৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

ইতিহাস কখনোই একটি সরলরেখায় চলে না; এটি মানবজাতির বিজয়, নিদারুণ ট্র্যাজেডি, নীরব উদ্ভাবন এবং সরব বিপ্লবের এক অত্যন্ত জটিল বুনন। ক্যালেন্ডারের পাতায় ৬ই সেপ্টেম্বর ঠিক এমনই একটি দিন, যা এই চরম বিশৃঙ্খলা আর সৌন্দর্যের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। ঠিক এই দিনটিতেই, প্রথমবারের মতো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে একটি ভাঙাচোরা জাহাজ স্পেনের বন্দরে ফিরে এসেছিল, একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আততায়ীর বুলেটে লুটিয়ে পড়েছিলেন এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মানবাধিকার রক্ষায় এক যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছিল।

আপনি যদি সমাজের বিবর্তন নিয়ে আগ্রহী একজন সংস্কৃতি-গবেষক হন, বিস্মৃত মাইলফলক খুঁজতে থাকা একজন সংগ্রাহক হন, অথবা নিছকই কৌতূহলী কোনো মানুষ হন—৬ই সেপ্টেম্বরের ঐতিহাসিক পদচিহ্ন আপনার জন্য গল্পের এক বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে অপেক্ষায় আছে। চলুন, গভীর দৃষ্টিতে দেখে নেওয়া যাক সেইসব ঘটনা, দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব এবং সাংস্কৃতিক মাইলফলকগুলোকে, যা আজকের এই দিনে পুরো পৃথিবীর রূপরেখা বদলে দিয়েছিল।

বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশ

ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, রাজনৈতিক বিবর্তন এবং অসামান্য শৈল্পিক অবদানে সমৃদ্ধ। বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য ৬ই সেপ্টেম্বর বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মাইলফলক বহন করে।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাবলি

  • ১৯৫৬: পূর্ব বাংলায় গণতান্ত্রিক জোটের সূচনা: বাংলাদেশ তার কষ্টার্জিত স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক দশক আগে থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অধিকার আদায়ের এক উত্তাল রণাঙ্গন। ১৯৫৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠিত হয়। এটি ছিল একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত, যা পূর্ব বাংলায় একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশের সূচনা করেছিল। এই ঘটনাটি বাঙালি রাজনীতিকদের কণ্ঠস্বরকে আরও জোরালো করে এবং সেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

  • ১৯৬৫: পাক-ভারত যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি: উপমহাদেশের সামরিক ইতিহাসে ৬ই সেপ্টেম্বর অত্যন্ত গভীরভাবে খোদাই করা একটি দিন। পাকিস্তানের “অপারেশন গ্র্যান্ড স্ল্যাম”-এর পর, ১৯৬৫ সালের এই দিনে ভারতীয় বাহিনী প্রতিশোধ নিতে পাঞ্জাবের আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ‘লাহোরের যুদ্ধ’ শুরু হয়। এই পদক্ষেপটি কাশ্মীর নিয়ে একটি আঞ্চলিক সংঘাতকে পূর্ণাঙ্গ প্রচলিত যুদ্ধে পরিণত করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই যুদ্ধেই সবচেয়ে বড় ট্যাংক লড়াইয়ের ঘটনা ঘটেছিল। পরিশেষে, জাতিসংঘের নির্দেশনায় যুদ্ধবিরতি এবং তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও, এর ভূ-রাজনৈতিক ক্ষত আজও স্পষ্ট।

  • ২০১৮: ভারতে সমকামিতার বৈধতা প্রদান: আধুনিক ভারতের ইতিহাসে অন্যতম প্রগতিশীল আইনি মাইলফলক হিসেবে, ২০১৮ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিল করে। ঔপনিবেশিক আমলের এই আইনটি প্রায় ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সম্মতিসূচক সমকামী সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আসছিল। পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চের এই সর্বসম্মত রায়কে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে মানবাধিকার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) সম্প্রদায়ের জন্য এক বিশাল বিজয় হিসেবে বিশ্বব্যাপী উদ্‌যাপন করা হয়।

