মার্কিন ভিসা বন্ড নীতি: বাংলাদেশিদের জন্য এক নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

সর্বাধিক আলোচিত

বিশ্বব্যাপী অভিবাসন নীতিতে যখন কড়াকড়ি আরোপের নতুন ঢেউ বইছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত পদ্ধতি বাংলাদেশিদের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়ম নয়, বরং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য একটি ‘অর্থনৈতিক প্রাচীর’। যখন একজন ভ্রমণকারীকে প্রমাণ করতে হয় যে তিনি যথাসময়ে দেশে ফিরে আসবেন এবং তার গ্যারান্টি হিসেবে জমা রাখতে হয় ৫,০০০ থেকে ১৫,০০০ ডলার—তখন প্রশ্ন জাগে, এটি কি কেবলই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, নাকি পরোক্ষভাবে নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের প্রবেশাধিকার সংকুচিত করার কৌশল? এই নীতি কার্যকর হলে তা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যিক, সামাজিক এবং শিক্ষাগত যোগাযোগে এক দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

২০২৬ সালের বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। যখন প্রযুক্তি এবং ডেটা সায়েন্স ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন পুরোনো ধাঁচের ‘টাকা জমা রাখা’র পদ্ধতি কেন ফিরে আসছে? এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা উন্মোচন করার চেষ্টা করব এই নীতির পেছনের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর এর বাস্তবিক প্রভাব।

প্রেক্ষাপট: কেন এই বন্ড এবং কেন এখন?

ভিসা বন্ডের ধারণাটি হঠাৎ করে আসেনি। ২০২০ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে প্রথমবারের মতো ‘টেম্পোরারি ফাইনাল রুল’ (Temporary Final Rule) হিসেবে এটি সামনে আসে। তখন মূল লক্ষ্য ছিল সেই সব দেশ, যাদের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও থেকে যাওয়ার হার (Overstay Rate) ১০ শতাংশের বেশি। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (DHS) তালিকায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই এই ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে।

যদিও বাইডেন প্রশাসনের সময় এই নীতিটি কিছুটা শিথিল ছিল, কিন্তু ২০২৫-২৬ সালে বিশ্বজুড়ে অভিবাসন বিরোধী মনোভাব এবং বর্ডার কন্ট্রোল নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হওয়ায় এই বন্ড সিস্টেম বা এর কোনো পরিবর্তিত রূপ ফিরে আসার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি মূলত কনস্যুলার অফিসারদের হাতে দেওয়া এক অসীম ক্ষমতা, যার মাধ্যমে তারা সন্দেহভাজন আবেদনকারীদের কাছে আর্থিক গ্যারান্টি দাবি করতে পারেন।

ভিসা বন্ডের কার্যপদ্ধতি ও অর্থনৈতিক জটিলতা

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মূল যুক্তি হলো, এটি একটি ‘প্রতিরোধক’ বা ডিটারেন্স ব্যবস্থা। তাদের মতে, যেসব দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ফিরে না আসার প্রবণতা বেশি, তাদের অর্থনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ করতেই এই বন্ড। তবে এই ব্যবস্থাটি ঢালাওভাবে সবার জন্য নয়। এটি মূলত বি-১ (বাণিজ্যিক) এবং বি-২ (পর্যটন) ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যখন একজন কনস্যুলার অফিসার মনে করেন যে আবেদনকারীর ফিরে আসার সম্ভাবনা কম, তখন তিনি এই বন্ডের শর্ত জুড়ে দিতে পারেন।

এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে জটিল দিক হলো এর অনির্দিষ্টতা। কাকে বন্ড দিতে হবে এবং কাকে হবে না, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে কনস্যুলার অফিসারের ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনার ওপর। এই ‘ডিসক্রিশনাল পাওয়ার’ বা স্বেচ্ছা ক্ষমতা ব্যবহারের ফলে অনেক যোগ্য প্রার্থীও সন্দেহের তালিকায় পড়ে যেতে পারেন। নিয়ম অনুযায়ী, ভ্রমণ শেষে সঠিক সময়ে দেশে ফিরে আসার প্রমাণ দেখালে এই টাকা ফেরত পাওয়ার কথা। কিন্তু ব্যাংকিং জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সেই টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েও রয়েছে বিস্তর শঙ্কা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি কেবল টাকার অঙ্ক নয়, এটি একটি আইনি ও ব্যাংকিং জটিলতাও বটে।

