অবশেষে সব বিতর্কের অবসান — মেসিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ

সর্বাধিক আলোচিত

২৬ জুন ২০১৬। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম তখন শব্দে, আলোয় এবং উদ্বেগে থরথর করছে। কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও চিলি।

টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার প্রথম শট নিতে এগিয়ে এলেন লিওনেল মেসি। একটি দেশের দীর্ঘদিনের অপূর্ণ এক প্রত্যাশা। একটি পুরো জাতির আশা তাঁর বাঁ পায়ের ওপর। মেসি শট নিলেন। বল চলে গেল ক্রসবারের ওপর দিয়ে।

আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা ফাইনালে পরাজিত। আগের বছরও একই প্রতিপক্ষের কাছে একইভাবে শিরোপা হারিয়েছিল তারা। তারও আগে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে পরাজয়। তিন বছরের মধ্যে টানা তিনটি বড় ফাইনাল, তিনবারই শূন্য হাতে ফেরা।

সেদিন সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে মেসি বলেছিলেন, ‘জাতীয় দল নিয়ে তাঁর যাত্রা শেষ। তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন। চারটি ফাইনাল খেলেছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করতে পারেননি। আর পারবেন বলে তাঁর মনে হচ্ছে না। কথাগুলো কোনো নাটকীয় ঘোষণার মত শোনালেও আসলে তা  ছিল মানুষের প্রত্যাশা আর সমালোচকদের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ বিদ্রুপের ভারে ক্লান্ত এক মানুষের হতাশার অভিব্যক্তি।

সেই রাতে মেসির বয়স ছিল ২৯ বছর। ফুটবলার হিসেবে তখনই তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা। কিন্তু আর্জেন্টিনায় তাঁর পরিচয়ের পাশে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসে ছিল। সমালোচকেরা বলতেন, তিনি বার্সেলোনার মেসি, আর্জেন্টিনার নন। তাঁর শরীরে আর্জেন্টিনার আবেগ নেই। তিনি মারাদোনার মতো চিৎকার করেন না, সতীর্থদের ধাক্কা দিয়ে জাগান না, পরাজয়ের পর আগুন ঝরানো বক্তৃতা দেন না। তাঁর নীরবতাকে দুর্বলতা, সংযমকে উদাসীনতা এবং ব্যর্থতাকে দেশপ্রেমের অভাব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল।

মেসি সেদিন ফুটবল থেকে অবসর নেননি। তিনি পালাতে চেয়েছিলেন একটি অন্তহীন বিচারের আসর থেকে।

তখন কেউ জানত না, ছয় বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালের টাইব্রেকারে সেই একই মানুষ আবার প্রথম পেনাল্টি নিতে যাবেন। কিন্তু সেই দৃশ্যের গুরুত্ব বুঝতে হলে আরও পেছনে যেতে হয়—রোসারিওর একটি বাড়িতে, যেখানে এক ছোট্ট ছেলে জানত না, ফুটবল খেলার জন্য তাকে প্রথমে নিজের শরীরের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

রোসারিওর ছেলে

লিওনেল আন্দ্রেস মেসির জন্ম ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন, আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে। শহরটি তাঁকে দিয়েছিল পরিবার, পাড়ার ফুটবল, শ্রমজীবী জীবনের স্বাভাবিক কঠোরতা এবং এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে বল পায়ে ছোট একটি ছেলে মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের মানুষের মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

মাঠের বাইরে তিনি ছিলেন লাজুক, প্রায় নির্বাক। অপরিচিত মানুষের সামনে চোখ নিচু করে থাকতেন। কিন্তু বল পায়ে পেলেই তাঁর শরীরের ভাষা বদলে যেত। স্থানীয় গ্রান্দোলি ক্লাবে খুব ছোট বয়সে খেলা শুরু করেন। পরে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের যুবদলে যোগ দেন। তাঁর উচ্চতা অন্যদের তুলনায় কম ছিল, কিন্তু ভারসাম্য, গতি এবং বলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অস্বাভাবিকরকম সাবলীল।