উপমহাদেশের বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু

ব্যক্তিত্ব জীবনকাল অবদান ও উত্তরাধিকার
মিতা হক ১৯৬২ – ২০২১ বাংলাদেশের কিংবদন্তি রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। তিনি ছিলেন একজন শুদ্ধতাবাদী, যিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদি সুর সংরক্ষণ ও নিখুঁত পরিবেশনায় তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ লাভ করেন।
আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত ১৯৮৩ – বর্তমান একজন প্রশংসিত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। তাঁর সাড়া জাগানো প্রথম চলচ্চিত্র, আশা যাওয়ার মাঝে (Labour of Love), কলকাতার মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব ও ক্লান্তিকর ছন্দকে অপূর্বভাবে তুলে ধরেছে। এটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায় এবং প্রমাণ করে যে আঞ্চলিক বাংলা সিনেমা বিশ্বশিল্পের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র।
সালমান শাহ ১৯৭১ – ১৯৯৬ জন্মগত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। নব্বইয়ের দশকে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে (ঢালিউড) এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। সম্পূর্ণ নতুন, আধুনিক নান্দনিকতা এবং অমোঘ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই তারকার ২৪ বছর বয়সে ৬ই সেপ্টেম্বরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ও অত্যন্ত বিতর্কিত মৃত্যু বাংলাদেশের মানুষের মনে এক স্থায়ী ক্ষত রেখে গেছে।

আন্তর্জাতিক দিবস ও জাতীয় ছুটি

ভূ-রাজনীতির বাইরেও, ৬ই সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে জাতীয় গর্ব, নীরব প্রতিফলন এবং সম্প্রদায়-ভিত্তিক বিভিন্ন দিবস পালনের জন্য বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।

  • স্বাধীনতা দিবস (এসওয়াতিনি): পূর্বে সোয়াজিল্যান্ড নামে পরিচিত, দক্ষিণ আফ্রিকার এই স্থলবেষ্টিত দেশটি ১৯৬৮ সালের এই দিনে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে তাদের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা অর্জন করে। দিনটি ঐতিহ্যবাহী সোয়াজি সংগীত, দর্শনীয় নৃত্য পরিবেশনা (যার মধ্যে এই মৌসুমের বিখ্যাত রিড ড্যান্স অন্যতম) এবং জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে পালিত হয়।

  • বই পড়ার দিন (National Read a Book Day): এটি একটি বিশ্বব্যাপী পালিত তৃণমূল পর্যায়ের ছুটির দিন, যা মানুষকে ডিজিটাল স্ক্রিন, অন্তহীন স্ক্রোলিং এবং আধুনিক জীবনের উদ্বেগ থেকে দূরে সরে গিয়ে সাহিত্যের জগতে ডুব দিতে উৎসাহিত করে। এই দিনে লাইব্রেরি, স্কুল এবং স্বাধীন বইয়ের দোকানগুলো প্রায়ই একটানা বই পড়ার আসর বা ‘রিড-এ-থন’ আয়োজন করে থাকে।

  • মৃতবৎসা স্মরণ দিবস (Stillbirth Remembrance Day): মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় পালিত এই শোকাবহ দিনটি সেইসব পরিবারকে সম্মান জানায়, যারা শিশু মৃত্যু বা মৃত সন্তান প্রসবের মতো নিদারুণ ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছেন। গর্ভপাত ঘিরে থাকা সামাজিক কলঙ্ক ভেঙে ফেলা এবং সম্মিলিতভাবে শোক মোকাবিলার সহায়তা প্রদানের ওপর এই দিনটিতে জোর দেওয়া হয়।

  • দীর্ঘসূত্রতা দূর করার দিন (Fight Procrastination Day): এটি কিছুটা হালকা মেজাজের হলেও অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি দিন, যা মূলত ফেলে রাখা কাজগুলো শেষ করার জন্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।

বিশ্ব ইতিহাস: মহাদেশীয় প্রেক্ষাপট

বিশ্ব ইতিহাস

৬ই সেপ্টেম্বরের বৈশ্বিক প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে কীভাবে এই দিনে বিভিন্ন মহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণগুলো বদলে গিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র: ভোটাধিকার, গুপ্তহত্যা এবং সুপারমার্কেট

