পাহাড়ের গল্প: পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি

সর্বাধিক আলোচিত

সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা ঝর্ণা আর মেঘের মিতালী—এই নিয়ে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবান—এই তিন জেলায় পা রাখলেই বোঝা যায় প্রকৃতি এখানে কতটা উদার। তবে পাহাড়ের আসল সৌন্দর্য শুধু এই সবুজেই লুকিয়ে নেই, তা মিশে আছে এখানকার মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনে। বহু বছর ধরে এই পাহাড়ি ঢালে গড়ে উঠেছে এক অনন্য ঐতিহ্য। আজকের আড্ডায় আমরা একটু গভীরে গিয়ে দেখব পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি ঠিক কতটা সমৃদ্ধ আর কীভাবে তারা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের শিকড় আঁকড়ে ধরে রেখেছে।

কারা এই পাহাড়ের সন্তান? নৃগোষ্ঠীগুলোর সহজ পরিচয়

পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠী

পার্বত্য চট্টগ্রামে মূলত ১১টি স্থায়ী পাহাড়ি নৃগোষ্ঠী বাস করে। এদের মধ্যে জনসংখ্যা আর সামাজিক প্রভাবে চাকমারা সবচেয়ে এগিয়ে। ঠিক এর পরেই আছে মারমা আর ত্রিপুরাদের অবস্থান। এছাড়া ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, বમ, পাংখোয়া, খিয়াং, খুমি, লুসাই আর চাক—এই ছোট ছোট দলগুলোও এই পাহাড়েরই সন্তান। তাত্ত্বিকভাবে এদের সবাইকে মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীর অংশ বলা হলেও, প্রত্যেকের ভাষা, সাজপোশাক আর চালচলন একদম আলাদা। এই বৈচিত্র্যই পাহাড়কে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

সার্কেল চিফ ও পাড়ার কারবারী প্রথা

পাহাড়িদের নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থা কিন্তু বেশ চমৎকার এবং সুশৃঙ্খল। চাকমাদের সামাজিক প্রধান হলেন চাকমা রাজা। আবার মারমাদের বেলায় দেখা যায় সার্কেল প্রথা—যার মধ্যে রয়েছে বোমাং রাজা (বান্দরবান) ও মং রাজা (খাগড়াছড়ি)। কিন্তু ত্রিপুরাদের সমাজে আবার রাজ প্রথার চেয়ে পাড়ার কারবারী বা প্রধানদের ভূমিকা বেশি। এই প্রধানেরা এখনো সরকারি আদালতের বাইরে নিজেদের পাড়ার ছোটখাটো ঝামেলা, পারিবারিক বিবাদ বা সামাজিক বিচার-আচার বেশ দক্ষতার সাথে সামলান।

দুর্গম পাহাড়ের জীবনসংগ্রাম ও বংশধারা

ম্রো, বম বা খুমির মতো ছোট ছোট দলগুলো সাধারণত পাহাড়ের একদম উঁচুতে বা বেশ দুর্গম এলাকায় থাকে। শহরের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এখনো তাদের দরজায় ওভাবে কড়া নাড়েনি। তবে এই কষ্টের জীবনেও তারা তাদের নিজস্ব ভাষা, লোকগাথা আর সুরগুলোকে মরে যেতে দেয়নি। এদের সমাজ ব্যবস্থা মূলত পিতৃতান্ত্রিক হলেও, ঘরের যেকোনো বড় সিদ্ধান্তে কিংবা কৃষিকাজে নারীদের মতামতের যথেষ্ট কদর করা হয়।

নৃগোষ্ঠীর নাম প্রধান বাসস্থান প্রধান ভাষা সামাজিক শাসন কাঠামো পারিবারিক ধারা
চাকমা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি চাকমা (নিজস্ব লিপি আছে) চাকমা সার্কেল (রাজা প্রধান) পিতৃতান্ত্রিক (পিতৃকুল প্রধান)
মারমা বান্দরবান ও রাঙামাটি মারমা (বর্মী লিপির সাথে মিল) বোমাং ও মং সার্কেল পিতৃতান্ত্রিক (নারীদের উচ্চ সামাজিক মর্যাদা)
ত্রিপুরা খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান ককবরক রোয়াজা বা কারবারী প্রথা পিতৃতান্ত্রিক (দফা বা গোত্র ভিত্তিক)
ম্রো বান্দরবানের দুর্গম পাহাড় ম্রো পাড়া কারবারী প্রধান পিতৃতান্ত্রিক (প্রকৃতি ঘনিষ্ঠ)
তঞ্চঙ্গ্যা রাঙামাটি ও বান্দরবান তঞ্চঙ্গ্যা চাকমা সার্কেলের অংশ পিতৃতান্ত্রিক (গোত্র প্রথা শক্তিশালী)

ইতিহাসের পাতা থেকে: কীভাবে এলেন তারা?

