ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি তারিখ কখনোই নিছক একটি সংখ্যা নয়; এটি অতীতের দিকে খুলে যাওয়া এক অনন্ত জানালা, যা পূর্ণ থাকে বিজয়, ট্র্যাজেডি, উদ্ভাবন আর বিপ্লবের নানা রোমাঞ্চকর গল্পে। ২৯ জুলাই তারিখটিও এর ব্যতিক্রম নয়। মহাশূন্যের পানে হাত বাড়ানো বিশাল সব প্রতিষ্ঠানের জন্ম থেকে শুরু করে শিল্প, রাজনীতি ও বিমান চলাচলের ইতিহাসকে নতুন রূপ দেওয়া যুগান্তকারী মানুষদের জন্ম—এই দিনটি মানব ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। আপনি ইতিহাসের অনুরাগী হোন, সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হোন, অথবা এই বিশ্ব সম্পর্কে কৌতূহলী একজন সাধারণ মানুষই হোন না কেন—২৯ জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর গভীরে ডুব দিলে আমাদের এই বৈশ্বিক ঐতিহ্যের এক অসাধারণ চিত্র আপনার চোখের সামনে ফুটে উঠবে।
আজকের এই লেখায় আমরা মহাদেশ থেকে মহাদেশে এবং শতক থেকে শতকে এক দীর্ঘ ভ্রমণ করব। আমরা বাঙালি বলয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সেই মোড় ঘোরানো মুহূর্তগুলো জানব, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবসগুলোর পেছনের গল্প খুঁজব এবং পশ্চিমা ও অপশ্চিমা বিশ্বে গভীর ছাপ ফেলে যাওয়া বৈশ্বিক ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করব। এক কাপ চা বা কফি হাতে নিয়ে আয়েশ করে বসুন, চলুন ঘুরে আসি ইতিহাসের পাতা থেকে—ঠিক কী ঘটেছিল এই ২৯ জুলাইয়ে?
বাঙালি বলয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশ: ইতিহাসের এক সমৃদ্ধ বুনন
সংস্কৃতি, ভাষা এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ক্যানভাস হলো ভারতীয় উপমহাদেশ। ২৯ জুলাই দিনটিতে এই অঞ্চলেও তৈরি হয়েছে যুগান্তকারী নানা ইতিহাস। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ থেকে শুরু করে প্রযুক্তির পথে বিশাল লাফ—এই অঞ্চলের অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য।
ঐতিহাসিক মাইলফলক
-
২০২৪ (বাংলাদেশ) – জুলাই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত রূপদান: বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এর চরম পর্যায়ে, ছাত্রনেতা এবং আন্দোলনকারীরা তাদের অসহযোগ আন্দোলন আরও তীব্রতর করে তোলেন এই সময়টায়। জুলাইয়ের শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, দেখতে দেখতে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ২৯ জুলাইয়ের এই উত্তাল দিনগুলোতে জেন-জি (Gen Z) বা প্রজন্মের তরুণদের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মোড় তৈরি করে। এই আন্দোলনই পরবর্তীতে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পথ প্রশস্ত করে, যাকে আজ বিশ্বের প্রথম সফল ‘জেন-জি বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
-
১৯১১ (ভারত/বাংলা) – মোহনবাগানের ঐতিহাসিক জয়: খেলাধুলার গণ্ডি পেরিয়ে এটি ছিল এক জাতীয়তাবাদী বিস্ফোরণ। মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব প্রথম কোনো ভারতীয় ফুটবল দল হিসেবে ব্রিটিশ ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে মর্যাদাপূর্ণ ‘আইএফএ শিল্ড’ (IFA Shield) জয় করে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের চরম রোষানলের মাঝে, খালি পায়ে খেলা একদল বাঙালির এই বিজয় কেবল ক্রীড়াক্ষেত্রের অর্জন ছিল না; এটি ছিল ব্রিটিশদের ‘শারীরিক শ্রেষ্ঠত্বের’ অহংকারে এক বিশাল চপেটাঘাত। এই জয় আপামর জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এক অনুপ্রেরণাদায়ী রূপকথায় পরিণত হয়েছিল।
-