বাংলাদেশের ফরেক্স (বৈদেশিক মুদ্রা) আইনের সাথে সংঘর্ষ: 

বাংলাদেশের কড়াকড়ি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, একজন নাগরিক চাইলেই দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিদেশে পাঠাতে পারেন না। বর্তমানে ট্রাভেল কোটা অনুযায়ী একজন ব্যক্তি বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ (সাধারণত ১২,০০০ ডলার) খরচ করতে পারেন। কিন্তু ‘বন্ড’ বা জামানত হিসেবে সরকারিভাবে ১৫,০০০ ডলার (প্রায় ১৮ লক্ষ টাকা) বিদেশে পাঠানো এবং তা ফেরত আনা—এই প্রক্রিয়ার কোনো স্পষ্ট ব্যাংকিং চ্যানেল বর্তমানে নেই। ফলে বৈধ পথে এই বন্ডের টাকা জমা দেওয়া সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব হতে পারে।

Cost comparison of travel with and without visa

সাধারণ ভ্রমণ খরচ বনাম বন্ডসহ খরচের তুলনা

খরচের খাত সাধারণ ভিসার খরচ (আনুমানিক) ভিসা বন্ডসহ খরচ (আনুমানিক) বৃদ্ধির হার
ভিসা প্রসেসিং ফি $১৮৫ (প্রায় ২২,০০০ টাকা) $১৮৫ (প্রায় ২২,০০০ টাকা) ০%
বিমান ভাড়া $১,২০০ – $১,৫০০ $১,২০০ – $১,৫০০ ০%
বন্ড/জামানত প্রযোজ্য নয় $৫,০০০ – $১৫,০০০ অসীম বৃদ্ধি
আনুষঙ্গিক খরচ $২,০০০ $২,০০০ ০%
মোট প্রাথমিক খরচ ~$৩,৩৮৫ ~$৮,৩৮৫ থেকে ~$১৮,৩৮৫ ২০০% – ৫০০% বৃদ্ধি

পরিসংখ্যানের রাজনীতি: ওভারস্টে রেট কেন বেশি?

মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশকে টার্গেট করার প্রধান কারণ হিসেবে ‘ওভারস্টে রেট’ বা ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার হারকে দায়ী করে। ডিএইচএস (DHS)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভিসার মেয়াদ শেষে দেশে ফেরেন না।

কিন্তু এই পরিসংখ্যানের গভীরে গেলে দেখা যায়, সব ওভারস্টে ইচ্ছাকৃত নয়। অনেকেই আইনি জটিলতা বা অসচেতনতার কারণে ওভারস্টে করে ফেলেন, যা পরিসংখ্যানকে বাড়িয়ে দেয়।

  • ইচ্ছাকৃত ওভারস্টে: যারা ইমিগ্রান্ট হওয়ার আশায় গিয়ে আর ফেরেন না।
  • টেকনিক্যাল ওভারস্টে: অসুস্থতা, ফ্লাইট বাতিল, বা ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস পরিবর্তনের আবেদন (যেমন ভিজিট টু স্টুডেন্ট) পেন্ডিং থাকার কারণে যারা আটকা পড়েন। মার্কিন সিস্টেমে স্ট্যাটাস পেন্ডিং থাকলেও অনেক সময় সেটি ওভারস্টে হিসেবে কাউন্ট হয়।

ওভারস্টে রেটের ধরন ও কারণ

ওভারস্টের ধরন বিবরণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
Suspected In-Country Overstay যারা দেশ ত্যাগ করেননি বলে সন্দেহ করা হয়। আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে গ্রিন কার্ড পাওয়ার আশায় অনেকেই থেকে যান।
Out-of-Country Overstay যারা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেরিতে দেশ ত্যাগ করেছেন। ফ্লাইট শিডিউল বিপর্যয় বা অসুস্থতার কারণে এমনটি ঘটে।
Status Violation যারা ভিজিট ভিসায় গিয়ে কাজ করেছেন বা স্টুডেন্ট হয়েছেন। সঠিক নির্দেশনার অভাবে অনেকেই এই ভুলটি করেন।

কেন বাংলাদেশ টার্গেট?