আজ আমরা যে জীবনযাত্রা দেখি, তা কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এই মানুষগুলোর পাহাড়ে স্থায়ী হওয়া এক দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প। মিয়ানমারের আরাকান, তিব্বত আর ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময়ে এই দলগুলো এ দেশে এসে আশ্রয় নেয়। মুঘল আর ব্রিটিশ আমলেও তারা নিজেদের মতো করে স্বাধীনতা ভোগ করত। মূলত, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি হলো মানুষের সাথে প্রকৃতির মিলেমিশে থাকার এক জীবন্ত দলিল।

রাজা, ব্রিটিশ আইন আর ভূমির অধিকার

১৬শ থেকে ১৮শ শতকের মধ্যে এই নৃগোষ্ঠীগুলোর বড় একটা অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকাপাকিভাবে বসতি গড়ে তোলে। পরে ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন‘ (CHT Regulation 1900) নামের একটি বিশেষ আইন পাস করে। এই আইনটি পাহাড়ের মানুষের জন্য ছিল এক মস্ত বড় ঢাল। এর মাধ্যমে বহিরাগতদের অবাধে পাহাড়ের জমি কেনা নিষিদ্ধ করা হয়, যা তাদের সংস্কৃতি এবং জাতিগত পরিচয়কে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।

পাহাড়ের নিজস্ব রূপকথা ও নাচ

পাহাড়ি সংস্কৃতির দিকে তাকালে একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যায়—তারা প্রকৃতিকে বন্ড ভালোবাসে, দেবতাতুল্য মনে করে। নদী, পাহাড় আর জঙ্গলকে ঘিরেই তাদের সব গান, নাচ আর গল্প। তাদের বিখ্যাত বাঁশ নৃত্য কিংবা জুম নাচ কিন্তু স্রেফ বিনোদন নয়; এগুলো মূলত ফসল কাটার আনন্দ আর প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম। মুখে মুখে প্রচলিত এই লোককাহিনী আর মিথগুলোই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে তাদের ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে।

ঐতিহাসিক সময়কাল প্রধান ঘটনা সংস্কৃতির ওপর প্রভাব আইনি অবস্থা
প্রাক-ব্রিটিশ আমল আরাকান ও ত্রিপুরা থেকে আগমন নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন স্বাধীন ও করদ রাজ্য প্রথা
১৯০০ সাল পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন পাস আইনি স্বীকৃতি ও ভূমির অধিকার রক্ষা বিশেষ শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা
১৯৬০ এর দশক কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি ও সাংস্কৃতিক ধাক্কা অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বিপর্যয়
১৯৯৭ সাল পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ও পর্যটন বিকাশ আঞ্চলিক পরিষদ গঠন ও স্বীকৃতি

জুম চাষ: পাহাড়ের পেট চালানোর আসল কারবার

পাহাড়ের মানুষের জীবন মানেই কৃষি। তবে সমতলের মতো এখানে লাঙল বা ট্র্যাক্টর চালানো যায় না। তাই শত শত বছর ধরে তারা এক বিশেষ উপায়ে চাষবাস করে আসছে, যাকে আমরা বলি ‘জুম চাষ’। এই চাষ পদ্ধতি শুধু তাদের পেট চালায় না, বরং তাদের পুরো জীবন সংস্কৃতি, লোকসংগীত এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করে।

জঙ্গল পোড়ানো থেকে বীজ বোনা

বছরের শুরুতে, অর্থাৎ শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি-মার্চ) পাহাড়ের ঢালের জঙ্গল কেটে শুকানো হয়। এরপর চৈত্র মাসে তাতে আগুন ধরিয়ে জমি পরিষ্কার করা হয়। বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নামার ঠিক আগে, পোড়া ছাইয়ের ওপর ছোট ছোট গর্ত করে তারা একসঙ্গে ধান, তুলা, মিষ্টি কুমড়া, মারফা (পাহাড়ি শসা), আদা, হলুদ আর তিল বীজ বুনে দেয়। একই জমিতে ঋতুভেদে এত পদের ফসল ফলানোর এই ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী কৌশল সত্যিই চমৎকার।

