২১ জুলাই: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

ইতিহাস কখনোই হঠাৎ করে বা দুর্ঘটনাবশত তৈরি হয় না। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা উত্তেজনা, মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি এবং অদম্য সাহসের এক চূড়ান্ত পরিণতিই হলো ইতিহাস। আপনি যদি ইতিহাসের পাতায় ২১ জুলাই তারিখটির দিকে গভীরভাবে তাকান, তবে দেখতে পাবেন মানবজাতির বিজয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক মাইলফলকের এক অসাধারণ ও বৈচিত্র্যময় বুনন।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী প্রান্তর থেকে শুরু করে কুমেরুর (অ্যান্টার্কটিকা) হাড়কাঁপানো শীতলতা, কিংবা কলকাতার উত্তাল রাজনৈতিক রাজপথ থেকে চাঁদের নীরব বুক—২১ জুলাই এমন একটি দিন, যা বারবার আমাদের আধুনিক বিশ্বকে নতুন রূপ দিয়েছে। আমরা জানব এই বিশেষ দিনটিতে ঘটা যুগান্তকারী সব ঘটনা, স্মরণীয় মানুষদের জন্ম এবং বেদনাবিধুর মৃত্যুর কথা। চলুন ডুব দেওয়া যাক বাঙালি বলয় থেকে শুরু করে বিশ্ব ভূ-রাজনীতির গভীর ইতিহাসে।

বাঙালি বলয়: ইতিহাস ও সংগ্রাম

ভারত উপমহাদেশ, বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গের আগে ও পরের বাংলাজুড়ে রয়েছে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম, রাজনৈতিক আত্মত্যাগ এবং অসাধারণ সাংস্কৃতিক চর্চার এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। গণতন্ত্র এবং মাতৃভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে এই দিনটিতে বাংলার মানুষ যে অপরিসীম আত্মত্যাগ করেছে, তা আধুনিক ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ

  • ১৯৯৩ — কলকাতার শহীদ দিবস (Shahid Diwas): আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে এবং ভোট জালিয়াতি ঠেকাতে সচিত্র ভোটার আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক করার দাবিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যুব কংগ্রেসের হাজার হাজার কর্মী কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং (রাজ্য সচিবালয়) অভিমুখে বিশাল এক মিছিল বের করেন। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের নির্দেশে পুলিশ সেই মিছিলে ব্যাপক লাঠিচার্জ ও গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে ১৩ জন তরতাজা রাজনৈতিক কর্মী প্রাণ হারান। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি বাংলার রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে আমূল বদলে দেয় এবং ধীরে ধীরে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)-এর উত্থানের পথ প্রশস্ত করে। সেই শহীদদের স্মরণে আজও প্রতি বছর ২১ জুলাই কলকাতায় বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে ‘শহীদ দিবস’ পালন করা হয়।

  • ১৯৬৮ — করিমগঞ্জ ভাষা আন্দোলনের শহীদ: মাতৃভাষা বাংলার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম শুধু ১৯৫২ সালের ঢাকা বা ১৯৬১ সালের শিলচরেই থেমে থাকেনি। ১৯৬৮ সালের ২১ জুলাই আসামের করিমগঞ্জে অহমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হন দিব্যেন্দু ও জগন্ময়। আসামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিজেদের ভাষাগত ঐতিহ্য রক্ষার লড়াইয়ে তাদের এই আত্মত্যাগ আজও এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা।

বিখ্যাত জন্ম

  • আনন্দ বক্সী (জন্ম ১৯৩০): দেশভাগের আগে রাওয়ালপিন্ডিতে জন্মগ্রহণকারী আনন্দ বক্সী বড় হয়ে হিন্দি সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং জনপ্রিয় গীতিকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। চার দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বলিউডের হাজার হাজার জনপ্রিয় গানের কথা লিখেছেন, ৪০ বার ফিল্মফেয়ার মনোনয়ন পেয়েছেন এবং চারবার এই সম্মানজনক পুরস্কার জয় করেছেন।

  • চান্দু বোর্ডে (জন্ম ১৯৩৪): পুনেতে জন্মগ্রহণকারী ভারতের এই কিংবদন্তি ক্রিকেটার ছিলেন একাধারে দুর্ধর্ষ ব্যাটসম্যান এবং স্পিন বোলার। তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে ভারতের হয়ে ৫৫টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন এবং পরবর্তীতে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (BCCI) নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

