সময় যেন এক প্রবহমান নদীর মতো। অবিরাম বয়ে চলা এই সময়ের স্রোতে এমন কিছু নির্দিষ্ট দিন আসে, যা বিশালাকার পাথরের মতো ইতিহাসের গতিপথকে চিরতরে বদলে দেয়। ২ আগস্ট নিঃসন্দেহে তেমনই একটি দিন। আধুনিক গণতন্ত্রের জন্ম দেওয়া মৌলিক রাজনৈতিক দলিলে স্বাক্ষরের মুহূর্ত থেকে শুরু করে মর্মান্তিক সব বিপর্যয়, বিশ্ব-কাঁপানো সামরিক আগ্রাসন, এবং শিল্প, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা মহান ব্যক্তিদের জন্ম ও মৃত্যুর সাক্ষী এই দিনটি।
আপনি যদি ইতিহাসপ্রেমী হন, তথ্যের সন্ধানে থাকা একজন শিক্ষার্থী হন, অথবা নিছক কৌতূহলবশত জানতে চান যে আপনার জন্মদিনে অতীতে কী ঘটেছিল, তবে ২ আগস্টের আর্কাইভে ডুব দিলে আপনি মানবজাতির জয়, ট্র্যাজেডি এবং রূপান্তরের এক বিশাল ক্যানভাস দেখতে পাবেন। এই দিনেই সাম্রাজ্যগুলো তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছিল, বিজ্ঞানীদের একটিমাত্র চিঠি পারমাণবিক যুগের সূচনা করেছিল এবং বিশ্বের আইকনিক ব্যক্তিত্বরা তাদের প্রথম কিংবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।
আসুন, সময়ের পাতা উল্টে আমরা এক বিস্তৃত এবং তথ্যবহুল যাত্রায় বেরিয়ে পড়ি, যেখানে আমরা ২ আগস্টের সেইসব যুগান্তকারী ঘটনা, উল্লেখযোগ্য জন্ম, বিখ্যাত মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক দিবসগুলো সম্পর্কে জানব, যা এই দিনটিকে বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
বাঙালি ও দক্ষিণ এশিয়ার মাইলফলক
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ, জটিল এবং আধুনিক বিশ্বের জন্য গভীরভাবে প্রভাবশালী। বাংলাদেশ, ভারত এবং আশেপাশের অঞ্চলগুলোর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে নতুন রূপ দেওয়া বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই ২ আগস্টেই ঘটেছিল।
১৮৫৮: ভারত সরকার আইন এবং ব্রিটিশ রাজের সূচনা
১৮৫৭ সালের রক্তক্ষয়ী এবং ব্যাপক অভ্যুত্থান (যা সিপাহী বিদ্রোহ নামে পরিচিত)-এর পর, ১৮৫৮ সালের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘ভারত সরকার আইন’ (Government of India Act) পাশ করে। এই যুগান্তকারী আইনটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিলুপ্তি ঘটায়, যারা এতদিন একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হয়েও উপমহাদেশের বিশাল অংশ শাসন করছিল। এই আইনের মাধ্যমে ভারতের সমস্ত প্রশাসনিক, আঞ্চলিক এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ সরাসরি ব্রিটিশ মুকুটের অধীনে চলে যায় এবং শুরু হয় ‘ব্রিটিশ রাজ’। রানি ভিক্টোরিয়া ভারতের সর্বোচ্চ শাসক হন এবং ‘ভাইসরয়’ পদটি তৈরি করা হয়। একটিমাত্র দিনের এই সিদ্ধান্ত তৎকালীন ৩০ কোটিরও বেশি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল এবং পরবর্তী নব্বই বছরের ঔপনিবেশিক শাসন এবং ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি তৈরি করেছিল।
১৯৯৯: মর্মান্তিক গাইসাল ট্রেন দুর্ঘটনা
