আজ ১৫ আগস্ট ২০২৬। ঠিক একশো বছর আগে, ১৯২৬ সালের এই দিনে কালীঘাটে মাতুলালয়ে জন্মেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। আর এই একই তারিখ, একুশ বছর পরে, হয়ে উঠেছিল স্বাধীন ভারতের জন্মদিন—যে দিনটি দেখার মাত্র তিন মাস আগে তিনি চলে গিয়েছিলেন। আমাদের স্মৃতিতে তাই সুকান্ত যেন চিরকালই কুড়ি বছরের: ‘কিশোর কবি’, অকালমৃত প্রতিভা, পূর্ণিমার চাঁদে ঝলসানো রুটির ছবি এঁকে দেওয়া এক বিস্ময়-বালক। পরিচয়টি মিথ্যা নয়, কিন্তু বিপজ্জনকভাবে অসম্পূর্ণ।
কারণ সুকান্ত শুধু কম বয়সে কবিতা লেখেননি; আঠারো বছর বয়সে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কাজ করেছেন, পার্টির দৈনিক পত্রিকায় সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁর কবিতার ক্ষুধা, শ্রম, যুদ্ধ, শ্রেণি ও নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন সেই রাজনৈতিক জীবন থেকে আলাদা কোনো বিষয় ছিল না। একজন কবিকে কি আমরা তাঁর মৃত্যুর বয়স দিয়ে চিনব, নাকি তিনি জীবনে কোন পক্ষ বেছে নিয়েছিলেন, সেই প্রশ্ন দিয়েও পড়ব? শতবর্ষে সুকান্তকে নতুন করে পড়ার শুরুটা আমার কাছে এখানেই।
এক নজরে সুকান্ত: জীবন ও রাজনৈতিক কর্মজীবন
| বিষয় | তথ্য |
| জন্ম | ১৫ আগস্ট ১৯২৬, কালীঘাট, কলকাতা; মাতুলালয়ে |
| পৈতৃক ভূমি | কোটালিপাড়া, তৎকালীন ফরিদপুর জেলা; বর্তমান গোপালগঞ্জ, বাংলাদেশ |
| পরিবার | পিতা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য, কলকাতার বই ব্যবসায়ী; মাতা সুনীতি দেবী। একাধিক ভাইয়ের মধ্যে সুকান্ত ছিলেন দ্বিতীয়। |
| শিক্ষা | কমলা বিদ্যামন্দির ও বেলেঘাটা দেশবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়; ১৯৪৫ সালের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি এবং পরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর এগোয়নি। |
| রাজনৈতিক সংযুক্তি | ১৯৪৪ সালে, ১৮ বছর বয়সে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। |
| সাংগঠনিক ভূমিকা | দৈনিক স্বাধীনতার কিশোর বিভাগ কিশোর সভার সম্পাদক। দৈনিক স্বাধীনতার সূচনা ১৯৪৬ ধরে সমকালীন বিবরণে তাঁকে প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক বলা হয়েছে; বাংলাপিডিয়ায় সালটি ১৯৪৫ উল্লেখ আছে। |
| সম্পাদিত গ্রন্থ | আকাল (১৯৪৪), ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের পক্ষে সম্পাদিত কবিতা সংকলন। |
| অসুস্থতা | ১৯৪৪ সালের শেষদিকে বেনারস সফরের সময় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত; পরে যক্ষ্মা। |
| মৃত্যু | ১৩ মে ১৯৪৭, যাদবপুর টিবি হাসপাতাল, কলকাতা; বয়স ২০। |
আঠারো বছরের দরজায় যে রাজনীতি অপেক্ষা করছিল
সুকান্তের রাজনৈতিক হয়ে ওঠাকে হঠাৎ ১৯৪৪ সালের একটি পার্টি-সদস্যপদের তারিখে সীমাবদ্ধ করলে গল্পটির অর্ধেকই বলা হয়। তাঁর বেড়ে ওঠার কলকাতা তখন যুদ্ধ, খাদ্যসংকট, ঔপনিবেশিক শাসন, ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক মেরুকরণের শহর। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ কোনো সংবাদপত্রের দূরের খবর ছিল না; কলকাতার রাস্তায় তার ক্ষুধার শরীর দৃশ্যমান। তাঁর কবিতার বিষয় হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ফ্যাসিবাদ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে অবস্থানকে তাই সরাসরিই চিহ্নিত করা যায়।