কিন্তু ১০ বা ১১ বছর বয়সে তাঁর শরীরের বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি শনাক্ত করেন। নিয়মিত ইনজেকশন প্রয়োজন ছিল। চিকিৎসা ব্যয়বহুল। পরিবারের পক্ষে দীর্ঘদিন সেই খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই অংশটি পরে মেসির জীবনীতে প্রায় রূপকথার মতো বলা হয়। কিন্তু একটি শিশুর জন্য বাস্তবতা ছিল কঠিন। সে জানত না ব্যালন ডি’অর কী, বিশ্বকাপ কী, ইউরোপের ফুটবল কত বড়! সে শুধু জানত, তার শরীর অন্যদের মতো বাড়ছে না এবং ফুটবল খেলার স্বপ্নটি চিকিৎসার খরচের সঙ্গে বাঁধা পড়ে গেছে।

Lionel Messi childhood at Barcelona

২০০০ সালে, ১৩ বছর বয়সে, তিনি পরিবারসহ আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বার্সেলোনায় যান। পরীক্ষামূলক অনুশীলনে তাঁর দক্ষতা ক্লাব কর্মকর্তাদের মুগ্ধ করে। বার্সেলোনা তাঁকে দলে নেয় এবং তাঁর গ্রোথ হরমোন চিকিৎসার ব্যয় বহনের দায়িত্বও গ্রহণ করে।

নতুন দেশ, নতুন ভাষার ভিন্নতা, পরিচিত পরিবার থেকে দূরত্ব, ছোট শরীর এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। লা মাসিয়ায় মেসির শুরুর দিনগুলো কোনো আরামদায়ক প্রতিভা বিকাশের গল্প ছিল না। তিনি নিঃসঙ্গতা অনুভব করতেন। তাঁর মা ও ভাইবোনেরা একসময় রোসারিওতে ফিরে যান। মেসি বাবা হোর্হের সঙ্গে বার্সেলোনায় থেকে যান।

সেই সিদ্ধান্তের মূল্য তখন কেউ জানত না।

যুবদলের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে তিনি দ্রুত এগোতে থাকেন। ২০০৪ সালে ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার প্রথম দলের হয়ে লা লিগায় অভিষেক হয়। ২০০৫ সালের ১ মে আলবাসেতের বিপক্ষে রোনালদিনহোর পাস থেকে করেন প্রথম আনুষ্ঠানিক গোল। গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে নিখুঁত একটি লব। কয়েক মুহূর্ত আগে একই ধরনের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়েছিল। আবার সুযোগ পেয়ে তিনি আবার একই কাজ করলেন।

সেই গোলটির মধ্যেই ভবিষ্যতের মেসি লুকিয়ে ছিলেন। ভুল বা ব্যর্থতার পর কল্পনাকে ত্যাগ না করা, কঠিন সিদ্ধান্তটি দ্বিতীয়বারও নেওয়ার সাহস এবং গোলরক্ষকের অবস্থান এক ঝলকে পড়ে ফেলার ক্ষমতা।

এরপর আর শুধু উত্থান নয়, ফুটবলের একটি যুগ নির্মিত হয়েছে।

পরবর্তী দুই দশকে সেই ছেলেই ফুটবলের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান বদলে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর শৈশব প্রথম প্রমাণটি রেখে গিয়েছিল—মেসির মহত্ত্ব শুধু জন্মগত প্রতিভার গল্প নয়। এটি একটি সুযোগ পাওয়া, সেই সুযোগ ধরে রাখা এবং নিজের শরীরের সীমাকে ফুটবলীয় সুবিধায় রূপ দেওয়ার গল্প।

সংখ্যার পাহাড়, ক্লাবের সাম্রাজ্য

মেসির ক্যারিয়ার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এক সংখ্যাগত বিষ্ময় দেখা যায়।

১৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বার্সেলোনা, প্যারিস সাঁ জার্মেই, ইন্টার মায়ামি এবং আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি ১,১৬০টির বেশি সিনিয়র ম্যাচ খেলেছেন। তাঁর গোলসংখ্যা প্রায় ৯২০। অ্যাসিস্ট গণনার নিয়ম একেক পরিসংখ্যানভান্ডারে একেক রকম হওয়ায় মোট সংখ্যায় পার্থক্য দেখা যায়, তবে তাঁর নথিবদ্ধ অ্যাসিস্ট চার শতাধিক। অর্থাৎ সরাসরি গোল-অবদান ১,৩০০-এর অনেক ওপরে।

