ফিফা বিশ্বকাপের বিতর্কিত অধ্যায়: রাজনীতি, অর্থ ও ফুটবলের অন্ধকার দিক

সর্বাধিক আলোচিত

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল, আর এর সর্বোচ্চ আসর হলো ফিফা বিশ্বকাপ। প্রতি চার বছর অন্তর এই প্রতিযোগিতা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে আনন্দে ভাসায়। কিন্তু এই সুন্দর খেলার  আড়ালে রয়েছে এক নিরেট অন্ধকার জগৎ, যা প্রায়শই ঢাকা পড়ে যায় মাঠের উন্মাদনায়।

শুধু মাঠের ৯০ মিনিটের হিসাব নয়; বরং পর্দার আড়ালের রাজনীতি, বিপুল অর্থের হাতছানি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার কীভাবে বারবার এই মেগা ইভেন্টকে কলুষিত করেছে, তা তুলে ধরতেই এই লেখা। আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে ফিফা বিশ্বকাপ বিতর্ক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি কাঠামোগত ব্যাধি।

এই প্রতিবেদনে আপনাদের সামনে বস্তুনিষ্ঠভাবে ফিফা বিশ্বকাপের পেছনের বিতর্কিত ইতিহাস তুলে ধরব। মার্কিন বিচার বিভাগের (DOJ) রোমহর্ষক তদন্ত থেকে শুরু করে রেফারিংয়ের ত্রুটি, স্পনসরশিপের দ্বন্দ্ব, বল ও প্রযুক্তি বিতর্ক এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ—সবকিছুই প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হবে। কারণ আমি বিশ্বাস করি, ফুটবলের এই অন্ধকার অধ্যায়গুলো জানা থাকলে তবেই আমরা খেলাটির সামগ্রিক চিত্র পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারব।

আয়োজক দেশ নির্বাচনে দুর্নীতি: ক্ষমতার নেপথ্যে

বিশ্বকাপের মতো একটি মেগা ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ পাওয়া যেকোনো দেশের জন্যই আর্থসামাজিকভাবে লাভজনক। কিন্তু এই আয়োজক হওয়ার দৌড়ে যে পরিমাণ অস্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক লবিং কাজ করে, তা অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের কাছে সব সময়ই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

ফিফাগেট কেলেঙ্কারি ও ২০১৫ সালের ডিওজে (DOJ) তদন্ত

২০১৫ সালের মে মাসের সেই সকালটার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। জুরিখের বিলাসবহুল ‘বাউর আউ লাক’ হোটেল থেকে সুইস পুলিশ যখন চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে ফিফার শীর্ষ কর্তাদের বের করে আনছিল, পুরো ক্রীড়া বিশ্ব তখন স্তব্ধ। মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) এবং সুইস কর্তৃপক্ষের সেই যৌথ অভিযান মূলত ফিফার দুর্নীতির সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।

  • প্রমাণিত সত্য: মার্কিন বিচার বিভাগের (DOJ) আনুষ্ঠানিক তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, গত ২৪ বছর ধরে ব্রডকাস্টিং রাইটস, স্পনসরশিপ এবং টুর্নামেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব প্রদানে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের ঘুষ লেনদেন হয়েছে। ফিফার সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য চাক ব্লেজারের স্বীকারোক্তি এবং তার রেকর্ড করা গোপন টেপ এই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই ঘটনায় ফিফার তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্লাটার এবং উয়েফা সভাপতি মিশেল প্লাতিনিকে ফুটবল সংক্রান্ত সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করে ফিফার এথিক্স কমিটি।
  • অভিযোগ (অপ্রমাণিত): অনেকেই মনে করেন, এই দুর্নীতির শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত ছিল। ফিফার কার্যনির্বাহী কমিটির প্রায় প্রতিটি সদস্যই কোনো না কোনোভাবে স্পনসর বা ব্রডকাস্টারদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যদিও সবার বিরুদ্ধে আইনি প্রমাণ জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।

কাতার ২০২২ এবং রাশিয়া ২০১৮ বিডিং বিতর্ক

২০১০ সালে যখন ফিফা একই সাথে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে যথাক্রমে রাশিয়া ও কাতারের নাম ঘোষণা করে, তখন ফুটবল মহলে তীব্র বিস্ময় তৈরি হয়েছিল।

