ইতিহাস কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা কিছু প্রাণহীন তারিখের সমষ্টি নয়; এটি মানবজাতির সংগ্রাম, বিজয়, হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি, নীরবে ঘটে যাওয়া বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এবং সরবে এগিয়ে চলা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত ক্যানভাস। একজন ইতিহাসবিদ এবং সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী হিসেবে, আমি আপনাকে সময়ের পাতা উল্টে একটি বিশেষ এবং অসাধারণ দিনের গভীরে প্রবেশ করার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি—দিনটি হলো ২৫শে জুলাই।
শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে এই দিনটির দিকে গভীরভাবে তাকালে একটি বিস্ময়কর এবং চিত্তাকর্ষক প্যাটার্ন বা ধরন আমাদের চোখে পড়ে। ২৫শে জুলাই হলো আমূল পরিবর্তনের একটি দিন। এটি এমন একটি দিন যেদিন ফোক মিউজিক তার বৈদ্যুতিক স্পন্দন খুঁজে পেয়েছিল, যেদিন মানুষ প্রথমবারের মতো মহাকাশ স্টেশনের বাইরে শূন্যে পা রেখেছিল এবং যেদিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র মৌলিকভাবে বদলে গিয়েছিল।
এই বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা ২৫শে জুলাই ঘটে যাওয়া সেই যুগান্তকারী ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে একটি যাত্রা করব। পশ্চিমা-কেন্দ্রিক আখ্যানের বাইরে গিয়ে আমরা বাঙালি পরিমণ্ডলের গভীর ইতিহাস অন্বেষণ করব, বিশ্বজুড়ে জন্ম নেওয়া ও বিদায় নেওয়া কিংবদন্তিদের স্মরণ করব এবং এমন কিছু অজানা তথ্য উন্মোচন করব যা আজও আমাদের আধুনিক বিশ্বকে আকার দিয়ে চলেছে।
বাঙালি পরিমণ্ডলে ২৫শে জুলাই
ভারতীয় উপমহাদেশের রয়েছে এক বিশাল এবং জটিল ইতিহাস, যা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, সাংস্কৃতিক নবজাগরণ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশের জন্যই ২৫শে জুলাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা একদিকে স্বাধীনতার মূল্য এবং অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের বিজয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
১৯৭১: বাংলাদেশের সোহাগপুর গণহত্যা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের ভয়াবহ দিনগুলোতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর এক পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ চালায়, যার ফলে অসংখ্য বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং প্রায় এক কোটি মানুষ প্রতিবেশী ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে জুলাই, এই বর্বরোচিত অভিযান শেরপুর জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম সোহাগপুরে এসে পৌঁছায়। এক সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসররা মিলে ১৮৭ জন নিরস্ত্র নিরপরাধ পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং গ্রামের নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়।
এই ধ্বংসযজ্ঞ এতটাই চরম ছিল যে, পরবর্তীকালে সোহাগপুর গ্রামটি বেদনাসিক্তভাবে “বিধবাপল্লী” নামে পরিচিতি লাভ করে। আজ, ২৫শে জুলাইকে স্মরণ করা মানে একটি স্বাধীন ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ জন্মের জন্য সাধারণ বাঙালি নাগরিকদের সেই অসীম আত্মত্যাগকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে সম্মান জানানো।
ভারতের রাষ্ট্রপতিদের শপথ গ্রহণের ঐতিহ্য