২০১২ সালে এক ক্যালেন্ডার বছরে তিনি ৯১ গোল করেছিলেন। বার্সেলোনার হয়ে ৭৯টি এবং আর্জেন্টিনার হয়ে ১২টি। গার্ড মুলারের ৮৫ গোলের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে তৈরি করা সেই কীর্তি আজও অক্ষত।

আটটি ব্যালন ডি’অর, ইতিহাসে সর্বাধিক। ছয়টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু। লা লিগায় সর্বকালের রেকর্ড তাঁর দখলে – ৪৭৪ গোল। বার্সেলোনার হয়ে ৬৭২টি প্রতিযোগিতামূলক গোল। চ্যাম্পিয়নস লিগে ১২০টির বেশি গোল। আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা- ১২৫টির ও বেশি। এক ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোল, এল ক্লাসিকোর সর্বোচ্চ গোল, লা লিগায় সর্বোচ্চ হ্যাটট্রিকসহ অসংখ্য রেকর্ড তাঁর নামে। বার্সেলোনা ছাড়ার সময় তিনি ছিলেন ক্লাবটির সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ফুটবলার, সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সর্বাধিক শিরোপাজয়ী খেলোয়াড়।

Linel Messi Career

সংখ্যাগুলো শুধু বড় নয়, দীর্ঘ সময় ধরে পুনরাবৃত্ত। অনেক ফুটবলার দুই বা তিন মৌসুম শীর্ষে থাকেন। কেউ পাঁচ বছর ফুটবল পৃথিবী শাসন করেন। মেসি প্রায় দুই দশক ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ডিফেন্ডারের বিরুদ্ধে একই প্রভাব ধরে রেখেছেন। রোনালদিনহোর সঙ্গে খেলেছেন, জাভি ও ইনিয়েস্তার সঙ্গে ফুটবলের ছন্দ বদলেছেন, নেইমার ও লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগ গড়েছেন। পরে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেই মাঝমাঠের স্রষ্টায় পরিণত হয়েছেন।

তবে মেসির শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে সংখ্যার প্রয়োজন যতটা, সংখ্যার সীমাবদ্ধতা বোঝাও ঠিক ততটাই জরুরি। গোল একটি ঘটনার ফলাফল। স্কোরবোর্ডে সেটির মূল্য এক। কিন্তু গোলের আগে যে কল্পনা, ভারসাম্য, সময়জ্ঞান এবং ছন্দ কাজ করে, সেগুলো স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না।

মেসিকে শুধু গোল বা স্ট্যাটিস্টিক্যাল সংখ্যা দিয়ে বিচার করা মানে একটি উপন্যাসকে তার শব্দসংখ্যা দিয়ে মূল্যায়ন করা।

গোলের ওপারে যে ফুটবল

মেসির পরিসংখ্যান এত বিশাল যে তাঁর খেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি কখনো কখনো সংখ্যার নিচে চাপা পড়ে যায়। মানুষ জিজ্ঞেস করে, তিনি কত গোল করেছেন। কত অ্যাসিস্ট করেছেন। কত ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। তুলনার টেবিলে তাঁর পাশে আরেকজনের সংখ্যা বসিয়ে সিদ্ধান্ত খোঁজা হয়।

কিন্তু মেসিকে বুঝতে হলে কিছুক্ষণের জন্য স্কোরবোর্ড থেকে চোখ সরাতে হয়।

গোল শেষ ফল। মেসির শিল্প শুরু হয় তার অনেক আগে।

তিনি মাঠে হাঁটেন। এই হাঁটা নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ক্যামেরায় কখনো মনে হয়, খেলার বাইরে রয়েছেন। সতীর্থরা দৌড়াচ্ছেন, প্রতিপক্ষ চাপ দিচ্ছে, আর তিনি মাঝমাঠের কাছে ধীরে ধীরে অবস্থান বদলাচ্ছেন। কিন্তু সেই হাঁটা বিশ্রাম নয়। সেটি তথ্য সংগ্রহ।

কোন ডিফেন্ডার বলের দিকে অতিরিক্ত তাকাচ্ছেন, কার শরীরের ভার কোন পায়ে, কোন ফুলব্যাক সামনে উঠে জায়গা ছেড়েছেন, সতীর্থের দৌড় কখন শুরু হতে পারে, দুই লাইনের মাঝখানে কতটুকু ফাঁক তৈরি হয়েছে, সব তিনি দেখেন। তারপর হঠাৎ তাঁর একটি তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে ম্যাচের গতি বদলে যায়।