  • অভিযোগ (অপ্রমাণিত): দ্য সানডে টাইমস-এর মতো পশ্চিমা মিডিয়া এবং বিভিন্ন তদন্তকারী সাংবাদিকদের অভিযোগ ছিল, ভোট কেনার মাধ্যমেই এই দুই দেশ আয়োজক হওয়ার স্বত্ব লাভ করেছে। মাইকেল গার্সিয়ার নেতৃত্বে ফিফার নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদন (Garcia Report) বিডিং প্রক্রিয়ার অনেক ত্রুটি এবং অস্বচ্ছতা তুলে ধরলেও, সরাসরি কাতার বা রাশিয়ার আয়োজক স্বত্ব বাতিলের মতো কোনো অকাট্য আইনি প্রমাণ সেখানে ছিল না।
  • জনশ্রুতি: ভক্তদের মধ্যে একটি ধারণা গভীরভাবে গেঁথে আছে যে, কেবল তেল ও গ্যাসের বিপুল অর্থের কারণেই ফুটবলের ঐতিহ্যহীন এবং গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম থাকা সত্ত্বেও একটি দেশে বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়েছিল।

Top 5 FIFA World Cup Controversies

রেফারিং ও অন-ফিল্ড পক্ষপাত: মাঠের বিতর্ক

মাঠের খেলাতেও রেফারি বিতর্ক নতুন কিছু নয়। প্রযুক্তির অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে মানবিক ভুলের কারণে বিশ্বকাপ ফুটবলে এমন কিছু বিতর্কিত মুহূর্ত তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে আজও চায়ের কাপে ঝড় ওঠে।

১৯৬৬ সালের জিওফ হার্স্টের গোল ও ১৯৮৬ সালের ‘হ্যান্ড অফ গড’

বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় বিতর্কটি হয় ১৯৬৬ সালে। ইংল্যান্ড বনাম পশ্চিম জার্মানির ফাইনালে জিওফ হার্স্টের একটি শট ক্রসবারে লেগে গোললাইনে আছড়ে পড়ে।

  • প্রমাণিত সত্য: তৎকালীন সুইস রেফারি গটফ্রিড ডিয়েনস্ট এবং সোভিয়েত লাইন্সম্যান তোফিক বাখরামভ এটিকে গোল হিসেবে ঘোষণা করেন, যা ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ জিততে সাহায্য করে। পরবর্তীতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিশ্লেষণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে বলটি পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম করেনি।
  • প্রমাণিত সত্য: ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাত দিয়ে গোল করেছিলেন, যা পরে “হ্যান্ড অফ গড” নামে পরিচিতি পায়। রেফারি আলি বিন নাসের সেটি দেখতে পাননি এবং গোলটি বৈধ বলে রায় দেন। ম্যারাডোনা পরবর্তীতে নিজেই সংবাদমাধ্যমে তার হাত ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছিলেন।

ম্যারাডোনাকে ঘিরে ফাউলের রেকর্ড: ১৯৮২ বনাম ১৯৮৬ বিশ্বকাপ

রেফারিং এবং অন-ফিল্ড ফাউলের প্রসঙ্গে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত নাম দিয়েগো ম্যারাডোনা। তাকে আটকানোর জন্য প্রতিপক্ষের নেওয়া কৌশলগুলো তৎকালীন রেফারিং মানদণ্ডের একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরে।

  • প্রমাণিত সত্য: ১৯৮২ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে ইতালি ২-১ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে। এই ম্যাচে ইতালিয়ান ডিফেন্ডার ক্লদিও জেন্তিলে একাই ম্যারাডোনার বিরুদ্ধে ২৩টি ফাউল করেন। এটি শুধু ম্যারাডোনা ফাউল রেকর্ড নয়, বরং বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক ম্যাচে একজন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে অন্য একজন খেলোয়াড়ের করা সর্বোচ্চ ফাউলের রেকর্ড।
  • বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: জেন্তিলের ট্যাকলিং পদ্ধতি নিয়ে আজও ফুটবল মহলে বিতর্ক রয়েছে। অনেকে এটিকে কঠোর কিন্তু বৈধ ম্যান-মার্কিং হিসেবে দেখেন। আবার অনেকে মনে করেন, সেই যুগে রেফারিরা আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়দের বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক কম সুরক্ষা দিতেন, যার ফলে এই ধরনের চরম কৌশল বিনা শাস্তিতে চলতে পেরেছিল।
  • বিশ্লেষণ: এই রেকর্ডগুলোকে কোনো নিয়মভঙ্গ বা ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ১৯৮২ বিশ্বকাপ ইতালি আর্জেন্টিনা ম্যাচটি তৎকালীন রেফারিং মানদণ্ড এবং তারকা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে শারীরিক মার্কিং কৌশলের একটি প্রামাণ্য চিত্র মাত্র। এটি কোনো ‘ফাউল ষড়যন্ত্র’ নয়, বরং যুগের খেলার ধরনের একটি তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ।

১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনাল: প্রথম লাল কার্ড ও বিতর্কিত পেনাল্টি

