ইলেক্ট্রনিক-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: রিসাইক্লিং ও নিরাপদে ফেলার সঠিক নিয়ম

সর্বাধিক আলোচিত

প্রতিদিন আমাদের ঘরে-অফিসে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, টিভি, চার্জার কিংবা রেফ্রিজারেটর—এসবই একসময় পুরোনো হয়ে যায় । কিন্তু এগুলো ফেলে দেওয়ার সঠিক নিয়ম না জানলে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয় । বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা প্রতি বছর প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে । শুধুমাত্র মোবাইল ফোন থেকেই প্রতি বছর তিন কোটি ডিভাইস ই-বর্জ্য হিসেবে যুক্ত হচ্ছে ।​

বেশিরভাগ মানুষই পুরনো বা নষ্ট ইলেকট্রনিক পণ্য হয় ড্রয়ারে ফেলে রাখেন, অথবা সাধারণ ডাস্টবিনে ফেলে দেন। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ এক বিপদ, যার নাম ইলেক্ট্রনিক-বর্জ্য বা ই-বর্জ্য (E-waste)। এটি শুধুমাত্র আবর্জনা নয়, এটি আমাদের পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যের জন্য একটি নীরব ঘাতক।

এই আর্টিকেলে আমরা সহজ ভাষায় জানব ই-বর্জ্য কী, কেন এটি সাধারণ ময়লার চেয়ে আলাদা, এবং কীভাবে আমরা সঠিক নিয়মে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং করতে পারি। পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই গাইডলাইনটি জানা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।

ই-বর্জ্য কী?

সহজ কথায়, যেসব ইলেকট্রনিক বা বৈদ্যুতিক পণ্য আর ব্যবহারযোগ্য নেই, নষ্ট হয়ে গেছে, অথবা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আমরা ফেলে দিতে চাই—সেগুলোকেই ই-বর্জ্য বা ইলেক্ট্রনিক বর্জ্য বলা হয়। যখন কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস তার জীবনচক্রের শেষে পৌঁছায়, তখন সেটি ই-বর্জ্যে পরিণত হয়।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ই-বর্জ্যের অনেক উদাহরণ রয়েছে:

ই-বর্জ্যের কিছু সাধারণ উদাহরণ হলো:

শ্রেণি উদাহরণ বিপদ/ঝুঁকি
মোবাইল ও ট্যাব স্মার্টফোন, ট্যাবলেট লিথিয়াম ব্যাটারি বিস্ফোরণ, ডেটা চুরি
কম্পিউটার ও ল্যাপটপ ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, মনিটর, কীবোর্ড, মাউস সীসা, ক্যাডমিয়াম, মেটাল পুনঃব্যবহার প্রয়োজন
টিভি ও মনিটর LED, LCD, CRT পারদ, সীসা, কাচ ভাঙলে কাটার ঝুঁকি
চার্জার ও ক্যাবল মোবাইল, ল্যাপটপ চার্জার আগুন ধরে যাওয়া, প্লাস্টিক দুষণ
ব্যাটারি লিথিয়াম-আয়ন, নিকেল-ক্যাডমিয়াম বিস্ফোরণ, বিষাক্ত পদার্থ
ঘরোয়া যন্ত্রপাতি রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, এয়ার কন্ডিশনার CFCs, ক্লোরোফ্লুরোকার্বন, প্লাস্টিক
গ্যাজেটস ও এক্সেসরিজ হেডফোন, স্পিকার, রিমোট, প্রিন্টার ছোট অংশ শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ

যা ই-বর্জ্য নয় (কিন্তু মানুষ ভাবে)

অনেক সময় মানুষ ভুল করে এমন কিছু জিনিসকে ই-বর্জ্য ভাবে, যেগুলো আসলে ই-বর্জ্য নয়:

  • সাধারণ প্লাস্টিকের খেলনা (যদি না তাতে ব্যাটারি বা সার্কিট থাকে)
  • খালি প্লাস্টিকের বোতল বা প্যাকেজিং
  • কাগজ বা কাপড়ের বর্জ্য
  • যান্ত্রিক ঘড়ি (যদি ব্যাটারি না থাকে)

