মাটির সোঁদা গন্ধ আর ভাটিয়ালি সুরের কথা উঠলেই অবধারিতভাবে চোখের সামনে ভেসে ওঠে একমুখ দাড়ি, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ আর হাতে একটি দোতারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাণোচ্ছল মানুষের ছবি। তিনি কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য। যাঁর ভরাট, উদাত্ত কণ্ঠস্বর শহুরে ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার মেঠো পথ পর্যন্ত এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল। আজ ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬—এই শেকড়সন্ধানী শিল্পীর ৫৬তম জন্মবার্ষিকী।
কালিকা প্রসাদ নিছক কোনো গায়কের নাম নয়; তিনি ছিলেন আমাদের ভুলে যাওয়া ঐতিহ্যের এক অক্লান্ত অভিযাত্রী। আসামের শিলচরের এক ছিমছাম সংস্কৃতিমনা পরিবার থেকে তাঁর যে পথচলার শুরু, তা পরবর্তীতে বাংলার লোকগানকে স্বমহিমায় পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বমঞ্চের আলোয়। বাউল, ভাটিয়ালি কিংবা ভাওয়াইয়ার মতো লোকায়ত সুরগুলো যখন আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যেতে বসেছিল, তখন তিনিই ধুলো ঝেড়ে সেগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে আপন করে তুলেছিলেন। আজকের এই বিশেষ দিনে দাঁড়িয়ে তাঁর জীবনের পাতাগুলো উল্টে দেখাটা কেবল একজন শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, বরং এ যেন নিজেদের শেকড়ের কাছেই আরেকবার ফিরে যাওয়ার এক আন্তরিক আহ্বান।
শিলচরের প্রারম্ভিক জীবন ও সঙ্গীতের শেকড়
১৯৭০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আসামের বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র শিলচরে জন্মগ্রহণ করেন কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য। তাঁর বেড়ে ওঠা এমন এক পরিবারে, যেখানে শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীতের অবাধ যাতায়াত ছিল। তাঁর বাবা ভব প্রসাদ ভট্টাচার্য ছিলেন পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক এবং নেশায় গভীর সংস্কৃতি অনুরাগী। বাবার হাত ধরেই কালিকার সঙ্গীতে প্রথম হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকেই বাড়ির আশেপাশে বসা লোকজ মেলা, বাউলের একতারা, আর কীর্তনের খোল-করতাল তাঁর শিশুমনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| জন্মস্থান | শিলচর, আসাম, ভারত |
| জন্মতারিখ | ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭০ |
| সাংস্কৃতিক পরিবেশ | বাংলা লোকগান, সাহিত্য ও শিল্পকলার মেলবন্ধন |
| পারিবারিক প্রভাব | বাবা ও আত্মীয়দের প্রবল উৎসাহ এবং সাঙ্গীতিক তালিম |
| লোকগানের প্রথম পাঠ | স্থানীয় মেলা, বাউল গান এবং কীর্তনের আসর |
শিলচরের পাঠ চুকিয়ে কালিকা প্রসাদ চলে আসেন কলকাতায়। ভর্তি হন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে। এরপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তাঁর এই ইতিহাসচর্চা তাঁর সঙ্গীতজীবনে এক অভাবনীয় মাত্রা যোগ করেছিল। তিনি কেবল একজন গায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির একজন নিষ্ঠাবান ঐতিহাসিক। গানের পেছনের মানুষ, মাটি আর সমাজব্যবস্থাকে তিনি ইতিহাসের আতশকাঁচ দিয়ে বিচার করতেন।
‘দোহার’ প্রতিষ্ঠা এবং লোকগানের বিশ্বযাত্রা
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ। কলকাতা তখন পাশ্চাত্যের ব্যান্ড সঙ্গীতে বুঁদ। ঠিক সেই সময়, ১৯৯৯ সালের ৭ আগস্ট কলকাতায় কালিকা প্রসাদ এবং তাঁর কয়েকজন সমমনা বন্ধু মিলে তৈরি করলেন ব্যান্ড ‘দোহার’। ‘দোহার’ শব্দের অর্থ হলো যারা মূল গায়কের সঙ্গে ধুয়ো ধরে বা কোরাস গায়। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল খুব স্পষ্ট এবং শক্তিশালী—গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে গান সংগ্রহ করা, মূল সুর বা স্রষ্টাকে পূর্ণ সম্মান জানানো এবং গানের আত্মার স্পন্দন না হারিয়ে সেগুলোকে আধুনিক মঞ্চে তুলে ধরা।