৮ জুলাই ১৯৯০, রোমের স্তাদিও অলিম্পিকোতে অনুষ্ঠিত পশ্চিম জার্মানি ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনালটি ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম পুনরাবৃত্ত ফাইনাল (আগের ফাইনালেও এই দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল, যেখানে আর্জেন্টিনা জিতেছিল)। তবে এই ম্যাচটি তার সুন্দর ফুটবলের চেয়ে বরং ১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনাল বিতর্ক-এর জন্যই বেশি স্মরণীয়। এটি ছিল একটি অত্যন্ত রক্ষণাত্মক ও কম উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনাল, যেখানে আর্জেন্টিনা প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে কোনো গোল করতে ব্যর্থ হওয়ার রেকর্ড গড়ে।

  • প্রমাণিত সত্য: ম্যাচের ৬৫ মিনিটে মেক্সিকান রেফারি এদগার্দো কোদেসাল আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় পেদ্রো মনসন লাল কার্ড (সরাসরি) দেখান ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানের বিরুদ্ধে একটি বিপজ্জনক ট্যাকলের জন্য। এটি ছিল বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রদর্শিত প্রথম লাল কার্ড।
  • প্রমাণিত সত্য: ম্যাচের ৮৫ মিনিটে রবার্তো সেনসিনি জার্মান স্ট্রাইকার রুডি ফোলারকে ফাউল করলে রেফারি কোদেসাল পশ্চিম জার্মানিকে পেনাল্টি উপহার দেন। আন্দ্রেয়াস ব্রেহমে এই আর্জেন্টিনা জার্মানি ১৯৯০ পেনাল্টি থেকে ম্যাচের একমাত্র ও জয়সূচক গোলটি করেন।
  • প্রমাণিত সত্য: এর ঠিক দুই মিনিট পর গুস্তাভো দেসোত্তিও (ইয়ুর্গেন কোলারকে জাপটে ধরার জন্য) দ্বিতীয় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন, ফলে আর্জেন্টিনা ৯ জনের দলে পরিণত হয়।
  • বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: বহু বিশ্লেষক ও পরবর্তী রিপ্লে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেনসিনির ফাউলটি পেনাল্টি বক্সের বাইরে ঘটেছিল বলে মনে হয় এবং অনেকের মতে এটি আদৌ কোনো স্পষ্ট ফাউল ছিল না। অন্যদিকে, একই ম্যাচে জার্মান খেলোয়াড় ক্লাউস আউগেন্টালারকে আর্জেন্টিনার ডি-বক্সে ফাউল করার ঘটনায় রেফারি কোনো পেনাল্টি দেননি, যা জার্মান ধারাভাষ্যকারদের মতে পেনাল্টির আরও শক্তিশালী দাবি ছিল।
  • অপ্রমাণিত অভিযোগ: ২০১৪ সালে মেক্সিকান রেফারি কমিশনের সাবেক প্রধান হুম্বের্তো রোহানো প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, রেফারি কোদেসালের শ্বশুর হাভিয়ের আরিয়াগা ১৯৯০ সালে ফিফা’র রেফারি কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। রোহানোর দাবি অনুযায়ী, “কর্তৃপক্ষ” নাকি তখন ইঙ্গিত দিয়েছিল যে “আর্জেন্টিনার জেতার দরকার নেই”। তবে, এই দাবিটি কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ায় কখনো প্রমাণিত হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণরূপে একটি অপ্রমাণিত অভিযোগ।
  • রেফারির প্রতিক্রিয়া: রেফারি কোদেসাল সব সময় এই অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে তার কোনো গোপন উদ্দেশ্য ছিল না এবং তিনি বরং চেয়েছিলেন আর্জেন্টিনাই জিতুক।

২০০২ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ এবং ভিএআর (VAR) যুগের বিতর্ক

আমার মতে, আধুনিক যুগে রেফারিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে ২০০২ সালের বিশ্বকাপে। দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচগুলোতে ইকুয়েডরের রেফারি বায়রন মোরেনো (যিনি পরে মাদক চোরাচালানের দায়ে গ্রেপ্তার হন) এবং মিশরের গামাল আল-ঘান্দুরের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বকে হতবাক করেছিল।

  • জনশ্রুতি: ইতালিয়ান ও স্প্যানিশ সমর্থকদের মধ্যে আজও তীব্র ক্ষোভ রয়েছে যে, স্বাগতিক দেশকে সেমিফাইনালে তুলে নেওয়ার জন্য রেফারিরা ইচ্ছাকৃত এবং পরিকল্পিত পক্ষপাতিত্ব করেছিলেন।
  • প্রমাণিত সত্য: ফিফা পরবর্তীতে এই ম্যাচগুলোর রেফারিংয়ে গুরুতর ভুলের কথা স্বীকার করে। তবে কোনো ফিক্সিং বা আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ তারা পায়নি বলে আনুষ্ঠানিক রায় দেয়।

সম্প্রতি ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) প্রযুক্তি চালু হওয়ার পরও ভিএআর বিতর্ক থামেনি। অফসাইডের চুলচেরা বিশ্লেষণ (Millimeter offsides) বা হ্যান্ডবলের প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল নিয়মের কারণে মাঠের রেফারিদের সিদ্ধান্ত বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ম্যাচ ফিক্সিং ও বেটিং কেলেঙ্কারি: ফুটবলের কলঙ্ক

