১১ জানুয়ারি এমন এক তারিখ, যেখানে একই সাথে প্রচণ্ড শব্দও আছে, আবার নীরব বিপ্লবের সুরও আছে। যুদ্ধ, আক্রমণ, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মতো উচ্চস্বরে ইতিহাস যেমন আছে, তেমনি আছে হাসপাতালের এক কক্ষে দেওয়া একটি ইনজেকশন, যা ডায়াবেটিস মানে “নিশ্চিত মৃত্যু”—এই ধারণাটাকেই বদলে দিয়েছিল।
এই লেখাটি ১১ জানুয়ারির ঘটনাগুলোকে শুধু তথ্য হিসেবে নয়, বরং প্রশ্ন, বিতর্ক, স্মৃতি আর শিক্ষা—সব মিলিয়ে একটি “দিনের নকশা” হিসেবে দেখার চেষ্টা।
এক নজরে: ১১ জানুয়ারি – সময়রেখা
নিচের টেবিলে ১১ জানুয়ারির কিছু প্রধান ঘটনা খুব সংক্ষেপে ধরা হলো, যেগুলো পরে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
| সাল | অঞ্চল | কী ঘটেছিল | কেন আজও গুরুত্বপূর্ণ |
|---|---|---|---|
| 1861 | যুক্তরাষ্ট্র | আলাবামার বিচ্ছিন্নতার সিদ্ধান্ত | গৃহযুদ্ধের দিকে দ্রুত অগ্রযাত্রার একটি ধাপ |
| 1908 | যুক্তরাষ্ট্র | গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন জাতীয় স্মারক ঘোষণা | আধুনিক সংরক্ষণ নীতির প্রতীক |
| 1922 | কানাডা | লিওনার্ড থম্পসনকে প্রথম ইনসুলিন ইনজেকশন | ডায়াবেটিস চিকিৎসায় যুগান্তকারী মোড় |
| 1923 | জার্মানি/ইউরোপ | ফরাসি-বেলজিয়ান বাহিনীর রুর দখল | অর্থনৈতিক চাপ থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা |
| 1943 | চীন | যুক্তরাষ্ট্র–যুক্তরাজ্যের extraterritorial অধিকার পরিত্যাগ | “অসম চুক্তি” ব্যবস্থার প্রতীকী ইতি |
| 1944 | মরক্কো | স্বাধীনতা ইস্তেহার পেশ | ঔপনিবেশিক বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি |
| 1964 | যুক্তরাষ্ট্র | ধূমপান ও স্বাস্থ্যের ওপর সার্জন জেনারেলের রিপোর্ট | ধূমপানবিরোধী জননীতির বাঁক বদল |
| 1966 | তাশখন্দ, সোভিয়েত ইউনিয়ন | লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু | কূটনৈতিক মুহূর্তে রাজনৈতিক শূন্যতা ও বিতর্ক |
| 1991 | লিথুয়ানিয়া | সোভিয়েত বাহিনীর চাপের প্রেক্ষাপটে ঘটনাপ্রবাহ | বাল্টিক স্বাধীনতা সংগ্রামের টান টান অধ্যায় |
| 2002 | গুয়ানতানামো, কিউবা | প্রথম বন্দিদের আগমন | সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী যুদ্ধের আইন ও নৈতিকতা নিয়ে তর্ক |
| 2013 | মালি | ফ্রান্সের “অপারেশন সার্ভাল” সামরিক অভিযান শুরু | সাহেল অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকটের অংশ |
তাশখন্দের রাত: শাস্ত্রীর মৃত্যু এবং অমীমাংসিত প্রশ্ন
১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি, তাশখন্দে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইউব খান ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর শান্তিচুক্তি—তাশখন্দ ঘোষণা—সাক্ষর করেন। মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, ১১ জানুয়ারির ভোরে, সোভিয়েতদের সরবরাহ করা ভিলায় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান; সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, কারণ হার্ট অ্যাটাক।