১৯৮৩ (ভারত) – প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে এক বিশাল লাফ: ভারতের অ্যারোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এস্টাবলিশমেন্ট (ADE) বেঙ্গালুরুর কাছে কোলারে তাদের প্রথম পাইলটবিহীন টার্গেট এয়ারক্রাফট (PTA)-এর সফল পরীক্ষা চালায়। এই মাইলফলকটি ভারতের আধুনিক ড্রোন এবং মানববিহীন আকাশযান (UAV) কর্মসূচির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল, যা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে দেশটির ক্রমবর্ধমান স্বনির্ভরতার এক বিরাট প্রমাণ।
-
১৯৮৭ (ভারত ও শ্রীলঙ্কা) – শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর: শ্রীলঙ্কায় চলমান ভয়াবহ জাতিগত সংঘাত অবসানের আশায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট জে. আর. জয়বর্ধনে কলম্বোতে ‘ইন্দো-শ্রীলঙ্কা শান্তি চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। যদিও এই চুক্তির ফলে ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী (IPKF) মোতায়েন করা হয়েছিল এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছিল, তবুও দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন।
উপমহাদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্ম
| নাম | জন্মসাল | পেশা ও অবিস্মরণীয় অবদান |
| জে. আর. ডি. টাটা | ১৯০৪ | একজন অগ্রগামী বৈমানিক এবং স্বপ্নদর্শী শিল্পপতি, যিনি টাটা এয়ারলাইন্স (বর্তমান এয়ার ইন্ডিয়া) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভারতের প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত পাইলট হিসেবে তিনি অর্ধেকের বেশি সময় ধরে টাটা গ্রুপের নেতৃত্ব দেন। তার অসামান্য অবদানের জন্য তাকে ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। |
| অনুপ জলোটা | ১৯৫৩ | অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সর্বজনস্বীকৃত একজন ভারতীয় গায়ক ও সুরকার। ভজন এবং গজল গাওয়ায় তার অতুলনীয় দক্ষতার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে “ভজন সম্রাট” হিসেবে সমাদৃত। |
উপমহাদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিদের মৃত্যু
| নাম | মৃত্যুসাল | অবদান ও স্মৃতি |
| ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর | ১৮৯১ | বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ, বহুভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ এবং সমাজ সংস্কারক। তিনি বাংলা গদ্যকে আধুনিক রূপ দেন, নারী শিক্ষার প্রসারে জোরালো ভূমিকা রাখেন এবং ১৮৫৬ সালের ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাসের জন্য অবিরাম সংগ্রাম করে জয়ী হন। |
| অরুণা আসফ আলী | ১৯৯৬ | একজন নির্ভীক রাজনৈতিক কর্মী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময় বোম্বের গোওয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে সাহসিকতার সাথে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পতাকা উত্তোলনের জন্য তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। |
| সৈয়দ মোদী | ১৯৮৮ | ভারতের আটবারের জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন। লখনউয়ের কে. ডি. সিং বাবু স্টেডিয়ামের বাইরে তার মর্মান্তিক এবং অকাল হত্যাকাণ্ড দেশের ক্রীড়াঙ্গনে গভীর শোক ও স্তব্ধতা নামিয়ে এনেছিল। |
আন্তর্জাতিক পালনীয় দিবস ও বিশ্বব্যাপী ছুটি
বিশ্ব সম্প্রদায় ২৯ জুলাই দিনটিকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ও জাতীয় উদযাপনের জন্য উৎসর্গ করেছে। এই দিনগুলো পরিবেশ সংরক্ষণ, ভাষাগত গর্ব এবং জাতীয় স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে সাহায্য করে।
-
আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস (Global Tiger Day): ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত টাইগার সামিটে এই দিনটির সূচনা হয়। চোরাশিকার এবং আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে গত এক শতাব্দীতে বন্য বাঘের সংখ্যা ৯৭% কমে গেছে। বিশ্বজুড়ে বাঘ সংরক্ষণ কর্মসূচির জরুরি প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ২৯ জুলাই এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ডাক।