অথচ তাঁর পারিবারিক শিকড়ে ছিল আরেক পৃথিবী। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সুকান্ত সমগ্র-এর ভূমিকায় আমরা দেখি, পরিবারে সংস্কৃতচর্চা ছিল, ছোটবেলায় মায়ের মুখে তিনি মহাভারত-রামায়ণ শুনেছেন, আবার একই পরিবারের নতুন প্রজন্মের মধ্যে আধুনিক চিন্তার জায়গাও তৈরি হচ্ছিল। বই ব্যবসায়ী পিতার সংসারে বই তাঁর কাছে কোনো দূরের বস্তু ছিল না। অর্থাৎ যে কিশোর পরে মার্ক্সবাদে পৌঁছবেন, তিনি শূন্য সাংস্কৃতিক জমিতে দাঁড়াননি; তাঁর পেছনে ছিল পুরোনো কাহিনি, বাংলা ছন্দ, বিস্তর পাঠ আর দ্রুত বদলে যাওয়া শহরের বাস্তবতা।
১৯৪৪ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন। বয়স আঠারো। এই বয়সটিকেই পরে আমরা তাঁর বিখ্যাত কবিতার শিরোনাম দিয়ে রোমান্টিক করে ফেলেছি—দুঃসাহসের বয়স, মাথা তোলার বয়স। কিন্তু সুকান্তের ক্ষেত্রে এটি নিছক কাব্যিক প্রতীক ছিল না। তিনি সংগঠনের কাজে ঢুকলেন, ছাত্র ও কিশোরদের নিয়ে কাজ করলেন, সভা-মিছিলের দৈনন্দিন জীবনে জড়িয়ে পড়লেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে: তাঁদের প্রজন্মের অনেককে যেন কবিতাকে বাইরে রেখে রাজনীতিতে ঢুকতে হয়েছিল, কিন্তু সুকান্ত রাজনীতিতে ঢুকেছিলেন কবিতাকে সঙ্গে নিয়েই। তাঁর কাছে কবিতা ও রাজনীতির মধ্যে আলাদা দুটি ঘর ছিল না।
এই কথাটি মনে রাখলে সুকান্তের কবিতা পড়ার পদ্ধতিটাই বদলে যায়, বদলে যায় কবিতার ভাবার্থ।
আকাল থেকে স্বাধীনতা: শুধু কবি নন, একজন দায়িত্বশীল সম্পাদকও
১৯৪৪ সালে সুকান্ত সম্পাদনা করলেন আকাল। নামটিই সময়ের দলিল। ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের পক্ষে প্রকাশিত এই কবিতা সংকলনের সঙ্গে তাঁর যুক্ত হওয়া দেখায়, কবিতা তাঁর কাছে তখন সাংস্কৃতিক সংগ্রামেরও উপকরণ। একই সময়ে তিনি নিজেও কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য।
এরপর আসে দৈনিক স্বাধীনতা। পার্টির বাংলা দৈনিকটির কিশোর বিভাগ কিশোর সভার প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক হিসেবে ১৯৪৬ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কাজ করেন সুকান্ত—এই তথ্যটি দ্য ডেইলি স্টারের জীবনপঞ্জিতেও নথিভুক্ত। বাংলাপিডিয়ার নথিতে সাল নিয়ে সামান্য অমিল আছে, তবে সম্পাদকীয় ভূমিকা নিয়ে মতভেদ নেই।
এই কাজটিকে জীবনীতে একটি ছোট পদবি হিসেবে লিখে চলে গেলে বড় ভুল হয়। পত্রিকার পাতা সম্পাদনা মানে নিয়মিত লেখা সংগ্রহ, লেখা বাছাই, পাঠকের কথা ভাবা, সংগঠনের বার্তা পৌঁছানো, তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। তাঁর চিঠিপত্রেও কিশোর সংগঠন ও পার্টির কাজের এই নিত্য ব্যস্ততার ছাপ ছড়িয়ে আছে। সুতরাং তিনি এমন কবি ছিলেন না, যিনি রাতে বিপ্লবের কবিতা লিখে সকালে রাজনীতি ভুলে যেতেন। রাজনীতি ছিল তাঁর দিনের কাজও।
এখানেই “কিশোর কবি” নামটির আরেক সমস্যা। শব্দটি শুনলে চোখের সামনে আসে এক প্রতিভাবান স্কুলছাত্র। অথচ এই স্কুলছাত্র একই সময়ে পার্টির কাগজ চালাচ্ছে, সাংস্কৃতিক সংগঠনে কাজ করছে, রাজনৈতিক সভায় যাচ্ছে, লেখাকে সাংগঠনিক পরিসরে ব্যবহার করছে। যে মানুষের কবিতা নিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা হতো সভা বা মিছিলে যাওয়ার রাস্তায়, তাকে কি কেবল অকালপক্ব প্রতিভা বলে বোঝা যায়?