দক্ষিণ এশিয়ার রেলওয়ের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটে ১৯৯৯ সালের ২ আগস্ট, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের গাইসাল রেলওয়ে স্টেশনে। গভীর রাতে, সিগন্যালিং ব্যবস্থার এক ভয়াবহ ত্রুটির কারণে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ব্রহ্মপুত্র মেইল’ এবং প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসা ‘অবধ-আসাম এক্সপ্রেস’ একই লাইনে চলে আসে। অবিশ্বাস্য উচ্চ গতির এই মুখোমুখি সংঘর্ষে এক ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলেই অন্তত ২৮৫ জন মানুষ প্রাণ হারান এবং আরও প্রায় ৩০০ জন গুরুতর আহত হন। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে দুটি ট্রেনের বগিগুলো একে অপরের সাথে দুমড়েমুচড়ে আটকে গিয়েছিল। এই ট্র্যাজেডি আজও গণপরিবহনে অবকাঠামোগত নিরাপত্তা এবং তদারকির অপরিহার্যতার এক বিষণ্ণ অনুস্মারক হয়ে আছে।
দক্ষিণ এশিয়ার উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যু
| নাম | বছর | অবদান ও স্মৃতি |
| আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (জন্ম) | ১৮৬১ | বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণকারী এই মহান বিজ্ঞানীকে “ভারতীয় রসায়নের জনক” বলা হয়। তিনি ভারতের প্রথম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতাও। |
| পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া (জন্ম) | ১৮৭৬ | ভারতের একজন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি সেই পতাকার মূল নকশা করেছিলেন, যার ওপর ভিত্তি করে বর্তমান ভারতের জাতীয় পতাকা তৈরি হয়েছে। |
| সন্তোষ মোহন দেব (জন্ম) | ১৯৩৪ | একজন প্রভাবশালী ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং ক্যাবিনেট মন্ত্রী, যিনি ভারী শিল্প ও সরকারি উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। |
| রামকমল সেন (মৃত্যু) | ১৮৪৪ | একজন অগ্রগামী বাঙালি পণ্ডিত, অভিধান প্রণেতা এবং এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সেক্রেটারি। |
বিশ্ব ইতিহাস: রাজনৈতিক ও সামাজিক মাইলফলক

বৃহত্তর বিশ্বে ২ আগস্ট দিনটি যুদ্ধ, শান্তি এবং রাজনৈতিক বিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। নিচে এই দিনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশ্বিক ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো তুলে ধরা হলো:
১৭৭৬: আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রকৃত স্বাক্ষর
যদিও মার্কিনিরা ৪ জুলাইকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপন করে (যেদিন কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে দলিলের পাঠ্য গ্রহণ করেছিল), কিন্তু মূল চর্মপত্রে বা ঘোষণাপত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল ১৭৭৬ সালের ২ আগস্ট। ফিলাডেলফিয়ার সেই চরম গ্রীষ্মের দিনে জন হ্যানকক, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন এবং টমাস জেফারসন সহ ৫৬ জন প্রতিনিধি এগিয়ে এসে নিজেদের স্বাক্ষর যুক্ত করেন। এই স্বাক্ষরের মাধ্যমে তারা মূলত গ্রেট ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় জর্জের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। যদি তাদের এই বিপ্লব ব্যর্থ হতো, তবে ২ আগস্ট স্বাক্ষরিত সেই পার্চমেন্ট বা দলিলটিই তাদের সবার মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা হিসেবে কাজ করত।
১৯৩৪: হিটলারের ফিউরার (Führer) হিসেবে আত্মপ্রকাশ
