কল্পনা করুন এমন একটি রাস্তা, যেখানে আপনি গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল ধরে একটানা কয়েক মাস চালিয়ে যাচ্ছেন। জানালার বাইরে কখনো বরফে ঢাকা পাহাড়, কখনো তপ্ত মরুভূমি, আবার কখনো ঘন সবুজ জঙ্গল। পৃথিবীর এক মেরু থেকে আরেক মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথে যেন কোনো পিছুটান নেই, শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়া। হ্যাঁ, আমি বলছি প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে (Pan-American Highway)-এর কথা। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী এটি বিশ্বের দীর্ঘতম ‘মটরেবল রোড’ বা গাড়ি চলাচলের উপযোগী রাস্তা।
উত্তর আমেরিকার আলাস্কা থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাকাব্যিক পথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০,০০০ কিলোমিটার (১৯,০০০ মাইল)। অনেকেই বলেন, এই পথে নাকি কোনো ‘ইউ-টার্ন’ নেই! আক্ষরিক অর্থে না হলেও, রূপক অর্থে এটি সত্য—কারণ একবার এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় নামলে আপনার মন আর ঘরে ফিরতে চাইবে না। ১৪টি দেশের বুক চিরে চলে যাওয়া এই হাইওয়ে কেবল একটি রাস্তা নয়, এটি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষের কাছে একটি স্বপ্ন, একটি চ্যালেঞ্জ এবং জীবনকে নতুনভাবে চেনার মাধ্যম।
প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে কী? একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে কেবল কংক্রিট বা পিচের তৈরি কোনো সাধারণ রাস্তা নয়। এটি আসলে পুরো আমেরিকা মহাদেশের (উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ) দেশগুলোকে সংযুক্ত করা সড়কপথের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। ১৯২৩ সালে চিলির সান্তিয়াগোতে অনুষ্ঠিত ‘পঞ্চম আন্তর্জাতিক আমেরিকান স্টেটস কনফারেন্স’-এ প্রথম এই হাইওয়ের ধারণা প্রস্তাব করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা এবং বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো।
পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালে আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, মেক্সিকো, নিকারাগুয়া, পানামা, পেরু এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি কনভেনশনে স্বাক্ষর করে এই রাস্তা নির্মাণের অঙ্গীকার করে। যদিও আজও এই পথের একটি অংশ (দারিয়েন গ্যাপ) অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, তবুও এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্ট হিসেবে স্বীকৃত। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এটি ‘দ্য আলটিমেট রোড ট্রিপ’ নামে পরিচিত।
এক নজরে প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| মোট দৈর্ঘ্য | ৩০,০০০ কিমি (শাখা-প্রশাখাসহ প্রায় ৪৮,০০০ কিমি) |
| শুরুর স্থান | প্রুধো বে (Prudhoe Bay), আলাস্কা, যুক্তরাষ্ট্র |
| শেষ স্থান | উশুয়াইয়া (Ushuaia), আর্জেন্টিনা |
| যুক্ত দেশ সংখ্যা | ১৪টি (অফিসিয়াল), রুটের ভিন্নতায় ১৮টি পর্যন্ত হতে পারে |
| নির্মাণ শুরু | ১৯২৩ সালে প্রস্তাবনা, ১৯৩৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষর |
| রেকর্ড | গিনেস বুকে ‘বিশ্বের দীর্ঘতম মটরেবল রোড’ |
রুটের বিস্তারিত মানচিত্র: উত্তর থেকে দক্ষিণ