“ক্ষুধার রাজ্যে” চাঁদও আর নির্দোষ থাকে না
সুকান্তের বহুলপঠিত হে মহাজীবনকে আমরা প্রায়ই একটি অসাধারণ উপমার কবিতা হিসেবে মনে রাখি। পূর্ণিমার চাঁদকে খাদ্যের ছবিতে নামিয়ে আনার সেই মুহূর্ত বাংলা কবিতায় এত শক্তিশালী যে, সেটিই যেন গোটা কবিতাকে গ্রাস করেছে। কিন্তু কবিতাটির রাজনৈতিক কাজ শুধু চমকপ্রদ উপমা তৈরি করা নয়।
এখানে ক্ষুধা মানুষের দেখার ক্ষমতাই বদলে দেয়। যে চাঁদ বাংলা প্রেমের কবিতায় সৌন্দর্যের পুরোনো প্রতীক, শ্রেণিবিভক্ত ক্ষুধার পৃথিবীতে তার অর্থ পাল্টে যায়। “ক্ষুধার রাজ্যে”—এই ছোট্ট কথাটিই আসলে একটি সামাজিক অবস্থার ঘোষণা। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে নন্দনতত্ত্ব নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। সুকান্ত কবিতা ত্যাগ করছেন না; বরং কবিতাকে জিজ্ঞেস করছেন, অনাহারের সামনে তোমার ভাষা কেমন হবে?
এই প্রশ্নটি একটি মোরগের কাহিনীতেও অন্য রূপে ফিরে আসে। খাদ্যের সন্ধানে প্রাসাদের দিকে যাওয়া মোরগ শেষ পর্যন্ত সেই প্রাচুর্যের অংশীদার হয় না—নিজেই খাদ্যে পরিণত হয়। গল্পটি প্রায় উপকথার মতো সহজ, অথচ শ্রেণিবিন্যাস নির্মম। বাইরে যে ক্ষুধার্ত, ভেতরের প্রাচুর্যে তার প্রবেশাধিকার নেই; সে প্রবেশ করতে পারে ভোগকারী হিসেবে নয়, ভোগ্যবস্তু হিসেবে। সুকান্তের রাজনৈতিক কবিতার শক্তি এখানেই—“শ্রেণিসংগ্রাম” শব্দটি না বলেও তিনি তার সম্পর্কটি দৃশ্যমান করে দিতে পারেন। তাঁর সমকালীন আলোচনা ও পরবর্তী মূল্যায়নেও মোরগ, সিগারেট, দেশলাই কাঠি, শ্রমিক, কৃষক—এই দৈনন্দিন জগতের মধ্যে নিপীড়নের সামাজিক সম্পর্ক খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতাটিই বারবার ধরা হয়েছে।
সিগারেট, দেশলাই কাঠি, সিঁড়ি, রানার—শিরোনামগুলির দিকেই তাকান। বিপ্লব তাঁর কবিতায় শুধু লাল পতাকা নিয়ে আসে না; আসে ব্যবহার্য বস্তু, শ্রমজীবী শরীর, শহরের অবকাঠামো, পেশা ও পরিশ্রমের ভাষায়। ছাড়পত্র সংকলনের সূচিই দেখায়, লেনিন থেকে মজুর, কৃষক, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৬-এর রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব একই কাব্যভুবনে পাশাপাশি রয়েছে।
এমনকি তাঁর হরতাল নামের ছোটগল্পে রেলের ইঞ্জিন, লাইন, সিগন্যাল, ঘণ্টা যেন শ্রমিকদের মতো নিজেদের খাটুনি ও অধিকার নিয়ে সভায় বসে। শিশুসুলভ কল্পনার আবরণ আছে, কিন্তু তার ভেতরের প্রশ্নটি নিখাদ শ্রম-রাজনীতির: যে যন্ত্রকে আমরা কাজ করতে দেখি, তার পেছনের শ্রম, অতিরিক্ত বোঝা ও শোষণের সম্পর্ক কি আমরা দেখি? উইকিসংকলনের শ্রেণিবিন্যাসেও হরতাল রচনাটি ছোটগল্প হিসেবে চিহ্নিত।
ছাড়পত্র: নবজাতকের হাতে পুরোনো পৃথিবীর নোটিশ
