১৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

ইতিহাস কেবল পুরনো বইয়ের পাতায় জমে থাকা ধূলোমাখা কিছু তারিখের সমষ্টি নয়; এটি মানবজাতির জয়, পরাজয়, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং নিত্যনতুন উদ্ভাবনের এক জীবন্ত আখ্যান। ক্যালেন্ডারের প্রতিটি দিন আমাদের অতীতের একটি আয়না হিসেবে কাজ করে, যা দেখিয়ে দেয় কীভাবে অজস্র ঘটনা আজকের এই আধুনিক বিশ্বকে রূপ দিয়েছে। আমরা যখন ইতিহাসের পাতা উল্টে ১৬ই সেপ্টেম্বরে এসে থামি, তখন বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া নানা মোড় ঘোরানো ঘটনার এক বিস্ময়কর চিত্রপট আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। নতুন পৃথিবীর সন্ধানে ধর্মীয় তীর্থযাত্রীদের যাত্রা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অবাধ্যতার বিস্ফোরক কাজ, এবং সঙ্গীতের কিংবদন্তিদের জন্ম থেকে শুরু করে রাজাদের পতন—এই দিনটি মানব সভ্যতার টাইমলাইনে গভীরভাবে খোদাই করা আছে।

এই বিস্তৃত এবং বর্ণনামূলক আয়োজনে, আমরা ঔপনিবেশিক বাংলার রাজনৈতিক বন্দিশালা থেকে শুরু করে সন্ত্রাসকবলিত ওয়াল স্ট্রিটের ব্যস্ততম অর্থনৈতিক এলাকা পর্যন্ত ভ্রমণ করব। আমরা জানব এই দিনে জন্মগ্রহণকারী সেইসব স্বপ্নদ্রষ্টাদের কথা এবং বিদায় জানাবো সেইসব মহারথীদের যারা এদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। আপনি ইতিহাসপ্রেমী হোন, সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী হোন, বা নিছক আড্ডার টেবিলে বলার মতো চমকপ্রদ তথ্য খুঁজছেন এমন কেউ হোন না কেন—ইতিহাসের পাতায় ১৬ই সেপ্টেম্বর ঠিক কী কী ঘটেছিল, তার একটি বিশদ এবং রোমাঞ্চকর চিত্র আপনি এখানে পাবেন।

বাঙালি বলয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশ

বিশ্বের ইতিহাসের বইগুলো প্রায়শই পশ্চিমা ঘটনাগুলোর ওপর বেশি জোর দেয়। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশ—এবং বিশেষ করে আমাদের বাঙালি বলয়—ঔপনিবেশিক বিরোধী প্রতিরোধ, অসামান্য সাংস্কৃতিক অবদান এবং বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের এক সমৃদ্ধ এবং অনেক ক্ষেত্রেই উত্তাল ইতিহাসের সাক্ষী। ১৬ই সেপ্টেম্বর এই অঞ্চলে অপরিসীম আত্মত্যাগ এবং কিংবদন্তি প্রতিভার উদযাপনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন।

ঐতিহাসিক ঘটনা: হিজলি বন্দি নিবাসে গুলিবর্ষণ (১৯৩১)

বাংলার ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম অন্ধকার এবং তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৩১ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর। বিনাবিচারে রাজনৈতিক বন্দীদের আটকে রাখার জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে ‘হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প’ বা হিজলি বন্দি নিবাস স্থাপন করেছিল। সেখানকার পরিস্থিতি ছিল কুখ্যাত রকমের কঠোর। বন্দীদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন তরুণ, অকুতোভয় বিপ্লবী যারা ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছিলেন—যার ফলে কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের প্রায়শই সংঘর্ষ হতো।

এই ভয়াল রাতে, আগের একটি ছোটখাট বিবাদের জেরে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ প্রহরীরা সেলের ভেতরে থাকা নিরস্ত্র বন্দীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এই বর্বরোচিত হামলায় দুজন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদ হন: সন্তোষ কুমার মিত্র এবং তারকেশ্বর সেনগুপ্ত। আরও কয়েক ডজন বন্দী গুরুতর আহত হন। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এই নির্লজ্জ ঘটনাটি পুরো উপমহাদেশে শোক ও ক্ষোভের ঢেউ তুলেছিল। ঘটনাটি এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে, নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্য সত্ত্বেও কলকাতার মনুমেন্টের (বর্তমানে শহীদ মিনার) সামনে এক বিশাল জনসমাবেশের আয়োজন করেন এবং তীব্র প্রতিবাদী ভাষণ দেন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু স্বয়ং মেদিনীপুরে ছুটে গিয়েছিলেন শহীদদের মৃতদেহ গ্রহণ করতে। বর্তমানে, সেই হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্পের ভবনটিকে সংস্কার করে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT) খড়গপুরের ক্যাম্পাসের মধ্যে একটি পবিত্র জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নির্বাক সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বালিয়াডাঙ্গার যুদ্ধ (১৯৭১)