বিখ্যাত মৃত্যু

  • উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (মৃত্যু ১৯০৬): তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম সারির একজন ব্যারিস্টার এবং প্রারম্ভিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক অবিসংবাদিত নেতা। ১৮৮৫ সালে বোম্বেতে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের (INC) উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি প্রথম সভাপতি হওয়ার বিরল সম্মান অর্জন করেন।

  • কায়কোবাদ (মৃত্যু ১৯৫১): তাঁর আসল নাম কাজেম আল কোরেশী। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকবি। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত তাঁর মহাকাব্য মহাশ্মশান আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়।

  • কর্নেল আবু তাহের (মৃত্যু ১৯৭৬): ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তিনি। বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী এই সামরিক নেতা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মূল কারিগর ছিলেন। পরবর্তীতে সামরিক ট্রাইব্যুনালের এক বিতর্কিত রায়ে ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়, যা বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত উত্তাল ও সমালোচিত অধ্যায়।

  • শিবাজি গণেশন (মৃত্যু ২০০১): ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাবান এবং বহুমুখী অভিনেতা হিসেবে তিনি সর্বজনস্বীকৃত। যদিও তিনি মূলত তামিল চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করেছেন, কিন্তু তাঁর শক্তিশালী ও আবেগময় অভিনয় ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত অভিনয়শিল্পীদের জন্যই এক অনুকরণীয় মানদণ্ড তৈরি করে দিয়েছিল।

সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক উৎসব

  • খর্চি পূজা (ত্রিপুরা): চান্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী তারিখ কিছুটা এদিক-ওদিক হলেও ঐতিহ্যবাহী এই হিন্দু উৎসবটি সাধারণত এই সময়েই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরায় উদযাপিত হয়। ১৪ জন দেবতার (চতুর্দশ দেবতা) আরাধনার এই উৎসবটি ত্রিপুরাবাসী এবং প্রতিবেশী বাংলার মানুষের মধ্যকার গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এক চমৎকার সেতুবন্ধন।

আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিন

সারা বিশ্বজুড়ে ২১ জুলাই দিনটি স্বাধীনতা, সম্প্রীতি এবং অনন্য সব সাংস্কৃতিক উৎসবের দিন হিসেবে পালিত হয়।

  • বেলজিয়ামের জাতীয় দিবস (Belgium): ১৮৩১ সালের এই দিনে রাজা প্রথম লিওপোল্ডের সিংহাসনে আরোহণকে স্মরণ করে দিনটি উদযাপন করা হয়। ১৮৩০ সালের বেলজিয়ান বিপ্লবের মাধ্যমে নেদারল্যান্ডস থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো সফলভাবে আলাদা হওয়ার পর লিওপোল্ড রাজা হিসেবে শপথ নেন, যার মাধ্যমে আধুনিক বেলজিয়াম রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

  • গুয়াম মুক্তি দিবস (Guam): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রশান্ত মহাসাগরীয় থিয়েটারে এটি একটি বিশাল মোড় ঘোরানো দিন। ১৯৪৪ সালের ২১ জুলাই মার্কিন বাহিনী গুয়ামের সমুদ্রসৈকতে অবতরণ করে এবং প্রায় তিন বছরের নির্দয় জাপানি সামরিক দখলদারিত্ব থেকে দ্বীপটিকে মুক্ত করার জন্য তীব্র লড়াই শুরু করে।

  • জাতিগত সম্প্রীতি দিবস (Singapore): ১৯৬৪ সালের ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গার মর্মান্তিক স্মৃতিকে স্মরণ করে সিঙ্গাপুর এই দিনটি পালন করে। একটি বহুজাতিক সমাজে সামাজিক শান্তি বজায় রাখা কতটা জরুরি এবং এর ভঙ্গুরতা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে স্কুল ও সামাজিক সংগঠনগুলো এদিন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

  • জাতীয় ল্যামিংটন দিবস (Australia): এটি অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত কেক উদযাপনের একটি দারুণ মজার দিন। চকোলেটে ডুবানো এবং নারকেলের গুঁড়োয় জড়ানো স্পঞ্জ কেক ‘ল্যামিংটন’ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে কুইন্সল্যান্ডের গভর্নর লর্ড ল্যামিংটনের জন্য প্রথম তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