বিশ্বকাপের মূল পর্বে সরাসরি ম্যাচ ফিক্সিং প্রমাণিত হওয়া বেশ বিরল। ফিফার কড়া নজরদারির কারণে মূল মঞ্চে এমন ঘটনা ঘটানো কঠিন। তবে বাছাইপর্ব এবং এর পারিপার্শ্বিক প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে কিছু কুখ্যাত ঘটনা ঘটেছে।

মূল বিতর্কগুলোর তালিকা (প্রমাণিত ঘটনা):

  1. ২০১০ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচ: ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের ঠিক আগে স্বাগতিক দেশের কয়েকটি প্রস্তুতি ম্যাচে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ফিফার নিজস্ব তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, সিঙ্গাপুরের কুখ্যাত ফিক্সার উইলসন রাজ পেরুমল রেফারিদের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই ম্যাচগুলোর ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।
  2. ঘানার রেফারি কেলেঙ্কারি: ২০১৮ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের সময় ঘানার রেফারি জোসেফ ল্যাম্পটে দক্ষিণ আফ্রিকা ও সেনেগালের মধ্যকার একটি ম্যাচে সম্পূর্ণ কাল্পনিক একটি পেনাল্টি দেন। ফিফা পরবর্তীতে তাকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে এবং স্পোর্টস কোর্ট (CAS) সেই শাস্তি বহাল রাখে। ম্যাচটি পুনরায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
  • প্রমাণিত সত্য: এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, বিশ্বকাপ সরাসরি কলুষিত না হলেও, এর আশেপাশের ইকোসিস্টেমে বেটিং সিন্ডিকেটের কালো থাবা রয়েছে।

স্পনসরশিপ ও বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব: অর্থের খেলা

আধুনিক ফুটবল মূলত বিলিয়ন ডলারের কর্পোরেট ব্যবসা। এর ফলে ফুটবল স্পনসরশিপ কেলেঙ্কারি এবং কর্পোরেট দ্বন্দ্ব বিশ্বকাপের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বড় ব্র্যান্ডগুলো কীভাবে ফিফাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা একজন ক্রীড়া সাংবাদিকের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।

অ্যাডিডাস-নাইকি দ্বন্দ্ব ও অ্যামবুশ মার্কেটিং

বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্পনসর হওয়ার জন্য বিলিয়ন ডলার খরচ করে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু যারা স্পনসর নয়, তারাও নানা কৌশলে বিজ্ঞাপনী ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে, যাকে মার্কেটিংয়ের ভাষায় ‘অ্যামবুশ মার্কেটিং‘ (Ambush Marketing) বলা হয়।

  • প্রমাণিত সত্য: ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের একটি ম্যাচে ডাচ বিয়ার কোম্পানি ‘বাভারিয়া’ (Bavaria) তাদের কমলা রঙের পোশাক পরিয়ে প্রায় ৩৬ জন নারী মডেলকে গ্যালারিতে পাঠায়। অথচ ওই বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্পনসর ছিল বাডউইজার (Budweiser)। ফিফা তৎক্ষণাৎ ওই নারীদের স্টেডিয়াম থেকে বের করে দেয় এবং পুলিশি হেফাজতে নেয়, যা বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় তোলে।

কাতারে শ্রমিক অধিকার এবং স্পনসরদের ভূমিকা

কাতার বিশ্বকাপ বিতর্ক কেবল স্টেডিয়ামের ভেতরের ঘটনা ছিল না। স্টেডিয়াম নির্মাণের সময় হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সারা বিশ্বে তোলপাড় ফেলে।

  • প্রমাণিত সত্য: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও গার্ডিয়ানের মতো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কাতারের ‘কাফালা’ সিস্টেম এবং শ্রমিকদের মানবেতর অবস্থার অকাট্য প্রমাণ উঠে আসে।
  • অভিযোগ (অপ্রমাণিত): মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, কোকাকোলা, ম্যাকডোনাল্ডস বা অ্যাডিডাসের মতো বড় স্পনসররা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে ফিফা বা কাতার সরকারের ওপর পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে বা ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব থেকেছে।

আডিডাস বল বিতর্ক ও খেলোয়াড়দের প্রযুক্তিগত সুবিধা নিয়ে বিতর্ক

Adidas ball controversy

বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্পনসর হিসেবে আডিডাস (Adidas) দীর্ঘকাল ধরে ম্যাচ বল সরবরাহ করে আসছে। তবে বলের ডিজাইন এবং এর সাথে যুক্ত আধুনিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন প্রায়ই নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এর সাথে অনেক সময় ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্বও যুক্ত হয়েছে, যা আমি একজন ফ্যাক্ট-চেকার হিসেবে এখানে বিশ্লেষণ করতে চাই।

