২৩শে ডিসেম্বর তারিখটি বছরের এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে উপস্থিত হয়, যখন বিশ্বজুড়ে মানুষ একদিকে ফেলে আসা বছরের চিন্তায় মগ্ন, অন্যদিকে নতুনকে বরণ করার উৎসবে মাতোয়ারা। শতাব্দীজুড়ে এই দিনটি বাঙালি বলয়ে উপনিবেশবিরোধী প্রতিরোধের গল্প, রাষ্ট্রক্ষমতা ও অর্থনীতির পালাবদল এবং আধুনিক জীবনকে বদলে দেওয়া যুগান্তকারী আবিষ্কারের (যেমন ট্রানজিস্টর) সাক্ষী হয়ে আছে।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকেও দিনটি অনন্য: ভারতে এই দিনে কৃষকদের সম্মান জানানো হয়, মেক্সিকোতে মূলো দিয়ে শিল্পকর্ম তৈরি হয়, পূর্ব এশিয়ায় পালন করা হয় শীতকালীন অয়নকালের ঐতিহ্য, এমনকি পপ কালচার থেকে জন্ম নেওয়া আধুনিক ‘ছুটির দিন’ও পালিত হয় আজ।
নিচে ২৩শে ডিসেম্বর নিয়ে আপনার জন্য তৈরি বিশেষ প্রতিবেদনটি দেওয়া হলো, যেখানে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের ওপর বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে।
এক নজরে: ২৩শে ডিসেম্বরের প্রধান ঘটনাবলী
বাঙালি বলয় ও উপমহাদেশ
ঐতিহাসিক ঘটনা
১৯১২ — হার্ডিঞ্জ বোমা মামলা: বাংলা কেন্দ্রিক উপনিবেশবিরোধী প্রতিরোধ ১৯১২ সালের ২৩শে ডিসেম্বর, দিল্লিতে এক জমকালো শোভাযাত্রা চলাকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। হার্ডিঞ্জ বেঁচে গেলেও, এই ঘটনাটি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম নাটকীয় বিপ্লবী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
-
কেন এখানে বাঙালি বলয় গুরুত্বপূর্ণ: যদিও হামলাটি দিল্লিতে হয়েছিল, কিন্তু এর নেপথ্যে থাকা বিপ্লবী নেটওয়ার্কটি মূলত বাংলার সশস্ত্র আন্দোলন এবং গোপন সমিতিগুলোর সাথে যুক্ত ছিল। এটি প্রমাণ করে যে বাংলার রাজনৈতিক চেতনা কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না; বাঙালি বিপ্লবীরা সমগ্র উপমহাদেশকেই তাদের কুরুক্ষেত্র মনে করতেন।
-
আজকের দিনে এর গুরুত্ব: এটি এই সরল ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করে যে স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল আবেদন-নিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এটি প্রমাণ করে যে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র প্রতিরোধও সমানভাবে সক্রিয় ছিল।
বিখ্যাত জন্মদিন
শহীদ আলতাফ মাহমুদ (জন্ম ২৩শে ডিসেম্বর, ১৯৩৩ — বাংলাদেশ): সুরকার, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদ আলতাফ মাহমুদ বাংলাদেশের প্রতিরোধের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। ভাষা, পরিচয় এবং মুক্তিকে তিনি সুরের মাধ্যমে একসূত্রে গেঁথেছিলেন।
-
আজকের প্রাসঙ্গিকতা: একটি জাতির সংগ্রাম কীভাবে গানে গানে ছড়িয়ে পড়ে, তা বুঝতে হলে আলতাফ মাহমুদকে জানা জরুরি।
আলী মনসুর (জন্ম ২৩শে ডিসেম্বর, ১৯২৩ — বাংলাদেশ/পশ্চিমবঙ্গ): অভিনেতা, নির্দেশক এবং নাট্যব্যক্তিত্ব আলী মনসুর দেশভাগ-পরবর্তী যুগে বাঙালি সাংস্কৃতিক জীবনের এক উজ্জ্বল নাম। নাটক ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি সমসাময়িক সমাজকে তুলে ধরেছিলেন।