এই বিশাল পথ পাড়ি দেওয়া কোনো মুখের কথা নয়। বৈচিত্র্যময় এই যাত্রাপথকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা। প্রতিটি অংশের নিজস্ব চ্যালেঞ্জ এবং সৌন্দর্য রয়েছে। নিচে আমরা প্রতিটি সেকশন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
উত্তর আমেরিকা অংশ (বরফ ও মরুভূমির খেলা)
যাত্রার শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার একেবারে উত্তর প্রান্তের প্রুধো বে থেকে। এখানকার ডাল্টন হাইওয়ে (Dalton Highway) পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম রাস্তা। এরপর কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ও আলবার্টা প্রদেশের মধ্য দিয়ে রকি পর্বতমালার শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে করতে আপনি প্রবেশ করবেন মূল যুক্তরাষ্ট্রে। ইন্টারস্টেট হাইওয়ে সিস্টেম ধরে মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছানো পর্যন্ত রাস্তা খুবই মসৃণ।
মেক্সিকোতে প্রবেশের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। এখানকার মরুভূমি, ক্যাকটাস এবং ছোট ছোট শহরের রঙিন সংস্কৃতি আপনাকে মুগ্ধ করবে। মেক্সিকোর রাস্তাগুলো বেশ ভালো হলেও ট্রাফিক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত স্পিড ব্রেকার বা ‘তোপেস’ (Topes) আপনাকে কিছুটা ভোগাবে।
মধ্য আমেরিকা অংশ (আগ্নেয়গিরি ও সরু পথ)
মেক্সিকো পার হয়ে গুয়াতেমালা, এল সালভাদর, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া এবং কোস্টারিকা হয়ে পানামা পর্যন্ত এই অংশটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। এখানকার রাস্তাগুলো সরু এবং আঁকাবাঁকা। বিশেষ করে গুয়াতেমালা এবং কোস্টারিকার পাহাড়ি পথগুলোতে গাড়ি চালানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কোস্টারিকার ‘সিয়েরা দে লা মুয়ের্তে’ বা মৃত্যু পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মেঘের ভেতর দিয়ে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা হবে। এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এবং ঘন সবুজ জঙ্গল আপনাকে মুগ্ধ করবে।
দক্ষিণ আমেরিকা অংশ (আন্দিজ ও শেষ প্রান্ত)
পানামা থেকে কলম্বিয়া হয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় প্রবেশের পর রাস্তার ধরন আবার বদলে যায়। ইকুয়েডর ও পেরুর মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় আপনি আন্দিজ পর্বতমালার বিশালতা অনুভব করবেন। পেরুর মরুভূমি এবং চিলির আতাকামা মরুভূমি (বিশ্বের শুষ্কতম স্থান) পার হয়ে আপনি পৌঁছাবেন আর্জেন্টিনায়। আর্জেন্টিনার পাম্পাস তৃণভূমি পেরিয়ে অবশেষে আপনি পৌঁছাবেন উশুয়াইয়াতে—যাকে বলা হয় ‘দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’।
রুট সংক্রান্ত তথ্য
| অঞ্চল | অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহ | রাস্তার অবস্থা |
|---|---|---|
| উত্তর আমেরিকা | যুক্তরাষ্ট্র (আলাস্কা), কানাডা, মেক্সিকো | অত্যন্ত উন্নত এবং প্রশস্ত (মেক্সিকো বাদে) |
| মধ্য আমেরিকা | গুয়াতেমালা, এল সালভাদর, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, কোস্টারিকা, পানামা | সরু, পাহাড়ি এবং কোথাও কোথাও ভাঙাচোরা |
| দক্ষিণ আমেরিকা | কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু, চিলি, আর্জেন্টিনা | বৈচিত্র্যময়—মরুভূমি থেকে পাহাড়ি পথ |
৩০,০০০ কিলোমিটার পথে ‘ইউ-টার্ন নেই’—কথাটির সত্যতা কতটুকু?
সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন ট্রাভেল ব্লগে প্রায়ই শোনা যায়, প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে এমন একটি রাস্তা যেখানে ৩০ হাজার কিলোমিটার পথে কোনো ইউ-টার্ন নেই! এই কথাটি শুনে অনেকেই অবাক হন। তবে বাস্তবিক অর্থে এটি একটি ‘মেটাফোর’ বা রূপক।
টেকনিক্যালি রাস্তার মোড়ে মোড়ে আপনি গাড়ি ঘোরাতে পারবেন বা ইউ-টার্ন নিতে পারবেন। কিন্তু এই কথাটির গভীর অর্থ হলো—এই যাত্রার নিরবচ্ছিন্নতা। যখন কেউ আলাস্কা থেকে আর্জেন্টিনার উদ্দেশ্যে রওনা দেন, তখন তাদের লক্ষ্য থাকে শুধুই দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাওয়া। হাজার হাজার মাইলের এই যাত্রায় পিছু ফেরার মানসিকতা থাকে না বললেই চলে। ভৌগোলিকভাবেও উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরুর দিকে এই লম্বা যাত্রাপথকে একটি সরলরেখা হিসেবে কল্পনা করা হয়, যেখানে ইউ-টার্ন নেওয়া মানেই স্বপ্নের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া।
ইউ-টার্ন মিথ বনাম বাস্তবতা
| ধারণা (Myth) | বাস্তবতা (Reality) |
|---|---|
| ৩০,০০০ কিমি পথে কোনো ইউ-টার্ন সাইন নেই | ট্রাফিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনে ইউ-টার্ন নেওয়া যায় |
| রাস্তাটি সম্পূর্ণ সোজা | রাস্তায় প্রচুর বাঁক (Curve) এবং পাহাড় রয়েছে |
| একবার ঢুকলে বের হওয়া যায় না | যেকোনো বড় শহরে যাত্রা বিরতি বা শেষ করা সম্ভব |
দারিয়েন গ্যাপ: এই মহাকাব্যিক যাত্রার একমাত্র বাধা
প্যান-আমেরিকান হাইওয়ের সবচেয়ে রহস্যময় এবং চ্যালেঞ্জিং অংশের নাম হলো ‘দারিয়েন গ্যাপ’ (Darién Gap)। পানামা এবং কলম্বিয়ার সীমান্তে অবস্থিত প্রায় ১০৬ কিলোমিটার (৬৬ মাইল) দীর্ঘ এই এলাকাটি গভীর জঙ্গল, জলাভূমি এবং পাহাড় দিয়ে ঘেরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ৩০,০০০ কিলোমিটারের এই বিশাল হাইওয়ে নেটওয়ার্কের মধ্যে কেবল এইটুকু জায়গায় কোনো রাস্তা নেই!
পরিবেশগত উদ্বেগ, আদিবাসী সম্প্রদায়ের সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক কারণে (যেমন ড্রাগ ট্রাফিকিং রোধ) এখানে রাস্তা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তাই আলাস্কা থেকে গাড়ি চালিয়ে এসে পানামায় থামতে হয়। এরপর গাড়ি বা বাইককে জাহাজে করে কলম্বিয়ায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজে বিমানে বা নৌকায় পার হতে হয়। এটিকে বলা হয় এই রুটের ‘মিসিং লিঙ্ক’।
দারিয়েন গ্যাপ পার হওয়ার খরচ ও উপায়
| পদ্ধতি | খরচ (আনুমানিক) | সময় | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| RORO শিপিং (গাড়ি) | ১,০০০ – ১,৫০০ ডলার | ৫-৭ দিন | গাড়ির চাবি শিপিং কোম্পানির কাছে দিতে হয় |
| কন্টেইনার শিপিং (গাড়ি) | ১,৫০০ – ২,৫০০ ডলার | ৩-১০ দিন | বেশি নিরাপদ, দুইজন শেয়ার করলে খরচ কমে |
| ব্যক্তিগত ভ্রমণ (বিমান) | ১৫০ – ৩০০ ডলার | ১-২ ঘণ্টা | পানামা সিটি থেকে বোগোটা বা কার্তাহেনা |
এই রুটের সেরা ৫টি দর্শনীয় স্থান
পুরো যাত্রাপথ জুড়ে দেখার মতো হাজারো জায়গা রয়েছে। তবে এমন কিছু স্পট আছে যেগুলো মিস করা মানে পুরো ভ্রমণটাই বৃথা।
১. গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন (যুক্তরাষ্ট্র): অ্যারিজোনার এই গিরিখাত প্রকৃতির এক বিস্ময়। এর বিশালতা এবং পাথরের রঙের খেলা আপনাকে স্তব্ধ করে দেবে।
২. টিওতিহুয়াকান পিরামিড (মেক্সিকো): মেক্সিকো সিটির কাছে অবস্থিত এই প্রাচীন শহরটি অ্যাজটেক সভ্যতার নিদর্শন। এখানকার ‘সূর্য পিরামিড’ দেখার মতো।
৩. লেক আটিটলান (গুয়াতেমালা): তিনটি বিশাল আগ্নেয়গিরি দ্বারা বেষ্টিত এই লেকটিকে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর লেক বলা হয়।
৪. মাচু পিচু (পেরু): যদিও এটি মূল হাইওয়ে থেকে একটু ভেতরে, তবু ইনকা সভ্যতার এই হারানো শহর না দেখে কেউ ফেরে না।
৫. সালার দে ইউনি (বলিভিয়া): বিশ্বের বৃহত্তম লবণের মরুভূমি। বর্ষাকালে এখানে আকাশ মাটির সাথে মিশে যায়, তৈরি হয় এক অপার্থিব দৃশ্য।
দর্শনীয় স্থানের তালিকা
| স্থান | দেশ | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| টরেনস ডেল পাইন | চিলি | ট্রেকিং এবং গ্লেসিয়ার দেখার জন্য সেরা |
| কার্তাহেনা | কলম্বিয়া | ঔপনিবেশিক স্থাপত্য ও রঙিন শহর |
| পানামা খাল | পানামা | আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগস্থল |
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সতর্কতা
বিশ্বের দীর্ঘতম এই ভ্রমণে নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরো রুট নিরাপদ হলেও কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে মেক্সিকোর কিছু রাজ্যে ড্রাগ কার্টেলের প্রভাব এবং মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি থাকে।
অভিজ্ঞ ভ্রমণকারীরা সবসময় দিনের আলোয় গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেন। রাতে হাইওয়েতে ডাকাতি বা অদৃশ্য গর্তের কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া আন্দিজ পর্বতমালার উঁচু রাস্তায় ‘অল্টিটিউড সিকনেস’ বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে, তাই সাথে অক্সিজেন ক্যান বা ওষুধ রাখা জরুরি। গাড়ি নষ্ট হলে মেরামতের জন্য স্পেয়ার পার্টস এবং বেসিক টুলস সবসময় সাথে রাখা উচিত।
নিরাপত্তা গাইডলাইন
| ঝুঁকির ধরন | সমাধানের উপায় |
|---|---|
| ছিনতাই/ডাকাতি | রাতে গাড়ি না চালানো, নির্জন স্থানে ক্যাম্পিং না করা |
| পুলিশের ঘুষ দাবি | শান্ত থাকা, নথিপত্র ঠিক রাখা, ড্যাশ ক্যাম ব্যবহার করা |
| শারীরিক অসুস্থতা | ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স এবং ফার্স্ট এইড কিট সাথে রাখা |
ভ্রমণের প্রস্তুতি ও বাজেট গাইড

প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে ভ্রমণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। এটি কোনো এক সপ্তাহের ট্যুর নয়, বরং ৬ মাস থেকে ২ বছরের প্রজেক্ট।
যানবাহন: আপনার বাহনটিই হবে আপনার ঘর। ফোর-হুইল ড্রাইভ (4×4) এসইউভি, ভ্যান বা বিশেষভাবে তৈরি ওভারল্যান্ডিং ট্রাক এই পথের জন্য সেরা। অনেকেই পুরোনো ভ্যান কিনে সেটাকে ‘ক্যাম্পার ভ্যান’-এ রূপান্তর করে নেন।