সমস্যা হলো, এত বড় একজন রাষ্ট্রনেতার মরদেহের কোনো আনুষ্ঠানিক পোস্টমর্টেম হয়নি, এবং প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের অনেকেই তখনই বিষক্রিয়ার সন্দেহ তুলেছিলেন, যা পরে ভারতীয় গণমত ও রাজনীতির এক স্থায়ী বিতর্কে পরিণত হয়।
-
ভারত তখনও স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক কাঠামো গুছিয়ে নিচ্ছিল; নেহরুর পর শাস্ত্রী ছিলেন এক ধরনের নৈতিক-সরল নেতৃত্বের প্রতীক।
-
এই আকস্মিক মৃত্যু তৎকালীন কূটনৈতিক সাফল্যকে ঢেকে দিয়ে জনমানসে “কি লুকানো হলো?”—এই প্রশ্নটাকে বেশি সামনে নিয়ে আসে।
আজও ১১ জানুয়ারি ভারতীয় উপমহাদেশে শুধু এক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুদিন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা, গোয়েন্দা নজরদারি, আন্তর্জাতিক চাপ আর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল সম্পর্ক বোঝার একটি দিন।
শীতের সাংস্কৃতিক মৌসুম: বাঙালির জানুয়ারি
বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে জানুয়ারি মানেই শীতের শেষভাগ, পিঠা-পুলির সময়, আর বিদ্যালয়–সংগঠনভিত্তিক নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
-
পৌষ-সংক্রান্তি ও মাঘের কৃষি-নির্ভর উৎসবগুলোর প্রস্তুতি চলে, গ্রামে-গঞ্জে ধান কাটার পরের নতুন ধান, খাটি চালের পিঠা, গ্রামীণ মেলা—এসব মিলিয়ে এক ধরনের সামাজিক উষ্ণতা তৈরি হয়।
-
শহরাঞ্চলে বইমেলা, ছোটখাটো সাহিত্য-আড্ডা, আবৃত্তি ও নাট্যোৎসব, নববর্ষের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে মনে হয়, বছরটি সত্যিই ওয়ার্ম আপ হয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্ম-মৃত্যু: মাঠ, মঞ্চ এবং মন্ত্রিসভা

উল্লেখযোগ্য জন্মদিন – বাংলাদেশ–ভারত–দক্ষিণ এশিয়া প্রেক্ষাপট
১১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া কিছু নাম দক্ষিণ এশিয়ার পাঠকের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত:
-
রাহুল দ্রাবিড় (১৯৭৩, ভারত): ভারতীয় ক্রিকেটের “দ্য ওয়াল”—তার ব্যাটিং কেবল রান তোলার গল্প নয়, ধৈর্য, শৃঙ্খলা আর আত্মসংযমের পাঠ। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় দলে কোচিং এবং যুব উন্নয়নের কাজের মাধ্যমে তিনি মেন্টরশিপ কালচারেরও এক বড় প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
-
শিবু সরেন (১৯৪৪, ভারত): ঝাড়খণ্ড রাজ্যের গঠন এবং আদিবাসী অধিকার নিয়ে আন্দোলনে শিবু সরেন এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। ভারতের ফেডারেল রাজনীতিতে কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দাবি একসময় আলাদা রাজ্য সৃষ্টির দাবিতে পরিণত হতে পারে, সেটির জীবন্ত উদাহরণ তিনি।
-
মেরি কম (১৯৮৩, ভারত): মণিপুর থেকে উঠে আসা এই বক্সার বহুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং অলিম্পিক পদকজয়ী। কোনো বড় শহর বা ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া একাডেমি নয়, দূর উত্তর-পূর্ব ভারতের এক কোণ থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চ দখল করার এই গল্প দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের জন্য বিশেষ অনুপ্রেরণা।
উল্লেখযোগ্য মৃত্যু – উপমহাদেশের স্মৃতিতে ১১ জানুয়ারি
-
