ইতিহাস ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকা নিছক কিছু তারিখের সমষ্টি নয়; এটি মানবজাতির জয়-পরাজয়, বিপ্লব, বিষাদ এবং নীরব প্রতিভাদের এক জীবন্ত দলিল। ৫ই সেপ্টেম্বর ঠিক এমনই একটি অসাধারণ দিন, যা মানব অভিজ্ঞতার পুরো স্পেকট্রামকে নিজের মধ্যে ধারণ করে আছে। ঠিক এই তারিখে পৃথিবীর বুকে বড় বড় সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে, নতুন চুক্তিতে বিশ্বের মানচিত্র নতুন করে আঁকা হয়েছে, জন্ম নিয়েছেন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষেরা, আর বিদায় নিয়েছেন কিংবদন্তিরা।
ভারতীয় উপমহাদেশের দার্শনিকদের জন্ম থেকে শুরু করে মিউনিখ অলিম্পিকের নির্মম ট্র্যাজেডি, কিংবা সৌরজগৎ ছাড়িয়ে অসীমের পানে ছুটে চলা মহাকাশযানের উৎক্ষেপণ—সব মিলিয়ে ৫ই সেপ্টেম্বর এক সুগভীর তাৎপর্য বহন করে। চলুন, সময়ের পাতা উল্টে এই দিনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে ফিরে যাই।
বাঙালি পরিমণ্ডল ও ভারতবর্ষ
ভারতীয় উপমহাদেশের রয়েছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ, ঘটনাবহুল এবং প্রভাবশালী এক ইতিহাস। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৫ই সেপ্টেম্বর অধিকার আদায়, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং নতুন ইতিহাস রচনার এক অনন্য স্মারক।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলি
-
গোয়ালহাটির যুদ্ধ (১৯৭১): নয় মাস ব্যাপী বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রায় ৩০ লক্ষ নিরীহ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই ভয়াবহ গণহত্যার মাঝেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাঙালিরা। ১৯৭১ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর যশোরের গোয়ালহাটিতে এক রোমহর্ষক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ, যিনি বিদ্রোহ করে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, এই দিন অকল্পনীয় বীরত্বের প্রমাণ দেন। টহলে থাকা অবস্থায় তার দল পাকিস্তানি বাহিনীর অতর্কিত হামলার শিকার হয়। মর্টারের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পরও তিনি হাল ছাড়েননি। একটি লাইট মেশিনগান (LMG) দিয়ে তিনি ক্রমাগত ফায়ারিং বা ‘কাভারিং ফায়ার’ দিয়ে যান, যাতে তার সহযোদ্ধারা নিরাপদে পিছু হটতে পারে। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। তার এই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘বীর শ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ভাষা, সংস্কৃতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য লড়াই করা এক জাতির অদম্য সাহসের প্রতীক হয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন।
-
এআইটিইউসি-এর ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা (১৯৪৭): ভারত ভাগের ঠিক কয়েক সপ্তাহ পরের কথা। এই অঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলনে তখন ব্যাপক রদবদল চলছিল। ১৯৪৭ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর মুম্বাইতে ‘অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’ (AITUC)-এর জেনারেল কাউন্সিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গ্রহণ করে। এর ফলশ্রুতিতেই পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জে ‘পূর্ব পাকিস্তান ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন’ (EPTUF) প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত নতুন এই ভূখণ্ডের শ্রমিকদের অধিকার আদায় এবং একটি সুসংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের ভিত্তিমূল।
-
