আজ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এক দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ধ্রুবতারার পতন হলো। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, ‘আপোষহীন নেত্রী’ খ্যাত বেগম খালেদা জিয়া আর আমাদের মাঝে নেই। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৮৪ সালে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যে রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল, ৪১ বছরের সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথচলা আজ থামল। তাঁর প্রস্থান কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশেষ যুগের সমাপ্তি।
শুরু যেখানে: সাধারণ জীবন থেকে রাজনীতির পথে
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া ইসকান্দার মজুমদারের কন্যা খালেদার জীবন শুরু হয়েছিল অত্যন্ত সাধারণভাবে। তাঁর পরিবার মূলত ফেনির বাসিন্দা ছিল, যদিও পিতা দেশ বিভাগের পর জলপাইগুড়ি থেকে চা ব্যবসা ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন ।
খালেদা জিয়ার জীবন এক নজরে

| জীবনের দিক | সারসংক্ষেপ |
| জন্ম | ১৫ আগস্ট ১৯৪৬, দিনাজপুর |
| মৃত্যু | ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ (৮০ বছর), ঢাকা |
| রাজনৈতিক জীবন | ১৯৮৪-২০২৫ (৪১ বছর) |
| প্রধানমন্ত্রিত্ব | তিন মেয়াদ, মোট ১০+ বছর |
| বিএনপি নেতৃত্ব | ১৯৮৪-২০২৫ (৪১ বছর চেয়ারপারসন) |
| কারাবাস | ২০০৭-০৮, ২০১৮-২০২০ |
| প্রধান অবদান | স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্র, নারী ক্ষমতায়ন |
| পরিবার | স্বামী জিয়াউর রহমান (মৃত্যু ১৯৮১), দুই পুত্র – তারেক রহমান (১৭ বছর নির্বাসনের পর ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন), আরাফাত রহমান কোকো (মৃত্যু ২০১৫) |
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
১৯৬০ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসার জিয়াউর রহমানের সাথে। স্বামীর সামরিক পোস্টিংয়ের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকতে হয়েছে তাঁকে। দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে তাঁর জীবন ছিল একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীর মতোই সাধারণ।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ খালেদা জিয়ার জীবনে প্রথম বড় পরিবর্তন আনে। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হলে তিনি প্রথম মহিলা হিসেবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এবং নেদারল্যান্ডসের রানী জুলিয়ানাসহ বিশ্ব নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
নিয়তির ডাক: রাজনীতিতে অপ্রত্যাশিত প্রবেশ
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়ার প্রাথমিক জীবন ছিল নিতান্তই সাধারণ। পৈতৃক বাড়ি ফেনীতে হলেও বাবার কর্মসূত্রে তাঁর শৈশব কাটে দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁর জীবন আবর্তিত হয়েছিল সেনা ক্যাম্প আর সংসারের চার দেয়ালের মাঝে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ একজন ফার্স্ট লেডি।
কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল ভিন্ন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপি যখন অস্তিত্ব সংকটে, তখন দলের নেতাকর্মীদের দাবির মুখে তিনি গৃহকোণ ছেড়ে রাজপথে নেমে আসেন। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন এবং ১৯৮৪ সালের মে মাসে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত—টানা ৪১ বছর তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
রাজনৈতিক যাত্রার মাইলফলক
| তারিখ | ঘটনা |
| ৩০ মে ১৯৮১ | রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যু |
| ২ জানুয়ারি ১৯৮২ | বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগদান |
| মার্চ ১৯৮৩ | বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত |
| ১০ মে ১৯৮৪ | বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত |
| ১৯৮৩ | সাত-দলীয় জোট গঠনের স্থপতি |
| ১৯৮৩-১৯৯০ | এরশাদ সরকারের আমলে ৭ বার আটক |
গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম: স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন
১৯৮০-এর দশকে তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে খালেদা জিয়া নেতৃত্ব দেন । তিনি ১৯৮৩ সালে স্বৈরাচার বিরোধী সাত-দলীয় জোট গঠনের স্থপতি ছিলেন ।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ
| বছর | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা |
| ১৯৮৩ | সাত-দলীয় জোট গঠন |
| ১৯৮৪ | ৬ ফেব্রুয়ারি ‘দাবি দিবস’ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘প্রতিবাদ দিবস’ ঘোষণা |
| ১৯৮৬ | এরশাদের নির্বাচন বয়কট (আওয়ামী লীগ ও জামায়াত অংশগ্রহণ করে) |
| ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৭ | ঢাকায় গণসমাবেশ, শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার |
| ফেব্রুয়ারি-জুলাই ১৯৮৭ | সাত-দলীয় জোটের ধারাবাহিক ধর্মঘট আয়োজন |
| ১৯৯০ | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নে জয়লাভ (৩২১-এর মধ্যে ২৭০টি ছাত্র ইউনিয়ন) |
| ১০ অক্টোবর ১৯৯০ | ছাত্রদল নেতা নাজিরউদ্দিন জেহাদের মৃত্যু, গণঅভ্যুত্থান তীব্র হয় |
| ডিসেম্বর ১৯৯০ | এরশাদের পতন |
১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর তিনি অসংখ্যবার গৃহবন্দি ও কারাবরণ করেন—মোট সাতবার আটক হন । তবে আন্দোলন থেকে পিছু হটেননি। রাজপথে নেমে এসেছেন বারবার, জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন, হরতাল-অবরোধের ডাক দিয়েছেন।
তিনি বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের (জেসিডি) সংগঠন শক্তিশালীকরণে নেতৃত্ব দেন এবং তারা দেশজুড়ে ৩২১টির মধ্যে ২৭০টি ছাত্র ইউনিয়নে জয়লাভ করে। ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) জয়লাভ এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে বড় ভূমিকা রাখে।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তাতে খালেদা জিয়া ও বিএনপির অবদান অনস্বীকার্য। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তাঁর আপোষহীন অবস্থানের জন্য তিনি “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর আসন: ক্ষমতা ও দায়িত্ব
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাসে এক মাইলফলক।
তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রিত্বের সারসংক্ষেপ
| মেয়াদ | সময়কাল | প্রধান অর্জন | চ্যালেঞ্জ |
| প্রথম মেয়াদ | ২০ মার্চ ১৯৯১ – ৩০ মার্চ ১৯৯৬ | – রাষ্ট্রপতি শাসিত থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে রূপান্তর (১২তম সংশোধনী)
– তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা (১৩তম সংশোধনী) – পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান ২৯% বৃদ্ধি – ২ লক্ষ নারীর পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান – রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি – গঙ্গার পানি বণ্টন ইশু জাতিসংঘে উত্থাপন |
– রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
– বিরোধী দলের আন্দোলন |
| দ্বিতীয় মেয়াদ (সংক্ষিপ্ত) | ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ – মার্চ ১৯৯৬ | – নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য স্বেচ্ছায় পদত্যাগ | – বিরোধী দলের নির্বাচন বয়কট
– ৯০% ভোটার অনুপস্থিত – জুন ১৯৯৬ নির্বাচনে পরাজয় |
| তৃতীয় মেয়াদ | অক্টোবর ২০০১ – অক্টোবর ২০০৬ | – চার-দলীয় জোট সরকার গঠন
– রপ্তানি আয় ও প্রবাসী রেমিটেন্স বৃদ্ধি – শিল্প ও টেলিযোগাযোগ খাতে প্রবৃদ্ধি – র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন – ফোর্বস-এ ২৯তম শক্তিশালী নারী (২০০৫) |
– দুর্নীতির অভিযোগ
– ২১ আগস্ট ২০০৪ গ্রেনেড হামলা – জঙ্গিবাদের উত্থান (জেএমবি, হুজি) – অপারেশন ক্লিন হার্ট সমালোচনা |
প্রথম মেয়াদের বিস্তারিত অর্জন (১৯৯১-১৯৯৬)
খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। তাঁর সরকার ১৯৯১ সালের আগস্টে সংবিধানের ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে। এই সংশোধনী সর্বসম্মতভাবে সংসদে পাস হয়, যা ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতি শাসনের অবসান ঘটায়।
১৯৯৬ সালে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে । এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল।
শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন:
- বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু
- মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা
- মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচি
- খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি
- শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ
- সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে ৩০ বছরে বৃদ্ধি
অর্থনৈতিক উন্নয়ন:
প্রধান অর্থনৈতিক সূচক
| সূচক | ১৯৯১ | ১৯৯৬ | বৃদ্ধি |
| জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার | ৪.২% | ৫.৫%+ | ১.৩% পয়েন্ট বৃদ্ধি |
| মুদ্রাস্ফীতি হার | উচ্চ | সর্বকালের সর্বনিম্ন | উল্লেখযোগ্য হ্রাস |
| পোশাক শিল্প কর্মসংস্থান বৃদ্ধি | – | ২৯% | ৫ বছরে |
| নারী কর্মসংস্থান (আরএমজি) | – | ২ লক্ষ | নতুন কর্মসংস্থান |
| রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল | – | ১টি নতুন | ১৯৯৩ সালে ঢাকার নিকটে |
