একশ বছরে উত্তম কুমার: ব্যর্থতা, অভিনয়ের বিপ্লব আর একটি ইন্ডাস্ট্রি বদলে দেওয়ার গল্প

সর্বাধিক আলোচিত

একজন ব্যর্থ অভিনেতাকে চিনতে স্টুডিওপাড়ার খুব বেশি সময় লাগে না। দরজায় ঢোকার ভঙ্গি, মেকআপ রুমের সামনে অপেক্ষা, সহকারীর অন্যমনস্কতা, প্রযোজকের চোখ এড়িয়ে যাওয়া—সবকিছু যেন তাকে আগেই জানিয়ে দেয়, তিনি এখানে প্রয়োজনীয় নন। অথচ সেই মানুষটিই যদি কয়েক বছরের মধ্যে এমন এক নাম হয়ে ওঠেন, যার উপস্থিতি একটি ছবির অর্থ জোগাড় করতে পারে, হলমালিককে নিশ্চিন্ত করতে পারে, দর্শককে প্রথম সপ্তাহেই প্রেক্ষাগৃহে টেনে আনতে পারে, তখন তার সাফল্যের গল্প আসলে ব্যক্তিগত থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে একটি শিল্পের পুনর্গঠনের গল্প।

উত্তম কুমারের জন্মের একশ বছর পূর্ণ হওয়ার মুহূর্তে তাই তাঁকে শুধু ‘মহানায়ক’ বলে স্মরণ করলে কিছুটা কম বলা হয়। কারণ মহানায়ক ছিল পরিণতির নাম; শুরুটা ছিল অন্যরকম। সেখানে ছিলেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামে এক মধ্যবিত্ত কলকাতার যুবক, সংসারের দায়, কলেজ অসমাপ্ত রেখে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টে চাকরি, অপেশাদার নাটকের টান, আর সিনেমায় ঢুকে পরপর প্রত্যাখ্যাত হওয়ার দগদগে অভিজ্ঞতা। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া সেই যুবক ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র তিপ্পান্ন বছর বয়সে চলে যাবেন—এ কথা তখন কেউ জানত না। আরও জানা ছিল না, তাঁর জীবনকালের মধ্যেই বাংলা জনপ্রিয় সিনেমার অভিনয়, প্রেম, নায়কত্ব এবং তারকা-অর্থনীতির ব্যাকরণ বদলে যাবে।

প্রথম অঙ্ক: যে ব্যর্থতা অরুণকে ভেঙে উত্তম বানাল

Uttam Kumar Short Biography

‘দৃষ্টিদান’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৪৮ সালে। নীতিন বসুর ছবিতে অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের উপস্থিতি ছিল ছোট, এবং সেই উপস্থিতি তাঁকে এমন কোনো স্বীকৃতি এনে দেয়নি, যার ওপর দাঁড়িয়ে পরের পথ সহজ হয়ে যায়। পরের বছর ‘কামনা’-য় প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ এল, কিন্তু সাফল্য এল না। ‘মর্যাদা’-তেও ভাগ্য ফেরেনি। নামও যেন স্থির হচ্ছিল না—অরুণ, উত্তম চ্যাটার্জি, অরূপ, তারপর অবশেষে উত্তম কুমার। ১৯৫১ সালের ‘সহযাত্রী’-তে পাহাড়ী সান্যালের পরামর্শে ‘উত্তম কুমার’ নামটি স্থায়ী হয়। নাম বদল হলেও তাঁর ব্যর্থতার চাকা থেমে যায়নি। ব্যর্থতার তালিকা তখন এতটাই দীর্ঘ যে স্টুডিওপাড়ায় তাঁর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল বিদ্রূপাত্মক উপাধি—‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’।

এই উপাধিটা আজ মজার তথ্যের মতো শোনায়, কারণ আমরা শেষ পরিণতি জানি। কিন্তু তখন উত্তমের জন্য সেটি ছিল চরম পেশাগত অপমান। একজন অভিনেতা বারবার ব্যর্থ হলে কেবল আত্মবিশ্বাস হারান না, তাঁর চারপাশের লোকও তাঁর সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করা বন্ধ করে দেয়। প্রযোজক সন্দিহান হন, পরিচালক নিরাপদ মুখ খোঁজেন, সহ-অভিনেতা দূরত্ব রাখেন। 

