ইতিহাস মানেই কেবল নীরস কিছু তারিখ আর সালের সমাহার নয়; এটি মানবজাতির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, চরম ট্র্যাজেডি এবং অবিশ্বাস্য বিজয়ের এক জীবন্ত গল্প। আমরা যখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ১০ সেপ্টেম্বরের দিকে ফিরে তাকাই, তখন আমরা দেখতে পাই ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা প্রতিরোধের আগুন, ইউরোপের বুকে বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের রোমাঞ্চ, আর উত্তর আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোর এক অদ্ভুত মোহনা। এটি এমন এক দিন যেদিন একদল দুঃসাহসী বিপ্লবী দেশের জন্য হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন, জন্ম নিয়েছেন বিশ্ববরেণ্য গণিতবিদ, আর ফ্রান্সে শেষবারের মতো নেমে এসেছে গিলোটিনের মরণ-খড়গ।
বাঙালি সমাজ এবং বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের কাছে ১০ সেপ্টেম্বর গভীর আবেগ ও বেদনার একটি দিন। এটি যেমন স্বাধীনতার বেদিতে প্রাণ উৎসর্গকারী শহীদদের স্মরণ করার দিন, তেমনি বাংলার রেনেসাঁকে রূপ দেওয়া কিংবদন্তি সাহিত্যিকদের বিদায় জানানোরও দিন। একই সাথে, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে এই দিনটিতেই ঘটেছে উত্তর আমেরিকার সীমানা নির্ধারণকারী নৌযুদ্ধ, আধুনিক ফ্যাশন ও ক্রীড়াজগতের আইকনদের জন্ম, এবং এমন এক যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সুইচ অন করার ঘটনা—যা আমাদের মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে সাহায্য করেছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা এই বিস্তৃত আর্কাইভে আমরা শত শত বছর এবং বিভিন্ন মহাদেশ পেরিয়ে জানার চেষ্টা করব ঠিক কী ঘটেছিল আজকের এই দিনে। বালাসোরের কাদা-মাখা পরিখা থেকে শুরু করে সুইজারল্যান্ডের সার্ন (CERN)-এর অত্যাধুনিক গবেষণাগার পর্যন্ত—১০ সেপ্টেম্বরের ইতিহাস, বিখ্যাত জন্মদিন, উল্লেখযোগ্য মৃত্যু এবং বিশ্বব্যাপী পালিত দিবসগুলোর এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হলো।
বাঙালি বলয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশ
ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষ করে বাঙালি সমাজের কাছে ১০ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত ভারাক্রান্ত এবং তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। দিনটি ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবীদের চূড়ান্ত আত্মত্যাগ এবং বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতনের সাক্ষী।
ঐতিহাসিক ঘটনা ও আন্দোলন
-
১৯১৫: বুড়িবালামের তীরে বালাসোরের যুদ্ধ এবং বাঘা যতীনের পতন: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম বীরত্বপূর্ণ এবং একই সাথে মর্মান্তিক অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। ওই দিন বালাসোর জেলা হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, যিনি সবার কাছে ‘বাঘা যতীন’ নামেই বেশি পরিচিত। ঠিক এর আগের দিন, যতীন এবং তার তরুণ বিপ্লবী সঙ্গীরা উড়িষ্যার চাসখন্ডের (বালাসোর) কর্দমাক্ত পরিখায় চার্লস টেগার্টের নেতৃত্বাধীন ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ পুলিশের সাথে ৭৫ মিনিটের এক ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হন। হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জার্মান অস্ত্র খালাস করে সারা ভারতব্যাপী একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটানোর যে পরিকল্পনা তারা করেছিলেন, তা ফাঁস হয়ে যায়। পেটে মারাত্মক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ১০ সেপ্টেম্বর বাঘা যতীনের মৃত্যু পুরো বাংলায় শোকের ছায়া ফেলে দেয়। তবে তার এই আত্মদান সুভাষচন্দ্র বসুসহ পরবর্তীতে অগণিত স্বাধীনতা সংগ্রামীকে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
-