বিশ্ব ইতিহাস: যুদ্ধ, মহাকাশ ও ভূ-রাজনীতি

বিশ্ব ইতিহাস

উপমহাদেশের বাইরেও ২১ জুলাই সাক্ষী হয়েছে চরম আবহাওয়া, মহাকাশ যাত্রার যুগান্তকারী সাফল্য, বিধ্বংসী যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক কূটচালের।

আমেরিকা: রক্তপাত, বিজ্ঞান এবং মহাকাশ

  • ১৮৬১ — ফার্স্ট ব্যাটল অফ বুল রান: ভার্জিনিয়ার মানাসাসের কাছে সংঘটিত এই যুদ্ধটি ছিল আমেরিকার গৃহযুদ্ধের প্রথম বড় আকারের স্থলযুদ্ধ। ইউনিয়ন (উত্তরাঞ্চলীয়) সেনাবাহিনী ভেবেছিল তারা খুব সহজেই কনফেডারেট (দক্ষিণাঞ্চলীয়) বিদ্রোহ দমন করে ফেলবে। কিন্তু জেনারেল “স্টোনওয়াল” জ্যাকসনের নেতৃত্বে কনফেডারেট বাহিনী তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ইউনিয়ন বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এই পরাজয় বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, গৃহযুদ্ধ অনেক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী হতে চলেছে।

  • ১৯২৫ — স্কোপস ‘মাঙ্কি ট্রায়াল’-এর সমাপ্তি: আমেরিকার ডেটন, টেনেসির একটি স্কুলে মানব বিবর্তনবাদ পড়ানোর কারণে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক জন টি. স্কোপসকে ১০০ ডলার জরিমানা করা হয়। এই বিচারকার্যটি পুরো জাতির মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল, কারণ এটি ছিল আধুনিক বিজ্ঞান ও কট্টর ধর্মীয় বিশ্বাসের এক সরাসরি সংঘাত। আইনিভাবে স্কোপস হেরে গেলেও, এই বিচারের ফলে শিক্ষাখাতে আধুনিক বিজ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

  • ১৯৬৯ — চাঁদের বুক থেকে অ্যাপোলো ১১-এর সফল উড্ডয়ন: নীল আর্মস্ট্রং ২০ জুলাই চাঁদে পা রাখলেও মহাকাশ যাত্রার ইতিহাসে ২১ জুলাই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদের মাটিতে ২১ ঘণ্টা কাটানোর পর, আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন তাদের লুনার মডিউল ‘ঈগল’-এর ইঞ্জিন চালু করেন। প্রথমবারের চেষ্টাতেই সফলভাবে ইঞ্জিন কাজ করে এবং তারা চাঁদের মাটি থেকে উড়ে গিয়ে কমান্ড মডিউলে অপেক্ষারত মাইকেল কলিন্সের সাথে যুক্ত হন। এটি প্রমাণ করেছিল যে, মানুষ শুধু অন্য গ্রহে যেতেই পারে না, সেখান থেকে নিরাপদে ফিরেও আসতে পারে।

রাশিয়া: চরম শীতলতা

  • ১৯৮৩ — পৃথিবীর শীতলতম তাপমাত্রা রেকর্ড: অ্যান্টার্কটিকার দুর্গম এলাকায় অবস্থিত সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ভস্তক স্টেশন‘-এ বিজ্ঞানীরা রেকর্ড করেন −১২৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা −৮৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা! এটি আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রাকৃতিকভাবে পরিমাপ করা সবচেয়ে কম তাপমাত্রা।

চীন: ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা

  • ১৯৯৫ — তৃতীয় তাইওয়ান প্রণালী সংকট: তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লি টেং-হুইয়ের আমেরিকা সফরের কড়া প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীন তাইওয়ান প্রণালীর চারপাশে ব্যাপক মিসাইল পরীক্ষা শুরু করে। ৯ মাস ধরে চলা এই উত্তেজনার জেরে আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর ওই অঞ্চলে তাদের সবচেয়ে বড় নৌবহর মোতায়েন করতে বাধ্য হয়।