সীমান্তের ওপারে ভারতে ২৫শে জুলাই দিনটি গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শনে পরিপূর্ণ। ১৯৭৭ সালে, ‘জরুরি অবস্থা’ (The Emergency) নামক এক তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতার পর, নীলম সঞ্জীব রেড্ডি ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঠিক এই দিনে শপথ গ্রহণ করেন। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের প্রতিটি রাষ্ট্রপতি ঠিক ২৫শে জুলাই তারিখেই শপথ নিয়ে আসছেন। এই অসাধারণ এবং নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহ্যের অংশ হয়েছেন এ.পি.জে. আবদুল কালাম (২০০২), প্রণব মুখার্জি (২০১২) এবং দ্রৌপদী মুর্মুর (২০২২) মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বরা। বিশেষ করে উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ২৫শে জুলাই প্রতিভা পাতিল শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু: উপমহাদেশের প্রেক্ষাপট
বিখ্যাত জন্ম: বসন্ত বাপট (১৯২২)
মহারাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বসন্ত বাপট ছিলেন মারাঠি সাহিত্য ও কবিতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তবে তিনি কেবল একজন পণ্ডিত বা কবিই ছিলেন না; ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর ডাকা ‘ভারত ছাড়ো’ (Quit India) আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং কারাবরণ করেন। তাঁর জীবন এই উপমহাদেশে শিল্প ও সক্রিয়তাবাদের (activism) এক শক্তিশালী সংযোগের প্রতীক।
বিখ্যাত মৃত্যু: ফুলন দেবী (২০০১)
আধুনিক ভারতের ইতিহাসে ফুলন দেবীর মতো মেরুকরণ সৃষ্টিকারী বা নৃবিজ্ঞানীদের দ্বারা এত বেশি চর্চিত ব্যক্তিত্ব খুব কমই আছেন। সারা বিশ্বে তিনি “ব্যান্ডিট কুইন” বা দস্যুরানী নামে পরিচিত। চরম গ্রামীণ দারিদ্র্য এবং জাতিভেদ প্রথার ভয়াবহ নিপীড়ন থেকে উঠে এসে তিনি একজন কুখ্যাত বিদ্রোহী নেতায় পরিণত হন। পরবর্তীতে তিনি আত্মসমর্পণ করেন, দীর্ঘ কারাবাস ভোগ করেন এবং শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২০০১ সালের ২৫শে জুলাই নয়াদিল্লিতে নিজ বাসভবনের বাইরে তাকে হত্যা করা হয়। তার রেখে যাওয়া জীবনকাহিনী লিঙ্গবৈষম্য, জাতিগত সংঘাত এবং ভারতের বিচার ব্যবস্থার এক জটিল পাঠ হিসেবে আজও প্রাসঙ্গিক।
সাংস্কৃতিক ও ঋতুভিত্তিক প্রেক্ষাপট: শ্রাবণের ধারা
উপমহাদেশের প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলো (যেমন ঈদ, দুর্গাপূজা বা দীপাবলি) চন্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতি বছর পরিবর্তিত হলেও, ২৫শে জুলাই দিনটি সবসময়ই পড়ে ‘শ্রাবণ’ মাসের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে—যা বাংলার বর্ষাকালের চরম মুহূর্ত। সাংস্কৃতিকভাবে এই ঋতুটি বদ্বীপ অঞ্চল বাংলার প্রাণভোমরা, যা আমাদের কৃষিকাজকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশ্বকবির সাহিত্য ও সঙ্গীতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টি দক্ষিণ এশীয় নৃবিজ্ঞানে প্রেম, বিরহ, আকাঙ্ক্ষা এবং প্রকৃতির পুনর্জন্মের গভীর অনুভূতি জাগ্রত করে। “শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা”—এই আবহ বাঙালির অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে।
আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিন
প্রতিদিন বিশ্ব সম্প্রদায় তাদের অভিন্ন মূল্যবোধ, ইতিহাস এবং জরুরি মানবিক সংকটগুলো নিয়ে ভাবার জন্য বিরতি নেয়। ২৫শে জুলাই জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন এবং কয়েকটি দেশের জাতীয় উদযাপনের দিন।
বিশ্ব ডুবে-মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস (World Drowning Prevention Day)
জাতিসংঘ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দ্বারা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এই দিনটি একটি নীরব মহামারীর ওপর আলোকপাত করে। ডুবে যাওয়া বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ, যা প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর শিশুদের। ২৫শে জুলাই হলো পানি সুরক্ষা কাঠামোর উন্নতি, প্রয়োজনীয় সাঁতার শেখানো এবং বন্যার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা মোতায়েন করার জন্য একটি জরুরি আহ্বান।
বিভিন্ন দেশের জাতীয় দিবস
| দেশ | দিবস | ঐতিহাসিক তাৎপর্য |