পুরোনো ও নতুন ই-বর্জ্যের পার্থক্য

পুরোনো ই-বর্জ্য (যেমন সিআরটি মনিটর, পুরোনো টিভি) বেশি বিপজ্জনক কারণ এতে সীসা, পারদ ও অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকারক পদার্থ বেশি থাকে । নতুন ডিভাইসগুলোতে (স্মার্টফোন, ল্যাপটপ) তুলনামূলকভাবে কম বিষাক্ত উপাদান থাকে, তবে লিথিয়াম ব্যাটারি আগুন ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে ।​

ই-বর্জ্যের ভেতরে কী আছে (আসল বিপদ)

The real danger of e-waste

ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ভেতরে এক হাজারেরও বেশি ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ থাকতে পারে । এর মধ্যে প্রধান বিপজ্জনক উপাদানগুলো হলো:​

 ই-বর্জ্যের বিপজ্জনক উপাদান

উপাদান কোথায় থাকে স্বাস্থ্য/পরিবেশ ঝুঁকি
সীসা (Lead) সার্কিট বোর্ড, পুরোনো মনিটর কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র, মস্তিষ্ক ক্ষতি
পারদ (Mercury) মনিটর, ল্যাম্প, ব্যাটারি শ্বাসতন্ত্র, মস্তিষ্ক, জন্মগত সমস্যা
ক্যাডমিয়াম (Cadmium) ব্যাটারি, সার্কিট বোর্ড কিডনি, ফুসফুস, ক্যান্সার ঝুঁকি
লিথিয়াম স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ব্যাটারি আগুন, বিস্ফোরণ
CFCs রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার ওজোন স্তর নষ্ট, ত্বক ও জেনেটিক সমস্যা
ক্রোমিয়াম VI বিভিন্ন মেটাল সার্কিট DNA ক্ষতি, বিষাক্ত
প্লাস্টিক ও ফ্লেম রিটার্ড্যান্ট কেসিং, তার, গ্যাজেট হরমোন সমস্যা, ক্যান্সার

মাটি, পানি, বাতাস ও মানবস্বাস্থ্যে প্রভাব

ই-বর্জ্য যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফেলা হয় বা পোড়ানো হয়, তখন এর ভেতরের বিষাক্ত পদার্থ মাটি ও পানিতে মিশে যায় । এই রাসায়নিক পদার্থগুলো মানুষের রক্তে প্রবেশ করে কোষের প্রদাহ, ক্ষতি এমনকি কোষের মৃত্যু ঘটায় । জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (NIH) গবেষণা অনুযায়ী, ই-বর্জ্যের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের রক্তে ডিএনএ ক্ষতি এবং কোষীয় বয়সবৃদ্ধি দ্রুত হয় । এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায় এবং টিকার কার্যকারিতাও কমে যায় । থাইরয়েড ও এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের ক্ষতি হয়, যা শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে ।​

ই-বর্জ্য পোড়ানো কেন বিপজ্জনক

বাংলাদেশের অনেক সাধারন রিসাইক্লিং সেন্টারে বা ভাঙ্গারি (সাধারণ পুরাতন জিনিস ক্রয় বিক্রয়ের দোকান) দোকানে ই-বর্জ্য পোড়ানো হয় তার ও ক্যাবল থেকে তামা বের করার জন্য । কিন্তু এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ পোড়ানোর সময় ডাইঅক্সিন ও ফুরান নামক মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে । এই গ্যাস ভ্রূণের বিকৃতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট, বৃদ্ধি ও প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং ক্যান্সারের কারণ হতে পারে । তাই কখনোই ই-বর্জ্য পোড়ানো উচিত নয়।​

বাংলাদেশে ই-বর্জ্য: বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ই-বর্জ্য। বুয়েটের ‘পরিবেশ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (CERM)’ এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে এবং এর খুব সামান্য অংশই সঠিক উপায়ে রিসাইক্লিং হয়।

  • সবচেয়ে বেশি বর্জ্য কারা তৈরি করে?
    স্মার্টফোন ব্যবহারকারী এবং জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে প্রচুর ই-বর্জ্য আসে। 
  • ইনফরমাল বা অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং:
    বাংলাদেশে বেশিরভাগ ই-বর্জ্য সংগ্রহ করে ভাঙারি বা ফেরিওয়ালারা। তারা সঠিক সুরক্ষাব্যবস্থা (গ্লাভস, মাস্ক) ছাড়াই খালি হাতে এসিড দিয়ে সার্কিট পরিষ্কার করে বা তার পোড়ায়। এতে তারা নিজেরাও অসুস্থ হন এবং পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি করেন।  
  • সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ: বর্তমানে সরকারি এবং কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (যেমন- আজিজু রিসাইক্লিং, জেআর রিসাইক্লিং ইত্যাদি) প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে এসেছে।