এরপর আমরা যদি চল্লিশ বছর এগিয়ে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে যাই, তবে দেখতে পাবো ১৯৭১ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের চিত্র। এদিন মুক্তিবাহিনী (বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামীরা) বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের কাছে কাকডাঙ্গায় অবস্থিত একটি সুসজ্জিত পাকিস্তানি সামরিক বর্ডার অবজারভেশন পোস্টের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। যদিও এই নির্দিষ্ট হামলাটি তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল এবং তাৎক্ষণিকভাবে পোস্টটি দখল করা সম্ভব হয়নি, তবে এটি ছিল ৮নং সেক্টরের বৃহত্তর সামরিক কৌশলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর ক্রমাগত গেরিলা আক্রমণের চাপ দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল, যা ডিসেম্বরে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়ের পথকে আরও সুগম করেছিল।

উপমহাদেশে বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু

এই তারিখের সাথে যুক্ত এই অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের একনজরে দেখার জন্য নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:

নাম বছর ঘটনা পেশা / অবদান
এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মী ১৯১৬ জন্ম কিংবদন্তি কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী। প্রথম সঙ্গীতশিল্পী যিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ লাভ করেন।
সন্তোষ কুমার মিত্র ১৯৩১ মৃত্যু বাঙালি বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী, হিজলি বন্দি নিবাসে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।
তারকেশ্বর সেনগুপ্ত ১৯৩১ মৃত্যু বাঙালি বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী, হিজলি বন্দি নিবাসে সন্তোষ কুমার মিত্রের সাথে শহীদ হন।

আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিন

১৬ই সেপ্টেম্বরকে জাতিসংঘ একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত দিবস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একইসাথে এটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কয়েকটি দেশের জন্য অপরিসীম জাতীয় গর্বের একটি দিন।

  • আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ঘোষিত এই দিনটি মূলত ১৯৮৭ সালে ‘মন্ট্রিল প্রটোকল’ (Montreal Protocol) স্বাক্ষরের স্মৃতিবহন করে। মন্ট্রিল প্রটোকলকে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল পরিবেশগত চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি স্বাক্ষরের আগে, অ্যারোসল এবং রেফ্রিজারেটরে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC)-এর ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পৃথিবীর ওজোন স্তরে একটি বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী ইকোসিস্টেমকে ক্ষতিকারক অতিবেগুনী রশ্মির হুমকির মুখে ফেলেছিল। এই তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া বৈশ্বিক সহযোগিতার ফলেই, ওজোন স্তরটি বর্তমানে ২১ শতকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হওয়ার পথে রয়েছে।

  • মালয়েশিয়া দিবস (হরি মালয়েশিয়া): মালয়েশিয়া যদিও ১৯৫৭ সালের ৩১শে আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, কিন্তু ১৯৬৩ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর দিনটি আধুনিক মালয়েশিয়া রাষ্ট্র গঠনের প্রকৃত দিন হিসেবে চিহ্নিত। এদিন মালয় ফেডারেশন সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ উত্তর বোর্নিও (সাবাহ), সারাওয়াক এবং সিঙ্গাপুরের সাথে একত্রিত হয়ে নতুন রাষ্ট্র ‘মালয়েশিয়া’ গঠন করে (অবশ্য সিঙ্গাপুর ১৯৬৫ সালে ফেডারেশন থেকে আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন নগর-রাষ্ট্রে পরিণত হয়)। মালয়েশিয়া দিবসটি বিশাল কুচকাওয়াজ, দেশাত্মবোধক গান এবং দেশের অবিশ্বাস্য জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপিত হয়।

