুত ও জটিল পরিস্থিতি বোঝাতে আজ বিশ্বজুড়ে “Kafkaesque” (কাফকায়েস্ক) শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
-
থারগুড মার্শাল (১৯০৮ — ১৯৯৩): ম্যারিল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী মার্শাল ছিলেন একজন সাহসী নাগরিক অধিকার আইনজীবী। ১৯৫৪ সালে সুপ্রিম কোর্টে ব্রাউন বনাম বোর্ড অব এডুকেশন মামলায় জয়লাভ করে তিনি স্কুলে জাতিগত বিভাজনকে অসাংবিধানিক প্রমাণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।
-
টম ক্রুজ (১৯৬২ — বর্তমান): নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল বক্স-অফিস তারকা। মিশন: ইম্পসিবল ফ্র্যাঞ্চাইজিতে ডামি ছাড়া নিজের ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট নিজে করার জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত।
বিখ্যাত মৃত্যু:
-
জিম মরিসন (১৯৪৩ — ১৯৭১): রক ব্যান্ড ‘দ্য ডোরস’-এর আইকনিক গায়ক মাত্র ২৭ বছর বয়সে প্যারিসের একটি বাথটবে রহস্যজনকভাবে মারা যান। তার মৃত্যু তাকে জিমি হেন্ডরিক্স ও জেনিস জপলিনদের সাথে ট্র্যাজিক “২৭ ক্লাব”-এর সদস্য করে তোলে।
-
আন্দ্রেই গ্রোমিকো (১৯০৯ — ১৯৮৯): স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব এবং ২৮ বছর ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা গ্রোমিকো ১৯৮৯ সালের এই দিনে মারা যান। জাতিসংঘে সোভিয়েত ভেটো প্রয়োগের জন্য পশ্চিমা কূটনীতিকরা তাকে “Mr. No” বলে ডাকতেন।
অজানা ও চমকপ্রদ তথ্য
-
দ্য ডে নিউ কোক ডায়েড: ১৯৮৫ সালের ৩ জুলাই কোকা-কোলা কর্পোরেট ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ভোক্তা ক্ষোভের কাছে মাথানত করে। তাদের নতুন স্বাদ “নিউ কোক” বাজারে আনার পর প্রতিদিন ১৫০০-এর বেশি অভিযোগ আসতে থাকে। বাধ্য হয়ে এই দিন বিকেলে কোম্পানিটি তাদের পুরোনো ফর্মুলাকে “Coca-Cola Classic” হিসেবে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেয়।
-
ডেভিড বোয়ির নিজের সৃষ্টিকে হত্যা: ১৯৭৩ সালের ৩ জুলাই লন্ডনের হ্যামারস্মিথ ওডিওন থিয়েটারে ডেভিড বোয়ি ঘোষণা দেন, “এটি শুধু আমাদের সফরের শেষ শো নয়, এটি আমাদের জীবনের শেষ শো।” ভক্তরা অবাক হলেও তিনি মূলত গান ছাড়ছিলেন না, বরং তার বিখ্যাত অল্টার-ইগো ‘জিগি স্টারডাস্ট’ চরিত্রটিকে চিরতরে মেরে ফেলছিলেন!
-
মোবাইল বিপ্লবের শুরু: ২০০৮ সালের ৩ জুলাই অ্যাপল নীরবে তাদের আইফোন ৩জি-এর জন্য ‘অ্যাপ স্টোর’ (App Store) চালু করে। মাত্র ৫০০টি অ্যাপ নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্ল্যাটফর্মটি তিন দিনের মধ্যে ১ কোটি ডাউনলোডের মাইলফলক ছোঁয় এবং আধুনিক স্মার্টফোন অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করে।
সময়ের সুতোয় গাঁথা একটি দিন
৩ জুলাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কীভাবে একই সমান্তরালে হাঁটে। একই ক্যালেন্ডার তারিখে বাংলার এক স্বাধীন নবাবের পতন যেমন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঔপনিবেশিক শোষণের বীজ বপন করেছিল, তেমনি ঠিক কয়েক শতাব্দী পর গেটিসবার্গের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আমেরিকার বিভক্ত ভবিষ্যৎকে নতুন রূপ দিয়েছিল। ফ্রাঞ্জ কাফকার কলম থেকে শুরু করে হংস মেহতার মানবাধিকারের সাহসী ভাষা—এই দিনে জন্মানো মানুষেরা আমাদের চিন্তাধারা ও সহাবস্থানের পথ বদলে দিয়েছেন। ইতিহাস কোনো দূরবর্তী মৃত দলিল নয়; এটি একটি জীবন্ত নকশা।