ফেলার আগে ৫টি গোল্ডেন রুলস

ই-বর্জ্য ফেলার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মেনে চলা জরুরি। এগুলো পরিবেশ রক্ষা, অর্থ সাশ্রয় এবং সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে ।​

মেরামত করুন

ডিভাইসটি যদি সামান্য নষ্ট হয়, তাহলে মেরামত করার চেষ্টা করুন । মোবাইলের স্ক্রিন ভেঙে গেলে শুধু স্ক্রিন পরিবর্তন করুন, পুরো ফোন ফেলে দেবেন না। ল্যাপটপের ব্যাটারি নষ্ট হলে নতুন ব্যাটারি লাগান। অনেক স্থানীয় মেরামত শপ এবং “রিপেয়ার ক্যাফে” আছে, যেখানে বিনামূল্যে বা কম খরচে মেরামত করা যায় । মেরামত করলে খরচ কমে এবং ই-বর্জ্য কম হয় ।​

পুনর্ব্যবহার করুন

পুরোনো ডিভাইস অন্যভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। যেমন:

  • পুরোনো স্মার্টফোন ক্যামেরা, মিউজিক প্লেয়ার বা ই-বুক রিডার হিসেবে ব্যবহার করুন
  • পুরোনো ল্যাপটপ শিশুদের শেখার কাজে ব্যবহার করুন
  • পুরোনো মনিটর সেকেন্ড ডিসপ্লে হিসেবে ব্যবহার করুন

দান বা বিক্রয় করুন

যদি ডিভাইস এখনো চলমান থাকে কিন্তু আপনার আর প্রয়োজন নেই, তাহলে দান করুন বা বিক্রি করুন । দাতব্য সংস্থা, স্কুল, এতিমখানা, মসজিদ-মন্দির, দরিদ্র পরিবার বা স্থানীয় যুব সংগঠনে দান করতে পারেন । অনলাইন মার্কেটপ্লেস, বা স্থানীয় পুরাতন পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের দোকানে বিক্রয় করতে পারেন ।​

পার্টস পুনর্ব্যবহার করুন

ডিভাইস সম্পূর্ণ নষ্ট হলেও কিছু অংশ কাজ করতে পারে । যেমন ল্যাপটপের হার্ড ড্রাইভ, র‍্যাম, কীবোর্ড বা চার্জার অন্য ডিভাইসে ব্যবহার করা যেতে পারে । এভাবে কম্পোনেন্ট পুনর্ব্যবহার করলে ই-বর্জ্য কমে এবং অর্থ সাশ্রয় হয় ।​

ফেলে দেওয়া শেষ বিকল্প

যখন মেরামত, পুনর্ব্যবহার, দান বা বিক্রয়—কোনোটাই সম্ভব নয়, তখনই শুধুমাত্র ফেলে দেওয়ার কথা ভাবুন । অবশ্যই অনুমোদিত রিসাইক্লিং সেন্টারে জমা দিন, রাস্তায় বা ডাস্টবিনে ফেলবেন না ।​

নিরাপদে ই-বর্জ্য ফেলার সঠিক নিয়ম

যখন মেরামত বা দান করার আর কোনো উপায় নেই, তখনই কেবল ‘ডিসপোজাল’ বা ফেলে দেওয়ার চিন্তা করবেন। তবে তার আগে কিছু কাজ আবশ্যিক।

সবসময় ডেটা রিসেট/মুছে ফেলুন

ই-বর্জ্য ফেলে দেওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আপনার ব্যক্তিগত ডেটা সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা । মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা হার্ড ড্রাইভে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকিং ডেটা, ফটো ও পাসওয়ার্ড থাকতে পারে । এগুলো মুছে না ফেললে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে ।​

লেবেল ও স্টোরেজ

ঘরে ই-বর্জ্য আলাদা করার জন্য কিছু ছোট বক্স বা প্লাস্টিকের কন্টেইনার রাখুন এবং লেবেল লাগান । যেমন:​