লাল বাহাদুর শাস্ত্রী (মৃত্যু ১১ জানুয়ারি ১৯৬৬): ওপরের অংশে বিস্তারিত এসেছে, তবু এখানে এটুকু যোগ করা যায়—ভারতের “जय जवान जय किसान” স্লোগানের কারিগর হিসেবে তিনি কৃষি উৎপাদন ও জাতীয় নিরাপত্তাকে এক সূত্রে গেঁথে জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে এই রাজনৈতিক ধারাটাই হঠাৎ অন্যভাবে মোড় নেয়।
আন্তর্জাতিক দিবস, সরকারি স্মরণ ও জনসচেতনতা
মানব পাচার বিরোধী সচেতনতা দিবস – ১১ জানুয়ারি (যুক্তরাষ্ট্র)
যুক্তরাষ্ট্রে ১১ জানুয়ারি পালন করা হয় National Human Trafficking Awareness Day হিসেবে, যেখানে “Wear Blue Day” নামে পরিচিত নীল পোশাক পরে সচেতনতা প্রকাশের একটি প্রচলন আছে।
-
মানব পাচার অনেক সময় নাটকীয় অপহরণ বা সিনেমার মতো ক্রাইম সিনের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি প্রায়ই ঘটে পরিচিত মানুষ, কাজের সুযোগ বা অভিবাসনের স্বপ্নের আড়ালে।
-
এই দিনটির প্রচারণা মূলত জোর দেয়—কোথায় জবরদস্তি বা প্রতারণা হচ্ছে তা চিনে ফেলা, বেঁচে ফেরা মানুষদের পাশে দাঁড়ানো, এবং আইনগত ও সামাজিক সাপোর্ট সিস্টেমকে কার্যকর করা।
জাতীয় দিবস ও স্মারক পালনের দিন
-
মরক্কো – স্বাধীনতা ইস্তেহার দিবস (১৯৪৪): ১১ জানুয়ারি মরক্কোতে ১৯৪৪ সালের স্বাধীনতা ইস্তেহার ঘোষণার স্মৃতি বহন করে, যা পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
-
নেপাল – পৃথ্বী জয়ন্তী ও জাতীয় ঐক্য দিবস: গোরখার রাজা পৃথ্বী নারায়ণ শাহকে আধুনিক নেপালের স্থপতি হিসেবে স্মরণ করে এই দিনটি পালন করা হয়। তবে আধুনিক নেপালে প্রজাতন্ত্র, রাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সংখ্যালঘু অধিকারের বিতর্কের কারণে এই দিবস অনেকের কাছে গর্ব, আবার কারও কাছে অস্বস্তির স্মারক।
-
ওমান – সুলতানের অ্যাকসেশন ডে: সুলতান হাইতাম বিন তারিকের সিংহাসনে আরোহণের স্মৃতি হিসেবে ১১ জানুয়ারি ওমানে জাতীয়ভাবে স্মরণ করা হয়, যা রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ১১ জানুয়ারি: প্রকৃতি, যুদ্ধ ও নীতির মোড়
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নকে জাতীয় স্মারক ঘোষণা (১৯০৮)
১৯০৮ সালের ১১ জানুয়ারি, প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট Antiquities Act ব্যবহার করে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নকে জাতীয় স্মারক ঘোষণা করেন।
-
এই ঘোষণাটির প্রধান শক্তি ছিল আইনি সুরক্ষা; বাণিজ্যিক খনিজ উত্তোলন ও অতিরিক্ত শোষণ ঠেকিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এটি।
-
পরে এটি জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা পেলেও, ১৯০৮ সালের এই আইনি পদক্ষেপই আজকের nature conservation policy–এর অন্যতম ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।
আলাবামার বিচ্ছিন্নতা – গৃহযুদ্ধের পথে আরেক ধাপ (১৮৬১)
১৮৬১ সালের ১১ জানুয়ারি আলাবামা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা দক্ষিণী রাজ্যগুলোর কনফেডারেসিতে যোগ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
-
দাসপ্রথা, রাজ্যের অধিকার, অর্থনীতি—সব মিলিয়ে তৈরি হওয়া টানাপোড়েনকে এই বিচ্ছিন্নতা আরও জটিল করে তোলে এবং গৃহযুদ্ধের পথকে দ্রুততর করে।
