২৯ ডিসেম্বর বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় এমন একটি দিন, যেখানে আনন্দ এবং বেদনা—উভয়ই তীব্রভাবে উপস্থিত। এটি সেই দিন যেদিন আধুনিক চীনা গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল, আবার এই দিনেই আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর নেমে এসেছিল ইতিহাসের অন্যতম নির্মম হত্যাযজ্ঞ। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, এটি সেই দিন যেদিন বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার রূপকারের জন্ম হয়, এবং বিশ্ব হারায় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ বা ফুটবলের রাজাকে।
লন্ডনের ‘ব্লিটজ’ এর ধোঁয়াচ্ছন্ন আকাশ থেকে শুরু করে ঢাকার মেট্রোরেল উদ্বোধনের আনন্দঘন মুহূর্ত—২৯ ডিসেম্বর কেবল ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখ নয়; এটি সহনশীলতা, শাসনব্যবস্থা এবং শিল্পের অমরত্বের এক জীবন্ত দলিল। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ, বিশিষ্ট জীবন এবং তাঁদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যের গভীরে প্রবেশ করব।
বাঙালি বলয়
২৯ ডিসেম্বরে ‘বাঙালি বলয়’-এর ইতিহাস আমাদের এই অঞ্চলের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক পরিপক্কতার গল্প বলে। এটি এমন একটি দিন যা বাঙালি সত্তার রূপকারদের সম্মান জানায়।
ঐতিহাসিক ঘটনা ও মাইলফলক
- ১৯১৪: শিল্পাচার্যের জন্ম (জয়নুল আবেদিন)
বাংলাদেশের জন্য এই দিনের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা হলো কিশোরগঞ্জে জয়নুল আবেদিন-এর জন্ম। তিনি কেবল একজন চিত্রশিল্পী নন; তিনি ‘শিল্পাচার্য’ বা শিল্পের মহান শিক্ষক। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের ওপর আঁকা তাঁর স্কেচগুলো হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী ছিল—যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অবহেলা এবং মানবিক বিপর্যয়ের নির্মম বাস্তবতাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিল।
-
-
আজকের তাৎপর্য: তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউট (তৎকালীন আর্ট ইনস্টিটিউট) প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অবদান বাংলাদেশের শিল্পকলাকে কেবল নান্দনিকতায় সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং একে সামাজিক প্রতিবাদ ও দলিলায়নের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
-
- ১৯৭১: বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত (ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ)
বিজয়ের মাত্র ১৩ দিন পর, ১৯৭১ সালের ২৯ ডিসেম্বর, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ জবাবদিহিতার পথে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর দ্বারা বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিত গণহত্যার তদন্তের জন্য সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রধান ছিলেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হান।
-
-
ট্র্যাজিক প্রেক্ষাপট: এই নিয়োগটি ছিল দেশের জন্য জহির রায়হানের শেষ অবদানগুলোর একটি। ঠিক এক মাস পর, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, নিখোঁজ ভাইয়ের সন্ধানে বের হয়ে তিনি নিজেই নিখোঁজ হন।
-
- ২০২২: মেট্রো যুগে প্রবেশ
যদিও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন আগের দিন হয়েছিল, ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ছিল সেই দিন, যেদিন ঢাকা মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন ৬) প্রথমবারের মতো সাধারণ জনগণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
-
-
প্রভাব: যানজটের জন্য কুখ্যাত একটি শহরের জন্য এটি ছিল মুক্তির মুহূর্ত। এটি বাংলাদেশকে আধুনিক বৈদ্যুতিক নগর পরিবহণ ব্যবস্থা থাকা দেশগুলোর কাতারে নিয়ে যায়।