উত্তমের ক্ষেত্রে অপমানের চাইতেও সম্ভবত আরেকটি বড় চাপ ছিল—দ্রুত প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা হতে না পারলে কেরানির চাকরিকেই জীবিকা হিসাবে নিতে হবে। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় তিনি প্রথম থেকেই ছিলেন না। পোর্ট ট্রাস্টের কেরানির কাজই ছিল নিশ্চয়তা, সিনেমা ছিল অনিশ্চয়তা। ফলে দিনের এক অংশে হিসাবের খাতা, অন্য অংশে মেকআপের আলো; একদিকে নির্দিষ্ট বেতন, অন্যদিকে বারবার অস্বীকৃতি। এই দ্বৈত জীবনই সম্ভবত তাঁকে খুব তাড়াতাড়ি একটি সত্য শিখিয়েছিল—ক্যামেরার সামনে শুধু ‘অভিনয়’ করলেই হবে না, তাকে নিজের একটি ‘অবস্থান’ খুঁজে পেতে হবে।

এখানেই তাঁর ব্যর্থতার গুরুত্ব। আমরা প্রায়ই বড় তারকার জীবনে ব্যর্থতাকে অলঙ্কার বানাই—যেন পরের সাফল্যকে উজ্জ্বল দেখানোর জন্য প্রথমে কিছু অন্ধকার প্রয়োজন। তবে এটাকে নিছক অনুপ্রেরণামূলক গল্প ভাবলে একটা সত্য চাপা পড়ে যায়। উত্তমের পরপর ব্যর্থতা তাঁর অভিনয়ের ভাষাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। তখনকার বাংলা জনপ্রিয় অভিনয়ে মঞ্চের উত্তরাধিকার প্রবল—কণ্ঠের জোর, সংলাপের উচ্চারণ, আবেগের স্পষ্ট প্রদর্শন, অঙ্গভঙ্গির বৃহৎ বৃত্ত। সেই ধারার নিজস্ব শক্তি ছিল; ছবি বিশ্বাস, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, পাহাড়ী সান্যালদের প্রভাবকে সরলভাবে ‘পুরোনো’ বলে উড়িয়ে দেওয়া অন্যায়। কিন্তু ক্যামেরা মুখের অনেক কাছে আসে, চোখের সামান্য নড়াচড়াও ধরে, নীরবতার ভেতরের দ্বিধাও দৃশ্যমান করে। উত্তম ধীরে ধীরে বুঝেছিলেন, পর্দায় কম করেও বেশি বলা যায়।

১৯৫২ সালের ‘বসু পরিবার’ সেই সন্ধিক্ষণ। নির্মল দে পরিচালিত ছবিটি তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এম পি প্রোডাকশনস, যে সংস্থা তাঁকে আগের ব্যর্থতার পরও ধরে রেখেছিল, সেখানেই তাঁর জন্য দরজা খুলল। একটি সফল ছবি একদিনে অভিনেতাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয় না, কিন্তু শিল্পের চোখ বদলে দেয়। যে মুখটিকে আগের দিন ঝুঁকি মনে হচ্ছিল, পরদিন তার ভেতর সম্ভাবনা দেখা যায়। ‘বসু পরিবার’-এর পর উত্তম হয়ে উঠলেন অপেক্ষমাণ সম্ভাবনা।

তারপর এল ১৯৫৩ সালের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। এখানেই প্রথমবার সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর যুগল উপস্থিতি। ছবিটি কৌতুক, দলগত অভিনয় এবং শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের তৎপরতায় তৈরি; তাই এটিকে কেবল পরবর্তী রোম্যান্টিক জুটির সূচনা বলে ছোট করে দেখা ঠিক নয়। কিন্তু ইতিহাস কখনও কখনও একটি দৃশ্যের ভেতর ভবিষ্যৎ রেখে দেয়। উত্তম ও সুচিত্রার মধ্যে যে পর্দাগত প্রতিসরণ দেখা গেল, তা পরের কয়েক বছরে বাংলা সিনেমার আবেগের মানচিত্র পাল্টে দেয়। 

