৫৫ বছরে বাংলাদেশ: আসলে আমরা কতদূর এগোলাম? [একজন সাধারণ নাগরিকের নির্মোহ বিশ্লেষণ]

সর্বাধিক আলোচিত

২৬শে মার্চ, ২০২৬। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্ণ হলো। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজ স্বাভাবিকভাবেই মনে একটা প্রশ্ন জাগে—এই সাড়ে পাঁচ দশকে আমরা ঠিক কতটা পথ পাড়ি দিলাম?

রাজনৈতিক চটকদার কথা কিংবা শুধু কাগুজে পরিসংখ্যান সরিয়ে রেখে যদি একজন সাধারণ নাগরিকের চোখ দিয়ে দেখি, তবে বাংলাদেশের গল্পটা আসলে তীব্র প্রতিকূলতার মাঝেও টিকে থাকার এক অবিশ্বাস্য রূপকথা। ১৯৭১ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে, পশ্চিমাদের দেওয়া ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ আজ ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল অর্থনীতি।

তবে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের গল্পটা শুধু আর ‘টিকে থাকার’ নয়; বরং এটি এখন ‘কেমন আছি’ বা জীবনমানের গল্প। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ এখন এক যন্ত্রণাদায়ক কিন্তু অতি-প্রয়োজনীয় সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি, স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে, আসুন সহজ ভাষায় ও সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে দেশের বর্তমান অবস্থাটা একটু তলিয়ে দেখি।

প্রবৃদ্ধির ধাক্কা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা: ২০২৪-পরবর্তী অর্থনীতি

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেন একটা সোজা ওপরের দিকে ওঠা সিঁড়ির মতো ছিল, যার গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫%-এর ওপরে (মহামারির আগে যা প্রায় ৭.৮%-এ ঠেকেছিল)। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষের দিকের রাজনৈতিক পালাবদল এই কাঠামোতে একটা বড় ধাক্কা দেয়। অভ্যুত্থানের ফলে দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এলেও, সাময়িক নীতিগত অনিশ্চয়তা ও উৎপাদনে ধীরগতির কারণে অর্থনীতি কিছুটা হোঁচট খায়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৭%-এ নেমে আসে। কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের আসল ম্যাজিক! বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ পূর্বাভাস দিচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াবো এবং প্রবৃদ্ধি ৪.৭% থেকে ৪.৮%-এ পৌঁছাবে।

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার ফলে রিজার্ভের পতন ঠেকানো গেছে এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি (যা দুই অঙ্কের ঘরে চলে গিয়েছিল) কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে ৮.৫%-এ নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই ‘কড়া ওষুধের’ একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে—ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়া কমিয়ে দেওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান কম হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের কেনাকাটা বা ভোগ কমে গেছে। সহজ কথায়, দেশ হয়তো বড় অর্থনৈতিক বিপদ থেকে বেঁচেছে, কিন্তু সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য সময়টা এখনো বেশ কঠিন।

একনজরে আমাদের অর্থনীতির বর্তমান হালচাল:

অর্থনীতির মূল সূচক ২০২৪-২৫ (প্রকৃত অবস্থা) ২০২৫-২৬ (পূর্বাভাস) সাধারণ নাগরিকের চোখে এর অর্থ কী?
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৭% ৪.৭% অর্থনীতি ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে, তবে দ্রুত দারিদ্র্য কমাতে হলে আগের মতো ৭%+ প্রবৃদ্ধি দরকার।
মূল্যস্ফীতি (জিনিসপত্রের দাম) ৮.৫% ৬.০% (আশা করা হচ্ছে) দাম কমার লক্ষণ আছে, তবে খাবারের চড়া দাম এখনো সাধারণ মানুষের জন্য বড় বোঝা।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৬.৮ বিলিয়ন ডলার ৩০.৯ বিলিয়ন ডলার ডলারের রেট বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ায় রিজার্ভ এখন স্থিতিশীল হচ্ছে।
চলতি হিসাবের ভারসাম্য জিডিপির ০.০% জিডিপির -০.৩% আমদানি কমানোর ফলে ঘাটতি কমেছে ঠিকই, কিন্তু এর ফলে কারখানার যন্ত্রপাতি আসাও কমে গেছে।

পোশাক খাত: সস্তা শ্রমের দিন কি শেষ হয়ে আসছে?

