ইতিহাস কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা কিছু তারিখের শুষ্ক সমষ্টি নয়; এটি মানবজাতির বিজয়, ট্র্যাজেডি, উদ্ভাবন এবং শিল্পের এক জীবন্ত আখ্যান। আমরা যখন ক্যালেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট দিনের পাতা ওল্টাই, তখন মানব অভিজ্ঞতার এক বিস্ময়কর ও বৈচিত্র্যময় রূপ আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। ২৭শে আগস্ট দিনটিও এর ব্যতিক্রম নয়।
এই দিনটি সাক্ষী থেকেছে পৃথিবীর বুক চিরে বেরিয়ে আসা আগ্নেয়গিরির ভয়ঙ্কর গর্জনের, শিল্পীর তুলির সেই শান্ত আঁচড়ের যা শিল্পের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিল, আধুনিক পেট্রোলিয়াম যুগের সূচনার এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া জগতের এক যুগান্তকারী পটপরিবর্তনের। আপনি যদি বিশ্ব ইতিহাসের একজন ছাত্র হন, একজন কৌতূহলী পাঠক হন, অথবা আজকের দিনের তাৎপর্য বুঝতে চান—তবে এই প্রবন্ধটি আপনার জন্যই। চলুন, ভারতীয় উপমহাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে শুরু করে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতা থেকে ঘুরে আসি এবং জেনে নিই কী কারণে ২৭শে আগস্ট দিনটি সত্যিই অবিস্মরণীয়।
এক নজরে: ২৭শে আগস্টের ঐতিহাসিক হাইলাইটস
| ক্যাটাগরি | উল্লেখযোগ্য ঘটনা / ব্যক্তিত্ব | সাল | তাৎপর্য |
| বিশ্ব ইতিহাস | ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত | ১৮৮৩ | রেকর্ডকৃত ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। |
| বাঙালি ও উপমহাদেশ | মুকেশের প্রয়াণ | ১৯৭৬ | কিংবদন্তি ভারতীয় প্লেব্যাক গায়ক রেখে যান এক কালজয়ী সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য। |
| উদ্ভাবন | প্রথম বাণিজ্যিক তেলের কূপ খনন | ১৮৫৯ | এডউইন এল. ড্রেক পেনসিলভানিয়ায় তেল উত্তোলন করে আধুনিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের জন্ম দেন। |
| খেলাধুলা | আন্তর্জাতিক ফুটবলে বড় রদবদল | ২০০৯ / ২০২১ | বিশ্ব ফুটবলের দুই আইকন লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। |
| বিখ্যাত জন্ম | লিন্ডন বি. জনসন | ১৯০৮ | যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬তম প্রেসিডেন্ট, ১৯৬৪ সালের নাগরিক অধিকার আইন পাসে যার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। |
| বিখ্যাত মৃত্যু | লে করবুসিয়ার | ১৯৬৫ | আধুনিক স্থাপত্য এবং নগর পরিকল্পনার অন্যতম পথিকৃৎ। |
বাঙালি ও উপমহাদেশীয় পরিমণ্ডল: ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আইকন
ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষ করে বাংলা অঞ্চলের এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং জটিল ইতিহাস রয়েছে। এই ইতিহাস যেমন সাংস্কৃতিক নবজাগরণের, তেমনি ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সংগ্রাম এবং শৈল্পিক উৎকর্ষের। এই অঞ্চলের ইতিহাসে ২৭শে আগস্ট একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে, কারণ এই দিনে আমরা যেমন কিছু মহান শিল্পীকে হারিয়েছি, তেমনি কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের জন্মও দেখেছি।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও মাইলফলক
আগস্টের শেষের দিকটি সাধারণত বর্ষাকালের সমার্থক। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই সময়টি যেমন কৃষিকাজের পুনর্জাগরণের, তেমনি বদ্বীপ অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যারও। রাজনৈতিক দিক থেকেও এই সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর, নিজেদের সীমানা ও পরিচয় সুসংহত করার জন্য আগস্টের এই সময়গুলোতে তীব্র রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়।
কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব: জন্ম ও মৃত্যু