তাঁর শাসনামলে কর্মসংস্থান হার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশেষত তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে পাঁচ বছরে ২৯% কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় । প্রায় দুই লক্ষ নারী তাঁর নীতির কারণে পোশাক শিল্পে যোগ দেন ।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি:
১৯৯২ সালে তিনি হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত হন, যেখানে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থী সমস্যা বিশেষভাবে উত্থাপন করেন। তাঁর চাপের ফলে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানি বণ্টন সমস্যা তুলে ধরেন, যা ভারতের উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে।
তৃতীয় মেয়াদ (২০০১-২০০৬)
২০০১ সালে চার-দলীয় জোট নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসেন খালেদা জিয়া। এই জোটে ছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি (নাজিউর) এবং ইসলামী ঐক্যজোট।
এই মেয়াদে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী রেমিট্যান্সে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। শিল্প ও টেলিযোগাযোগ খাতে সুস্থ প্রবৃদ্ধি হয় এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন করা হয়।
২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের ১০০ সবচেয়ে শক্তিশালী নারীর তালিকায় ২৯তম স্থানে রাখে। এটি নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি ছিল।
তবে এই মেয়াদে দুর্নীতির কেলেঙ্কারি, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং জেএমবি ও হুজিসহ ইসলামি মৌলবাদী সংগঠনের উত্থান তাঁর শাসনামলকে বিতর্কিত করে তোলে।
২০০৬ সালে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে তিনি সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| অর্থনৈতিক সূচক | ২০০১ | ২০০৬ | পরিবর্তন | বৃদ্ধির হার |
| জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার | – | ৬%+ | ধারাবাহিকভাবে ৬%-এর উপরে | স্থিতিশীল |
| মাথাপিছু জাতীয় আয় | – | ৪৮২ ডলার | উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি | – |
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ | ১ বিলিয়ন ডলার | ৩ বিলিয়ন ডলার | ৩ গুণ বৃদ্ধি | ২০০% |
| প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ | – | ২.৫ বিলিয়ন ডলার | উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি | ক্রমবর্ধমান |
| শিল্প খাতের জিডিপি অবদান | – | ১৭%+ | উল্লেখযোগ্য | ১৭% অতিক্রম |
| শিল্প খাত প্রবৃদ্ধি হার | – | ১০%+ | ২০০৫-০৬ অর্থবছরে | অত্যন্ত উচ্চ |
| রেমিটেন্স | – | ৫ বিলিয়ন ডলার+ | প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি | অসাধারণ |
| নিবন্ধিত শিল্প প্রকল্প | – | প্রায় ৯,০০০ | মার্চ ২০০৬ পর্যন্ত | বিনিয়োগ বান্ধব নীতি |
| এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন | – | ১টি নতুন | আদমজী জুট মিলস চত্বরে ২০০৪-০৫ | কর্মসংস্থান বৃদ্ধি |
মূল অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কার
| বছর | সংস্কার/নীতি | প্রভাব |
| ১৯৯১ | ব্যাংক কোম্পানি আইন | ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ |
| ১৯৯১ | নতুন শিল্প নীতি | ব্যক্তিগত বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত |
| ১৯৯১ | ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) চালু | রাজস্ব বৃদ্ধি |
| ১৯৯৩ | আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন | আর্থিক খাত শক্তিশালীকরণ |
| ১৯৯৩ | বেসরকারীকরণ বোর্ড প্রতিষ্ঠা | রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রয় |
| ১৯৯৩ | GATT-এ স্বাক্ষর | আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ |
| ১৯৯১ | ১০০% বৈদেশিক মালিকানা অনুমোদন | এফডিআই বৃদ্ধি |
| ২০০১-০৬ | বিনিয়োগ-বান্ধব অর্থনৈতিক নীতি | বৈদেশিক কোম্পানি আকর্ষণ |
নির্বাচনী রেকর্ড: অপরাজেয় নেত্রী
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য নির্বাচনী রেকর্ড ধারণ করেন—তিনি কখনো কোনো নির্বাচনী এলাকা থেকে হারেননি।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান
| নির্বাচন বছর | প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আসন | জয়লাভ | ফলাফল |
| ১৯৯১ | ৫টি আসন | সবগুলো | প্রধানমন্ত্রী |
| ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি) | ৫টি আসন | সবগুলো | প্রধানমন্ত্রী (সংক্ষিপ্ত) |
| ১৯৯৬ (জুন) | ৫টি আসন | সবগুলো | বিরোধী দলীয় নেত্রী (১১৬ আসন) |
| ২০০১ | ৫টি আসন | সবগুলো | প্রধানমন্ত্রী |
| ২০০৮ | ৩টি আসন | ৩টিই | বিরোধী দলীয় নেত্রী |
| মোট | ৫টি ভিন্ন নির্বাচনে একাধিক আসন | কখনো হারেননি | বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য কীর্তি |