| বছর | মাইলফলক / প্রকাশনা (লেবেল) |
| ২০০১ | বন্ধুর দেশে (কনকর্ড রেকর্ডস ইন্ডিয়া) |
| ২০০২ | বাংলার গান শিকড়ের টান (সনি মিউজিক) |
| ২০০৪ | রূপসাগরে (সারেগামা) |
| ২০০৬ | বাংলা (সারেগামা) |
| ২০০৭ | ২০০৭ (সারেগামা) |
| ২০০৯ | মাটির স্বর (ওরিয়ন এন্টারটেইনমেন্ট) |
| ২০১১ | মাটির কেল্লা – মিউজিক্যাল ডকুমেন্টারি (সারেগামা) |
| ২০১২ | বাউল ফকিরের রবীন্দ্রনাথ (ওরিয়ন) |
| ২০১৩ | সহস্র দোতারা (ওরিয়ন) |
| ২০১৫ | উনিশের ডাক (পিকাসো এন্টারটেইনমেন্ট) |
কালিকা প্রসাদ শুধু গান গাইতেন না, তিনি হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতেন। শহুরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি যখন একতারা, দোতারা, খমক বা মাদল বাজিয়ে গান ধরতেন, তখন মনে হতো যেন বাংলার রাঢ় অঞ্চল বা পূর্ববঙ্গের কোনো নদীর পাড় খোদ উঠে এসেছে মঞ্চে। তাঁর এই অসামান্য উপস্থাপনার কারণে লোকগান কেবল বয়স্কদের নস্টালজিয়া না থেকে তরুণ প্রজন্মের প্লেলিস্টের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর নেতৃত্বে ‘দোহার’ ভারত ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং বাংলাদেশেও লোকগানের এই জাদু ছড়িয়ে দেয়।
বাংলার যে লোকজ ধারাগুলোকে তিনি বহন করেছেন

কালিকা প্রসাদের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের মাটির গানকে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছিলেন।
বাউল (আত্মানুসন্ধান ও মরমি ধারা)
বাউল গান মূলত আত্মানুসন্ধান এবং মানবদেহের ভেতরে থাকা ঈশ্বর বা “মনের মানুষ”-এর খোঁজ। ২০০৮ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে মানবজাতির অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (Intangible Cultural Heritage) স্বীকৃতি দেয়। কালিকা প্রসাদ লালন সাঁই, হাছন রাজা বা শাহ আবদুল করিমের দর্শনকে অত্যন্ত সহজ ভাষায় মঞ্চে ব্যাখ্যা করতেন।
| বিষয় | বিবরণ |
| মূল দর্শন | আত্মানুসন্ধান; “মনের মানুষ”-এর খোঁজ |
| ভৌগোলিক অঞ্চল | সমগ্র বাংলা, বিশেষভাবে কুষ্টিয়া ও বীরভূম |
| বাদ্যযন্ত্র ও সুর | একতারার ন্যূনতম সুর এবং কণ্ঠের গভীরতা |
| উল্লেখযোগ্য প্রভাব | লালন শাহের কালজয়ী পদাবলি |
ভাটিয়ালি (নদীমাতৃক বাংলার মাঝিদের গান)
ভাটিয়ালি হলো বিস্তীর্ণ নদী আর একাকিত্বের গান। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের নদীপথ ধরে এই গানের জন্ম। মাঝিরা যখন স্রোতের অনুকূলে বা ভাটিতে নৌকা ভাসিয়ে দিতেন, তখন হাতে অঢেল সময়। সেই অবসরে গলা ছেড়ে গাওয়া দীর্ঘ সুরের টানই হলো ভাটিয়ালি।
| বিষয় | বিবরণ |
| মূল অনুষঙ্গ | নদী, নৌকা, ঢেউ আর দিগন্ত |
| আবহ ও মেজাজ | একাকিত্ব, বিষাদ, বিরহ এবং আত্মমগ্নতা |
| পরিবেশনকারী | নদীর মাঝি বা মাল্লারা |
| বিশেষত্ব | প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের বয়ান |
ভাওয়াইয়া (উত্তরবঙ্গ ও আসামের শ্রমজীবী মানুষের সুর)
উত্তরের জেলাগুলো—বাংলাদেশের রংপুর, পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার এবং আসামের গোয়ালপাড়ায় ভাওয়াইয়ার জন্ম। এই গানে মিশে থাকে শ্রমজীবী মানুষের ঘাম আর কান্নার ইতিহাস। মাহুত, গাড়িয়াল বা মহিষালদের জীবনের দুঃখ, দীর্ঘ যাত্রা এবং ঘরে ফেলে আসা নারীদের বিরহ এই গানের মূল উপজীব্য।
| বিষয় | বিবরণ |
| ভৌগোলিক অঞ্চল | উত্তরবঙ্গ, রংপুর, গোয়ালপাড়া, কোচবিহার |
| গানের থিম | বিরহ, শ্রম, দীর্ঘ যাত্রা এবং অবদমিত কান্না |
| গায়কী শৈলী | দীর্ঘ ও ভাঙা সুরের মাধ্যমে গভীর আবেগ প্রকাশ |