| তিউনিসিয়া | প্রজাতন্ত্র দিবস | ১৯৫৭ সালে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি এবং হাবিব বুরগিভার অধীনে প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা। |
| পুয়ের্তো রিকো | সংবিধান দিবস | ১৯৫২ সালে দ্বীপটির সংবিধান গ্রহণের স্মৃতিচারণ এবং ১৮৯৮ সালে মার্কিন আগ্রাসনের বার্ষিকী। |
| কোস্টারিকা | গুয়ানাকাস্তে দিবস | ১৮২৪ সালে প্রতিবেশী নিকারাগুয়া থেকে গুয়ানাকাস্তে প্রদেশের শান্তিপূর্ণ অন্তর্ভুক্তি উদযাপন। |
বৈশ্বিক ইতিহাস: পরিবর্তনের হাওয়া

ইতিহাস তৈরি করে তারাই যারা প্রচলিত ব্যবস্থাকে মেনে নিতে অস্বীকার করে। ২৫শে জুলাই আমরা প্রতিটি মহাদেশে আমূল সামাজিক পরিবর্তন, ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ এবং আশ্চর্যজনক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রমাণ দেখতে পাই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: সঙ্গীত, বিজ্ঞান এবং নাগরিক অধিকার
-
১৯৬৫ (সঙ্গীতে বিপ্লব): রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যালে, অ্যাকোস্টিক ফোক আন্দোলনের অবিসংবাদিত প্রিয়মুখ বব ডিলান হাতে একটি ফেন্ডার স্ট্র্যাটোকাস্টার ইলেকট্রিক গিটার নিয়ে মঞ্চে ওঠেন। তিনি যখন গিটারের তারে বৈদ্যুতিক ঝংকার তুললেন, তখন দর্শকরা চরম ধাক্কা খায় এবং জোরে দুয়োধ্বনি দেয়। কিন্তু অ্যাকোস্টিক বিশুদ্ধতার গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে ডিলানের এই অস্বীকৃতি আধুনিক সঙ্গীতের গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল, যার মাধ্যমে ফোকের লিরিক্যাল গভীরতার সাথে রক অ্যান্ড রোলের উদ্দাম শক্তির মিলন ঘটে।
-
১৯৪৬ (পারমাণবিক যুগ): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিকিনি অ্যাটলে “ক্রসরোডস বেকার” (Crossroads Baker) নামক পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম জলের নিচের পারমাণবিক পরীক্ষা। এর ফলে তেজস্ক্রিয় জলের এক ভয়ঙ্কর ও আইকনিক মাশরুম ক্লাউড তৈরি হয়, যা বিশ্বব্যাপী সামরিক কৌশল এবং পরিবেশগত নীতিকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়।
রাশিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন
-
১৯৮৪ (মহাকাশে নারী): স্যালিয়ুট ৭ (Salyut 7) মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানকালে সোভিয়েত মহাকাশচারী স্বেতলানা ইয়েভজেনেভনা সাভিৎস্কায়া ইতিহাসের প্রথম নারী হিসেবে স্পেসওয়াক (Extravehicular activity বা EVA) সম্পন্ন করে ইতিহাস রচনা করেন।
-
১৯১৯ (কারখান ম্যানিফেস্টো): নবগঠিত সোভিয়েত সরকার একটি ইশতেহার জারি করে যেখানে চীনের ওপর সাবেক রাশিয়ান জার সাম্রাজ্যের সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে।
চীন এবং জাপান
-
১৬৬৮ (ভয়াবহ ভূমিকম্প): কিং রাজবংশের শাসনামলে পূর্ব চীনে ৮.৫ মাত্রার বিশাল শানডং ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর ফলে আনুমানিক ৪৩,০০০ থেকে ৫০,০০০ মানুষ প্রাণ হারায়, যা এটিকে এশিয়ার রেকর্ডকৃত ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পরিণত করে।
-
১৯০৮ (উমামি-র আবিষ্কার): টোকিওতে রসায়নবিদ কিকুনায়েকে ইকেদা আবিষ্কার করেন যে কম্বু সামুদ্রিক শৈবালের একটি নির্দিষ্ট যৌগ এক অনন্য, সুস্বাদু স্বাদের জন্য দায়ী। তিনি মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট (MSG) তৈরির প্রক্রিয়া প্যাটেন্ট করেন, যা বিশ্ববাসীকে পঞ্চম মৌলিক স্বাদ “উমামি” (Umami)-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বৈশ্বিক রন্ধনবিজ্ঞানকে চিরতরে বদলে দেয়।
যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপ
-
১৯৪৩ (ফ্যাসিবাদীদের পতন): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে এক বিশাল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। ইতালীয় স্বৈরশাসক বেনিটো মুসোলিনিকে গ্র্যান্ড কাউন্সিল অফ ফ্যাসিজমের উৎসাহে ইতালির রাজা ক্ষমতাচ্যুত করেন। এটি কার্যকরভাবে ইতালির ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটায়।