সুকান্তের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে পরিষ্কার রূপ সম্ভবত ছাড়পত্র কবিতায়। এখানে একটি নবজাতক আসে। সাধারণ কবিতায় নবজাতক মানে কোমলতা, আশীর্বাদ, পারিবারিক আনন্দ। সুকান্তের নবজাতক জন্মেই যেন অধিকার দাবি করে। পুরোনো পৃথিবীকে সে উত্তরাধিকার সূত্রে যেমন আছে তেমন গ্রহণ করবে না; তার জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে দিয়ে যেতে হবে পূর্ববর্তী প্রজন্মকে।
এই “নতুন বিশ্ব”কে নিছক মানবতাবাদী শুভেচ্ছা হিসেবে পড়লে কবিতার অর্ধেক শক্তি হারিয়ে যায়। সুকান্তের অন্য কবিতা, তাঁর রাজনৈতিক কর্মজীবন এবং বাংলাপিডিয়ার মূল্যায়ন একত্রে পড়লে স্পষ্ট হয়, শোষণহীন সমাজ ছিল তাঁর কাব্যিক ভবিষ্যৎ-কল্পনার কেন্দ্রে।
তবে এখানেই একটি সাবধানতা জরুরি। তাঁর প্রত্যেকটি কবিতাকে পার্টির প্রস্তাবনার সাংকেতিক অনুবাদ বানিয়ে ফেলাও ভুল। সুভাষ মুখোপাধ্যায় পরে খুব স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, সুকান্ত রাজনৈতিক আন্দোলনের কাঁধে চড়ে কবি হননি; রাজনীতিকে তিনি নিজের ভেতরের জিনিস করে তুলেছিলেন। তাঁর কবিতায় স্লোগান ছিল—এ সত্য গোপন করারও কিছু নেই। বরং প্রশ্ন হলো, স্লোগান কখন কেবল উচ্চারণ থেকে কবিতায় রূপান্তরিত হয়েছে।
সুকান্তের সাফল্য যেখানে, সেখানে রাজনৈতিক শব্দ কবিতার বাইরে ঝোলানো প্ল্যাকার্ড নয়; তা অভিজ্ঞতার ভেতর ঢুকে গেছে। আর যেখানে তা পুরোপুরি পারেনি, সেখানে দুর্বলতাও আছে। শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি মানে সেই দুর্বলতা লুকিয়ে দেওয়া নয়।
সুকান্তের সাহিত্যকর্ম: সম্পূর্ণ তালিকা
“সম্পূর্ণ” শব্দটি এখানে একটু সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা দরকার। সুকান্ত সমগ্র প্রস্তুত করতে গিয়ে সম্পাদক সুভাষ মুখোপাধ্যায় নিজেই লিখেছিলেন, রচনাগুলি এত ছড়িয়ে ছিল যে সব লেখা নিঃশেষে উদ্ধার হয়েছে—এ কথা জোর দিয়ে বলা সম্ভব নয়। পরবর্তী সংস্করণেও নতুন গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা ও চিঠি যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ সুকান্তের গ্রন্থপঞ্জি নিজেই এক চলমান সম্পাদনার ইতিহাস।
| রচনা | ধরন | প্রকাশকাল | নোট |
| আকাল | সম্পাদিত কবিতা সংকলন | ১৯৪৪ | ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের পক্ষে সম্পাদিত। |
| ছাড়পত্র | কাব্যগ্রন্থ | ১৯৪৭ | প্রকাশের প্রস্তুতি সুকান্ত জীবদ্দশায় দেখে গিয়েছিলেন; শক্তিশালী সূত্র অনুযায়ী বই আকারে প্রকাশ তাঁর মৃত্যুর পরে ১৩৫৪ বঙ্গাব্দেই। তাই “জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র কাব্যগ্রন্থ” কথাটি পুরোপুরি নির্ভুল নয়। |
| পূর্বাভাস | কাব্যগ্রন্থ | ১৯৫০ | মরণোত্তর প্রকাশিত। |