  • মোবাইল ও ট্যাবলেট
  • ল্যাপটপ ও কম্পিউটার পার্টস
  • চার্জার ও ক্যাবল
  • ব্যাটারি (আলাদা বক্সে)
  • ছোট যন্ত্রপাতি (রিমোট, হেডফোন)
  • বড় যন্ত্রপাতি (টিভি, প্রিন্টার)

ব্যাটারি ও ঝুঁকিপূর্ণ ডিভাইস হ্যান্ডলিং

ডিভাইস/উপাদান স্টোরেজ নিরাপত্তা টিপস
ব্যাটারি আলাদা বক্স বা প্লাস্টিক ব্যাগ ফোলা/ফাটা ব্যাটারি রিসাইক্লিং সেন্টারে দিন, টার্মিনাল টেপ করুন
ভাঙা স্ক্রিন/কাচ বাবল র‍্যাপ বা কাগজে মোড়ানো হাত-পা কাটা থেকে রক্ষা
তার/ক্যাবল আলাদা বক্সে সরু করে রাখুন ছোট শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন
ছোট ইলেকট্রনিক্স লেবেল সহ কন্টেইনার শুকনো, ঠান্ডা, অন্ধকার স্থানে রাখুন

ব্যাটারি হ্যান্ডলিং

ব্যাটারি খুবই বিপজ্জনক, কারণ এগুলো আগুন ধরতে পারে বা বিস্ফোরিত হতে পারে । ব্যাটারি সবসময় আলাদা প্লাস্টিক ব্যাগ বা বক্সে রাখুন । ফোলা বা ফাটা ব্যাটারি খুবই বিপজ্জনক—এগুলো যত দ্রুত সম্ভব রিসাইক্লিং সেন্টারে জমা দিন । ব্যাটারির টার্মিনাল (যেখানে ধাতব অংশ থাকে) টেপ দিয়ে ঢেকে রাখুন, যাতে শর্ট সার্কিট না হয় ।​

তার ও ভাঙা ডিভাইস

চার্জার, ক্যাবল ও তারগুলো একসাথে গোছিয়ে রাখুন । ভাঙা বা কাচ থাকা ডিভাইস (যেমন ভাঙা স্ক্রিন) কাগজ বা বাবল র‍্যাপ দিয়ে মুড়িয়ে আলাদা বক্সে রাখুন, যাতে হাত-পা কাটার সম্ভাবনা না থাকে।​

শিশুদের থেকে দূরে রাখুন

ই-বর্জ্যে বিষাক্ত পদার্থ থাকে, তাই সবসময় শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন । ছোট ব্যাটারি, চার্জার বা ভাঙা কাচ শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ।​

রিসাইক্লিং আসলে কীভাবে কাজ করে

সংগ্রহ → সাজানো → ভাঙা → প্রক্রিয়াকরণ

ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং একটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হওয়া প্রক্রিয়া, যা পরিবেশ রক্ষা এবং মূল্যবান উপাদান পুনরুদ্ধার করে:​

ধাপ ১: সংগ্রহ (Collection)

ই-বর্জ্য অনুমোদিত সংগ্রহ কেন্দ্র, ব্র্যান্ড টেক-ব্যাক প্রোগ্রাম বা পিক-আপ সার্ভিসের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় । সংগ্রহের পর সেগুলো নিরাপদভাবে রিসাইক্লিং প্লান্টে নেওয়া হয় ।​

ধাপ ২: সাজানো ও পরিদর্শন (Sorting and Inspection)

রিসাইক্লিং সেন্টারে ই-বর্জ্য প্রথমে ধরন অনুযায়ী সাজানো হয়—মোবাইল, ল্যাপটপ, টিভি, ব্যাটারি, তার ইত্যাদি । কোন ডিভাইস এখনো মেরামতযোগ্য বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য, তা পরীক্ষা করা হয় ।​

ধাপ ৩: ম্যানুয়াল ডিসম্যান্টলিং (Manual Dismantling)