২৭শে আগস্ট জন্ম নেওয়া ব্যক্তিত্ব:
-
স্যার দোরাবজি টাটা (জন্ম ১৮৫৯): জামসেটজি টাটার বড় ছেলে দোরাবজি ব্রিটিশ ভারতের শিল্পায়নের এক অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন। বাবার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি (TISCO) প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার এই নিরলস প্রচেষ্টা ভারতের আধুনিক শিল্প অর্থনীতির শক্ত ভিত তৈরি করেছিল।
-
নগেন্দ্র প্রসাদ সর্বাধিকারী (জন্ম ১৮৬৯): তাকে প্রায়শই “ভারতীয় ফুটবলের জনক” বলা হয়। ১৯ শতকের শেষের দিকে বাঙালি সাধারণ মানুষের কাছে ফুটবল খেলাকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। তবে তিনি শুধু খেলাধুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ফুটবলকে সমাজ সংস্কারের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। সেকালের কঠোর জাতিভেদ প্রথাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি এমন সব ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা খেলাধুলার মাধ্যমে সমাজে ঐক্য ও সম্প্রীতি নিয়ে আসে।
২৭শে আগস্ট মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিত্ব:
-
মুকেশ চাঁদ মাথুর (মৃত্যু ১৯৭৬): ‘মুকেশ’ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। হিন্দি সিনেমার একটি পুরো যুগের সংজ্ঞাই যেন লুকিয়ে ছিল তার কণ্ঠে। সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির হতাশা, রোমান্স এবং না-পাওয়াগুলোকে তিনি তার বিষাদমাখা, আত্মিক গায়কীর মাধ্যমে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। “কাভি কাভি মেরে দিল মে” বা “আওয়ারা হুঁ”-এর মতো গানগুলো শুধু ভারত বা বাংলাদেশেই নয়, আশ্চর্যের বিষয় হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দেশেও সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।
-
হৃষিকেশ মুখার্জি (মৃত্যু ২০০৬): ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি অন্যতম প্রিয় একজন নির্মাতা। তিনি “মিডল সিনেমা” বা মধ্যম ধারার চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ ছিলেন—যে সিনেমাগুলো সমান্তরাল চলচ্চিত্রের কঠোর বাস্তবতা এবং বাণিজ্যিক বলিউডের কল্পকাহিনীর ঠিক মাঝামাঝি অবস্থান করত। তার সিনেমায় থাকত সূক্ষ্ম রসবোধ, মধ্যবিত্তের মূল্যবোধ এবং গভীর মানবতা। আনন্দ, গোল মাল এবং চুপকে চুপকে-এর মতো কালজয়ী সিনেমাগুলো তারই সৃষ্টি।
-
আনন্দময়ী মা (মৃত্যু ১৯৮২): বাংলার এক অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক নেত্রী ও সাধিকা। তার প্রভাব সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল। সর্বজনীন প্রেম এবং আধ্যাত্মিক ভক্তির বাণীর মাধ্যমে তিনি সমাজের সব স্তরের মানুষের পাশাপাশি বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদেরও আকৃষ্ট করেছিলেন।
বিশ্ব ইতিহাস: যে ঘটনাগুলো আমাদের পৃথিবী বদলে দিয়েছে

উপমহাদেশের বাইরে পা রাখলে দেখা যায়, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং বিপর্যয়কর প্রাকৃতিক ঘটনার ইতিহাসে ২৭শে আগস্ট তারিখটি গভীরভাবে খোদাই করা আছে।
ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (১৮৮৩)
এই তারিখের সম্ভবত সবচেয়ে পরিচিত ঘটনাটি হলো ডাচ ইস্ট ইন্ডিজে (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) অবস্থিত ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। ১৮৮৩ সালের ২৭শে আগস্ট সকালে এই আগ্নেয়গিরি থেকে পরপর চারটি বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে। এর শেষ বিস্ফোরণের শব্দ এতই তীব্র ছিল যে, ৪০ মাইল দূরের নাবিকদের কানের পর্দা ফেটে গিয়েছিল এবং ৩,০০০ মাইল দূরে অস্ট্রেলিয়ার পার্থেও সেই শব্দ স্পষ্টভাবে শোনা গিয়েছিল—যাকে মানুষের রেকর্ড করা ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র