| মিঠেকড়া | কবিতা ও ছড়ার গ্রন্থ | ১৯৫১ | মরণোত্তর; ব্যঙ্গ, খাদ্যসংকট ও সামাজিক বিষয়ের রচনাও রয়েছে। |
| অভিযান | কাব্য/দীর্ঘ রচনার সংকলন | ১৯৫৩ | মরণোত্তর; সুকান্ত সমগ্র-এর বিন্যাসে সূর্য-প্রণামও এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। |
| ঘুম নেই | কাব্যগ্রন্থ | ১৯৫৪ | বাংলাপিডিয়া ১৯৫৪ সাল দেয়; কিছু অনলাইন সূত্রে ১৯৫০ পাওয়া যায়, তাই সাল নিয়ে সামান্য উৎসভেদ আছে। এখানে বাংলাপিডিয়ার সাল অনুসরণ করা হয়েছে। |
| হরতাল | গল্প ও নাট্যধর্মী গদ্যের সংকলন | ১৯৬২ | বিভিন্ন তালিকায় কখনো কাব্যগ্রন্থ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সুকান্ত সমগ্র-এর হরতাল বিভাগে একাধিক গদ্যরচনা রয়েছে এবং শিরোনাম রচনাটি উইকিসংকলনে “ছোট গল্প” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। |
| গীতিগুচ্ছ | সঙ্গীতগ্রন্থ | ১৯৬৫ | গান ও সঙ্গীতরচনার মরণোত্তর সংকলন। |
| সুকান্ত সমগ্র | সংকলিত রচনাবলি | ১৯৫৭ থেকে | সারস্বত লাইব্রেরির সংস্করণে প্রথম প্রকাশ ৩১ শ্রাবণ ১৩৬৪; পরবর্তী সংস্করণে নতুন রচনা ও পত্র সংযোজিত হয়েছে। |
“কিশোর কবি” নামের মিষ্টি ফাঁদ
সুকান্তকে “কিশোর কবি” বলা ভুল নয়। তিনি সত্যিই কিশোর বয়সেই বিস্ময়কর পরিণতিতে লিখেছেন এবং কুড়ি বছর বয়সেই মারা গেছেন। সমস্যা শুরু হয় যখন এই বিশেষণটি তাঁর কবিতার প্রধান ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।
কিশোর প্রতিভার গল্প নিরাপদ। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে তাকে সহজে রাখা যায়। অকালমৃত্যু, দারিদ্র্য, অসুখ, ঝলসানো রুটির চাঁদ—সব মিলিয়ে একটি আবেগময় প্রতিকৃতি তৈরি হয়। কিন্তু সেই ছবিতে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী সুকান্তকে একটু পিছনে সরিয়ে দিলেই তাঁর কবিতার ক্রোধও অনেকটা ব্যক্তিগত দুঃখে পরিণত হয়। দুর্ভিক্ষ তখন ইতিহাস নয়, “ক্ষুধার অনুভূতি”; শ্রমিক তখন শ্রেণির মানুষ নয়, কেবল দরিদ্র চরিত্র; নতুন পৃথিবী তখন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, সাধারণ আশাবাদ।
সুকান্তকে এভাবে নিরস্ত্র করে পড়া তাঁর প্রতি সুবিচার নয়।
আবার উল্টো দিকের ভুলও আছে। তাঁকে কেবল “বিপ্লবের কবি” বানিয়ে তাঁর ভেতরের অন্য মানুষটিকে মুছে দেওয়া। সমকালীন বিবরণে তাঁকে একই সঙ্গে গভীর রোমান্টিক স্বভাবের মানুষ হিসেবে মনে রাখা হয়েছে। তাঁর চিঠিপত্রে প্রেম আছে, প্রকৃতির কাছে পালিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে, অভিমান আছে, নির্জনতার তৃষ্ণা আছে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাই সুকান্ত সমগ্র-এর ভূমিকায় প্রায় বিস্ময়ের সঙ্গে একই মানুষকে দেখান কখনো জনতার দিকে ছুটতে, কখনো নিঃসঙ্গতা চাইতে; কখনো বিষণ্ন, কখনো প্রবল আশাবাদী।