  • ১৮৭০: নারীদের ভোটাধিকারের মাইলফলক: ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে দেশজুড়ে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত হওয়ার বহু আগে, পশ্চিমাঞ্চলীয় ওয়াইওমিং (Wyoming) অঞ্চল একটি সমান ভোটাধিকার আইন পাস করে। ১৮৭০ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর, লুইসা অ্যান সোয়াইন নামের একজন বয়স্ক নারী পরিষ্কার এপ্রন পরে লারামির একটি ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন এবং ১৮০৭ সালের পর সাধারণ নির্বাচনে বৈধ ব্যালট প্রদানকারী প্রথম মার্কিন নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

  • ১৯০১: প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলে-কে হত্যা: নিউইয়র্কের বাফেলোতে প্যান-আমেরিকান এক্সপোজিশনে অংশগ্রহণ করার সময়, প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলে লিওন সলগোজ নামক এক স্বঘোষিত নৈরাজ্যবাদীর গুলিতে দুবার বিদ্ধ হন। এই ঘটনা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়। ম্যাককিনলে প্রাথমিক হামলা থেকে বেঁচে গেলেও, কয়েকদিন পর গ্যাংরিন বা পচন ধরে তার মৃত্যু হয়। তাঁর এই মৃত্যু তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টকে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন করে এবং আমেরিকার নিরাপত্তা প্রোটোকল চিরতরে বদলে দেয়, যার ফলশ্রুতিতে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্টকে রক্ষার দায়িত্ব ‘সিক্রেট সার্ভিস’-এর হাতে তুলে দেয়।

  • ১৯১৬: আধুনিক সুপারমার্কেটের জন্ম: ১৯১৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বরের আগে, মুদি কেনাকাটার জন্য একজন কেরানির হাতে তালিকা ধরিয়ে দিতে হতো, যিনি আপনার জন্য পণ্যগুলো এনে দিতেন। ক্ল্যারেন্স স্যান্ডার্স মেমফিস, টেনেসিতে প্রথম “পিগলি উইগলি” (Piggly Wiggly) স্টোর খোলার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের কেনাকাটার অভিজ্ঞতা চিরতরে বদলে দেন। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম সত্যিকারের সেলফ-সার্ভিস বা স্বয়ংক্রিয় সেবামূলক মুদি দোকান, যেখানে প্রথমবারের মতো শপিং বাস্কেট, উন্মুক্ত তাক এবং চেকআউট স্ট্যান্ডের প্রচলন করা হয়।

  • ১৯৯৫: বেসবলের আয়রন ম্যান: ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্তে, বাল্টিমোর ওরিওলসের ক্যাল রিপকেন জুনিয়র তার ২,১৩১তম টানা মেজর লিগ বেসবল ম্যাচ খেলেন। এর মাধ্যমে তিনি ইয়াঙ্কিস কিংবদন্তি লু গেহরিগের গড়া “অটুট” রেকর্ড ভেঙে দেন। স্টেডিয়ামের দর্শকরা টানা ২২ মিনিট দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানায়, যা ছিল অদম্য মানসিকতা এবং একাগ্রতার এক চূড়ান্ত প্রতীক।

ইউরোপ: প্রথম বিশ্বভ্রমণ এবং অলিম্পিক ট্র্যাজেডি

  • ১৫২২: ভিক্টোরিয়া জাহাজের চূড়ান্ত যাত্রা সম্পন্ন: ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান স্পাইস আইল্যান্ডে যাওয়ার পশ্চিমের পথ খোঁজার জন্য পাঁচটি জাহাজ এবং ২৭০ জন নাবিক নিয়ে যাত্রা শুরু করার তিন বছর পর, একটিমাত্র জরাজীর্ণ জাহাজ স্পেনের সানলুকার ডি বারামেদা বন্দরে এসে পৌঁছায়। জুয়ান সেবাস্তিয়ান এলকানো-র নেতৃত্বে (ম্যাগেলান ফিলিপাইনে নিহত হয়েছিলেন) ‘ভিক্টোরিয়া’ নামের ওই জাহাজটিতে ছিল মাত্র ১৮ জন অনাহারে ভোগা জীবিত নাবিক। ১৫২২ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীর প্রথম রেকর্ডকৃত প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করেন, যা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করেছিল আমাদের এই গ্রহটি আসলে কতটা বিশাল।