নতুন ধানের গন্ধ আর জুমের গান

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে যখন জুমের ফসল পেকে যায়, তখন পাহাড়ের পাড়াগুলোতে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। নতুন চালের ভাত রান্না করে তারা দেব-দেবী আর পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে ভোগ দেয়। এই সময় তরুণ-তরুণীরা পাহাড়ি ঢালে দল বেঁধে জুমের গান গায় আর নাচে। জুমের এই খাটুনি, মাটির গন্ধ আর ফসল কাটার আনন্দই পাহাড়ি লোকসংগীতের মূল সুর।

জুম চাষের ধাপ সময়কাল প্রধান ফসল সংস্কৃতির রূপ শ্রমের ধরণ
জঙ্গল কাটা ও পোড়ানো জানুয়ারি – মার্চ নাই জুম ক্ষেত্র তৈরি (চেলং) যৌথ সামাজিক শ্রম
বীজ বপন এপ্রিল – মে ধান, ভুট্টা, তুলা, সবজি বৃষ্টির জন্য প্রকৃতি পূজা নারী-পুরুষের সমান অংশীদারিত্ব
নিড়ানি ও যত্ন জুন – আগস্ট আদা, হলুদ, লঙ্কা জুম পাহারা ও লোকগীতি গোত্রভিত্তিক তদারকি
ফসল কাটা সেপ্টেম্বর – নভেম্বর জুমের নতুন চাল, তিল জুম সংস্কৃতির উৎসব (নবান্ন) আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশ

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস এবং সংস্কৃতির প্রধান দিক

উৎসবের রঙ: বৈসাবি আর জলকেলির গল্প

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস এবং সংস্কৃতির সবচেয়ে রঙিন দিকটা দেখতে পাবেন বছরের শেষ আর শুরুতে। এই সময় পাহাড়ে কোনো বিষাদের সুর থাকে না, থাকে কেবল উৎসবের আনন্দ। চাকমারা একে বলে ‘বিজু’, মারমারা বলে ‘সাংগ্রাই’ আর ত্রিপুরারা বলে ‘বৈসুক’। এই তিন উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর জোড়া লাগিয়ে তৈরি হয়েছে ‘বৈসাবি’।

বিজুর তিন দিন আর ‘পাজন’ তরকারি

চাকমাদের বিজু উৎসব চলে তিন দিন ধরে—ফুল বিজু, মূল বিজু আর গোজ্জেপোজ্জে বিজু। প্রথম দিন ভোরে নদী বা ঝর্ণায় ফুল ভাসিয়ে ঈশ্বরের কাছে আশীর্বাদ চাওয়া হয় এবং বাড়িঘর সাজানো হয়। দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ মূল বিজুর দিনে ঘরে ঘরে রান্না হয় এক বিশেষ তরকারি, যার নাম ‘পাজন’। ২০-৩০ পদের পাহাড়ি বুনো সবজি, ভেষজ মূল আর শুঁটকি দিয়ে তৈরি এই পাজনের স্বাদ একবার খেলে ভোলা মুশকিল। শেষ দিনটি কাটানো হয় বয়স্কদের সেবা ও বিহারে প্রার্থনার মধ্য দিয়ে।

সাংগ্রাইয়ের পানির খেলা ও ম্রোদের উৎসব

মারমাদের সাংগ্রাই উৎসবের আসল আকর্ষণ হলো জল কেলি বা পানি খেলা। তরুণেরা দল বেঁধে একে অপরের গায়ে পানি ছিটায়। এর অর্থ হলো—বিগত বছরের সব দুঃখ, কষ্ট আর গ্লানি পানি দিয়ে ধুয়ে নতুন বছরকে একদম ফ্রেশভাবে বরণ করে নেওয়া। অন্যদিকে ম্রোদের ‘চিয়াশিয়ত পোই’ (গো-হত্যা উৎসব) কিংবা বমদের বড়দিন ও ঐতিহ্যবাহী বাঁশ নৃত্যের উৎসব পাহাড়ের সংস্কৃতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।