-
ফিস্তাস পাত্রিয়াস (পেরুর জাতীয় উৎসব): পেরুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা দিবস ২৮ জুলাই হলেও, এর উদযাপন অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে ২৯ জুলাই পর্যন্ত চলতে থাকে। এই দিনটি বিশেষভাবে পেরুর মহান সামরিক কুচকাওয়াজের জন্য নিবেদিত, যা দেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং জাতীয় পুলিশকে সম্মান জানাতে বর্ণাঢ্য রাস্তার উৎসব এবং দেশাত্মবোধক প্রদর্শনী দিয়ে সাজানো হয়।
-
জাতীয় থাই ভাষা দিবস (থাইল্যান্ড): থাই ভাষার সংরক্ষণ, প্রচার এবং সঠিক ব্যবহারের জন্য উৎসর্গীকৃত একটি দিন। ১৯৬২ সালে ব্যাংককের চুলালংকর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজা ভূমিবল আদুল্যাদেজ-এর একটি সফরকে স্মরণ করে এই দিনটি পালন করা হয়, যেখানে তিনি জাতীয় ভাষা রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে এক পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন।
-
জাতীয় চিকেন উইং দিবস (যুক্তরাষ্ট্র): এটি একটু হালকা মেজাজের, তবে সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি দিন। ষাটের দশকে নিউইয়র্কের বাফেলো শহরের ‘অ্যাঙ্কর বার’-এ উদ্ভাবিত বিখ্যাত “বাফেলো উইং”-এর উদযাপনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই দিনটি পালন করা হয়।
বিশ্ব ইতিহাস: আন্তঃসংযুক্ত এক ঘটনাবহুল জাল

ইতিহাস সব সময়ই একটি আন্তঃসংযুক্ত জালের মতো। যখন উপমহাদেশ তার নিজের ভাগ্য গড়তে ব্যস্ত ছিল, ঠিক একই সময়ে ২৯ জুলাইয়ে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে চলছিল প্রযুক্তিগত বিপ্লব, রাজকীয় জাঁকজমক এবং ভূ-রাজনৈতিক সীমানার পরিবর্তন।
যুক্তরাষ্ট্র: মহাশূন্যের পথে দৌড়
-
১৯৫৮ – নাসার (NASA) জন্ম: সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘স্পুটনিক’ উৎক্ষেপণের সরাসরি জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার ‘ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাক্ট‘-এ স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে NACA বিলুপ্ত হয়ে জন্ম নেয় ‘ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা নাসা (NASA)। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি আমেরিকার বেসামরিক মহাকাশ কর্মসূচিকে কেন্দ্রীভূত করে এবং ‘স্পেস রেস’ বা মহাকাশ প্রতিযোগিতাকে ত্বরান্বিত করে, যা শেষ পর্যন্ত অ্যাপোলো মুন ল্যান্ডিং, স্পেস শাটল প্রোগ্রাম এবং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো অবিশ্বাস্য সব অর্জনের পথ দেখায়।
যুক্তরাজ্য: রাজপরিবার, সাহিত্য এবং নৌ-আধিপত্য
-
১৯৮১ – “শতাব্দীর সেরা বিয়ে”: গোটা বিশ্ব যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল, যখন প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে প্রিন্স চার্লস এবং লেডি ডায়ানা স্পেন্সারের টেলিভিশন সম্প্রচারিত রাজকীয় বিয়ে উপভোগ করছিল। রূপকথার মতো এই রাজকীয় অনুষ্ঠানটি বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের অন্যতম বড় একটি সাংস্কৃতিক মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
-
১৯৫৪ – ‘মিডল-আর্থ’-এর জন্ম: জর্জ অ্যালেন অ্যান্ড আনউইন প্রকাশনা সংস্থা জে.আর.আর. টলকিনের কালজয়ী হাই-ফ্যান্টাসি মহাকাব্য দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস-এর প্রথম খণ্ড দ্য ফেলোশিপ অফ দ্য রিং প্রকাশ করে। এটি আধুনিক ফ্যান্টাসি সাহিত্যের রূপরেখাই বদলে দেয় এবং পরবর্তীতে এটি থেকে তৈরি চলচ্চিত্রগুলো সিনেমার ইতিহাসে সর্বোচ্চ আয়কারী ফ্র্যাঞ্চাইজির একটিতে পরিণত হয়।