-
- ১৮৪৪: উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে, এই দিনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন।
-
-
তাৎপর্য: উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তাঁর নেতৃত্ব ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
-
সংস্কৃতি ও উৎসব
-
হাকিম আজমল খানের মৃত্যু (১৯২৭): এই দিনে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ হাকিম আজমল খান মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ইউনানি চিকিৎসার পুনর্জাগরণ ঘটান এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
-
সাহিত্যের নক্ষত্র: কন্নড় সাহিত্যের প্রথম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজ বিজয়ী কবি কুভেম্পু (জন্ম ১৯০৪) এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম সর্বজনীন মানবতাবাদের ওপর জোর দেয়।
আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিন
- সংবিধান দিবস (আয়ারল্যান্ড): ১৯৩৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর একটি নতুন সংবিধান গ্রহণের মাধ্যমে ‘আইরিশ ফ্রি স্টেট’-এর পরিবর্তে সম্পূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্র ‘আয়ারল্যান্ড’ (বা আইরে) প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল ব্রিটিশ আধিপত্য থেকে বের হয়ে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের চূড়ান্ত ঘোষণা।
- স্বাধীনতা দিবস (মঙ্গোলিয়া): ১৯১১ সালের এই দিনে মঙ্গোলিয়া কুইং রাজবংশের শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে। বোগদ খানের সিংহাসনে আরোহণের মাধ্যমে শতবর্ষের পরাধীনতার পর মঙ্গোলীয় রাষ্ট্রীয় সত্তা পুনরুদ্ধার হয়।
- আন্তর্জাতিক সেলো দিবস (International Cello Day): এই দিনটি বিখ্যাত বাদ্যযন্ত্রী পাবলো ক্যাসালস-এর (জন্ম ১৮৭৬) জন্মবার্ষিকী স্মরণে পালিত হয়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতপ্রেমীরা এই দিনে সেলো বাদ্যযন্ত্রের গভীর ও গম্ভীর সুর উদযাপন করেন, যাকে প্রায়শই মানুষের কণ্ঠস্বরের সবচেয়ে কাছাকাছি বাদ্যযন্ত্র বলা হয়।
- টিক টক ডে (Tick Tock Day): বছরের শেষ প্রান্তে এসে এই দিনটি একটি মজার উপলক্ষ। এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে আর মাত্র দুদিন বাকি। অসমাপ্ত কাজগুলো—সেটা ট্যাক্স ফাইল করা হোক বা কারো সাথে বিবাদ মিটিয়ে ফেলা—নতুন বছর শুরুর আগেই শেষ করার তাগিদ দেয় এই দিনটি।
বিশ্ব ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্র: উউন্ডেড নি গণহত্যা (Wounded Knee Massacre)
-
১৮৯০: সাউথ ডাকোটার পাইন রিজ রিজার্ভেশনে যুক্তরাষ্ট্রের ৭ম ক্যাভালরি রেজিমেন্ট আত্মসমর্পণরত একদল লাকোটা আদিবাসীর ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।
-
ক্ষয়ক্ষতি: নারী ও শিশুসহ প্রায় ৩০০ লাকোটা আদিবাসী নিহত হন।
-
তাৎপর্য: এটি আমেরিকান ফ্রন্টিয়ার যুদ্ধের সমাপ্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়নের একটি নির্মম প্রতীক হিসেবে আজও বিবেচিত।
-
-
১৮৪৫: টেক্সাস আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে যুক্ত হয়। এই সংযুক্তি মেক্সিকান-আমেরিকান যুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল।
চীন: রাজবংশের পতন
-
১৯১১: এশীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত—নানজিংয়ে ড. সান ইয়াত-সেন চীন প্রজাতন্ত্রের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
-
তাৎপর্য: এই ঘটনা ২,০০০ বছরেরও বেশি সময়ের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অবসান ঘটায় এবং কুইং রাজবংশের পতন নিশ্চিত করে আধুনিক চীন গঠনের পথ সুগম করে।
-
যুক্তরাজ্য: গির্জায় হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিকাণ্ড
-