উৎসবের নাম নৃগোষ্ঠী প্রধান আকর্ষণ সামাজিক তাৎপর্য বিশেষ খাবার
বিজু চাকমা ফুল ভাসানো ও পাজন রান্না নতুন বছরকে বরণ ও সামাজিক মৈত্রী পাজন ও বিন্নি পিঠা
সাংগ্রাই মারমা জল কেলি বা পানি খেলা পঙ্কিলতা ধুয়ে শুদ্ধ হওয়া সাংগ্রাই পিঠা ও ঐতিহ্যবাহী পানীয়
বৈসুক ত্রিপুরা গরাইয়া নৃত্য ও অতিথি আপ্যায়ন সুখ-সমৃদ্ধির যৌথ প্রার্থনা পাজন ও চালের পিঠা
ওয়ানগালা গারো/অন্যান্য ক্রাম ও মাদল বাজিয়ে নাচ সূর্য দেব (তাঁতারা-রাবুগা) প্রতি কৃতজ্ঞতা নতুন জুমের চাল ও মুরগির মাংস

কোমর তাঁতের জাদু আর রূপার অলঙ্কার

পাহাড়ি নারীদের হাতের কাজ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। তারা বাজার থেকে কেনা কাপড়ের চেয়ে নিজেদের তৈরি পোশাক পরতেই বেশি ভালোবাসেন। ঘরে বসে কাঠের তৈরি ‘কোমর তাঁত’ (Back-Strap Loom) দিয়ে তারা চমৎকার সব জ্যামিতিক নকশার কাপড় বোনেন। এই পোশাকগুলোই দূর থেকে তাদের জাত চিনিয়ে দেয় এবং তাদের কারুকাজের নিপুণতা ফুটিয়ে তোলে।

পিনন, হাদি আর থামির বাহার

চাকমা নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক হলো পিনন আর হাদি। কোমর থেকে নিচের অংশের রঙিন স্ট্রাইপযুক্ত স্কার্টকে বলে পিনন, আর গায়ের ওড়নাটা হলো হাদি। মারমা নারীরা আবার পরেন ‘থামি’ আর ‘ব্লাউজ’। ত্রিপুরারা পরেন রিনাই আর রিসা। এই পোশাকের সুতাগুলোও অনেক সময় তারা নিজেদের জুমের তুলা থেকে তৈরি করে নেন এবং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রঙ (গাছের ছাল বা পাতা থেকে প্রাপ্ত) ব্যবহার করেন।

রূপার গহনার ছন্দ

উৎসবের দিনে পাহাড়ি নারীরা ভারী রূপার গহনা আর রঙিন পাথরের পুঁতির মালা দিয়ে সাজেন। কানজোড়া (বড় কানের দুল), গলার হাসুলি, চন্দ্রহার আর হাতের বাуটি তাদের রূপ আরও বাড়িয়ে দেয়। ম্রো বা খিয়াং নারীরা আবার পায়ে এক ধরনের বিশেষ ধাতব বলয় পরেন, যা হাঁটার সময় ছান্দসিক একঝাঁক শব্দ তৈরি করে, যা পাহাড়ের নীরবতার মাঝে এক অপূর্ব সুর তোলে।

পোশাক/অলঙ্কার ব্যবহারকারী সম্প্রদায় উপাদান ও তৈরি পদ্ধতি দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য সাংস্কৃতিক প্রতীক
পিনন-হাদি চাকমা নারী কোমর তাঁতে বোনা সুতা লাল-কালো স্ট্রাইপ ও ফুল নকশা নারী স্বাবলম্বিতার প্রতীক
থামি মারমা নারী সুতি বা সিল্ক কাপড় লম্বালম্বি বা আড়াআড়ি স্ট্রাইপ মারমা সংস্কৃতির মৌলিক অঙ্গ
হাসুলি / চন্দ্রহার প্রায় সব গোষ্ঠী রূপা বা মিশ্র খাগড়াই ধাতু ভারী ও বৃত্তাকার গলার গহনা আভিজাত্য ও উৎসবের সাজ
রিনাই-রিসা ত্রিপুরা নারী হাতে বোনা দুই খণ্ডের পোশাক উজ্জ্বল রঙের জ্যামিতিক টেক্সচার ঐতিহ্য ও সামাজিক পরিচয়

