২০২৬ সালে হলিউড বক্স অফিসে ঝড় তুলল যে চলচ্চিত্রগুলো: শীর্ষ ব্লকবাস্টার তালিকা

সর্বাধিক আলোচিত

সিনেমাপ্রেমীদের জন্য ২০২৬ সালটা কেটেছে এক অবিশ্বাস্য উন্মাদনায়। বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি, বহুল প্রতীক্ষিত সিক্যুয়েল আর দুর্দান্ত কিছু মৌলিক গল্পের জোয়ারে প্রেক্ষাগৃহগুলো ছিল দর্শকে ঠাসা। ওটিটির দাপট সামলে হলিউডের ইতিহাসে অন্যতম লাভজনক বছর হিসেবে এটি জায়গা করে নিয়েছে।

অ্যানিমেশন মুভি থেকে শুরু করে পপ সম্রাটের জীবনী কিংবা সায়েন্স ফিকশন—সব ধরনের সিনেমাই বক্স অফিসে রীতিমতো রাজত্ব করেছে। চলুন দেখা যাক, ঠিক কীভাবে ২০২৬ সালে হলিউড বক্স অফিসে ঝড় তুলল যে চলচ্চিত্রগুলো এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা করল।

২০২৬ সালের বক্স অফিস কাঁপানো শীর্ষ অ্যানিমেশন মুভি

চলতি বছর অ্যানিমেশন ঘরানার সিনেমাগুলো আয়ের দিক থেকে অন্য সব বড় বাজেটের লাইভ-অ্যাকশন সিনেমাকে বেশ পেছনে ফেলে দিয়েছে। ছোট-বড় সব বয়সী দর্শকদের হলে টানতে এই মুভিগুলো ছিল একচেটিয়া সফল। চেনা নস্টালজিয়া আর আধুনিক অ্যানিমেশন প্রযুক্তির মেলবন্ধনে প্রযোজনা সংস্থাগুলো এ বছর সবচেয়ে বড় বাজিটি জিতেছে।

দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি (The Super Mario Galaxy Movie)

২০২৬ সালে হলিউড বক্স অফিসে ঝড় তুলল যে চলচ্চিত্রগুলো, তার মধ্যে একেবারে শীর্ষ স্থানটি দখল করে নিয়েছে ইউনিভার্সাল পিকচার্সের ‘দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’। নিনটেনডোর জনপ্রিয় গেমের সিক্যুয়েলটি বিশ্বজুড়ে ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। চমৎকার ভিজ্যুয়াল আর মহাকাশের রোমাঞ্চকর গল্প সব বয়সী গেমার ও সাধারণ দর্শকদের দারুণ পছন্দ হয়েছে।

টয় স্টোরি ৫ (Toy Story 5)

ডিজনির অন্যতম সফল ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘টয় স্টোরি ৫’ এ বছর তার জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির গ্যাজেটের সাথে খেলনাদের লড়াই এবং পুরোনো বন্ধুদের ফিরে পাওয়ার আবেগঘন এই গল্পটি বিশ্বজুড়ে ৭৬৪.৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে। এর মাধ্যমে পুরো টয় স্টোরি ফ্র্যাঞ্চাইজি এখন ৪ বিলিয়ন ডলার ক্লাবে প্রবেশ করল।

সিনেমার নাম বিশ্বব্যাপী আয় (ডলার) মূল থিম/ঘরানা প্রধান কাস্ট (ভয়েস)
দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি ১.০০৯ বিলিয়ন অ্যাডভেঞ্চার / কমেডি ক্রিস প্র্যাট, আনিয়া টেলর-জয়
টয় স্টোরি ৫ ৭৬৪.৩ মিলিয়ন ফ্যামিলি / অ্যানিমেশন টম হ্যাঙ্কস, টিম অ্যালেন

বায়োপিক ও ড্রামা ঘরানার অবিশ্বাস্য রেকর্ড

বাস্তব জীবনের গল্প বা মানুষের আবেগ নিয়ে তৈরি সিনেমা যে বাণিজ্যিক ফ্র্যাঞ্চাইজির সমকক্ষ হতে পারে, তা ২০২৬ সালে আবারও প্রমাণিত হলো। নামী তারকাদের নিখুঁত অভিনয় আর দুর্দান্ত পরিচালনা দর্শকদের থিয়েটারমুখী করতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট মিউজিক্যাল বায়োপিক এ বছর সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে।

মাইকেল (Michael)

লায়নসগেটের ব্যানারে নির্মিত পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘মাইকেল’ এ বছর বক্স অফিসে তুফান তুলেছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯৭৮.৬ মিলিয়ন ডলার আয় করে এটি ইতিহাসের সফলতম মিউজিক্যাল বায়োপিক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ওপেনহাইমার বা বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডির মতো সিনেমাকেও এটি আয়ের দিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে। মাইকেলের জীবনের নানা বিতর্ক এবং তার জাদুকরী সংগীত জীবনের নিখুঁত ভারসাম্য পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে।