১৯৩৪ সালের ২ আগস্ট ভাইমার প্রজাতন্ত্রের (Weimar Republic) শেষ গণতান্ত্রিক রক্ষাকবচটুকুও পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়। ৮৬ বছর বয়সী জার্মান প্রেসিডেন্ট পল ফন হিন্ডেনবার্গের মৃত্যুর পর চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলার অবিলম্বে রাষ্ট্রপতির পদ বাতিল করেন এবং নিজের কার্যালয়ের সাথে এর ক্ষমতা একীভূত করেন। নিজেকে ‘Führer und Reichskanzler’ (নেতা এবং চ্যান্সেলর) ঘোষণা করে হিটলার জার্মানির ওপর একচ্ছত্র এবং নিরঙ্কুশ স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা লাভ করেন। এরপর জার্মান সশস্ত্র বাহিনীকে রাষ্ট্র বা সংবিধানের পরিবর্তে সরাসরি হিটলারের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের শপথ নিতে বাধ্য করা হয়, যা সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভয়াবহ হলোকাস্টের পথ প্রশস্ত করেছিল।
১৯৩৯: আইনস্টাইন-সিলার্ড চিঠি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক প্রাক্কালে, পদার্থবিজ্ঞানী লিও সিলার্ড একটি চিঠির খসড়া তৈরি করেন এবং ১৯৩৯ সালের ২ আগস্ট বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তাতে স্বাক্ষর করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টকে উদ্দেশ্য করে লেখা এই চিঠিতে সতর্ক করা হয়েছিল যে, নাৎসি জার্মানি ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি অস্ত্র তৈরি করতে পারে—যাকে আমরা আজ পারমাণবিক বোমা হিসেবে জানি, যার ধ্বংসক্ষমতা অকল্পনীয়। আজীবন শান্তিবাদী আইনস্টাইন এই চিঠিতে স্বাক্ষর করার বিষয়ে গভীরভাবে দ্বিধান্বিত ছিলেন, কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর ফ্যাসিবাদের একচেটিয়া আধিপত্যের ভয় তাকে বাধ্য করেছিল। এই একটিমাত্র দলিল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয় অতিগোপন ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’।
১৯৯০: ইরাকের কুয়েত আক্রমণ
১৯৯০ সালের ২ আগস্ট ভোরে সাদ্দাম হোসেনের নির্দেশে ইরাকি সামরিক বাহিনী যখন প্রতিবেশী উপসাগরীয় রাষ্ট্র কুয়েত আক্রমণ করে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। কুয়েতের বিরুদ্ধে সীমান্ত পেরিয়ে ইরাকি তেল চুরির অভিযোগ এনে এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় জমে থাকা বিশাল ঋণ বাতিল করার অজুহাতে ইরাকের বাহিনী মাত্র দুই দিনের মধ্যে কুয়েতি প্রতিরক্ষাকে গুঁড়িয়ে দেয়। এই আগ্রাসী দখলদারিত্ব দ্রুত এবং তীব্র আন্তর্জাতিক নিন্দার ঝড় তোলে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অবিলম্বে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালের শুরুতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’-এর দিকে মোড় নেয়।
এক নজরে: ২ আগস্টের অন্যান্য বড় বৈশ্বিক ঘটনা
| বছর | ঘটনার বিবরণ | অঞ্চল |
| ১৮৭০ | লন্ডনের টেমস নদীর নিচে ‘টাওয়ার সাবওয়ে’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়, যা বিশ্বের প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড টিউব রেলওয়ে। | যুক্তরাজ্য |
| ১৮৭৩ | সান ফ্রান্সিসকোর বিখ্যাত ট্রানজিট সিস্টেমে ‘ক্লে স্ট্রিট হিল রেলপথ’ প্রথমবারের মতো কেবল কার (Cable car) চালানো শুরু করে। | যুক্তরাষ্ট্র |
| ১৯১৪ | প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শুরুতে জার্মান বাহিনী লুক্সেমবার্গ দখল করে এবং দেশটির নিরপেক্ষতা লঙ্ঘন করে। | ইউরোপ |