‘ফ্লপ মাস্টার’-এর শূন্যতা পেরিয়ে অরুণ কুমার থেকে উত্তম কুমার হয়ে উঠতে গিয়ে তিনি কখনই অন্য কারও ছাঁচে ঢোকার চেষ্টা করেন নি। এই বৈশিষ্ট্যই তাকে অনন্য করে। নিজের মুখ, নিজের বিরতি, নিজের হাসি, নিজের সংলাপের তাল তিনি খুঁজে নিতে পেরেছেন। এই সামর্থ্যের সর্বোচ্চ শিখর ই তাকে মহানায়ক এর তকমা এনে দিয়েছে।

দ্বিতীয় অঙ্ক: ক্যামেরা যখন আবেগের আওয়াজ কমিয়ে দিল

১৯৫৪ সালের ‘অগ্নিপরীক্ষা’কে এই পরিবর্তনের প্রকৃত বিস্ফোরণ বলা যায়। অগ্রদূত পরিচালিত ছবিটি মুক্তি পায় উত্তমের জন্মদিনেই, ৩ সেপ্টেম্বর। উত্তম–সুচিত্রা জুটির জনপ্রিয়তা এই ছবির পর যে মাত্রায় পৌঁছায়, তা বাংলা সিনেমায় আজও অস্পর্শী। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাকে কেবল ‘রোম্যান্টিক জাদু’ বলে ব্যাখ্যা করলে অভিনয়ের বিপ্লবটা চোখ এড়ায়। উত্তমের নায়কত্বের কেন্দ্রে ছিল আকর্ষণ, নিঃসন্দেহে; কিন্তু আকর্ষণের সঙ্গে তিনি যোগ করেছিলেন সংযম। তিনি সংলাপ বলতেন এমন ঢং এ যেন কথাটা এইমাত্র মনে এসেছে; তাকাতেন এমন ভাবে যেন দর্শক পর্দার ওপারে নয়, তাঁর সাথেই  সিনেমা দৃশ্যের অংশ; হাসতেন পুরো মুখ খুলে, আবার একই হাসির মধ্যে মুহূর্তে বিষণ্ণতা নামিয়ে আনতে পারতেন।

এই ‘স্বাভাবিকতা’ শব্দটিও সাবধানে ব্যবহার করা দরকার। উত্তম কুমার বাংলা সিনেমা থেকে মেলোড্রামা মুছে দেননি, তাঁর বহু ছবিই আবেগপ্রবণ, ঘটনাবহুল, কখনও অতিনাটকীয়। তিনি যা করলেন, তা হলো মেলোড্রামার স্কেল বদলে দেওয়া। মঞ্চের জন্য তৈরি দেহভাষাকে ক্যামেরার দূরত্বে এনে ছোট করলেন, সংলাপের ভিতরে কথ্যতার ছন্দ ঢোকালেন, বিরতিকে অর্থ দিলেন, চোখের কাজকে মুখের বড় অঙ্গভঙ্গির সমতুল্য গুরুত্ব দিলেন। বলা যায়, তাঁর অভিনয় একেবারে নতুন কোনো শূন্যস্থান থেকে জন্মায়নি; বরং পুরোনো ঐতিহ্যকে পর্দার ঘনিষ্ঠতার সঙ্গে পুনর্বিন্যস্ত করেছিল।

সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর রসায়ন এখানেই শিল্পিত হয়ে ওঠে। গসিপ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, জনপ্রিয় কৌতূহল—এসব বহু দশক ধরে এই জুটিকে ঘিরে আছে, কিন্তু সেগুলো তাঁদের পর্দাগত শক্তির মূল ব্যাখ্যা নয়। একজন দৃশ্যকে টানতেন দৃঢ়তা, সৌন্দর্য ও আহত আত্মমর্যাদার দিকে; অন্যজন নরম করতেন হাসি, দ্বিধা, পুরুষালি আত্মবিশ্বাসের আড়ালে লুকোনো অসহায়তা দিয়ে। তাঁরা পরস্পরের অভিনয়কে সম্পূর্ণ করতেন, কখনও বিরোধিতা করতেন, কখনও থামিয়ে দিতেন। ফলে প্রেম কেবল গান বা আলিঙ্গন হয়ে থাকত না; তা হয়ে উঠত অপেক্ষা, ভুল বোঝাবুঝি, সামাজিক নিষেধ, নীরব দৃষ্টি, অসমাপ্ত বাক্য।

‘হারানো সুর’-এ এই যুগল অভিনয় আরও পরিণত হয়ে ওঠে। ১৯৫৭ সালের ছবিতে স্মৃতিভ্রংশ, পরিচয়, প্রেম এবং হারিয়ে যাওয়ার বেদনা—সবকিছুর কেন্দ্রে উত্তম এমন এক পুরুষ চরিত্র নির্মাণ করেন, যার ভঙ্গুরতা তার নায়কত্বকে কমায় না, বরং বাড়ায়। গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি দিক, ছবিটি তাঁর প্রযোজক-জীবনেরও বড় পদক্ষেপ; অজয় করের সঙ্গে ‘আলোছায়া’ প্রযোজনার ব্যানারে তৈরি এই ছবি জাতীয় স্তরেও সম্মান পায়। অর্থাৎ যে অভিনেতা কয়েক বছর আগেও প্রযোজকের কাছে ঝুঁকি ছিলেন, তিনি এখন নিজের সৃজনশীল ঝুঁকির অর্থনৈতিক অংশীদার।

‘সপ্তপদী’তে এসে উত্তম–সুচিত্রা যুগলতার আরেক রূপ দেখা যায়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনির পটভূমিতে কৃষ্ণেন্দু আর রিনার সম্পর্ক ধর্ম, পরিচয়, পরিবার, যুদ্ধ, বিচ্ছেদের ভেতর দিয়ে এগোয়। ১৯৬১ সালের এই ছবিতে উত্তমের অভিনয়ের শক্তি শুধু প্রেমিকের মুগ্ধতায় নয়; সময়ের সঙ্গে চরিত্রের ভিতর যে পরিবর্তন জমে, তা বহনে। তরুণ উদ্দীপনা থেকে আঘাত, আঘাত থেকে বিচ্ছিন্নতা, তারপর পুনর্মিলনের ক্লান্ত মানবিকতা—এই রূপান্তরকে তিনি বাহ্যিক নাটকীয়তার বদলে ক্রমশ স্তরীভূত করেন। ছবিটি তাঁর প্রযোজনা-যাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। 

সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ সিনেমায় উত্তম কুমারের অভিনয়ের আরেকটি শক্তিশালী দিক উঠে আসে। ১৯৬৬ সালের এই ছবিতে অরিন্দম মুখার্জি এক সুপারস্টার, ট্রেনে দিল্লি যাওয়ার পথে যার আত্মবিশ্বাসের আবরণ ধীরে ধীরে খুলে যায়। ভূমিকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, বাস্তবের উত্তমের তারকাখ্যাতি চরিত্রটির সঙ্গে অনিবার্যভাবে মিশে থাকে; দর্শক অরিন্দমকে দেখে, আবার উত্তমকেও ভুলতে পারে না। সত্যজিৎ রায় সেই দ্বৈততাকেই ব্যবহার করেন। ক্যামেরার সামনে এক মানুষ, যার হাসি লাখো দর্শকের পরিচিত, কিন্তু সেই হাসির পিছনে ব্যর্থতার স্মৃতি, নৈতিক দ্বিধা, ভয়, অপরাধবোধও আছে। এখানেই উত্তম নিজের তারকা-ইমেজকে অভিনয়ের উপকরণে পরিণত করেন।