তাঁর বাঁ পায়ের সঙ্গে বলের সম্পর্ককে শুধু নিয়ন্ত্রণ বলা যথেষ্ট নয়। মেসির ক্ষেত্রে বল ও শরীর যেন একই ছন্দে চলে। তাঁর প্রতিটি ক্ষুদ্র স্পর্শ পরের পদক্ষেপের প্রস্তুতি। ডিফেন্ডার ট্যাকলের জন্য পা বাড়ানোর মুহূর্তে বলটি আর সেখানে থাকে না।

তিনি শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ভাঙেন না। তিনি প্রতিপক্ষের ভারসাম্যের বিরুদ্ধে খেলেন।

২০০৭ সালে গেটাফের বিপক্ষে মাঝমাঠ থেকে দৌড় শুরু করে একের পর এক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে করা গোলটি তাঁর ড্রিবলিংয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি। কিন্তু গোলটির সৌন্দর্য কেবল পাঁচজনকে কাটানোর মধ্যে নয়। প্রতিটি স্পর্শে তিনি নিজের জন্য পরের দরজা খুলেছেন। একটি স্পর্শও অপ্রয়োজনীয় নয়। বার্সেলোনার সমর্থকদের ভোটে সেটি ক্লাব ইতিহাসের সেরা গোল নির্বাচিত হয়েছিল।

২০১১ সালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালে তাঁর দৌড়, ২০১৫ সালে বায়ার্ন মিউনিখের জেরোম বোয়াটেংকে ভারসাম্যহীন করে ম্যানুয়েল নয়্যারের মাথার ওপর দিয়ে চিপ, অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিপক্ষে টাচলাইনের পাশ দিয়ে তিনজনকে কাটিয়ে গোল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে হেড, লিভারপুলের বিপক্ষে দূরপাল্লার ফ্রি-কিক, এসব মুহূর্ত শুধু গোলের তালিকা নয়। এগুলো ফুটবলের গতিবিদ্যা নিয়ে ছোট ছোট গবেষণাপত্র।

তবু ড্রিবলিংও তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।

মেসি একই সঙ্গে গোলদাতা এবং খেলা নির্মাতা। তিনি ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে গোল করতে পারেন। মাঝমাঠে নেমে পাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। রক্ষণের দুই লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বল নিয়ে ঘুরতে পারেন। প্রতিপক্ষের চারজনকে নিজের দিকে টেনে অন্য প্রান্তের সতীর্থকে মুক্ত করতে পারেন। গোলরক্ষক ও ডিফেন্ডারের মাঝখানে এমন পাস দিতে পারেন, যা একদিকে শটের মতো দ্রুত, অন্যদিকে সতীর্থের জন্য নিখুঁতভাবে নরম।

এই কারণেই তাঁর অ্যাসিস্টের সংখ্যাও অসাধারণ। কিন্তু সব সৃষ্টিশীলতাকে অ্যাসিস্টে ধরা যায় না। তিনি যে পাসটি দিয়ে রক্ষণ ভাঙলেন, তার পরের পাস থেকে গোল হলে প্রথম পাসটি পরিসংখ্যানে অদৃশ্য থাকে। তিনি তিনজন ডিফেন্ডারকে টেনে নিয়ে জায়গা তৈরি করলেন, অন্য কেউ সেই জায়গা ব্যবহার করে গোল করল, স্কোরশিট সেখানে মেসির নাম লিখবে না।

তবু ম্যাচটি বদলেছে তাঁর কারণেই।

গোলসংখ্যা একজন ফিনিশারের দক্ষতা বোঝাতে পারে। কিন্তু মেসি শুধু আক্রমণের শেষ বিন্দু নন; তিনি আক্রমণের শুরু, মধ্যবর্তী ছন্দ এবং শেষ সিদ্ধান্ত। একই খেলোয়াড় কখনো জাভির মতো খেলা পরিচালনা করেছেন, কখনো ইনিয়েস্তার মতো চাপ ভেঙেছেন, কখনো একজন বিশুদ্ধ নম্বর নাইন হিসেবে গোল করেছেন।