| ১৯২২ | চীনের শানতুতে আঘাত হানে এক প্রলয়ংকরী টাইফুন। এর ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে ৫০,০০০-এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। | চীন |
| ১৯২৩ | প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন জি. হার্ডিংয়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। | যুক্তরাষ্ট্র |
| ১৯৩২ | মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী কার্ল ডি. অ্যান্ডারসন ইলেকট্রনের অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিকণা ‘পজিট্রন’ আবিষ্কার করেন। | যুক্তরাষ্ট্র |
| ১৯৮৫ | ডালাস/ফোর্ট ওয়ার্থ বিমানবন্দরে তীব্র মাইক্রোবার্স্ট বা আকস্মিক বায়ুপ্রবাহের কারণে ডেল্টা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৯১ বিধ্বস্ত হয়, যাতে ১৩৭ জন নিহত হন। | যুক্তরাষ্ট্র |
| ১৯৯৮ | দ্বিতীয় কঙ্গো যুদ্ধ শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত ৯টি আফ্রিকান দেশকে একটি সংঘাতে টেনে আনে; একে কখনো কখনো “আফ্রিকান বিশ্বযুদ্ধ” বলা হয়। | আফ্রিকা |
| ২০০৭ | রাশিয়ান অভিযাত্রীরা সাবমার্সিবলে করে উত্তর মেরুর নিচে ডুব দিয়ে সমুদ্রতলে একটি টাইটানিয়াম পতাকা স্থাপন করে আর্কটিক সম্পদের ওপর নিজেদের দাবি জানায়। | রাশিয়া / আর্কটিক |
বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্মদিন
২ আগস্ট পৃথিবী এমন সব দূরদর্শী, শিল্পী, চিন্তাবিদ এবং বিনোদনদাতাদের স্বাগত জানিয়েছে, যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে কিংবদন্তি। স্বাধীনতার ভাস্কর্য যিনি গড়েছেন, তিনি থেকে শুরু করে যারা সমাজের প্রচলিত নিয়ম ভেঙেছেন—এই দিনে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরা আমাদের সংস্কৃতিতে অমলিন ছাপ রেখে গেছেন।
-
ফ্রেদেরিক-অগ্যুস্ত বার্থোল্ডি (১৮৩৪ – ১৯০৪): ১৮৩৪ সালের ২ আগস্ট ফ্রান্সের কোলমারে জন্মগ্রহণকারী বার্থোল্ডি ছিলেন একজন দূরদর্শী ফরাসি ভাস্কর। পৃথিবীর অন্যতম স্বীকৃত স্মৃতিস্তম্ভ ‘লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড’—যা ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’ নামেই বেশি পরিচিত—তারই নকশা করা। বিশালাকৃতির ভাস্কর্যের প্রতি আগ্রহী বার্থোল্ডি তার এই বিশাল তামার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রকৌশলী গুস্তাভ আইফেলের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করেছিলেন। ফ্রান্সের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার দেওয়া এই মূর্তিটি আজও সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের স্বাগত জানানো এবং স্বাধীনতার এক চিরস্থায়ী প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
-
জেমস বল্ডউইন (১৯২৪ – ১৯৮৭): আমেরিকান সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত প্রতিভা এবং ২০ শতকের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠস্বর জেমস বল্ডউইন ১৯২৪ সালের ২ আগস্ট নিউইয়র্কের হারলেমে জন্মগ্রহণ করেন। তার গদ্য, প্রবন্ধ এবং উপন্যাসগুলো—যার মধ্যে ‘Go Tell It on the Mountain’ এবং ‘Notes of a Native Son‘ উল্লেখযোগ্য—পশ্চিমা সমাজের বর্ণ, যৌনতা এবং শ্রেণির পার্থক্যকে গভীরভাবে অন্বেষণ করেছে। আমেরিকার পদ্ধতিগত বর্ণবাদের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে বাঁচতে তিনি প্যারিসে চলে যান, তবে সমতার লড়াইয়ে অংশ নিতে তিনি বারবার নিজ দেশে ফিরে এসেছিলেন এবং রেখে গেছেন সাহসী সাংস্কৃতিক সমালোচনার এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার।