  • ১৯৭২: মিউনিখ হত্যাকাণ্ডের মর্মান্তিক সমাপ্তি: ১৯৭২ সালে মিউনিখে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের উদ্দেশ্য ছিল একটি নতুন, শান্তিকামী জার্মানিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু এর বদলে এটি পরিণত হয় নজিরবিহীন এক সন্ত্রাসের মঞ্চে। ৬ই সেপ্টেম্বর ফার্স্টেনফেল্ডব্রুক বিমানঘাঁটিতে এই সংকটের এক রক্তক্ষয়ী সমাপ্তি ঘটে। পশ্চিম জার্মান পুলিশের একটি ব্যর্থ উদ্ধার অভিযানের ফলে ৯ জন ইসরায়েলি জিম্মি, একজন জার্মান পুলিশ কর্মকর্তা এবং ফিলিস্তিনি ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর গ্রুপের ৫ জন সন্ত্রাসীর মৃত্যু হয়। এই ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ দমন কৌশলকে চিরতরে বদলে দেয়।

  • ১৯৯১: সেন্ট পিটার্সবার্গের পুনর্জন্ম: সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্রুত পতন শুরু হওয়ার পর, রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের নাগরিকরা তাদের সোভিয়েত পরিচয় মুছে ফেলার পক্ষে ভোট দেয়। এই দিনে লেনিনগ্রাদ শহরটি আনুষ্ঠানিকভাবে তার আদি, রাজকীয় নাম ‘সেন্ট পিটার্সবার্গ’ ফিরে পায়। একই দিনে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া এবং লিথুয়ানিয়া) স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়, যা ছিল আয়রন কার্টেনের চূড়ান্ত পতনের ইঙ্গিত।

  • ১৯৯৭: প্রিন্সেস ডায়ানাকে বৈশ্বিক বিদায়: লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে অনুষ্ঠিত ওয়েলসের প্রিন্সেস ডায়ানার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান দেখার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রায় দুই বিলিয়ন (২০০ কোটি) মানুষ টেলিভিশন সেটের সামনে বসেছিলেন। প্যারিসে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর আকস্মিক মৃত্যু সাধারণ মানুষের মাঝে নজিরবিহীন শোকের ছায়া ফেলেছিল, যা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্ককে আমূল আধুনিকায়ন করতে বাধ্য করেছিল।

আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য: গুপ্তহত্যা ও গোপন হামলা

  • ১৯৬৬: অ্যাপার্থেইড বা বর্ণবাদের স্থপতির পতন: দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রী হেন্ড্রিক ভেরউর্ড, যাকে মূলত নিষ্ঠুর, বর্ণবাদী ‘অ্যাপার্থেইড’ (Apartheid) ব্যবস্থার প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ছুরিকাঘাতে নিহত হন। কেপটাউনে হাউস অফ অ্যাসেম্বলির ফ্লোরে দিমিত্রি সাকেন্ডাস নামের একজন সংসদীয় বার্তাবাহক তাকে হত্যা করেন। যদিও তাঁর মৃত্যু শাসক গোষ্ঠীকে চরমভাবে হতবাক করেছিল, তবে এটি তাৎক্ষণিকভাবে বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটায়নি; বরং এই শাসনব্যবস্থা আরও তিন দশক ধরে টিকে ছিল।

  • ২০০৭: অপারেশন অরচার্ড (Operation Orchard): মধ্যরাতের ঠিক পর এক অত্যন্ত গোপনীয় সামরিক পদক্ষেপে, ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর জেট বিমানগুলো সিরিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং দেইর ইজ-জোর অঞ্চলের একটি স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। বহু বছর পর এটি নিশ্চিত করা হয় যে, ঐ লক্ষ্যবস্তুটি ছিল উত্তর কোরিয়ার সহায়তায় নির্মিত একটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক চুল্লি। এই হামলাটি মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক ভারসাম্যকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছিল।

