শ্রীকান্ত থেকে শেষ প্রশ্ন: দেশে ফেরার পর শরৎচন্দ্রের বাইশ বছর

সর্বাধিক আলোচিত

১৯০৭ সালের দিকের ঘটনা। নতুন এক লেখকের লেখা বেরোচ্ছে, পাঠক বাড়ছে, নাম ছড়াচ্ছে — লেখা যত জনপ্রিয় হচ্ছে, লেখক নিয়ে তত ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে, কেউ কেউ তো দাবি করছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছদ্মনামে লিখছেন। আর লোকটি বসে আছেন হাজার মাইল দূরে, একটা অফিসঘরে, হিসাবের খাতা নিয়ে। দেশ তাঁকে চিনে ফেলেছিল যখন তিনি দেশে ছিলেন না।

ফিরে আসা

লেখক দেশে ফিরলেন তেরো বছর পর, এবং ফিরে এসে দেখলেন তাঁর নামটা তাঁর আগেই পৌঁছে গেছে।

এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। খ্যাতি এসেছে, কিন্তু খ্যাতি তৈরি হওয়ার সময়টায় তিনি ছিলেন না। যারা তাঁর বই পড়ে কেঁদেছে, তাদের একজনকেও তিনি দেখেননি।

১৯১৬ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রেঙ্গুনের চাকরি ছেড়ে দিলেন। ছুটি নিয়ে অফিসের সঙ্গে একটা মনোমালিন্য হয়েছিল।

বয়স তখন চল্লিশ।

সঞ্চয় বলতে বিশেষ কিছু নেই। নিজের বাড়ি নেই। হাওড়ার বাজে শিবপুরে ফার্স্ট বাই লেনে একটা ঘর ভাড়া নিলেন।

আট মাস পরে একই রাস্তায় আরেকটা ভাড়াবাড়িতে। সেখানে থাকলেন ন বছর।

ওই ঘরে বসে পরের চার বছরে যা লেখা হলো, তার তালিকা এখন আর কাউকে মনে করিয়ে দিতে হয় না। শ্রীকান্তচরিত্রহীনদত্তাগৃহদাহবামুনের মেয়ে। সঙ্গে ছাপা হলো দেবদাস, যেটা তিনি লিখেছিলেন কুড়ি বছর বয়সে, ভাগলপুরের খাতায়।

একটা ভাড়াবাড়ি থেকে বাংলা সাহিত্যের অর্ধেকটা তাক ভরে গেল।

দেবদাস পরে যা হলো, তা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে বিরলতম ঘটনা। পনেরোবারের বেশি রুপালি পর্দায়, ছয়-সাতটা ভাষা, একশো বছরের বেশি সময়।

যে জীবন খাতায় হারানোর সংখ্যা অনেক

বার্মার তেরো বছরের গল্পটা আসলে শরৎচন্দ্রের হারানোর গল্প।

১৯০৩ সালে তিনি গিয়েছিলেন রেঙ্গুনে, আত্মীয়ের সূত্রে, চাকরির খোঁজে। রেলওয়ে অডিট অফিসে একটা অস্থায়ী কাজ পেলেন।

সেটা চলে গেল।

তারপর পেগু। তারপর লাঙ্গলাবিনে এক ধান ব্যবসায়ীর সঙ্গে কিছুদিন। ১৯০৬ সালে একটা পাকা চাকরি জুটল অবশেষে।

বোটাটং-পোজনটং অঞ্চলে থাকতেন। সেখানেই বিয়ে করলেন, শান্তিকে। একটা ছেলে হলো।

ছেলেটার এক বছর বয়সে প্লেগ এল। মা আর শিশু — দুজনেই চলে গেল সময়ের ওপারে।

এরপর তিনি কী করেছিলেন, কতদিন লাগল, কেউ লিখে রাখেনি।

অনেক বছর পরে আবার বিয়ে। মেয়েটির নাম মোক্ষদা, বয়স কম। শরৎচন্দ্র তাঁর নাম পাল্টে রাখলেন হিরন্ময়ী। তারপর নিজে হাতে তাঁকে অক্ষর চেনালেন।

নাম কেড়ে নেওয়া আর অক্ষর দেওয়া, একই লোকের একই হাতে।

তাঁর উপন্যাসের মেয়েরা যেন এই দুটোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।

এদিকে কলকাতায় ঘটছিল সম্পূর্ণ উল্টো কিছু। বন্ধু সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় তাঁর অজান্তেই ‘বড়দিদি’ পাঠিয়ে দিলেন ভারতী পত্রিকায়। ছাপা হলো, লেখকের নাম ছাড়াই।