১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাঁচটি ভিন্ন সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হন—এমন কৃতিত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্য কোনো রাজনীতিবিদের নেই। ২০০৮ সালে তিনি যে তিনটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তিনটিতেই জয়লাভ করেন।
ঝড়ঝাপটা: রাজনীতির উত্থান-পতন
২০০৬ সালের পর থেকে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন আরও বেশি সংগ্রামী হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক সংকটের সময়রেখা
| সময়কাল | ঘটনা |
| ১১ জানুয়ারি ২০০৭ | সামরিক-সমর্থিত জরুরি সরকার ক্ষমতায় আসে |
| সেপ্টেম্বর ২০০৭ | দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার |
| ২০০৭-২০০৮ | প্রায় এক বছর কারাভোগ |
| ২০০৮ | সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির করুণ পরাজয় |
| ২০০৯ থেকে | নতুন সরকারের অধীনে গণতন্ত্রের জন্য পুনরায় লড়াই |
| ২০১১ | নিউ জার্সি স্টেট সিনেট “গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা” সম্মাননা |
| ২০১৪ ও ২০১৮ | জাতীয় নির্বাচন বয়কট |
| ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৫ বছরের কারাদণ্ড |
| ২০১৮ (একই বছর) | জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ৭ বছরের অতিরিক্ত সাজা (মোট ১৭ বছর) |
| ২৫ মার্চ ২০২০ | করোনা মহামারির কারণে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি |
| ২৭ নভেম্বর ২০২৪ | জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালাস |
| ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ | জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালাস |
| ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি |
| ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | মৃত্যু |
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সামরিক-সমর্থিত অসাধারণ ধরনের একটি সরকার ক্ষমতা দখল করে । তাঁকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর সেপ্টেম্বর ২০০৭-এ তাঁকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় । প্রায় এক বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির করুণ পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বড় ধাক্কা ছিল। এরপর থেকে তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে সংসদের বাইরে অবস্থান নেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন বয়কট, রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম – সবকিছুতেই তিনি সক্রিয় ছিলেন।
তাঁর গণতন্ত্রের জন্য দৃঢ় অবস্থানের জন্য ২০১১ সালে নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাঁকে “গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা” (Fighter for Democracy) সম্মাননা প্রদান করে।
বিতর্ক ও সমালোচনা: ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া একটি বিতর্কিত চরিত্র ছিলেন। তাঁর সমর্থকরা তাঁকে দেখেন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা একজন নিবেদিতপ্রাণ নেত্রী হিসেবে। বিরোধীরা তাঁকে দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতালোভী বলে সমালোচনা করেন।
দুর্নীতির মামলা: বিস্তারিত বিশ্লেষণ
| মামলা | অভিযোগ | সাজা | পরিণতি |
| জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট | অপব্যবহার | ৫ বছর | ২০২০ সালে খালাস |
| জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট | দুর্নীতি | ১২ বছর | খালাস |
| মোট সাজা | – | ১৭ বছর | পরবর্তীতে উভয় মামলায় খালাস |
| কারাবাস | ২০১৮-২০২০ | প্রায় ২ বছর | ২০২০ সালে মানবিক কারণে মুক্তি |
সমালোচনা ও বিতর্কের প্রধান দিকগুলো
নেতিবাচক দিক:
- পরিবারতন্ত্র: ছেলে তারেক রহমানকে রাজনীতিতে নিয়ে আসা এবং তাঁকে পরবর্তী নেতা বানানোর চেষ্টা, যা রাজবংশীয় রাজনীতির সমালোচনার জন্ম দেয়।
- ২১ আগস্ট ২০০৪ গ্রেনেড হামলা: আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা, যার সঠিক তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন।
- জঙ্গিবাদের উত্থান: ২০০১-২০০৬ শাসনামলে জেএমবি ও হুজিসহ জঙ্গি সংগঠনের উত্থান এবং সেই সময়কার কিছু ঘটনার সঠিক মোকাবেলা না করা।
- সংসদ বর্জন: নির্বাচন বয়কট ও সংসদ বর্জনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল করা।
- দুর্নীতি কেলেঙ্কারি: শাসনামলে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ।
- অপারেশন ক্লিন হার্ট: আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিচালিত অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ।
ইতিবাচক অবদান:
- স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব: ১৯৮০-এর দশকে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থান।
