আজকাল শহরের রাস্তায় বের হলে কেমন যেন দমবন্ধ লাগে, তাই না? চারপাশে শুধু ইট-কংক্রিটের ধূসর দেয়াল আর সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা নাম না জানা কিছু বিদেশি বাহারি গাছ। অথচ খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, আমাদের চারপাশ জুড়েই ছিল নিম, বকুল, ছাতিম, হিজল আর শিউলি গাছের চিরচেনা মেলা। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে এসে আমরা তীব্র তাপদাহ আর অসময়ের বন্যার মুখোমুখি হয়ে টের পাচ্ছি, প্রকৃতির এই আদি রূপটা হারিয়ে আমরা কতটা বড় ভুল করেছি। নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতেই এখন আমাদের প্রকৃতির কাছে ফিরতে হবে। আর ঠিক এই কারণেই লোকাল জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং দেশীয় গাছ লাগানোর গুরুত্ব আজ আমাদের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত।
খুব সহজ করে বললে, ঘরের কাছের চড়ুই, শালিক, মৌমাছি আর চেনা গাছপালাকে টিকিয়ে না রাখলে আমরা নিজেরাও শান্তিতে বাঁচতে পারব না। বিদেশি গাছ দেখতে হয়তো বেশ চকচকে, আধুনিক বা জ্যামিতিক কাঠামোর লাগে, কিন্তু আমাদের মাটির জন্য ওগুলো একদমই কাজের না। লোকাল জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং দেশীয় গাছ লাগানোর গুরুত্ব বোঝা তাই কোনো শৌখিনতা নয়, এটা আমাদের বংশধরদের টিকিয়ে রাখার সরাসরি লড়াই। দেশী গাছ শুধু আমাদের বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার অক্সিজেন দেয় না, এটা স্থানীয় পাখিদের বাসা বানাতে, বন্যপ্রাণীর খাদ্যের জোগান দিতে আর মাটির নিচের জলস্তর ধরে রাখতে সাহায্য করে। চলুন একদম গভীরে গিয়ে দেখে নেওয়া যাক, কেন এখনই আমাদের বাড়ির কোণে, রাস্তার ধারে বা ফাঁকা জায়গায় দেশী গাছ লাগানো দরকার।
লোকাল জীববৈচিত্র্য কী এবং কেন এটি সংকটে
আমাদের চারপাশের মাটি, জলবায়ু, অববাহিকা আর আবহাওয়াকে কেন্দ্র করে যে চেনা পরিবেশ বা নিখুঁত বাস্তুসংস্থান (ইকোসিস্টেম) গড়ে ওঠে, সেটাই হলো লোকাল জীববৈচিত্র্য। এর মধ্যে ঘরের কোণের চড়ুই পাখি, গাছের দূরন্ত কাঠবিড়ালি, রাতের জোনাকি থেকে শুরু করে মাটির নিচের কেঁচো, পিঁপড়ে বা খালি চোখে দেখা যায় না এমন হাজারো উপকারী অণুজীবও রয়েছে। কিন্তু তথাকথিত বনায়ন আর আধুনিক নগরায়ণের নামে আমরা এই পুরো চেনা শৃঙ্খলটাকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।
আমরা প্রতিনিয়ত এমন সব বিদেশি সোজা-লম্বা গাছ লাগাচ্ছি যা আমাদের চিরন্তন প্রকৃতির সাথে একদমই খাপ খায় না। ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি কিংবা ল্যুকেনিয়ার মতো গাছগুলো আমাদের মাটির গভীর থেকে স্পঞ্জের মতো হুহু করে পানি আর খনিজ শুষে নেয়। ঠিক এই জায়গাতেই লোকাল জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং দেশীয় গাছ লাগানোর গুরুত্ব আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। আমাদের চেনা পাখিরা বা কীটপতঙ্গরা এই বিদেশি গাছগুলোতে না পায় চেনা স্বাদের ফল, না পায় নিরাপদ কোনো আশ্রয়। ফলে তারা ধীরে ধীরে আমাদের চারপাশ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।
দেশী বন্যপ্রাণীর থাকার জায়গার অভাব ও খাদ্য সংকট