  • পাপুয়া নিউ গিনি স্বাধীনতা দিবস: ১৯৭৫ সালের এই দিনে, পাপুয়া নিউ গিনি অস্ট্রেলিয়ান প্রশাসনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। অন্যান্য অনেক উত্তর-ঔপনিবেশিক পালাবদলের বিপরীতে, এটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে অর্জিত হয়েছিল। দিনটি প্রাণবন্ত ঐতিহ্যবাহী ‘সিং-সিং’ (সঙ্গীত ও নৃত্যের উৎসব), বার্ড-অফ-প্যারাডাইস সম্বলিত নজরকাড়া লাল ও কালো জাতীয় পতাকার উত্তোলন এবং দেশব্যাপী উৎসবের মধ্য দিয়ে পালিত হয়।

বিশ্ব ইতিহাস: বিপ্লব, ট্র্যাজেডি এবং যুগান্তকারী যাত্রা

বিশ্ব ইতিহাস

উপমহাদেশের বাইরেও, ১৬ই সেপ্টেম্বর বিপ্লব, মর্মান্তিক গণহত্যা, অর্থনৈতিক ধস এবং স্মরণীয় যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ওয়াল স্ট্রিটে আতঙ্ক এবং প্রথম ড্রাফট

  • ১৬২০ – মেফ্লাওয়ারের যাত্রা: এই দিনে (পুরনো স্টাইলের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী), ‘মেফ্লাওয়ার’ নামের জাহাজটি ইংল্যান্ডের প্লাইমাউথ থেকে ১০২ জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এই নারী, পুরুষ এবং শিশুরা—যাদের মধ্যে ছিলেন ধর্মীয় স্বাধীনতার সন্ধানে বের হওয়া মানুষ এবং অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে বের হওয়া ধর্মনিরপেক্ষ উপনিবেশবাদীরা—এক বিপজ্জনক আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন। তারা মূলত ভার্জিনিয়া কলোনির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন কিন্তু দিকভ্রান্ত হয়ে বর্তমান ম্যাসাচুসেটস অঞ্চলে অবতরণ করেন। তাদের এই যাত্রা উত্তর আমেরিকার প্রারম্ভিক উপনিবেশায়ন এবং এর ভিত্তিমূলের পৌরাণিক কাহিনীকে মৌলিকভাবে রূপ দিয়েছিল।

  • ১৯২০ – ওয়াল স্ট্রিট বোমা হামলা: সেই সময় পর্যন্ত আমেরিকার মাটিতে হওয়া সবচেয়ে মারাত্মক সন্ত্রাসী হামলায়, নিউইয়র্কের আর্থিক জেলায় জে.পি. মরগান অ্যান্ড কোং-এর সদর দপ্তরের বাইরে ১০০ পাউন্ড ডিনামাইট এবং ৫০০ পাউন্ড ভারী ঢালাই লোহার ওজন দিয়ে ঠাসা একটি ঘোড়ায় টানা ওয়াগনের বিস্ফোরণ ঘটে। দুপুরের খাবার চলাকালীন এই বিশাল বিস্ফোরণে ৩৮ জন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হন। ব্যাপক তদন্ত সত্ত্বেও, অপরাধটির কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধান হয়নি, যদিও ঐতিহাসিকরা এই হামলার জন্য গ্যালিয়ানিস্ট নামক কট্টর ইতালীয় নৈরাজ্যবাদীদের একটি গোষ্ঠীকে দায়ী করেন।

  • ১৯৪০ – প্রথম শান্তিকালীন সামরিক খসড়া (Peacetime Draft): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন ইউরোপকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল, তখন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ‘সিলেক্টিভ ট্রেনিং অ্যান্ড সার্ভিস অ্যাক্ট’-এ স্বাক্ষর করেন। এটি আমেরিকান ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শান্তিকালীন সামরিক খসড়া বা ‘ড্রাফট’ প্রতিষ্ঠা করে, যার মাধ্যমে ২১ থেকে ৩৬ বছর বয়সী পুরুষদের সামরিক বাহিনীর জন্য নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। একটি বহুলাংশে বিচ্ছিন্নতাবাদী দেশে এটি একটি বিতর্কিত পদক্ষেপ ছিল, কিন্তু এক বছর পরে পার্ল হারবারে হামলার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধে প্রবেশের জন্য এটি আগে থেকেই প্রস্তুত করেছিল।