পরের বছর ‘চিড়িয়াখানা’-য় তিনি ব্যোমকেশ। সেখানে রোম্যান্টিক তারকার পরিচিত মাধুর্যকে অনেকটাই আড়াল করতে হয়; পর্যবেক্ষণ, সন্দেহ, বুদ্ধি, সংযত প্রতিক্রিয়া সামনে আসে। একই সময়ের ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-তে আবার সম্পূর্ণ অন্য আবেগ ও সাংস্কৃতিক চরিত্র। 

এই দুই ছবির অভিনয়ের জন্যই তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগ চালু হওয়ার প্রথম বছরেই প্রথম বিজয়ী হন। এর মধ্যে এক ধরনের ঐতিহাসিক ব্যঙ্গ আছে—যাকে একসময় ‘ফ্লপ মাস্টার’ বলা হয়েছিল, ভারত রাষ্ট্রের প্রথম জাতীয় শ্রেষ্ঠ অভিনেতার স্বীকৃতি গেল তাঁরই হাতেই।

তৃতীয় অঙ্ক: একটি মুখ যখন পুরো শিল্পের আর্থিক ব্যাকরণ বদলে দেয়

Why Uttam Kumar is Mahanayak

তারকা হওয়া আর প্রতিষ্ঠান হওয়া এক জিনিস নয়। তারকার ছবি চলে; প্রতিষ্ঠানের ওপর অন্য মানুষের জীবিকা, বিনিয়োগ, পরিকল্পনা, আস্থা নির্ভর করতে শুরু করে। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে উত্তম কুমার ধীরে ধীরে এই দ্বিতীয় অবস্থানে পৌঁছান। তাঁর নাম পোস্টারে থাকা মানে কেবল দর্শকের আগ্রহ নয়, প্রযোজকের ঋণ নেওয়ার সাহস, পরিবেশকের ছবি কিনতে আগ্রহ, হলমালিকের প্রদর্শনী-সূচিতে জায়গা দেওয়ার নিশ্চয়তা। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের একক ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করেননি, কিন্তু তাঁর তারকামূল্য এমন এক সময়ে কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে, যখন পুরোনো স্টুডিও ব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে এবং স্বাধীন প্রযোজনা, তারকা-কেন্দ্রিক প্যাকেজ, পরিবেশক-নির্ভর অর্থায়ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চলচ্চিত্র-ইতিহাসের গবেষণাতেও এই পরিবর্তনের সঙ্গে উত্তমের উত্থানকে পাশাপাশি দেখা হয়।

খোলা চোখে দেখলে মনে হয়, উত্তম যেন একাই টালিগঞ্জের পুরোনো স্টুডিও ব্যবস্থা ভেঙে নতুন ব্যবস্থা বানিয়েছিলেন। যদিও ইতিহাস এত সরল নয়। নিউ থিয়েটার্স-নির্ভর সংগঠিত স্টুডিও কাঠামোর পতন শুরু হয়েছিল তাঁর পূর্ণ উত্থানের আগেই। বরং উত্তম সেই পরিবর্তিত শিল্পে এমন এক তারকা হয়ে উঠলেন, যাঁকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক স্থিতি তৈরি করা সম্ভব হলো। এম পি প্রোডাকশনসে তিনি একসময় চুক্তিবদ্ধ শিল্পী; পরে একই মানুষ নিজের প্রযোজনা সংস্থার মাধ্যমে ছবি বানাচ্ছেন, গল্প বাছছেন, সৃজনশীল ঝুঁকি নিচ্ছেন। কর্মচারী থেকে অংশীদার, অংশীদার থেকে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী—এই যাত্রাটা বাংলা সিনেমার ব্যবসায়িক রূপান্তরেরও অন্তর্লিপি। 

‘হারানো সুর’-এর প্রযোজক উত্তমকে তাই শুধু নায়ক উত্তমের ছায়া ভাবলে ভুল হবে। ‘আলোছায়া’র অধীনে ‘সপ্তপদী’ও তৈরি হলো। পরে ‘উত্তম কুমার ফিল্মস’ নামের ব্যানারে ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘যতুগৃহ’, ‘গৃহদাহ’-এর মতো ছবি এল। সব ছবিতে তিনি কেন্দ্রীয় অভিনেতা নন—‘উত্তর ফাল্গুনী’-তে তাঁর ভূমিকা প্রযোজকের, আর সেই ছবিই জাতীয় স্তরে শ্রেষ্ঠ বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পায়। অর্থাৎ তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিজেকে ফ্রেমের কেন্দ্রে রাখার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল; অন্তত কিছু ক্ষেত্রে তিনি এমন ছবি নির্মাণে অর্থ, সংগঠন ও নাম দিয়েছেন, যেখানে অন্য অভিনয়শিল্পীই প্রধান।