যুক্তরাজ্য: ব্যর্থ সন্ত্রাসী হামলা

  • ২০০৫ — লন্ডনে ব্যর্থ বোমা হামলা: লন্ডনের ট্রানজিটে ভয়াবহ ৭/৭ হামলার ঠিক দুই সপ্তাহ পর, সন্ত্রাসীরা আবারও তিনটি আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন এবং একটি বাসে সমন্বিত বোমা হামলার চেষ্টা করে। কিন্তু অলৌকিকভাবে তাদের বোমার রাসায়নিক মিশ্রণ কাজ করেনি। শুধু ডেটোনেটরগুলো ছোট শব্দ করে ফুটেছিল, কিন্তু মূল বোমা ফাটেনি। ফলে কেউ হতাহত হয়নি এবং পুলিশ অপরাধীদের ধরতে সক্ষম হয়।

ইউরোপ: বিভাজন ও গুপ্তহত্যা

  • ১৯৪৪ — ক্লাউস ফন স্টাফেনবার্গের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: অ্যাডলফ হিটলারকে ব্রিফকেস বোমার সাহায্যে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা (যা অপারেশন ভ্যালকিরি বা ‘জুলাই ২০ প্লট’ নামে পরিচিত) করার অপরাধে জার্মান সেনা কর্মকর্তা ক্লাউস ফন স্টাফেনবার্গ এবং তার সহযোগীদের বার্লিনে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

  • ১৯৫৪ — ভিয়েতনাম বিভাজন: জেনেভা কনভেনশনের মাধ্যমে ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে ১৭তম সমান্তরাল রেখা বরাবর দুই ভাগে ভাগ করা হয়। উত্তরে কমিউনিস্ট ভিয়েত মিন এবং দক্ষিণে পশ্চিমা সমর্থিত সরকার। সাময়িক এই বিভাজনই পরবর্তীতে কয়েক দশকব্যাপী চলা ভয়াবহ ভিয়েতনাম যুদ্ধের বীজ বপন করেছিল।

অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা: অদম্য সাহস ও রহস্য

  • ১৯৪২ — কোকোদা ট্র্যাক ক্যাম্পেইন শুরু: পাপুয়ায় জাপানিদের অবতরণের পর অস্ট্রেলিয়ান বাহিনী প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধের অন্যতম কঠিন এক লড়াই শুরু করে। দুর্গম জঙ্গল এবং ভয়াবহ ম্যালেরিয়ার সাথে লড়াই করে তারা জাপানিদের অগ্রযাত্রা রুখে দেয়।

  • ১৬৬০ — নিউ ফ্রান্সের প্রথম আদমশুমারি: কানাডায় (তৎকালীন নিউ ফ্রান্স) প্রথম সরকারি আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মাত্র ৩,৪১৮ জন অধিবাসীর খোঁজ পাওয়া যায়।

  • ১৯৫১ — ফ্লাইট ৩৫০৫-এর রহস্যজনক অন্তর্ধান: ভ্যাঙ্কুভার থেকে টোকিওগামী কানাডিয়ান প্যাসিফিক এয়ারলাইন্সের একটি বিমান প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ৩৭ জন আরোহীসহ চিরতরে নিখোঁজ হয়। আজও বিমানটির কোনো খোঁজ মেলেনি।

বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত

  • ১৭৯৮ — পিরামিডের যুদ্ধ: নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তাঁর মিশর অভিযানের সময় কায়রোর কাছে মামলুক বাহিনীকে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেন।

  • ১৯৬০ — বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী: সিলনের (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) সিরিমাভো বন্দরনায়েকে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান হওয়ার ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেন।

  • ১৯৭০ — আসোয়ান হাই ড্যামের সমাপ্তি: সোভিয়েত প্রকৌশলের সহায়তায় ১১ বছর ধরে তৈরি করা মিশরের এই বিশাল বাঁধটির নির্মাণকাজ শেষ হয়, যা নীল নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।

বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বদের জন্ম ও মৃত্যু

সাহিত্য, শিল্প ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ২১ জুলাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।

বিখ্যাত জন্ম

  • আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (১৮৯৯): সাহিত্যে নোবেলজয়ী এই মার্কিন সাহিত্যিক তাঁর ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ এবং ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টির জন্য অমর হয়ে আছেন।

  • রবিন উইলিয়ামস (১৯৫১): অস্কারজয়ী এবং প্রজন্মের অন্যতম সেরা এক কমেডিয়ান। তাঁর তাৎক্ষণিক হাস্যকৌতুক এবং ‘গুড উইল হান্টিং’ বা ‘ডেড পোয়েটস সোসাইটি’-এর মতো সিনেমায় তাঁর গভীর আবেগপূর্ণ অভিনয় বিশ্বজুড়ে আজও ভক্তদের হৃদয়ে অমলিন।

