ক্যালেন্ডারের পাতায় প্রতিটি দিনই মানব ইতিহাসের কোনো না কোনো বিজয়ের গল্প, সংঘাত, আবিষ্কার আর নৈতিক অর্জনের নীরব সাক্ষী। তবে ২৬শে আগস্ট দিনটি একটু আলাদা। রাজনীতি, নাগরিক অধিকার, বিজ্ঞান এবং শিল্পের জগতে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে এই দিনটি।
অষ্টাদশ শতাব্দীর ফ্রান্সের বিপ্লবী প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে উপনিবেশিক বাংলার ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, আমেরিকার নারীদের ভোটাধিকার অর্জন কিংবা মহাকাশ যুগের শুরুর দিকের রকেট প্রযুক্তির বিকাশ—২৬শে আগস্ট বারবার মানবসমাজ ও বিজ্ঞানের গতিপথ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। মানব ইতিহাসের এই অবিস্মরণীয় অধ্যায়গুলোকে এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
বাঙালি এবং দক্ষিণ এশীয় বলয়: প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ ও ঐতিহ্য
ভারতবর্ষের ইতিহাস, বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গের আগে ও পরের বাংলার ইতিহাস, উপনিবেশবাদবিরোধী বীরত্ব, তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের গল্পে সমৃদ্ধ। ২৬শে আগস্ট এই অঞ্চলের মানুষের সাহস ও রাজনৈতিক সচেতনতার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
রডা অ্যান্ড কোম্পানির অস্ত্র লুণ্ঠন (কলকাতা, ১৯১৪)
১৯১৪ সালের ২৬শে আগস্ট, ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত কলকাতার বুকে ঘটে যায় এক দুঃসাহসিক ও রোমাঞ্চকর ঘটনা। মুক্তি সংঘ এবং অনুশীলন সমিতির সাথে যুক্ত বাংলার তরুণ বিপ্লবীরা—যাঁদের মধ্যে বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী, হাবু মুখার্জি এবং শ্রীশ চন্দ্র মিত্র (হাবু নামে পরিচিত) ছিলেন অন্যতম—ব্রিটিশদের প্রধান আগ্নেয়াস্ত্র সংস্থা ‘রডা অ্যান্ড কোম্পানি’র একটি বড় চালান ছিনতাই করেন।
কাস্টমসের গাড়িচালকের ছদ্মবেশে এই স্বাধীনতা সংগ্রামীরা সফলভাবে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরিয়ে ফেলেন, যার মধ্যে ছিল:
-
৫০টি মজার সি৯৬ (Mauser C96) সেমি-অটোমেটিক পিস্তল
-
৪৬,০০০ রাউন্ড বিশেষ ৭.৬৩×২৫ মিমি গোলাবারুদ
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাটিকে উপনিবেশিক পুলিশের ইতিহাসে “দিনের আলোয় সর্বশ্রেষ্ঠ ডাকাতি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। এই নিখুঁত ও প্রাণঘাতী অস্ত্রগুলো পরবর্তীতে বাংলা এবং উত্তর ভারতের একাধিক বিপ্লবী দলের হাতে পৌঁছায়, যা গদর ষড়যন্ত্র এবং বাঘা যতীনের নেতৃত্বে সশস্ত্র প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
ফুলবাড়ী অভ্যুত্থান এবং ফুলবাড়ী দিবস (বাংলাদেশ, ২০০৬)
আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাসে ২৬শে আগস্ট প্রতি বছর ‘ফুলবাড়ী দিবস’ হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালিত হয়। ২০০৬ সালের এই দিনে, এশিয়া এনার্জি (একটি ব্রিটিশ-সমর্থিত বহুজাতিক কর্পোরেশন) দ্বারা প্রস্তাবিত একটি উন্মুক্ত কয়লা খনি প্রকল্পের প্রতিবাদে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় ৫০ হাজারেরও বেশি কৃষক, আদিবাসী, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দা রাস্তায় নেমে আসেন।