‘জুলাই বিপ্লব’-এর এক মাস পূর্তি (২০২৪): বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ৫ই সেপ্টেম্বর এক নতুন মাত্রায় যোগ হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। একে অনেকেই ‘জুলাই বিপ্লব’ আখ্যা দিয়েছেন। ৫ই সেপ্টেম্বর সেই অবিস্মরণীয় বিপ্লবের ঠিক এক মাস পূর্তির দিন। এই দিনটি এখন সেই অকুতোভয় শহীদদের স্মরণ করার এক আবেগঘন ক্ষণ, যারা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। এটি গুম, খুন ও দুর্নীতিমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার নতুন শপথ নেওয়ার দিন।
বিখ্যাত জন্ম
-
ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ (১৮৮৮): তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির চিত্তুর জেলার এক তেলেগুভাষী পরিবারে জন্ম নেওয়া রাধাকৃষ্ণাণ ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মতত্ত্ব ও তুলনামূলক দর্শনের পণ্ডিত। তিনি ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি (১৯৫২-১৯৬২) এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি (১৯৬২-১৯৬৭) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নিজের জন্মদিনটি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যাপন না করে দিনটিকে দেশের শিক্ষকদের প্রতি উৎসর্গ করার অনুরোধ করেছিলেন। “দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদেরই শিক্ষক হওয়া উচিত”—তার এই বিশ্বাস আজও ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলে।
-
নজিব তারেক (১৯৭০): বাংলাদেশের দিনাজপুরে জন্মগ্রহণকারী এই গুণী শিল্পী দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল আর্ট স্পেসে একজন অগ্রদূত। একজন প্রখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী, প্রিন্টমেকার ও লেখক হিসেবে তিনি বাংলাদেশে প্রথম দিকের একটি অনলাইন আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করেন। ঐতিহ্যবাহী বাঙালি শিল্পকলার মোটিফের সাথে বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল শিল্পের মেলবন্ধন ঘটানোর জন্য তিনি ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
বিখ্যাত মৃত্যু
-
এম. সাইফুর রহমান (২০০৯): বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব। তিনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করে রেকর্ড গড়েন। পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এই মানুষটি সত্তরের দশকের শেষভাগ এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯২ সালে ভ্যাট (VAT) ব্যবস্থা চালুর কৃতিত্ব তারই। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেরও একজন লড়াকু সৈনিক ছিলেন এবং এর স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক লাভ করেন। ২০০৯ সালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান।
-
নীরজা ভানোট (১৯৮৬): প্যান অ্যাম এয়ারলাইন্সের একজন সিনিয়র ফ্লাইট পার্সার ছিলেন নীরজা। ১৯৮৬ সালের এই দিনে করাচিতে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩ সন্ত্রাসীদের দ্বারা ছিনতাই হওয়ার পর, মাত্র ২২ বছর বয়সী এই অকুতোভয় নারী নিজের জীবনের বিনিময়ে শত শত যাত্রীকে বাঁচিয়েছিলেন। তার এই বীরত্বের জন্য তাকে ভারতের সর্বোচ্চ শান্তিকালীন সাহসিকতার পুরস্কার ‘অশোক চক্র’ প্রদান করা হয়। তিনিই এই পুরস্কারের কনিষ্ঠতম প্রাপক।
সাংস্কৃতিক ও আন্তর্জাতিক দিবসসমূহ

-
শিক্ষক দিবস (ভারত): ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৬২ সাল থেকে ভারতে ৫ই সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
-
আন্তর্জাতিক চ্যারিটি দিবস: মাদার তেরেসার মৃত্যুবার্ষিকী (৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৯৭) স্মরণে জাতিসংঘ এই দিনটি পালন করে। এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে স্বেচ্ছাসেবা ও দাতব্য কাজকে উৎসাহিত করা।