ঝুমুর (লাল মাটির উৎসবের গান)
রাঢ় বাংলা বা পশ্চিমের জেলাগুলো—পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুরের পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশায় ঝুমুরের বিস্তার। পরবর্তীকালে চা বাগানের শ্রমিকদের হাত ধরে এটি উত্তরবঙ্গ ও আসামেও ছড়িয়ে পড়ে।
| বিষয় | বিবরণ |
| ভৌগোলিক অঞ্চল | রাঢ় বাংলা, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং চা বাগান অঞ্চল |
| সম্প্রদায় | কুর্মি-মাহাতো, ভূমিজ, ওঁরাও, মুন্ডা প্রভৃতি |
| আবহ | ছান্দিক, গোষ্ঠীগত, আনন্দমুখর এবং মাদলনির্ভর |
গানের কথা, মঞ্চের গল্প এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা
কালিকা প্রসাদের মঞ্চানুষ্ঠানগুলো ছিল এক একটি জীবন্ত পাঠশালা। তিনি গান গাওয়ার আগে গানের পেছনের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গল্প বলতেন। লোকগানকে তিনি কোনো জাদুঘরের নির্জীব বস্তু মনে করতেন না; তাঁর কাছে এটি ছিল বর্তমান সমাজের সঙ্গে কথা বলার একটি মাধ্যম।
| থিম বা মূল বিষয় | শ্রোতাদের জন্য বার্তা |
| নদী ও পরিযান | স্থানবদল, দূরত্ব, এবং নিজের শেকড়ে ফিরে আসার টান। |
| ভক্তি (আধ্যাত্মিকতা) | নীরব মানসিক শক্তি, সহনশীলতা এবং আত্মনিবেদন। |
| শ্রম ও ঋতু | বর্ষার রূপ, ফসল ঘরে তোলা এবং গ্রামীণ উৎসবের চিত্র। |
| প্রেম ও বিরহ | অনন্ত অপেক্ষা, চিঠি, পথ এবং ঘাটের নিখাদ গল্প। |
তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের সংগ্রাম, প্রান্তিক মানুষের অধিকার, নারীদের না-বলা কথা এবং পরিবেশ ধ্বংসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরতেন। “ভ্রমর কইয়ো গিয়া” গানে যখন তিনি নারীর অপেক্ষার কথা বলতেন, কিংবা “গাড়ি চলে না” গানে যখন জীবনের ভঙ্গুরতার কথা শোনাতেন, শ্রোতারা তাতে নিজেদের জীবনের প্রতিফলন দেখতে পেতেন।
অপরিহার্য কিছু গান ও রেকর্ডিং

যাঁরা কালিকা প্রসাদ এবং ‘দোহার’-এর কাজের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হতে চান, তাঁদের জন্য নিচের তালিকাটি একটি চমৎকার নির্দেশিকা হতে পারে।
| গানের শিরোনাম | গানের ধরন / অঞ্চল | আবেগ বা মূল বিষয় | কোথায় শুনবেন |
| কোথায় পাবো তারে | বাউল | আধ্যাত্মিক খোঁজ, “মনের মানুষ” | সারেগামা সিঙ্গেল; স্পটিফাই/ইউটিউব |
| আমার ভাঙা নাওয়ের | ভাটিয়ালি (নদী) | বর্ষার রূপ, ভঙ্গুর আশা এবং বিষাদ | ইউটিউবে ‘মাটির কেল্লা’ সিলেকশন |
| গাড়ি চলে না | শ্রম / লোকজ | জীবনের পথ, সংগ্রাম ও চলাচল | সারেগামা জুকবক্স (ইউটিউব) |
| জলে না যাইও | নদী / লোকজ | সতর্কতা, যত্ন ও দীর্ঘ যাত্রা | সারেগামা জুকবক্স (ইউটিউব) |
সঙ্গীতের বাইরে: একজন গবেষক, সংরক্ষক ও চিন্তাবিদ
কালিকা প্রসাদ বিশ্বাস করতেন, শেকড়ের গান সংরক্ষণ করা নিছক শখ নয়, এটি একটি চলমান সামাজিক লড়াই। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে ঘুরেছেন। সেখানকার বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পীদের কাছ থেকে গান রেকর্ড করেছেন, গানের উৎপত্তিস্থল ও স্রষ্টার নাম সযত্নে লিপিবদ্ধ করেছেন।
তাঁর এই সংরক্ষণ ও গবেষণার চূড়ান্ত রূপ ছিল ‘সহজ পরব’। কলকাতায় এই উন্মুক্ত লোকসঙ্গীত উৎসব আয়োজনের অন্যতম মূল কারিগর ছিলেন তিনি। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে তিনি গ্রামবাংলার অনামী শিল্পীদের শহুরে বিশাল মঞ্চে পরিবেশনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
| সংরক্ষণের স্তম্ভ | কাজের ধরন ও বিবরণ |
| মাঠপর্যায়ের কাজ | গানের উৎপত্তিস্থল, স্রষ্টা এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপটসহ গান সংগ্রহ করা। |
| শিক্ষাদান | বিভিন্ন কর্মশালা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং মঞ্চে ব্যাখ্যামূলক পরিবেশনা। |