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের কারণে লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার এবং হাজার হাজার হেক্টর উর্বর, বহুমুখী ফসলি জমি ধ্বংস হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি ছিল। শান্তিপূর্ণ এই পদযাত্রার সময়, তৎকালীন আধা-সামরিক বাহিনী (বাংলাদেশ রাইফেলস) বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। তরিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ সালেক এবং আল আমিন—এই তিন তরুণ কর্মী ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান এবং ২০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। এর ফলে দেশব্যাপী যে ব্যাপক নাগরিক অবাধ্যতা ও তীব্র গণ-আন্দোলন শুরু হয়, তার মুখে সরকার ঐতিহাসিক ৬-দফা ফুলবাড়ী চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয় এবং উন্মুক্ত খনি প্রকল্প বাতিল করা হয়। আজ ২৬শে আগস্ট বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত ন্যায়বিচার, সম্প্রদায়ের সংহতি এবং সম্পদ রক্ষার একটি চিরস্থায়ী আন্তর্জাতিক প্রতীক।
মধ্যযুগের ক্রনিকল: চিত্তোরগড় অবরোধ (১৩০৩)
১৩৩ সালের ২৬শে আগস্ট, দিল্লি সালতানাতের সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি আধুনিক রাজস্থানের গুহিলা রাজা রত্নসিংহের (রতন সিং) শক্ত ঘাঁটি, দুর্ভেদ্য চিত্তোরগড় দুর্গের আট মাস দীর্ঘ অবরোধ সম্পন্ন করেন। এই অবরোধটি মধ্যযুগীয় ভারতের সবচেয়ে বেশি চর্চিত এবং নাটকীয় সামরিক অভিযানগুলোর মধ্যে একটি, যা পরবর্তীতে ১৫৪০ সালে মালিক মুহাম্মদ জায়সীর মহাকাব্যিক কবিতা ‘পদ্মাবত’-এ অমর হয়ে আছে। এই ঘটনা সমগ্র উত্তর ভারতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করে দেয় এবং রাজপুত রাজ্যগুলোর ওপর দিল্লি সালতানাতের সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে।
আন্তর্জাতিক উদ্যাপন ও বৈশ্বিক দিবসসমূহ

২৬শে আগস্ট মানবাধিকার, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং প্রাণী কল্যাণের প্রচার ও প্রসারের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় দিবস পালন করা হয়।
নারী সমতা দিবস
প্রতিনিধি বেলা আবজাগের (Bella Abzug) আহ্বানে ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, ‘নারী সমতা দিবস’ ১৯২০ সালের ২৬শে আগস্ট মার্কিন সংবিধানের ১৯তম সংশোধনীর আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের দিনটিকে স্মরণ করে। এই সংশোধনী ফেডারেল এবং রাজ্য সরকারগুলোকে লিঙ্গের ভিত্তিতে ভোটাধিকার অস্বীকার করতে নিষেধ করেছিল। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই দিনটিকে নারীদের চলমান চ্যালেঞ্জগুলো—যেমন মজুরি বৈষম্য, রাজনীতিতে কম প্রতিনিধিত্ব, এবং শিক্ষা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় বাধা—মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবে পালন করে।
বীর দিবস (নামিবিয়া)
২৬শে আগস্ট দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ নামিবিয়ায় একটি অত্যন্ত ভাবগম্ভীর জাতীয় ছুটির দিন। এটি ১৯৬৬ সালের ওমুলুগোম্বাশে যুদ্ধকে স্মরণ করে, যেখানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি অফ নামিবিয়া’ (PLAN)-এর যোদ্ধারা প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। এই যুদ্ধটি ২৪ বছরের নামিবিয়ান স্বাধীনতা যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে চিহ্নিত, যা ১৯৯০ সালে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব অর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।