-
বিশ্ব সামোসা দিবস: দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় তুমুল জনপ্রিয় ত্রিভুজাকৃতির এই মুখরোচক খাবারটির বিশ্বব্যাপী উদযাপন।
-
জাতীয় চিজ পিজ্জা দিবস (যুক্তরাষ্ট্র): যুক্তরাষ্ট্রে পিজ্জার সবচেয়ে সাধারণ অথচ জনপ্রিয় রূপটিকে উদযাপনের একটি মজাদার দিন।
বিশ্ব ইতিহাস
ইতিহাস গভীরভাবে পরস্পরের সাথে যুক্ত। এক গোলার্ধে কিছু ঘটলে তার ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়ে অন্য প্রান্তে। ৫ই সেপ্টেম্বর বিশ্বরাজনীতি থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণার অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার নীরব সাক্ষী।
যুক্তরাষ্ট্র
-
প্রথম কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের সম্মেলন (১৭৭৪): ব্রিটিশ পার্লামেন্টের দমনমূলক ‘ইনটলারেন্স অ্যাক্টস’-এর প্রতিবাদে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ার কার্পেন্টার্স হলে ১৩টি উপনিবেশের ১২টির ৫৬ জন প্রতিনিধি জড়ো হন (জর্জিয়া অংশ নেয়নি)। জর্জ ওয়াশিংটন, জন অ্যাডামস ও প্যাট্রিক হেনরির মতো নেতারা ব্রিটিশ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তাদের করণীয় নিয়ে বিতর্ক করেন। এই ঐতিহাসিক সমাবেশটিই মূলত আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
-
স্যাম হিউস্টন টেক্সাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত (১৮৩৬): স্যান জাসিন্টোর যুদ্ধে মেক্সিকান বাহিনীর বিরুদ্ধে টেক্সিয়ানদের বিজয়ের পর ‘রিপাবলিক অফ টেক্সাস’ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সামরিক বীর স্যাম হিউস্টন এই দিনে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
-
প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের ওপর হত্যাচেষ্টা (১৯৭৫): কুখ্যাত কাল্ট লিডার চার্লস ম্যানসনের অনুসারী লিনেট “স্কুইকি” ফ্রোম ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাক্রামেন্টোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডকে হত্যার চেষ্টা করেন। তিনি খুব কাছ থেকে একটি লোডেড এম১৯১১ পিস্তল তাক করলেও সেটি ফায়ার করতে ব্যর্থ হয়। এই ঘটনাটি সে যুগে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার গুরুতর ত্রুটিগুলো জনসমক্ষে নিয়ে আসে।
-
ভয়েজার ১-এর উৎক্ষেপণ (১৯৭৭): এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক অর্জন। সৌরজগতের বাইরের অংশ নিয়ে গবেষণার জন্য নাসা ভয়েজার ১ নামের মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করে। এতে রাখা হয়েছে একটি ‘গোল্ডেন রেকর্ড’—যাতে পৃথিবীর নানা ভাষার শব্দ, ছবি এবং একটি শিশুর কপালে মায়ের চুম্বনের শব্দ রেকর্ড করা আছে, যা ভিনগ্রহের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর উদ্দেশ্যে পাঠানো। ভয়েজার ১ বর্তমানে মানুষের তৈরি সবচেয়ে দূরবর্তী বস্তু, যা ইতিমধ্যেই আমাদের সৌরজগৎ পার হয়ে গেছে।
ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য
-
দ্য রেইন অব টেরর বা সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু (১৭৯৩): ফরাসি বিপ্লব তখন তার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবেস্পিয়েরের প্রভাবে ন্যাশনাল কনভেনশন ঘোষণা করে যে, “সন্ত্রাসই এখনকার একমাত্র বিধান।” শুরু হয় গিলোটিনে শিরশ্ছেদের উৎসব। বিপ্লবের শত্রু সন্দেহে হাজার হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
-