এই বহুস্তরীয়তাই তাঁকে আলাদা করে।

ফুটবলে গোল অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু মহত্ত্ব শুধু কতবার বল জালে গেছে তার হিসাব নয়। মহত্ত্ব হলো, একজন খেলোয়াড় মাঠে থাকলে বাকি ২১ জনের অবস্থান কীভাবে বদলে যায়। প্রতিপক্ষ কতটা নিচে নেমে যায়। সতীর্থ কতটা সাহস পায়। দর্শক বল তাঁর পায়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে কেন আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।

মেসি গোল করেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তিনি গোল হওয়ার আগের সময়টুকুকে শিল্পে পরিণত করেন।

যে হারগুলো তাঁকে তৈরি করেছিল

ক্লাব ফুটবলে মেসির সাফল্য যত বেড়েছে, আর্জেন্টিনার জার্সি তত ভারী হয়েছে। প্রতিটি ব্যালন ডি’অর যেন দেশের হয়ে একটি নতুন প্রশ্ন তৈরি করত। বার্সেলোনার হয়ে এত সহজে ম্যাচ বদলে দেওয়া মানুষটি আর্জেন্টিনাকে কেন শিরোপা এনে দিতে পারছেন না?

২০১৪ বিশ্বকাপে তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। গ্রুপ পর্বে গুরুত্বপূর্ণ গোল, নকআউটে সিদ্ধান্তমূলক অবদান এবং পুরো দলের আক্রমণ তাঁর চারপাশে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু মারাকানার ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটশের গোলে জার্মানি জিতে যায়। মেসি গোল্ডেন বল পেলেন, বিশ্বকাপ নয়।

২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে পরাজয়। ২০১৬ সালে আবার চিলি, আবার টাইব্রেকার, এবার নিজের পেনাল্টিও লক্ষ্যভ্রষ্ট। সেই পরাজয় তাঁকে অবসরের ঘোষণা পর্যন্ত ঠেলে দেয়।

মেসির ওপর চাপ শুধু ট্রফি না জেতার ছিল না। তাঁকে প্রতিনিয়ত মারাদোনার একটি বিশেষ সংস্করণের সঙ্গে তুলনা করা হতো—১৯৮৬ বিশ্বকাপে প্রায় একক আধিপত্যে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করা মারাদোনা। যেন একটি দলীয় খেলায় মহত্ত্ব প্রমাণের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো, আগের কিংবদন্তির গল্পটি হুবহু পুনরাবৃত্তি করা।

মেসি ফিরে এসেছিলেন। কারণ দেশের জার্সি থেকে দূরে থাকা তাঁকে শান্তি দেয়নি। কিন্তু ২০১৮ বিশ্বকাপেও মুক্তি আসেনি। কৌশলগত বিশৃঙ্খলায় থাকা আর্জেন্টিনা শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে যায়।

এই ব্যর্থতাগুলো তাঁর সর্বকালের সেরা হওয়ার দাবিকে দুর্বল করেনি; বরং তাঁর গল্পে মানবিক গভীরতা যোগ করেছে। মহান খেলোয়াড়েরও এমন রাত আসে, যখন প্রতিভা যথেষ্ট নয়। যখন ভুল দল, ভুল সময়, মানসিক চাপ এবং সামান্য দুর্ভাগ্য মিলিয়ে ট্রফির দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

পরিবর্তন আসে লিওনেল স্কালোনির অধীনে। তিনি মেসিকে একা পুরো জাতিকে বহন করতে বলেননি। বরং এমন একটি দল তৈরি করেন, যারা মেসির প্রতিভাকে ব্যবহার করবে, তাঁর দুর্বলতা ঢাকবে এবং প্রয়োজনে তাঁর জন্যও লড়বে। রদ্রিগো দি পল, এমিলিয়ানো মার্তিনেস, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লাউতারো মার্তিনেস ও পরে জুলিয়ান আলভারেসদের কাছে মেসি দূরের কোনো দেবতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।

এই সম্পর্কই মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

মারাকানার কান্না, মুক্তির শুরু

২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল। স্থান মারাকানা। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। অ্যাঞ্জেল দি মারিয়ার গোলের পর বাকি সময় আর্জেন্টিনা নিজেদের সামর্থ্যের সেরাটুকু দিয়ে লিড রক্ষা করল। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মেসি মাটিতে বসে পড়লেন। সতীর্থরা ছুটে এসে তাঁকে ঘিরে ধরলেন, তুলে নিলেন, আকাশে ছুড়ে দিলেন।