১৯৭১: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কূটনৈতিক মোড় বদল: ১৯৭১ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের দিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এক চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক পর্যায়ে প্রবেশ করে। আগস্ট মাসে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘ইন্দো-সোভিয়েত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি’র ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে বিদেশি শক্তির (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের) সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধারা (মুক্তিবাহিনী) পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের গেরিলা হামলা তীব্রতর করে তোলে। এই সেপ্টেম্বরের দিনগুলোতেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো—যাদের আগে কঠোর সেন্সরশিপের আওতায় রাখা হয়েছিল—শরণার্থী শিবিরের মানবিক সংকটের পূর্ণাঙ্গ চিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে শুরু করে। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত সুদৃঢ় হতে শুরু করে।
বিখ্যাত জন্ম (উপমহাদেশ)
গোবিন্দ বল্লভ পন্থ (জন্ম: ১৮৮৭)
বর্তমান উত্তরাখণ্ডের আলমোড়াতে জন্মগ্রহণকারী পন্থ ছিলেন মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহেরুর পাশাপাশি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অসামান্য ব্যক্তিত্ব। তিনি উত্তরপ্রদেশের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জমিদারি প্রথা বিলোপ এবং হিন্দিকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় তার অবদানের জন্য ১৯৫৭ সালে তাকে ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
বাসাপ্পা দানাপ্পা জাট্টি (বি. ডি. জাট্টি) (জন্ম: ১৯১২)
ভারতের প্রভাবশালী এই রাজনীতিবিদ দেশের পঞ্চম উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দীন আলী আহমেদের আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সি. আর. রাও (জন্ম: ১৯২০)
মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে জন্মগ্রহণকারী কালিয়ামপুদি রাধাকৃষ্ণ রাও ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ। ‘ক্র্যামার-রাও বাউন্ড’ এবং ‘রাও-ব্ল্যাকওয়েল উপপাদ্য’-এর মতো তার যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো ডেটা অ্যানালাইসিসের দুনিয়ায় বিপ্লব এনেছিল। ১০২ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে তিনি বিশ্ব বিজ্ঞানে এক অতুলনীয় উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।
বিখ্যাত মৃত্যু (উপমহাদেশ)
সুকুমার রায় (মৃত্যু: ১৯২৩)

সুকুমার রায় (১৮৮৭–১৯২৩) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় প্রতিভা। তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত কবি, রম্যরচয়িতা, শিশুসাহিত্যিক এবং অসামান্য চিত্রশিল্পী। বাংলা শিশুসাহিত্যকে তিনি তাঁর অদ্বিতীয় ‘ননসেন্স ছড়া’, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ এবং কল্পনাশক্তিতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রখ্যাত লেখক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সন্তান এবং বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পিতা হিসেবে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, কিন্তু তিনি নিজের এক আলাদা জগত তৈরি করেছিলেন।
‘আবোল তাবোল’ বা ‘হযবরল’-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টিগুলো আজও প্রতিটি বাঙালি পাঠকের মনে গভীর আবেগ তৈরি করে। তাঁর আপাত-হাস্যকর লেখার আড়ালে লুকিয়ে থাকত সমাজের প্রতি গভীর ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা এবং চমকপ্রদ শব্দখেলা। পারিবারিক পত্রিকা ‘সন্দেশ’-এর সম্পাদনা ও প্রসারেও তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। দুর্ভাগ্যবশত, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, ১৯২৩ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি অকালে মৃত্যুবরণ করেন।
বাঘা যতীন (মৃত্যু: ১৯১৫)