প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানরা বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে ডিভাইসগুলো ভেঙে ফেলেন । এ সময় বিপজ্জনক উপাদান (যেমন ব্যাটারি, পারদযুক্ত লাইট, সিআরটি মনিটর) আলাদা করে সুরক্ষিত স্থানে রাখা হয় । সার্কিট বোর্ড, তার, হার্ড ড্রাইভ, প্লাস্টিক কেসিং আলাদাভাবে সংগ্রহ করা হয় ।​

ধাপ ৪: শ্রেডিং ও সাইজ রিডাকশন (Shredding)

ডিসম্যান্টলিংয়ের পর বাকি অংশগুলো শিল্প শ্রেডার মেশিনে ভেঙে ছোট টুকরা করা হয় (২-৬ ইঞ্চি) । এতে পরবর্তী ধাপে উপাদান আলাদা করা সহজ হয় ।​

ধাপ ৫: উপাদান আলাদা করা (Material Separation)

শ্রেডিং করার পর বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উপাদান আলাদা করা হয়:​

  • চৌম্বক বিভাজন: লোহা ও স্টিল চুম্বক দিয়ে আলাদা করা হয়
  • এডি কারেন্ট সেপারেটর: তামা, অ্যালুমিনিয়ামসহ অন্যান্য মেটাল আলাদা করা হয়
  • ওয়াটার সেপারেশন: প্লাস্টিক ও কাচ পানিতে ভাসিয়ে আলাদা করা হয়
  • অপটিক্যাল স্ক্যানিং: বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক সনাক্ত করে আলাদা করা হয়  

ধাপ ৬: প্রক্রিয়াকরণ ও পুনরুদ্ধার (Processing and Recovery)

আলাদা করা উপাদানগুলো পরিশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়, যেখানে:

  • মেটাল গলিয়ে নতুন পণ্য তৈরি করা হয়
  • প্লাস্টিক গুঁড়ো করে নতুন প্লাস্টিক পণ্য বানানো হয়
  • কাচ গলিয়ে পুনর্ব্যবহার করা হয়
  • মূল্যবান মেটাল (সোনা, রূপা, তামা, প্যালাডিয়াম) রাসায়নিক পদ্ধতিতে বের করা হয়​

কোন পার্টস রিসাইক্লিং করা যায়

ই-বর্জ্য থেকে প্রায় সব ধরনের উপাদান রিসাইক্লিং করা সম্ভব:​

  • মেটাল: তামা, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, লোহা, সোনা, রূপা, প্যালাডিয়াম
  • প্লাস্টিক: বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক (ABS, PS, PP, PVC)
  • কাচ: মনিটর ও টিভির কাচ
  • সার্কিট বোর্ড: মূল্যবান ও বিরল মেটাল থাকে
  • ব্যাটারি: লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল পুনরুদ্ধার করা হয়

পরিবেশগত সুবিধা

রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে নতুন খনি খনন কমে যায়, যা পরিবেশ রক্ষা করে । মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার করে আবার ব্যবহার করা হয়, ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ হয় । ই-বর্জ্য ল্যান্ডফিলে না ফেলে মাটি ও পানি দূষণ রোধ করা যায় । এছাড়া রিসাইক্লিং শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনৈতিক লাভ হয় ।​

ই-বর্জ্য কোথায় দিতে হবে

অনুমোদিত রিসাইক্লিং সেন্টার (সাধারণ ব্যাখ্যা)

ই-বর্জ্য শুধুমাত্র অনুমোদিত রিসাইক্লিং সেন্টারে জমা দিতে হবে । এসব কেন্দ্র সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং সঠিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ মান মেনে চলে । অনুমোদিত কেন্দ্রগুলো ই-বর্জ্য সংগ্রহ, স্টোরেজ, ডিসম্যান্টলিং ও রিসাইক্লিং—সব পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে । এসব কেন্দ্র নিয়মিত পরিবেশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হয় ।​

অনুমোদিত রিসাইক্লিং সেন্টার খুঁজতে আপনার এলাকার পরিবেশ অধিদপ্তর বা পৌরসভা অফিসে যোগাযোগ করুন । অনেক শহরে মোবাইল রিসাইক্লিং ভ্যান বা সংগ্রহ ইভেন্ট আয়োজিত হয়, যেখানে আপনি বিনামূল্যে ই-বর্জ্য জমা দিতে পারবেন ।​

