সময়ের পথপরিক্রমায় কিছু দিন খুব শান্তভাবে পার হয়ে যায়, আবার কিছু দিন ইতিহাসের পাতায় গভীর দাগ কেটে যায়। ১৯ ডিসেম্বর তেমনই একটি দিন। মহাদেশ থেকে মহাদেশে—এই দিনটি সাক্ষী হয়ে আছে ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী মুক্তি সংগ্রামের, রাজনৈতিক জবাবদিহিতার এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের। ভিক্টোরিয়ান সাহিত্য থেকে শুরু করে আধুনিক ক্রিসমাস সংস্কৃতি, এমনকি বড় বড় কূটনৈতিক চুক্তি—সবকিছুতেই এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।
বাঙালি ও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি মিলিয়ে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
বাঙালি ও ভারতীয় উপমহাদেশ
এই অঞ্চলের ইতিহাসে ১৯ ডিসেম্বর মূলত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন এবং আত্মত্যাগের দিন হিসেবে চিহ্নিত।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলি

এই অঞ্চলের ইতিহাসে ১৯ ডিসেম্বর মূলত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন এবং আত্মত্যাগের দিন হিসেবে চিহ্নিত। তবে এর বাইরেও রয়েছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব।
১৯৬১ — গোয়া মুক্তি দিবস (পর্তুগিজ শাসনের অবসান) ১৯৬১ সালের এই দিনে ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘অপারেশন বিজয়’-এর মাধ্যমে গোয়া, দমন ও দিউ থেকে দীর্ঘ ৪৫০ বছরের পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটায়।
-
কেন এটি আজও গুরুত্বপূর্ণ: ১৯৪৭ সালে মূল ভারত স্বাধীন হলেও ঔপনিবেশিকতার পুরোপুরি অবসান তখনো হয়নি। গোয়ার মুক্তি প্রমাণ করে যে শীতল যুদ্ধের সময়েও এই অঞ্চলে ঔপনিবেশিকতা বিরোধী লড়াই জারি ছিল। এটি আধুনিক ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের এক অনন্য উদাহরণ।
১৯২৭ — কাকোরি শহীদদের ফাঁসি: বিপ্লব ও আত্মত্যাগ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে এটি একটি শোকাবহ ও গর্বের দিন। ১৯২৭ সালের এই দিনে কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত মহান বিপ্লবী রাম প্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান এবং ঠাকুর রোশন সিং-কে ফাঁসি দেওয়া হয়। (রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ীকে এর আগেই ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল)।
-
কেন এটি আজও গুরুত্বপূর্ণ: হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বিপ্লবীদের এই যৌথ আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম কোনো একক সম্প্রদায়ের ছিল না। তাঁদের এই বলিদান আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করার প্রেরণা যোগায়।
বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু
-
জন্ম:
-
রাহাত খান (১৯৪০): বাংলাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। তিনি বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।
-
জাকিয়া বারী মম: বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও মডেল। লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার হিসেবে তার উত্থান।
-
-
মৃত্যু (শহীদ):
-
রাম প্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান ও ঠাকুর রোশন সিং (১৯২৭): ব্রিটিশ শাসকের হাতে ফাঁসির মঞ্চে জীবন দেওয়া এই বিপ্লবীরা উপমহাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে নক্ষত্র হয়ে আছেন।
-
আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি ও পর্যবেক্ষণ
বিশ্বজুড়ে ১৯ ডিসেম্বর দিনটি কূটনীতি, মানবাধিকার, মহাকাশ বিজ্ঞান এবং বিনোদন জগতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
রাজনীতি ও কূটনীতি
-
১৯৮৪ — সিনো-ব্রিটিশ যৌথ ঘোষণা (Sino-British Joint Declaration): চীন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে ১৯৯৭ সালে হংকং চীনের কাছে হস্তান্তরের পথ প্রশস্ত হয় এবং ‘এক দেশ, দুই নীতি’ (One Country, Two Systems) ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
