ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক ও নিরাপদে ইলেক্ট্রনিক্স রিসাইকেল করার কার্যকরী উপায়

সর্বাধিক আলোচিত

আমাদের প্রাত্যহিক জীবন এখন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ আর স্মার্ট গ্যাজেট ছাড়া এক মুহূর্তও কল্পনা করা যায় না। প্রতিদিন নিত্যনতুন প্রযুক্তির জিনিস বাজারে আসছে, আর আমরাও ট্রেন্ডের সাথে তাল মেলাতে পুরনো ডিভাইস বদলে নতুনগুলো কিনছি। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, আপনার বাতিল হওয়া পুরনো ফোন, নষ্ট ইয়ারফোন বা ল্যাপটপের চার্জারটি দিনশেষে কোথায় যাচ্ছে? ড্রয়ারের কোণায় অযত্নে পড়ে থাকা কিংবা সাধারণ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া এসব পুরনো গ্যাজেট মিলে তৈরি করছে এক বিশাল অদৃশ্য পাহাড়, যার নাম ই-বর্জ্য বা ইলেক্ট্রনিক বর্জ্য।

ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক নিয়ে কথা বলা এখন শুধু পরিবেশবাদীদের শখের বিষয় বা সেমিনারের আলোচনা নয়; এটি আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এই লেখায় আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব কেন এই বর্জ্য এত ভয়ংকর, মানবদেহে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী, এবং কীভাবে খুব সহজেই আমরা নিরাপদে ইলেক্ট্রনিক্স রিসাইকেল করতে পারি।

ই-বর্জ্য আসলে কী এবং কেন এর পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে?

সহজ কথায়, যেসব ইলেক্ট্রনিক বা বৈদ্যুতিক জিনিস আমরা আর ব্যবহার করি না, নষ্ট হয়ে গেছে বা পুরনো মডেলের কারণে বাতিল বলে ধরে নিয়েছি, সেগুলোই ই-বর্জ্য। এর মধ্যে ভাঙা মোবাইল, নষ্ট টিভি, রেফ্রিজারেটর, চার্জার, ব্যাটারি থেকে শুরু করে ছোট হেডফোন বা স্মার্টওয়াচও থাকতে পারে। এগুলো সাধারণ তরকারি বা কাগজের ময়লার মতো মাটিতে মিশে যায় না। এগুলো বছরের পর বছর অবিকৃত অবস্থায় পড়ে থেকে পরিবেশকে দূষিত করে। আধুনিক যুগে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতাই মূলত এর পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বর্জ্যের ধরন সাধারণ উদাহরণ বাতিল করার মূল কারণ
ছোট ব্যক্তিগত ডিভাইস মোবাইল, স্মার্টওয়াচ, ব্লুটুথ স্পিকার, পাওয়ার ব্যাংক নতুন মডেল কেনা, ব্যাটারি নষ্ট হওয়া, ট্রেন্ড পরিবর্তন
বড় হোম অ্যাপ্লায়েন্স টিভি, ফ্রিজ, এসি, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ওয়াশিং মেশিন পার্টস না পাওয়া, মেরামত খরচ বেশি হওয়া
আইটি ও নেটওয়ার্কিং ল্যাপটপ, প্রিন্টার, মনিটর, রাউটার, সার্ভার যন্ত্রাংশ ধীরগতি, সফটওয়্যার আপডেট না হওয়া
খুচরা যন্ত্রাংশ লিথিয়াম ব্যাটারি, চার্জিং কেবল, মাউস, মাদারবোর্ড ছিঁড়ে যাওয়া, ফুলে যাওয়া বা সংযোগ নষ্ট হওয়া

আধুনিক লাইফস্টাইল ও গ্যাজেট সংস্কৃতির ফাঁদ

বর্জ্য বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমাদের ‘ফাস্ট টেকনোলজি’ বা দ্রুত গ্যাজেট বদলানোর প্রবণতা। কোম্পানিগুলো প্রতি বছর নতুন ফিচারের স্মার্টফোন আনছে, আর আমরা একটু পুরনো হলেই তা বাতিল করছি। নষ্ট হলে মেরামত করার চেয়ে নতুন কেনাটাই এখন বেশি সহজ, সময়সাশ্রয়ী ও সস্তা মনে হয়। ফলে আমাদের নিজেদের বাসাবাড়িই হয়ে উঠছে ই-বর্জ্যের ছোটখাটো কারখানা।