-
চার্লি এক্সসিএক্স (১৯৯২ – বর্তমান): ১৯৯২ সালের ২ আগস্ট ইংল্যান্ডের কেমব্রিজে শার্লট এমা আইচিসন নামে জন্মগ্রহণ করা চার্লি এক্সসিএক্স তার প্রজন্মের অন্যতম উদ্ভাবনী এবং সীমানা-ভাঙা পপ গায়িকা ও গীতিকারে পরিণত হয়েছেন। তার অ্যাভান্ট-পপ সংবেদনশীলতা এবং হাইপারপপ কলাবোরেশনের জন্য পরিচিত চার্লি, নিয়মিতভাবে মূলধারার মিউজিকের প্রথাগত ধারাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং একইসাথে দারুণ সব গ্লোবাল হিট গান উপহার দিয়েছেন।
এক নজরে: ২ আগস্টের বিখ্যাত জন্মদিন
| নাম | জন্মসাল | পেশা ও স্মৃতি |
| জ্যাক এল. ওয়ার্নার | ১৮৯২ | কানাডিয়ান-আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্বাহী এবং ওয়ার্নার ব্রস স্টুডিওর মূল চালিকাশক্তি। |
| মার্না লয় | ১৯০৫ | কিংবদন্তি আমেরিকান চলচ্চিত্র ও মঞ্চ অভিনেত্রী, ‘দ্য থিন ম্যান’ চলচ্চিত্র সিরিজের জন্য বিখ্যাত। |
| পিটার ও’টুল | ১৯৩২ | আইকনিক ব্রিটিশ-আইরিশ অভিনেতা। অস্কারে একাধিক মনোনয়নপ্রাপ্ত এবং ‘লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া’-এর জন্য বিশ্বখ্যাত। |
| ওয়েস ক্রেভেন | ১৯৩৯ | আমেরিকান হরর সিনেমার মাস্টার; ‘অ্যা নাইটমেয়ার অন এলম স্ট্রিট’ এবং ‘স্ক্রিম’ পরিচালনা করেছেন। |
| মেরি-লুইস পার্কার | ১৯৬৪ | পুরস্কার বিজয়ী আমেরিকান অভিনেত্রী, ‘উইডস’ এবং ‘ফ্রিড গ্রিন টমেটোস’-এর জন্য খ্যাতিমান। |
| কেভিন স্মিথ | ১৯৭০ | আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা এবং কমিক বই লেখক, যিনি কাল্ট ক্লাসিক ‘ক্লার্কস’ পরিচালনা করেছেন। |
| স্যাম ওয়ার্থিংটন | ১৯৭৬ | জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’-এ অভিনয় করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জনকারী ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান অভিনেতা। |
| এডওয়ার্ড ফার্লং | ১৯৭৭ | আমেরিকান অভিনেতা, যিনি ‘টার্মিনেটর ২: জাজমেন্ট ডে’-তে জন কনর চরিত্রে আইকনিক আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। |
ইতিহাসের পাতায় যাদের বিদায়
ঠিক যেমন এই দিনটি অনেক অবিশ্বাস্য ব্যক্তিত্বকে পৃথিবীতে এনেছিল, তেমনি এটি এমন কয়েকজন মানুষের প্রস্থানেরও দিন, যাদের জীবনযাপণ প্রযুক্তি, রাজনীতি এবং শিল্পকলাকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছিল।
-
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল (১৮৪৭ – ১৯২২): ১৯২২ সালের ২ আগস্ট বিশ্ব একজন স্কটিশ বংশোদ্ভূত উদ্ভাবককে হারায়, যার সৃষ্টি মানুষের যোগাযোগের পদ্ধতিকে চিরতরে পরিবর্তন করেছিল। তিনি আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। ১৮৭৬ সালে প্যাটেন্ট করা তার ব্যবহারিক টেলিফোন আবিষ্কার পৃথিবীকে ছোট করে এনেছিল এবং আধুনিক টেলিযোগাযোগের পথ প্রশস্ত করেছিল। টেলিফোনের বাইরেও বেল বধিরদের শিক্ষার প্রতি গভীরভাবে নিবেদিত ছিলেন (তার স্ত্রী এবং মা দুজনেই বধির ছিলেন) এবং তিনি ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি’-এর একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তার স্মৃতির প্রতি এক মর্মস্পর্শী শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে, ৪ আগস্ট তার শেষকৃত্যের সময় উত্তর আমেরিকার সমস্ত ১ কোটি ৩০ লক্ষ টেলিফোন পুরো দুই মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ নীরব ছিল।