ভিসা বন্ডের তালিকায় কোনো দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রধান মাপকাঠি হলো সেই দেশের নাগরিকদের ‘ওভারস্টে রেট’ বা ভিসার মেয়াদ শেষে থেকে যাওয়ার হার। মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (DHS) ডেটা অনুযায়ী, যদি কোনো দেশের নাগরিকদের ওভারস্টে রেট ১০ শতাংশের বেশি হয়, তবে সেই দেশকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ওভারস্টে রেট এই বিপজ্জনক সীমার ওপরে বা কাছাকাছি অবস্থান করছে। এটি কেবল ইচ্ছাকৃতভাবে থেকে যাওয়া নয়, বরং অনেক সময় তথ্যের অভাব বা আইনি জটিলতার কারণেও ঘটে। কিন্তু মার্কিন ইমিগ্রেশন সিস্টেম এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো আমলে নেয় না। তাদের কাছে পরিসংখ্যানই শেষ কথা।

দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন ভিসা ওভারস্টে রেটের তুলনামূলক চিত্র (আনুমানিক)

দেশের নাম ওভারস্টে রেট (গড়) ভিসা বন্ডের ঝুঁকি সম্ভাব্য কারণ
বাংলাদেশ ১০% – ১৩% অত্যন্ত বেশি পারিবারিক অভিবাসন ও অর্থনৈতিক অভিবাসনের প্রবণতা।
ভারত ১% – ২% কম শক্তিশালী আইটি সেক্টর ও দক্ষ পেশাজীবী অভিবাসন।
পাকিস্তান ৩% – ৫% মাঝারি কঠোর স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া আগে থেকেই বিদ্যমান।
নেপাল ৪% – ৬% মাঝারি শিক্ষার্থী ভিসার দিকে ঝোঁক বেশি।

এই টেবিল থেকে স্পষ্ট যে, আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ওভারস্টে রেট আশঙ্কাজনকভাবে বেশি, যা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কঠোর হতে প্ররোচিত করে।

মধ্যবিত্তের স্বপ্নের অপমৃত্যু ও সামাজিক প্রভাব

আমেরিকা ভ্রমণ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে একটি মর্যাদার প্রতীক এবং অনেকের জন্য পারিবারিক পুনর্মিলনের একমাত্র উপায়। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সন্তানদের দেখতে যাওয়া বাবা-মায়েরা মূলত বি-২ ভিসায় ভ্রমণ করেন।

যদি ভিসা বন্ড কার্যকর হয়, তবে অবসরপ্রাপ্ত বাবা-মা—যাদের নিজস্ব কোনো বড় আয় নেই—তাদের জন্য ১৫,০০০ ডলার জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে পারিবারিক বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দাদা-দাদি তাদের নাতি-নাতনিদের দেখতে যেতে পারবেন না। সামাজিকভাবে এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে, যেখানে আমেরিকা ভ্রমণ কেবল ‘ধনী ও অভিজাত’ শ্রেণির বিলাসবিতা হয়ে দাঁড়াবে।

সমাজ ও বিভিন্ন শ্রেণির ওপর প্রভাব

শ্রেণি/গোষ্ঠী বর্তমান অবস্থা বন্ড কার্যকর হলে সম্ভাব্য প্রভাব
অবসরপ্রাপ্ত বয়োজ্যেষ্ঠ সহজেই সন্তানদের দেখতে যেতে পারেন। বন্ডের টাকা জোগাড় করা অসম্ভব হবে; পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা বাড়বে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এক্সপো বা সেমিনারে যোগ দিতে পারেন। তারল্য সংকটে (Liquidity Crisis) পড়বেন; ব্যবসায়িক সুযোগ হারাবেন।
অসুস্থ রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য যান। চিকিৎসার খরচের সাথে বন্ডের বোঝা যোগ হলে অনেকেই চিকিৎসা নিতে পারবেন না।
শিক্ষার্থী ও গবেষক কনফারেন্সে যোগ দেন। ফান্ডিং বা স্কলারশিপের টাকায় বন্ড কাভার করা সম্ভব নয়; মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর প্রভাব

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় ১০-১২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। তৈরি পোশাক শিল্পের বড় বাজার আমেরিকা। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা নিয়মিত সেখানে বায়ারদের সাথে মিটিং বা ট্রেড ফেয়ারে যোগ দিতে যান।