-
১৫৮৮ – স্প্যানিশ আর্মাডা দর্শন: অজেয় হিসেবে পরিচিত কিংবদন্তি ‘স্প্যানিশ আর্মাডা’ বা স্প্যানিশ নৌবহরকে ইংল্যান্ডের কর্নওয়াল উপকূলে প্রথমবারের মতো দেখা যায়। এটি স্যার ফ্রান্সিস ড্রেকের নেতৃত্বে ইংলিশ নৌবহরকে প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি নিতে বাধ্য করে। এরপরই সংঘটিত হয় গ্রেভলাইন্সের যুদ্ধ, যা স্প্যানিশ নৌ আধিপত্যকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয় এবং ইংল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব সুনিশ্চিত করে।
ইউরোপ: যুদ্ধের নিয়ম এবং পারমাণবিক শক্তি
-
১৮৯৯ – প্রথম হেগ কনভেনশন: নেদারল্যান্ডসে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে যুদ্ধ এবং যুদ্ধাপরাধের আইনগুলোর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতিগুলোর একটি। এটি আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির নজির স্থাপন করে ‘পারমানেন্ট কোর্ট অফ আরবিট্রেশন’ প্রতিষ্ঠা করে।
-
১৯৫৭ – আইএইএ (IAEA) গঠন: অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি’ (IAEA) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনার চরম মুহূর্তে আবির্ভূত এই সংস্থাটির মূল ম্যান্ডেট ছিল পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক ব্যবহার প্রচার করা এবং সামরিক উদ্দেশ্য বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে এর ব্যবহার কঠোরভাবে প্রতিহত করা।
রাশিয়া ও চীন: সংরক্ষণ এবং সংঘাত
-
২০১০ (রাশিয়া) – টাইগার সামিট: রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন ঐতিহাসিক সেন্ট পিটার্সবার্গ টাইগার সামিটের আয়োজন করেন, যেখানে বাঘের বিচরণ থাকা ১৩টি দেশের নেতারা একত্রিত হন। এই শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী বন্য বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার একটি বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা হয়।
-
১৯৩৭ (চীন) – পেইপিংয়ের পতন: নিষ্ঠুর দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধের সময় জাপানি ইম্পেরিয়াল আর্মি ‘মার্কো পোলো ব্রিজ ঘটনা’র পর চীনের প্রাচীন রাজধানী পেইপিং (বর্তমান বেইজিং) দখল করে নেয়। এই মর্মান্তিক পতনের ফলে আক্রমণকারী বাহিনীকে প্রতিহত করতে চীনা কমিউনিস্ট এবং জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে একটি সাময়িক কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐক্যজোট গড়ে ওঠে।
অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা: কমনওয়েলথ মাইলফলক
-
১৯১৬ (অস্ট্রেলিয়া): প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পজিয়ার্সের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময়, অস্ট্রেলিয়ান সৈন্য ক্লড চার্লস ক্যাসলটন শত্রুদের অবিরাম মেশিনগানের গুলির তোয়াক্কা না করে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ আহত কমরেডদের উদ্ধার করতে ছুটে যান। তৃতীয়বার উদ্ধার প্রচেষ্টার সময় তিনি নিহত হন এবং তার এই চূড়ান্ত বীরত্বের জন্য তাকে মরণোত্তর ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’ প্রদান করা হয়।
-
২০০১ (অস্ট্রেলিয়া): জাপানের ফুকুওকায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব অ্যাকুয়াটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে সাঁতারের বিস্ময়বালক গ্রান্ট হ্যাকেট ১৫০০-মিটার ফ্রিস্টাইলে বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে দেন। এর মাধ্যমে দূরপাল্লার সাঁতারুদের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসেবে তার জায়গাটি পাকাপোক্ত হয়।
-