- নারী ক্ষমতায়ন: বাংলাদেশ ও মুসলিম বিশ্বে নারীদের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ তৈরি।
- সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে রূপান্তর।
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা: ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা।
- শিক্ষা সম্প্রসারণ: মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, উপবৃত্তি কর্মসূচি।
- অর্থনৈতিক উদারীকরণ: বেসরকারি খাত সম্প্রসারণ, পোশাক শিল্পে নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।
- পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া: শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা।
স্বাস্থ্য সংগ্রাম: শেষ কয়েক বছর
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পান খালেদা জিয়া। ওই দিন থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে।

স্বাস্থ্য সমস্যার বিস্তারিত বিবরণ
| রোগ/জটিলতা | বিবরণ |
| হৃদরোগ | স্থায়ী পেসমেকার স্থাপিত, হার্টে স্টেন্টিং |
| লিভার সমস্যা | লিভার সিরোসিস, লিভার কার্যক্ষমতা হ্রাস |
| কিডনি জটিলতা | কিডনি কার্যক্ষমতা হ্রাস |
| ডায়াবেটিস | উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিস |
| উচ্চ রক্তচাপ | দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ |
| আর্থ্রাইটিস | গুরুতর বাত রোগ |
| ফুসফুসের সমস্যা | শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া |
| চোখের সমস্যা | দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত জটিলতা |
| বার্ধক্যজনিত সমস্যা | ৮০ বছর বয়সে একাধিক অঙ্গের দুর্বলতা |
২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনা মহামারির শুরুতে মানবিক কারণে তাঁকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি গুলশানের বাড়িতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কারাবাসের সময় তাঁর স্বাস্থ্য অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও, স্বৈরাচারী সরকার তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে দেয়নি।
চূড়ান্ত অসুস্থতা ও মৃত্যু
চিকিৎসার সময়রেখা
| তারিখ | ঘটনা | বিবরণ |
| ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি | ফুসফুসে সংক্রমণ ও শ্বাসকষ্ট |
| ২৫-২৯ নভেম্বর | হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে চিকিৎসা | অবস্থা সংকটজনক |
| ৩০ নভেম্বর | আইসিইউতে স্থানান্তর | অবস্থার অবনতি |
| ডিসেম্বর প্রথম সপ্তাহ | ব্রিটিশ চিকিৎসক টিম পরিদর্শন | ডা. রিচার্ড বেইলের নেতৃত্বে |
| মধ্য ডিসেম্বর | চীনা চিকিৎসক টিম আগমন | বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য |
| ডিসেম্বর শেষ সপ্তাহ | ভেন্টিলেশন সাপোর্ট | অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থা |
| ২৭ ডিসেম্বর | ডা. জাহিদের বিবৃতি | “উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই” |
| ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টা | মৃত্যু | ৮০ বছর বয়সে |
২৩ নভেম্বর ২০২৫ থেকে তিনি ফুসফুসে সংক্রমণ এবং শ্বাসকষ্টের কারণে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান যে তাঁর অবস্থা “অত্যন্ত সংকটজনক এবং জটিল”।
প্রথম দিকে তিনি হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৩০ নভেম্বর থেকে তাঁর অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে এবং তাঁকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তিনি ভেন্টিলেশন সাপোর্টে ছিলেন। স্থানীয় ও বিদেশি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের একটি সমন্বিত টিম তাঁর চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিল। ২৭ ডিসেম্বর ডা. জাহিদ জানান যে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি এবং তিনি একটি সংকটজনক মুহূর্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
আজ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ৮০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
শেষ কয়েক বছর তিনি প্রায় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। বয়স ও অসুস্থতা তাঁকে রাজপথ থেকে দূরে রাখে। তবে তাঁর অনুসারীরা এখনও তাঁকে তাদের নেত্রী হিসেবে দেখতেন।
পারিবারিক দুর্ভোগ: ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি
রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও খালেদা জিয়াকে অসংখ্য দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে।
পারিবারিক দুঃখের সারসংক্ষেপ
| ঘটনা | বিবরণ |
| স্বামীর হত্যা | ৩০ মে ১৯৮১, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত |
| ছেলেদের গ্রেফতার | ২০০৭ সালে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান গ্রেফতার ও নির্যাতিত |