বিদেশি গাছে আমাদের দেশী পাখিরা বা কাঠবিড়ালিরা সচরাচর বাসা বাঁধে না কিংবা ফল খেতে পারে না। একটা বট, পাকুড়, ডুমুর বা শিমুল গাছ যেভাবে পাখিদের অগুনতি নরম ফল আর নিরাপদ ডালপালার বড় আশ্রয় দেয়, তা একটা রেইনট্রি বা মেহগনি গাছ কখনোই দিতে পারে না। ফল আর আশ্রয়ের অভাবে পাখিরা গ্রাম ও শহর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
পরাগায়ন ও উপকারী পোকামাকড় বিলুপ্তি
আমাদের দেশের মৌমাছি, প্রজাপতি, ফড়িং আর নানা রকম উপকারী কীটপতঙ্গ দেশী ফুল ও লতাগুল্মের মধুর ওপর বেঁচে থাকে। দেশী গাছ কমে যাওয়ায় এই পতঙ্গগুলো খাবার পাচ্ছে না। এর সরাসরি বড় ধাক্কাটা লাগছে আমাদের ফসলের ও ফলের স্বাভাবিক পরাগায়নে, যা আমাদের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তাকেও বড় ঝুঁকিতে ফেলছে।
| সংকটের আসল কারণ | আমাদের প্রকৃতির ওপর এর প্রভাব | বাঁচার সহজ ও বাস্তবমুখী উপায় |
| বিদেশি গাছের আগ্রাসী দাপট | মাটির পুষ্টি নষ্ট হওয়া ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নামা | নতুন করে বিদেশি গাছ না লাগানো, বেশি করে দেশী ফল ও ঔষধি গাছ রোপণ |
| যত্রতত্র বাড়িঘর ও কংক্রিটের কাঠামো | বন্যপ্রাণীদের চেনা খাবার ও নিরাপদ প্রাকৃতিক আশ্রয়ের চরম অভাব | ছাদবাগান, বাড়ির আঙিনায় ছোট বন ও ফাঁকা জায়গায় সবুজ জোন বানানো |
| বিষাক্ত কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার | মৌমাছি, প্রজাপতি ও উপকারী ফড়িংয়ের মতো প্রাকৃতিক পরাগায়নকারী ধ্বংস | সমন্বিত বালাইনাশক ব্যবহার, প্রাকৃতিক উপায়ে চাষবাস ও দেশী ঝোপঝাড় রক্ষা |
লোকাল জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং দেশীয় গাছ লাগানোর গুরুত্ব

আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য দীর্ঘদিনের জন্য টিকিয়ে রাখতে দেশী গাছের কোনো বিকল্প নেই। আম, জাম, কাঁঠাল, হিজল, করচ বা গাবের মতো গাছগুলো এদেশের মাটির সাথে শত শত বছর ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে মিশে গেছে। এগুলো এদেশের যেকোনো তীব্র ঝড়-তুফান, বন্যা বা খরা অনায়াসে সহ্য করতে পারে এবং মাটির গভীরে শিকড় চালিয়ে দিয়ে ভূমিক্ষয়রোধে দারুণ কাজ করে।
পরিবেশ গবেষকদের মতে, লোকাল জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং দেশীয় গাছ লাগানোর গুরুত্ব ঠিক এখানেই যে, একটা মাত্র দেশী গাছকে ঘিরে আস্ত একটা জীবজগৎ বা মিনি-ইকোসিস্টেম বেঁচে থাকে। যেমন একটা বুড়ো বট বা আম গাছ শত শত পাখি, বাদুড়, কাঠবিড়ালি, গিরগিটি আর হাজারো কীটপতঙ্গের একমাত্র ভরসাস্থল। অন্যদিকে, একটা বিদেশি গাছ হয়তো সোজা হয়ে বেড়ে উঠে দামী কাঠ দিতে পারে, কিন্তু কোনো প্রাণকে ছায়া বা আশ্রয় দিতে পারে না।
মাটির স্বাস্থ্য ও ভূগর্ভস্থ পানির সুরক্ষা
দেশী গাছের শিকড় মাটির অনেক গভীরে ছড়ায় এবং চারপাশের মাটিকে চালুনির মতো শক্ত করে ধরে রাখে। এগুলো মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং বর্ষার অতিরিক্ত পানিকে স্পঞ্জের মতো চুষে মাটির নিচে চুইয়ে যেতে সাহায্য করে, ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ধাক্কা সামলানো