-
এনরিকো কারুসো (১৮৭৩ – ১৯২১): কিংবদন্তি ইতালীয় অপেরা টেনর গায়ক এনরিকো কারুসো ১৯২১ সালের ২ আগস্ট ৪৮ বছর বয়সে ইতালির নেপলসে মারা যান। কারুসো কেবল মঞ্চের মাস্টারই ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম সত্যিকারের গ্লোবাল রেকর্ডিং স্টার। ২০ শতকের গোড়ার দিকে, তার অত্যন্ত জনপ্রিয় ফোনোগ্রাফ রেকর্ডিংগুলো উচ্চাঙ্গের অপেরা শিল্পকে সাধারণ মানুষের বসার ঘরে নিয়ে এসেছিল এবং প্রাথমিক রেকর্ডিং শিল্পের বাণিজ্যিক ভিত্তি শক্ত করেছিল।
-
ওয়ারেন জি. হার্ডিং (১৮৬৫ – ১৯২৩): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৯তম প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন জি. হার্ডিং ১৯২৩ সালের ২ আগস্ট সান ফ্রান্সিসকোর একটি হোটেল রুমে সন্দেহজনক হার্ট অ্যাটাকে আকস্মিকভাবে মারা যান। আলাস্কা এবং পশ্চিম উপকূলে তার ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্ট সফর থেকে ফেরার পথে এই আকস্মিক মৃত্যু পুরো জাতিকে হতবাক করেছিল। তবে তার মৃত্যুর পর তার প্রশাসনের ভেতরের পদ্ধতিগত দুর্নীতির—বিশেষ করে কুখ্যাত ‘টিপট ডোম কেলেঙ্কারি’ (Teapot Dome scandal)—ভয়াবহ চিত্র জনসমক্ষে চলে আসে, যা ইতিহাসে তার ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে।
এক নজরে: ২ আগস্টের উল্লেখযোগ্য মৃত্যু
| নাম | মৃত্যুসাল | পেশা ও স্মৃতি |
| ওয়াইল্ড বিল হিকক | ১৮৭৬ | আমেরিকান ওল্ড ওয়েস্টের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, ডেডউডে পোকার খেলার সময় নিহত হন। |
| ওয়ালেস স্টিভেন্স | ১৯৫৫ | আমেরিকার অন্যতম সম্মানিত আধুনিকতাবাদী কবি এবং পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী। |
| ফ্রিটজ ল্যাং | ১৯৭৬ | দূরদর্শী অস্ট্রিয়ান-জার্মান-আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি সায়েন্স ফিকশন মাস্টারপিস ‘মেট্রোপলিস’ পরিচালনা করেছিলেন। |
| রয় কোহন | ১৯৮৬ | অত্যন্ত বিতর্কিত আমেরিকান আইনজীবী, যিনি ম্যাকার্থি শুনানিতে তার ভূমিকার জন্য পরিচিত। |
| রেমন্ড কার্ভার | ১৯৮৮ | অত্যন্ত প্রভাবশালী আমেরিকান ছোটগল্পকার ও কবি, যিনি আমেরিকান রিয়ালিজম বা বাস্তববাদকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। |
| উইলিয়াম এস. বুরোস | ১৯৯৭ | কাউন্টারকালচার আইকন এবং বিট জেনারেশনের লেখক, তার পরাবাস্তব উপন্যাস ‘নেকেড লাঞ্চ’-এর জন্য বিখ্যাত। |
| অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ | ২০০৪ | ফরাসি ফটোগ্রাফার, যাকে ব্যাপকভাবে ক্যান্ডিড ফটোগ্রাফি এবং ফটোজার্নালিজমের মাস্টার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। |
| আহমেদ জেওয়াইল | ২০১৬ | মিশরীয়-আমেরিকান বিজ্ঞানী, যিনি “ফেমটোকেমিস্ট্রির জনক” হিসেবে পরিচিত এবং রসায়নে নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন। |
আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিনসমূহ
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ২ আগস্ট দিনটি গভীর স্মরণ এবং জাতীয় গর্বের দিন হিসেবেও চিহ্নিত।