-
১৯০৯ (ইংলিশ চ্যানেল জয়): ফরাসি বিমান চলাচলের পথিকৃৎ লুই ব্লেয়ারিও বিশ্বের প্রথম মানুষ হিসেবে বাতাসের চেয়ে ভারী যন্ত্র (উড়োজাহাজ) নিয়ে সফলভাবে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। ক্যালে থেকে ডোভার পর্যন্ত এই বিপজ্জনক যাত্রাটি তিনি ৩৭ মিনিটে সম্পন্ন করেন।
-
২০০০ (কনকর্ড ট্র্যাজেডি): প্যারিসের ঠিক বাইরে উড্ডয়নের পরপরই এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইট ৪৫৯০, একটি সুপারসনিক কনকর্ড যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে বোর্ডে থাকা ১০৯ জন এবং মাটিতে থাকা ৪ জন নিহত হন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা সুপারসনিক বিমানের নিরাপত্তার রূপকথাকে ভেঙে চুরমার করে দেয় এবং কনকর্ড বহরের সম্পূর্ণ অবসরের পথ ত্বরান্বিত করে।
কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া
-
১৯১৭ (আয়করের জন্ম): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপুল ব্যয় সাময়িকভাবে মেটানোর উদ্দেশ্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্যার রবার্ট বর্ডেন দেশের প্রথম আয়কর (Income tax) চালু করেন। এটি কঠোরভাবে একটি অস্থায়ী যুদ্ধকালীন ব্যবস্থা হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল এবং করের হার ছিল ৪% থেকে ২৫%। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, এই “অস্থায়ী” কর আর কখনোই বাতিল করা হয়নি।
-
১৯৪৪ (অপারেশন স্প্রিং): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নরম্যান্ডি ক্যাম্পেইনের সময় কানাডিয়ান বাহিনী ‘অপারেশন স্প্রিং’ শুরু করে। এটি প্রথম কানাডিয়ান আর্মির জন্য একক দিন হিসেবে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটিতে পরিণত হয়, যা ইউরোপীয় মুক্তির জন্য দেওয়া চরম মূল্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত
-
১৯৮৩ (শ্রীলঙ্কার ব্ল্যাক জুলাই): শ্রীলঙ্কায় উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে যখন কলম্বোর ওয়েলিকাদা উচ্চ-নিরাপত্তা কারাগারে সিংহলি বন্দীরা ৩৭ জন তামিল রাজনৈতিক বন্দীকে হত্যা করে। “ব্ল্যাক জুলাই” নামে পরিচিত বৃহত্তর তামিল-বিরোধী দাঙ্গার অংশ হিসেবে এই নৃশংসতাটি কয়েক দশক ধরে চলা শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
-
১৯৭৮ (চিকিৎসাবিজ্ঞানের অলৌকিকতা): ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করে লুইস জয় ব্রাউন, যিনি বিশ্বের প্রথম “টেস্ট-টিউব বেবি”। ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) এর মাধ্যমে গর্ভধারণ করা তার জন্ম বৈজ্ঞানিক সীমানাকে ভেঙে দেয় এবং বিশ্বব্যাপী বন্ধ্যাত্বের সাথে লড়াই করা লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে অভূতপূর্ব আশার সঞ্চার করে।
উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যু (বৈশ্বিক)
২৫শে জুলাই মানবজাতির কয়েকজন প্রতিভাবান মস্তিষ্কের আগমন এবং বিদায়ের দিন।
বিখ্যাত জন্ম
| নাম | বছর | জাতীয়তা | প্রভাব ও অবদান |
| টমাস একিন্স | ১৮৪৪ | আমেরিকান | ‘দ্য গ্রস ক্লিনিক’-এর মতো মাস্টারপিস আঁকা বিখ্যাত বাস্তববাদী চিত্রশিল্পী। |
| রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন | ১৯২০ | ব্রিটিশ | প্রতিভাবান এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফার, যাঁর “ফটো ৫১” ডিএনএ-র ডাবল-হেলিক্স কাঠামো উন্মোচনে মূল ভূমিকা রাখে। |
| এমমেট টিল | ১৯৪১ | আমেরিকান | এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর, যাঁর বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের একটি বড় অনুঘটক ছিল। |
| ওয়াল্টার পেটন | ১৯৫৪ | আমেরিকান | এনএফএল-এর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় এবং মানবহিতৈষী। |
| ম্যাট লেব্লাঙ্ক | ১৯৬৭ | আমেরিকান | বিখ্যাত অভিনেতা, যিনি ‘ফ্রেন্ডস’ সিটকমে জোয়ি ট্রিভিয়ানি চরিত্রে অভিনয় করে পপ-কালচার আইকন হয়ে ওঠেন। |