বেনেলাক্স (Benelux) গঠন (১৯৪৪): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন ইউরোপে শেষের দিকে, তখন বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গের নির্বাসিত সরকারগুলো লন্ডনে বসে একটি কাস্টমস ইউনিয়ন গঠনের চুক্তি স্বাক্ষর করে। এটি ইউরোপীয় অর্থনৈতিক ঐক্যের একটি বড় পদক্ষেপ ছিল এবং পরবর্তীতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU) গঠনের মূল নকশা হিসেবে কাজ করে।
-
মিউনিখ অলিম্পিক গণহত্যা (১৯৭২): ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত যখন ক্রীড়াঙ্গনে আছড়ে পড়ল, বিশ্ব এক ভয়াবহ আতঙ্কের সাক্ষী হলো। ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’-এর সদস্যরা পশ্চিম জার্মানির মিউনিখ অলিম্পিক ভিলেজে ঢুকে ১১ জন ইসরায়েলি অ্যাথলেট ও কোচকে জিম্মি করে। তাদের দাবি ছিল ইসরায়েলে বন্দি ২০০ ফিলিস্তিনির মুক্তি। উদ্ধার অভিযানটি চরমভাবে ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১১ জন ইসরায়েলি জিম্মি, একজন জার্মান পুলিশ ও পাঁচজন সন্ত্রাসী নিহত হয়। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চিরতরে বদলে দেয়।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত
-
পোর্টসমাউথ চুক্তি (১৯০৫): মাঞ্চুরিয়া ও কোরিয়া নিয়ে রুশ ও জাপানি সাম্রাজ্যের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে এই চুক্তির মাধ্যমে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের মধ্যস্থতায় এটি স্বাক্ষরিত হয় (যার জন্য তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন)। আধুনিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনো এশিয়ান পরাশক্তি ইউরোপিয়ান শক্তিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে, যা জাপানের বিশ্বশক্তি হিসেবে উত্থান এবং রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের বিপ্লবের বীজ বপন করেছিল।
-
মুহাম্মদ আলীর অলিম্পিক স্বর্ণজয় (১৯৬০): রোম অলিম্পিকে মাত্র ১৮ বছর বয়সী আমেরিকান বক্সার ক্যাসিয়াস ক্লে (যিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মদ আলী নাম ধারণ করেন) লাইট হেভিওয়েট বিভাগে স্বর্ণপদক জেতেন। এটি শুধু একজন কিংবদন্তির উত্থানই ছিল না, বিশ্বব্যাপী নাগরিক অধিকার আন্দোলনেও এটি গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
বিশ্ববিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু
বিখ্যাত জন্ম
-
চতুর্দশ লুই (১৬৩৮): ফরাসি এই সম্রাট ‘সান কিং’ নামে পরিচিত। তিনি টানা ৭২ বছর ফ্রান্স শাসন করেন, যা স্বাধীন কোনো দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম রাজত্বের রেকর্ড। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ করেন, ভার্সাই প্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং ফ্রান্সকে সামরিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
-
জেসি জেমস (১৮৪৭): আমেরিকান ওয়াইল্ড ওয়েস্টের কিংবদন্তি হয়ে ওঠা এক দুর্ধর্ষ ডাকাত এবং ট্রেন লুণ্ঠনকারী।
-
ফ্রেডি মার্কারি (১৯৪৬): ব্রিটিশ রক ব্যান্ড ‘কুইন’-এর কিংবদন্তি মূল গায়ক। তার চার-অক্টেভ কণ্ঠস্বর এবং মঞ্চের জাদুকরী উপস্থিতি রক মিউজিকের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।
-
ওয়ার্নার হারজগ (১৯৪২): প্রখ্যাত জার্মান চলচ্চিত্র পরিচালক, যিনি তার সাহসী এবং জীবনের ঝুঁকি নেওয়া ডকুমেন্টারি ও নির্মাণের জন্য বিখ্যাত।
-
মাইকেল কিটন (১৯৫১): ‘ব্যাটম্যান’, ‘বিটলজুস’ এবং অস্কার-মনোনীত ‘বার্ডম্যান’ খ্যাত অত্যন্ত জনপ্রিয় হলিউড অভিনেতা, যিনি কমেডি ও ড্রামায় সমান দক্ষ।
বিখ্যাত মৃত্যু
-
ক্রেজি হর্স (১৮৭৭): যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা এক অকুতোভয় নেটিভ আমেরিকান (লাকোটা) যোদ্ধা। লিটল বিগহর্নের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া এই বীরকে আত্মসমর্পণের পর এক প্রহরী বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।