তারপর যমুনা-য় ‘রামের সুমতি’। তারপর একের পর এক।

তিনি রেঙ্গুনে বসে আছেন, আর বাংলায় তাঁর বই বিক্রি হচ্ছে। নিজের খ্যাতির জন্মটা তিনি দেখেননি।

চল্লিশ বছর বয়সে যিনি ভাড়াবাড়িতে উঠলেন, তিনি নতুন লেখক নন। তিনি অনুপস্থিত এক বিখ্যাত লোক, যিনি অবশেষে হাজির হয়েছেন। যেমন মোহন জাদুতে মুগ্ধ দর্শকের সামনে পর্দার অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসে জাদুকর।

গল্পের ভেতর নিজের জীবন কথা

গল্পের ভেতর নিজের জীবনকথা

জোড়াসাঁকোর একটা ঘর। ১৩২৪ বঙ্গাব্দের ১৪ চৈত্র। বিচিত্রা আসর বসেছে।

রবীন্দ্রনাথ অনুরোধ করেছেন। শরৎচন্দ্র পড়ছেন ‘বিলাসী’।

গল্পের কিশোরটির নাম ন্যাড়া।

ছোটবেলায় শরৎচন্দ্রের মাথায় চুল ছিল না। বাড়ির লোক তাঁকে ওই নামেই ডাকত।

ঘরভর্তি লোকের সামনে তিনি নিজের ডাকনাম উচ্চারণ করছেন, এবং কেউ জানছে না। লেখকরা এভাবেই নিজেদের রেখে যান, এমন জায়গায় যেখানে কেউ খুঁজতে যায় না। শরৎচন্দ্রের প্রায় সব গল্পেই তাঁর নিজের ছায়াময় উপস্থিতি আছে কোনো না কোনো চরিত্রে।

সেই আসর থেকে দুই লেখকের পরিচয়।

একই ঘরে দুজন লেখক বসে আছেন। একজনের পাঠক শ্রদ্ধা করে। আরেকজনের পাঠক কাঁদে।

শরৎচন্দ্র লেখার গুরু মানতেন এমিল জোলাকে। রবীন্দ্রনাথকে নয়। এই সত্যটা অনুধাবন করলে তাঁর জীবনের পরবর্তী দশ বছর বোঝা যায় পরিষ্কারভাবে।

রাজনীতির লেখক

১৯২১ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের ডাকে শরৎচন্দ্র অসহযোগ আন্দোলনে গেলেন। হাওড়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হলেন, এবং বহু বছর সেই পদে রইলেন।

একটা জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতির কাজটা ঠিক কী, সেটা ভাবলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়।

চাঁদা তোলা। মিটিং ডাকা। লোকের ঝগড়া মেটানো। থানায় ডাক পড়া। পুলিশের খাতায় নাম ওঠা।

খদ্দর পরতেন নিয়মিত। একটা রিভলভার বহুদিন তাঁর কাছে ছিল।

কংগ্রেসের লোক হয়েও গোপন সশস্ত্র দলগুলোর প্রতি তাঁর টান ছিল, এবং নানাভাবে তাদের সাহায্যও করতেন।

লেখকদের রাজনীতি সাধারণত অন্যরকম। বিবৃতি, সভা, নাম সই। তারপর বাড়ি ফিরে লেখা।

তবে শরৎচন্দ্র কেবল প্রতীকী রাজনীতির বার্তাবাহক লেখক নন। এখানে তিনি কর্মীও বটে।

১৯২৫ সালে দেশবন্ধু মারা গেলেন। মাসিক বসুমতী-র স্মৃতিসংখ্যায় শরৎচন্দ্র লিখলেন ‘স্মৃতিকথা’।

মানুষ চলে গেলে কী লিখতে হয়, সেটা তাঁর চেয়ে ভালো কেউ জানত না। সারাজীবন তো তিনি তাই করেছেন। লেখায় ধরে রেখেছেন হারানো মানুষগুলোকে।

পদ্মার ওপারে

একই বছরের এপ্রিলে তিনি পূর্ববঙ্গে গেলেন।

১০ আর ১১ এপ্রিল, মুন্সীগঞ্জে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন। সাহিত্য শাখার সভাপতি শরৎচন্দ্র।