  • ক্যাট স্টিভেন্স / ইউসুফ ইসলাম (১৯৪৮): বিখ্যাত ব্রিটিশ গায়ক ও গীতিকার, যাঁর “ফাদার অ্যান্ড সন”-এর মতো গানগুলো সত্তর দশকের ফোক-পপ সঙ্গীতকে নতুন রূপ দিয়েছিল।

  • এছাড়া ভাস্কর আলেকজান্ডার ক্যাল্ডার (১৮৯৮) এবং আমেরিকার প্রথম নারী অ্যাটর্নি জেনারেল জ্যানেট রেনোর (১৯৩৮) জন্মও এই দিনে।

বিখ্যাত মৃত্যু

  • রবার্ট বার্নস (১৭৯৬): স্কটল্যান্ডের জাতীয় কবি, যাঁর লেখা “ওল্ড ল্যাং সাইন” গানটি আজও নববর্ষের রাতে বিশ্বজুড়ে গাওয়া হয়।

  • অ্যালান শেপার্ড (১৯৯৮): ১৯৬১ সালে মহাকাশে যাওয়া প্রথম আমেরিকান নভোচারী। পরবর্তীতে তিনি চাঁদের মাটিতে গলফ খেলে ইতিহাস গড়েন।

  • টনি বেনেট (২০২৩): কিংবদন্তি আমেরিকান জ্যাজ ও পপ সঙ্গীতশিল্পী, যিনি তাঁর আট দশকের ক্যারিয়ারে ২০টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জয় করেন।

  • এছাড়া ব্রিটিশ অভিনেতা ব্যাসিল র্যাথবোন (১৯৬৭) এই দিনেই মৃত্যুবরণ করেন।

“আপনি কি জানতেন?” – কিছু দারুণ তথ্য

আড্ডায় চমক দেওয়ার মতো কিছু তথ্য খুঁজছেন? চলুন জেনে নিই ২১ জুলাইয়ের কিছু অজানা মাইলফলক:

  • গতির সেঞ্চুরি: ১৯০৪ সালের ২১ জুলাই ফরাসি নাগরিক লুই রিগোলি প্রথম মানুষ হিসেবে ঘণ্টায় ১০০ মাইল বেগে গাড়ি চালান। ঠিক ২১ বছর পর, ১৯২৫ সালের একই দিনে ম্যালকম ক্যাম্পবেল ঘণ্টায় ১৫০ মাইলের বাধা অতিক্রম করেন।

  • পারমাণবিক জাহাজ: ১৯৫৯ সালে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক শক্তিচালিত বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী ও কার্গো জাহাজ ‘এনএস সাভানা’ সফলভাবে জলে ভাসানো হয়।

  • মহাকাশে সাহিত্যের ছোঁয়া: আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জন্ম এবং অ্যাপোলো ১১-এর চাঁদের মাটি ছাড়ার দিনটি একই (২১ জুলাই)। অদ্ভুত এক সমাপতন হিসেবে চাঁদের বুকে থাকা একটি ক্রেটার বা গহ্বরের নাম রাখা হয়েছে “হেমিংওয়ে”!

শেষ কথা

২১ জুলাইয়ের এই ঘটনাপ্রবাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কেবল কিছু তারিখের নীরস তালিকা নয়; এটি একটি চলমান, প্রাণবন্ত আখ্যান। কলকাতার রাজপথের আত্মত্যাগ থেকে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার তীব্র শীত, এবং অ্যাপোলো ১১-এর দুঃসাহসিক অভিযান—এই দিনটি মানুষের সহনশীলতা ও স্বপ্নের বিশালত্বকে ধারণ করে আছে। এই দিনেই জন্ম নিয়েছেন সাহিত্যিকরা, শুরু হয়েছে বিধ্বংসী যুদ্ধ, আবার এই দিনেই অনেক দেশ হেঁটেছে মুক্তির পথে।

২১ জুলাইয়ের এই ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় চোখ রাখলে আমরা আমাদের বর্তমান বিশ্বকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। ইতিহাস প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশেই তৈরি হচ্ছে—আর ২১ জুলাই আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, ক্যালেন্ডারের একটি মাত্র দিনও ভবিষ্যৎ পৃথিবীর গতিপথ চিরতরে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

সর্বশেষ