পাহাড়ি রান্না: তেল-মশলা ছাড়া অকৃত্রিম স্বাদ

বাঙালি রান্নার মতো পাহাড়ে তেল বা জিরের গুঁড়োর ছড়াছড়ি পাবেন না। এখানকার রান্নার ধরন একদম আলাদা, যা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর। তারা মূলত সেদ্ধ, পোড়া আর ভাপে তৈরি খাবার বেশি পছন্দ করেন। খাবারে সুগন্ধ আনার জন্য তারা ব্যবহার করেন জংলি আদা, পাহাড়ি ধনেপাতা, আদা পাতা আর কাঁচা মরিচ। তাই এদের খাবার যেমন সুস্বাদু, তেমনই স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ।

বাঁশ করল আর সিদলের চাটনি

বর্ষা নামলেই পাহাড়ের বাজারে দেদারসে বিক্রি হয় বাঁশ করল (কচি বাঁশের ভেতরের নরম অংশ)। এটি ভাজি, সেদ্ধ বা শুঁটকি দিয়ে রান্না করে খাওয়া হয়। এছাড়া ছোট মাছ বা চিংড়ি রোদে শুকিয়ে এবং গেঁজিয়ে তৈরি ফারমেন্টেড পেস্ট, যাকে চাকমারা ‘নাপ্পি’ আর অন্যরা ‘সিদল’ বলে, তা তাদের প্রতিদিনের খাবারের পাতে থাকবেই। এর গন্ধ একটু তীব্র হলেও এর স্বাদ ও প্রোটিনের গুণাগুণ অসাধারণ।

কলাপাতার ‘হেবাং’ ও বিন্নি চাল

মাছ বা মাংসকে পাহাড়ি ভেষজ মশলা দিয়ে মেখে কলাপাতায় মুড়িয়ে চুলার গরম ছাইয়ের নিচে বা ভাপে সেদ্ধ করা হয়। চাকমা ভাষায় একে বলে ‘হেবাং’। তেল ছাড়া এই রান্নার ভেতরের স্মোকি ফ্লেভার বা পোড়া গন্ধটা মুখে লেগে থাকার মতো। এর সাথে পাহাড়ে উৎপাদিত আঠালো ও সুগন্ধি ‘বিন্নি চালের ভাত’ তাদের অন্যতম প্রধান খাদ্য।

প্রধান খাদ্য উপাদান রান্নার পদ্ধতি বিশেষ বৈশিষ্ট্য স্বাদ ও পুষ্টি ভেষজ উপাদান
বাঁশ করল সেদ্ধ বা তরকারি কচি বাঁশের ভেতরের নরম অংশ আঁшযুক্ত ও কম ক্যালরি প্রাকৃতিক ফাইবার
নাপ্পি / সিদল পেস্ট বা চাটনি ছোট মাছ বা চিংড়ির ফারমেন্টেড রূপ তীব্র সুগন্ধ ও প্রোটিন সমৃদ্ধ উচ্চ ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন
বিন্নি চালের ভাত ভাপে রান্না আঠালো পাহাড়ি চালের ভাত মিষ্টি ও ভারী খাবার প্রাকৃতিভাবে সুগন্ধি
হেবাং কলাপাতায় পোড়ানো তেল ছাড়া শুধু ভেষজ মশলা স্মোকি ফ্লেভারের মাংস/মাছ আদা পাতা ও পাহাড়ি লঙ্কা

ভাষা, লিপি আর মনের বিশ্বাস

চাকমা আর তঞ্চঙ্গ্যাদের দিকে তাকালে অবাক হতে হয়—তাদের নিজস্ব বর্ণমালা বা লিপি আছে! এই লেখাগুলো দেখতে অনেকটা মিয়ানমার বা থাইল্যান্ডের প্রাচীন লিপির (ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভূত) মতো। ভাষার দিক থেকে বৈচিত্র্য থাকলেও ধর্মীয় দিক থেকে পাহাড়ের বড় অংশই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তবে ত্রিপুরারা সনাতন হিন্দু ধর্ম মানেন, আর বম বা লুসাইদের অনেকেই এখন খ্রিস্টধর্ম আপন করে নিয়েছেন।