পরিকল্পিত অকেজো হওয়ার নীতি (Planned Obsolescence)

অনেক প্রযুক্তি কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবেই তাদের পণ্য এমনভাবে তৈরি করে যেন একটি নির্দিষ্ট সময় পর তা অকেজো হয়ে যায় বা ব্যাটারি ব্যাকআপ কমে যায়। সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে পুরনো ফোন স্লো করে দেওয়ার নজিরও রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ক্রেতাকে নতুন পণ্য কিনতে বাধ্য করা। এই ব্যবসায়িক নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে ই-বর্জ্যের পরিমাণ কল্পনার চেয়েও দ্রুত বাড়ছে।

ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক: পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর নীরব ঘাতক

Main e-waste hazards

পুরনো ইলেক্ট্রনিক্স জাদুর মতো উবে যায় না বা সাধারণ মাটির সাথে মিশে সার হয়ে যায় না। এগুলোর ভেতরে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম আর লিথিয়ামের মতো ভয়ংকর ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ থাকে। যখন এসব জিনিস খোলা জায়গায় বা ভাগাড়ে ফেলে রাখা হয়, তখন এই বর্জ্যগুলো ধীরে ধীরে প্রকৃতিতে বিষ ছড়াতে শুরু করে। ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক এতটাই সুদূরপ্রসারী যে, এটি একটি পুরো এলাকার বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

ক্ষতিকর উপাদান ডিভাইসের কোথায় থাকে মানবদেহে যে রোগ ছড়ায়
সিসা (Lead) পুরনো মনিটর, সার্কিট বোর্ড, ব্যাটারি স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি, শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া
পারদ (Mercury) ফ্লুরোসেন্ট বাল্ব, বিভিন্ন সেন্সর ও সুইচ কিডনি ড্যামেজ, শ্বাসকষ্ট, ত্বকের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা
ক্যাডমিয়াম রিচার্জেবল ব্যাটারি, প্রিন্টারের কালি ফুসফুস ও লিভারের ক্ষতি, হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হওয়া
ব্রোমিনেটেড ফ্লেম রিটারডেন্ট তারের কভার, প্লাস্টিক কেসিং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট, থাইরয়েডের সমস্যা ও প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস

মাটি ও পানি দূষণে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

রোদের প্রচণ্ড তাপে বা বৃষ্টির পানিতে ভিজে গ্যাজেটের ভেতরের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থগুলো গলে সরাসরি মাটিতে মিশে যায়। এতে করে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ও অণুজীব চিরতরে নষ্ট হয়। বৃষ্টির পানির সাথে ধুয়ে এই বিষাক্ত কেমিক্যালগুলো চলে যায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে অথবা পুকুর ও নদীর পানিতে। সেই দূষিত পানি যখন কৃষিকাজে ব্যবহার করা হয় বা সেই নদীর মাছ আমরা খাই, তখন বিষ সরাসরি ঢুকে পড়ে আমাদের খাদ্যচক্রে।

মানবদেহে সরাসরি বিষক্রিয়া ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভাঙারি ব্যবসায়ীরা সার্কিট বোর্ড থেকে সামান্য পরিমাণ তামা বা সোনা বের করার জন্য সেগুলো খোলা জায়গায় আগুনে পোড়ায় বা এসিডে ভেজায়। প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল পোড়া সেই বিষাক্ত ধোঁয়া আমরা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করি। ফলে হাঁপানি, ফুসফুসের ক্যান্সার থেকে শুরু করে মারাত্মক সব ক্রনিক রোগ আমাদের শরীরে বাসা বাঁধে।

শিশু ও গর্ভবতী নারীদের ওপর প্রভাব

ই-বর্জ্যের বিষাক্ত রাসায়নিকের সবচেয়ে বড় শিকার হয় শিশুরা এবং গর্ভবতী নারীরা। সিসা ও পারদ সরাসরি ভ্রূণের বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। যেসব এলাকায় ই-বর্জ্য পোড়ানো হয়, সেখানকার শিশুদের মধ্যে জন্মগত ত্রুটি, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধকতা এবং শ্বাসকষ্টের হার অন্যান্য এলাকার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দেখা যায়।