ভিসা বন্ড ব্যবস্থা চালু হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা (SME) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বড় কর্পোরেট হাউসের জন্য ১৫,০০০ ডলার হয়তো বড় বিষয় নয়, কিন্তু একজন উদীয়মান গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর জন্য এই টাকা ৬ মাসের জন্য আটকে রাখা (Dead Investment) ব্যবসার ক্ষতি ডেকে আনবে।

কূটনৈতিকভাবে, এটি দুই দেশের আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকাভুক্ত করা—এমন এক সময়ে যখন বাংলাদেশ ভূ-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়—তা ওয়াশিংটনের সাথে ঢাকার সম্পর্কের শীতলতা বাড়াতে পারে।

ব্যবসায়িক খাতে লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণ

খাত প্রভাব বিবরণ
তৈরি পোশাক (RMG) নেতিবাচক ছোট ও মাঝারি কারখানার মালিকদের সরাসরি যোগাযোগ কমে যাবে।
আইটি ফ্রিল্যান্সিং মিশ্র ক্লায়েন্ট মিটিং ভার্চুয়াল হবে, তবে ফিজিক্যাল নেটওয়ার্কিং কমবে।
পর্যটন এজেন্সি চরম নেতিবাচক ইউএসএ ট্যুর প্যাকেজ বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞ মতামত: বাস্তবতা বনাম নীতি

ইমিগ্রেশন পলিসি এনালিস্ট এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এই বন্ড সিস্টেমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

  • মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট (MPI): তাদের মতে, “বন্ড সিস্টেম আসলে অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করতে পারে না। যারা আমেরিকায় থেকে গিয়ে মাসে ৩-৪ হাজার ডলার আয় করার স্বপ্ন দেখেন, তারা ১৫ হাজার ডলার বন্ড গচ্চা দিয়ে হলেও থেকে যাবেন। এটি আসলে সৎ ভ্রমণকারীদের আটকানোর ফাঁদ।”
  • আইনজীবীদের মত: বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা এবং মার্কিন ইমিগ্রেশন লয়াররা মনে করেন, বন্ডের টাকা ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল হবে। ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE)-এর কাছ থেকে টাকা ফেরত পেতে বছরের পর বছর সময় লাগতে পারে, যা কার্যত সেই টাকা বাজেয়াপ্ত হওয়ার শামিল।

ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস: ২০২৬ এবং পরবর্তী সময়

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে বোঝা যায়, মার্কিন অভিবাসন নীতি আরও প্রযুক্তিনির্ভর এবং কঠোর হবে। ভিসা বন্ড হয়তো একটি ধাপ মাত্র।

১. ডিজিটাল ওয়ালেট ও স্মার্ট কন্ট্রাক্ট: ভবিষ্যতে হয়তো ফিজিক্যাল ডলারের বদলে ডিজিটাল কারেন্সি বা স্মার্ট কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে বন্ড নেওয়া হবে, যা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথে অটোমেটিক্যালি ফেরত আসবে অথবা বাজেয়াপ্ত হবে। 

২. কঠোর স্ক্রিনিং: বন্ডের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রিনিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ব্যবহার করে আবেদনকারীর ‘ফিরে আসার সম্ভাবনা’ যাচাই করা হবে। 

৩. বিকল্প গন্তব্য: আমেরিকা যদি এত কঠোর হয়, তবে বাংলাদেশি পর্যটক ও শিক্ষার্থীরা ইউরোপ, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার দিকে আরও বেশি ঝুঁকবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার সফট পাওয়ার (Soft Power) কমিয়ে দেবে।

শেষ কথা

মার্কিন ভিসা বন্ড নীতি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সংবাদ নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের পাসপোর্টের মান বাড়াতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া কতটা জরুরি।

যদি এই নীতি পুরোদমে কার্যকর হয়, তবে বাংলাদেশ সরকারকে অবশ্যই কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা করতে হবে। একই সাথে, সাধারণ নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে যেন তারা টেকনিক্যাল কারণে ওভারস্টে না করেন। শেষ পর্যন্ত, একটি দেশের নাগরিকদের আচরণই নির্ধারণ করে বিশ্বের কাছে সেই দেশের সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু হবে। ভিসা বন্ডের এই দেয়াল ভাঙতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং ব্যক্তিগত সচেতনতার এক সমন্বিত প্রয়াস।

সর্বশেষ