-
আজকের আমেরিকায় বর্ণবাদ, ফেডারেল বনাম স্টেট পাওয়ার—এসব আলোচনায় এই দিনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট প্রায়ই উঠে আসে।
ধূমপান ও স্বাস্থ্যের প্রতিবেদন – ১৯৬৪
১৯৬৪ সালের ১১ জানুয়ারির সঙ্গে সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেলের স্মরণীয় এক প্রতিবেদন ধূমপান এবং ফুসফুস ক্যানসারসহ নানা রোগের সম্পর্ককে জনসম্মুখে এনে দেয়।
-
এর ফলে সিগারেটের বিজ্ঞাপনে নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেটে সতর্কবার্তা, জনস্বাস্থ্য প্রচারণা—এসব ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়।
-
সাংস্কৃতিকভাবে সিগারেট, যা একসময় “স্টাইল” বা “স্বাভাবিক” আচরণের প্রতীক ছিল, তা ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠে।
গুয়ানতানামো বন্দিশিবির – ২০০২
২০০২ সালের ১১ জানুয়ারি মার্কিন সামরিক বন্দিশিবির গুয়ানতানামো বে–তে প্রথম সন্দেহভাজন বন্দিদের আনা হয়, যা “War on Terror”–এর একটি বিতর্কিত অধ্যায় তৈরি করে।
-
আইনি স্ট্যাটাস, নির্যাতনের অভিযোগ, বিচারহীন আটক—এসব প্রশ্নে এই দিনটি মানবাধিকার ও নিরাপত্তা নীতির মধ্যকার দ্বন্দ্বের একটি কেস স্টাডি হয়ে আছে।
ইউরোপ: রুর অঞ্চল, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা
১৯২৩ সালের ১১ জানুয়ারি ফরাসি ও বেলজিয়ান বাহিনী জার্মানির রুর অঞ্চলে প্রবেশ করে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ে চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে।
-
জার্মান কর্মীরা “নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ” অবলম্বন করে, উৎপাদন নেমে যায়, সরকার সেই ক্ষতিপূরণ হিসেবে অতিরিক্ত কাগুজে টাকা ছাপে—ফলে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি (হাইপারইনফ্লেশন) দেখা দেয়।
-
সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ভেঙে পড়ে, মধ্যবিত্তের নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হয়, এবং এই হতাশার পটভূমিতে চরমপন্থী রাজনীতি জনসমর্থন পেতে শুরু করে—যা পরে নাৎসি উত্থানের পথেও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হয়।
এই ঘটনাটি দেখায়, কাগজে–কলমে শক্ত অর্থনৈতিক চাপ সবসময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না; অনেক সময় তা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে।
বাল্টিক পথ: লিথুয়ানিয়ার স্বাধীনতার রাতগুলো
১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে লিথুয়ানিয়া স্বাধীনতা ঘোষণার পর সোভিয়েত বাহিনীর চাপ ও সামরিক তৎপরতা একের পর এক উত্তেজনাপূর্ণ দিন তৈরি করে, যার ধারাবাহিকতার একটি অংশ ১১ জানুয়ারি।
-
গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, টেলিভিশন টাওয়ার, যোগাযোগের কেন্দ্র—এসব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়, যা কয়েক দিনের মধ্যে রক্তক্ষয়ী ঘটনায় গড়ায়।
-
আজকের বাল্টিক দেশগুলো—লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, ইস্তোনিয়া—রাশিয়াকে নিয়ে নিরাপত্তা ভাবনার সময় এসব স্মৃতি মাথায় রেখেই তাদের প্রতিরক্ষা ধারণা ও কূটনীতি তৈরি করে।