আমাদের দেশে প্রায়ই বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস হয়। উপকূলের কেওড়া, গেওয়া, বাইন কিংবা আমাদের চেনা বাঁশঝাড়, হিজল ও করচ গাছগুলো প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে কাজ করে। এগুলো ঝড়ের গতিবেগকে বাধা দিয়ে নিজেরা বুক পেতে দেয় এবং আমাদের জীবন ও ঘরবাড়ি রক্ষা করে।
মাটির নিজস্ব পুষ্টিচক্র ও হিউমাস গঠন
দেশী গাছের পাতা যখন মাটিতে পড়ে, তখন তা খুব দ্রুত পচে গিয়ে প্রাকৃতিক হিউমাস বা জৈব সারে পরিণত হয়। এটা মাটির উর্বরা শক্তি বাড়ায় এবং মাটির ভেতরের উপকারী বন্ধুদের বাঁচিয়ে রাখে, যা মেহগনি বা ইউক্যালিপটাসের পাতার টক্সিনের কারণে সম্ভব হয় না।
| দেশী গাছের অনন্য গুণাগুণ | পরিবেশগত আসল সুবিধা | আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী লাভ |
| মজবুত ও অত্যন্ত গভীর শিকড় | মাটিকে আলগা হতে দেয় না ও নদীর পাড় বা ভূমিক্ষয় রোধ করে | বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিধস সহজে প্রতিরোধ করা যায় |
| চেনা দেশী ফলের নিয়মিত জোগান | পাখি ও কাঠবিড়ালির খাবারের অভাব হয় না, ফলে তারা লোকালয়ে থাকে | বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি ঘটে ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা পায় |
| স্থানীয় আবহাওয়ায় খাপ খাইয়ে নেওয়া | কোনো বাড়তি রাসায়নিক সার বা কৃত্রিম পানি ছাড়াই বেঁচে থাকে | তীব্র খরা, তাপদাহ বা অনাবৃষ্টিতেও আমাদের চারপাশ সবুজ রাখে |
বিদেশি গাছের ক্ষতিকর দিক ও আমাদের কিছু ভুল ধারণা
আমরা অনেকেই মনে করি, সবুজ পাতা থাকলেই হলো—যেকোনো গাছ লাগালেই বুঝি প্রকৃতির উপকার হবে। এই ভুল ধারণার কারণে আমাদের দেশে গত কয়েক দশকে ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, আকাশমণি, ল্যুকেনিয়া (ইপিল-ইপিল) আর রেইনট্রির মতো গাছ দেদারসে লাগানো হয়েছে। এই গাছগুলো খুব দ্রুত বড় হয় আর কাঠও বেশ সোজা ও দামী, কিন্তু এগুলো আমাদের পরিবেশের জন্য এক ধরনের নীরব ঘাতক বা ‘গ্রিন ইনভেডার’।
যেমন ইউক্যালিপটাস গাছ প্রতিদিন চারপাশের মাটি থেকে প্রচুর লিটার পানি শুষে নিয়ে জমিকে রুক্ষ ও অনুর্বর করে ফেলে। আবার মেহগনি বা আকাশমণি গাছের পাতার ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান (অ্যালিলোপ্যাথি প্রভাব) মাটির স্বাভাবিক অম্লতা বাড়িয়ে দেয়। এই গাছগুলোর নিচে খেয়াল করলে দেখবেন অন্য কোনো ছোট দেশী গাছ, গুল্ম বা সাধারণ ঘাসও গজাতে পারে না। তাই লোকাল জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং দেশীয় গাছ লাগানোর গুরুত্ব বোঝা এবং আজই ক্ষতিকর বিদেশি গাছ লাগানো বন্ধ করা দরকার।
মাটির পুষ্টি ও পানির অপচয়
বিদেশি দ্রুত বর্ধনশীল গাছগুলো মাটি থেকে সব পুষ্টি একাই শুষে নেয়। এর ফলে একই জমিতে থাকা বা তার আশেপাশে থাকা ফসলি জমি ও অন্যান্য দেশী গাছপালা পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং মারা যায়।
পাখির অনীহা ও বিষাক্ত ফল
অনেক বিদেশি গাছের ফল বা বীজ আমাদের দেশী পাখিরা ও বন্যপ্রাণীরা চিনতেই পারে না, তাই খেতেও পারে না। কিছু কিছু বিদেশি গাছের ফল পাখিদের জন্য বিষাক্তও প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি এই গাছগুলোর পাতা আমাদের গবাদিপশুরাও মুখে তোলে না।
অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি
ইউক্যালিপটাস বা কিছু বিদেশি একাশিয়া গাছের ফুল থেকে যে সূক্ষ্ম পরাগরেণু বাতাসে ওড়ে, তা মানুষের ফুসফুসে ঢুকে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস আর অ্যালার্জির জন্ম দেয়। এটা আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্যও এক বড় হুমকি।
| গাছের ধরন ও প্রজাতি | দেখতে যেমনই হোক না কেন | প্রকৃতির ওপর এর আসল নেতিবাচক প্রভাব |
| ইউক্যালিপটাস | দ্রুত বাড়ে, সোজা ও ভালো কাঠ দেয় | ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত শেষ করে, মাটিকে মরুভূমি বানায়, পাখি বসে না |
| মেহগনি | আসবাবের জন্য দামী কাঠ পাওয়া যায় | পাতা সহজে পচে না, মাটির অম্লতা বাড়িয়ে উর্বরতা ও অণুজীব নষ্ট করে |
| দেশী নিম বা বকুল | চমৎকার ঔষধি গুণ, বাতাস পরিষ্কার রাখে | বাড়ে একটু ধীরে, তবে পরিবেশ ও মানুষের চিরকালের আসল বন্ধু |
টেকসই পরিবেশ গঠনে দেশী গাছের অনন্য ভূমিকা
একটা সুন্দর, দীর্ঘস্থায়ী এবং ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ গড়তে হলে আমাদের এমন গাছ বেছে নিতে হবে যা প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না করে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকবে। আমাদের দেশী গাছপালা প্রাকৃতিকভাবেই কম যত্নে এবং কম খরচে বড় হতে পারে। এগুলোর জন্য আলাদা কোনো রাসায়নিক সার বা অতিরিক্ত বিষাক্ত কীটনাশকের কোনো প্রয়োজনই হয় না।
আজকাল শহরের তাপমাত্রা যেভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তাকে পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় ‘আর্বান হিট আইল্যান্ড’ (Urban Heat Island) প্রভাব বলা হয়। এই অতিরিক্ত গরম কমাতে পারে একমাত্র ঘন ও ছড়ানো পাতার দেশী গাছগুলো। কৃষ্ণচূড়া, বকুল, কদম বা ছাতিম গাছ রাস্তার ধারে পরিকল্পিতভাবে লাগালে তা শুধু চমৎকার শীতল ছায়াই দেবে না, বরং বাতাসের ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার ও ধূলিকণাও শুষে নেবে।
কম খরচে ও শূন্য যত্নে দীর্ঘমেয়াদী সুফল
দেশী গাছে প্রাকৃতিকভাবেই রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে। ছোট অবস্থায় প্রথম এক-ইউ বছর একটু খেয়াল রাখলে, একবার শিকড় মাটিতে বসে গেলে এগুলো বছরের পর বছর কোনো বাড়তি কৃত্রিম সেচ ছাড়াই বেঁচে থাকে।
স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও ভেষজ ওষুধের জোগান
নিম, তুলসী, বহেরা, আমলকী, হরিতকী ও অর্জুনের মতো দেশী গাছগুলো আমাদের ঘরোয়া চিকিৎসার সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য উৎস। তাছাড়া দেশী ফলের গাছ থেকে খাঁটি পুষ্টি, ভিটামিন ও অর্থনৈতিক লাভ দুই-ই পাওয়া সম্ভব, যা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে।
সংস্কৃতি ও নান্দনিকতার মেলবন্ধন
কদম ছাড়া আমাদের বর্ষা কিংবা শিউলি ছাড়া শরৎকাল ভাবাই যায় না। দেশী গাছ আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও উৎসবের সাথে মিশে আছে। রাস্তার ধারে বা পার্কগুলোতে কৃষ্ণচূড়ার লাল, সোনালুর হলুদ কিংবা জারুলের বেগুনি রঙের মেলা যে নান্দনিক সৌন্দর্য তৈরি করে, তা কোনো ধসর বিদেশি গাছ দিতে পারে না।