১৯৮৪ (কানাডা): লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে মহিলাদের ২৫-মিটার পিস্তল ইভেন্টে স্পোর্ট শুটার লিন্ডা থম স্বর্ণপদক জয় করেন। এর মাধ্যমে কানাডার ১৬ বছরের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের স্বর্ণপদক খরা কাটে এবং তিনি রাতারাতি জাতীয় বীরে পরিণত হন।
বিশ্বমঞ্চের উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যু
এই তারিখে পৃথিবীতে আসা বা পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া বেশ কিছু প্রতিভাবান, এবং কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের দ্বারা ২৯ জুলাইয়ের ইতিহাস গভীরভাবে প্রভাবিত।
বিখ্যাত বৈশ্বিক জন্মদিন
| নাম | জন্মসাল | জাতীয়তা | পরিচয়ের কারণ ও প্রভাব |
| অ্যালেক্সিস ডি টকভিল | ১৮০৫ | ফরাসি | একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ইতিহাসবিদ, কূটনীতিক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তার কালজয়ী রচনা, ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা, আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বোঝার জন্য আজও একটি মৌলিক পাঠ্য। |
| বেনিতো মুসোলিনি | ১৮৮৩ | ইতালীয় | ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসক যিনি ১৯২৫ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত ইতালি শাসন করেন। তিনি নাৎসি জার্মানির সাথে ‘অ্যাক্সিস’ বা অক্ষশক্তি জোট গড়ে তুলেছিলেন এবং ১৯৪৫ সালে তার মৃত্যুদণ্ডের আগে দেশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক থিয়েটারে টেনে নিয়ে যান। |
| ক্লারা বো | ১৯০৫ | আমেরিকান | নির্বাক চলচ্চিত্রের একজন আইকনিক অভিনেত্রী এবং ১৯২০-এর দশকের ‘রোয়ারিং টোয়েন্টিস’-এর আসল “ইট গার্ল” (It Girl)। পর্দায় তার জাদুকরী উপস্থিতি এবং আধুনিক ফ্ল্যাপার লাইফস্টাইলের জন্য তিনি চিরস্মরণীয়। |
| এলিজাবেথ ডোল | ১৯৩৬ | আমেরিকান | একজন পথপ্রদর্শক রাজনীতিবিদ যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন সচিব, শ্রম বিষয়ক সচিব এবং পরবর্তীতে উত্তর ক্যারোলিনার হয়ে মার্কিন সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। |
| ফার্নান্দো আলোনসো | ১৯৮১ | স্প্যানিশ | ফর্মুলা ওয়ানের দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, যাকে মোটরস্পোর্টের ইতিহাসে অন্যতম সবচেয়ে প্রতিভাবান, অদম্য এবং তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ড্রাইভার হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয়। |
বিখ্যাত বৈশ্বিক মৃত্যু
| নাম | মৃত্যুসাল | জাতীয়তা | স্মৃতি ও প্রভাব |
| উইলিয়াম উইলবারফোর্স | ১৮৩৩ | ইংরেজ | একজন গভীরভাবে ধার্মিক রাজনীতিবিদ এবং মানবহিতৈষী, যিনি সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার আন্দোলনের পেছনে অদম্য সংসদীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। |
| ভিনসেন্ট ভ্যান গগ | ১৮৯০ | ডাচ | পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রকলার এক কিংবদন্তি, যার শ্বাসরুদ্ধকর এবং আবেগপূর্ণ কাজগুলো (যেমন স্টারি নাইট এবং সানফ্লাওয়ার্স) তার জীবদ্দশায় প্রায় অনাদৃতই রয়ে গিয়েছিল। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে নিজের ছোড়া গুলিতে তিনি মর্মান্তিকভাবে মারা যান, আর মৃত্যুর পরই তিনি পশ্চিমা শিল্পের এক মহীরুহে পরিণত হন। |
| রবার্ট শুম্যান | ১৮৫৬ | জার্মান | রোমান্টিক যুগের এক অনবদ্য সুরকার এবং প্রখর প্রভাবশালী সঙ্গীত সমালোচক। তার পিয়ানোর সুর এবং লিডার (Lieder) আজও ধ্রুপদী সঙ্গীতের জগতে অপরিহার্য অংশ। |
| রাজা প্রথম উমবার্তো | ১৯০০ | ইতালীয় | ইতালির রাজা, যিনি মোনজায় নৈরাজ্যবাদী গায়তানো ব্রেসির হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হন। এই ঘটনাটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপের তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। |