বিশ্বকাপের বলের ইতিহাস ও অভিযোগ

বিশ্বকাপের প্রতিটি নতুন বল উন্মোচনের পর খেলোয়াড়, বিশেষ করে গোলরক্ষকদের কাছ থেকে প্রবল মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।

  • প্রমাণিত সত্য: ২০১০ সালের জাবুলানি বিতর্ক ছিল সবচেয়ে আলোচিত। এই বলের মুভমেন্ট বা গতিপথ বাতাসে অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ছিল। ইকের ক্যাসিয়াস ও জুলিও সিজারের মতো শীর্ষ গোলরক্ষকরা প্রকাশ্যে একে “বিচ বল” বা সুপারমার্কেটের সস্তা বল বলে সমালোচনা করেন। এটি কোনো দুর্নীতির অংশ ছিল না। নাসা (NASA) এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারোডাইনামিক গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, বলটিতে সিম (seams) কম থাকায় এটি বাতাসে নির্দিষ্ট গতিতে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ত।
  • প্রমাণিত সত্য: ২০২২ সালের আল রিহলা বল এবং এর সেমি-ফাইনাল/ফাইনাল সংস্করণ ‘আল হিল্ম’-এর ভেতরে প্রথমবারের মতো একটি মোশন সেন্সর (IMU) ব্যবহার করা হয়। এটি মূলতঃ অফসাইড প্রযুক্তি ও ভিএআর (VAR) সিদ্ধান্তকে আরও নিখুঁত করার জন্য ব্রডকাস্ট টেকনোলজির অংশ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছিল। তবে এই সেন্সরের ডেটা নিয়ে সাময়িক বিতর্ক তৈরি হলেও তা ফিফা এবং আইএফএবি (IFAB) দ্বারা স্বীকৃত প্রযুক্তির বৈধ প্রয়োগ ছিল।

নির্দিষ্ট খেলোয়াড়দের জন্য প্রযুক্তিগত সুবিধার অভিযোগ (জনশ্রুতি বনাম বাস্তবতা)

খেলোয়াড়দের বুট ও বলের সম্পর্ক নিয়ে প্রায়ই এমন কিছু দাবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে, যা সাধারণ ফুটবল ভক্তদের বিভ্রান্ত করে।

  • জনশ্রুতি/ষড়যন্ত্র তত্ত্ব (কোনো প্রমাণ নেই): সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই মেসি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নামে একটি দাবি ভাইরাল হয় যে, আডিডাস তাদের স্পনসর করা হাই-প্রোফাইল খেলোয়াড়দের (যেমন লিওনেল মেসি) বাড়তি সুবিধা দেওয়ার জন্য বিশেষ প্রযুক্তির বল বা নির্দিষ্ট ফুটবল বুট প্রযুক্তি সরবরাহ করে। দাবি করা হয়, এই প্রযুক্তিগুলো ম্যাচের গতিপথ বা রেফারিং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
  • প্রমাণিত সত্য: আমি স্পষ্টভাবে জানাতে চাই, এই ধরনের অভিযোগের কোনো আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক বা ফিফা এথিক্স কমিটির তদন্ত বা রায় নেই। কোনো খেলোয়াড়কে এ ধরনের বেআইনি ‘ম্যাচ-ফিক্সিং সুবিধা’ বা গোপন প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়নি।
  • বিশ্লেষণ: এই তত্ত্বগুলো ছড়ানোর মূল কারণ হলো আডিডাস বনাম নাইকি/পুমার মতো ব্র্যান্ডগুলোর চরম ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ক্লিকবেট’ বা ভাইরাল সংস্কৃতি। সুপারস্টার খেলোয়াড়দের পক্ষে রেফারিদের অবচেতন সাধারণ পক্ষপাতিত্বের (Human bias) একটি ধারণা মানুষের মনে আগে থেকেই কাজ করে, ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো সেই মনস্তত্ত্বকেই কাজে লাগায়। বাস্তবে, বুট ডিজাইনে স্পনসরড খেলোয়াড়দের মতামত নেওয়া (Player input) একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক, আইনি এবং প্রকাশ্য বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া।

FIFA World Cup Controversies timeline

জাতীয় ফেডারেশনের রাজনীতি ও বয়কট: যখন ফুটবল রাজনৈতিক হাতিয়ার

ফুটবল কখনোই রাজনীতির ঊর্ধ্বে নয়। সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি সব সময়ই ফুটবলের মাঠে ছায়া ফেলেছে। বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবানরা নিজেদের ইমেজ বাড়াতে বা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিশ্বকাপকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করেছেন।

১৯৭৮ আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ও জান্তা সরকার

ফুটবলকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ হলো ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ।