এই দ্বৈততা সুকান্তকে দুর্বল করে না, বরং সময়ের করে। মার্ক্সবাদ তাঁকে অনুভূতিহীন পার্টিকর্মীতে বদলে দেয়নি। প্রেম ও বিপ্লব, বিষণ্নতা ও সংগঠন, ব্যক্তিগত আঘাত ও সামষ্টিক ভবিষ্যৎ—সবই একই কুড়ি বছরের শরীরে ছিল।
আর এখানেই তাঁর পার্টিজীবনের একটি অস্বস্তিকর দিকও সামনে আসে।
এক বন্ধুকে লেখা চিঠিতে অসুস্থ সুকান্ত লিখছেন, পরীক্ষা শেষ করেই মাসের পর মাস পার্টির কাজে খেটেছেন; শরীর ভেঙে পড়ার পর সংগঠন থেকে পাওয়া সামান্য আর্থিক সহায়তা ও অপর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থায় তিনি গভীরভাবে আঘাত পেয়েছিলেন। চিঠিটিতে নিজের “লেখকসত্তা”র অভিমান এবং “কর্মীসত্তা”র আবার উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছার দ্বন্দ্ব তিনি নিজেই প্রকাশ করেন।
এ থেকে সরাসরি বলা ঠিক হবে না যে পার্টি তাঁকে কেবল প্রচারের যন্ত্র হিসেবে দেখত—তার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। কিন্তু এটুকু বলা যায়, সংগঠনের প্রতি তাঁর আনুগত্য নির্বিকার ছিল না। সেখানে প্রত্যাশা ছিল, অভিমান ছিল, ক্লান্তি ছিল। যে মানুষ নিজের রাজনৈতিক সংগঠনকেও নিজের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা থেকে অব্যাহতি দেননি, তাকে নিখুঁত পার্টি-পোস্টারে রূপান্তর করাও ইতিহাসের প্রতি অন্যায়।
পূর্বাভাস থেকে ঘুম নেই: কুড়ি বছরেই বদলে যাচ্ছিলেন তিনি
সুকান্তের অকালমৃত্যু নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলোর একটি বলেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কঠোর সমালোচক সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর মতে, পূর্বাভাস আর ঘুম নেই-এর মধ্যে বড় পার্থক্য ছিল; এমনকি ছাড়পত্রর প্রথম দিকের কবিতা ও শেষ দিকের কবিতার মধ্যেও স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়।
এই পর্যবেক্ষণটি আমাদের “কিশোর কবি” ধারণাকে আরও জটিল করে তোলে। আমরা যাঁকে বিশ বছর বয়সে স্থির ছবি হিসেবে দেখি, তিনি বাস্তবে দ্রুত বদলাচ্ছিলেন। প্রথম দিকের অনেক রচনায় দলীয় স্লোগান সরাসরি এসেছে—সমকালীন সমালোচকরাও তা স্বীকার করেছেন। কিন্তু বয়স ও আত্মবিশ্বাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রকাশভঙ্গি আরও স্বাধীন হচ্ছিল।
সুভাষ এমনও মনে করতেন, সুকান্ত বেঁচে থাকলে তাঁর কিশোরবয়সের কিছু লেখা হয়তো ভবিষ্যতের কোনো সুকান্ত সমগ্র-এ রাখতেই চাইতেন না। কথাটি শ্রদ্ধাঞ্জলির দিনে অস্বস্তিকর শোনাতে পারে। কিন্তু এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী—কবিকে পাথরের মূর্তি না ভেবে একজন বিকাশমান শিল্পী হিসেবে দেখা?