পরিচালনায়ও তিনি প্রবেশ করেন। ‘শুধু একটি বছর’ থেকে ‘বনপলাশীর পদাবলী’—অভিনেতার বাইরে নির্মাতা হিসেবে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল স্পষ্ট। সুরারোপ করেছেন ‘কাল তুমি আলেয়া’-য়; নিজের কণ্ঠেও গান রেকর্ড করেছেন। এই বহুমুখিতা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে তাঁকে সর্বক্ষেত্রে সমান উচ্চতার শিল্পী প্রমাণ করার দরকার নেই। তাঁর প্রধান শক্তি নিঃসন্দেহে অভিনয়। তবু প্রযোজনা, পরিচালনা, সঙ্গীত ও গানে হাত দেওয়া একটি বিষয় বোঝায়—উত্তম নিজের তারকাখ্যাতিকে কেবল পারিশ্রমিক বাড়ানোর সম্পদ হিসেবে দেখেননি, তাকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণের পথ হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন।

এই নিয়ন্ত্রণের মূল্যও ছিল। তারকা-কেন্দ্রিক শিল্প নিরাপত্তা দেয়, আবার নির্ভরতাও তৈরি করে। উত্তমের ছবি চললে বহুজনের কাজ চলে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রযোজকের কল্পনা একটি মুখের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হতে পারে। বাংলা সিনেমা বহু বছর ধরে তাঁর ব্যাংকযোগ্যতার সুবিধা নিয়েছে; তাঁর মৃত্যুর পর সেই নির্ভরতার শূন্যতাও প্রকট হয়েছে—এমন বিশ্লেষণ চলচ্চিত্র-গবেষণায় বারবার এসেছে। ফলে তাঁকে ইন্ডাস্ট্রি ‘বাঁচিয়েছিলেন’ বলা যেমন অতিরঞ্জন, তেমনি তাঁর অর্থনৈতিক গুরুত্বকে শুধু ভক্তির ভাষা বলে উড়িয়ে দেওয়াও ভুল। তিনি ছিলেন এক বিরল বাজার-নিশ্চয়তা, আর বাজারের সেই নিশ্চয়তা তাঁকে সৃজনশীল ক্ষমতাও দিয়েছিল।

ষাটের দশকের শেষে তাঁর জাতীয় পুরস্কার, বিভিন্ন সময়ে বঙ্গীয় চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির স্বীকৃতি, প্রযোজক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে সম্মানিত ছবির সঙ্গে যুক্ত থাকা—এসব আলাদা ট্রফির তালিকা নয়; এগুলো তাঁর অবস্থান বদলের চিহ্ন। প্রথমদিকে প্রশ্ন ছিল, তিনি টিকবেন কি না। পরে প্রশ্ন হলো, তাঁর ছবি কেমন চলবে। আরও পরে প্রশ্ন দাঁড়াল, তাঁর অভিনয়ের সীমা কোথায়। ‘নায়ক’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘অমানুষ’, ‘অগ্নীশ্বর’—বয়সের সঙ্গে তিনি চরিত্রের ছায়াও বদলেছেন। রোম্যান্টিক যুবক থেকে ক্লান্ত, দায়বদ্ধ, কখনও অনুতপ্ত, কখনও কঠোর পুরুষে রূপান্তর তাঁর দীর্ঘস্থায়িত্বের বড় কারণ।

