১৭ জুলাই: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমন কিছু নির্দিষ্ট দিন চোখে পড়ে, যা মানব সভ্যতার গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। পুরনো বিশ্বের সমাপ্তি এবং নতুন এক যুগের সূচনার এমনই এক অসাধারণ সন্ধিক্ষণ হলো ১৭ই জুলাই। বিংশ শতাব্দীর মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক পরাক্রমশালী রাজবংশের পতন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি বিচারের গোড়াপত্তন এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভাগ্য নির্ধারণকারী আধুনিক গণঅভ্যুত্থান—এই দিনের ঘটনাগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতিধ্বনিত হয়ে আসছে।

একজন ইতিহাসবিদ, সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী এবং আর্কাইভিস্টের দৃষ্টিকোণ থেকে ১৭ই জুলাইয়ের এই বিস্তৃত ও গভীর আলোচনায় আপনাকে স্বাগত। আপনি যদি ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী হন, সাধারণ জ্ঞানের খোঁজ রাখেন অথবা বৈশ্বিক সংস্কৃতির ছাত্র হন—তবে এই বিস্তারিত নির্দেশিকাটি আপনাকে বাঙালি বলয়, আন্তর্জাতিক ছুটির দিন, বৈশ্বিক মাইলফলক এবং এই ঐতিহাসিক দিনে জন্ম ও মৃত্যুবরণকারী বিশিষ্ট মানুষদের জীবনের এক অসাধারণ যাত্রায় নিয়ে যাবে।

বাঙালি বলয় ও ভারতীয় উপমহাদেশ

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে গঠিত বাংলাভাষী অঞ্চল তথা পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের রয়েছে এক গভীর ও সুদীর্ঘ ইতিহাস। এই অঞ্চলে ১৭ই জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে সার্বভৌমত্বের লড়াই, নিজস্ব পরিচয়ের প্রতি তীব্র আবেগ এবং প্রতিবাদের এক অদম্য চেতনা ফুটে ওঠে।

ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

  • ১৪৮৯: লোদী রাজবংশের পালাবদল

    বহলুল খান লোদীর পর সিকান্দার লোদী দিল্লির সুলতান হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার শাসনামলে দিল্লি সালতানাতের সীমানা ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল বাংলার পশ্চিম সীমান্তসহ পুরো উপমহাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে।

  • ২০০০: পাটনা বিমান দুর্ঘটনা

    ভারতের পাটনায় একটি আবাসিক এলাকায় অ্যালায়েন্স এয়ারের ফ্লাইট ৭৪১২ বিধ্বস্ত হয়ে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৬০ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর ফলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বিমান চলাচলের নিরাপত্তা মান এবং অবকাঠামো নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের তদন্ত ও সতর্কতা শুরু হয়।

  • ২০২৪: বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থান

    আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৭ই জুলাই এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মোড় ঘোরানো দিন। বৈষম্যবিরোধী কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে এক দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে এই দিনে পরিস্থিতি এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভের মুখে সরকার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীদের বলপ্রয়োগ করে বের করে দেওয়া হয়। প্রশাসনের এই আক্রমণাত্মক ও দমনমূলক সিদ্ধান্তটিই মূলত এই আন্দোলনের দাবানলকে আরও উসকে দেয়। এর ফলে পরবর্তী দিনগুলোতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে এক বিশাল অসহযোগ আন্দোলনের রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন নিশ্চিত করে।

বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্ম

নাম জন্মসাল পেশা ও অবদান
মোহাম্মদ হাবিব ১৯৪৯ হায়দ্রাবাদে জন্মগ্রহণকারী এই ফুটবল কিংবদন্তি কলকাতার ময়দানে ‘বড়ে মিয়া’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান এবং মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে খেলেছেন। ১৯৭৭ সালে পেলের নিউইয়র্ক কসমসের বিপক্ষে তার বিখ্যাত গোলটি আজও স্মরণীয়। তিনি ভারতের মর্যাদাপূর্ণ ‘অর্জুন পুরস্কার’ লাভ করেন।

বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের প্রয়াণ

নাম মৃত্যুসাল অবদান ও তাৎপর্য
ইউ তিরোত সিং সিয়েম ১৮৩৫ অ্যাংলো-খাসি যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা এক কিংবদন্তি খাসি নেতা। শেষ পর্যন্ত বন্দিদশায় বাংলাদেশের ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে তার এই অকুতোভয় সংগ্রাম উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
ডাঃ এম. এস. ভলিয়াথন ২০২৪ বিশ্বখ্যাত ভারতীয় কার্ডিয়াক সার্জন, যার যুগান্তকারী গবেষণা ও কাজ ভারতে নিজস্ব প্রযুক্তিতে চিকিৎসাসরঞ্জাম (বিশেষ করে ‘চিত্রা হার্ট ভালভ’) তৈরির ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

সংস্কৃতি ও উৎসব

  • ইউ তিরোত সিং দিবস: ভারতের মেঘালয় রাজ্যে এই দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে খাসি নেতা ইউ তিরোত সিংয়ের বীরত্ব, আত্মত্যাগ এবং আদিবাসী প্রতিরোধকে সম্মান জানাতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে দিনটি পালন করা হয়। তার স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিন

আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিনসমূহ

মানবাধিকার, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে ১৭ই জুলাই বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালিত হয়।

  • বিশ্ব আন্তর্জাতিক বিচার দিবস (World Day for International Justice): আন্তর্জাতিক ফৌজদারি বিচার দিবস হিসেবেও পরিচিত এই দিনটি ১৯৯৮ সালের ১৭ই জুলাই ‘রোম সংবিধি’ (Rome Statute) গ্রহণের স্মৃতি বহন করে। এই চুক্তির মাধ্যমেই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (ICC) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি বিশ্বের প্রথম স্থায়ী আন্তর্জাতিক বিচারিক সংস্থা, যা গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের মতো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা রাখে।

  • বিশ্ব ইমোজি দিবস (World Emoji Day): একটু হালকা মেজাজের সংস্কৃতির কথা বললে, বিশ্বজুড়ে ১৭ই জুলাই পালিত হয় ‘বিশ্ব ইমোজি দিবস’ হিসেবে। ইমোজিপিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জেরেমি বার্জ ২০১৪ সালে এই ডিজিটাল ছুটির দিনটির সূচনা করেন। এর পেছনের কারণটি খুবই মজার—অ্যাপলের আসল আইওএস (iOS) ডিজাইনে ক্যালেন্ডার ইমোজিতে (📅) এই ১৭ই জুলাই তারিখটিই লেখা থাকে! ভাষাগত বাধা পেরিয়ে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, এটি তারই এক আনন্দদায়ক উদযাপন।

  • সংবিধান দিবস, দক্ষিণ কোরিয়া (Constitution Day): স্থানীয়ভাবে ‘জেহওনজোল’ (Jeheonjeol) নামে পরিচিত এই জাতীয় দিবসটি ১৯৪৮ সালের ১৭ই জুলাই দক্ষিণ কোরিয়ার সংবিধান প্রবর্তনের দিনটিকে স্মরণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক ‘রিপাবলিক অফ কোরিয়া’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি ছিল প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

  • স্লোভাক প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা দিবস: ১৯৯২ সালের এই দিনে স্লোভাক ন্যাশনাল কাউন্সিল স্লোভাক প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের মাধ্যমেই চেকোস্লোভাকিয়া শান্তিপূর্ণভাবে ভেঙে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথ সুগম হয়।

  • রাজার জন্মদিন, লেসোথো: আফ্রিকার দেশ লেসোথোতে এটি একটি সরকারি ছুটির দিন, যা তাদের বর্তমান রাজা তৃতীয় লেটসিয়ের (King Letsie III) জন্মদিন উপলক্ষে পালিত হয়।

