বিশ্বের বুকে একটি দেশের পাসপোর্টের শক্তি সেই দেশের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ পাসপোর্ট আপডেট ২০২৬ অনুযায়ী, গ্লোবাল পাসপোর্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ৯৬তম। দীর্ঘ কয়েক বছর ১০০-এর ঘরে বা তার নিচে থাকার পর, ২০২৬ সালের এই সামান্য অগ্রগতি বা স্থিতিশীলতা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ভ্রমণপিপাসু এবং প্রবাসীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—আসলে কী পরিবর্তন হয়েছে?
যদিও এই র্যাঙ্কিং এখনো সন্তোষজনক নয়, তবুও ই-পাসপোর্টের প্রচলন এবং কিছু নতুন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ফলে পরিস্থিতির ধীর উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৬ সালে বাংলাদেশের পাসপোর্টের আদ্যোপান্ত, ভিসা-মুক্ত দেশগুলোর তালিকা এবং র্যাঙ্কিংয়ের নেপথ্য কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করব।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ পাসপোর্টের অবস্থান: বিস্তারিত বিশ্লেষণ
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের প্রায় ৪০-৪৮টি দেশে (সূত্রভেদে ভিন্নতা হতে পারে) ভিসা ছাড়া বা অন-অ্যারাইভাল ভিসায় ভ্রমণ করতে পারছেন। র্যাঙ্কিং ৯৬তম হওয়ার অর্থ হলো, এখনো বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে ভ্রমণের জন্য আমাদের কঠোর ভিসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
তবে আশার কথা হলো, গত দুই বছরে (২০২৪-২০২৫) রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও পাসপোর্ট তার অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে, যা ভবিষ্যতে উন্নতির ইঙ্গিত দেয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের অবস্থান কোথায়?
প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশের পাসপোর্টের শক্তির প্রকৃত চিত্র বোঝা সহজ হয়। ভারত ও মালদ্বীপ আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় পাসপোর্টের তুলনা (২০২৬)
| দেশ | গ্লোবাল র্যাঙ্ক | ভিসা-ফ্রি/অন-অ্যারাইভাল অ্যাক্সেস | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| মালদ্বীপ | ৫৮তম (আনুমানিক) | ৯০+ দেশ | দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী |
| ভারত | ৮২তম (আনুমানিক) | ৬০+ দেশ | স্থিতিশীল ও শক্তিশালী অর্থনীতি |
| বাংলাদেশ | ৯৬তম | ৪০+ দেশ | ধীর উন্নতি, তবে স্থিতিশীল |
| পাকিস্তান | ১০২তম | ৩১ দেশ | রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় পিছিয়ে |
| নেপাল | ১০৩তম | ৩৬ দেশ | পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি |
কেন এই র্যাঙ্কিং? নেপথ্যের কারণসমূহ (Reasons Behind the Ranking)
অনেকেই ভাবেন, দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, তাহলে পাসপোর্টের মান বাড়ছে না কেন? বাংলাদেশ পাসপোর্ট আপডেট ২০২৬-এর তথ্য বিশ্লেষণে এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে:
১. অবৈধ অভিবাসন ও ওভার-স্টে
উন্নত দেশগুলো, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো ভিসা নীতি কঠোর করার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘ওভার-স্টে’ বা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা। এটি সরাসরি একটি দেশের পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা বা ‘স্কোর’ কমিয়ে দেয়।
২. কূটনৈতিক সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা
ভিসা-ফ্রি সুবিধা মূলত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও, অনেক দেশের সাথে এখনো ‘ভিসা ওয়েভার এগ্রিমেন্ট’ (Visa Waiver Agreement) স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি।
৩. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা
২০২৪ ও ২০২৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলি আন্তর্জাতিক মহলে কিছুটা আস্থার সংকট তৈরি করেছিল। তবে ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে শুরু করায় র্যাঙ্কিংয়ে বড় কোনো পতন ঘটেনি।
ই-পাসপোর্ট: গেম চেঞ্জার নাকি শুধুই প্রযুক্তি?