  • প্রমাণিত সত্য: তৎকালীন স্বৈরশাসক জেনারেল হোর্হে ভিদেলার নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা সরকার দেশটিতে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক গুম (Desaparecidos) চালাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়েই সামরিক পাহারায় আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়।
  • জনশ্রুতি: সামরিক সরকার আন্তর্জাতিক বিশ্বে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এবং দেশের মানুষের মনোযোগ ঘোরাতে এই বিশ্বকাপকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এমনকি ফাইনালে ওঠার জন্য পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৬-০ গোলের বিশাল জয়ের ম্যাচটিতে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও শস্য চুক্তির লেনদেন ছিল বলে আজও অভিযোগ করা হয়, যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো প্রমাণিত হয়নি।

২০২৬ বিশ্বকাপ: ইরান দলের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ

চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপ বিতর্ক-এ রাজনীতির নগ্ন প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, যা আমি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।

  • প্রমাণিত সত্য: যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসা ও অভিবাসন নীতির কারণে ইরানি ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মেহেদি তাজ কানাডায় ফিফা কংগ্রেসে প্রবেশাধিকার পাননি এবং পরবর্তীতে বিশ্বকাপ ড্রয়ের আগে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ভিসা প্রত্যাখ্যাত হয়।
  • প্রমাণিত সত্য: ভিসা জটিলতা ও নিরাপত্তার কারণে ইরান দলকে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের পূর্বনির্ধারিত প্রশিক্ষণ শিবির (টাকসন, অ্যারিজোনা) বাতিল করে মেক্সিকোর তিজুয়ানায় সরিয়ে নিতে বাধ্য হতে হয়। এছাড়া, গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচের পর দলকে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে হয়েছিল।
  • প্রমাণিত সত্য: মার্চ মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন যে টুর্নামেন্টে ইরানের অংশগ্রহণ “উপযুক্ত” নয়।
  • প্রমাণিত সত্য: গ্রুপ পর্ব থেকে ইরান বিদায় নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিন প্রকাশ্যে “আনন্দ প্রকাশ” করেন। ইরানি ফেডারেশন আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে একটি “বৈরী” (hostile) আচরণ বলে বর্ণনা করেছে।
  • প্রমাণিত সত্য: ইরানের কোচ আমির ঘালেনোই এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনে তাঁর দলকে “সবচেয়ে নিপীড়িত” (most oppressed) দল বলে অভিহিত করেছেন। ফেডারেশন জানিয়েছে, এই ধরনের আচরণ টুর্নামেন্টের “ন্যায্যতার অনুভূতি ক্ষুণ্ণ করেছে”।
  • জনশ্রুতি/বিতর্কিত ব্যাখ্যা: মার্কিন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই পদক্ষেপগুলো কেবলই তাদের দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে করা রুটিন যাচাই বা ভেটিং প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, ইরান ও তাদের সমর্থকদের অভিযোগ, এটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও শাস্তি।
  • ফিফা’র প্রতিক্রিয়া: এই ইরান বিশ্বকাপ ভিসা বিতর্কে ফিফা জানিয়েছে যে তারা সব দলের জন্য বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তবে ফিফা এ কথাও স্পষ্ট করেছে যে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বা ভিসা নীতির ওপর ফিফা’র সরাসরি এখতিয়ার বা নিয়ন্ত্রণ নেই।

ইরাক দলের ফটোগ্রাফার ও অন্যান্য প্রতিনিধিদের প্রবেশে বাধা

ভিসা ও অভিবাসন জটিলতা কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রেও বড় আকার ধারণ করেছে।

  • প্রমাণিত সত্য: ইরাকি তারকা স্ট্রাইকার আইমেন হুসেইনকে শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দরে সাত ঘণ্টা আটকে রেখে জেরা করা হয়, যদিও শেষ পর্যন্ত তাকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়।
  • প্রমাণিত সত্য: ইরাক দলের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার তালাল সালাহকে বৈধ ভিসা ও ফিফা স্বীকৃত অ্যাক্রেডিটেশন থাকা সত্ত্বেও প্রায় দশ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এরপর “ভেটিং সংক্রান্ত উদ্বেগ” (vetting concerns) উল্লেখ করে তাকে প্রবেশ প্রত্যাখ্যান করা হয়। মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (CBP) এর পেছনে বিস্তারিত কোনো কারণ ব্যাখ্যা করতে অস্বীকৃতি জানায়।
  • প্রমাণিত সত্য: দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া ইরাক দল এই ইরাক ফটোগ্রাফার বিতর্ক-এর কারণে টুর্নামেন্টে নিজেদের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার ছাড়াই খেলতে বাধ্য হয়, যা তাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক ছিল।
  • প্রমাণিত সত্য: সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান, যিনি ২০২৫ সালে আফ্রিকান কনফেডারেশনের সেরা রেফারি নির্বাচিত হয়েছিলেন, বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও একইভাবে প্রবেশ প্রত্যাখ্যানের শিকার হন। এর পাশাপাশি আইভরি কোস্ট ও সেনেগালের বেশ কয়েকজন সমর্থকের ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঘটনাও ঘটেছে।
  • প্রমাণিত সত্য (প্রেক্ষাপট): হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch) বা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের (Amnesty International) মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই ঘটনাগুলো বৃহত্তর মার্কিন অভিবাসন নীতির কাঠামোগত বিতর্কের অংশ এবং এটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের বিষয়।