দ্য ডেভিল ওয়ার্স প্রাডা ২ (The Devil Wears Prada 2)

দীর্ঘদিন পর মারিল স্ট্রিপ এবং অ্যান হ্যাথাওয়ের অন-স্ক্রিন রসায়ন দেখতে দর্শকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন। ২০থ সেঞ্চুরি স্টুডিওজের এই ড্রামা সিক্যুয়েলটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬৮৫.৮ মিলিয়ন ডলার ঘরে তুলেছে, যা এই ঘরানার সিনেমার জন্য একটি বিশাল রেকর্ড। কর্পোরেট ফ্যাশন দুনিয়ার ভেতরের গল্প ও নাটকীয়তা আধুনিক দর্শকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করেছে।

সিনেমার নাম বিশ্বব্যাপী আয় (ডলার) প্রধান তারকা বাজেট (আনুমানিক)
মাইকেল ৯৭৮.৬ মিলিয়ন জাফর জ্যাকসন $১৫৫ মিলিয়ন
দ্য ডেভিল ওয়ার্স প্রাডা ২ ৬৮৫.৮ মিলিয়ন মারিল স্ট্রিপ, অ্যান হ্যাথাওয়ে $৮৫ মিলিয়ন

Hollywood Box Office Movies 2026

সায়েন্স ফিকশন ও থ্রিলারের রাজত্ব

কল্পবিজ্ঞান বা মহাকাশ অভিযানের গল্প সবসময়ই সিনেমা হলের বড় পর্দায় দেখার জন্য দারুণ। এ বছর বেশ কিছু হার্ড সায়েন্স ফিকশন ও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিনেমা বক্স অফিসে বাজিমাত করেছে। সিজিআই (CGI) প্রযুক্তির চমৎকার ব্যবহার এই সিনেমাগুলোকে আন্তর্জাতিক স্তরে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

প্রজেক্ট হেইল মেরি (Project Hail Mary)

অ্যান্ডি উইয়ারের বিখ্যাত বই অবলম্বনে তৈরি অ্যামাজন এমজিএম-এর ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ সায়েন্স ফিকশন ভক্তদের মন জয় করেছে। রায়ান গসলিং অভিনীত এই মহাকাশ অভিযানভিত্তিক সিনেমাটি ৬৮৩.৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’ সিনেমার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। একাকী এক নভোচারীর পৃথিবীকে বাঁচানোর লড়াইয়ের গল্পটি ছিল বেশ রোমাঞ্চকর।

অবসেসশন (Obsession)

এ বছর হলিউডের সবচেয়ে লাভজনক সিনেমা হিসেবে ফোকাস ফিচারের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘অবসেসশন’ জায়গা করে নিয়েছে। মাত্র ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের নামমাত্র বাজেটে তৈরি এই সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ৪০৩ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। পরপর কয়েক সপ্তাহে এর টিকিট বিক্রি কমার বদলে উল্টো বেড়ে গিয়ে চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের চমকে দিয়েছে। মুখে মুখে ছড়ানো পজিটিভ রিভিউ বা ‘ওয়ার্ড অব মাউথ’ এই ছবিকে ব্লকবাস্টার বানাতে সাহায্য করেছে।

সিনেমার নাম বাজেট (আনুমানিক) বিশ্বব্যাপী আয় (ডলার) আইএমডিবি (IMDb) রেটিং
প্রজেক্ট হেইল মেরি $১২০ মিলিয়ন ৬৮৩.৫ মিলিয়ন ৮.২/১০
অবসেসশন $৭৫০,০০০ ৪০৩ মিলিয়ন ৭.৯/১০

২০২৬ সালে হলিউড বক্স অফিসে ঝড় তুলল যে চলচ্চিত্রগুলো: অনন্য ট্রেন্ড ও ফ্র্যাঞ্চাইজি

এই বছরের বক্স অফিস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিক্যুয়েল বা পরিচিত ফ্র্যাঞ্চাইজির বাইরেও একদম কম বাজেটের হরর বা থ্রিলার ঘরানার ছবিগুলো ব্যাপক লাভ এনে দিয়েছে। ইন্টারনেটের বিভিন্ন ট্রেন্ড এবং সোশ্যাল মিডিয়া হাইপ সিনেমাগুলোর ব্যবসায় বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৬ সালে হলিউড বক্স অফিসে ঝড় তুলল যে চলচ্চিত্রগুলো তা মূলত প্রমাণ করে যে, দর্শক এখন নিখাদ বিনোদনের পাশাপাশি একদম নতুন ও চমকপ্রদ কনসেপ্ট দেখতে পছন্দ করছেন। তা ছাড়া ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দাপটের মাঝেও থিয়েটার বা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার যৌথ অভিজ্ঞতা পাওয়ার প্রবণতা এ বছর অনেক বেড়েছে।