তিনি যে কবি হয়ে উঠেছিলেন, সেটিই তাঁর শেষ পরিচয় ছিল না। সেটি ছিল শুরু।
স্বাধীনতার দরজা খুলল, কবি তখন আর নেই
১৯৪৪ সালের শেষদিকে বেনারস সফরের সময় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর সুকান্তের স্বাস্থ্য আর পুরোপুরি ফিরল না। ক্রমে যক্ষ্মা ধরা পড়ে। চিকিৎসা, হাসপাতাল, কাজ, অর্থাভাব—সবকিছুর মধ্যে শরীর ক্ষয় হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কলকাতার যাদবপুর টিবি হাসপাতালে ১৩ মে ১৯৪৭ তিনি মারা যান। বয়স মাত্র কুড়ি।
তারপর ক্যালেন্ডার এগোল মাত্র তিন মাস দুই দিন।
১৫ আগস্ট ১৯৪৭ ভারত স্বাধীন হলো। সেদিনই সুকান্তের একুশতম জন্মদিন হওয়ার কথা ছিল। যে তরুণ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লিখেছেন, স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছেন, যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের ভেতর নতুন সমাজের সম্ভাবনা খুঁজেছেন—স্বাধীনতা এসে দাঁড়াল ঠিক তাঁর জন্মদিনে, কিন্তু তিনি নেই।
ইতিহাস কখনো কখনো তারিখ দিয়ে এমন নির্মম বাক্য লিখে, যা কোনো কবির পক্ষেও লেখা কঠিন।
আর স্বাধীনতার সঙ্গে এই সম্পর্কটিও সরল নয়। সুকান্ত যে “নতুন বিশ্বের” কথা লিখেছিলেন, তা কেবল ব্রিটিশ পতাকা নেমে যাওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর স্বপ্নে ছিল ক্ষুধার অবসান, শোষণমুক্ত মানুষের জীবন, শ্রমজীবীর অধিকার। ফলে ১৫ আগস্ট তাঁর জন্য হয়তো শেষ বিন্দু হতো না; বরং নতুন প্রশ্নের শুরু হতো। স্বাধীন দেশে তিনি কী লিখতেন? দেশভাগ নিয়ে? উদ্বাস্তু নিয়ে? খাদ্যসংকট নিয়ে? কৃষকের আন্দোলন নিয়ে? রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে পড়া নতুন শ্রেণির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন হতো?
আমরা জানি না। জানার উপায়ও নেই।
সেই অজানাটাই তাঁর অকালমৃত্যুর সবচেয়ে বড় শূন্যতা।
শতবর্ষে সুকান্তকে তাঁর রাজনীতি ফিরিয়ে দেওয়া
আজ, ১৫ আগস্ট ২০২৬-এ সুকান্তের জন্মের একশো বছর পূর্ণ হলো। শতবর্ষ সাধারণত স্মৃতিকে চকচকে করে। মূর্তি পরিষ্কার হয়, নির্বাচিত কবিতা আবৃত্তি হয়, পরিচিত উপমা আবার সামাজিক মাধ্যমে ফিরে আসে। কিন্তু সুকান্তকে সত্যিই স্মরণ করতে চাইলে তাঁকে আরও মসৃণ করে তোলার দরকার নেই। বরং তাঁর কবিতার ধারালো অংশগুলিকে আবার দৃশ্যমান করা দরকার।
এর অর্থ এই নয় যে আজকের পাঠককে সুকান্তের রাজনৈতিক মতাদর্শ গ্রহণ করতেই হবে। সাহিত্য পড়ার কাজ আনুগত্য ঘোষণা করা নয়। কিন্তু একজন ঘোষিত মার্ক্সবাদী, সক্রিয় কমিউনিস্ট কর্মী ও পার্টি-সাংবাদিকের কবিতা থেকে তাঁর রাজনীতি বাদ দিয়ে শুধু মানবিকতা রেখে দিলে পাঠটাই ইতিহাসবিহীন হয়ে যায়। বাংলাপিডিয়ার ভাষায়ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের পাশাপাশি শোষণমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য।