আন্তর্জাতিক কুকুর দিবস
প্রাণী কল্যাণ কর্মী এবং লেখিকা কলিন পেজ দ্বারা ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দিবসটি প্রতি বছর ২৬শে আগস্ট বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। এই দিনটির মূল ফোকাস হলো কুকুর উদ্ধার কার্যক্রম, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা লাখ লাখ কুকুরের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ, বাণিজ্যিক প্রজননের চেয়ে দত্তক নেওয়াকে উৎসাহিত করা এবং সেইসব কর্মজীবী কুকুরের প্রতি সম্মান জানানো যারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, উদ্ধারকারী দল এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাহায্য করে।
বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ঘটনাবলি
মধ্যযুগ থেকে শুরু করে স্নায়ুযুদ্ধ এবং একুশ শতক পর্যন্ত, ২৬শে আগস্ট রূপান্তরমূলক সামরিক যুদ্ধ, দার্শনিক ঘোষণাপত্র এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে।
১০৭১: মানজিকার্টের যুদ্ধ
মধ্যযুগের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সামরিক সংঘর্ষগুলোর মধ্যে একটিতে, সুলতান আল্প আরস্লানের নেতৃত্বে সেলজুক তুর্কি সেনাবাহিনী মানজিকার্টের কাছে (আধুনিক তুরস্কের মালাজগির্ট) সম্রাট রোমানোস চতুর্থ ডায়োজিনেসের অধীনে থাকা বাইজেন্টাইন বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এই পরাজয়ের ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য আনাতোলিয়ায় বিশাল ভূখণ্ড ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এটি খ্রিষ্টান বিশ্বের পূর্ব সীমান্তকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেয় এবং ১০৯৫ সালে পোপ আরবান দ্বিতীয়ের প্রথম ক্রুসেডের ডাক দেওয়ার পরোক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করে।
১৩৪৬: ক্রেসির যুদ্ধ
শতবর্ষের যুদ্ধের (Hundred Years’ War) সময় উত্তর ফ্রান্সে সংঘটিত ক্রেসির যুদ্ধে, রাজা এডওয়ার্ড তৃতীয় এবং তার ১৬ বছর বয়সী ছেলে এডওয়ার্ড দ্য ব্ল্যাক প্রিন্সের অধীনে একটি সংখ্যালঘু ইংরেজ এবং ওয়েলশ সেনাবাহিনী, রাজা ফিলিপ ষষ্ঠের ফরাসি অশ্বারোহী এবং জেনোজ ক্রসবোম্যানদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। এই যুদ্ধ ইউরোপীয় সামরিক কৌশলে একটি বিপ্লবের সূচনা করে: ইংলিশ লংবো বা লম্বা ধনুকের বিধ্বংসী পাল্লা এবং বর্ম-ভেদী ক্ষমতার কারণে ভারী বর্মযুক্ত অশ্বারোহী বাহিনী মূলত অপ্রচলিত হয়ে পড়ে, যা ঐতিহ্যবাহী বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের পতন ডেকে আনে।
১৭৮৯: মানুষ ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণাপত্র
ফরাসি বিপ্লবের শুরুর দিকের মাসগুলোতে, ভার্সাইয়ের জাতীয় গণপরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মানুষ ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণাপত্র’ (Déclaration des droits de l’homme et du citoyen) অনুমোদন করে। থমাস জেফারসনের পরামর্শে মার্কুইস দে লাফায়েট কর্তৃক খসড়াকৃত এই ১৭-দফার সনদে ঘোষণা করা হয় যে, সকল মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং অধিকারে সমান। এটি কিছু মৌলিক নীতি প্রবর্তন করে, যার মধ্যে ছিল:
-
জনগণের সার্বভৌমত্ব (ক্ষমতা জাতির ওপর ন্যস্ত, রাজতন্ত্রের ওপর নয়)
-
বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা
-
দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ বলে গণ্য হওয়ার অধিকার
-
ব্যক্তিগত সম্পত্তির সুরক্ষা
এই দলিলটি আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনের একটি ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রকে সরাসরি অনুপ্রাণিত করেছিল।
১৮৯৫: অল্টারনেটিং কারেন্ট (AC) দিয়ে নায়াগ্রা জলপ্রপাত কাজে লাগানো
১৮৯৫ সালের ২৬শে আগস্ট, নায়াগ্রা জলপ্রপাতের অ্যাডামস পাওয়ার প্ল্যান্ট বাণিজ্যিকভাবে বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহ শুরু করে। নিকোলা টেসলার পলিফেজ অল্টারনেটিং কারেন্ট (AC) পেটেন্টের ওপর ভিত্তি করে এবং জর্জ ওয়েস্টিংহাউসের প্রকৌশলে তৈরি এই স্থাপনাটি টমাস এডিসনের ডাইরেক্ট কারেন্ট (DC) সিস্টেমের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক “বিদ্যুতের যুদ্ধ” বা “War of the Currents”-এর সমাপ্তি টানে। এটি প্রমাণ করে যে উচ্চ-ভোল্টেজের এসি কারেন্ট দীর্ঘ দূরত্বে দক্ষতার সাথে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে, যা আজকের আধুনিক বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক গ্রিডের ভিত্তি স্থাপন করে।
১৯৫৭: সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম আইসিবিএম (ICBM) পরীক্ষা
স্নায়ুযুদ্ধ একটি নতুন মোড় নেয় যখন সোভিয়েত সংবাদ সংস্থা তাস (TASS) বিশ্বের প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM) আর-৭ সেমিওরকার (R-7 Semyorka) সফল উড্ডয়নের ঘোষণা দেয়। প্রধান রকেট ডিজাইনার সের্গেই কোরোলেভ দ্বারা প্রকৌশলকৃত, মাল্টি-স্টেজ এই মিসাইলটি কাজাখস্তানের বৈকানুর কসমোড্রোম থেকে কামচাটকা উপদ্বীপ পর্যন্ত ৬,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দেয়। এই যুগান্তকারী পরীক্ষাটি নিশ্চিত করে যে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত এখন কয়েক মিনিটের মধ্যে পারমাণবিক হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ঠিক এই রকেট প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই মাত্র ছয় সপ্তাহ পরে স্পুটনিক-১ কক্ষপথে উৎক্ষেপিত হয়েছিল।
২০২১: কাবুল বিমানবন্দরে হামলা
আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর প্রত্যাহারের শেষ দিনগুলোতে, ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশের (ISKP) সাথে যুক্ত একজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অ্যাবে গেটের বাইরে নিজেকে উড়িয়ে দেয়। এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে দেশ ছেড়ে পালাতে চাওয়া প্রায় ১৭০ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক এবং ১৩ জন মার্কিন সামরিক কর্মী প্রাণ হারান। এই আক্রমণটি আফগানিস্তানের দুই দশকের যুদ্ধের অন্যতম রক্তাক্ত ও মর্মান্তিক দিন হিসেবে বিবেচিত।
২৬শে আগস্টের বিখ্যাত জন্মদিনসমূহ
ইতিহাসের বেশ কয়েকজন অত্যন্ত প্রভাবশালী বিজ্ঞানী, মানবতাবাদী, লেখক এবং শিল্পীর জন্ম হয়েছে এই দিনে।
অ্যান্টোইন-লরেন্ট ডি ল্যাভয়সিয়ে (১৭৪৩–১৭৯৪)