বিশ্বজুড়ে ই-বর্জ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যান ঘাঁটলে এই সমস্যার ভয়াবহতা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটরের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের মাত্র ১৭% থেকে ২০% আনুষ্ঠানিকভাবে সঠিকভাবে রিসাইকেল করা হয়। বাকি প্রায় ৮০% বর্জ্যই ডাস্টবিন, ভাগাড় কিংবা নদী-নালায় গিয়ে পড়ে, যা পরিবেশের জন্য এক অশনিসংকেত।

অঞ্চল বা দেশ বর্জ্য তৈরির পরিমাণ (বার্ষিক) মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদন
এশিয়া (সামগ্রিক) প্রায় ২৫ মিলিয়ন টন ৫.৬ কেজি
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭ মিলিয়ন টন ২১ কেজি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ১২ মিলিয়ন টন ১৬ কেজি
আফ্রিকা প্রায় ৩ মিলিয়ন টন ২.৫ কেজি

কোন দেশগুলো বেশি বর্জ্য তৈরি করছে?

উন্নত দেশগুলো মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি বর্জ্য তৈরি করে। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার তাদের লাইফস্টাইলের অংশ। কিন্তু নিজেদের পরিবেশ ঠিক রাখতে তারা অত্যন্ত কঠোর আইন মেনে চলে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রচুর অর্থ ব্যয় করে।

অবৈধ ই-বর্জ্য পাচার (Illegal E-waste trafficking)

আশ্চর্যের বিষয় হলো, উন্নত দেশগুলো অনেক সময় তাদের বাতিল হওয়া গ্যাজেটগুলো ‘সেকেন্ড হ্যান্ড পণ্য’ বা ‘চ্যারিটি’র নাম করে উন্নয়নশীল দেশে পাঠিয়ে দেয়। ফলে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো, যেমন— ঘানা, নাইজেরিয়া, ভারত ও বাংলাদেশ, ধীরে ধীরে উন্নত বিশ্বের ই-বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক বাসেল কনভেনশন (Basel Convention) আইনের সরাসরি লঙ্ঘন হলেও কাস্টমসের ফাঁকফোকর দিয়ে এই অবৈধ পাচার বেড়েই চলেছে।

ইলেক্ট্রনিক্স রিসাইকেল করা কেন অপরিহার্য এবং এর অর্থনৈতিক দিক

অনেকেই ভাবেন ইলেক্ট্রনিক্স রিসাইকেল করা শুধু পরিবেশ রক্ষার খাতিরেই করা দরকার। এটি আংশিক সত্য। এর পেছনে বিশাল এক অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও লুকিয়ে আছে। ই-বর্জ্য ব্যবসা এখন সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসাগুলোর একটি।

পুরনো গ্যাজেট ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া মানে আক্ষরিক অর্থেই টাকা ময়লায় ফেলে দেওয়া। কারণ এগুলোর ভেতরে অত্যন্ত দামি ধাতু লুকিয়ে থাকে।

রিসাইক্লিংয়ের ক্ষেত্র অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা
প্রাকৃতিক সম্পদ সাশ্রয় পুরনো ডিভাইস থেকে সোনা, রুপা ও তামা উদ্ধার করে পুনরায় ব্যবহার।
এনার্জি বা শক্তি সাশ্রয় নতুন ধাতু উত্তোলনের চেয়ে রিসাইকেল করা ধাতু প্রক্রিয়াজাত করতে অনেক কম বিদ্যুৎ লাগে।
দূষণ প্রতিরোধ বিষাক্ত কেমিক্যাল মাটি ও পানিতে মেশা থেকে ঠেকানো সম্ভব হয়।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি সংগ্রহ, বাছাই এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে লাখ লাখ মানুষের নতুন চাকরির সুযোগ।

আরবান মাইনিং এবং অর্থনীতির নতুন দুয়ার

একটি সাধারণ স্মার্টফোনের সার্কিট বোর্ডে খনি থেকে তোলা সাধারণ এক টন পাথরের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ সোনা, রুপা, প্যালাডিয়াম ও তামা থাকে। একে বলা হয় ‘আরবান মাইনিং’ (Urban Mining) বা শহরের খনি। নতুন করে খনি খুঁড়ে এই ধাতুগুলো বের করতে যে বিপুল পরিমাণ খরচ, জনবল ও পরিবেশের ক্ষতি হয়, তার চেয়ে পুরনো গ্যাজেট থেকে এগুলো উদ্ধার করা অনেক বেশি লাভজনক।