বৈশ্বিক ইতিহাস

১৭ই জুলাইয়ের আসল ব্যপ্তি বুঝতে হলে আমাদের মহাদেশ থেকে মহাদেশে এবং শত শত বছর পেছনে ফিরে যেতে হবে। এই দিনের ঘটনাগুলো মানচিত্রের সীমানা নতুন করে এঁকেছে, নাগরিক অধিকারের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে এবং প্রযুক্তির সীমানাকে অসীম পর্যন্ত প্রসারিত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র: ট্র্যাজেডি, বিনোদনের জাদু এবং এভিয়েশন

  • ১৯৪৪ (মানবাধিকার ও ট্র্যাজেডি): ক্যালিফোর্নিয়ার পোর্ট শিকাগো বিপর্যয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডিগুলোর একটি। বিস্ফোরক বোঝাই করার সময় জাহাজে বিস্ফোরণ ঘটে ৩২০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। যেহেতু তখন শ্রমব্যবস্থায় কঠোর বর্ণবাদ ছিল, তাই নিহতদের মধ্যে ২০০ জনেরও বেশি ছিলেন আফ্রিকান-আমেরিকান নাবিক। অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানো নাবিকদের পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়ায় তৎকালীন চরম বর্ণবৈষম্য উন্মোচিত হয়, যা পরবর্তীতে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীতে বর্ণবাদ অবসানের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।

  • ১৯৫৫ (সংস্কৃতি ও বিনোদন): ওয়াল্ট ডিজনি ক্যালিফোর্নিয়ার আনাহেইমে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডিজনিস্যান্ড’ (Disneyland)-এর দরজা খুলে দেন। “পৃথিবীর সবচেয়ে সুখের জায়গা” হিসেবে পরিচিত এই থিম পার্কটি বিশ্বব্যাপী বিনোদন শিল্পে এক অভাবনীয় বিপ্লব এনেছিল।

  • ১৯৮৯ (এভিয়েশন ও প্রযুক্তি): নর্থরপ গ্রুমম্যান বি-২ স্পিরিট স্টিলথ বোম্বার (Northrop Grumman B-2 Spirit Stealth Bomber) এই দিনে তার প্রথম পাবলিক টেস্ট ফ্লাইট সম্পন্ন করে। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে উড্ডয়ন করা বাদুড়ের ডানার মতো দেখতে এই অত্যাধুনিক বিমানটি রাডার ফাঁকি দেওয়ার এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি প্রদর্শন করে, যা আধুনিক সামরিক এভিয়েশনের চেহারা চিরতরে বদলে দেয়।

রাশিয়া: একটি সাম্রাজ্যের পতন

  • ১৯১৮ (রাজনীতি ও বিপ্লব): বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সবচেয়ে ভাগ্য-নির্ধারণকারী ও রক্তক্ষয়ী এক রাতে রোমানভ রাজবংশের শেষ সম্রাট জার দ্বিতীয় নিকোলাসকে তার স্ত্রী সম্রাজ্ঞী আলেকজান্দ্রা, তাদের পাঁচ সন্তান এবং অনুগত পরিচারকদের সাথে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ইয়েকাটেরিনবার্গ শহরের ইপাতিভ হাউসে বন্দি অবস্থায় বলশেভিক বিপ্লবীরা তাদের গুলি করে হত্যা করে। এই নির্মম ঘটনার মধ্য দিয়ে রাশিয়ান সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রের ক্ষমতা সুসংহত হয়।

ইউরোপ: যুদ্ধ, চুক্তি এবং যুদ্ধোত্তর স্থাপত্য

  • ১৪৫৩ (শতবর্ষের যুদ্ধ): এই দিনে কাস্টিলনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিরা এক চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে। ইতিহাসে এটি শতবর্ষের যুদ্ধের (The Hundred Years’ War) শেষ লড়াই হিসেবে স্বীকৃত। এটি ইউরোপের ইতিহাসের প্রথম দিকের এমন একটি যুদ্ধ ছিল, যেখানে আর্টিলারি বা কামান এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।