“আধুনিক রসায়নের জনক” হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ল্যাভয়সিয়ে রসায়নকে একটি গুণগত বিষয় থেকে একটি কঠোর পরিমাণগত বিজ্ঞান বা কোয়ান্টিটেটিভ ডিসিপ্লিনে রূপান্তরিত করেন। তাঁর সাফল্যের মধ্যে রয়েছে:
-
ভরের নিত্যতা সূত্র প্রমাণ করা (“বস্তু সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না”)।
-
ফ্লজিস্টন তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করা এবং অক্সিজেন (১৭৭৮) ও হাইড্রোজেন (১৭৮৩) সঠিকভাবে শনাক্ত ও নামকরণ করা।
-
মৌলগুলোর প্রথম আধুনিক তালিকা তৈরি করা এবং মেট্রিক পদ্ধতি নির্মাণে সাহায্য করা।
দুঃখজনকভাবে, ফরাসি বিপ্লবের ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ (Reign of Terror) চলাকালীন কর আদায়কারী হিসেবে তাঁর ভূমিকার কারণে তিনি রোষানলে পড়েন এবং ১৭৯৪ সালে গিলোটিনে তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়।
মাদার তেরেসা (সেন্ট তেরেসা অফ ক্যালকাটা) (১৯১০–১৯৯৭)
আধুনিক উত্তর মেসিডোনিয়ার স্কোপজে-তে আনজেজ গোঞ্জা বোজাঝিউ নামে জন্মগ্রহণ করা মাদার তেরেসা ১৯২৯ সালে ভারতে আসেন। ১৯৫০ সালে তিনি কলকাতায় ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’ প্রতিষ্ঠা করেন, এবং এইচআইভি/এইডস, কুষ্ঠরোগ এবং চরম দারিদ্রে ভোগা মানুষের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং ১৯৮০ সালে ভারতরত্ন (ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান) লাভ করেন। ২০১৬ সালে ক্যাথলিক চার্চ তাকে ‘সেন্ট’ বা সন্ত হিসেবে ঘোষণা করে। তাঁর কাজ বিশ্বজুড়ে নিঃস্বার্থতা এবং মানবিক সেবার এক অনন্য প্রতীক।
ক্যাথরিন জনসন (১৯১৮–২০২০)
নাসার (NASA) একজন পথপ্রদর্শক আফ্রিকান আমেরিকান গণিতবিদ ক্যাথরিন জনসন। মহাকাশবিদ্যার অরবিটাল মেকানিক্স নিয়ে তাঁর নির্ভুল হিসাব-নিকাশ আমেরিকার প্রাথমিক মানব মহাকাশ ফ্লাইটের সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ল্যাংলি রিসার্চ সেন্টারের একটি পৃথক অংশে “মানব কম্পিউটার” হিসেবে কাজ শুরু করে তিনি পরবর্তীতে:
-
অ্যালান শেপার্ডের ১৯৬১ সালের ফ্লাইটের (মহাকাশে প্রথম আমেরিকান) গতিপথ গণনা করেন।
-
জন গ্লেনের ১৯৬২ সালের পৃথিবীর চারপাশের কক্ষপথ পরিভ্রমণের ডিজিটাল কম্পিউটার গণনা ব্যক্তিগতভাবে যাচাই করেন।
-
১৯৬৯ সালে চাঁদে অ্যাপোলো ১১ মিশনের লঞ্চ উইন্ডো এবং ব্যাকআপ পথ গণনা করেন।
মার্গট লি শেটারলির বই এবং পরবর্তীতে ‘হিডেন ফিগারস’ (Hidden Figures) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অসামান্য অবদান ব্যাপক জনসমক্ষে আসে এবং ২০১৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম লাভ করেন।
জুলিও কর্টাজার (১৯১৪–১৯৮৪)
ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যের উত্থানের (el Boom) অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব, আর্জেন্টাইন লেখক জুলিও কর্টাজার গতানুগতিক গল্প বলার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তাঁর ১৯৬৩ সালের উপন্যাস রায়ুয়েলা (Rayuela / Hopscotch) একটি উন্মুক্ত আখ্যান বা ওপেন-এন্ডেড ন্যারেটিভ অফার করে, যা ক্রমানুসারে পড়া যায় অথবা একটি রিডিং প্ল্যান অনুযায়ী অধ্যায়গুলোর মধ্যে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়া যায়। পরাবাস্তববাদ, অস্তিত্ববাদী দর্শন এবং শহুরে পর্যবেক্ষণের তাঁর এই মিশ্রণ সমসাময়িক বিশ্ব সাহিত্যকে আজও প্রভাবিত করে।
২৬শে আগস্টের উল্লেখযোগ্য প্রয়াণ