বৃত্তাকার অর্থনীতি (Circular Economy) তৈরি

রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে আমরা লিনিয়ার ইকোনমি (তৈরি করো, ব্যবহার করো, ফেলে দাও) থেকে বের হয়ে সার্কুলার বা বৃত্তাকার অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে পারি। এর মানে হলো, একটি পণ্যের মেয়াদ শেষ হলে তার ভেতরের উপাদানগুলো দিয়ে আবার নতুন পণ্য তৈরি হবে। এতে করে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমবে এবং বর্জ্য বলে আর কিছু থাকবে না।

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ: আইন ও বাস্তবতা

বাংলাদেশে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে ই-বর্জ্যের পরিমাণও রকেটের গতিতে বাড়ছে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে এবং এর পরিমাণ প্রতি বছর ২০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার চিত্রটি বেশ হতাশাজনক।

ব্যবস্থাপনার দিক বর্তমান অবস্থা ও করণীয়
সরকারি আইন ২০২১ সালের ‘ই-বর্জ্য বিধিমালা’ থাকলেও মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ ধীরগতিতে হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপ বাড়ি থেকে ই-বর্জ্য সংগ্রহ করছে, তবে তা অপর্যাপ্ত।
জনসচেতনতা সাধারণ মানুষ এখনও পুরনো ফোন ড্রয়ারে জমিয়ে রাখে বা সাধারণ ভাঙারিওয়ালাকে দেয়।
ইনফরমাল সেক্টর শিশু ও নারী শ্রমিকরা কোনো সুরক্ষা ছাড়াই খোলা হাতে বর্জ্য ভাঙার কাজ করছে।

আইন ও নীতিমালার প্রয়োগ

বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালে ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ প্রণয়ন করেছে। এই আইন অনুযায়ী, যারা ইলেক্ট্রনিক পণ্য উৎপাদন বা আমদানি করবে, তাদেরকেই নষ্ট পণ্য ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা (EPR – Extended Producer Responsibility) করতে হবে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং কোম্পানিগুলোর অনীহার কারণে এই আইনের পুরোপুরি প্রয়োগ এখনও সম্ভব হচ্ছে না।

ইনফরমাল সেক্টরের ঝুঁকি

আমাদের দেশে বেশিরভাগ ই-বর্জ্য চলে যায় ঢাকার নিমতলী, ধোলাইখাল বা এলিফ্যান্ট রোডের মতো এলাকার ভাঙ্গারি দোকানগুলোতে। সেখানে কোনো ধরনের গ্লাভস বা মাস্ক ছাড়াই শিশু ও শ্রমিকরা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে সার্কিট ভাঙে বা খোলা আগুনে পোড়ায়। এটি তাদের স্বাস্থ্য এবং ওই এলাকার বাতাসের মান মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে।

কর্পোরেট ও অফিস পর্যায়ে ই-বর্জ্য কমানোর উপায়

একটি অফিসের আইটি ডিপার্টমেন্ট থেকে এক বছরে যে পরিমাণ ই-বর্জ্য তৈরি হয়, তা একটি সাধারণ পাড়ার কয়েক বছরের বর্জ্যের সমান। তাই প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ই-বর্জ্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি।

উদ্যোগের ধরন কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন
ইকো-ফ্রেন্ডলি প্রকিউরমেন্ট দীর্ঘস্থায়ী এবং সহজে মেরামতযোগ্য ব্যান্ডের ল্যাপটপ ও আইটি সামগ্রী কেনা।
ই-ওয়েস্ট বিন স্থাপন অফিসের প্রতিটি ফ্লোরে শুধু ব্যাটারি, কেবল ও নষ্ট গ্যাজেট ফেলার জন্য আলাদা বিন রাখা।
প্রফেশনাল রিসাইক্লিং চুক্তি মেয়াদোত্তীর্ণ আইটি সামগ্রী নিলামে না তুলে স্বীকৃত রিসাইক্লিং এজেন্সিকে দেওয়া।
কর্মীদের প্রশিক্ষণ ডাটা সিকিউরিটি এবং গ্যাজেট দীর্ঘকাল ব্যবহারের নিয়মাবলি নিয়ে সেমিনার করা।