-
ইউরোপীয় রোমা হলোকাস্ট মেমোরিয়াল ডে: ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত, ২ আগস্ট রোমানি জনগণের জন্য গভীর শোক ও স্মরণের দিন। দিনটি ১৯৪৪ সালের ২-৩ আগস্টের সেই মর্মান্তিক রাতকে স্মরণ করে, যখন এসএস (SS) বাহিনী আউশভিৎজ-বিরকেনাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে “জিপসি ফ্যামিলি ক্যাম্প” (Zigeunerfamilienlager) ধ্বংস করে দেয়। মাত্র এক রাতে ৪,৩০০ জনেরও বেশি রোমা এবং সিন্টি পুরুষ, নারী ও শিশুকে গ্যাস চেম্বারে হত্যা করা হয়েছিল। এই দিনটি হলোকাস্টে নিহত আনুমানিক ৫ লক্ষ রোমা সম্প্রদায়ের মানুষের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
-
প্রজাতন্ত্র দিবস (উত্তর মেসিডোনিয়া): ইলিন্ডেন (সেন্ট এলিয়াসের দিন) নামেও পরিচিত ২ আগস্ট দিনটি উত্তর মেসিডোনিয়ার একটি প্রধান জাতীয় ছুটি। এটি এই তারিখে ঘটে যাওয়া দুটি স্বতন্ত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে। প্রথমটি হলো ১৯০৩ সালের ইলিন্ডেন অভ্যুত্থান, যা ছিল শাসক অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একটি বিশাল এবং সমন্বিত বিদ্রোহ। দ্বিতীয়টি হলো ১৯৪৪ সালে ASNOM (ম্যাসেডোনিয়ার জাতীয় মুক্তির জন্য ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সমাবেশ)-এর প্রথম সমাবেশ, যা আধুনিক মেসিডোনিয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
-
আওয়ার লেডি অফ দ্য অ্যাঞ্জেলস (কোস্টারিকা): কোস্টারিকায় ২ আগস্ট দিনটি ‘ভার্জেন ডি লস অ্যাঞ্জেলেস’ (আওয়ার লেডি অফ দ্য অ্যাঞ্জেলস)-এর উৎসবের দিন হিসেবে উদযাপিত হয়, যিনি দেশটির পৃষ্ঠপোষক সাধু (Patron saint)। লক্ষ লক্ষ কোস্টারিকান এই দিনে কার্তাগো শহরের ব্যাসিলিকায় বার্ষিক বিশাল তীর্থযাত্রায় (রোমেরিয়া) অংশ নেন। তারা নিজেদের ভক্তি প্রদর্শন এবং অলৌকিক আশীর্বাদ লাভের আশায় মাইলের পর মাইল হাঁটেন—এবং অনেকেই যাত্রার শেষ অংশটুকু হাঁটু গেড়ে বসে সম্পন্ন করেন।
শেষ কথা
২ আগস্টের ইতিহাস আমাদের সৃষ্টি এবং ধ্বংস—উভয় ক্ষেত্রেই মানবজাতির অসীম ক্ষমতার কথা স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়। এটি এমন একটি দিন যা একদিকে আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের সাহসিকতার প্রমাণ দেয়, যারা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে কালি ছুঁইয়েছিলেন, অন্যদিকে অ্যাডলফ হিটলারের ভয়াবহ স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা সুসংহত হতে দেখেছিল। এটি অগ্যুস্ত বার্থোল্ডির মতো শিল্পীর জন্মদিন, যিনি স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন, আবার জেমস বল্ডউইনের মতো লেখকদেরও জন্মদিন, যারা সবার জন্য স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অক্লান্ত সংগ্রাম করেছিলেন।
এই দিনের ঘটনাবলির দিকে ফিরে তাকালে—বাংলার গাইসাল ট্রেন দুর্ঘটনার মর্মান্তিক পরিণতি থেকে শুরু করে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের নীরব প্রস্থান পর্যন্ত—আমরা সেই শক্তিগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি, যা আমাদের আধুনিক বিশ্বকে রূপ দিয়েছে। ইতিহাস কখনোই পুরোপুরি অতীতে হারিয়ে যায় না; এটি হলো সেই মজবুত ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন প্রতিটি ২ আগস্ট নির্মিত হয়।