পোশাক খাত সস্তা শ্রমের দিন কি শেষ হয়ে আসছে

বাংলাদেশের সফলতার গল্প বলতে গেলে তৈরি পোশাক (RMG) খাতের কথা বলতেই হবে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪%-ই আসে এখান থেকে, যা লাখ লাখ গ্রামীণ নারীর জীবন বদলে দিয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক কিছু তথ্য আমাদের চিন্তার ভাঁজ বাড়াচ্ছে:

  • ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধ: রপ্তানি ২.৬৩% কমে ১৯.৩৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
  • ডিসেম্বর ২০২৫: রপ্তানি এক ধাক্কায় ১৪.২৩% পড়ে যায়, যা ঢাকার শিল্পাঞ্চলগুলোতে রীতিমতো আতঙ্ক তৈরি করেছিল।
  • জানুয়ারি ২০২৬: দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে রপ্তানি আবার ১১.৭৭% বৃদ্ধি পায়! এটি আমাদের শ্রমিক ও মালিকদের হার না মানা মানসিকতার প্রমাণ।

কেন এই ওঠানামা? দেশের ভেতরে মূল্যস্ফীতির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, সরকার কিছু প্রণোদনা তুলে নিয়েছে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি ক্রেতারা ভয়ে সাময়িকভাবে ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার দিকে ঝুঁকেছিল।

সামনের পথ: আমাদের বুঝতে হবে, শুধু ‘সস্তা শ্রম’ দিয়ে আর বেশিদিন টেকা যাবে না। সাধারণ সুতির টি-শার্ট বানানোর দিন শেষ। এখন আমাদের নজর দিতে হবে কৃত্রিম ফাইবার (MMF), রোবোটিক্স বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি (4IR) এবং পরিবেশবান্ধব (LEED) কারখানার দিকে। সস্তা দামের পোশাক থেকে বেরিয়ে আমাদের এখন দামি পোশাক বানানোর দিকে এগোতে হবে।

এলডিসি (LDC) উত্তরণ: সম্মানের মুকুট নাকি বিপদের ফাঁদ?

জাতিসংঘের হিসেবে, ২০২৬ সালের ২৪শে নভেম্বর বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ (LDC) থেকে ‘উন্নয়নশীল দেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা। মাথা পিছু আয় থেকে শুরু করে সব সূচকেই আমরা পাস করেছি। এটি দেশের জন্য বিশাল এক সম্মানের ব্যাপার।

কিন্তু মুশকিল হলো, সম্মান দিয়ে তো আর পেট ভরে না! এই স্বীকৃতি পেলেই ইউরোপের বাজারে আমরা যে বিনা শুল্কে পোশাক রপ্তানির সুবিধা পেতাম, তা বাতিল হয়ে যাবে। তখন আমাদের পোশাকে ৯-১২% বাড়তি ট্যাক্স বসবে, যা রাতারাতি আমাদের বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা নষ্ট করে দিতে পারে।

সরকার কী করছে?

অর্থনীতির এই ভঙ্গুর অবস্থায় সরকার জাতিসংঘের কাছে অনুরোধ করেছে এই উত্তরণ প্রক্রিয়া ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে। আপাতত বেঁচে থাকার জন্য এই ৩ বছর সময় পাওয়া খুব জরুরি। তবে এই বাড়তি সময়টুকু শুধু বসে থাকলে চলবে না; এর মধ্যেই বিভিন্ন দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করতে হবে এবং শুধু পোশাকের ওপর নির্ভর না করে চামড়া, আইটি বা কৃষিজাত পণ্যের মতো অন্যান্য রপ্তানি বাড়াতে হবে।

তরুণ প্রজন্ম: আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, নাকি ভবিষ্যতের সংকট?

পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল দেখলে মনে হয় আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। কিন্তু একটি দেশের আসল সম্পদ হলো তার মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা। দুঃখজনকভাবে, আমাদের এই ‘তারুণ্যের শক্তি’ এখন অনেকটা টিকিং টাইমবোমার মতো হয়ে আছে।

সামাজিক সূচক বর্তমান পরিসংখ্যান এর প্রভাব ও পেছনের বাস্তবতা
দারিদ্র্যের হার ২১.২% (২০২৪-২৫ অর্থবছর) লাখ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে ভাসছে। পরিবারের কারও বড় অসুখ হলে বা একটা বন্যা হলেই এরা পথে বসবে।
কাজে অংশগ্রহণের হার ৫৮.৯% কাজের বাজারে মানুষের অংশগ্রহণ কমছে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অনেক নারী বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন।
বেকার বা নিট (NEET) তরুণ প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন (৮৫ লাখ) এই বিপুল সংখ্যক তরুণ পড়াশোনা, কাজ বা কোনো প্রশিক্ষণের সাথে যুক্ত নেই। ফলে মেধা পাচার হচ্ছে এবং আমরা সস্তা শ্রমের প্রবাসীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক শিল্পের চাহিদার সাথে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে লাখ লাখ তরুণ গ্রাজুয়েট হয়েও চাকরি পাচ্ছে না। “স্মার্ট বাংলাদেশ” শুধু মুখে বললে হবে না; কারিগরি শিক্ষা, আইটি দক্ষতা এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের পেছনে এখনই বড় বিনিয়োগ করতে হবে।

ব্যাংক খাতের সংকট ও সামাজিক নিরাপত্তা

বাংলাদেশ একসময় ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে সারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল, মানুষের গড় আয়ুও অনেক বেড়েছে। কিন্তু ২০২৩-২০২৪ সালের অর্থনৈতিক ধাক্কায় আমাদের অনেক সামাজিক অর্জন মলিন হতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, দারিদ্র্যের হার আবার বেড়েছে। সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে এখন শুধু ক্ষুদ্রঋণ নয়, বরং সরকারের পক্ষ থেকে শক্তিশালী ভাতা বা সাহায্য প্রকল্প (Social Safety Net) দরকার।

এর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ‘ক্যান্সার’ হলো ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ। বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালীরা আইনের ফাঁক গলে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। 

কৃষি এখনো দেশের নীরব ভরসা

বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে আমরা অনেক সময় শহর, পোশাকশিল্প, মেট্রোরেল বা বড় প্রকল্পের কথা বলি; কিন্তু কৃষির কথা তুলনামূলক কম বলি। অথচ বাস্তবে দেশের সবচেয়ে বড় নীরব শক্তিগুলোর একটি এখনো কৃষি।

ধান, সবজি, মাছ, পোলট্রি—এসব খাত শুধু খাদ্যই দেয় না, লাখ লাখ মানুষের কাজও তৈরি করে। কোনো সংকটের সময় শহরের চাকরি কমে গেলেও গ্রামবাংলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি অনেক পরিবারকে টিকিয়ে রাখে।
তবে এই খাতও এখন চাপে আছে। সার, বীজ, সেচ, পরিবহন—সবকিছুর খরচ বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, অকাল বৃষ্টি—সবই কৃষককে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে।

তাই কৃষিকে শুধু “গ্রামের বিষয়” হিসেবে দেখলে হবে না। খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, এমনকি সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও কৃষি সরাসরি জড়িত।