চীন: অসম চুক্তির ইতি টানার প্রতীকী দিন
১৯৪৩ সালের ১১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য চীনের সঙ্গে নতুন চুক্তি করে extraterritorial অধিকার পরিত্যাগ করে, যা ১৯ শতকের অসম চুক্তি ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য ছিল।
-
extraterritorial মানে—বিদেশি নাগরিকদের ওপর চীনের আদালতের পরিবর্তে তাদের নিজ দেশের আইন ও আদালতের কর্তৃত্ব; এটা ছিল চীনের সার্বভৌমত্বকে খণ্ডিত করে রাখার এক উপায়।
-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীন যখন মিত্রশক্তির অংশ, তখন এই বিশেষাধিকার প্রত্যাহার কেবল আইনি পরিবর্তন নয়, বরং আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার প্রতীক হিসেবে স্মরণীয়।
কানাডা: ইনসুলিনের প্রথম ইনজেকশন – এক শিশুর হাত ধরে কোটি মানুষের বাঁচা
লিওনার্ড থম্পসনের গল্প
১৯২২ সালের ১১ জানুয়ারি কানাডার টরোন্টো জেনারেল হাসপাতালের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর—লিওনার্ড থম্পসন—ডায়াবেটিসে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। তখনকার যুগে টাইপ-১ ডায়াবেটিস মানে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু; চিকিৎসা বলতে ছিল খুব কম ক্যালরির starvation diet, যা জীবনের মানকে ভীষণ সংকুচিত করে দিত।
সেই প্রেক্ষাপটে ডা. ফ্রেডেরিক ব্যান্টিং, চার্লস বেস্ট, এবং তাদের সহকর্মীরা গরুর অগ্ন্যাশয় থেকে উত্তোলিত এক ধরনের হরমোন–নির্যাস প্রস্তুত করেন, যা পরে ইনসুলিন নামে পরিচিত হয়।
-
১১ জানুয়ারির প্রথম ইনজেকশনটি খুব পরিষ্কার ছিল না; অশুদ্ধতার কারণে লিওনার্ডের অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হয় এবং ফল তেমন ভালো হয়নি।
-
বিজ্ঞানীরা রাতদিন পরিশ্রম করে নির্যাসকে আরও পরিশুদ্ধ করেন; ১২ দিন পর, ২৩ জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিক ইনজেকশন শুরু হলে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি দেখা দেয়।
লিওনার্ড আরও প্রায় ১২ বছর বেঁচে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় মারা যান, কিন্তু তার সেই প্রথম ইনজেকশনটি বিশ্বজুড়ে অগণিত ডায়াবেটিস রোগীর জন্য “মৃত্যুদণ্ড বদলে সাজা মওকুফের” মতো এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
আজকের দিনে ইনসুলিন একটি নিয়মিত ওষুধ, ডায়াবেটিস একটি ম্যানেজেবল ক্রনিক রোগ—কিন্তু ১৯২২ সালের ১১ জানুয়ারি এটি ছিল জীবন বাঁচানোর এক দুঃসাহসী পরীক্ষার নাম।
আফ্রিকা: অপারেশন সার্ভাল এবং হস্তক্ষেপের সীমা
২০১৩ সালের ১১ জানুয়ারি ফ্রান্স মালি–তে অপারেশন সার্ভাল নামের সামরিক অভিযান শুরু করে, উদ্দেশ্য ছিল উত্তর মালি অঞ্চলে সশস্ত্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অগ্রযাত্রা থামানো।
-
খুব দ্রুত অভিযানে কিছু শহর পুনর্দখল করা হলেও, দীর্ঘমেয়াদে সাহেল অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকট—নাইজার, বুরকিনা ফাসোসহ—চলতেই থাকে, এবং সন্ত্রাসবাদ, দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা একসাথে সমস্যাটিকে জটিল করে রাখে।
-