  • ১৯৪৫ (যুদ্ধোত্তর রাজনীতি): জার্মানিতে ঐতিহাসিক পটসডাম সম্মেলন শুরু হয়। মিত্রবাহিনীর “বিগ থ্রি” নেতা—মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল (যিনি পরবর্তীতে ক্লিমেন্ট অ্যাটলির দ্বারা প্রতিস্থাপিত হন) এবং সোভিয়েত প্রিমিয়ার জোসেফ স্তালিন—পরাজিত নাৎসি জার্মানির প্রশাসন পরিচালনা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা চূড়ান্ত করতে একত্রিত হয়েছিলেন।

অস্ট্রেলিয়া: গতির সীমানা জয়

  • ১৯৬৪ (রেকর্ড): ব্রিটিশ স্পিডস্টার ডোনাল্ড ক্যাম্পবেল দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার লেক আয়ারের জনশূন্য সল্ট ফ্ল্যাটে জেট-চালিত, চার চাকার যানের সাহায্যে ৪০৩.১০ মাইল প্রতি ঘণ্টা (৬৪৮.৭৩ কিমি/ঘণ্টা) গতির এক বিস্ময়কর ল্যান্ড স্পিড রেকর্ড গড়েন।

বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত: নৃবিজ্ঞান এবং ভূ-রাজনীতি

  • ১৯৫৯ (নৃবিজ্ঞান – তানজানিয়া): ওল্ডুভাই গর্জে (Olduvai Gorge) প্যালিওনৃবিজ্ঞানী মেরি লিকি একটি প্রাচীন হোমিনিনের জীবাশ্মযুক্ত মাথার খুলি আবিষ্কার করেন। তিনি প্রাথমিকভাবে এর নাম দিয়েছিলেন জিনজানথ্রোপাস (যাকে পরে প্যারানথ্রোপাস বোসেই হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়)। পূর্ব আফ্রিকায় আদিম হোমিনিনদের বিবর্তনের টাইমলাইনের ক্ষেত্রে এই আবিষ্কারটি ছিল এক বিশাল মাইলফলক।

  • ১৯৭৬ (ভূ-রাজনীতি – ইন্দোনেশিয়া/পূর্ব তিমুর): ইন্দোনেশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ব তিমুরকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে এবং দেশটিকে তাদের ২৭তম প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে। পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই শুরু হওয়া আট মাসব্যাপী সামরিক আগ্রাসনের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল এটি। ২০০২ সালে পূর্ব তিমুর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব অর্জনের আগ পর্যন্ত কয়েক দশক ধরে সেখানে সহিংস সংঘাত এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন চলতে থাকে।

বিশ্বের বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু

১৭ই জুলাই যেমন অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষের জন্ম দিয়েছে, তেমনি অনেক আইকনিক ব্যক্তিত্বকে বিদায়ও জানিয়েছে। নিচে বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারকারী কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির তালিকা দেওয়া হলো।