-
১৯৯৮ — বিল ক্লিনটনের অভিশংসন (Impeachment): যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ (House of Representatives) প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে ইমপিচ বা অভিশংসিত করে। এটি মার্কিন সংবিধানের জবাবদিহিতার ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
- ২০১২ — দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট: পার্ক গিউন-হিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন, যা পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে লিঙ্গ সমতার ক্ষেত্রে একটি বড় ঘটনা ছিল।
মহাকাশ ও বিজ্ঞান
-
১৯৬৬ — মহাশূন্য চুক্তি (Outer Space Treaty): জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ মহাকাশ চুক্তির খসড়া গ্রহণ করে। এটি বর্তমান মহাকাশ আইনের ভিত্তি। এর মূল কথা হলো—মহাকাশ কোনো একক দেশের সম্পত্তি নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির সম্পদ।
-
১৯৭২ — অ্যাপোলো ১৭-এর প্রত্যাবর্তন: চাঁদে মানুষের শেষ অভিযানের (এখন পর্যন্ত) সমাপ্তি ঘটে এই দিনে। অ্যাপোলো ১৭ মিশনের নভোচারীরা প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করেন। এর মাধ্যমে নাসা তাদের অ্যাপোলো প্রোগ্রামের ইতি টানে।
-
১৯৭৪ — পার্সোনাল কম্পিউটারের যাত্রা: ‘অলতেয়ার ৮৮০০’ (Altair 8800) নামক মাইক্রোকম্পিউটারটি বিক্রির জন্য বাজারে আসে। একে অনেকেই ব্যক্তিগত কম্পিউটার বা পিসি বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে মনে করেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি
-
১৮৪৩ — চার্লস ডিকেন্সের ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’ প্রকাশ: চার্লস ডিকেন্সের কালজয়ী উপন্যাস A Christmas Carol প্রকাশিত হয়। এই বইটি আধুনিক বড়দিন উদযাপনের ধারণা (দানশীলতা, সহানুভূতি ও উৎসবমুখরতা) গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।
- ১৯৯৭ — টাইটানিক সিনেমার মুক্তি: জেমস ক্যামেরন পরিচালিত কালজয়ী সিনেমা Titanic যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পায়। এটি চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সফল সিনেমা যা বিশ্বজুড়ে পপ কালচারে বিশাল প্রভাব ফেলে।
দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা
-
২০১৬ — রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের হত্যাকাণ্ড: তুরস্কের আঙ্কারায় একটি প্রদর্শনীতে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কার্লভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এটি আধুনিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি বড় ধাক্কা ছিল।
-
২০১৬ — বার্লিন ক্রিসমাস মার্কেটে হামলা: জার্মানির বার্লিনে বড়দিনের বাজারে ট্রাক হামলায় বহু মানুষ হতাহত হন, যা ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনে।
উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক জন্ম ও মৃত্যু
জন্ম:
-
লিওনিদ ব্রেজনেভ (১৯০৬): সোভিয়েত ইউনিয়নের দীর্ঘসময়ের ও প্রভাবশালী নেতা।
-
এডিথ পিয়াফ (১৯১৫): ফরাসি গায়িকা ও সাংস্কৃতিক আইকন।
-
মিলেভা মারিক (১৮৭৫): সার্বিয়ান পদার্থবিদ এবং আলবার্ট আইনস্টাইনের প্রথম স্ত্রী ও সহগবেষক।
-
জ্যাক ইলেনহল (১৯৮০): আধুনিক হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা।
মৃত্যু:
-
এমিলি ব্রন্টি (১৮৪৮): ইংরেজি সাহিত্যের ধ্রুপদী উপন্যাস Wuthering Heights-এর রচয়িতা।
-
রবার্ট এ. মিলিকান (১৯৫৩): নোবেল বিজয়ী মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি ইলেকট্রনের চার্জ পরিমাপের জন্য বিখ্যাত।
শেষ কথা
১৯ ডিসেম্বর আমাদের শেখায় যে ইতিহাস কেবল রাজা-বাদশাহদের গল্প নয়। একদিকে গোয়ার মুক্তি ও কাকোরির বিপ্লব আমাদের শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, অন্যদিকে চার্লস ডিকেন্সের সাহিত্য আমাদের শেখায় সহমর্মী হতে। অতীত কোনো জাদুঘর নয়, এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা।