এবারও তাঁর চোখে জল ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের মেটলাইফের কান্না আর ২০২১ সালের মারাকানার কান্না এক ছিল না। প্রথমটি ছিল শূন্যতার। দ্বিতীয়টি মুক্তির।

এটি ছিল আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলের হয়ে মেসির প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা। শুধু একটি ট্রফি নয়, দীর্ঘদিনের মানসিক কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার দরজা। দেশের হয়ে তিনি কিছু জিততে পারেন না—এই অভিযোগের ভিত্তি সেদিন ভেঙে পড়েছিল।

এক বছর পর ওয়েম্বলিতে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা জেতে ফিনালিসিমা। মেসি দুটি গোল তৈরি করেন এবং ম্যাচসেরা হন। এই জয় প্রমাণ করে, মারাকানা কোনো বিচ্ছিন্ন আবেগের রাত ছিল না। স্কালোনির দল এখন সংগঠিত, আত্মবিশ্বাসী এবং বড় মঞ্চের উপযোগী।

কোপা আমেরিকা ছিল একটি প্রমাণ। ফিনালিসিমা আরেকটি। তবু শেষ প্রশ্নটি বেঁচে ছিল।

বিশ্বকাপ?

লুসাইলের রাত এবং অসমাপ্ত গল্পের পূর্ণতা

Argentina Celebration as WorldCup Champion 2022

কাতারে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ শুরু হয় সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলের পরাজয় দিয়ে। দীর্ঘ অপরাজিত যাত্রা হঠাৎ থেমে গেল। একটি ম্যাচেই পুরোনো সন্দেহ ফিরে এল। মেসির শেষ বিশ্বকাপ কি প্রথম সপ্তাহেই ভেঙে যাবে?

মেক্সিকোর বিপক্ষে পরের ম্যাচে আর্জেন্টিনা দীর্ঘ সময় গোল পাচ্ছিল না। পাসে ভয়, দৌড়ে দ্বিধা। তারপর বক্সের বাইরে থেকে মেসির নিচু বাঁ পায়ের শট জালে ঢুকে গেল। সেই গোল একটি দলকে আবার শ্বাস নিতে শেখায়।

এরপর মেসি বিশ্বকাপটিকে ধীরে ধীরে নিজের গল্পে পরিণত করেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গোল, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নাহুয়েল মোলিনাকে এমন একটি পাস, যার পথ ক্যামেরার ওপর থেকে দেখেও আগে অনুমান করা কঠিন। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে ইয়োশকো গভার্দিওলকে ডান প্রান্তে ঘুরিয়ে জুলিয়ান আলভারেসকে গোল বানিয়ে দেওয়া। তরুণ মেসির বিস্ফোরণ তখন কিছুটা কমেছে, কিন্তু ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা আরও গভীর।

১৮ ডিসেম্বর, লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনাল। প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ফাইনাল গড়াল টাইব্রেকারে।

মেসি আর্জেন্টিনার প্রথম পেনাল্টি নিতে এলেন। ছয় বছর আগে নিউ জার্সিতে চিলির বিপক্ষে একই মানুষ প্রথম শটটি ক্রসবারের ওপর দিয়ে মেরেছিলেন। সেই ব্যর্থতার পর বলেছিলেন, দেশের হয়ে তাঁর যাত্রা শেষ। এবার সামনে হুগো লরিস। পেছনে একটি দেশের নিঃশ্বাস। মেসি দৌড়ালেন। কোনো অতিরিক্ত শক্তি নয়, কোনো আতঙ্ক নয়। গোলরক্ষককে দেখে শান্তভাবে বলটি জালে পাঠালেন।

২০১৬ সালের ব্যর্থতা এবং ২০২২ সালের মুক্তি একটি সাদা বিন্দুর ওপর এসে মিলল।

গনসালো মন্তিয়েলের শেষ পেনাল্টি জালে ঢুকতেই মেসি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। সতীর্থরা তাঁকে ঢেকে ফেললেন। কিছুক্ষণ পর তিনি বিশ্বকাপ হাতে তুললেন—যে ট্রফিটির অনুপস্থিতিকে তাঁর পুরো ক্যারিয়ারের বিরুদ্ধে শেষ যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

কাতার বিশ্বকাপে মেসি সাতটি গোল করেন এবং তিনটি এসিস্ট করেন। ফাইনালে দুই গোলের পাশাপাশি টাইব্রেকারেও নিজের পেনাল্টি থেকে গোল করেন। তিনি দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতে এই পুরস্কার দুবার পাওয়া প্রথম খেলোয়াড় হন।