চৌধুরী চরণ সিং (জন্ম ২৩শে ডিসেম্বর, ১৯০২ — ভারত): ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং কৃষকদের নেতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর জন্মদিনটি ভারতে ‘কিষাণ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
-
আজকের প্রাসঙ্গিকতা: দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষি এখনও কোটি কোটি মানুষের জীবিকা। ফসলের ন্যায্য মূল্য, কৃষি ঋণ এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো জাতীয় নীতিতে কতটা গুরুত্ব পাবে, তা মনে করিয়ে দেয় এই দিনটি।
বিখ্যাত মৃত্যু
মাহবুব উল আলম চৌধুরী (মৃত্যু ২৩শে ডিসেম্বর, ২০০৭ — বাংলাদেশ): কবি এবং ভাষা সৈনিক। একুশের চেতনার সাথে যুক্ত অন্যতম শক্তিশালী কবিতার রচয়িতা হিসেবে তিনি স্মরণীয়।
-
আজকের প্রাসঙ্গিকতা: তিনি মনে করিয়ে দেন, ভাষা আন্দোলন কেবল ব্যাকরণের বিষয় ছিল না; এটি ছিল মর্যাদা এবং অধিকারের লড়াই।
শ্যাম বেনেগাল (মৃত্যু ২৩শে ডিসেম্বর, ২০২৪: ভারতের প্যারালাল বা সমান্তরাল সিনেমার অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো ক্ষমতা, লিঙ্গবৈষম্য এবং সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
-
আজকের প্রাসঙ্গিকতা: দ্রুতগতির কন্টেন্টের এই যুগে, বেনেগালের কাজ মনে করিয়ে দেয় যে চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়, এটি সমাজকে জানার এক মাধ্যমও।
সংস্কৃতি ও উৎসব
কিষাণ দিবস (জাতীয় কৃষক দিবস): চৌধুরী চরণ সিংয়ের জন্মবার্ষিকীতে প্রতি বছর ২৩শে ডিসেম্বর কৃষকদের সম্মান জানাতে দিনটি পালিত হয়। এটি কেবল একটি দিবস নয়, বরং একটি বার্ষিক প্রশ্ন—কৃষকরা কি গত বছরের চেয়ে ভালো আছেন?
শীতকালীন আবহ ও বড়দিনের প্রস্তুতি পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ এবং পুরো উপমহাদেশে ডিসেম্বরের শেষ ভাগ মানেই:
-
শীতকালীন নবান্ন ও পিঠা উৎসবের আমেজ।
-
বিয়েবাড়ির ধুমধাম।
-
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বড়দিনের প্রস্তুতি।
-
এবং বছর শেষের ছুটির মেজাজ।
আন্তর্জাতিক দিবস ও পালনীয়
জাপান — সম্রাটের জন্মদিন (ঐতিহাসিক): সম্রাট আকিহিতোর শাসনামলে ২৩শে ডিসেম্বর ছিল জাপানের সরকারি ছুটির দিন। ২০১৯ সালে সিংহাসন বদলের পর এটি পরিবর্তিত হলেও, দিনটি জাপানিদের কাছে এখনও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফেস্টিভ্যাস (Festivus): পপ কালচার জনপ্রিয় টিভি শো শেইনফেল্ড (Seinfeld) থেকে উদ্ভূত এই কাল্পনিক দিনটি ছুটির মৌসুমের চাপ কমানোর জন্য পালন করা হয়। এটি মূলত ব্যঙ্গাত্মক, যেখানে উৎসবের নামে বাণিজ্যিকীকরণের প্রতিবাদ জানানো হয়।
নাইট অফ দ্য র্যাডিশেস (Noche de Rábanos): মেক্সিকো প্রতি বছর ২৩শে ডিসেম্বর মেক্সিকোর ওহাকা শহরে বিশাল আকারের মূলো খোদাই করে অদ্ভুত সব শিল্পকর্ম তৈরির প্রতিযোগিতা হয়। এটি প্রমাণ করে যে সাধারণ সবজি দিয়েও অসাধারণ ঐতিহ্য তৈরি সম্ভব।
দংঝি উৎসব (শীতকালীন অয়নকাল) — চীন ও পূর্ব এশিয়া ২১-২৩ ডিসেম্বরের মধ্যে পালিত এই উৎসবটি কেবল জ্যোতির্বিজ্ঞান নয়, বরং ভারসাম্য এবং পারিবারিক পুনর্মিলনের প্রতীক। এই সময়ে ট্যাংইউয়ান (মিষ্টি চালের বল) খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে।