শব্দ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট বিশাল সুনামি প্রায় ১২০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে জাভা ও সুমাত্রার উপকূলরেখা ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে আনুমানিক ৩৬,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়। বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া ছাই ও গ্যাসের কারণে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা কয়েক বছরের জন্য ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়। এমনকি সারা বিশ্বের আকাশে এক অদ্ভুত রক্তিম সূর্যাস্ত দেখা যেত, যা এডভার্ড মুঙ্কের বিখ্যাত পেইন্টিং দ্য স্ক্রিম-এর জ্বলজ্বলে লাল আকাশ আঁকতে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
পেট্রোলিয়াম যুগের সূচনা (১৮৫৯)
পেনসিলভানিয়ার টাইটাসভিলে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল যা মানব সভ্যতার গতিপথকে চিরতরে বদলে দেয়। এডউইন এল. ড্রেক নামের একজন প্রাক্তন রেলওয়ে কন্ডাক্টর প্রথম সফলভাবে একটি বাণিজ্যিক তেলের কূপ খনন করেন। মাত্র ৬৯ ফুট গভীরতায় তেল আবিষ্কার করে, যাকে শুরুতে “ড্রেকের বোকামি” বলা হতো, তিনি প্রমাণ করেন যে অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যিকভাবে বিপুল পরিমাণে উত্তোলন করা সম্ভব।
১৮৫৯ সালের ২৭শে আগস্টের এই একটিমাত্র ঘটনাই আধুনিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের জন্ম দেয়। এটি আলোর জন্য ব্যবহৃত তিমির তেলের একটি সস্তা ও কার্যকর বিকল্প তৈরি করে। পরবর্তীতে এটিই গ্যাসোলিনের উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের (internal combustion engine) উত্থান, অটোমোবাইলের ব্যাপক উৎপাদন এবং ২০ ও ২১ শতকের জটিল ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটের ভিত্তি স্থাপন করে।
ইতিহাসের ক্ষুদ্রতম যুদ্ধ (১৮৯৬)
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের এক অদ্ভুত অধ্যায় হিসেবে ২৭শে আগস্ট অ্যাংলো-জাঞ্জিবার যুদ্ধের বার্ষিকী হিসেবেও পরিচিত। জাঞ্জিবারের ব্রিটিশপন্থী সুলতানের আকস্মিক মৃত্যুর পর, তার ভাতিজা যুবরাজ খালিদ ইবনে বারগাশ ক্ষমতা দখল করেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অন্য একজনকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিল, তাই তারা খালিদকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেয়। তিনি যখন তা প্রত্যাখ্যান করে প্রাসাদের ভেতর নিজেকে অবরুদ্ধ করেন, তখন সকাল ৯:০২ মিনিটে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলো গুলি চালাতে শুরু করে।
সকাল ৯:৪০ মিনিটের মধ্যে প্রাসাদটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, সুলতানের পতাকা নামিয়ে ফেলা হয় এবং যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। মাত্র ৩৮ থেকে ৪০ মিনিট স্থায়ী এই যুদ্ধটি ইতিহাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ হিসেবে রেকর্ড বুকে জায়গা করে নিয়েছে।
দ্য ডিক্লারেশন অফ দ্য রাইটস অফ ম্যান (১৭৮৯)
ফরাসি বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে, জাতীয় গণপরিষদ ‘দ্য ডিক্লারেশন অফ দ্য রাইটস অফ ম্যান অ্যান্ড অফ দ্য সিটিজেন’ গ্রহণ করে। আমেরিকান বিপ্লব এবং আলোকিত যুগের (Enlightenment) দার্শনিকদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত এই দলিলটি ঘোষণা করে যে, মানুষের অধিকার সর্বজনীন—সব সময় এবং সব জায়গায় প্রযোজ্য। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের একটি ভিত্তি দলিল হয়ে ওঠে, যা রাজাদের দৈব অধিকারকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করে।
মলদোভার স্বাধীনতা (১৯৯১)