তবে তাঁর সাম্রাজ্যে সব অভিযান সফল ছিল না। হিন্দি ছবিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা, বড় প্রযোজনার আর্থিক চাপ, বাজারের অনিশ্চয়তা—এসবও ছিল। এটাই তাঁকে আরও মানবিক করে। যে মানুষ ব্যর্থতা থেকে উঠে এসেছিলেন, সাফল্যের মধ্যেও ব্যর্থতা তাঁকে ছাড়েনি। কিন্তু পার্থক্য হলো, প্রথম জীবনে ব্যর্থতা তাঁর অস্তিত্ব মুছে দিতে পারত; পরে ব্যর্থতা তাঁর প্রতিষ্ঠিত অবস্থানকে প্রশ্ন করলেও তাঁকে আর অদৃশ্য করতে পারেনি।

চতুর্থ অঙ্ক: মহানায়ক কি স্মৃতি, না এখনও জীবন্ত একটি অভিনয়ভাষা

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তম কুমারের মৃত্যু কেবল একজন জনপ্রিয় অভিনেতার মৃত্যু হিসেবে ধরা পড়েনি। তিপ্পান্ন বছরের জীবন, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্দায় উপস্থিতি, অসংখ্য চরিত্র, গান, সংলাপ, হাসি—সব মিলিয়ে তিনি তখন ব্যক্তির সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। কোনো শিল্পীর মৃত্যুর পরই ‘মিথ’ তৈরি হয় না; মিথ তৈরি হয় যখন তাঁর অনুপস্থিতি নতুন প্রজন্মের কাছেও উপস্থিতির মতো কাজ করতে থাকে। উত্তমের ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে। টেলিভিশনের পুনঃপ্রচার, পুরোনো গানের নতুন শ্রোতা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দৃশ্যের পুনরাবিষ্কার, পোস্টার, বই, স্মরণানুষ্ঠান—মাধ্যম বদলেছে, মুখটি থেকে গেছে।

কিন্তু এই স্থায়িত্বকে কি শুধুই নস্টালজিয়া দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়? বাংলা মধ্যবিত্তের কাছে উত্তম–সুচিত্রা এক হারিয়ে যাওয়া শহরের, হারানো পোশাকের, হারানো উচ্চারণের, হারানো প্রেমপত্রের স্মৃতি বহন করে। সাদা-কালো ফ্রেমে তাঁরা এমন এক যুগকে সংরক্ষণ করেন, যা বাস্তবে হয়তো এত সুন্দর ছিল না, কিন্তু স্মৃতিতে ক্রমে মসৃণ হয়ে গেছে। তবু এটাকে নিছক অতীতপ্রেম ভাবলে আরেকটি সত্য চাপা পড়ে। নস্টালজিয়া দুর্বল অভিনয়কে একশ বছর ধরে টিকিয়ে রাখতে পারে না। যে দর্শক সেই সময় দেখেনি, সে যদি আজও ‘নায়ক’-এর অরিন্দমের চোখে ভয় পড়তে পারে, ‘সপ্তপদী’র কৃষ্ণেন্দুর আঘাত বুঝতে পারে, ‘হারানো সুর’-এর স্মৃতিহীনতার অসহায়তা অনুভব করতে পারে, তবে সেখানে কারিগরি শক্তি আছে।

আমার কাছে মনে হয়, উত্তমের সবচেয়ে অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল পরিচিতিকে অভিনয়ের শত্রু হতে না দেওয়া। তিনি এত বড় তারকা ছিলেন যে দর্শক চরিত্রের আগে তাঁকেই চিনত। সাধারণত এতে অভিনেতার বিপদ হয়—প্রতিটি চরিত্র একই ব্যক্তিত্বের সংস্করণ হয়ে পড়ে। উত্তমও এই ফাঁদ থেকে সর্বদা মুক্ত ছিলেন না; তাঁর বহু বাণিজ্যিক ছবিতে ‘উত্তমীয়’ ভঙ্গি পুনরাবৃত্ত হয়েছে। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজগুলোতে তিনি সেই পরিচিত ভঙ্গিকেই কখনও চরিত্রের আশ্রয়, কখনও মুখোশ, কখনও ভাঙনের উপকরণ করেছেন। ‘নায়ক’-এ তারকাখ্যাতিই চরিত্রের কারাগার; ‘চিড়িয়াখানা’-য় পরিচিত আকর্ষণকে শীতল করতে হয়; ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-তে কণ্ঠ, শরীর, সাংস্কৃতিক অবস্থান অন্য রকম ছন্দ দাবি করে। এখানেই মিথের নিচে কারিগরকে দেখা যায়।