১১৭০: রাজা দ্বিতীয় হেনরির চারজন নাইট মিলে ক্যান্টারবরি ক্যাথেড্রালের ভেতরে আর্চবিশপ টমাস বেকেট-কে নির্মমভাবে হত্যা করে। বেকেট গির্জার স্বাধীনতায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন।
-
উত্তরাধিকার: তাঁর মৃত্যু তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে শহীদের মর্যাদায় আসীন করে এবং ক্যান্টারবরি ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে পরিণত হয়।
-
-
১৯৪০: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডন ‘সেকেন্ড গ্রেট ফায়ার’ বা দ্বিতীয় বৃহত্তম অগ্নিকাণ্ডের মুখোমুখি হয়। জার্মান বিমানবাহিনী হাজার হাজার বোমা ফেলে, যার ফলে ১৬৬৬ সালের পর লন্ডনে সবচেয়ে ভয়াবহ আগুনের সৃষ্টি হয়।
ইউরোপ: ভেলভেট বিপ্লবের বিজয়
-
১৯৮৯: চেকোস্লোভাকিয়ায় বিপ্লবের বছরটি বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়। নাট্যকার ও ভিন্নমতাবলম্বী ভাকলাভ হ্যাভেল, যাকে কমিউনিস্ট সরকার একসময় কারাবন্দী করেছিল, তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এটি ছিল রক্তপাতহীন ‘ভেলভেট বিপ্লব’-এর চূড়ান্ত সাফল্য।
বিশিষ্ট জন্ম ও মৃত্যু (আন্তর্জাতিক)
বিখ্যাত জন্ম
| নাম | বছর | জাতীয়তা | পরিচিতি |
| জয়নুল আবেদিন | ১৯১৪ | বাংলাদেশি | ‘শিল্পাচার্য’; বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার জনক। |
| অ্যান্ড্রু জনসন | ১৮০৮ | আমেরিকান | যুক্তরাষ্ট্রের ১৭তম রাষ্ট্রপতি; অভিশংসিত (impeached) হওয়া প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট। |
| মেরি টাইলার মুর | ১৯৩৬ | আমেরিকান | অভিনেত্রী, যিনি টেলিভিশনে নারীদের চরিত্রায়নে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। |
| জুড ল | ১৯৭২ | ব্রিটিশ | পুরস্কার বিজয়ী অভিনেতা (শার্লক হোমস, দ্য ট্যালেন্টেড মিস্টার রিপলি)। |
| পাবলো ক্যাসালস | ১৮৭৬ | স্প্যানিশ | সেলো বাদক ও কন্ডাক্টর; জাতিসংঘের শান্তি পদক প্রাপ্ত। |
| রাজেশ খান্না | ১৯৪২ | ভারতীয় | ভারতীয় সিনেমার “প্রথম সুপারস্টার”; রোমান্টিক চলচ্চিত্রের আইকন। |
বিখ্যাত মৃত্যু
| নাম | বছর | জাতীয়তা | কারণ/উত্তরাধিকার |
| পেলে | ২০২২ | ব্রাজিলিয়ান | কোলন ক্যান্সারে মৃত্যু। একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ৩টি বিশ্বকাপ জিতেছেন; সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত। |
| ভিভিয়েন ওয়েস্টউড | ২০২২ | ব্রিটিশ | ফ্যাশন ডিজাইনার যিনি পাঙ্ক এবং নিউ ওয়েভ ফ্যাশনকে মূলধারায় নিয়ে এসেছিলেন। |
| টমাস বেকেট | ১১৭০ | ইংরেজ | আর্চবিশপ ও সেন্ট; রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধর্মীয় প্রতিরোধের প্রতীক। |
| হ্যারল্ড ম্যাকমিলান | ১৯৮৬ | ব্রিটিশ | ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বি-ঔপনিবেশিকরণের (decolonization) নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। |
শেষ কথা
২৯ ডিসেম্বর মানব সভ্যতার এক আয়না স্বরূপ—যেখানে একই সাথে আমাদের সৃষ্টির অপার ক্ষমতা এবং ধ্বংসের নির্মম রূপ ফুটে ওঠে। এটি এমন একটি দিন যা আমাদের ইতিহাসের ক্যানভাসকে বড় পরিসরে দেখতে শেখায়; একদিকে জয়নুল আবেদিনের তুলির আঁচড় এবং পাবলো ক্যাসালস-এর সুরের মূর্ছনা, অন্যদিকে উউন্ডেড নি গণহত্যা বা লন্ডন ব্লিটজ-এর দগদগে ঘা।
ঢাকার ব্যস্ত মেট্রো স্টেশন থেকে শুরু করে ক্যান্টারবরি ক্যাথেড্রালের নিস্তব্ধ চত্বর পর্যন্ত—এই তারিখটি ভিন্ন ভিন্ন জগতকে এক সুতোয় গেঁথেছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কুইং রাজবংশের মতো সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে পারে, বাংলাদেশ বা ইউরোপের রাজনীতির মোড় ঘুরতে পারে, কিন্তু শিল্প, ন্যায়বিচার এবং সহনশীলতার উত্তরাধিকার চিরস্থায়ী। আমরা যখন নতুন গণতন্ত্রের জন্ম উদযাপন করি কিংবা পেলে-র মতো কিংবদন্তিকে বিদায় জানাই, তখন ইতিহাস আমাদের কানে কানে বলে যায়— দিন শেষে কেবল মানুষের কীর্তিই বেঁচে থাকে।