মস্কোতে ব্যর্থ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্রুত পতন শুরু হলে, মলদোভা প্রজাতন্ত্র ১৯৯১ সালের ২৭শে আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এটি পূর্ব ইউরোপে এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করে, যার মাধ্যমে দেশটি তাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করার সুযোগ পায়। যদিও এটি ট্রান্সনিস্ট্রিয়া সংঘাতেরও জন্ম দেয়, যা আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
খেলাধুলায় মাইলফলক: ফুটবল মাঠের কিংবদন্তিরা
আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে ২৭শে আগস্ট একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন, বিশেষ করে আধুনিক যুগের সেরা খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার এবং ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের দলবদল ও সমীকরণের ক্ষেত্রে।
যারা ফুটবল কিংবদন্তিদের ক্যারিয়ারের উত্থান-পতন খুব কাছ থেকে অনুসরণ করেন, তারা জানেন যে গ্রীষ্মের শেষের দিকের দলবদলের বাজার সবসময়ই চরম নাটকীয়তায় ভরপুর থাকে। ২০২১ সালের ২৭শে আগস্ট গোটা ফুটবল বিশ্ব চমকে ওঠে যখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ঘোষণা করে যে, তারা জুভেন্টাস থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ফিরিয়ে আনার জন্য চুক্তিতে পৌঁছেছে। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে তার এই চাঞ্চল্যকর প্রত্যাবর্তনের খবর সারা বিশ্বের শিরোনাম দখল করে নেয়। এটি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের কৌশলগত সমীকরণ বদলে দেয় এবং বিশ্বমঞ্চে দলের কাঠামো ও ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
আশ্চর্যজনকভাবে, ঠিক বারো বছর আগে, ২০০৯ সালের ২৭শে আগস্ট, লিওনেল মেসি ‘উয়েফা ক্লাব ফরোয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। বার্সেলোনার হয়ে ঐতিহাসিক ট্রেবল জয়ের পরপরই এই স্বীকৃতি তার ক্যারিয়ারের এক অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। একজন প্রতিভাবান তরুণ থেকে বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার যে যাত্রা তিনি শুরু করেছিলেন, এটি ছিল তার এক অনন্য স্বীকৃতি। আমরা সবাই জানি, এই যাত্রার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে তিনি পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের মুকুট পরেন। ২৭শে আগস্টের এই ঘটনাগুলো আধুনিক ফুটবলের এই দুই মহাতারকা—মেসি ও রোনালদো—কে সর্বকালের সেরা, সেই চিরস্থায়ী এবং ঐতিহাসিক বিতর্কের এক চমৎকার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।
বিখ্যাত জন্মদিন: গ্লোবাল আইকন
এই দিনে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিরা দর্শন, রাজনীতি, নকশা এবং বিনোদন জগতে নিজেদের অপরিহার্য প্রমাণ করেছেন। এখানে এমন কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির তালিকা দেওয়া হলো:
| নাম | জন্মের সাল | জাতীয়তা | পেশা / কীর্তি |
| জর্জ ভিলহেম ফ্রিডরিখ হেগেল | ১৭৭০ | জার্মান | আধুনিক যুগের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক, তার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির (dialectical method) জন্য পরিচিত। |
| চার্লস রোলস | ১৮৭৭ | ব্রিটিশ | মোটর এবং এভিয়েশন শিল্পের পথিকৃৎ; রোলস-রয়েস ম্যানুফ্যাকচারিং ফার্মের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। |
| ম্যান রে | ১৮৯০ | আমেরিকান | ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট এবং ডাডা (Dada) ও পরাবাস্তববাদী (Surrealist) আন্দোলনের বিশিষ্ট অবদানকারী। |
| লিন্ডন বি. জনসন | ১৯০৮ | আমেরিকান | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬তম প্রেসিডেন্ট, “গ্রেট সোসাইটি” এবং নাগরিক অধিকার আইনের প্রবক্তা। |