অধিবেশনের পর তিনি ঢাকা শহরে কয়েকটা দিন রইলেন। মুন্সীগঞ্জ থেকে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের এক অধ্যাপক, যিনি জগন্নাথ হলের প্রভোস্টও।

শহরের একটা কাগজ তাঁর প্রতি বিরূপ ছিল আর শহরটা ছিল ঠিক উল্টো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক আর সাধারণ মানুষ তাঁকে যেভাবে বরণ করে নিয়েছিলেন, তার পাশে কাগজের বিরূপতা দাঁড়াতে পারেনি।

ঢাকা তাঁকে চিনেছিল বইয়ের মলাট দিয়ে। সেই চেনাটা কত গভীরে গিয়েছিল, তার প্রমাণ আসবে আরও এগারো বছর পরে, একই শহরে।

নদী আর মাটির আরও কাছে

সামতাবেড় গ্রামটা রূপনারায়ণের গায়ে। শরৎচন্দ্রের দিদি থাকতেন কাছেই।

শিবপুর ট্রামডিপোর কাছে বছরখানেক থাকার পর তিনি ওখানে কিছু জমি কিনলেন। ১৯২৬ সালে একটা মাটির বাড়ি তুলে উঠে গেলেন।

তখন তিনি বাংলার সবচেয়ে বিক্রীত লেখক।

শহরে টাকা ছিল, লোক ছিল, সম্মান ছিল। তিনি গেলেন নদীর ধারে। মাটির ঘরে।

একই বছরের আগস্টে বই আকারে বেরোল পথের দাবী। তার আগে কয়েক বছর ধরে সেটা বঙ্গবাণী মাসিকপত্রে ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল, অনিয়মিতভাবে।

বই করার সময় প্রকাশকেরা কিছু অংশ বাদ দিতে চাইলেন।

তিনি রাজি হলেন না।

ফলে প্রকাশক আর প্রেস জোগাড় করতেই তাঁকে ঘুরতে হলো। এত নামী একজন লেখকের এই সমস্যা হওয়ার কথা নয়। হয়েছিল, কারণ বইটার ভেতরে কী আছে সবাই বুঝে ফেলেছিলেন।

বেরোনোর পর পাঁচ হাজার কপি ফুরোতে সাত দিনও লাগেনি। তিন টাকার বই দোকানে দশ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

কিছুদিনের মধ্যে সরকার বইটা বাজেয়াপ্ত করল।

চাহিদা তাতে কমেনি। কপি না পেয়ে অনেকে গোটা উপন্যাসটা হাতে লিখে নকল করে নিয়েছিলেন।

একটা বই জনপ্রিয়তা পেরিয়ে কখন দরকারি হয়ে ওঠে, এর চেয়ে ভালো মাপ আর নেই। মানুষ যখন কোনো লেখা নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন সেটা আর লেখকের সম্পত্তি থাকে না।

দুটি চিঠি

কারও কাছে সাহায্য চাইতে যাওয়ার আগে মানুষ অনেকবার ভাবে।

শরৎচন্দ্র গেলেন। বাংলায় তখন একটাই গলা ছিল যেটা ইংরেজ সরকারকেও শুনতে হতো।

তিনি বললেন, আপনি একটা প্রতিবাদ করলে কাজ হয়। পৃথিবীর লোক জানতে পারে সরকার সাহিত্যের সঙ্গে কী করছে।

সেদিন দুজনের মধ্যে ঠিক কী কথা হয়েছিল, কেউ লিখে রাখেননি। রবীন্দ্রজীবনীকার সাক্ষাৎটুকু স্বীকার করেছেন, তার বেশি কিছু নয়।

কিছুদিন পরে একটা চিঠি এল।

রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, লেখক উত্তেজক বই লিখবেন অথচ শাস্তি পাবেন না — এমন আশা করা যায় না। কর্তব্যের বিচারে চুপ না থাকাটা দোষের নয়। কোনো শাসনকে অন্যায় মনে হলে লেখক নীরব থাকতে পারেন না। কিন্তু নীরব না থাকার যে বিপদ আছে, সেটুকু মেনে নিতে হবে।

যুক্তিটা নিখুঁত।

আর সেই কারণেই সেদিন সেটা কোনো কাজে লাগেনি। মানুষ যখন আঘাত পেয়ে কারও কাছে যায়, তখন সে যুক্তি চায় না।