বাঘা যতীন, যাঁর প্রকৃত নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৭৯–১৯১৫), ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক অকুতোভয় বিপ্লবী নেতা এবং ‘যুগান্তর’ দলের অন্যতম প্রধান সংগঠক। শুধুমাত্র একটি ছোরা দিয়ে একাই একটি বিশাল বেঙ্গল টাইগারকে হত্যা করার অসীম সাহসিকতার কারণে তিনি ‘বাঘা যতীন’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর শৌর্য ও বীরত্বের কাহিনী আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, জার্মানির সহায়তায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের (যা ইন্দো-জার্মান ষড়যন্ত্র নামে পরিচিত) মূল কারিগর ছিলেন তিনি।
দেশকে স্বাধীন করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর বুকে। ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, ওড়িশার বুড়িবালাম নদীর তীরে ব্রিটিশ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর এক বিশাল বাহিনী তাঁকে এবং তাঁর মাত্র চারজন সঙ্গীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। সংখ্যায় ও অস্ত্রে অনেক পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও, তাঁরা আত্মসমর্পণ না করে প্রায় ৭৫ মিনিট ধরে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধে ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে বুক চিতিয়ে লড়ে তিনি মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হন। ১৯১৫ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে এই বীর বিপ্লবী মৃত্যুবরণ করেন।
আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিন
১০ সেপ্টেম্বর কিছু দেশে যেমন তাদের সার্বভৌমত্ব উদযাপনের দিন, তেমনি সমগ্র বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ পালনেরও দিন।
-
বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস (গ্লোবাল): বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর সমর্থনপুষ্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (IASP) কর্তৃক আয়োজিত এই দিনটি বিশ্বজুড়ে পালন করা হয়। এর মূল বার্তা হলো—আত্মহত্যা একটি প্রতিরোধযোগ্য ট্র্যাজেডি। মানসিক অবসাদ নিয়ে সমাজে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে তা দূর করা, প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করাই এই দিনটির প্রধান লক্ষ্য।
-
শিক্ষক দিবস (চীন): ১৯৮৫ সাল থেকে চীনে ১০ সেপ্টেম্বরকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে আসছে। কনফুসিয়াসের দর্শন অনুযায়ী শিক্ষকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হিসেবে এই দিনে শিক্ষার্থীরা উপহার, কার্ড এবং নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের গুরুজনদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
-
জিব্রাল্টার জাতীয় দিবস: ১৯৬৭ সালের একটি ঐতিহাসিক গণভোটের স্মরণে এই দিনটি পালিত হয়। ওই গণভোটে জিব্রাল্টারের নাগরিকরা স্পেনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বদলে বিশাল ব্যবধানে (১২,১৩৮ বনাম ৪৪ ভোট) ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থাকার পক্ষে রায় দেয়। দিনটিতে পুরো জিব্রাল্টার লাল-সাদা রঙে সেজে ওঠে।
-
সেন্ট জর্জ কেই দিবস (বেলিজ): এটি বেলিজের একটি বর্ণাঢ্য জাতীয় ছুটির দিন। ১৭৯৮ সালে ‘ব্যাটল অফ সেন্ট জর্জ কেই’-তে ব্রিটিশ হন্ডুরাস (যাদের সাথে ক্রীতদাসরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল) স্প্যানিশ আক্রমণকারীদের একটি বিশাল নৌবহরকে সফলভাবে প্রতিহত করার স্মৃতিতে দিনটি উদযাপিত হয়।
বিশ্ব ইতিহাস: সাম্রাজ্যের পতন ও প্রযুক্তির উত্থান
উপমহাদেশের বাইরেও ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বমঞ্চে সাম্রাজ্যগুলোর সংঘাত, প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য লাফ এবং আধুনিক সীমানা নির্ধারণের বহু ঘটনার সাক্ষী।
যুক্তরাষ্ট্র: যুদ্ধ এবং পেটেন্ট
-
১৬০৮: ক্যাপ্টেন জন স্মিথকে ভার্জিনিয়ার জেমসটাউনের কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়, যা ছিল আমেরিকায় প্রথম স্থায়ী ইংরেজ বসতি। তার কঠোর নেতৃত্ব (নীতি ছিল: “যে কাজ করবে না, সে খাবেও না”) মূলত অনাহারে ধুঁকতে থাকা এই উপনিবেশটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল।