রাশিয়া নিষিদ্ধ, ইসরায়েল নয়: ফিফা’র নৈতিক দ্বৈরথ নিয়ে বিতর্ক

আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ফুটবলের সংমিশ্রণে ফিফা মানবাধিকার বিতর্ক বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত এবং সংবেদনশীল টপিক।

  • প্রমাণিত সত্য (পটভূমি): ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের কয়েকদিনের মধ্যেই ফিফা ও উয়েফা রাশিয়ার জাতীয় দল ও ক্লাবগুলোকে সকল আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে।
  • প্রমাণিত সত্য: অন্যদিকে, গাজা যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলকে ফিফা বা উয়েফা কোনো প্রতিযোগিতা থেকে বহিষ্কার করেনি। যদিও একাধিক ইউরোপীয় ফেডারেশন, ৩০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন থেকে এই দাবি জোরালোভাবে তোলা হয়েছে।
  • প্রমাণিত সত্য: এই ফিফা রাশিয়া ইসরায়েল নীতির পার্থক্যের বিষয়ে উয়েফা প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার চেফেরিন সম্প্রতি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে এটি “একটি বৈধ প্রশ্ন” (a legitimate question)।
  • সমালোচকদের মতে: স্প্যানিশ ক্রীড়ামন্ত্রী, ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন যুক্তি দেয় যে একই মানদণ্ড উভয় দেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত ছিল। তাদের দাবি, পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই ফিফার এই স্পষ্ট দ্বৈত নীতির মূল কারণ।
  • ফিফা ও এর সমর্থকদের মতে: ফিফা বারবার উল্লেখ করেছে যে তারা জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোর সঙ্গে কাজ করে, সরকার বা সেনাবাহিনীর সঙ্গে নয়। রাশিয়ার ক্ষেত্রে একাধিক উয়েফা সদস্য দেশ (যেমন পোল্যান্ড, সুইডেন) রাশিয়ার বিরুদ্ধে খেলতে সরাসরি ও আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছিল, যা প্রতিযোগিতার কার্যক্রম অচল করে দিচ্ছিল। ফিফার সমর্থকদের যুক্তি, ইসরায়েলের ক্ষেত্রে তেমন প্রাতিষ্ঠানিক বয়কটের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি এবং ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ফিফা’র সমস্ত নিয়ম মেনেই চলছে। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ইসরায়েলকে নিষিদ্ধ করার দাবিকে একটি “রেড লাইন” হিসেবে বর্ণনা করে তা খারিজ করে দিয়েছেন।

ফুটবলের ভবিষ্যতের দিশা

আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে, ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাস কেবলই দুর্দান্ত গোল, রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ বা নায়ক হয়ে ওঠার গল্প নয়। এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে রাজনীতি, দুর্নীতি এবং অর্থের এক জটিল সমীকরণ। ২০১৫ সালের ফিফাগেট কেলেঙ্কারি বিশ্ব ফুটবল সংস্থাকে নাড়িয়ে দিলেও, এটি তাদের এথিক্স কমিটি এবং স্বচ্ছতার নীতিকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে বাধ্য করেছে।

সাংবাদিক হিসেবে আমাদের কাজ হলো কেবল মাঠের সাফল্য উদযাপন করা নয়, বরং মাঠের বাইরের এই অন্ধকার দিকগুলোকে আলোতে নিয়ে আসা। প্রযুক্তিগত উন্নতি (যেমন ভিএআর) হয়তো রেফারিং বিতর্ক কিছুটা কমিয়েছে, কিন্তু স্পনসরশিপের নৈতিকতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মানবাধিকার এবং ফেডারেশনগুলোর ভেতরে স্বচ্ছতার অভাব এখনো ফুটবলের জন্য বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতের বিশ্বকাপগুলো যেন এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত হতে পারে, তার জন্য ফিফা, স্পনসর, আয়োজক দেশ এবং সর্বোপরি ফুটবল ভক্তদের সচেতন ও সোচ্চার থাকা একান্ত প্রয়োজন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. ফিফা বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় দুর্নীতির ঘটনা কোনটি?