| নির্বাসন | উভয় ছেলেকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয় |
| কনিষ্ঠ পুত্রের মৃত্যু | ২০১৫ সালে আরাফাত রহমান কোকো নির্বাসিত অবস্থায় মালয়েশিয়ায় মারা যান |
| নিজের কারাবাস | ২০০৭, ২০১৮-২০২০ সালে কারাভোগ, মোট ১৭ বছরের সাজা |
স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে তিনি একা হয়ে যান। ২০০৭ সালে সামরিক-সমর্থিত সরকার তাঁর দুই ছেলেকেই গ্রেফতার করে এবং নির্যাতন চালায়। পরবর্তীতে উভয়কেই দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়।
২০১৫ সালে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকো নির্বাসিত অবস্থায় মালয়েশিয়ায় মারা যান । এই শোক তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান ১৭ বছর নির্বাসনের পর ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ – বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
নিজে ২০১৮ সাল থেকে কারাবাসের পর মুক্তি পেয়ে প্রায় বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেছেন। পরিবার-পরিজন থেকে দূরে, অসুস্থতায় জর্জরিত অবস্থায় তাঁর শেষ বছরগুলো কেটেছে।
উত্তরাধিকার: ইতিহাসে তাঁর স্থান
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সাথে সাথে বাংলাদেশের রাজনীতির এক যুগের অবসান ঘটল। ১৯৮৪ থেকে ২০২৫ – এই ৪১ বছর তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন।
ঐতিহাসিক কৃতিত্বের সারসংক্ষেপ
| ক্ষেত্র | অর্জন | প্রভাব |
| নারী নেতৃত্ব | বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী | মুসলিম বিশ্বে নারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের পথ প্রশস্ত |
| গণতান্ত্রিক সংগ্রাম | স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব | ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা |
| সংসদীয় গণতন্ত্র | ১২তম সংশোধনী | রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে রূপান্তর |
| নির্বাচনী সংস্কার | ১৩তম সংশোধনী | তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা |
| প্রধানমন্ত্রিত্ব | তিন মেয়াদ (১৯৯১-৯৬, ১৯৯৬, ২০০১-০৬) | স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘতম সময় (১০ বছর) শাসন |
| নির্বাচনী রেকর্ড | পাঁচটি ভিন্ন নির্বাচনে কখনো না হেরে | বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য কৃতিত্ব |
| নারী শিক্ষা | মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, উপবৃত্তি | নারী শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি |
| অর্থনৈতিক উন্নয়ন | পোশাক শিল্পে নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি | ২ লক্ষ নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি |
| আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি | ফোর্বস ২৯তম শক্তিশালী নারী (২০০৫) | বৈশ্বিক নারী নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব |
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন:
বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের পথ তৈরি করেছেন তিনি । একটি রক্ষণশীল সমাজে একজন নারী কীভাবে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতায় পৌঁছাতে পারেন, তিনি তার উদাহরণ। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়, মুসলিম বিশ্বের নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণা ছিল।
গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ভূমিকা:
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য । ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত তাঁর আপোষহীন লড়াই বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও পরবর্তীতে তাঁর নিজের গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দ্বিদলীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র:
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি – এই দ্বিদলীয় রাজনীতির যে কাঠামো, তাতে খালেদা জিয়া ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। ১৯৮৪ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৪১ বছর তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর এই রাজনৈতিক কাঠামো কীভাবে বিবর্তিত হবে, তা দেখার বিষয়।
সাংবিধানিক সংস্কার:
সংবিধানের ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু তাঁর সবচেয়ে স্থায়ী অবদানগুলির মধ্যে একটি। এই দুটি সংশোধনী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিতর্কিত উত্তরাধিকার:
সব রাজনৈতিক নেতার মতো তাঁরও ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিক আছে। ইতিহাস তাঁকে মূল্যায়ন করবে তাঁর সম্পূর্ণ কাজের ভিত্তিতে – শুধু অর্জন বা ব্যর্থতা দিয়ে নয়। দুর্নীতির অভিযোগ, পারিবারিক রাজনীতি, জঙ্গিবাদের উত্থান – এসব তাঁর উত্তরাধিকারকে জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম, নারী ক্ষমতায়ন, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা – এসব তাঁর ইতিবাচক অবদান হিসেবে থাকবে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার
| বছর | পুরস্কার/স্বীকৃতি | প্রদানকারী |
| ১৯৯৪ | পার্ল এস বাক ওম্যান অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড | পার্ল এস বাক ফাউন্ডেশন, যুক্তরাষ্ট্র |
| ১৯৯৮ | অনারারি ডক্টরেট | ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান |
| ২০০৫ | বিশ্বের ২৯তম শক্তিশালী নারী | ফোর্বস ম্যাগাজিন |
| ২০১১ | ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি পুরস্কার | নিউ জার্সি স্টেট সিনেট, যুক্তরাষ্ট্র |
সমাপনী: এক যুগের শেষ, নতুন অধ্যায়ের শুরু
বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। তাঁর যারা ভালোবাসতেন, তাদের কাছে এটি এক বিরাট শূন্যতা। যারা তাঁর সমালোচক ছিলেন, তারাও স্বীকার করবেন যে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিসংবাদিত চরিত্র।
একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া, দীর্ঘ ৪১ বছর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা, অসংখ্য ঝড়ঝাপটা পার করা – এসব তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান দিয়েছে। ১৯৮১ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ছিল অপ্রত্যাশিত এবং চ্যালেঞ্জিং।
বিএনপির ভবিষ্যৎ: তারেক রহমান ও নতুন নেতৃত্ব

নেতৃত্ব শূন্যতার চ্যালেঞ্জ
বিএনপির বর্তমান অবস্থা
| দিক | বিশ্লেষণ |
| নেতৃত্ব | খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে প্রায় নেতৃত্বশুন্য |
| আদর্শিক দিক | চিন্তার আখ্যান হারিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিতে আটকা |
| রাজনৈতিক মানদণ্ড | ক্ষমতার প্রতিযোগিতাকে প্রধান রাজনৈতিক মানদণ্ড করেছে |
| জনবিশ্বাস | অতীতের ভুল স্বীকার ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি প্রয়োজন |
তারেক রহমানের ভূমিকা
শক্তি ও দুর্বলতা
| দিক | বিবরণ |
| অবস্থান | বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান |
| নির্বাসন | ১৭ বছর লন্ডনে |
| স্বদেশ প্রত্যাবর্তন | ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ |
| আইনি জটিলতা | দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত |
| চ্যালেঞ্জ | জনবিশ্বাস পুনর্গঠন, দলীয় ঐক্য |
ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তিনটি উপাদানের উপর:
- নেতৃত্ব: তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নেতৃত্ব শূন্যতা পূরণ করতে পারে
- কৌশল: আন্দোলন ও নির্বাচনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা
- জনবিশ্বাস: অতীতের ভুল স্বীকার এবং দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি নিশ্চিত করা
প্রতিক্রিয়া ও শোক বার্তা
প্রধান উপদেষ্টার শোক বার্তা
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ ইউনূস গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার চলে যাওয়ার সাথে সাথে জাতি তার একজন মহান অভিভাবককে হারিয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে দুঃখিত এবং হতবাক”।
তিনি আরও বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর অবদান, দীর্ঘ সংগ্রাম এবং তাঁর প্রতি জনগণের আবেগ বিবেচনা করে সরকার এই মাসে তাঁকে রাষ্ট্রের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করেছিল”।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
চীন
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে পাঠানো এক শোক বার্তায় বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রবীণ ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, যিনি চীনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন”।
ভারত
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর পরিবারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান যে, প্রধান উপদেষ্টা তাঁর সাথে ফোনে কথা বলে জানিয়েছেন যে পরামর্শক পরিষদের একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হবে যেখানে বেগম খালেদা জিয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মান ও দাফনের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে ।
শেষকৃত্যের কর্মসূচি
| কর্মসূচি | স্থান | তারিখ |
| জানাজা | মানিক মিয়া এভিনিউ, ঢাকা | ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ (বুধবার) |
| দাফন | জিয়া উদ্যান, সংসদ ভবন এলাকা | ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ |
| স্থান | স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে | |
| শোক দিবস | ৭ দিন | ৩০ ডিসেম্বর – ৫ জানুয়ারি |