-
১৮১৩: লেক এরির যুদ্ধ ছিল ১৮১২ সালের যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌ সংঘাত। আমেরিকান কমোডোর অলিভার হ্যাজার্ড পেরি ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির বিরুদ্ধে তার নৌবহরকে এক চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে নেতৃত্ব দেন। তার সেই বিখ্যাত বার্তাটি আজও ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে: “আমরা শত্রুর দেখা পেয়েছি, এবং তারা এখন আমাদের।”
-
১৮৪৬: আমেরিকান উদ্ভাবক ইলিয়াস হাও লকস্টিচ ডিজাইনের একটি সেলাই মেশিনের জন্য প্রথমবারের মতো মার্কিন পেটেন্ট লাভ করেন। তার এই উদ্ভাবন পোশাক তৈরির ধরনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে, আধুনিক টেক্সটাইল শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করে এবং গার্হস্থ্য শ্রমের রূপ চিরতরে বদলে দেয়।
কানাডা: বিশ্বমঞ্চে স্বকীয়তার আত্মপ্রকাশ
-
১৯৩৯: পোল্যান্ডে হিটলারের আগ্রাসনের পর, কানাডার পার্লামেন্ট স্বাধীনভাবে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের যুদ্ধ ঘোষণার সাথে সাথে কানাডাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু ১৯৩১ সালের ‘স্ট্যাটিউট অফ ওয়েস্টমিনস্টার’ কানাডাকে কূটনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম লিয়ন ম্যাকেঞ্জি কিংয়ের ১০ সেপ্টেম্বরের এই ঘোষণা প্রমাণ করেছিল যে কানাডা এবার একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই যুদ্ধে লড়ছে।
ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্য: চুক্তি ও প্রাণদণ্ড
-
১৫৪৭: স্কটল্যান্ডের মুসেলবার্গের কাছে ‘ব্যাটল অফ পিঙ্কি ক্লিউ’ সংঘটিত হয়। স্কটিশ এবং ইংরেজ বাহিনীর মধ্যে এটিই ছিল শেষ বড় ধরনের সরাসরি যুদ্ধ, যেখানে স্কটল্যান্ড শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
-
১৯১৯: ‘সেন্ট-জার্মেইন-এন-লে’ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইউরোপের মানচিত্র নতুন করে আঁকা হয়। মিত্রশক্তির সাথে জার্মান-অস্ট্রিয়া প্রজাতন্ত্র এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। এর মাধ্যমে প্রতাপশালী অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে, অস্ট্রিয়ার সামরিক শক্তি ৩০,০০০ সৈনিকে সীমাবদ্ধ করা হয় এবং চেকোস্লোভাকিয়া ও যুগোস্লাভিয়ার মতো নতুন গঠিত রাষ্ট্রগুলোর হাতে বিশাল ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া হয়।
-
১৯৭৭: ফ্রান্সের মার্সেই শহরে হামিদা জান্দোবি নামের এক দণ্ডিত খুনিকে গিলোটিনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পশ্চিমা বিশ্বে গিলোটিন দিয়ে মাথা কেটে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এটিই ছিল শেষ ঘটনা। এর ঠিক চার বছর পর, ১৯৮১ সালে ফ্রান্স মৃত্যুদণ্ড প্রথা পুরোপুরি বাতিল করে দেয়।
-
২০০২: চিরকাল নিজেদের ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতার জন্য পরিচিত সুইজারল্যান্ড শেষ পর্যন্ত তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থান থেকে সরে এসে পূর্ণ সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘে যোগ দেয়।
-
২০০৮: জেনেভায় ‘ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ’ (CERN) সফলভাবে তাদের ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল ‘লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার’ (LHC)-এর চারপাশে প্রথমবারের মতো প্রোটন রশ্মি চালনা করে। এটি কণা পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যা পরবর্তীতে বহু কাঙ্ক্ষিত ‘হিগস বোসন’ (ঈশ্বর কণা) আবিষ্কারের পথ সুগম করেছিল।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত: আফ্রিকা ও এশিয়া
-
১৯৬০: রোম অলিম্পিকে ইথিওপিয়ার দৌড়বিদ আবেবে বিকিলা সম্পূর্ণ খালি পায়ে ম্যারাথনে অংশ নিয়ে বিশ্বকে চমকে দেন এবং স্বর্ণপদক জয় করেন। তিনি কেবল বিশ্ব রেকর্ডই গড়েননি, প্রথম সাব-সাহারান আফ্রিকান হিসেবে অলিম্পিক গোল্ড মেডেল জিতে বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের মানচিত্রকে চিরতরে পূর্ব আফ্রিকার দিকে ঘুরিয়ে দেন।