বিখ্যাত মৃত্যু
| নাম | বছর | জাতীয়তা | কারণ ও অবদান |
| স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ | ১৮৩৪ | ইংরেজ | রোমান্টিক সাহিত্যের কিংবদন্তি কবি, যাঁর ‘দ্য রাইম অফ দ্য অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার’ ইংরেজি কবিতাকে বদলে দেয়। |
| চার্লস ম্যাকিনটোশ | ১৮৪৩ | স্কটিশ | উদ্যোক্তা রসায়নবিদ, যিনি ওয়াটারপ্রুফ কাপড় উদ্ভাবন করে আধুনিক রেইনকোটের জন্ম দেন। |
| ভ্লাদিমির ভিসোতস্কি | ১৯৮০ | রাশিয়ান | আইকনিক গায়ক-গীতিকার ও অভিনেতা, যাঁর গান সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক সমালোচনা করেছিল। |
| পল সরভিনো | ২০২২ | আমেরিকান | প্রিয় মঞ্চ ও পর্দা অভিনেতা, যিনি ‘গুডফেলাস’ চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য সমাদৃত। |
“আপনি কি জানেন?” – কিছু অজানা তথ্য
খাবার টেবিলে কিংবা আড্ডায় আপনাকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে ২৫শে জুলাই সম্পর্কিত তিনটি মুগ্ধকর এবং অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ঐতিহাসিক তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
-
মঙ্গল গ্রহের মুখচ্ছবি (The Pareidolia of Mars): ১৯৭৬ সালের ২৫শে জুলাই, নাসার ভাইকিং ১ অরবিটার মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে সিডোনিয়া অঞ্চলের একটি ছবি তোলে। ছায়া এবং ক্যামেরার কম রেজ্যুলেশনের কারণে, একটি পাথুরে পর্বত দেখতে হুবহু মহাশূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকা একটি বিশাল মানুষের মুখের মতো লাগছিল। এই একটিমাত্র ছবি কয়েক দশক ধরে প্রাচীন মঙ্গল গ্রহের সভ্যতা নিয়ে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দেয়। তবে পরবর্তীতে উন্নত ক্যামেরায় তোলা ছবি প্রমাণ করে যে এটি নিছকই একটি দৃষ্টি বিভ্রম (Optical illusion) ছিল।
-
‘অস্থায়ী’ করের মিথ: যখনই আপনি আপনার আয়কর জমা দেবেন, আপনি ১৯১৭ সালের ২৫শে জুলাইয়ের কথা মনে করতে পারেন। কানাডায় আয়করের সূচনাটি জনগণকে একটি “অস্থায়ী” যুদ্ধকালীন প্রয়োজনীয়তা হিসেবে অত্যন্ত আবেগের সাথে বোঝানো হয়েছিল। আজ এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, যা সেই পুরনো রাজনৈতিক প্রবাদটিই প্রমাণ করে: একটি অস্থায়ী সরকারি কর্মসূচির চেয়ে স্থায়ী আর কিছুই নেই।
-
অস্ট্রিয়ান রাজনীতির একটি কালো দিন: ১৯৩৪ সালের এই দিনে অস্ট্রিয়ান চ্যান্সেলর এঙ্গেলবার্ট ডলফাসকে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময় অস্ট্রিয়ান নাৎসিরা হত্যা করে। এটি ছিল কয়েক বছর পর হিটলারের জার্মানি কর্তৃক অস্ট্রিয়া দখলের (Anschluss) একটি ভয়াবহ পূর্বলক্ষণ।
শেষ কথা
২৫শে জুলাই তারিখটি আমাদের সমগ্র মানবজাতির বিস্তৃত আখ্যানের একটি আণুবীক্ষণিক দৃশ্য উপহার দেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে দেওয়া সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ থেকে শুরু করে মহাকাশের শূন্যতায় মানুষের পদচারণা কিংবা ল্যাবরেটরিতে প্রাণের সঞ্চার করার বৈজ্ঞানিক বিজয়—এই সবকিছুই আমাদের যৌথ স্মৃতিতে গভীরভাবে খোদাই করা আছে।
২৫শে জুলাইয়ের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে আমরা বুঝতে পারি যে, উন্নতির জন্য প্রায়শই আমাদের চরম মূল্য চোকাতে হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও, মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা—তা সে সঙ্গীতের মাধ্যমেই হোক, নাগরিক অধিকার আদায়ের মাধ্যমেই হোক বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মাধ্যমেই হোক—অসীম এবং সুন্দর। আমরা যখন ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, আজকের মতো দিনগুলোর ঐতিহাসিক আর্কাইভ আমাদের জন্য একইসাথে সর্বশ্রেষ্ঠ সতর্কতা এবং সর্বোচ্চ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