চার-পাঁচ দিন পরে শরৎচন্দ্র জবাব লিখলেন।

বইয়ে যদি মিথ্যা না থাকে, আর তার পরেও শাস্তি পেতে হয়, তো পেতেই হবে। মুখ বুজে পাবেন কি কাঁদতে কাঁদতে পাবেন, সেটা তাঁর নিজের ব্যাপার। কিন্তু প্রতিবাদ কি তাহলে করা যাবে না। প্রতিবাদেরও শাস্তি আছে, আর সেই শাস্তিরও প্রতিবাদ দরকার।

চিঠিটা যায়নি।

বন্ধুরা বারণ করেছিলেন, তিনি শুনেছিলেন।

এই না-পাঠানোটুকুর মধ্যে গোটা সম্পর্কটা ধরা আছে। রাগ ছিল। জবাব তৈরি ছিল। তবু একজনের সামনে আরেকজন থেমে গেলেন।

রবীন্দ্রনাথের চিঠিটা আজও রাখা আছে। শরৎচন্দ্রেরটা লেখা হয়েছিল, পৌঁছায়নি।

পরে অনেকে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের ইংরেজপ্রীতি ছিল। ব্যাখ্যাটা সহজ, এবং সহজ বলেই সন্দেহজনক।

এই চিঠি লেখার কয়েক দিন আগেই তিনি একটা দৈনিকে খোলা চিঠি ছেপেছিলেন। সেখানে লিখেছেন, দুর্বলের উপর শাসন করতে করতে শাসকের মন দিনে দিনে নিচে নেমে যায়।

তাহলে বিরোধটা রাজনীতির নয়।

একজন মনে করতেন, কথা বলার দাম দিতে হবে, চুপচাপ। আরেকজন মনে করতেন, দাম দেওয়ার পরেও চিৎকার করার অধিকার থেকে যায়।

দুজনের কেউই ভুল ছিলেন না। সম্ভবত সে কারণেই মিলটা হয়নি।

বইটা নিয়ে সাহিত্যিক আপত্তিও ছিল। রবীন্দ্রনাথের অভিযোগ, উপন্যাসের মূলধন হিসেবে ইংরেজ-বিদ্বেষ ব্যবহার করা হয়েছে। সমালোচক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, সব্যসাচী চরিত্রটা অস্বাভাবিকভাবে গড়া।

তরুণদের সামনে এক বৃদ্ধ

১৯২৯ সালের ৩০ মার্চ, ইস্টারের ছুটি। রংপুরে বঙ্গীয় যুব সম্মিলনী।

সামনে যারা বসে আছে, তাদের বয়স তাঁর অর্ধেক। অনেকেই বিপ্লবের কথা ভাবছে। তারা এসেছে পথের দাবী-র লেখককে শুনতে।

তিপ্পান্ন বছরের শরৎচন্দ্র ভাষণ শুরু করলেন নিজেকে বৃদ্ধ বলে। জীবন সমাপ্তির দিকে, কর্মশক্তি ফুরিয়ে আসছে, উদ্যম ক্লান্ত — আর ঠিক এখনই দেশের তরুণদের পথ দেখানোর ভার এসে পড়েছে তাঁর ঘাড়ে।

তারপর বললেন, স্বাধীনতা নামমাত্র জিনিস নয়। দাতার দক্ষিণ হস্তের দানে একে ভিক্ষার মতো পাওয়া যায় না। এর মূল্য দিতে হয়।

এই পর্যন্ত শ্রোতারা যা শুনতে এসেছিল, তাই শুনছিল।

তারপর তিনি বললেন, কোনো দেশেই কখনো শুধু বিপ্লবের জন্য বিপ্লব আনা যায় না। অর্থহীন অকারণ বিপ্লবের চেষ্টায় কেবল রক্তপাতই ঘটে, আর কিছু হয় না।

সব্যসাচীর স্রষ্টা তাঁর নিজের পাঠকদের সাবধান করছেন।

ভাষণটা পরে বই হয়ে বেরোয় তরুণের বিদ্রোহ নামে।

পথের দাবী বিপ্লবের প্রচারপুস্তিকা কখনো ছিল না। সব্যসাচী আর ভারতী, উপন্যাসের দুই বিপরীত কণ্ঠ, আসলে লেখকের ভেতরকার তর্ক। ভারতী বারবার আটকে দিয়েছে। রক্তপাতের জবাবে রক্তপাত হলে তারও জবাব কী দাঁড়ায়, এই প্রশ্নটা সে ছাড়েনি।