আমেরিকা মহাদেশ: দ্য ক্রাই অফ দোলোরেস

  • ১৮১০ – মেক্সিকান স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা: ১৬ই সেপ্টেম্বরের ভোরে, মিগুয়েল হিডালগো ওয়াই কসটিলা নামের একজন প্রগতিশীল ক্যাথলিক যাজক মেক্সিকোর দোলোরেস নামক ছোট্ট শহরের গির্জার ঘণ্টা বাজান। তিনি একটি আবেগময় ভাষণ দেন যা ‘গ্রিতো দে দোলোরেস’ (Grito de Dolores বা দোলোরেসের কান্না) নামে পরিচিত। তিনি নিপীড়ক স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য তার মণ্ডলীকে আহ্বান জানান। এই স্ফুলিঙ্গ একটি নৃশংস, দশক-ব্যাপী যুদ্ধের সূচনা করেছিল যার ফলস্বরূপ মেক্সিকো স্বাধীনতা লাভ করে। আজও, ১৬ই সেপ্টেম্বর মেক্সিকোর স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়, যেখানে মেক্সিকো সিটিতে প্রেসিডেন্ট সেই একই ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়ে দিনটির সূচনা করেন।

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ: ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে

  • ১৯৯২ – ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে (কালো বুধবার): ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক মর্যাদায় এক বিশাল আঘাত হেনে, যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় এক্সচেঞ্জ রেট মেকানিজম (ERM) থেকে পাউন্ড স্টার্লিংকে আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। মুদ্রা ফটকাবাজরা, যাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন জর্জ সোরোস (যিনি “ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড ভেঙেছিলেন” বলে পরিচিত), ব্যাপকভাবে পাউন্ডের ‘শর্ট-সেল’ করেন। একদিনে সুদের হার অভাবনীয় ১৫% এ উন্নীত করা সত্ত্বেও, সরকার কৃত্রিমভাবে মুদ্রার মান ধরে রাখতে পারেনি। এই বিপর্যয়ের ফলে যুক্তরাজ্যের কোষাগারের বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হয়, অর্থনৈতিক যোগ্যতার ক্ষেত্রে কনজারভেটিভ পার্টির সুনাম গভীরভাবে ক্ষুণ্ন হয়, এবং ইউরোপীয় আর্থিক সংহতকরণের প্রতি ব্রিটিশদের মনে একটি গভীর সংশয় তৈরি হয় যা শেষ পর্যন্ত ‘ব্রেক্সিট’ (Brexit)-এর পথ প্রশস্ত করেছিল।

এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য: ট্র্যাজেডি ও প্রতিবাদ

  • ১৯৮২ – সাবরা ও শাতিলা গণহত্যা: লেবাননের গৃহযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে, ডানপন্থী খ্রিস্টান ফালাঞ্জিস্ট মিলিশিয়ারা বৈরুতের সাবরা এবং শাতিলা ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে প্রবেশ করে। পরবর্তী দুই দিন ধরে, এই মিলিশিয়ারা ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি শরণার্থী এবং লেবাননের বেসামরিক নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করে। শিবিরগুলো ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল, যারা রাতের আকাশ আলোকিত করার জন্য ফ্লেয়ার ছুঁড়েছিল কিন্তু কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। এই গণহত্যাটি বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

  • ২০২২ – মাহশা আমিনির মৃত্যু: একটি আধুনিক ট্র্যাজেডি যা পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল; ২২ বছর বয়সী মাহশা জিনা আমিনি ইরানের তেহরানের একটি হাসপাতালে মারা যান। অভিযোগ ছিল যে, তিনি তার হিজাব ‘সঠিকভাবে’ পরিধান না করার কারণে দেশটির “নৈতিকতা পুলিশ” দ্বারা আটক হওয়ার পর নির্যাতিত হয়েছিলেন। তার এই অকাল মৃত্যু “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” (Woman, Life, Freedom) ব্যানারে একটি অভূতপূর্ব দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছিল। এই আন্দোলনে নারীদের রাস্তায় নেমে তাদের হেডস্কার্ফ পোড়াতে দেখা যায়, যার ফলশ্রুতিতে সরকার নির্মম দমন-পীড়ন চালায় এবং এটি আধুনিক ইরানের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে চিরতরে বদলে দেয়।

বিশ্বজুড়ে উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যু

১৬ই সেপ্টেম্বর বিশ্বকে যেমন বহু প্রতিভাবান শিল্পী, বিপ্লবী চিন্তাবিদ এবং বৈজ্ঞানিক পথপ্রদর্শকদের উপহার দিয়েছে, তেমনি বিদায় জানিয়েছে অনেক রাজা, সঙ্গীত জগতের আইকন এবং যুগান্তকারী মনোবিজ্ঞানীদের।