সূচক সংখ্যা সাধারণ ভাষায় এর মানে উৎস
জিডিপিতে কৃষির অংশ (২০২৪) ১১.২% প্রতি ১০০ টাকার অর্থনীতিতে প্রায় ১১ টাকা কৃষি থেকে আসে World Bank
কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি, FY25 ২.০% ধীর হলেও কৃষি অর্থনীতিকে ধরে রেখেছে World Bank
কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি, FY26 পূর্বাভাস ৩.১% সামনে কৃষি কিছুটা ভালো করার আশা আছে World Bank
গ্রামীণ দারিদ্র্য শহরের চেয়ে বেশি ৬ শতাংশ পয়েন্ট (২০২২) কৃষির সমস্যা হলে গ্রামের মানুষ আগে ধাক্কা খায় World Bank
নতুন কৃষিজ চাকরির মধ্যে তরুণ নারীর অংশ দুই-তৃতীয়াংশ কৃষি এখনো কাজ দেয়, বিশেষ করে নারীদের World Bank
কৃষিতে তরুণ নারীর আয় পুরুষের অর্ধেক কাজ আছে, কিন্তু আয় ও মানসম্মত সুযোগ কম World Bank
ধান উৎপাদন পূর্বাভাস, ২০২৪/২৫ ৩৭.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষি এখনো দেশের আসল বাফার USDA FAS 

রেমিট্যান্স: দেশের অর্থনীতির অক্সিজেন

রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অক্সিজেন

বিদেশে কাজ করা বাংলাদেশিরা বছরের পর বছর এই দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ইউরোপ বা অন্য দেশে কষ্ট করে আয় করে তারা দেশে টাকা পাঠান। সেই টাকা দিয়ে গ্রামের ঘর চলে, সন্তানের পড়াশোনা হয়, জমি কেনা হয়, ছোট ব্যবসা দাঁড়ায়, আবার দেশের ডলার সংকটও কিছুটা সামাল পায়।

কিন্তু রেমিট্যান্সের গল্পের পেছনেও কষ্ট আছে। আমাদের অনেক শ্রমিক এখনো কম দক্ষতার কাজ করেন, কম মজুরি পান, নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন।
এর মানে দাঁড়ায়—আমরা এখনো অনেকাংশে সস্তা শ্রম রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আনি।
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ হলো, শুধু বেশি মানুষ বিদেশে পাঠানো নয়; বরং বেশি দক্ষ মানুষ পাঠানো, যাতে তারা বেশি আয় করতে পারে এবং দেশের জন্যও বেশি মূল্য তৈরি হয়।

সূচক সংখ্যা সাধারণ ভাষায় এর মানে উৎস
বৈদেশিক ব্যক্তিগত রেমিট্যান্স, ২০২৪ $27.5 বিলিয়ন প্রবাসীদের পাঠানো টাকা এখনো দেশের বড় ডলারভিত্তি World Bank
জিডিপির তুলনায় রেমিট্যান্স, ২০২৪ ৬.১% প্রতি ১০০ টাকার অর্থনীতিতে প্রায় ৬ টাকা রেমিট্যান্স থেকে World Bank
দেশীয় রেমিট্যান্স পাওয়া পরিবারের হার ১২.৩% → ১৩.৯% (২০১০→২০২২) শুধু বিদেশ নয়, দেশের ভেতর থেকেও পাঠানো টাকা বহু পরিবারকে টিকিয়ে রাখে World Bank
বাড়তি উপকার পাওয়া পরিবার প্রায় ৪০ লাখ পরিবার অভ্যন্তরীণ টাকা পাঠানোও বড় “সেফটি নেট” World Bank
২০১৬–২০২২ সময়ে দারিদ্র্য কমাতে রেমিট্যান্সের প্রভাব প্রায় ৩.৩ পয়েন্ট রেমিট্যান্স না থাকলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারত World Bank
আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্সের একক প্রভাব প্রায় ২ পয়েন্ট প্রবাসী আয়ের প্রভাব সরাসরি দারিদ্র্য কমিয়েছে World Bank