শেষে ভারতী রাজনীতি ছেড়ে সমাজসেবায় চলে যায়। সব্যসাচী দুর্যোগের রাতে নিরুদ্দেশ।

কোনো পক্ষই জেতে না।

লেখক যখন নিজের সঙ্গে তর্ক করেন, উপন্যাস শেষ হয়। তর্কটা হয় না।

যে বই পাঠক চাননি

কমল কাঁদে না।

এটাই সমস্যা ছিল।

১৯৩১ সালের মে মাসে বেরোল শেষ প্রশ্ন। পটভূমি আগ্রা, যেখানে নানা সময়ে নানা কাজে গিয়ে কিছু বাঙালি পরিবার বাসা বেঁধেছে। কেউ কয়েক পুরুষের বাসিন্দা, কেউ এখনো বাসাড়ে।

কেন্দ্রে কমল নামের একটি মেয়ে, যে পাঠকের সহানুভূতি চায় না। সে তর্ক চায়।

সমাজ আর ধর্মের বাইরে দাঁড়িয়ে সে নিজের মতো ভাবে, এবং ভাববার জন্য কারও অনুমতির অপেক্ষা করে না। চরিত্রদোষে অপরাধী স্বামীকে ছেড়ে যাওয়ায় সে কোনো অন্যায় দেখে না। এই অধিকার শুধু পুরুষের, এই কথা সে মানবে না।

যিনি পার্বতীকে লিখেছিলেন, তিনিই কমলকে লিখলেন।

আঠারো বছর ধরে বাঙালি পাঠক তাঁর কাছে একটা জিনিস চেয়ে এসেছেন। আবেগ, আত্মত্যাগ, চোখের জল। জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি দিতে অস্বীকার করলেন।

বইটা তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত। এবং সম্ভবত সবচেয়ে কম পড়া বড় কাজ।

একটা প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, বাংলা সাহিত্য যেদিন নিজের অভিমান ছেড়ে রুশ সাহিত্যের মতো সমাজের নিচের স্তরে নামতে পারবে, মানুষের সুখদুঃখের মাঝখানে দাঁড়াতে পারবে, সেদিন সে বিশ্বসাহিত্যে জায়গা পাবে।

শেষ প্রশ্ন সম্ভবত সেই ইচ্ছারই একটা চেহারা।

পাঠক তখনো আগের বইটাই চাইছিলেন।

১৯৩৩ সালে বেরোল শ্রীকান্ত-এর চতুর্থ ও শেষ পর্ব। ষোলো বছর ধরে লেখা একটা বইয়ের সমাপ্তি। পরের বছর দক্ষিণ কলকাতার অশ্বিনী দত্ত রোডে একটা দোতলা বাড়ি।

ভাড়াবাড়ি, মাটির বাড়ি, দোতলা বাড়ি। তবু সামতাবেড়ে তিনি মাঝেমধ্যে গিয়ে থাকতেন।

একটা খালি চেয়ার

১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনে একজনের জায়গা খালি ছিল।

উপাচার্য স্যার এ এফ রহমান সম্মানসূচক ডি-লিটের আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আর যদুনাথ সরকারকে। ডি-এসসি-র আমন্ত্রণ গিয়েছিল জগদীশচন্দ্র বসু আর প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কাছে।

রবীন্দ্রনাথ আসতে পারেননি। তিনি অসুস্থ ছিলেন।

বাকি সবাই এসেছিলেন। কার্জন হলের সামনে তোলা ছবিটায় শরৎচন্দ্র দাঁড়িয়ে আছেন যদুনাথ সরকার, বাংলার গভর্নর ও চ্যান্সেলর স্যার জন অ্যান্ডারসন, প্রফুল্লচন্দ্র রায় আর উপাচার্যের সঙ্গে।

Sarat Chandra Chattopadhyay at DU
১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনে কার্জন হলের সামনে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

নয় বছর আগে যে সরকার তাঁর বই বাজেয়াপ্ত করেছিল, সেই সরকারের প্রতিনিধি তখন তাঁর পাশে।

ইতিহাস মাঝেমধ্যে এমন দৃশ্য বানায়, যার ব্যাখ্যা কেউ চায় না।

সেই সফরেই, ৩১ জুলাই, ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের দশম বার্ষিক অধিবেশন। মূল সভাপতি শরৎচন্দ্র।

এই সংগঠনটাই ছিল বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কেন্দ্র। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন — এঁদের মঞ্চ।

বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় হিন্দু লেখক সেখানে বসে হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ আর ব্যবধানের কথা তুললেন, এবং দুই প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি কামনা করলেন।