ব্র্যান্ড টেক-ব্যাক প্রোগ্রাম

অনেক বড় ব্র্যান্ড (যেমন স্যামসাং, অ্যাপল, ডেল) তাদের পুরোনো পণ্য ফেরত নেওয়ার প্রোগ্রাম চালু করেছে । স্যামসাং তাদের “STAR” (Samsung Take Back and Recycling) প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিনামূল্যে পুরোনো স্যামসাং পণ্য সংগ্রহ করে । এমনকি অন্য ব্র্যান্ডের পণ্যও কিছু চার্জে সংগ্রহ করে । আপনি তাদের কাস্টমার কেয়ার নম্বরে ফোন করে পিক-আপ সেবা নিতে পারেন বা নিকটস্থ সার্ভিস সেন্টারে জমা দিতে পারেন ।​

স্যামসাং বাংলাদেশে মোবাইল, টিভি, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ সহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ করে । এমনকি হেডসেট, চার্জার ও অ্যাকসেসরিজও তারা নেয় । এই ধরনের প্রোগ্রাম পরিবেশবান্ধব এবং নিরাপদ রিসাইক্লিং নিশ্চিত করে ।​

শহর/পৌর সুবিধা

অনেক বড় শহরে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন ই-বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করেছে । কিছু এলাকায় নির্দিষ্ট দিনে ই-বর্জ্য সংগ্রহ ইভেন্ট আয়োজিত হয়, যেখানে বাসিন্দারা তাদের পুরোনো ইলেকট্রনিক্স বিনামূল্যে জমা দিতে পারেন । স্থানীয় পৌরসভা বা ওয়ার্ড কমিশনারের সাথে যোগাযোগ করে এসব সুবিধা সম্পর্কে জানতে পারবেন ।​

এড়িয়ে চলুন: র‍্যান্ডম স্ক্র্যাপ শপ, ডাম্পিং, পোড়ানো

যেকোনো স্ক্র্যাপ শপে ই-বর্জ্য দেবেন না, কারণ বেশিরভাগ অনানুষ্ঠানিক স্ক্র্যাপ শপে পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নেই । এসব জায়গায় ই-বর্জ্য পোড়ানো বা অ্যাসিড দিয়ে গলানো হয়, যা মারাত্মক দূষণ সৃষ্টি করে । রাস্তায়, নদীতে বা খোলা মাঠে ই-বর্জ্য ফেলবেন না । কখনোই ই-বর্জ্য পোড়াবেন না, এমনকি বাড়ির আঙিনায়ও না । পোড়ালে বিষাক্ত ধোঁয়া ও গ্যাস নির্গত হয়, যা আপনার ও পরিবারের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ।​

অফিস/স্কুল/প্রতিষ্ঠানের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

নীতি তৈরি করুন

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি লিখিত ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি থাকা উচিত । এই নীতিতে থাকবে কখন, কীভাবে ও কোথায় ই-বর্জ্য জমা দিতে হবে, কোন কর্মচারী এর দায়িত্বে থাকবেন এবং কোন রিসাইক্লিং কোম্পানির সাথে চুক্তি করা হবে । সব কর্মচারীকে এই নীতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে ।​

ইনভেন্টরি রাখুন

সব ইলেকট্রনিক ডিভাইসের একটি তালিকা রাখুন—কত, কী ধরনের, কবে কেনা, কবে নষ্ট হয়েছে ইত্যাদি । এতে ই-বর্জ্যের পরিমাণ পরিমাপ করা এবং সঠিক পরিকল্পনা করা সহজ হয় ।​

ভেন্ডর চেকলিস্ট

যে রিসাইক্লিং কোম্পানির সাথে চুক্তি করবেন, তা অবশ্যই সরকার অনুমোদিত হতে হবে । চেক করুন:​

  • তাদের কি পরিবেশ অধিদপ্তর বা দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড থেকে লাইসেন্স আছে?​
  • তারা কি ই-বর্জ্য পোড়ায় না বা উন্নয়নশীল দেশে রপ্তানি করে না?​
  • তাদের কি ডেটা ধ্বংসের সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা আছে?​
  • তারা কি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মান মেনে চলে?​

রিপোর্টিং ও অডিট

প্রতি বছর ই-বর্জ্য সংগ্রহ, রিসাইক্লিং ও নিষ্কাশনের রিপোর্ট রাখুন । এই রিপোর্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হতে পারে । নিয়মিত অডিট করুন যে রিসাইক্লিং ভেন্ডর সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা ।​