১৬ই সেপ্টেম্বরে বিখ্যাত জন্ম

নাম জন্মের বছর জাতীয়তা পেশা / খ্যাতি
বি.বি. কিং ১৯২৫ আমেরিকান কিংবদন্তি ব্লুজ গিটারিস্ট, গায়ক এবং গীতিকার। তিনি তার গিটারের নাম রেখেছিলেন “লুসিল”।
লরেন বাকল ১৯২৪ আমেরিকান আইকনিক হলিউড অভিনেত্রী, যিনি তার জাদুকরী কণ্ঠস্বর এবং ফিল্ম নোয়ার ক্লাসিকের জন্য বিখ্যাত।
নিক জোনাস ১৯৯২ আমেরিকান পপ গায়ক, গীতিকার এবং অভিনেতা; বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ‘জোনাস ব্রাদার্স’-এর সদস্য।
ডেভিড কপারফিল্ড ১৯৫৬ আমেরিকান বিশ্ববিখ্যাত জাদুকর, যিনি স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকে “উধাও” করে দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
রিচার্ড মার্ক্স ১৯৬৩ আমেরিকান মাল্টি-প্লাটিনাম পপ/রক গায়ক-গীতিকার এবং প্রযোজক (বিখ্যাত গান: “Right Here Waiting”)।

বি.বি. কিং (১৯২৫-২০১৫) শুধুমাত্র ব্লুজ বাজাননি; তিনি বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের জন্য এই জঁনরাটিকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। মিসিসিপির একটি আবাদি জমিতে জন্মগ্রহণ করা রিলে বি. কিং একসময় “কিং অফ দ্য ব্লুজ” বা ব্লুজের রাজা হয়ে ওঠেন। তার অনন্য স্টাইল এরিক ক্ল্যাপটন থেকে শুরু করে জন মেয়ার পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি রক এবং ব্লুজ গিটারিস্টকে প্রভাবিত করেছে।

লরেন বাকল (১৯২৪-২০১৪) ১৯৪৪ সালের ‘টু হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভ নট’ (To Have and Have Not) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পর্দায় আবির্ভূত হন। তার তীব্র দৃষ্টি (যাকে “দ্য লুক” বলা হতো) এবং ধোঁয়াটে কণ্ঠস্বর তাকে হলিউডের সোনালী যুগের এক অনস্বীকার্য টাইটান বা মহারথীতে পরিণত করেছিল।

১৬ই সেপ্টেম্বরে বিখ্যাত মৃত্যু

নাম মৃত্যুর বছর জাতীয়তা কারণ / উত্তরাধিকার
মারিয়া ক্যালাস ১৯৭৭ গ্রিক-আমেরিকান ২০ শতকের অন্যতম বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী অপেরা সোপ্রানো; হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।
জ্যাঁ পিয়াজেঁ ১৯৮০ সুইস প্রবর্তক বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানী, যিনি শিশুরা কীভাবে শেখে সে সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিলেন।
মার্ক বোলান ১৯৭৭ ইংলিশ টি. রেক্স-এর লিড সিঙ্গার এবং গ্ল্যাম রক আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শক; ৩০ তম জন্মদিনের ঠিক আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান।
ড্যানিয়েল গ্যাব্রিয়েল ফারেনহাইট ১৭৩৬ পোলিশ/জার্মান পদার্থবিদ, যিনি পারদ-ভিত্তিক থার্মোমিটার এবং ফারেনহাইট স্কেল উদ্ভাবন করেছিলেন।
অষ্টাদশ লুই (Louis XVIII) ১৮২৪ ফরাসি ফ্রান্সের রাজা যিনি নেপোলিয়নের পতনের পর সিংহাসন গ্রহণ করেছিলেন; বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় মারা যান।

মারিয়া ক্যালাস (১৯২৩-১৯৭৭), যিনি ‘লা ডিভিনা’ নামে পরিচিত ছিলেন, এমন এক জাদুকরী কণ্ঠস্বর এবং নাটকীয় তীব্রতার অধিকারী ছিলেন যা আধুনিক অপেরাকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিয়েছিল।