বিশ্বকাপটি তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন করে মহত্ত্ব যোগ করেনি। তিনি তার আগেই মহান ছিলেন। কিন্তু ট্রফিটি তাঁর গল্প থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আপত্তিটি সরিয়ে দিয়েছিল। “দেশের হয়ে পারেন না” কথাটি লুসাইলের ঘাসে সমাহিত হয়েছিল।

চার শিরোপায় পূর্ণ বৃত্ত

কাতারের পর গল্পটি শেষ হয়ে গেলেও অসম্পূর্ণ মনে হতো না। মেসির আর কিছু প্রমাণ করার ছিল না। তবু ২০২৪ কোপা আমেরিকা তাঁর আন্তর্জাতিক অধ্যায়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর যোগ করে।

ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে খেলতে গিয়ে গোড়ালিতে চোট পান তিনি। মাঠ ছাড়ার পর বেঞ্চে বসে কাঁদছিলেন। ক্যামেরায় দেখা যায় ফুলে যাওয়া গোড়ালি। ২০১৬ সালে তাঁর কান্না ছিল নিজের ব্যর্থতার সামনে। ২০২৪ সালে কান্না ছিল দলকে শেষ পর্যন্ত সাহায্য করতে না পারার অসহায়তা।

কিন্তু এবার আর্জেন্টিনা মেসির অনুপস্থিতিতেও ভেঙে পড়েনি। অতিরিক্ত সময়ে লাউতারো মার্তিনেসের গোলে শিরোপা জেতে দল। সতীর্থরা আবার ট্রফিটি তাঁর কাছে নিয়ে আসে।

২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা—টানা চারটি আন্তর্জাতিক শিরোপা। যে মানুষটির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার একসময় শুধু পরাজিত ফাইনালের তালিকা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হতো, তিনিই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সফল ধারাবাহিক যুগের কেন্দ্রে দাঁড়ালেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৪ সালের জয় মেসির নেতৃত্বের নতুন প্রমাণ দেয়। একটি দলকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা সহজ; এমন একটি দল তৈরি হওয়ার পরিবেশ তৈরি করা কঠিন, যারা অধিনায়ককে হারিয়েও তাঁর জন্য ম্যাচ জিততে পারে।

একসময় আর্জেন্টিনা মেসির কাছে মুক্তি চাইত। এখন আর্জেন্টিনাই তাঁকে মুক্তি দিতে শিখেছে, এবং তা শিখেছে মেসির-ই হাত ধরে।

Why Lionel Messi Is the Greatest of All Time

৩৯ বছরেও সময়ের নিয়ন্ত্রক

কাতারের পর প্রশ্ন ছিল, মেসি কি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে খেলবেন? খেললেও তাঁর ভূমিকা কতটুকু থাকবে? ৩৯ বছর বয়সে অধিকাংশ আক্রমণভাগের খেলোয়াড় অবসর নেন, অথবা মাঠে নামলেও অতীতের নাম নিয়ে বর্তমানের সঙ্গে সমঝোতা করেন।

মেসি সমঝোতা করেননি। তিনি নিজের খেলাটি বদলেছেন।

ইন্টার মায়ামিতে যাওয়ার পর অনেকে ভেবেছিলেন, সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার অধ্যায় শেষ। কিন্তু সেখান থেকে তিনি আবার বিশ্বমঞ্চে ফিরেছেন। ১৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় মেসি ম্যাচের শেষ ভাগে দুটি গোলই তৈরি করেন। প্রথমে তাঁর পাস থেকে এনজো ফের্নান্দেসের সমতা, পরে যোগ করা সময়ে তাঁর ক্রস থেকে লাউতারো মার্তিনেসের জয়সূচক গোল। ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেন।

এই বিশ্বকাপে সাত ম্যাচ শেষে তাঁর আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট। বিশ্বকাপে মোট গোল ২১, অ্যাসিস্টসহ মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩টি; যা এযাবতকালের সবচেয়ে বেশি। 

সেমিফাইনালের আগে তিনি গোলের জন্য প্রশংসিত হচ্ছিলেন; ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গোল না করেও পুরো ম্যাচের সিদ্ধান্ত বদলে দিলেন।