ইকো-ফ্রেন্ডলি আইটি পলিসি

প্রতিটি কোম্পানির উচিত একটি সুনির্দিষ্ট আইটি পলিসি তৈরি করা। সামান্য স্লো হয়ে গেলেই ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ বাতিল না করে এর র‍্যাম (RAM) বা এসএসডি (SSD) আপগ্রেড করে আয়ু বাড়ানো যায়। এছাড়া ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহারে জোর দিলে ফিজিক্যাল হার্ডড্রাইভ বা সার্ভারের প্রয়োজনীয়তা এবং বর্জ্য দুটোই কমে যায়।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিরাপদে ইলেক্ট্রনিক্স রিসাইকেল করার কার্যকরী উপায়

Safe Electronics Recycling

ইচ্ছা থাকলেও সাধারণ মানুষ অনেক সময় জানেন না ঠিক কোথায় এবং কীভাবে ই-বর্জ্য জমা দিতে হয়। রাস্তায় বা সাধারণ ডাস্টবিনে গৃহস্থালি ময়লার সাথে এগুলো ফেলা পুরোপুরি বেআইনি ও ক্ষতিকর। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট ধাপ মেনে চলতে হবে।

রিসাইক্লিং পদ্ধতি কীভাবে এবং কোথায় করবেন
ব্র্যান্ডের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম স্যামসাং, অ্যাপল বা লোকাল শোরুমে পুরনো ফোন জমা দিয়ে ডিসকাউন্টে নতুন কেনা।
কালেকশন সেন্টার সিটি কর্পোরেশন বা পরিবেশ নিয়ে কাজ করা এনজিওর নির্দিষ্ট বক্সে জমা দেওয়া।
আপসাইক্লিং বা নতুন ব্যবহার পুরনো স্মার্টফোনকে সিসিটিভি বা ড্যাশক্যাম হিসেবে ব্যবহার করা।
ডোনেশন বা দান করা সচল ল্যাপটপ বা ফোনটি কোনো সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী বা স্কুলে দিয়ে দেওয়া।

রিসাইকেল করার আগে ডাটা মুছে ফেলার সঠিক নিয়ম

ডিভাইস হাতছাড়া করার আগে অবশ্যই গুগল ড্রাইভ বা পেনড্রাইভে ডাটা ব্যাকআপ নিন। এরপর ম্যানুয়ালি সব একাউন্ট (জিমেইল, ফেসবুক, অ্যাপল আইডি) লগআউট করুন। সেটিংসে গিয়ে ‘Encrypt Phone’ চালু করে ফ্যাক্টরি ডাটা রিসেট (Factory Data Reset) করুন। এতে আপনার ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য কেউ আর রিকভার করতে পারবে না। অবশ্যই সিম এবং মেমোরি কার্ড খুলে নিতে ভুলবেন না।

আপসাইক্লিং বা পুরনো গ্যাজেটের নতুন ব্যবহার

সব পুরনো জিনিসই ফেলে দেওয়ার জন্য নয়। আপনার পুরনো ট্যাবলেটটি কিচেনে রেসিপি দেখার জন্য বা স্মার্টহোম কন্ট্রোলার হিসেবে দেয়ালে আটকে রাখতে পারেন। পুরনো ল্যাপটপের স্ক্রিন ঠিক থাকলে তা খুলে পোর্টেবল মনিটর বানানো যায়। একটু সৃজনশীল হলে পুরনো গ্যাজেট দিয়ে দারুণ সব কাজ করা সম্ভব।

শেষ কথা

প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনকে অভাবনীয়ভাবে সহজ ও গতিশীল করেছে। কিন্তু এর ফেলে দেওয়া বা বাতিল অংশগুলোই আজ আমাদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় নীরব সংকট তৈরি করছে। ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আমরা যদি এখনই সোচ্চার ও সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি রোগবালাই পূর্ণ, অনুর্বর ও বিষাক্ত পৃথিবী রেখে যেতে হবে। তাই আজ থেকেই একটি সিদ্ধান্ত নিন— পুরনো ইলেক্ট্রনিক্স যত্রতত্র বা সাধারণ ডাস্টবিনে ফেলা বন্ধ করুন। কোনো কিছু নষ্ট হলেই চট করে তা ফেলে দিয়ে নতুন কেনার আগে মেরামতের সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন। ব্যবহারের পর সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে তা রিসাইকেল করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনার আমার একটু সচেতনতা আর সম্মিলিত সদিচ্ছাই পারে আমাদের এই সুন্দর পরিবেশ ও বাসযোগ্য পৃথিবীকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সুরক্ষিত রাখতে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. ই-বর্জ্য পুরোপুরি মাটিতে মিশতে কতদিন সময় লাগে?