সুকান্তের রাজনৈতিক পাঠ তাই তাঁর কবিতাকে সংকীর্ণ করে না; বরং অনেক পরিচিত কবিতাকে নতুন করে খুলে দেয়। তখন হে মহাজীবন শুধু ক্ষুধার কবিতা নয়, ক্ষুধা কীভাবে নন্দনের অর্থ বদলে দেয় তার কবিতা। একটি মোরগের কাহিনী শুধু ব্যঙ্গ নয়, প্রাচুর্য ও বঞ্চনার শ্রেণি-সম্পর্কের কাহিনি। হরতাল শুধু কিশোরদের মজার গল্প নয়, শ্রম ও ধর্মঘটের কল্পনামূলক পাঠ। আর ছাড়পত্র শুধু নবজাতকের প্রতি আশীর্বাদ নয়, পুরোনো সামাজিক ব্যবস্থার কাছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দাবি।
সম্ভবত এখানেই সুকান্ত আজও অস্বস্তিকরভাবে তরুণ। তাঁর বয়স বাড়েনি, কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলোর বয়স হয়েছে একশো বছর। ক্ষুধা, যুদ্ধ, শ্রমের মর্যাদা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, সম্পদের অসম বণ্টন—শব্দগুলোর রাজনৈতিক মানে বদলেছে, পৃথিবী বদলেছে, তবু এগুলো ইতিহাসের জাদুঘরে চলে যায়নি। তাই তাঁকে শুধু স্মরণ করা যথেষ্ট নয়; তাঁকে নিয়ে অস্বস্তিতে পড়াও দরকার।
আগস্টের দুপুরে আবার সেই ছাড়পত্র
আমার কাছে এই শতবর্ষে সুকান্তের সবচেয়ে বড় পুনরাবিষ্কার তাঁর অকালমৃত্যু নয়, তাঁর অসমাপ্ত হয়ে থাকা।
মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি যে উত্তরগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো সব নিখুঁত ছিল না। তাঁর কিছু কবিতা স্লোগানের খুব কাছে গেছে, কিছু রচনা অপরিণত, তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আনুগত্যের পাশাপাশি অভিমানও ছিল, রোমান্টিক মন কখনো সংগঠনের কঠোরতার সঙ্গে পুরো মেলেনি। আর ঠিক সেই কারণেই তিনি পোস্টারের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়—তিনি ছিলেন রক্তমাংসের, পরিবর্তনশীল, দ্বন্দ্বময় একজন মানুষ। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে যাঁর কবিতা তখনই নতুন বাঁক নিচ্ছিল, যখন মৃত্যু এসে পথটি কেটে দিয়েছিল।
শতবর্ষে তাই “কিশোর কবি” কথাটি মুছে দেওয়ার দরকার নেই। শুধু তার পাশে আরেকটি পরিচয় ফিরিয়ে রাখা দরকার—সংগঠক, সম্পাদক, কমিউনিস্ট, রাজনৈতিক মানুষ।
তখন আমরা বুঝতে পারি, ছাড়পত্রর সেই নবজাতক কেবল ভবিষ্যতের প্রতীক ছিল না। তার দাবি ছিল পৃথিবীর ওপর।
আজ একশো বছর পরে আগস্টের ভারী বাতাসে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সুকান্ত নিজেও যেন সেই শিশুটির মতো বাংলা কবিতার দরজায় এসেছিলেন—খুব অল্প সময়ের জন্য, কিন্তু মুষ্টিবদ্ধ এক ভবিষ্যৎ নিয়ে। তিনি স্বাধীনতার সকাল দেখেননি। নিজের কবিতার পূর্ণ পরিণতিও দেখেননি। তবু যে পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে যাওয়ার দায় তিনি কবিতার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সেই কাজের ছাড়পত্রটি এখনও বাতিল হয়নি।