সাহিত্য সমাজের বারো বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুটো উপস্থিতি — শরৎচন্দ্র আর নজরুল।

তবে এই ছবির পাশে আরেকটা জিনিস রেখে দেওয়া দরকার। ঠিক দশ বছর আগে, ১৯২৬ সালে, তিনি ‘বর্তমান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা’ নামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যেটা নিয়ে আজও তর্ক থামেনি।

দশ বছরে মানুষের মত বদলায়। আবার মানুষ ভিন্ন ঘরে ভিন্ন কথাও বলে।

কোনটা ঘটেছিল, না জানাই এখন সবচেয়ে সৎ অবস্থান।

চল্লিশ বছর আগের খাতা

শুভদা বইটা যখন বেরোল, লেখক তখন আর নেই।

১৯৩৭ সালে তাঁর ক্যানসার ধরা পড়েছিল, যকৃৎ আর পাকস্থলীতে। পার্ক নার্সিং হোমে অস্ত্রোপচার হলো।

১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি, ১৩৪৪ বঙ্গাব্দের ২ মাঘ, সকাল দশটা দশ মিনিটে সব থামল।

জুন মাসে শুভদা বেরোল।

বইটার খসড়া তিনি লিখেছিলেন ভাগলপুরে, চল্লিশ বছরেরও আগে। পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে না পেরে কলেজ ছাড়ার পর যে দিনগুলো — বন্ধুদের নিয়ে সাহিত্যসভা, নাটকের মহড়া, আর খাতায় জমতে থাকা উপন্যাস, যেগুলো ছাপানোর কথা কেউ ভাবত না।

সেই খাতা থেকেই শেষ বইটা এল।

রবীন্দ্রনাথ একটা শোককবিতা লিখলেন। প্রেমের আসনে যার অমর স্থান, মৃত্যুর শাসনে তার ক্ষতি ক্ষতি নয়। দেশের মাটি থেকে যাকে হরণ করা হলো, দেশের হৃদয় তাকে বরণ করে রেখেছে।

সেই চিঠি, সেই বিরোধ, সেই না-পাঠানো জবাব। বাইশ বছরের শেষে এটুকুই রইল।

পথের দাবী আজও রয়ে গেছে

১৯৭৮ সালের বন্যায় রূপনারায়ণের ধারের গ্রামগুলোর প্রায় সব মাটির বাড়ি ভেসে গিয়েছিল।

শরৎচন্দ্রের বাড়িটা যায়নি। জানালা পর্যন্ত ইট-সিমেন্টের গাঁথুনি ছিল বলে ক্ষতি হলেও সেটা দাঁড়িয়ে রইল। পরে সরকারি উদ্যোগে বাড়িটার দেখাশোনা হয়েছে।

মাটির ঘর সাধারণত জল সহ্য করে না। এটা করেছিল, কারণ ভিতটা মাটির ছিল না।

শরৎচন্দ্রের ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে।

১৯২৭ সালে সরকার ভেবেছিল বই বাজেয়াপ্ত করলেই সব চুকে বুকে যাবে। তারপর যা হলো, সেটা কোনো আইনে লেখা ছিল না। কপি না পেয়ে মানুষ গোটা উপন্যাস হাতে লিখে নকল করল।

সব্যসাচী নিরুদ্দেশ হয়েছিল দুর্যোগের রাতে। ভারতী রাজনীতি ছেড়ে সমাজসেবায় গিয়েছিল। যে লেখক দুজনকেই লিখেছিলেন, তিনি নিজে কোনো পক্ষ নেননি — জেলা কমিটির সভাপতি হয়েও নয়, রংপুরের মঞ্চে দাঁড়িয়েও নয়।

তাঁর উত্তর বদলেছে বলে মনে হয়। আসলে প্রশ্নটা বদলেছিল।

দেড়শো বছর হলো তাঁর জন্মের।

দেউলটি স্টেশন থেকে তিন-চার কিলোমিটার গেলে নদীর ধারে বাড়িটা এখনো পাওয়া যায়। সামনে পাশাপাশি দুটো বাঁধানো পুকুর। ডালিম আর পেয়ারা গাছ।

চল্লিশ বছর বয়সে যিনি হাওড়ার এক ভাড়াবাড়িতে উঠেছিলেন, তাঁর শেষ ঠিকানা এটাই।

ভেতরে কেউ নেই।

বাইরে বয়ে চলেছে রূপনারায়ণের জল।

সর্বশেষ