-
লুডভিগ বোলটজম্যান (১৯০৬): প্রখ্যাত অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্স তৈরি করেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের কাছে নিজের যুগান্তকারী তত্ত্বগুলো স্বীকৃতি না পাওয়ার হতাশায় তিনি আত্মহত্যা করেন।
-
মাদার তেরেসা (১৯৯৭): কলকাতার বস্তিতে দুস্থ, অনাথ ও মুমূর্ষুদের সেবায় আজীবন উৎসর্গকারী ক্যাথলিক নান। ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’-এর প্রতিষ্ঠাতা এই মহীয়সী নারী ১৯৭৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান।
-
ইয়োখেন রিন্ট (১৯৭০): ইতালীয় গ্র্যান্ড প্রিক্সে অনুশীলনের সময় নিহত হওয়া এক দুর্দান্ত ফর্মুলা ওয়ান রেসার। মৃত্যুর আগেই তিনি এত বেশি পয়েন্ট অর্জন করেছিলেন যে, তাকে মরণোত্তর ফর্মুলা ওয়ান ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। তিনিই এই খেতাব পাওয়া একমাত্র মরণোত্তর চ্যাম্পিয়ন।
চমকপ্রদ অজানা তথ্য
-
হলিউডের প্রথম বড় স্ক্যান্ডাল: আধুনিক যুগে ‘সেলিব্রিটি স্ক্যান্ডাল’ বলতে আমরা যা বুঝি, তার সূচনা হয়েছিল ১৯২১ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর। নীরব যুগের অত্যন্ত জনপ্রিয় কমেডি তারকা রস্কো ‘ফ্যাটি’ আরবাকলের আয়োজিত এক উদ্দাম পার্টিতে ভার্জিনিয়া র্যাপে নামক এক তরুণী অভিনেত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এর ফলে শুরু হওয়া মিডিয়া ট্রায়াল আরবাকলের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেয় এবং হলিউড তাদের প্রথম নৈতিক সেন্সরশিপ গাইডলাইন (Hays Code) তৈরি করতে বাধ্য হয়।
-
দাড়ির ওপর কর!: রাশিয়ার সমাজকে পশ্চিমাদের মতো আধুনিক করার এক অদ্ভুত পদক্ষেপ নেন জার পিটার দ্য গ্রেট। ১৬৯৮ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর তিনি আক্ষরিক অর্থেই পুরুষদের দাড়ির ওপর কর আরোপ করেন। কেউ দাড়ি রাখতে চাইলে তাকে চড়া ফি দিয়ে একটি তামার টোকেন সাথে রাখতে হতো; তা না হলে রাস্তায় পুলিশ জোর করে দাড়ি কেটে দিত!
-
মানুষের তৈরি সবচেয়ে দূরের বস্তু: ১৯৭৭ সালে যখন ভয়েজার ১ যাত্রা শুরু করে, তখন কেউ ভাবতেও পারেনি এটি ঠিক কতটা দূরে যাবে। এটি বর্তমানে ঘণ্টায় প্রায় ৩৮,০০০ মাইল বেগে পৃথিবী থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন মাইল দূরে, নক্ষত্রমণ্ডলীর গভীর অন্ধকারে ছুটে চলেছে। যদি অন্য কোনো সভ্যতার হাতে এটি গিয়ে পড়ে, তবে তারা সেখানে ৫৫টি ভাষায় শুভেচ্ছা বার্তা, মানুষের হৃদস্পন্দন এবং পৃথিবীর স্পন্দন শুনতে পাবে।
শেষ কথা
৫ই সেপ্টেম্বর যেন মানব ইতিহাসেরই এক ক্ষুদ্র সংস্করণ। এই দিনটি যেমন বাংলাদেশের রণাঙ্গন বা মিউনিখ অলিম্পিক ভিলেজের গভীর শোকের চিহ্ন বহন করে, তেমনি ইউরোপে শান্তি ফেরানোর অর্থনৈতিক জোট গঠন কিংবা মহাজাগতিক অসীমে মানুষের ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়ার অবিশ্বাস্য অর্জনেরও সাক্ষী।
ইতিহাসের এই দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমরা শুধু অতীত পড়ি না; বরং ভবিষ্যতের পথ চলার দিশা খুঁজে পাই। হোক তা শহীদদের রক্তে ভেজা আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান, জীবন বদলে দেওয়া কোনো শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা, কিংবা রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ভয়েজার ১-এর অসীম যাত্রা নিয়ে বিস্ময়—৫ই সেপ্টেম্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিটি দিনই বিশ্ব বদলে দেওয়ার এক অনন্য সম্ভাবনা লুকিয়ে রাখে। ইতিহাস কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি আমাদের হাতেই প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত নতুন করে লেখা হচ্ছে।