ডিজিটাল অগ্রগতি: শুধু ইন্টারনেট নয়, দক্ষ ব্যবহারও জরুরি

বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন সেবা, ফ্রিল্যান্সিং—এসব খাতে বড় পরিবর্তন এসেছে। অনেক তরুণ-তরুণী এখন ঘরে বসে আয় করছে, অনলাইনে ব্যবসা করছে, ডিজিটাল সেবা নিচ্ছে।
এটা নিঃসন্দেহে আশার দিক।

কিন্তু ডিজিটাল অগ্রগতি মানে শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার নয়। এর মানে হলো—ভুয়া তথ্য থেকে বাঁচা, সাইবার প্রতারণা ঠেকানো, অনলাইন দক্ষতা বাড়ানো, এবং প্রযুক্তিকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা।
অন্যথায় প্রযুক্তি শুধু বিনোদনের মাধ্যম হয়ে থাকবে, অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে না। 

সূচক সংখ্যা সাধারণ ভাষায় এর মানে উৎস
মোবাইল সংযোগ (২০২৫ শুরুর দিকে) ১৮.৫ কোটি দেশে মোবাইল পৌঁছে গেছে খুব গভীরভাবে; অনেকের একাধিক সিমও আছে DataReportal 2025
মোবাইল সংযোগ / জনসংখ্যা ১০৬% সংযোগের সংখ্যা জনসংখ্যার চেয়েও বেশি, কিন্তু এতে সবাই সমানভাবে ডিজিটাল দক্ষ—এমন নয় DataReportal 2025
ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৭.৭৭ কোটি বড় সংখ্যা, কিন্তু এখনো দেশের অর্ধেকেরও কম মানুষ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে DataReportal 2025
ইন্টারনেট প্রবেশহার ৪৪.৫% অর্থাৎ ১০০ জনে প্রায় ৪৫ জন অনলাইনে, বাকি বড় অংশ এখনো বাইরে DataReportal 2025
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী পরিচয় ৬.০ কোটি অনলাইনে ঢোকা মানুষের বড় অংশের ব্যবহার এখনো সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক DataReportal 2025
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার / জনসংখ্যা ৩৪.৩% অনেকেই ইন্টারনেটকে মূলত বিনোদন ও যোগাযোগে ব্যবহার করছে DataReportal 2025
মোবাইল ইন্টারনেটের মধ্যম গতি ২৮.২৬ Mbps আগের চেয়ে গতি বেড়েছে, তবে সারা দেশে মান একরকম নয় DataReportal 2025
ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের মধ্যম গতি ৪৮.৯১ Mbps বাসা/অফিসের ইন্টারনেট তুলনামূলক ভালো, কিন্তু তা এখনো সবার নাগালে নেই DataReportal 2025
মোবাইল ফোন আছে—এমন প্রাপ্তবয়স্ক ৮২% ডিভাইস আছে, কিন্তু ডিভাইস থাকলেই দক্ষ ব্যবহার আসে না UNDP Bangladesh citing World Bank Global Findex 2025
২০২৪ সালে ডিজিটাল পেমেন্ট করেছে/পেয়েছে—এমন প্রাপ্তবয়স্ক ৩৪% ডিজিটাল আর্থিক ব্যবহার বাড়ছে, কিন্তু এখনো এটি সবার দৈনন্দিন অভ্যাস হয়নি UNDP Bangladesh citing World Bank Global Findex 2025
জাতিসংঘের E-Government Development Index (২০২৪) ০.৬৫৭০ সরকারি ডিজিটাল সেবায় বাংলাদেশ এগোচ্ছে UN EGOVKB
E-Government বিশ্ব র‌্যাঙ্কিং (২০২৪) ১৯৩ দেশের মধ্যে ১০০তম ডিজিটাল সরকারে উন্নতি হয়েছে, কিন্তু শীর্ষ সারিতে যেতে এখনো অনেক পথ বাকি UN EGOVKB
E-Participation Index (২০২৪) ০.৬১৬৪ নাগরিকের ডিজিটাল অংশগ্রহণও বাড়ছে, তবে ব্যবহারকে আরও কার্যকর করতে হবে UN EGOVKB
E-Participation র‌্যাঙ্ক (২০২৪) ১৯৩ দেশের মধ্যে ৭০তম শুধু সেবা নয়, নাগরিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে UN EGOVKB 