ইলেক্ট্রনিক বর্জ্যের বেশিরভাগ অংশই গ্লাস, বিভিন্ন ধাতু, ফাইবার এবং হেভি ডিউটি প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। এগুলো পুরোপুরি মাটিতে মিশতে কয়েক শত থেকে কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট ধরণের প্লাস্টিক কখনোই পচে না, বরং মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়ে আমাদের নদী ও খাদ্যচক্রে ঢুকে যায়।

২. সাধারণ ভাঙারি দোকানে কি পুরনো মোবাইল বা চার্জার বিক্রি করা নিরাপদ?

না, এটি আপনার পরিবেশ এবং ওই দোকান কর্মচারীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সাধারণ ভাঙারি ব্যবসায়ীরা তামা বা লোহা দ্রুত বের করার জন্য সার্কিট বোর্ড আগুনে পোড়ায়। এরপর বাকি ক্ষতিকর বিষাক্ত অংশগুলো ড্রেনে বা খোলা জায়গায় ফেলে দেয়, যা সোজা নদীতে গিয়ে মেশে।

৩. পুরনো মোবাইল বা ল্যাপটপ থেকে কি সত্যিই সোনা পাওয়া যায়?

হ্যাঁ, এটি পুরোপুরি সত্য। মাদারবোর্ড, প্রসেসর বা র‍্যামের পিনগুলোতে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সুবিধার জন্য সামান্য পরিমাণ সোনা, রুপা ও প্যালাডিয়াম ব্যবহার করা হয় (যেহেতু সোনা বিদ্যুতের চমৎকার সুপরিবাহী এবং এতে মরিচা ধরে না)। বাণিজ্যিকভাবে লাখ লাখ ফোন একসঙ্গে অত্যাধুনিক কারখানায় রিসাইকেল করে এই মূল্যবান ধাতুগুলো আবার সংগ্রহ করা হয়।

৪. ব্যাটারি লিক হয়ে গেলে বা ফুলে গেলে কী করা উচিত?

মোবাইল বা রিমোটের লিথিয়াম ব্যাটারি ফুলে গেলে বা লিক হয়ে সাদা পাউডারের মতো রাসায়নিক বের হলে তা কখনোই খালি হাতে ধরবেন না। হাতে গ্লাভস পরে ব্যাটারিটি একটি শুকনো পলিথিন বা জিপলক ব্যাগে আটকে রাখুন। এটি সাধারণ ডাস্টবিনে না ফেলে নির্দিষ্ট ই-বর্জ্য বক্সে দিন, কারণ লিথিয়াম ব্যাটারি সাধারণ ময়লার সাথে ঘষা খেলে আগুন লাগার বা বিস্ফোরণের চরম ঝুঁকি থাকে।

৫. আমার পুরনো ল্যাপটপটি খুব স্লো হয়ে গেছে, এটি কি ফেলে দেওয়া উচিত?

ফেলে দেওয়ার আগে এর স্পিড বাড়ানোর চেষ্টা করুন। মেকানিকের কাছে গিয়ে পুরনো হার্ডডিস্ক বদলে একটি এসএসডি (SSD) লাগান এবং র‍্যাম (RAM) বাড়িয়ে নিন। ল্যাপটপ নতুনের মতো ফাস্ট হয়ে যাবে। যদি একান্তই ব্যবহারের অনুপযোগী হয় বা মাদারবোর্ড নষ্ট হয়, তবে এটি কোনো স্বীকৃত রিসাইক্লিং সেন্টারে দিন অথবা এর ভালো পার্টসগুলো (যেমন- স্ক্রিন, কিবোর্ড) টেকনিশিয়ানের কাছে বিক্রি করে দিন যেন অন্য কেউ তার ডিভাইসে লাগাতে পারে।

৬. স্মার্টফোন কতদিন ব্যবহার করা উচিত যাতে বর্জ্য কমে?

একটি ভালো মানের স্মার্টফোন অন্তত ৩ থেকে ৪ বছর অনায়াসে ব্যবহার করা যায়। ঘন ঘন ট্রেন্ডের কারণে ফোন না বদলে, ব্যাটারি লাইফ কমে গেলে শুধু ব্যাটারিটি রিপ্লেস করে নিন। এতে আপনার টাকাও বাঁচবে এবং পরিবেশও রক্ষা পাবে।

সর্বশেষ