জ্যাঁ পিয়াজেঁ (১৮৯৬-১৯৮০) বিশ্বব্যাপী শিক্ষার দৃষ্টান্তকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছিলেন। পিয়াজেঁর আগে, মনোবিজ্ঞানীরা মূলত শিশুদের কেবল ‘কম দক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক’ হিসেবেই দেখতেন। পিয়াজেঁর জ্ঞানীয় বিকাশের তত্ত্ব প্রমাণ করে যে শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে চিন্তা করে। তার কাজ আজও বিশ্বব্যাপী প্রারম্ভিক শৈশব শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর।

“আপনি কি জানেন?” (আকর্ষণীয় তথ্য)

আপনি যদি ১৬ই সেপ্টেম্বর কোনো আড্ডায় থাকেন, তবে সবাইকে চমকে দেওয়ার মতো তিনটি চমৎকার, কম পরিচিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

  1. আপনার থার্মোমিটারের উৎপত্তি: যে মানুষটি তাপমাত্রার মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন, সেই ড্যানিয়েল গ্যাব্রিয়েল ফারেনহাইট ১৭৩৬ সালের এই দিনেই মারা যান। তিনি কেবল তার নামের তাপমাত্রার স্কেলটিই উদ্ভাবন করেননি; তিনি ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সফলভাবে একটি সুনির্দিষ্ট পারদ-ভিত্তিক থার্মোমিটার তৈরি করেছিলেন, যা পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী বিপ্লব এনেছিল।

  2. বীরত্বের এক অবিশ্বাস্য গল্প: ১৯৭৬ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর, শাভারশ কারাপেতিয়ান নামের একজন ২৩ বছর বয়সী আর্মেনিয়ান চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু ইয়েরেভানের একটি জলাধারের কাছে দৌড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পান যে একটি যাত্রীবোঝাই ট্রলিবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়ে ৩৩ ফুট গভীর বরফশীতল, পয়ঃনিষ্কাশনের বিষাক্ত পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। কারাপেতিয়ান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে পানিতে ঝাঁপ দেন, ডুবে যাওয়া বাসের একটি জানালা ভেঙে ফেলেন এবং বারবার ডুব দিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০ জন অজ্ঞান মানুষকে নিরাপদে টেনে তোলেন। তার এই বীরত্ব তার নিজের অ্যাথলেটিক ক্যারিয়ার কেড়ে নিয়েছিল, কারণ বিষাক্ত পানি এবং গভীর ক্ষতের কারণে তিনি নিউমোনিয়া ও সেপসিসে আক্রান্ত হয়ে কয়েক সপ্তাহ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছিলেন।

  3. বিদেশে আমেরিকান শিক্ষা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তের বাইরে প্রতিষ্ঠিত প্রথম আমেরিকান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ১৮৬৩ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমেরিকান সমাজসেবী ক্রিস্টোফার রবার্ট এবং মিশনারি সাইরাস হ্যামলিন তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ‘রবার্ট কলেজ’ খোলেন, যা আমেরিকান শিক্ষাপদ্ধতি এবং অটোমান সংস্কৃতির মধ্যে একটি অনন্য সেতু হিসেবে দাঁড়িয়েছিল।

শেষ কথা

১৬ই সেপ্টেম্বর মানব অস্তিত্বের এক অসাধারণ ও মিশ্র প্রতিচ্ছবি। এটি এমন একটি দিন যা লেবাননে মর্মান্তিক গণহত্যা এবং বাংলায় ঔপনিবেশিক বর্বরতার ভারী বোঝা বহন করে, তবুও এটি এমন একটি দিন যা মেক্সিকো এবং পাপুয়া নিউ গিনির স্বাধীনতা উদযাপন করে। এই দিনটিতেই পৃথিবী উপহার পেয়েছে বি.বি. কিং-এর প্রাণস্পর্শী ব্লুজ মিউজিক এবং এই দিনেই আমরা হারিয়েছি মারিয়া ক্যালাসের অপেরাটিক প্রতিভাকে।

ইতিহাস একটি অবিচ্ছিন্ন জাল। এই দিনে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা বৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলো সময়ের স্রোতে এমন ঢেউ তুলেছে যা আমাদের বর্তমান বিশ্বকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করছে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে, অতীতের অর্থনৈতিক ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং যারা পৃথিবীতে সৌন্দর্য নিয়ে এসেছেন সেইসব শিল্পীদের সম্মান জানানোর মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করি যে অতীত কখনোই হারিয়ে যায় না। আরও একটি ১৬ই সেপ্টেম্বর উদযাপন করার সময়, আমাদের মনে রাখতে হবে—আমরাও প্রতিদিনের এই ইতিহাস রচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সর্বশেষ