এই দিনে পৃথিবী চিকিৎসাবিজ্ঞান, বিমান চলাচল, মনোবিজ্ঞান এবং শিল্পকলায় বেশ কিছু পথিকৃৎকে বিদায় জানিয়েছে।
অ্যান্থনি ফন লিউয়েনহুক (১৬৩২–১৭২৩)
নেদারল্যান্ডের ডেলফ্ট শহরের একজন স্বশিক্ষিত ব্যবসায়ী লিউয়েনহুক, প্রায় ৩০০ গুণ ম্যাগনিফিকেশন বা বিবর্ধন ক্ষমতাসম্পন্ন একক-লেন্স মাইক্রোস্কোপ বা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ডিজাইন করে জীববিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। অত্যন্ত ধৈর্যশীল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, মানব ইতিহাসে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে যা দেখতে এবং নথিভুক্ত করতে সক্ষম হন:
-
মাইক্রোস্কোপিক এককোষী জীব, যাকে তিনি অ্যানিমালকিউলস (animalcules) বলতেন (বর্তমানে ব্যাকটেরিয়া এবং প্রোটোজোয়া নামে পরিচিত)।
-
কৈশিক নালির (capillaries) মাধ্যমে রক্তকণিকার সঞ্চালন।
-
পেশী ফাইবার এবং শুক্রাণুর গঠন।
লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির কাছে পাঠানো তাঁর নিখুঁত এবং বিস্তারিত চিঠিগুলো মাইক্রোবায়োলজি বা অণুজীববিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
উইলিয়াম জেমস (১৮৪২–১৯১০)
ঔপন্যাসিক হেনরি জেমসের ভাই, উইলিয়াম জেমস ছিলেন মনোবিজ্ঞান এবং দর্শন উভয় ক্ষেত্রেই একজন মৌলিক চিন্তাবিদ। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পরীক্ষামূলক মনোবিজ্ঞান পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ১৮৯০ সালের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্সিপালস অফ সাইকোলজি’ (The Principles of Psychology) “স্ট্রিম অফ কনশাসনেস” বা চেতনার প্রবাহ-এর মতো চিরস্থায়ী ধারণাগুলোর প্রবর্তন করে, অন্যদিকে তাঁর দার্শনিক লেখাগুলো প্র্যাগম্যাটিজম (Pragmatism) বা প্রয়োগবাদের প্রতিষ্ঠা করে—যাতে বলা হয় যে একটি ধারণার সত্যতা তার ব্যবহারিক ফলাফল দিয়ে পরিমাপ করা উচিত।
চার্লস লিন্ডবার্গ (১৯০২–১৯৭৪)
১৯২৭ সালের মে মাসে লিন্ডবার্গ বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যখন তিনি তার কাস্টম-বিল্ট সিঙ্গেল-ইঞ্জিন মনোপ্লেন, ‘স্পিরিট অফ সেন্ট লুইস’ (Spirit of St. Louis) নিয়ে নিউইয়র্ক থেকে প্যারিস পর্যন্ত ৩৩.৫ ঘণ্টায় বিরতিহীনভাবে উড়ে যান। তিনিই প্রথম একক পাইলট যিনি নন-স্টপ ট্রান্সআটলান্টিক ফ্লাইট সম্পন্ন করেছিলেন। তাঁর এই অর্জন বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছিল।
এ. কে. হাঙ্গাল (অবতার কিষাণ হাঙ্গাল) (১৯১৪–২০১২)
শিয়ালকোটে (আধুনিক পাকিস্তানে) জন্মগ্রহণ করা এ. কে. হাঙ্গাল ছিলেন একজন একনিষ্ঠ উপনিবেশবিরোধী কর্মী, যিনি ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে ব্রিটিশদের হাতে একাধিকবার জেল খেটেছিলেন। বোম্বেতে চলে আসার পর, তিনি ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনে (IPTA) যোগ দেন এবং পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শোলে, বাওয়ার্চি এবং নামক হারাম-এর মতো ক্লাসিকসহ ২০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে হাঙ্গাল শ্রমিক-শ্রেণীর চরিত্রগুলোতে উষ্ণতা, মর্যাদা এবং বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলার জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ছিলেন।
২৬শে আগস্ট সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য