ব্যাকরুমস (Backrooms)

ইন্টারনেটের জনপ্রিয় ‘ক্রিপিপাস্তা’ বা আরবান লেজেন্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি এই সিনেমাটি তরুণ দর্শকদের মাঝে ব্যাপক ক্রেজ তৈরি করে। A24 স্টুডিওর চেনা ঘরানার বাইরে গিয়ে এটি একটি মূলধারার হরর হিট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বিশ্বজুড়ে সাশ্রয়ী বাজেটে ৩৪৯.৭ মিলিয়ন ডলার ঘরে তোলে।

দ্য ম্যান্ডালোরিয়ান অ্যান্ড গ্রোগু (The Mandalorian & Grogu)

স্টার ওয়ার্স ফ্র্যাঞ্চাইজিকে বড় পর্দায় ফিরিয়ে আনার এই প্রয়াসটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেলেও বিশ্বজুড়ে এর ফ্যানবেসের কল্যাণে ভালোই ব্যবসা করেছে। এটি বিশ্বজুড়ে ৩৩৭.২ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে এ বছরের শীর্ষ আয়ের তালিকায় নিজের জায়গা পোক্ত করেছে।

সিনেমার নাম ডিস্ট্রিবিউটর বক্স অফিস স্ট্যাটাস ঘরানা
ব্যাকরুমস (Backrooms) A24 ৩৪৯.৭ মিলিয়ন ডলার (সুপারহিট) হরর / মিস্ট্রি
দ্য ম্যান্ডালোরিয়ান অ্যান্ড গ্রোগু ডিসনি ৩৩৭.২ মিলিয়ন ডলার (গড়পড়তা) সাই-ফাই / অ্যাকশন

শেষ কথা

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালটি হলিউড ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। অ্যানিমেশন, লাইভ-অ্যাকশন বায়োপিক কিংবা মহাকাশ বিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই নতুন নতুন রেকর্ডের জন্ম হয়েছে। আমরা দেখলাম কীভাবে ২০২৬ সালে হলিউড বক্স অফিসে ঝড় তুলল যে চলচ্চিত্রগুলো এবং বিশ্বব্যাপী সিনেমার বাজারকে চাঙ্গা করে তুলল। ভালো গল্প, নিখুঁত অভিনয় আর চমৎকার নির্মাণশৈলী থাকলে দর্শকরা যে এখনো প্রেক্ষাগৃহে এসে সিনেমাকে সফল করতে দ্বিধা করেন না, এই বছরটি তারই বড় প্রমাণ। সামনের বছরগুলোতেও হলিউড এই ধারা বজায় রাখবে বলেই সিনেমা বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা

১. ২০২৬ সালে হলিউডের সবচেয়ে বেশি আয়কারী সিনেমা কোনটি?

২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি আয় করেছে ইউনিভার্সাল পিকচার্সের অ্যানিমেশন মুভি ‘দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’। এটি এ বছরের একমাত্র সিনেমা হিসেবে ১ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পেরিয়ে শীর্ষ স্থান দখল করেছে।

২. মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক ‘মাইকেল’ কি পূর্বের রেকর্ড ভাঙতে পেরেছে?

হ্যাঁ, জাফর জ্যাকসন অভিনীত ‘মাইকেল’ সিনেমাটি পূর্বের সমস্ত মিូចিক্যাল বায়োপিকের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এটি ওপেনহাইমার এবং বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডিকে ছাড়িয়ে ইতিহাসের অন্যতম শীর্ষ আয়কারী বায়োপিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

৩. ২০২৬ সালে সবচেয়ে কম বাজেটে সবচেয়ে বেশি লাভ করা সিনেমা কোনটি?

এ বছর সবচেয়ে চমকপ্রদ সাফল্য দেখিয়েছে হরর-থ্রিলার মুভি ‘অবসেসশন’। মাত্র ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার বাজেটে নির্মিত এই সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ৪০৩ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছে, যা এ বছরের সেরা রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI)।

৪. ওটিটি বা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের প্রভাব এ বছর কেমন ছিল?

ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা সচল থাকলেও, ২০২৬ সালে বড় পর্দার সিনেমা দেখার প্রতি দর্শকদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে প্রজেক্ট হেইল মেরি বা মারিও গ্যালাক্সির মতো বড় ভিজ্যুয়ালের সিনেমাগুলো দেখার জন্য দর্শকরা থিয়েটারকেই বেছে নিয়েছেন।

সর্বশেষ