কিয়াং ও ফানুস ওড়ানোর রাত

চাকমা আর মারমাদের প্রতিটি পাড়াতেই একটা করে ‘কিয়াং’ বা বৌদ্ধ বিহার থাকে। সকাল-সন্ধ্যা সেখানে থং বা ঘণ্টা বাজে, চলে শান্ত প্রার্থনা। প্রবারণা পূর্ণিমার মতো বড় উৎসবগুলোতে রাতের আকাশে যখন শত শত রঙিন ফানুস ওড়ে, তখন পাহাড়ের আকাশটা দেখতে রূপকথার মতো লাগে। এটি তাদের ধর্মীয় ত্যাগের প্রতীক।

প্রকৃতির বুকে পুরনো দেবতারা

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম পালন করলেও পাহাড়ি মানুষ এখনো তাদের পুরনো কিছু আদিম বিশ্বাসকে ভুলে যায়নি। তারা এখনো নদীর জন্য ‘গাঙ পূজা’ দেয়, জুমের ভালো ফসলের জন্য ‘জুম পূজা’ করে। কোনো পাড়ায় বড় রোগবালাই হলে পাড়ার প্রবেশমুখে বিশেষ তোরণ (সবুজ পাতা ও বাঁশ দিয়ে তৈরি) বানিয়ে তারা দেবতার কাছে মানত করে। প্রকৃতির প্রতি এই সম্মান আর সহাবস্থানই তাদের সংস্কৃতির মূল শক্তি।

নৃগোষ্ঠী প্রধান ধর্ম নিজস্ব লিপি ও বর্ণমালা ধর্মীয় প্রধান উৎসব প্রাচীন লোকবিশ্বাস
চাকমা বৌদ্ধ ধর্ম আছে (চাকমা ওঝাপাট লিপি) বুদ্ধ পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দান গাঙ পূজা, জুম পূজা
মারমা বৌদ্ধ ধর্ম আছে (মারমা লিপি) প্রবারণা পূর্ণিমা (ফানুস উৎসব) ছং বা অপদেবতার ভয় দূর করা
ত্রিপুরা হিন্দু ধর্ম নেই (ককবরক ভাষা) গড়াইয়া পূজা, দীপাবলি বুড়াহাফা বা বনদেবতার পূজা
বম / লুসাই খ্রিস্টধর্ম নেই (ল্যাটিন লিপি ব্যবহার হয়) বড়দিন, ইস্টার সানডে জুমের প্রাচীন আত্মা বিশ্বাস

বদলে যাওয়া পাহাড়: নতুন হাওয়া আর চ্যালেঞ্জ

সময় তো আর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। তাই আধুনিক জীবনের হাওয়া লেগেছে পাহাড়েও। মোবাইল, ইন্টারনেট আর শিক্ষার আলো পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে। পাহাড়ের নতুন প্রজন্ম এখন উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশ-বিদেশে বড় বড় চাকরি, ব্যবসা বা ফ্রিল্যান্সিং করছে। তারা শুধু জুম চাষের ওপর নির্ভর করে বসে নেই।

পর্যটনের জোয়ার ও অর্থনৈতিক বদল

সাজেক ভ্যালি, নীলগিরি, বগালেক বা থানচির মতো জায়গাগুলো এখন দেশের এক নম্বর ট্যুরিস্ট স্পট। পর্যটনের এই জোয়ারে স্থানীয় আদিবাসীদের ভাগ্য অনেকটাই বদলেছে। তারা কটেজ, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ আর হস্তশিল্পের ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। তবে এর একটা খারাপ দিকও আছে—অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ, পাহাড় কাটা আর প্লাস্টিকের বর্জ্যের কারণে পাহাড়ের শান্ত পরিবেশ আর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

হারিয়ে যাওয়ার ভয় ও নতুন লড়াই

শহরের সংস্কৃতির প্রভাবে অনেক পাহাড়ি তরুণ এখন নিজেদের ভাষা বা লিপি ঠিকমতো বলতে বা লিখতে পারে না। মৌখিক সাহিত্যগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা) বই দেওয়া হচ্ছে। সংস্কৃতিকে আধুনিক উপায়ে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াইটাই এখন পাহাড়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিবর্তনের ক্ষেত্র ইতিবাচক দিক নেতিবাচক ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যৎ সুরক্ষার উপায়
শিক্ষা ও প্রযুক্তি সচেতনতা বৃদ্ধি, বিশ্বায়ন নিজস্ব ভাষার প্রতি উদাসীনতা ডিজিটাল মাধ্যমে লিপির সংরক্ষণ
পর্যটন ও অর্থনীতি নতুন আয়ের উৎস, সংস্কৃতির প্রচার পরিবেশ দূষণ ও সামাজিক অবক্ষয় ইকো-ট্যুরিজম বা পরিবেশবান্ধব পর্যটন
পোশাক ও জীবনধারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁতের ব্যবহার হ্রাস বাণিজ্যিক প্রদর্শনী ও বাজারজাতকরণ