২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট (e-Passport) কার্যক্রম এখন পুরোদমে চলছে। এটি র্যাঙ্কিংয়ে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও, ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটা কমিয়েছে।
- দ্রুত ইমিগ্রেশন: ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ই-গেট (e-Gate) ব্যবহারের ফলে যাত্রীরা এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ইমিগ্রেশন পার হতে পারছেন।
- আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: বায়োমেট্রিক চিপযুক্ত হওয়ায় এই পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে, যা ভবিষ্যতে ভিসা প্রসেসিং সহজ করতে সাহায্য করবে।
ই-পাসপোর্ট আবেদনের জরুরি তথ্য (২০২৬): বর্তমানে ৫ বছর ও ১০ বছর মেয়াদী ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা যাচ্ছে। রেগুলার ডেলিভারি সাধারণত ১৫-২১ কর্মদিবস এবং এক্সপ্রেস ডেলিভারি ৭-১০ কর্মদিবসের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
ভিসা ছাড়া এবং অন-অ্যারাইভাল গন্তব্যসমূহ: মহাদেশ ভিত্তিক তালিকা
বাংলাদেশ পাসপোর্ট আপডেট ২০২৬ অনুযায়ী, আপনি যদি ঝটপট ভ্রমণে যেতে চান, তবে নিচের দেশগুলো আপনার তালিকার শীর্ষে থাকা উচিত। এই দেশগুলোতে আগে থেকে ভিসা নেওয়ার ঝামেলা নেই।
এশিয়া (Asia)
- ভুটান: ভিসা প্রয়োজন নেই (আইডি কার্ড বা পাসপোর্ট যথেষ্ট)।
- নেপাল: অন-অ্যারাইভাল সুবিধা।
- মালদ্বীপ: ৩০ দিনের অন-অ্যারাইভাল ভিসা।
- শ্রীলঙ্কা: অনলাইনে ই-ট্রাভেল অথোরাইজেশন (ETA) বা অন-অ্যারাইভাল।
- তিমুর লেস্তে (Timor-Leste): অন-অ্যারাইভাল।
আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান (Americas & Caribbean)
- বাহামাস (Bahamas): ৯০ দিন পর্যন্ত ভিসা-ফ্রি।
- বার্বাডোজ (Barbados): ভিসা-ফ্রি।
- ডমিনিকা ও হাইতি: ভিসা-ফ্রি।
- বলিভিয়া (Bolivia): অন-অ্যারাইভাল (দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র দেশ)।
আফ্রিকা (Africa)
- সেশেলস (Seychelles): ভিজিটর পারমিট অন-অ্যারাইভাল (হানিমুনের জন্য জনপ্রিয়)।
- মাদাগাস্কার: অন-অ্যারাইভাল।
- গাম্বিয়া ও লেসোথো: ভিসা-ফ্রি।
ওশেনিয়া (Oceania)
- ফিজি (Fiji): ১২০ দিন পর্যন্ত ভিসা-ফ্রি।
- ভানুয়াতু ও মাইক্রোনেশিয়া: ভিসা-ফ্রি।
(সতর্কতা: ভ্রমণের আগে এয়ারলাইন্স বা দূতাবাসের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ নিয়ম যাচাই করে নিন, কারণ অন-অ্যারাইভাল ভিসার জন্য অনেক সময় রিটার্ন টিকিট ও হোটেল বুকিং দেখাতে হয়।)
ভিসা রিজেকশন এড়াতে করণীয়
যেহেতু আমাদের র্যাঙ্কিং ৯৬তম, তাই উন্নত দেশগুলোতে (যেমন: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, শেনজেন) ভিসা পাওয়া চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। রিজেকশন এড়াতে এই টিপসগুলো মেনে চলুন:
১. শক্তিশালী ট্রাভেল হিস্ট্রি তৈরি করুন: প্রথমেই বড় দেশে আবেদন না করে এশিয়ার কয়েকটি দেশ (থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর) ভ্রমণ করুন।
২. আর্থিক স্বচ্ছতা: ব্যাংক স্টেটমেন্টে হঠাৎ বড় অংকের লেনদেন করবেন না। নিয়মিত লেনদেন ও আয়ের উৎস স্পষ্ট রাখুন।
৩. দেশে ফেরার প্রমাণ: ভিসা অফিসারের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে, ভ্রমণ শেষে আপনি অবশ্যই বাংলাদেশে ফিরে আসবেন (সম্পত্তি, চাকরি বা ব্যবসার নথি দেখান)।
উত্তরণের উপায়: ভবিষ্যৎ কী বলছে?
পাসপোর্টের মান উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়। এটি একটি জাতীয় প্রচেষ্টা। বাংলাদেশ পাসপোর্ট আপডেট ২০২৬-এর আলোকে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি সরকার কূটনৈতিক পর্যায়ে আরও সক্রিয় হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ৮০-এর ঘরে উঠে আসতে পারে।
পাসপোর্টের মান উন্নয়নের রোডম্যাপ
| পদক্ষেপ | কেন জরুরি? |
|---|---|
| নতুন ভিসা চুক্তি | লাতিন আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন জরুরি। |
| দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি | অদক্ষ শ্রমিকের বদলে দক্ষ জনশক্তি পাঠালে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। |
| মিথ্যা তথ্য রোধ | পাসপোর্ট ও ভিসার ক্ষেত্রে জালিয়াতি কঠোরভাবে দমন করতে হবে। |
শেষ কথা
পরিশেষে, বাংলাদেশ পাসপোর্ট আপডেট ২০২৬ আমাদের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ৯৬তম অবস্থান আমাদের কাঙ্ক্ষিত নয়, কিন্তু হতাশাজনকও নয়। ই-পাসপোর্টের আধুনিকায়ন এবং ভিসা-মুক্ত দেশগুলোর তালিকা আমাদের ভ্রমণের সুযোগ করে দিচ্ছে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সঠিক নিয়ম মেনে ভ্রমণ করা এবং দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে আমরা আরও গর্বের সাথে বিশ্ব ভ্রমণ করতে পারব।