বিশ্বের বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু

বড় বড় আন্দোলন সবসময়ই নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়। ৬ই সেপ্টেম্বর একদিকে যেমন অনেক বিপ্লবী ও বিজ্ঞানীদের জন্মের সাক্ষী, তেমনি এটি অনেক সাংস্কৃতিক মহারথীদের চিরবিদায়েরও দিন।

বিখ্যাত জন্ম

ব্যক্তিত্ব সাল জাতীয়তা উত্তরাধিকার ও অবদান
মার্কুইস ডি লাফায়েট ১৭৫৭ ফরাসি “দুই জগতের হিরো”। একজন ফরাসি অভিজাত এবং সামরিক কর্মকর্তা, যিনি জর্জ ওয়াশিংটনের পাশাপাশি আমেরিকান বিপ্লবী যুদ্ধে সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছিলেন এবং পরে ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম মূল ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।
জন ডাল্টন ১৭৬৬ ব্রিটিশ পথপ্রদর্শক রসায়নবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি রসায়নে আধুনিক পারমাণবিক তত্ত্বের সূচনা করেন এবং বর্ণান্ধতা (যাকে ডাল্টনিজমও বলা হয়) নিয়ে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক গবেষণা পরিচালনা করেন।
জেন অ্যাডামস ১৮৬০ আমেরিকান সমাজকর্মী, সমাজবিজ্ঞানী এবং সংস্কারক। দরিদ্র ও অভিবাসীদের সহায়তার জন্য তিনি শিকাগোতে ‘হাল হাউস’ সহ-প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে প্রথম আমেরিকান নারী হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
রজার ওয়াটার্স ১৯৪৩ ব্রিটিশ কিংবদন্তি প্রগ্রেসিভ রক ব্যান্ড ‘পিঙ্ক ফ্লয়েড’ (Pink Floyd)-এর সৃষ্টিশীল রূপকার, গীতিকার এবং বেসবাদক। তিনি The Dark Side of the Moon এবং The Wall-এর মতো কালজয়ী কনসেপ্ট অ্যালবামের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
ইদ্রিস এলবা ১৯৭২ ব্রিটিশ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন প্রখ্যাত অভিনেতা। এইচবিও-এর The Wire, বিবিসির Luther, এবং Mandela: Long Walk to Freedom চলচ্চিত্রে নেলসন ম্যান্ডেলার চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি বিখ্যাত।

বিখ্যাত মৃত্যু

ব্যক্তিত্ব সাল জাতীয়তা উত্তরাধিকার ও অবদান
সুলতান সুলেমান (দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট) ১৫৬৬ অটোমান অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় শাসনকারী সুলতান। তাঁর শাসনামলে সাম্রাজ্য সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছেছিল, যা ভূমধ্যসাগর থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করেছিল।
সুলি প্রুদোম ১৯০৭ ফরাসি একজন ফরাসি কবি এবং প্রাবন্ধিক, যিনি সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন: ১৯০১ সালে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
আকিরা কুরোসাওয়া ১৯৯৮ জাপানি সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী চলচ্চিত্র নির্মাতা। বিশ্বজুড়ে পরিচালকরা তাঁর নির্মিত Seven Samurai এবং Rashomon-এর মতো মাস্টারপিসগুলোকে ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং বা দৃশ্যমান গল্প বলার চূড়া হিসেবে গণ্য করেন।
লুসিয়ানো পাভারোত্তি ২০০৭ ইতালিয়ান সর্বকালের অন্যতম সফল এবং বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় অপেরা টেনর। তাঁর অসাধারণ কণ্ঠস্বর এবং মঞ্চে জাদুকরী উপস্থিতি ধ্রুপদী অপেরাকে মূলধারার পপ সংস্কৃতির অংশ করে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
বার্ট রেনল্ডস ২০১৮ আমেরিকান সত্তুর এবং আশির দশকের হলিউড আইকন ও সেক্স সিম্বল। Deliverance এবং Smokey and the Bandit-এর মতো ব্লকব্লাস্টার সিনেমার জন্য তিনি অমর হয়ে আছেন।

জানেন কি? (কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য)

