সময়ের অনন্ত প্রবাহে প্রতিদিন সূর্য ওঠে, আবার অস্ত যায়। কিন্তু ক্যালেন্ডারের কিছু পাতা এমন কিছু ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকে, যা চিরতরে বদলে দেয় পৃথিবীর ইতিহাস। ৭ই সেপ্টেম্বর ঠিক তেমনই একটি দিন। রাজপ্রাসাদের ষড়যন্ত্র থেকে শুরু করে স্বাধীনতার গর্জন, ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ থেকে কালজয়ী সাহিত্যের জন্ম—এই একটিমাত্র তারিখ ধারণ করে আছে মানব সভ্যতার উত্থান-পতন, রক্তপাত ও ঘুরে দাঁড়ানোর অগণিত গল্প।
আপনি যদি ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখতে ভালোবাসেন, তবে চলুন ফিরে যাই ৭ই সেপ্টেম্বরের সেই দিনগুলোতে, যেসব দিন আমাদের আজকের এই পৃথিবীকে রূপ দিয়েছে।
বাঙালি বলয় ও দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে ৭ই সেপ্টেম্বর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন।
-
১৯৪৭ – দেশভাগ পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন: ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঠিক পরপরই, পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) নতুন রাজনৈতিক জোট ও প্রতিরোধ গোষ্ঠী গড়ে উঠতে শুরু করে। গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় এবং সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা রক্ষার এই প্রাথমিক সংগ্রামগুলোই পরবর্তীতে মহান ভাষা আন্দোলনের শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল।
-
১৯৬৫ – ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আকাশযুদ্ধ: ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মুহূর্তে ৭ই সেপ্টেম্বর পাকিস্তান বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার এম. এম. আলম (যিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন) একটি বিতর্কিত অথচ কিংবদন্তিতুল্য সাফল্য অর্জন করেন। দাবি করা হয়, তিনি সরগোদার আকাশে এক মিনিটেরও কম সময়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর পাঁচটি হকার হান্টার যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিলেন।
-
১৯১৫ – বাঘা যতীনের শেষ প্রতিরোধ: ব্রিটিশবিরোধী কিংবদন্তি বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘা যতীন) যদিও ১০ই সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন, তবে ৭ই সেপ্টেম্বরের এই সময়ে তিনি এবং তার অনুসারীরা ঐতিহাসিক বুড়িবালামের যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এটি ছিল ঔপনিবেশিক পুলিশের বিরুদ্ধে এক দুঃসাহসিক ও রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম।
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম (১৯৩৪): আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সৃষ্টিশীল লেখক এবং কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই দিনে বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের পর তার পরিবার কলকাতায় চলে আসে। ১৯৫৩ সালে তিনি ও তার বন্ধুরা মিলে ‘কৃত্তিবাস’ নামের একটি কবিতা পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাংলা কবিতায় নতুন ছন্দ, থিম ও ভাষার এক যুগান্তকারী প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। ‘নীরা’ সিরিজের কবিতা থেকে শুরু করে কিশোরদের প্রিয় অ্যাডভেঞ্চার চরিত্র ‘কাকাবাবু’ (রাজা রায়চৌধুরী)—তার সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তার রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘সেই সময়’ ভারতের সম্মানজনক সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করে।
বিশ্ব ইতিহাস

ইউরোপ ও আমেরিকার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে চাঞ্চল্যকর গুপ্তহত্যা—৭ই সেপ্টেম্বর দেখেছে বিশ্বের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বহু ঘটনা।
-
১১৯১ – আরসুফের যুদ্ধ: তৃতীয় ক্রুসেড চলাকালীন ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম রিচার্ড (রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট) আরসুফের যুদ্ধে সালাদিনের বাহিনীকে পরাজিত করেন।
-
১৫৭১ – রানি এলিজাবেথকে হত্যার ষড়যন্ত্র (রিদোলফি প্লট): ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথকে হত্যা করে তার জায়গায় ‘মেরি, কুইন অব স্কটস’-কে বসানোর ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে থমাস হাওয়ার্ড (ডিউক অব নরফোক) গ্রেপ্তার হন।
-
১৮২২ – ব্রাজিলের স্বাধীনতা লাভ: ইপিরিঙ্গা নদীর তীরে যুবরাজ ডম পেড্রো তার বিখ্যাত “ইপিরিঙ্গার ডাক” (Cry of Ipiranga) উচ্চারণ করেন, যার মাধ্যমে পর্তুগালের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। দিনটি দেশটিতে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
-