| শহরের ও গ্রামের বর্তমান সমস্যা | দেশী গাছের ভূমিকা ও কর্মক্ষমতা | আমাদের জন্য আসল টেকসই ফলাফল |
| শহরের অতিরিক্ত গরম ও তাপদাহ | রাস্তার পাশে ছাতিম, কদম ও বকুল লাগানো | স্থানীয় তাপমাত্রা দ্রুত কমে আসে ও শীতল ছায়া পাওয়া যায় |
| বায়ু দূর্ষণ ও ধুলোবালির দাপট | ঘন, খসখসে ও বড় পাতার ধুলোবালি শোষণ | বাতাস প্রাকৃতিকভাবে পরিষ্কার হয় ও ফুসফুসের রোগ কমে |
| ঘরোয়া চিকিৎসা ও ভেষজ উপাদানের অভাব | নিম, তুলসী ও আমলকীর সুপরিকল্পিত চাষ | সহজে ভেষজ ওষুধের জোগান মেলে ও শরীর সুস্থ থাকে |
আমরা কীভাবে ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে অবদান রাখতে পারি
লোকাল জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং দেশীয় গাছ লাগানোর গুরুত্ব শুধু বইয়ের পাতায়, সেমিনারে বা অনলাইন ব্লগে আলোচনা করলেই চলবে না। এটা আমাদের নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের ছোট ছোট সচেতন পদক্ষেপই পারে পুরো দেশের প্রকৃতিকে আবার আগের মতো সবুজ ও জীবন্ত করে তুলতে।
আপনার যদি একটা ছোট ব্যালকনি, বারান্দা বা ছাদ থাকে, সেখানে বিদেশি ক্যাকটাস, প্লাস্টিকের ফুল বা কৃত্রিম রাসায়নিক দিয়ে তৈরি বাহারি পাতাবাহার না লাগিয়ে একটা দেশী মরিচ, বারোমাসি লেবু, ধনেপাতা বা তুলসী গাছ লাগাতে পারেন। এতে যেমন ঘরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও সুবাস বাড়বে, তেমনি পরিবেশেরও সত্যিকারের উপকার হবে।
সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ স্থানীয় মানুষকেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের খালি মাঠে বিদেশি আকাশমণি বা ইউক্যালিপটাস না লাগিয়ে কৃষ্ণচূড়া, শিউলি, কাঞ্চন, জারুল বা কদম গাছ লাগানো উচিত। আমাদের নতুন প্রজন্মকে গাছ চেনার, গাছের নাম জানার আর প্রকৃতির সাথে সরাসরি বন্ধুত্ব করার সুযোগ করে দিতে হবে।
- ছাদবাগানে দেশী ফলকে অগ্রাধিকার: আপনার ছাদবাগানের টবে আমড়া, করমচা, পেয়ারা, জামরুল বা কাগজি লেবুর মতো দেশী গাছ লাগান। এগুলো দ্রুত ফল দেয় এবং চড়ুই-শালিকের মতো পাখিদের আকৃষ্ট করে।
- উপহার হিসেবে গাছের চারা: বিয়ে, জন্মদিন বা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে প্লাস্টিকের শোপিস বা ক্ষতিকর সামগ্রী উপহার না দিয়ে সুন্দর মাটির টবে একটা দেশী গাছের চারা উপহার দেওয়ার চমৎকার সংস্কৃতি গড়ে তুলুন।
- অনলাইন ও অফলাইন সচেতনতা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশী গাছের উপকারিতা, চেনা-অচেনা দেশী গাছের ছবি এবং আমাদের লোকাল বন্যপ্রাণীর সাথে এর গভীর সম্পর্ক নিয়ে লেখালেখি করুন ও অন্যদের অনুপ্রাণিত করুন।
- নার্সারিতে দেশী চারার খোঁজ করা: চারা কেনার সময় নার্সারিতে গিয়ে সচেতনভাবে দেশী গাছের খোঁজ করুন। যখন সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে দেশী গাছের চাহিদা বাড়বে, তখন নার্সারি মালিকরাও বিদেশি গাছের বদলে দেশী চারা উৎপাদনে বেশি আগ্রহী হবেন।
সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা
১. দেশী গাছ বলতে প্রধানত কোন কোন প্রজাতিকে বোঝায়?