| উন্মুক্ত উৎসব | ‘সহজ পরব’-এর মতো লোকজ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। |
| মেন্টরিং | নতুন গায়ক এবং বাদ্যযন্ত্রীদের উৎসাহিত করা ও পথ দেখানো। |
চলচ্চিত্র জগত: ‘ভুবন মাঝি’ এবং সেলুলয়েডে তাঁর পদচারণা
লোকগানের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও তাঁর কাজ ছিল অসামান্য। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ‘ভুবন মাঝি’। ফখরুল আরেফীন খান পরিচালিত এই ছবিটির প্রেক্ষাপট ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়কাল।
| বিষয় | বিবরণ |
| চলচ্চিত্রের নাম | ভুবন মাঝি (বাংলাদেশ) |
| মুক্তির তারিখ | ৩ মার্চ, ২০১৭ |
| কালিকা প্রসাদের ভূমিকা | সঙ্গীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী (“আমি তোমার ই নাম গাই”) |
| মূল অভিনয়শিল্পী | পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা ঘোষ |
| সঙ্গীতের বিশেষত্ব | যুদ্ধের নির্মমতার মাঝে বাউল দর্শন ও মানবতার গভীর মেলবন্ধন |
ছবিটি মুক্তির মাত্র কয়েকদিন পরই তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়। তাঁর করা “আমি তোমার ই নাম গাই” গানটি আজও দুই বাংলার শ্রোতাদের কাছে এক তীব্র আবেগের জায়গা দখল করে আছে।
২০২৬-এ দাঁড়িয়ে: শূন্যতা এবং এক চিরন্তন আবেদন
২০১৭ সালের ৭ মার্চ। হুগলী জেলার গুড়াপের কাছে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় মাত্র ৪৬ বছর বয়সী কালিকা প্রসাদের প্রাণ। এই মৃত্যু সংবাদ সমগ্র ভারত ও বাংলাদেশে এক গভীর শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছিল।
কিন্তু আজ, ২০২৬ সালের এই ৫৬তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি তাঁর শিল্পকে মুছে ফেলতে পারেনি; বরং ডিজিটাল যুগে তাঁর কাজের প্রাসঙ্গিকতা আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। এই বছরটি অত্যন্ত জাঁকজমক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হচ্ছে।
-
শিলচরের মেগা ফোক ফেস্ট: তাঁর নিজের শহর শিলচরে এ বছর স্কুলপড়ুয়া শিশুদের নিয়ে একটি বিশাল লোকসঙ্গীত উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। নতুন প্রজন্ম তাঁর গাওয়া গানগুলো নতুন করে শিখছে।
-
কলকাতার রবীন্দ্র সদনে বিশেষ কনসার্ট: কলকাতায় ফিউশন ব্যান্ড এবং মূলধারার লোকশিল্পীদের নিয়ে আয়োজিত হয়েছে এক স্মরণীয় শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান।
-
আন্তর্জাতিক অনলাইন সিম্পোজিয়াম: ঢাকা এবং লন্ডন থেকে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে তাঁর কাজ সংরক্ষণের ওপর একটি আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শেষ কথা
শিলচরের মাটি থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে বাংলার লোকগানকে যে মর্যাদার আসনে কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য বসিয়েছিলেন, তা এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। ৫৬তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ কেবল একজন শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং শেকড়ের সন্ধানে ছুটে চলা এক আজন্ম সাধককে ফিরে দেখা।
অকালপ্রয়াণ হয়তো তাঁর শারীরিক উপস্থিতি কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু ‘দোহার’-এর সুর আর বাংলার মেঠো গানের দর্শনের মধ্য দিয়ে তিনি অমর হয়ে আছেন। যতদিন বাংলার নদী, প্রান্তর আর লোকায়ত জীবনে সুরের ধারা বইবে, ততদিন কালিকা প্রসাদের সৃষ্টি আমাদের ধমনিতে স্পন্দিত হবে। মাটি ও মানুষের গানের যে উত্তরাধিকার তিনি রেখে গেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাবে— তাঁর ৫৬তম জন্মদিনে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও চিরন্তন বিশ্বাস।