-
৩৩ দিনের পোপ: ১৯৭৮ সালের ২৬শে আগস্ট, কার্ডিনাল আলবিনো লুসিয়ানি ক্যাথলিক চার্চের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ‘পোপ জন পল প্রথম’ নাম গ্রহণ করেন। তাঁর মেয়াদ ছিল ইতিহাসের অন্যতম সংক্ষিপ্ত—মাত্র ৩৩ দিন পর ১৯৭৮ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর তিনি আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
-
বেসবলের ইতিহাস: ১৯৪৭ সালের ২৬শে আগস্ট, ড্যান ব্যাংকহেড ব্রুকলিন ডজার্সের হয়ে মেজর লিগ বেসবলে প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান কলস (pitcher) হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেন। তাঁর প্রথম প্লেট অ্যাপিয়ারেন্সেই তিনি একটি হোম রান হাঁকান।
-
একটি মাস্টারপিস রিলিজ: ১৯৬৮ সালের ২৬শে আগস্ট, দ্য বিটলস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাদের একক গান “হেই জুড” (“Hey Jude”) রিলিজ করে। পল ম্যাককার্টনি কর্তৃক রচিত এই গানটি মূলত শিশু জুলিয়ান লেননকে তাঁর পিতামাতার বিবাহবিচ্ছেদের সময় সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছিল। সাত মিনিটেরও বেশি দীর্ঘ এই ট্র্যাকটি ব্যান্ডের নিজস্ব অ্যাপল রেকর্ডস লেবেল থেকে প্রথম রিলিজ ছিল।
-
ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির তাণ্ডব: ১৮৮৩ সালের ২৬শে আগস্ট, সুন্দা প্রণালীতে অবস্থিত ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরি তার ভয়াবহ চূড়ান্ত অগ্ন্যুৎপাত পর্ব শুরু করে। পরের দিন সকালে হওয়া বিস্ফোরণের শব্দ প্রায় ৩,০০০ মাইল দূর পর্যন্ত শোনা গিয়েছিল এবং এটি এমন সুনামি সৃষ্টি করেছিল যা কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরণ পরিবর্তন করে রেখেছিল।
শেষ কথা
২৬শে আগস্ট দিনটি আসলে মানুষের প্রগতি, ন্যায়বিচার এবং আবিষ্কারের অদম্য আকাঙ্ক্ষারই এক অপূর্ব প্রতিফলন। শতাব্দী জুড়ে, এই দিনের ঘটনাগুলো আমাদের দেখায় কীভাবে ব্যক্তির সাহস এবং সম্মিলিত উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী এবং অন্যায্য ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
১৭৮৯ সালে ফরাসি নাগরিকরা সংজ্ঞায়িত করেছিলেন সর্বজনীন মানবাধিকার; ১৯১৪ এবং ২০০৬ সালে দক্ষিণ এশীয় কর্মীরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ঔপনিবেশিক শাসন এবং কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে; আর ১৯২০ সালে নারী ভোটাধিকার আমেরিকার গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে আরও প্রসারিত করেছিল।
একই সাথে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা ও মানবতার সেবায়—ল্যাভয়সিয়ের রসায়নের যুগান্তকারী সূত্র এবং লিউয়েনহুকের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কার থেকে শুরু করে ক্যাথরিন জনসনের মহাকাশীয় হিসাব-নিকাশ এবং প্রান্তিক মানুষদের জন্য মাদার তেরেসার নিঃস্বার্থ সেবা—এই সবই আমাদের সমাজ এবং পারষ্পরিক দায়িত্ববোধকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
২৬শে আগস্ট একটি চিরন্তন অনুস্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে—যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ধারণা, সাহস এবং অধ্যবসায় কীভাবে ইতিহাসকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