সাধারণত আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নিম, বকুল, ছাতিম, শিমুল, পলাশ, কদম, হিজল, করচ, গাব, চালতা এবং বট-পাকুড়কে আমাদের অঞ্চলের মূল দেশী গাছ বলা হয়। এগুলো এদেশের বৈচিত্র্যময় আবহাওয়া, দীর্ঘ বর্ষাকাল ও মাটির সাথে শত শত বছর ধরে নিখুঁতভাবে মানিয়ে নিয়েছে।
২. রেইনট্রি, কড়ই বা মেহগনি কি আমাদের নিজস্ব দেশী গাছ নয়?
না, রেইনট্রি, আকাশমণি এবং মেহগনি আমাদের আদি বা নিজস্ব দেশী গাছ নয়। এগুলো শত বছর আগে বা তারও পরে ঔপনিবেশিক আমলে মূলত দ্রুত কাঠ উৎপাদনের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিদেশি বিভিন্ন ক্রান্তীয় বা আমাজন অঞ্চল থেকে আনা হয়েছিল। এগুলো দেখতে বড় ও সবুজ হলেও আমাদের স্থানীয় পাখি বা কীটপতঙ্গের বাস্তুসংস্থানের জন্য খুব একটা উপকারী নয়।
৩. ছোট ছাদ বা ঘরের বারান্দায় কোন কোন দেশী গাছ সহজে লাগানো যায়?
ছোট জায়গায় বা টবে লাগানোর জন্য তুলসী, পুদিনা, গন্ধরাজ, শিউলি, কামিনী, কাঁচামরিচ, করমচা এবং ছোট জাতের কাগজি লেবু বা পেয়ারা গাছ খুবই উপযোগী। এগুলো অল্প মাটিতে ও অল্প জায়গাতেই সুন্দরভাবে বাঁচে, ফুল-ফল দেয় এবং ঘরের কোণে প্রজাপতি ও ছোট পাখিদের ডেকে আনে।
৪. আমাদের চারপাশের বিদেশি গাছগুলো কি এখনই পুরোপুরি কেটে ফেলা উচিত?
না, হুট করে চারপাশের সব বিদেশি গাছ কেটে ফেলা একদমই ঠিক হবে হবে না। কারণ এতে হঠাৎ করে সবুজায়নের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং পাখিরা সাময়িকভাবে বসার জায়গাও হারাবে। এর চেয়ে ভালো ও বুদ্ধিমানের কাজ হলো—এখন থেকে নতুন করে কোনো বিদেশি ক্ষতিকর গাছ না লাগানো এবং পুরনো বিদেশি গাছগুলো যখন স্বাভাবিকভাবে তাদের আয়ু শেষ করবে বা মারা যাবে, তখন সেই খালি জায়গায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে দেশী গাছের চারা রোপণ করা।
শেষ কথা
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা সবুজ, নিরাপদ এবং বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মকে সম্মান করতে হবে। প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে শুধু সাময়িক বাণিজ্যিক স্বার্থে ক্ষতিকর বিদেশি গাছ লাগালে আমাদের পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিই কেবল বাড়বে। লোকাল জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং দেশীয় গাছ লাগানোর গুরুত্ব অন্তরে অনুধাবন করে আজই আমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে—আমরা প্রত্যেকে অন্তত একটা হলেও দেশী গাছ লাগাব এবং সন্তান স্নেহে তার যত্ন নেব।
আজ আপনার লাগানো ছোট একটা নিম, বকুল বা আম গাছ হয়তো দেখতে খুব সাধারণ মনে হতে পারে; কিন্তু আগামী দিনে এটাই হয়ে উঠবে হাজারো পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল, প্রজাপতির চারণভূমি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য একটি জীবন্ত পরম ফুসফুস। প্রকৃতিকে আমরা ভালোবাসলে, প্রকৃতিও আমাদের পরম যত্নে বাঁচিয়ে রাখবে।