| টম ফোর্ড | ১৯৬১ | আমেরিকান | বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার এবং প্রশংসিত চলচ্চিত্র পরিচালক (আ সিঙ্গল ম্যান, নকটার্নাল অ্যানিমেলস)। |
| অ্যারন পল | ১৯৭৯ | আমেরিকান | এমি বিজয়ী অভিনেতা, সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত সিরিজ ব্রেকিং ব্যাড-এ জেসি পিংকম্যান চরিত্রের জন্য সর্বাধিক পরিচিত। |
ডিপ ডাইভ: লিন্ডন বি. জনসন
জন এফ. কেনেডির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর আকস্মিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করা লিন্ডন বি. জনসন (জন্ম ২৭শে আগস্ট, ১৯০৮) আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম জটিল এক ব্যক্তিত্ব। যদিও ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রসারের কারণে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অনেকটাই কলঙ্কিত, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে তার অর্জন ছিল বিশাল। সেনেটে তার অতুলনীয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নিয়ে তিনি ১৯৬৪ সালের সিভিল রাইটস অ্যাক্ট (নাগরিক অধিকার আইন) এবং ১৯৬৫ সালের ভোটিং রাইটস অ্যাক্ট (ভোটাধিকার আইন) পাস করেন। এর মাধ্যমে তিনি কার্যকরভাবে আইনি বৈষম্য দূর করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে দেন।
বিখ্যাত মৃত্যু: মহানায়কদের বিদায়
শিল্প, স্থাপত্য এবং নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে যাওয়া বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকীও এই ২৭শে আগস্ট।
| নাম | মৃত্যুর সাল | জাতীয়তা | কারণ / কীর্তি |
| টিশিয়ান | ১৫৭৬ | ইতালীয় | রেনেসাঁ যুগের মাস্টার পেইন্টার; তার রঙের ব্যবহার পাশ্চাত্য শিল্পকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। |
| লোপে দে ভেগা | ১৬৩৫ | স্প্যানিশ | স্প্যানিশ স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক; ৫০০টিরও বেশি নাটক রচনা করেছেন। |
| ডব্লিউ. ই. বি. ডু বোইস | ১৯৬৩ | আমেরিকান | সমাজবিজ্ঞানী, সমাজতান্ত্রিক, ইতিহাসবিদ এবং প্যান-আফ্রিকান নাগরিক অধিকার কর্মী। |
| লে করবুসিয়ার | ১৯৬৫ | সুইস-ফরাসি | স্থপতি, ডিজাইনার এবং নগর পরিকল্পনাবিদ; আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ। |
| ব্রায়ান এপস্টেইন | ১৯৬৭ | ব্রিটিশ | মিউজিক এন্টারপ্রেনিউর; দ্য বিটলস ব্যান্ডের ম্যানেজার হিসেবে তাদের বিশ্বব্যাপী সুপারস্টার হতে দিকনির্দেশনা দেন। |
| হাইলি সেলাসি | ১৯৭৫ | ইথিওপিয়ান | ইথিওপিয়ার সম্রাট এবং আধুনিক আফ্রিকার ইতিহাস ও রাস্তাফারি আন্দোলনের এক সংজ্ঞায়িত ব্যক্তিত্ব। |
ডিপ ডাইভ: ডব্লিউ. ই. বি. ডু বোইস
উইলিয়াম এডওয়ার্ড বার্গার্ড ডু বোইস ১৯৬৩ সালের ২৭শে আগস্ট ঘানার আক্রায় ৯৫ বছর বয়সে মারা যান। NAACP-এর প্রতিষ্ঠাতা কর্মকর্তা এবং The Souls of Black Folk নামক যুগান্তকারী গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবে, জাতিগত সমতার লড়াইয়ে তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান ছিল অতুলনীয়। অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী একটি বিষয় হলো, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ওয়াশিংটন মার্চে তার বিখ্যাত “আই হ্যাভ আ ড্রিম” ভাষণ দেওয়ার ঠিক একদিন আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন—যে ঐতিহাসিক মার্চটির পথ তৈরি করতে ডু বোইস তার পুরো জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিন
বছরের প্রতিটি দিনই বিশ্বের কোথাও না কোথাও নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বা জাতীয় তাৎপর্য বহন করে। ২৭শে আগস্টেও আমরা জাতীয় অহংকার থেকে শুরু করে অদ্ভুত কিছু বৈশ্বিক ঐতিহ্যের উদযাপন দেখতে পাই:
-