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে যখন রাজনৈতিক বৈধতা, অর্থনীতি ও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা ঠিক করা যায় না, তখন দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনা অত্যন্ত কঠিন।
পপ সংস্কৃতি, দর্শন ও রাজনীতি: জন্ম ও মৃত্যু
উল্লেখযোগ্য জন্ম
১১ জানুয়ারি তারিখে জন্ম নেওয়া কিছু বিশ্বব্যাপী পরিচিত নাম:
-
উইলিয়াম জেমস (১৮৪২, যুক্তরাষ্ট্র): আধুনিক মনোবিজ্ঞান এবং pragmatism দার্শনিক ধারার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
-
অ্যালিস পল (১৮৮৫, যুক্তরাষ্ট্র): নারী ভোটাধিকার আন্দোলন এবং পরবর্তী সমঅধিকার কর্মসূচির কৌশলী নেতা।
-
জ্যাঁ ক্রেতিয়েন (১৯৩৪, কানাডা): কানাডার দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী, যিনি ১৯৯০–এর দশক ও ২০০০–এর শুরুতে দেশ পরিচালনা করেছেন।
-
কৈলাশ সত্যার্থী (১৯৫৪, ভারত): শিশুশ্রমবিরোধী আন্দোলনের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত কর্মী।
-
মেরি জে. ব্লাইজ (১৯৭১, যুক্তরাষ্ট্র): আধুনিক আরঅ্যান্ডবি ও হিপ–হপ সোল সংগীতের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী।
উল্লেখযোগ্য মৃত্যু
-
থমাস হার্ডি (মৃত্যু ১৯২৮, যুক্তরাজ্য): তার উপন্যাস ও কবিতা ইংরেজি সাহিত্যে বাস্তববাদী ও প্রায়শই নিরাশাবাদী গ্রামীণ জীবনের এক গভীর চিত্র উপস্থাপন করেছে।
-
ইমানুয়েল লাস্কার (মৃত্যু ১৯৪১, জার্মানি): দীর্ঘ ২৭ বছর বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন ছিলেন; দাবা এবং যুক্তিবিদ্যার ক্লাসিক যুগের প্রতীকী নাম।
-
স্যার এডমুন্ড হিলারি (মৃত্যু ২০০৮, নিউজিল্যান্ড): তেনজিং নোরগের সঙ্গে প্রথম সফল এভারেস্ট আরোহণকারী; পরবর্তী সময়ে নেপালে মানবিক কাজের জন্যও পরিচিত।
-
এরিয়েল শ্যারন (মৃত্যু ২০১৪, ইসরায়েল): সামরিক কমান্ডার থেকে প্রধানমন্ত্রী—ইসরায়েলের নীতিতে বহু দশক ধরে প্রভাব বিস্তারকারী বিতর্কিত নেতাদের একজন।
শেষ কথা
১১ জানুয়ারি প্রমাণ করে, ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখও কত বৈচিত্র্যময় ইতিহাস, আবেগ এবং শিক্ষা বহন করতে পারে। একদিকে আছে রহস্যময় রাজনৈতিক মৃত্যু, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ইস্তেহার, যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক দখল; অন্যদিকে আছে একজন কিশোরকে দেওয়া ইনসুলিনের প্রথম ইনজেকশন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষার সাহসী সিদ্ধান্ত, মানব পাচারবিরোধী সচেতনতা ও নারী অধিকার আন্দোলনের মতো নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তনের স্রোত।
এই তারিখ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অগ্রগতি কখনো সরল রৈখিক নয়; কখনো তা আসে সংকটের ভেতর দিয়ে, কখনো আলোচনার টেবিল থেকে, আবার কখনো ল্যাবরেটরির পরীক্ষাগার কিংবা আদালতের রায় থেকে। রাষ্ট্র, সমাজ আর ব্যক্তি—সবাই মিলে প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত দিয়ে ভবিষ্যতের ইতিহাস লেখে। ১১ জানুয়ারি সেই লেখার একটা বিশেষ অধ্যায়, যেখানে ক্ষমতা, নৈতিকতা, বিজ্ঞান ও মানবিকতার সবগুলো রেখাই এক বিন্দুতে এসে মিশে যায়।