১৭ই জুলাই জন্ম নেওয়া বিখ্যাত ব্যক্তিরা

নাম জন্মসাল জাতীয়তা পেশা ও অবদান
অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ১৯৫৪ জার্মান আধুনিক ভূ-রাজনীতির এক বিশাল ব্যক্তিত্ব। তিনি জার্মানির ৮ম চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অঘোষিত অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হন।
ডোনাল্ড সাদারল্যান্ড ১৯৩৫ কানাডিয়ান অত্যন্ত বহুমুখী এবং প্রশংসিত অভিনেতা। ‘MAS*H’, ‘Ordinary People’, এবং ‘The Hunger Games’-এর মতো সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি চলচ্চিত্রে রাজত্ব করেছেন।
রানি ক্যামিলা ১৯৪৮ ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের রানি এবং রাজা তৃতীয় চার্লসের স্ত্রী। তিনি সাক্ষরতা এবং অস্টিওপরোসিস বিষয়ক বিভিন্ন দাতব্য কাজের সাথে গভীরভাবে যুক্ত।
ডেভিড হাসেলহফ ১৯৫২ আমেরিকান ‘Knight Rider’ এবং ‘Baywatch’-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় টেলিভিশন শোতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি বিশ্বব্যাপী পপ কালচার আইকনে পরিণত হন।
ল্যুক ব্রায়ান ১৯৭৬ আমেরিকান মাল্টি-প্লাটিনাম কান্ট্রি মিউজিক গায়ক এবং গীতিকার। অসংখ্য নাম্বার ওয়ান হিট গানের পাশাপাশি তিনি ‘আমেরিকান আইডল’-এর দীর্ঘস্থায়ী বিচারক হিসেবে পরিচিত।
গিজার বাটলার ১৯৪৯ ব্রিটিশ কিংবদন্তি হেভি মেটাল ব্যান্ড ‘ব্ল্যাক সাবাথ’ (Black Sabbath)-এর বেজিস্ট এবং প্রধান গীতিকার। হেভি মেটাল সঙ্গীতের সাউন্ড এবং নান্দনিকতা তৈরিতে তার অবদান অনস্বীকার্য।

১৭ই জুলাই মৃত্যুবরণকারী বিখ্যাত ব্যক্তিরা

নাম মৃত্যুসাল জাতীয়তা অবদান ও মৃত্যুর কারণ
জন কোলট্রেন ১৯৬৭ আমেরিকান বিংশ শতাব্দীর সঙ্গীতের এক অবিসংবাদিত জ্যাজ স্যাক্সোফোনিস্ট ও সুরকার, যিনি আধ্যাত্মিক জ্যাজের পথিকৃৎ ছিলেন। লিভার ক্যান্সারে মাত্র ৪০ বছর বয়সে তার অকাল মৃত্যু হয়।
বিলি হলিডে ১৯৫৯ আমেরিকান “লেডি ডে” নামে পরিচিত এই অগ্রগামী জ্যাজ ও সুইং গায়িকা তার গভীর আবেগপূর্ণ কণ্ঠের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। লিভার সিরোসিসে ৪৪ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
অ্যাডাম স্মিথ ১৭৯০ স্কটিশ আধুনিক অর্থনীতির জনক হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Wealth of Nations’ মুক্তবাজার পুঁজিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
টাই কব ১৯৬১ আমেরিকান বেসবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের একজন, যিনি তার ক্যারিয়ারে মেজর লিগের ডজনখানেক রেকর্ড গড়েছিলেন। ৭৪ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ক্যাথরিন গ্রাহাম ২০০১ আমেরিকান ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর দাপুটে প্রকাশক। পেন্টাগন পেপার্স এবং ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির মতো ঘটনার সময় সাহসিকতার সাথে পত্রিকা পরিচালনা করে তিনি আমেরিকান সাংবাদিকতার ইতিহাস চিরতরে বদলে দেন।
জন লুইস ২০২০ আমেরিকান কিংবদন্তি নাগরিক অধিকার নেতা এবং মার্কিন কংগ্রেসম্যান। জাতিগত সমতার লড়াইয়ে আজীবন কাজ করেছেন এবং ডক্টর মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিল করেছেন। ৮০ বছর বয়সে প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারে তার মৃত্যু হয়।

“আপনি কি জানতেন?” – কিছু অজানা তথ্য

আপনার পরবর্তী আড্ডায় আলোচনা জমানোর জন্য ১৭ই জুলাইয়ের কিছু চমকপ্রদ ও অজানা তথ্য এখানে দেওয়া হলো:

  • দুর্ঘটনাবশত আটলান্টিক পাড়ি (“রং ওয়ে কোরিগান”): ১৯৩৮ সালের ১৭ই জুলাই ডগলাস কোরিগান নামের এক আমেরিকান বৈমানিক নিউইয়র্কের ব্রুকলিন থেকে উড্ডয়ন করেন। তার ফ্লাইট প্ল্যান অনুযায়ী তার যাওয়ার কথা ছিল ক্যালিফোর্নিয়ায়। কিন্তু প্রায় ২৮ ঘণ্টা পর তিনি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে গিয়ে অবতরণ করেন! তিনি দাবি করেন যে কম্পাস ভুল পড়ার কারণে তার এই “নেভিগেশনাল ত্রুটি” হয়েছে। যদিও এভিয়েশন ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস, বারবার অনুমতি চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর তিনি চিরকালের জন্য “রং ওয়ে কোরিগান” (Wrong Way Corrigan) নামে পরিচিতি পান।

  • এয়ার কন্ডিশনারের জন্ম: আপনি যদি গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে শীতল ঘরে বসে এই লেখাটি পড়ে থাকেন, তবে আপনাকে উইলিস ক্যারিয়ারের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। ১৯০২ সালের ১৭ই জুলাই ক্যারিয়ার বিশ্বের প্রথম আধুনিক বৈদ্যুতিক এয়ার কন্ডিশনার ইউনিটের নকশা চূড়ান্ত করেছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, মানুষের আরাম দেওয়া তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল না! ব্রুকলিনের একটি প্রকাশনা সংস্থার রঙিন প্রিন্টিং প্রেসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে কালির বিন্যাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, মূলত সেই সমস্যা সমাধানের জন্যই এই যন্ত্রটি উদ্ভাবন করা হয়েছিল।

  • একটি ডিজিটাল কাকতালীয় ঘটনা (Calendar Coincidence): আপনি কি কখনও খেয়াল করেছেন যে বেশিরভাগ স্মার্ট ডিভাইসের সাধারণ ক্যালেন্ডার ইমোজিতে ১৭ই জুলাই তারিখটি দেখানো থাকে? এটি মোটেও কোনো কাকতালীয় বা এলোমেলো পছন্দ ছিল না। অ্যাপল ইচ্ছাকৃতভাবেই এই দিনটিকে বেছে নিয়েছিল, কারণ ২০০২ সালের ১৭ই জুলাই ম্যাকওয়ার্ল্ড এক্সপোতে তারা ম্যাক কম্পিউটারের জন্য তাদের বিখ্যাত “iCal” ক্যালেন্ডার অ্যাপ্লিকেশনটি সর্বপ্রথম প্রদর্শন করেছিল। অ্যাপলের এই ডিজিটাল ইস্টার এগটির কারণেই আজ আমরা ঠিক এই তারিখেই ‘বিশ্ব ইমোজি দিবস’ উদযাপন করি!

শেষ কথা

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে যখন আমরা ১৭ই জুলাইয়ে এসে দাঁড়াই, তখন এটি কেবলই গ্রীষ্মের মাঝামাঝি একটি সাধারণ দিন থাকে না; বরং এটি হয়ে ওঠে মানব অভিজ্ঞতার এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি। এই তারিখটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমাদের পৃথিবী কত দ্রুত বদলে যেতে পারে। এটি এমন একটি দিন, যেদিন শত বছরের পুরনো রাজবংশ ইতিহাসের পাতায় ধুলোয় মিশে গেছে, বাঙালি বলয়ের স্বাধীনতাকামী শিক্ষার্থী এবং নেতারা নিজেদের অধিকার ও সার্বভৌমত্বের জন্য বীরত্বের সাথে লড়াই করেছে এবং আন্তর্জাতিক ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবাধিকার রক্ষার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।

ডিজনিস্যান্ডের আনন্দের দরজা খুলে যাওয়া থেকে শুরু করে পোর্ট শিকাগোর চরম ট্র্যাজেডি, বি-২ বোম্বারের বৈপ্লবিক স্টিলথ প্রযুক্তি থেকে শুরু করে জন কোলট্রেনের অমর জ্যাজ সুর—১৭ই জুলাই আমাদের বৈশ্বিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল, মর্মান্তিক এবং অন্তহীন জটিল ক্যানভাসকে ধারণ করে আছে।

সর্বশেষ