জলবায়ু পরিবর্তন: বিনাদোষে যে মাশুল আমরা গুনছি

বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলতেই হবে। পুরো বিশ্বের মোট দূষণের (কার্বন নিঃসরণ) মাত্র ১ শতাংশেরও কম করে বাংলাদেশ; কিন্তু এর সবচেয়ে বড় শাস্তি পাচ্ছি আমরাই।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় আমাদের গত ৫০ বছরের সব অর্জনকে যেকোনো মুহূর্তে ধুয়ে মুছে দিতে পারে। সরকারের “ডেল্টা প্ল্যান ২১০০” একটি দারুণ পরিকল্পনা, কিন্তু এটি বাস্তবায়ন করতে হাজার হাজার কোটি ডলার দরকার। অথচ উন্নত বিশ্ব, যারা এই দূষণের জন্য দায়ী, তারা ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে চরম টালবাহানা করছে। 

আগামী ১০ বছর কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের সামনে এখন যে সময়টা আসছে, সেটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দশক। কারণ এই সময়েই ঠিক হবে—আমরা কি মাঝারি আয়ের ফাঁদে আটকে যাব, নাকি সত্যিই আরও উন্নত ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের পথে যাব।

এই দশকে আমাদের কয়েকটি কঠিন কিন্তু জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হবে:
কীভাবে ব্যাংক খাত ঠিক করব,
কীভাবে নতুন শিল্প গড়ব,
কীভাবে তরুণদের দক্ষ করব,
কীভাবে জলবায়ু বিপদের সঙ্গে মানিয়ে নেব,
এবং কীভাবে এমন প্রতিষ্ঠান বানাব যা ব্যক্তি নয়, নিয়মে চলে।

শেষ কথা: আগামী দিনের রায়

তাহলে ৫৫ বছরে বাংলাদেশ আসলে কতদূর এগিয়েছে?

এর উত্তর হলো—আমরা দারুণ গর্ব করার মতো একটি জায়গায় এসেছি, তবে সামনে সতর্ক হওয়ার মতো বিশাল বিপদও অপেক্ষা করছে। ১৯৭১ সালের ছাই থেকে উঠে এসে এই দেশ বিশাল জনসংখ্যাকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, নিজেদের টাকায় মেগাপ্রকল্প বানিয়েছে এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের অপরিহার্য প্রমাণ করেছে। এটা কোনো সাধারণ অর্জন নয়।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, যে কৌশল বা মডেলে আমরা গত ৫০ বছর চলেছি, সেই একই মডেলে আমরা ২০৫০ সালে উন্নত দেশে পৌঁছাতে পারব না। এখন আমাদের প্রয়োজন কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—ব্যাংক খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করা, শুধু পোশাকের ওপর নির্ভর না করে নতুন শিল্প গড়ে তোলা, শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

স্বাধীনতার এই ৫৫ বছরের গল্পটা নিঃসন্দেহে এক মহাকাব্য। আমরা আমাদের স্বপ্নের বাড়ির ভিত ঢালাই করেছি, দেয়ালও তুলেছি শক্ত করে; কিন্তু এর ছাদটা কতটা মজবুত হবে এবং ঝড়-বৃষ্টি থেকে আমাদের কতটা বাঁচাতে পারবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই!

বাঙালির স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ে যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, যাঁরা জীবন বাজি রেখে লড়েছেন—সেই সব অকুতোভয় শহীদ ও সংগ্রামীর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।

সর্বশেষ