-
১৯৭৪: দীর্ঘ ১১ বছরের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পর্তুগাল আনুষ্ঠানিকভাবে গিনি-বিসাউয়ের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। লিসবনে সংঘটিত ‘কার্নেশন রেভোলিউশন’-এর প্রেক্ষাপটে পর্তুগালের আফ্রিকান উপনিবেশগুলো খুব দ্রুত স্বাধীন হতে শুরু করে।
বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু (বিশ্বজুড়ে)
১০ সেপ্টেম্বর যেমন অনেক স্বপ্নদর্শী চিন্তাবিদ, শিল্পী ও ক্রীড়াবিদদের পৃথিবীতে স্বাগত জানিয়েছে, তেমনি অনেক ঐতিহাসিক কিংবদন্তির মর্মান্তিক এবং অনেক ক্ষেত্রে সহিংস বিদায়েরও সাক্ষী হয়েছে।
বিখ্যাত জন্ম
-
আর্থার কম্পটন (জন্ম: ১৮৯২, আমেরিকান): একজন অসামান্য পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি ‘কম্পটন ইফেক্ট’ আবিষ্কারের জন্য ১৯২৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এটি প্রমাণ করেছিল যে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশনের একটি কণা-প্রকৃতিও রয়েছে। তিনি ম্যানহাটন প্রজেক্টেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
-
আর্নল্ড পামার (জন্ম: ১৯২৯, আমেরিকান): যিনি গলফ জগতে “দ্য কিং” নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন গলফ ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং আকর্ষণীয় খেলোয়াড়, যার টেলিভিশন-উপযোগী ক্যারিশমা ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে এই খেলাটিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
-
কার্ল লেগারফেল্ড (জন্ম: ১৯৩৩, জার্মান): চ্যানেল (Chanel), ফেন্ডি (Fendi) এবং তার নিজস্ব ব্র্যান্ডের সৃজনশীল পরিচালক হিসেবে তিনি আধুনিক ফ্যাশন জগতকে পুরোপুরি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। (তার জন্ম সাল নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা থাকলেও রেকর্ড বলছে তিনি ১৯৩৩ সালেই জন্মেছিলেন)।
-
স্টিফেন জে. গুল্ড (জন্ম: ১৯৪১, আমেরিকান): বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান এবং প্রত্নতত্ত্বের দুনিয়ায় এক বিশাল নাম। তিনি “পাংচুয়েটেড ইকুইলিব্রিয়াম” (Punctuated equilibrium) তত্ত্বের সহ-প্রণেতা ছিলেন, যা প্রমাণ করে যে বিবর্তন কেবল ধীরগতিতে নয়, বরং মাঝে মাঝে খুব দ্রুতগতিতেও সম্পন্ন হয়।
-
জ্যাক মা (জন্ম: ১৯৬৪, চীনা): ধনকুবের ব্যবসায়ী এবং আলিবাবা গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তিনি প্রযুক্তি এবং ই-কমার্স সেক্টরে চীনের অভাবনীয় উত্থানের একটি বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
-
কলিন ফার্থ (জন্ম: ১৯৬০, ইংরেজ): ‘দ্য কিংস স্পিচ’, ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ এবং ‘এ সিঙ্গেল ম্যান’-এর মতো চলচ্চিত্রে অসামান্য অভিনয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত এই একাডেমি অ্যাওয়ার্ড (অস্কার) বিজয়ী অভিনেতা।
বিখ্যাত মৃত্যু
-
মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট (মৃত্যু: ১৭৯৭, ব্রিটিশ): নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রবর্তক এবং দার্শনিক। ১৭৯২ সালে তিনি তার যুগান্তকারী প্রবন্ধ ‘A Vindication of the Rights of Woman’ লেখেন, যেখানে তিনি যুক্তি দেন যে নারীরা স্বভাবগতভাবে পুরুষদের চেয়ে নিচু নয়, কেবল শিক্ষার অভাবেই তাদের এমনটা মনে হয়। মর্মান্তিকভাবে, কন্যা মেরি শেলির জন্মের মাত্র ১১ দিন পর তিনি প্রসবোত্তর সংক্রমণে মারা যান। তার এই কন্যাই পরবর্তীতে সাহিত্যের মাস্টারপিস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ রচনা করেছিলেন।
-
অস্ট্রিয়ার সম্রাজ্ঞী এলিসাবেথ (মৃত্যু: ১৮৯৮, অস্ট্রিয়ান): “সিসি” (Sisi) নামে পরিচিত অস্ট্রিয়ার এই অসম্ভব সুন্দরী ও বিষণ্ণ সম্রাজ্ঞীকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় হত্যা করা হয়। লুইগি লুচেনি নামের এক ইতালীয় নৈরাজ্যবাদী, যে যেকোনো রাজপরিবারের সদস্যকে হত্যার জন্য মরিয়া ছিল, স্টিমবোটে ওঠার সময় একটি ধারালো সুচ দিয়ে সিসির হৃদপিণ্ডে আঘাত করে।