| কালো পতাকা | সব বিএনপি অফিসে | ৭ দিন |
| কালো ব্যাজ | নেতাকর্মীদের জন্য | শোক সপ্তাহজুড়ে |
| শোক বই | সব জেলা ও কেন্দ্রীয় অফিসে | খোলা রাখা হবে |
জনগণের প্রতিক্রিয়া
এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে হাজার হাজার বিএনপি নেতাকর্মী এবং সমর্থক সমবেত হয়েছেন । পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশজুড়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে ।
প্রবীণ সাংবাদিক মাহফুজ মিশু বলেন, “মানুষ হতবাক, তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিশাল জনসমাগম প্রত্যাশিত। খালেদা জিয়া ব্যাপক জনপ্রিয় গণনেত্রী ছিলেন যার সাথে জনগণের গভীর সংযোগ ছিল, দশকের পর দশক ধরে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি গঠন করেছেন” ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর স্থান
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেন যখন দেশ স্বৈরাচার থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশক বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় ছিল এবং খালেদা জিয়া ছিলেন সেই পরীক্ষার একজন প্রধান স্থপতি ।
তাঁর সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করেছে, পোশাক শিল্প বিকশিত হয়েছে, নারী শিক্ষার হার বেড়েছে । একই সঙ্গে, রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদের উত্থানও দেখা গেছে। এই জটিল ও বহুমুখী উত্তরাধিকার তাঁকে একজন বিতর্কিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
খালেদা জিয়ার উক্তি
গণতন্ত্র সম্পর্কে
“গণতন্ত্র শুধু একটি শাসন ব্যবস্থা নয়, এটি জনগণের অধিকার এবং মর্যাদার প্রতীক। আমি আমার সারা জীবন এই অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করেছি।”
নারী ক্ষমতায়ন সম্পর্কে
“নারী শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। আমাদের মেয়েরা আমাদের ভবিষ্যৎ, এবং তাদের শিক্ষিত করা আমাদের দায়িত্ব।”
রাজনৈতিক দর্শন
“রাজনীতি ক্ষমতার খেলা নয়, এটি জনগণের সেবা করার একটি মাধ্যম। যে নেতা জনগণের কথা ভুলে যায়, সে নেতা নয়, স্বৈরাচার।”
স্মৃতি ও শ্রদ্ধা
বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি থাকবেন প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে, এবং ৪১ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী হিসেবে । তাঁর সমর্থকরা তাঁকে স্মরণ করবেন একজন সাহসী ও আপোষহীন নেত্রী হিসেবে। সমালোচকরা তাঁর ভুলত্রুটি মনে রাখবেন। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে।
তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে দেশবাসী স্বীকার করছে যে বাংলাদেশ একজন ঐতিহাসিক নেতাকে হারিয়েছে।
শেষ কথা
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন আমাদের শেখায় যে রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, এটি দায়িত্ব, ত্যাগ এবং সংগ্রামেরও বিষয়। একজন সাধারণ নারী থেকে জাতীয় নেতা হওয়ার তাঁর যাত্রা অনুপ্রেরণাদায়ক, যদিও তাঁর শাসনামলের বিতর্কিত দিকগুলো উপেক্ষা করা যায় না।
তাঁর ৮০ বছরের জীবন ছিল উত্থান-পতনে ভরা। ১৯৪৬ সালে দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া সেই মেয়েটি স্বপ্নেও ভাবেননি যে একদিন তিনি দেশ পরিচালনা করবেন, ইতিহাস রচনা করবেন । কিন্তু নিয়তি তাঁকে সেই পথে নিয়ে যায়।
স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯৮৪ সালে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর শেষ হলো । ৪১ বছরের সেই যাত্রাপথে তিনি জাতিকে অনেক কিছু দিয়েছেন, অনেক কিছু নিয়েছেন। তাঁর অর্জন ও ব্যর্থতা, গৌরব ও বিতর্ক – সবকিছু মিলেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর আত্মাকে শান্তিতে রাখুন এবং তাঁর পরিবারকে এই দুঃখ সহ্য করার শক্তি দিন।
খালেদা জিয়া সম্পর্কে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. বেগম খালেদা জিয়া কখন জন্মগ্রহণ করেন?
তিনি ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
২. তিনি কত বছর রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন?
১৯৮৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৪১ বছর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন।
৩. তিনি কতবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন?
তিনি তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন: ১৯৯১-১৯৯৬, ফেব্রুয়ারি-মার্চ ১৯৯৬, এবং ২০০১-২০০৬।
৪. কোন মামলায় তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছিল?
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় মোট ১৭ বছরের সাজা দেওয়া হয়, যদিও পরবর্তীতে উভয় মামলায় তিনি খালাস পান।
৫. তিনি কখন মৃত্যুবরণ করেন?
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।