১৯৭৮ – দ্য আমব্রেলা মার্ডার: লন্ডনের ওয়াটারলু ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় বুলগেরিয়ান ভিন্নমতাবলম্বী লেখক জর্জি মার্কভকে এক অভিনব উপায়ে গুপ্তহত্যা করা হয়। বুলগেরিয়ান সিক্রেট পুলিশের এক এজেন্ট একটি বিশেষ ছাতার সাহায্যে মার্কভের পায়ে বিষাক্ত রাইসিন (ricin) পুশ করে। চারদিন পর বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু হয়।
প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্থান
-
১৭৭৬ – প্রথম সাবমেরিন হামলা: পারমাণবিক সাবমেরিনের যুগে প্রবেশের অনেক আগে, আমেরিকান বিপ্লব চলাকালীন ‘টার্টল’ নামের একটি ডিম্বাকৃতির ডুবোজাহাজ ব্রিটিশ জাহাজে একটি টাইম বোমা যুক্ত করার চেষ্টা করে। মিশনটি ব্যর্থ হলেও তা নৌযুদ্ধের ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
-
১৯২৩ – ইন্টারপোল প্রতিষ্ঠা: আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন এবং পুলিশি সহযোগিতার উদ্দেশ্যে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক অপরাধী পুলিশ সংস্থা (INTERPOL) গঠিত হয়।
-
১৯২৭ – ইলেকট্রনিক টেলিভিশন: ফিলো ফার্নসওয়ার্থ সফলভাবে বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক টেলিভিশন সিস্টেম উদ্ভাবন করেন।
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যু
| বছর | নাম | জাতীয়তা | পরিচিতির কারণ |
| ১৫৩৩ | রানি প্রথম এলিজাবেথ | ইংলিশ | ইংল্যান্ডের স্বর্ণযুগের শাসক। তার দীর্ঘ নেতৃত্বেই স্প্যানিশ আর্মাডার পতন ঘটে। |
| ১৯০৯ | এলিয়া কাজান | গ্রিক-আমেরিকান | অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকার। |
| ১৯১২ | ডেভিড প্যাকার্ড | আমেরিকান | প্রখ্যাত প্রকৌশলী এবং প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘হিউলেট-প্যাকার্ড’ (HP)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। |
| ১৯৩৬ | বাডি হলি | আমেরিকান | রক অ্যান্ড রোলের অন্যতম পথিকৃৎ। তার সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ার দ্য বিটলস ও বব ডিলানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। |
| ১৯৪৩ | গ্লোরিয়া গেনর | আমেরিকান | ‘ডিস্কো কুইন’ গায়িকা, যার “I Will Survive” গানটি আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীকে পরিণত হয়। |
| ১৯৭৮ | কিথ মুন (মৃত্যু) | ব্রিটিশ | বিখ্যাত রক ব্যান্ড ‘দ্য হু’-এর প্রতিভাবান ড্রামার। মাত্র ৩২ বছর বয়সে ড্রাগের ওভারডোজে তার আকস্মিক মৃত্যু হয়। |
| ১৯৯৬ | টুপাক শাকুর (গুলিবিদ্ধ) | আমেরিকান | কিংবদন্তি হিপ-হপ শিল্পীকে লাস ভেগাসে এই দিনে চলন্ত গাড়ি থেকে গুলি করা হয় (১৩ই সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন)। |
অজানা ও চমকপ্রদ তথ্য
-
মোনা লিসা চুরির সন্দেহ: ১৯১১ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর ফরাসি পুলিশ বিখ্যাত কবি গিয়োম অ্যাপোলিনেয়ারকে লুভ্যর মিউজিয়াম থেকে ‘মোনা লিসা’ চুরির সন্দেহে গ্রেপ্তার করে। তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে এর আগে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোকেও পুলিশি জেরার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
-
বক্সার বিদ্রোহের অবসান: ১৯০১ সালের এই দিনে ‘বক্সার প্রোটোকল’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে চীনে দীর্ঘস্থায়ী বক্সার বিদ্রোহের (Boxer Rebellion) আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
-
নারী স্বাধীনতা প্রতিবাদের সূচনা: ১৯৬৮ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর আটলান্টিক সিটিতে মিস আমেরিকা প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে নারীবাদী সংগঠকরা তাদের অন্তর্বাস, হাই হিল এবং কর্সেট একটি “ফ্রিডম ট্র্যাশ ক্যান”-এ ছুড়ে ফেলে অভিনব প্রতিবাদ জানান।
শেষ কথা
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর সাথে সাথে ৭ই সেপ্টেম্বরের এই ঘটনাবহুল ইতিহাস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, মানবসভ্যতা মূলত ধ্বংস ও সৃষ্টির এক অন্তহীন আবর্তনের নাম। একদিকে যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমারু বিমান শহরকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, রচিত হয়েছে অমর সাহিত্য। বাঘা যতীনের অসমসাহসিকতা, সুনীলের কালজয়ী শব্দজগত কিংবা ব্রাজিলের স্বাধীনতার উল্লাস—সব কিছুই সময়ের ক্যানভাসে আঁকা এক একটি অবিস্মরণীয় চিত্র।
ইতিহাস কেবল অতীতের ধূসর দলিল নয়, এটি আমাদের বর্তমানের আয়না এবং ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। ৭ই সেপ্টেম্বরের এই বৈচিত্র্যময় ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, শত বাধা আর বিপর্যয়ের পরও মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ও সৃষ্টিশীলতা যেকোনো ধ্বংসযজ্ঞের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।