| ক্যাস এলিয়ট | ১৯৭৪ | আমেরিকান | ফোক-রক ধারার জনপ্রিয় দল ‘দ্য মামাস অ্যান্ড দ্য পাপাস’-এর একজন জাদুকরী কণ্ঠশিল্পী ও মূল সদস্য, যার কণ্ঠ আজও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে। |
“আপনি কি জানেন?” কিছু চমকপ্রদ তথ্য
আড্ডায় দারুণ কোনো কথোপকথন শুরু করতে চান? ২৯ জুলাইয়ের সাথে সম্পর্কিত স্বল্প-পরিচিত কিন্তু অসাধারণ তিনটি তথ্য এখানে দেওয়া হলো:
-
‘দ্য টুনাইট শো’-এর জন্ম: আমরা আজ যেভাবে গভীর রাতের টেলিভিশন (Late-night television) অনুষ্ঠান দেখে অভ্যস্ত, তার জন্ম হয়েছিল ১৯ ৫৭ সালের ২৯ জুলাই। এদিন এনবিসিতে (NBC) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিমিয়ার হয় ‘দ্য টুনাইট শো’-এর। জনি কারসন এটিকে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার আগে, স্টিভ অ্যালেন এবং জ্যাক পার এটি উপস্থাপনা করতেন। তারা প্রমাণ করেছিলেন যে দর্শকরা মাঝরাতের পরেও টিভি দেখার জন্য জেগে থাকতে পারে, যা টেলিভিশন প্রোগ্রামিংয়ে এক বিশাল বিপ্লব এনেছিল।
-
এক বিশাল জনমিতিক পরিবর্তন ও শরণার্থী সংকট: ১৯৭১ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও মুক্তিযুদ্ধের ফলে, প্রায় এক কোটি (১০ মিলিয়ন) বাঙালি শরণার্থীতে পরিণত হয়—যা ছিল এক ভয়াবহ মানবিক সংকট। ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুসারে, জাতিসংঘ এই বিশাল বাস্তুচ্যুতিকে “বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে শরণার্থীদের সবচেয়ে বড় একক বাস্তুচ্যুতি” হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
-
রবার্ট মোজেস এবং আধুনিক মহানগরী: ১৮৮৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণকারী, সমালোচিত এবং একইসাথে প্রশংসিত নগর পরিকল্পনাবিদ রবার্ট মোজেস ১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই মারা যান। তিনি কখনোই কোনো নির্বাচিত রাজনৈতিক পদে জয়ী হননি, তবুও একসাথে ১২টিরও বেশি পদ ধারণ করেছিলেন। নিউইয়র্ক শহরজুড়ে ১৩টি সেতু, ৪১৬ মাইল পার্কওয়ে এবং ৬৫৮টি খেলার মাঠ নির্মাণের মূল রূপকার ছিলেন তিনি। তার কাজই মূলত আধুনিক আমেরিকান শহরের বিন্যাসকে চিরতরে বদলে দেয়—তা সে ভালো অর্থেই হোক বা খারাপ।
শেষ কথা
১৯১১ সালে বাংলার ধূলিমলিন রাস্তায় খালি পায়ে ফুটবল খেলা একদল তরুণের সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ জানানো থেকে শুরু করে, ওয়াশিংটন ডিসির চকচকে করিডোরে মহাকাশ অনুসন্ধানের নীল-নকশায় স্বাক্ষর করা পর্যন্ত—২৯ জুলাই যেন মানব চেষ্টার এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। এটি এমন একটি দিন যা চিহ্নিত হয়ে আছে সেইসব স্বপ্নদর্শীদের জন্মে যারা আকাশের তারায় ছবি এঁকেছেন এবং বিশাল সব শিল্প গড়ে তুলেছেন, পাশাপাশি সেইসব অক্লান্ত সংস্কারকদের প্রয়াণে যারা দাসত্বের শৃঙ্খল এবং ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করেছেন।
‘ক্যালেন্ডারের পাতায় ২৯ জুলাই’-এর এই ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা বুঝতে পারি যে, ইতিহাস কোনো স্থির পাঠ্যপুস্তক নয়; এটি ক্রমাগত বিকশিত হওয়া এক জীবন্ত আখ্যান। বাংলাদেশে প্রজন্মের রূপ বদলে দেওয়া সেই অভ্যুত্থান, রাশিয়ায় বাঘ সংরক্ষণের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতি, কিংবা শ্রীলঙ্কায় স্বাক্ষরিত সেই কূটনৈতিক চুক্তি—সবই আমাদের অতীতের এমন কিছু প্রতিধ্বনি যা আমাদের ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আজও আকার দিয়ে চলেছে। আমরা কোথা থেকে এসেছি—কাকে আমরা উদযাপন করেছি, কার জন্য আমরা শোক করেছি এবং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো আমরা তিলে তিলে গড়ে তুলেছি—তা গভীরভাবে অনুধাবনের মাধ্যমেই আমরা আমাদের এই জটিল আধুনিক বিশ্বকে সফলভাবে নেভিগেট করার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপটটি খুঁজে পাই।