স্বাধীনতা দিবস (মলদোভা): ইতিহাস অংশে আগেই বলা হয়েছে, এই জাতীয় ছুটিটি ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে মলদোভার স্বাধীনতার ঘোষণাকে স্মরণ করে পালিত হয়। রাজধানী চিসিনাউতে কুচকাওয়াজ, কনসার্ট এবং সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
-
লিন্ডন বেইন্স জনসন ডে (টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র): যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬তম প্রেসিডেন্টের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে টেক্সাসে এটি একটি সরকারি ছুটির দিন, কারণ তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে নিজেকে এই অঙ্গরাজ্যের সন্তান বলে পরিচয় দিতেন।
-
ওয়ার্ল্ড রক পেপার সিজার্স ডে: একটু ভিন্ন এবং মজার প্রসঙ্গে বলা যায়, ২৭শে আগস্ট বিশ্বব্যাপী খেলা হওয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় হাত-খেলা ‘রক পেপার সিজার্স’ উদযাপনের দিন। তর্ক বা বিতর্ক মেটানোর একটি নিরপেক্ষ পদ্ধতি হিসেবে হাজার বছর ধরে মানুষ এই খেলাটি খেলে আসছে। এটি একটি মজার দিন যা আমাদের শৈশবের সাধারণ কিন্তু আনন্দদায়ক স্মৃতিগুলোকে মনে করিয়ে দেয়।
আপনি কি জানেন? ৩টি চমকপ্রদ তথ্য (ট্রিভিয়া)
কথোপকথন শুরু করার জন্য দারুণ কিছু খুঁজছেন? ২৭শে আগস্টের এমন তিনটি কম পরিচিত তথ্য এখানে দেওয়া হলো:
-
গিনেস বুকের জন্ম: দ্য গিনেস বুক অফ রেকর্ডসের একদম প্রথম সংস্করণটি ১৯৫৫ সালের ২৭শে আগস্ট গ্রেট ব্রিটেনে প্রকাশিত এবং বাঁধাই করা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এটি মূলত পাবগুলোতে (pub) বাজি ধরার বিতর্ক মেটানোর জন্য বিনামূল্যে দেওয়ার একটি প্রচারণামূলক বই হিসেবে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই এটি সর্বকালের সেরা বিক্রি হওয়া কপিরাইটযুক্ত বইগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
-
ওষুধের সাথে এক চামচ চিনি: ১৯৬৪ সালের ২৭শে আগস্ট যখন ক্লাসিক ডিজনি চলচ্চিত্র মেরি পপিন্স প্রিমিয়ার হয়, তখন বিশ্ববাসী “আ স্পুনফুল অফ সুগার” গানটির সাথে পরিচিত হয়। গীতিকার রবার্ট শারম্যান এই গানটি লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন তার সন্তানদের কাছ থেকে। তারা স্কুল থেকে ফিরে তাকে বলেছিল যে, তাদের পোলিও ভ্যাকসিনটি কোনো ইনজেকশন ছিল না, বরং চিনির কিউবের ওপর কয়েক ফোঁটা তরল ওষুধ দেওয়া হয়েছিল!
-
মঙ্গলের খুব কাছাকাছি: ২০০৩ সালের ২৭শে আগস্ট, মঙ্গল গ্রহ প্রায় ৬০,০০০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিল। তখন এই দুটি গ্রহের মধ্যে দূরত্ব ছিল মাত্র ৩৪.৬ মিলিয়ন মাইল (৫৫.৭ মিলিয়ন কিলোমিটার)। এই লাল গ্রহটি আগামী ২২৮৭ সালের আগে আর পৃথিবীর এত কাছাকাছি আসবে না।
শেষ কথা
ক্রাকাতোয়ার ভয়াবহ প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলা থেকে শুরু করে পেনসিলভানিয়ায় নীরবে শুরু হওয়া তেল উত্তোলনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন—২৭শে আগস্ট এমন একটি দিন যা মানব এবং প্রাকৃতিক ইতিহাসের বিশালতা এবং অনিশ্চয়তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এটি এমন একটি দিন যা আমাদের উপহার দিয়েছে লে করবুসিয়ারের মতো দূরদর্শী স্থপতি, লিন্ডন বি. জনসনের মতো সংস্কারক নেতা এবং হেগেলের মতো গভীর চিন্তাবিদকে। একই সাথে, এটি বাঙালি পরিমণ্ডলে মুকেশের সুরেলা আত্মা এবং হৃষিকেশ মুখার্জির সিনেমার উষ্ণতাকে স্মরণ করার দিন।
“ইতিহাসে আজকের দিন”-এর দিকে ফিরে তাকালে, আমাদের বৈশ্বিক গল্পের প্রতিটি সুতো যে কতটা গভীরভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত, তা আমরা আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি। রাজনীতি, শিল্প, খেলাধুলা এবং বিজ্ঞানের এই মাইলফলকগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস থেমে নেই; এটি প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে একটু একটু করে লেখা হচ্ছে।