বিশ্ব ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্র
-
১৭৮৩: জর্জ ওয়াশিংটন সেনাপ্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দেন। এটি ছিল গণতন্ত্রের জন্য এক বিশাল পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে যে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের সেবক, শাসক নয়।
-
১৯১৩: ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম গঠিত হয়, যা আজও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে।
-
১৯৪৭: বেল ল্যাবসে ট্রানজিস্টর প্রদর্শিত হয়। আজকের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট—সবকিছুর মূলে রয়েছে এই ছোট যন্ত্রটি।
-
১৯৫৪: প্রথম সফল কিডনি প্রতিস্থাপন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
রাশিয়া
-
১৯৫৩: লাভরেন্টি বেরিয়ার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। এটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় ক্ষমতার পালাবদলের নৃশংসতার প্রতীক।
-
২০১৩: মিখাইল কালাশনিকভ মৃত্যুবরণ করেন। একে-৪৭ (AK-47) এর নকশাকার হিসেবে তিনি পরিচিত।
যুক্তরাজ্য
-
১৬৮৮: রাজা জেমস দ্বিতীয় পলায়ন করেন। গৌরবময় বিপ্লবের এই ঘটনা রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সীমিত করার পথ প্রশস্ত করে।
অস্ট্রেলিয়া
-
১৯০১: ইমিগ্রেশন রেস্ট্রিকশন অ্যাক্ট পাস হয়। এটি কুখ্যাত ‘হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া পলিসি’র ভিত্তি ছিল, যা আধুনিক বহুসংস্কৃতির অস্ট্রেলিয়ায় একটি কালো অধ্যায় হিসেবে গণ্য হয়।
আর্জেন্টিনা
-
২০০১: ঋণ পরিশোধ স্থগিত এবং অর্থনৈতিক সংকট। এটি বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে একটি বড় শিক্ষা হয়ে আছে।
বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু (আন্তর্জাতিক)
বিখ্যাত জন্ম:
-
সম্রাট আকিহিতো (১৯৩৩): জাপানের প্রাক্তন সম্রাট।
-
জোসেফ স্মিথ (১৮০৫): ল্যাটার-ডে সেইন্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা।
-
হেলমুট স্মিডট (১৯১৮): পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর।
-
এডি ভেডার (১৯৬৪): পার্ল জ্যাম ব্যান্ডের গায়ক এবং রক আইকন।
বিখ্যাত মৃত্যু:
-
হিদেকি তোজো (১৯৪৮): জাপানি প্রধানমন্ত্রী, যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত।
-
লাভরেন্টি বেরিয়া (১৯৫৩): সোভিয়েত গোপন পুলিশের প্রধান।
-
জোন ডিডিয়ন (২০২১): প্রভাবশালী মার্কিন লেখিকা ও সাংবাদিক।
-
মিখাইল কালাশনিকভ (২০১৩): অস্ত্রের নকশাকার।
শেষ কথা
২৩শে ডিসেম্বর কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়; এটি এমন একটি দিন যা আমাদের আধুনিক বিশ্বকে আকার দিয়েছে। ট্রানজিস্টরের আবিষ্কার থেকে শুরু করে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম—এই দিনের প্রতিটি ঘটনা আমাদের বর্তমান জীবনযাত্রার সাথে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং এই দিনের ঘটনাগুলোকে স্মরণ করে আমরা ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারি।