‘মহানায়ক’ উপাধিটিও তাই শুধু জনপ্রিয়তার পরিমাপ নয়। বাংলা ভাষায় মহানায়ক বলতে আমরা এমন একজনকে বুঝতে শিখেছি, যিনি নায়কের চেয়েও বড়—কিন্তু বড় মানে কী? বেশি হিট? বেশি ভক্ত? বেশি স্মরণ? এগুলো নিশ্চয়ই আছে। তবু উত্তমের ক্ষেত্রে বড় হওয়ার অর্থ আরও কিছু: তিনি একটি সমাজের পুরুষ-আদর্শকে কোমল করেছিলেন, প্রেমিকের শরীরে ভঙ্গুরতা এনেছিলেন, নায়কের মুখে দ্বিধাকে জায়গা দিয়েছিলেন, আবার একই সঙ্গে সেই সমাজের রুচি, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপ্রতিকৃতিকে বহন করেছিলেন। দেশভাগ-পরবর্তী বাংলার মধ্যবিত্ত যখন নতুন শহর, নতুন অনিশ্চয়তা, নতুন সামাজিক সিঁড়িতে নিজেকে খুঁজছিল, তখন উত্তমের পর্দাগত আত্মবিশ্বাস এক ধরনের সাংস্কৃতিক আশ্রয় হয়ে উঠেছিল—গবেষকরাও তাঁর তারকাসত্তাকে সেই বৃহত্তর ভদ্রলোকীয় সাংস্কৃতিক জগতের পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

এখানে সুচিত্রা সেনের কথাও আবার ফিরে আসে। কারণ উত্তমের মিথ একা তৈরি হয়নি। একটি অভিনয়-সংস্কৃতি, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সঙ্গীতকার, গায়ক, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদক, সহ-অভিনেতা—অসংখ্য মানুষের শ্রম তাঁকে ঘিরে সেই যুগ নির্মাণ করেছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ উত্তমের পর্দার শরীরে যে দ্বিতীয় আত্মা তৈরি করেছিল, সুচিত্রার বিপরীতমুখী শক্তি যে রোম্যান্টিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল, সত্যজিৎ রায় যে আত্মসমীক্ষার আয়নায় তাঁকে দাঁড় করিয়েছিলেন—এসব বাদ দিলে ‘মহানায়ক’ একা, অতিরঞ্জিত এবং ইতিহাসহীন হয়ে পড়েন। মহানায়কত্ব ব্যক্তিগত প্রতিভার ফল, কিন্তু কখনও ব্যক্তিগত প্রতিভা মাত্র নয়।

শেষ পর্যন্ত অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এই যে তিনি ‘উত্তম কুমার’ নামের একটি চরিত্র তৈরি করেছিলেন, তারপর সারা জীবন সেই চরিত্রের ভেতর থেকেও বারবার অন্য মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। দর্শক তাঁকে ভালোবেসেছে মুখের জন্য, হাসির জন্য, প্রেমের জন্য—কিন্তু তিনি টিকে আছেন কারণ সেই মুখের নিচে ছিল কঠোর অনুশীলন, ব্যর্থতার স্মৃতি, ক্যামেরা সম্পর্কে গভীর বোধ, নিজেকে বদলানোর ক্ষমতা।

এই কারণেই শতবর্ষে এসে ‘মহানায়ক’ শব্দটি এখনও শুধু সম্মানসূচক নয়। এটি এক ধরনের ঐতিহাসিক সংক্ষিপ্তলিপি—একজন ব্যর্থ যুবকের জেদ, এক অভিনেতার ভাষাগত বিপ্লব, এক তারকার বাজার-ক্ষমতা, এক নির্মাতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, এক যুগের সম্মিলিত স্বপ্ন।

সর্বশেষ