শিশু ও পরিবারের জন্য নিরাপত্তা

ই-বর্জ্য শিশু ও পরিবারের জন্য বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করে । এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস:​

  • ছোট ব্যাটারি শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন: শিশুরা মুখে দিতে পারে, যা মারাত্মক বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে​
  • ভাঙা ডিভাইস সাবধানে রাখুন: কাচ বা ধারালো অংশ কাটার ঝুঁকি তৈরি করে​
  • পুরোনো ডিভাইস খেলার জিনিস নয়: শিশুদের পুরোনো মোবাইল বা রিমোট খেলতে দেবেন না, এতে ব্যাটারি ও ছোট অংশ গিলে ফেলার ঝুঁকি থাকে​
  • ই-বর্জ্য সংরক্ষণ নিরাপদ স্থানে করুন: বন্ধ ক্যাবিনেট বা উঁচু স্থানে রাখুন​
  • শিশুদের শেখান: বড় শিশুদের ই-বর্জ্য সম্পর্কে শেখান এবং তাদের নিরাপদ নিষ্কাশনে সাহায্য করতে উৎসাহিত করুন

ই-বর্জ্য নিয়ে ভুল ধারণা (Myths vs Facts)

ভুল ধারণা (Myth) সঠিক তথ্য (Fact)
“একটা ছোট ব্যাটারি সাধারণ ডাস্টবিনে ফেললে কিছু হবে না।” একটি ছোট ব্যাটারি হাজার লিটার পানি ও কয়েক একর মাটির উর্বরতা নষ্ট করতে পারে।
“ই-বর্জ্য পোড়ালে সব শেষ হয়ে যায়।” পোড়ালে বর্জ্য শেষ হয় না, বরং বিষাক্ত ধোঁয়া হয়ে বাতাসে মিশে আরও বড় ক্ষতি করে।
“আমার নষ্ট ফোনে কোনো দামী জিনিস নেই।” নষ্ট ফোনের সার্কিটেও সোনা, রুপা এবং বিরল সব ধাতু থাকে যা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য।

আইন ও দায়িত্ব

বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালে ‘ঝুঁকিপুর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ জারি করেছে। এই আইন অনুযায়ী:

  • উৎপাদকের দায় (EPR): যারা পণ্য উৎপাদন বা আমদানী করছে, তাদেরকেই পণ্যের জীবনকাল শেষে তা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ভোক্তার দায়: যত্রতত্র ই-বর্জ্য ফেলা আইনত দণ্ডনীয় হতে পারে। সচেতন নাগরিক হিসেবে সঠিক স্থানে বর্জ্য ফেলা আমাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।

ই-বর্জ্য কমানোর টিপস

সবচেয়ে ভালো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হলো বর্জ্য তৈরি না করা।

১. প্রয়োজন ছাড়া কিনবেন না: নতুন মডেলের ফোন এলেই কিনতে হবে—এই মানসিকতা বদলান।

২. ভালো কেস ও প্রটেক্টর ব্যবহার করুন: এতে ডিভাইসের আয়ু বাড়ে এবং সহজে ভাঙে না।

৩. সফ্টওয়্যার আপডেট: অনেক সময় ফোন স্লো হলে আমরা বদলে ফেলি, অথচ ফ্যাক্টরি রিসেট বা সফটওয়্যার আপডেটে তা নতুনের মতো হতে পারে।

শেষ কথা

প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের জীবন সহজ করেছে, কিন্তু এর বর্জ্য আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। “ইলেক্ট্রনিক-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা” কেবল কোনো সরকারি কাজ নয়, এটি আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অভ্যাসের বিষয়।

আজ থেকেই শুরু করুন—বাসায় একটি আলাদা বক্সে নষ্ট ব্যাটারি বা তার জমা করা শুরু করুন। আপনার পুরনো ফোনটি ড্রয়ারে ফেলে না রেখে সঠিক রিসাইক্লিং সেন্টারে পৌঁছে দিন। আমাদের একটু সচেতনতাই পারে বাংলাদেশকে একটি দূষণমুক্ত ও বাসযোগ্য দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। রিসাইক্লিং করুন, পরিবেশ বাঁচান।

সর্বশেষ