২০১৫ সালের “ফিফাগেট” কেলেঙ্কারিকে ফিফার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্নীতির ঘটনা হিসেবে ধরা হয়। মার্কিন বিচার বিভাগের (DOJ) তদন্তে ব্রডকাস্টিং রাইটস এবং আয়োজক দেশ নির্বাচনে মিলিয়ন ডলারের ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়, যার ফলে সেপ ব্লাটারসহ শীর্ষ কর্তারা নিষিদ্ধ হন।

২. ‘হ্যান্ড অফ গড’ ঘটনাটি কী?

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা হাত দিয়ে একটি গোল করেছিলেন। রেফারি সেটি বুঝতে না পেরে গোলটি বৈধ ঘোষণা করেন। ম্যারাডোনা পরবর্তীতে এটিকে “ঈশ্বরের হাত” বা “হ্যান্ড অফ গড” বলে আখ্যায়িত করেন।

৩. ১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনালে কেন পেনাল্টি নিয়ে এত বিতর্ক হয়েছিল?

১৯৯০ সালের ফাইনালে মেক্সিকান রেফারি এদগার্দো কোদেসাল ৮৫ মিনিটে পশ্চিম জার্মানির পক্ষে একটি পেনাল্টি দেন, যা থেকে জয়সূচক গোলটি আসে। তবে রিপ্লেতে দেখা যায় ফাউলটি বক্সের বাইরে ছিল বা আদৌ স্পষ্ট ফাউল ছিল না। এছাড়াও ফাইনালে প্রথম লাল কার্ড প্রদর্শন এবং পরবর্তীতে রেফারির বিরুদ্ধে ফিফার প্রভাব খাটানোর অপ্রমাণিত অভিযোগ এই বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।

৪. কাতার বিশ্বকাপ নিয়ে এত বিতর্ক কেন হয়েছিল?

কাতার বিশ্বকাপ মূলত দুটি কারণে বিতর্কিত ছিল: প্রথমত, ২০১০ সালে বিডিং প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ (যা প্রমাণিত হয়নি), এবং দ্বিতীয়ত, স্টেডিয়াম ও অবকাঠামো নির্মাণের সময় অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণিত সত্য।

৫. ভিএআর (VAR) প্রযুক্তি কি রেফারিং বিতর্ক সম্পূর্ণ দূর করতে পেরেছে?

না, সম্পূর্ণ দূর করতে পারেনি। ভিএআর প্রযুক্তি স্পষ্ট ভুলগুলো সংশোধন করতে সাহায্য করলেও, অফসাইডের সূক্ষ্ম নিয়ম বা হ্যান্ডবলের সংজ্ঞার মতো বিষয়গুলোতে এখনো প্রচুর রেফারিং বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।

৬. বিশ্বকাপে কি কখনো ম্যাচ ফিক্সিং প্রমাণিত হয়েছে?

বিশ্বকাপের মূল পর্বের ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সরাসরি প্রমাণ পাওয়া বিরল। তবে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব ও প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে রেফারিদের দ্বারা ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কিছু ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে, যার জন্য ফিফা সংশ্লিষ্টদের আজীবন নিষিদ্ধ করেছে।

৭. মেসিকে সাহায্য করার জন্য কি সত্যিই বিশেষ বল বা বুট ব্যবহার করা হয়েছিল?

না, এটি একটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি ও ইন্টারনেট-ভিত্তিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। আডিডাস-স্পনসরড খেলোয়াড়দের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার জন্য কোনো গোপন প্রযুক্তি বা বিশেষ বল সরবরাহ করা হয়নি। এই ধরনের দাবির পক্ষে ফিফা, স্পোর্টস কোর্ট বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের কোনো প্রমাণ নেই। ফুটবলের বুট প্রযুক্তি প্রকাশ্যে তৈরি হয় এবং তা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বাড়ানোর সাধারণ বাণিজ্যিক প্রচেষ্টার অংশ।

৮. ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরান দলের সঙ্গে কী ঘটেছিল?

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও অভিবাসন নীতির কারণে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি। এছাড়া ইরান দলকে তিজুয়ানায় (মেক্সিকো) অনুশীলন করতে বাধ্য করা হয় এবং প্রতিটি ম্যাচের পর দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হয়। ইরান একে বৈরী আচরণ বললেও, মার্কিন কর্তৃপক্ষ একে রুটিন নিরাপত্তা যাচাই বলে দাবি করেছে।

৯. ফিফা রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করলেও ইসরায়েলকে কেন নিষিদ্ধ করেনি?

এটি একটি চলমান ও তীব্র বিতর্কিত বিষয়। সমালোচকরা একে দ্বৈত নীতি বললেও, ফিফার যুক্তি হলো রাশিয়ার ক্ষেত্রে একাধিক ইউরোপীয় দেশ তাদের সাথে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল বলে প্রতিযোগিতা অচল হয়ে যাচ্ছিল, যা ইসরায়েলের ক্ষেত্রে ঘটেনি। ফিফার মতে, ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাদের নিয়ম মেনেই কাজ করছে।

সর্বশেষ