আড্ডায় গল্প শুরু করার মতো কিছু খুঁজছেন? ৬ই সেপ্টেম্বর সম্পর্কে এখানে তিনটি আকর্ষণীয়, স্বল্প-পরিচিত তথ্য দেওয়া হলো, যা আপনাকে চমকে দিতে পারে:

  • রাজকীয় লুকোচুরি খেলা: ১৬৫১ সালে ব্যাটল অফ ওরচেস্টারে শোচনীয় পরাজয়ের পর, ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস ৬ই সেপ্টেম্বরের পুরো দিনটি অলিভার ক্রমওয়েলের সংসদীয় বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে ব্রেসকোবেল হাউসের একটি বিশাল ওক গাছের (যা পরে রয়্যাল ওক নামে পরিচিত হয়) ডালে লুকিয়ে পার করেছিলেন।

  • বব ডিলানের সাধারণ সূচনা: ১৯৬১ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর, বব ডিলান নামের একজন তরুণ, প্রায় অপরিচিত ফোক গায়ক নিউইয়র্ক সিটির গ্রিনউইচ ভিলেজের ‘গ্যাসলাইট ক্যাফেতে’ প্রথমবারের মতো মঞ্চে গান গান। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি পুরো একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।

  • তলিয়ে যাওয়া গুপ্তধন উদ্ধার: ১৬২২ সালের এই দিনে স্প্যানিশ গুপ্তধনের জাহাজ Nuestra Señora de Atocha ফ্লোরিডা কিজের কাছে একটি ভয়াবহ হারিকেনের কবলে পড়ে ডুবে যায়, যা সাথে করে সমুদ্রের তলদেশে নিয়ে যায় কয়েক টন তামা, রূপা, সোনা এবং পান্না। সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি সময় পর গুপ্তধন শিকারী মেল ফিশার এই ধ্বংসাবশেষটি আবিষ্কার করেন, যেখান থেকে উদ্ধার হওয়া প্রাচীন নিদর্শনের মূল্য ছিল প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার।

শেষ কথা

৬ই সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলো মানব সভ্যতার অগ্রগতি, ভঙ্গুরতা এবং অদম্য সহনশীলতার এক গভীর স্মারক। ১৫২২ সালে স্পেনে ফিরে আসা স্কার্ভি-পীড়িত ‘ভিক্টোরিয়া’ জাহাজের ডেকে থাকা নাবিকদের কষ্ট থেকে শুরু করে, ১৮৭০ সালে লুইসা অ্যান সোয়াইনের মর্যাদাপূর্ণ ভোটাধিকার প্রয়োগ—এই দিনটি তাদেরই প্রমাণ দেয়, যারা অসম্ভব বলে বিবেচিত সীমানাকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছেন।

আমরা যেমন প্রেসিডেন্ট ম্যাককিনলে এবং প্রধানমন্ত্রী ভেরউর্ডের গুপ্তহত্যা কিংবা মিউনিখ অলিম্পিকের ট্র্যাজিক সহিংসতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ধর্মান্ধতার অন্ধকার দিকগুলো দেখতে পাই; ঠিক তেমনই ২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ঔপনিবেশিক আইন বাতিলের মাধ্যমে আমরা ন্যায়বিচারের পুনর্জাগরণও দেখতে পাই, যা প্রমাণ করে সমাজ ক্রমাগত বিবর্তিত হয় এবং উন্নত হয়।

জন ডাল্টনের মাধ্যমে পারমাণবিক তত্ত্বের জন্ম হোক, ক্যাল রিপকেন জুনিয়রের শারীরিক সহনশীলতা দেখে বিস্মিত হওয়া হোক, অথবা সালমান শাহ ও আকিরা কুরোসাওয়ার মতো আইকনদের অকাল বিদায়ে শোক প্রকাশ করা হোক—৬ই সেপ্টেম্বর আমাদের আধুনিক বিশ্বকে এক গভীর অতীত ইতিহাসের সাথে যুক্ত করে। “আজকের এই দিনে” কী ঘটেছিল তা জানা মানে কেবল তারিখ মুখস্থ করা নয়; বরং আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এই ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলোর অব্যাহত প্রতিধ্বনিকে অনুধাবন করা।

সর্বশেষ