-
হিউই লং (মৃত্যু: ১৯৩৫, আমেরিকান): “দ্য কিংফিশ” ডাকনামে পরিচিত মার্কিন সিনেটর এবং লুইসিয়ানার প্রাক্তন গভর্নর। লুইসিয়ানা স্টেট ক্যাপিটলে ডা. কার্ল উইস নামক এক আততায়ীর গুলিতে আহত হওয়ার দুদিন পর তিনি মারা যান। মহামন্দার সময় তার “শেয়ার আওয়ার ওয়েলথ” প্রোগ্রামটি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের জন্য বড় রাজনৈতিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
-
অনিতা রডিক (মৃত্যু: ২০০৭, ব্রিটিশ): বিখ্যাত ব্র্যান্ড ‘দ্য বডি শপ’ (The Body Shop)-এর স্বপ্নদর্শী প্রতিষ্ঠাতা। তিনি নৈতিক ভোগবাদ (ethical consumerism)-এর ধারণাটি জনপ্রিয় করেন এবং প্রমাণ করেন যে একটি সফল গ্লোবাল কর্পোরেট ব্যবসাও পরিবেশগত ন্যায়বিচারের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারে এবং পশুদের উপর পণ্যের পরীক্ষা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে পারে।
“আপনি কি জানতেন?” – কিছু অজানা তথ্য
১০ সেপ্টেম্বরের সাথে জড়িয়ে থাকা এমন তিনটি মজার এবং চমকপ্রদ তথ্য, যা ইতিহাসের আলোচনায় বেশ খোরাক জোগাতে পারে:
১. প্রথম মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর দায়ে গ্রেপ্তার: ব্রেথলাইজার বা অ্যালকোহল মাপার যন্ত্র আবিষ্কারের বহু আগে, ১৮৯৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর লন্ডনের এক ২৫ বছর বয়সী ট্যাক্সি চালক জর্জ স্মিথ এক অদ্ভুত ইতিহাস গড়েন। নিজের ইলেকট্রিক ক্যাবটি মাতাল অবস্থায় চালিয়ে একটি ভবনে ধাক্কা মারার পর, তিনিই বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ‘ড্রাঙ্ক ড্রাইভিং’-এর অপরাধে গ্রেপ্তার হন এবং তাকে ২৫ শিলিং জরিমানা করা হয়।
২. গ্রাঞ্জ (Grunge) মিউজিকের বিপ্লব শুরু: ১৯৯১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রক ব্যান্ড নির্ভানা (Nirvana) তাদের বিখ্যাত সিঙ্গেল “Smells Like Teen Spirit” রিলিজ করে। মুক্তির দিন গানটি সেভাবে হৈচৈ না ফেললেও, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটি ১৯৮০-এর দশকের হেয়ার-মেটাল সঙ্গীতের আধিপত্য পুরোপুরি ধূলিস্যাৎ করে দেয়। এর মাধ্যমে সিয়াটলের গ্রাঞ্জ মিউজিক মূলধারায় জায়গা করে নেয় এবং রক মিউজিকের ইতিহাস চিরতরে বদলে যায়।
৩. ব্রিটিশ ওয়ার ক্যাবিনেটের বেপরোয়া নির্দেশ: ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘ব্লিটজ’-এর ভয়াবহ দিনগুলোতে উইনস্টন চার্চিলের ওয়ার ক্যাবিনেট আজকের এই দিনে অত্যন্ত বিতর্কিত একটি গোপন নির্দেশ জারি করে। নির্দেশটি ছিল—জার্মানিতে যেসব ব্রিটিশ বোমারু বিমান তাদের নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পেতে ব্যর্থ হবে, তারা যেন সেই বোমাগুলো নিয়ে আর দেশে ফিরে না আসে। মানসিক আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য তাদের সেই বোমাগুলো জার্মানির “যেকোনো জায়গায়” ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
শেষ কথা
১০ সেপ্টেম্বরের এই ঘটনাবহুল ইতিহাস কেবল কিছু সাল, তারিখ বা বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি মানবসভ্যতার এক বিশাল ক্যানভাসের গুরুত্বপূর্ণ খণ্ডচিত্র। আজকের দিনে যেমন অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব পৃথিবীতে এসে সমাজ, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিকে আলোকিত করেছেন, তেমনি অনেক নক্ষত্রের চিরবিদায়ে বিশ্ব শোকাহত হয়েছে। পাশাপাশি, এই দিনে ঘটে যাওয়া নানা রাজনৈতিক পালাবদল, যুগান্তকারী আবিষ্কার বা সামাজিক আন্দোলনগুলো বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে।
তাই, ফেলে আসা দিনগুলোর এই নির্মোহ পাঠ আমাদের বর্তমানকে আরও অর্থবহ করতে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে সঠিক দিকনির্দেশনা দিক। কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যাওয়া এমন আরও রোমাঞ্চকর, অজানা এবং অনুপ্রেরণামূলক ইতিহাস সম্পর্কে নিয়মিত জানতে আমাদের সাথেই যুক্ত থাকুন। ইতিহাস কেবল অতীতের গল্প হয়ে না থাকুক, এটি হোক আমাদের আগামীর পথপ্রদর্শক।