বাজেট: খরচ সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার জীবনযাত্রার ওপর। কেউ মাসে ১০০০ ডলারেও ভ্রমণ শেষ করেন, আবার কারো ৩০০০ ডলার লাগে। জ্বালানি খরচই বাজেটের বড় অংশ দখল করে।
ভিসা: বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ইউএসএ, কানাডা, এবং শেনজেন (ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য) বা ল্যাটিন আমেরিকার প্রতিটি দেশের ভিসা আলাদাভাবে প্রসেস করতে হতে পারে, যা বেশ সময়সাপেক্ষ।
আনুমানিক বাজেট ব্রেকডাউন
| খাতের নাম | মাসিক খরচ (গড়) |
|---|---|
| জ্বালানি | ৫০০ – ৮০০ ডলার |
| খাবার | ৩০০ – ৫০০ ডলার |
| থাকা (ক্যাম্পিং/হোস্টেল) | ২০০ – ৫০০ ডলার |
| বিবিধ (মেরামত/ভিসা) | ২০০ – ৩০০ ডলার |
| মোট | ১২০০ – ২১০০ ডলার |
শেষ কথা
প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে পাড়ি দেওয়া মানে কেবল ৩০,০০০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করা নয়, এটি নিজেকে চেনার এক মহাযাত্রা। আলাস্কার হাড়কাঁপানো ঠান্ডা থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনার শেষ প্রান্তের নির্জনতা—প্রতিটি কিলোমিটার আপনাকে নতুন গল্প শোনাবে। দারিয়েন গ্যাপের বাধা কিংবা বর্ডার ক্রসিংয়ের ঝামেলা সব কিছুই তুচ্ছ মনে হবে যখন আপনি আন্দিজের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখবেন। যদি আপনার মনে অজানাকে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে এই পথ আপনারই অপেক্ষায়। প্রস্তুতি নিন, ইঞ্জিন চালু করুন এবং হারিয়ে যান পৃথিবীর দীর্ঘতম পথে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে ভ্রমণ করতে কত টাকা লাগে?
উত্তর: গড়ে একজন ভ্রমণকারীর মাসে ১৫০০ থেকে ২০০০ ডলার খরচ হতে পারে। পুরো ট্রিপের জন্য (৬-১২ মাস) প্রায় ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ ডলার বাজেট রাখা নিরাপদ (গাড়ি কেনা বাদে)।
২. বাংলাদেশ থেকে কি এই ভ্রমণে যাওয়া সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ, সম্ভব। তবে আপনাকে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার ভিসা নিয়ে সেখানে যেতে হবে এবং সেখান থেকে গাড়ি কিনে যাত্রা শুরু করতে হবে। বাংলাদেশি পাসপোর্টে ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশের ভিসা আগে থেকেই নিতে হয়।
৩. এই রাস্তায় কি রাতে গাড়ি চালানো নিরাপদ?
উত্তর: মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে রাতে গাড়ি চালানো মোটেও নিরাপদ নয়। রাস্তা খারাপ হওয়া এবং নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে দিনের আলোতেই ভ্রমণ করা বুদ্ধিমানের কাজ।
৪. প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে কি সম্পূর্ণ পাকা রাস্তা?
উত্তর: রুটের প্রায় ৯৫% রাস্তাই পাকা এবং ভালো মানের। তবে বলিভিয়া, পেরু এবং কোস্টারিকার প্রত্যন্ত কিছু অঞ্চলে কাঁচা বা আধা-পাকা রাস্তা থাকতে পারে।
৫. মোট কতটি বর্ডার ক্রস করতে হয়?
উত্তর: মূল রুট অনুসরণ করলে প্রায় ১৪টি দেশের বর্ডার ক্রস করতে হয়। তবে আপনি যদি আরও দেশ ঘুরতে চান, তবে সংখ্যাটি ১৮ পর্যন্ত হতে পারে।