পাহাড়ের শেষ কথা

দিনশেষে একটা কথা মানতেই হবে—পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি আমাদের বাংলাদেশের এক পরম পাওয়া। এই বৈচিত্র্য না থাকলে আমাদের সংস্কৃতি এতটা রঙিন আর বহুমাত্রিক হতো না। পাহাড়ের এই সহজ-সরল মানুষগুলোর জীবনযাত্রা আমাদের একটা বড় পাঠ দেয়—প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না করে, বনের সাথে মিতালী করে কীভাবে সুখে বাঁচা যায়। আধুনিকতার আলো আসুক, কিন্তু তাদের এই হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়, তা দেখা আমাদের সবার জাতীয় দায়িত্ব। পাহাড়ের এই রঙিন মেলা ডানা মেলে বেঁচে থাকুক তার আপন ছন্দে।

মনের কিছু খটকা দূর করুন

১. পাহাড়িদের ‘পাজন’ তরকারিটা আসলে কী?

পাজন হলো বৈসাবি উৎসবের সিগনেচার ডিশ। এটি বানাতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ বা তারও বেশি পদের পাহাড়ি বুনো সবজি, কচি বাঁশ করল, নানা জাতের আলু, পাহাড়ি মাশরুম আর শুঁটকি মাছ লাগে। পাহাড়িদের বিশ্বাস, বছরের শুরুতে এই ভেষজ তরকারি খেলে সারা বছর শরীর রোগমুক্ত থাকে।

২. পাহাড়ের সবারই কি নিজস্ব কোনো লিখিত বর্ণমালা আছে?

না, সবার নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি নৃগোষ্ঠীর মধ্যে প্রধানত চাকমা আর মারমাদের নিজস্ব লিখিত লিপি বা বর্ণমালা আছে। তঞ্চঙ্গ্যারাও চাকমা লিপির মতো এক ধরনের হরফ ব্যবহার করে। বাকিদের ভাষার নিজস্ব লিপি না থাকায় তারা ল্যাটিন বা বাংলা অক্ষরে নিজেদের ভাষা লেখে।

৩. ‘কোমর তাঁত’ জিনিসটা আসলে কেমন?

এটি পাহাড়ি নারীদের কাপড় বোনার একদম দেশি ও প্রাচীন পদ্ধতি। এতে কোনো আধুনিক বৈদ্যুতিক মেশিন লাগে না। তাঁতের এক প্রান্ত সুতা বা চামড়ার বেল্ট দিয়ে কোমরের সাথে শক্ত করে বাঁধা হয় এবং অন্য প্রান্তটি ঘরের কোনো খুঁটি বা গাছের সাথে টানটান করে আটকে সম্পূর্ণ হাতের সাহায্যে নিখুঁত নকশার কাপড় বোনা হয়।

৪. ‘গাঙ পূজা’ কেন দেওয়া হয়?

পাহাড়ি ভাষায় গাঙ মানে নদী। নদী যেন শান্ত থাকে, পাহাড়ের মানুষ যেন নদী থেকে ভালো মাছ ও বিশুদ্ধ জল পায় এবং পাড়ার সবার মঙ্গল হয়—এই কামনায় চাকমা ও মারমারা সাধারণত জ্যৈষ্ঠ বা আষাঢ় মাসে নদীর ঘাটে হাঁস-মুরগি উৎসর্গ করে এই পূজা দেয়।

৫. ‘বৈসাবি’ নামটা এলো কোত্থেকে?

এটি কোনো একক উৎসবের নাম নয়। পাহাড়ের প্রধান তিনটি নৃগোষ্ঠীর উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে এটি তৈরি। ত্রিপুরার ‘বৈসুক’ (বৈ), মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ (সা) আর চাকমাদের ‘বিজু’ (বি)—এই তিন মিলে হয়েছে ‘বৈসাবি’।

সর্বশেষ