এই ঘটনাই তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের মূল যুক্তিটিকে আবার সামনে আনে। গোল না করেও তিনি ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হতে পারেন। কারণ তাঁর প্রভাব গোলের সংখ্যায় শুরু বা শেষ হয় না।

২০১২ সালের মেসি বল নিয়ে দৌড় শুরু করলে চারজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে দিতে পারতেন। ২০২৬ সালের মেসি প্রতি পাঁচ মিনিটে সেই দৌড় দেন না। তিনি অপেক্ষা করেন। প্রতিপক্ষের কাঠামো দেখেন। কোন খেলোয়াড় ক্লান্ত, কে অতিরিক্ত আগ্রাসী, কোথায় জায়গা তৈরি হচ্ছে—সেই তথ্য সংগ্রহ করেন।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি কেন্দ্রীয় ভিড় থেকে সরে ডান দিকে জায়গা খুঁজেছিলেন। প্রতিপক্ষ যখন রক্ষণ আরও সংকুচিত করল, মেসি তাদের ব্লকের বাইরে দাঁড়িয়ে বল নিতে শুরু করেন। সেখান থেকেই আসে দুটি সিদ্ধান্তমূলক পাস।

শরীরের গতি কমেছে বটে, চিন্তার গতি হয়েছে আরো তীব্র।

তিনি এখন কম দৌড়ে বেশি বিপদ তৈরি করেন। কম স্পর্শে বেশি দরজা খোলেন। একসময় শারীরিক শক্তি তাঁকে ডিফেন্ডারের পাশ দিয়ে নিয়ে যেত, এখন সেই কাজ করে তাঁর সময়জ্ঞান।

২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু দীর্ঘায়ুর প্রমাণ নয়। এটি অভিযোজনের প্রমাণ। মেসি দেখিয়েছেন, মহান খেলোয়াড় শুধু নিজের সেরা অস্ত্র দিয়ে যুগকে জয় করেন না; অস্ত্র বদলে গিয়েও প্রভাব ধরে রাখেন।

তিনি সময়ের বিরুদ্ধে লড়ছেন না। তিনি সময়কেই নিজের ছন্দে খেলাচ্ছেন।

মাঠের বাইরের নীরব দায়িত্ব

মেসির জনসম্মুখ চরিত্র তাঁর খেলার মতো নাটকীয় নয়। তিনি দীর্ঘ বক্তৃতা দেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিটি মতামত জানান না। নিজের মানবিক কাজকে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে পরিণত করার প্রবণতাও তাঁর মধ্যে খুব কম দেখা যায়।

কিন্তু নীরবতা নিষ্ক্রিয়তা নয়।

২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত লিও মেসি ফাউন্ডেশন শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খেলাধুলার সুযোগ নিয়ে কাজ করে। ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবেও তিনি শিশুস্বাস্থ্য ও শিক্ষার বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত। তবে এই কাজের অর্থ কেবল প্রতিষ্ঠান, তহবিল বা আনুষ্ঠানিক প্রচারের তালিকায় নেই। অর্থটি আছে সেই শিশুদের জীবনে, যাদের জন্য একটি শ্রেণিকক্ষ বা চিকিৎসার সুযোগ স্বাভাবিকভাবে উপস্থিত ছিল না।

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় তাঁর ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ২০টি অস্থায়ী কিন্তু সম্পূর্ণ সজ্জিত শ্রেণিকক্ষ তৈরি হয়েছিল। সেখানে ১,৬০০-এর বেশি শিশু আবার পড়াশোনায় ফেরার সুযোগ পায়। তাদের অনেকেই বাড়ি হারিয়েছিল। যুদ্ধ তাদের কাছ থেকে স্বাভাবিক সকাল, পরিচিত রাস্তা এবং নিরাপদ শৈশব কেড়ে নিয়েছিল। একটি শ্রেণিকক্ষ তাদের শুধু বই দেয়নি; কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও স্বাভাবিক জীবনের অনুভূতি ফিরিয়ে দিয়েছিল।

শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসা ও গবেষণাতেও ফাউন্ডেশন সহায়তা করেছে। কিন্তু হাসপাতালের নাম বা প্রকল্পের অঙ্কের চেয়ে বড় বিষয় হলো, একটি অসুস্থ শিশুর পরিবার যখন চিকিৎসার খরচ, অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে যায়, তখন সহায়তা মানে কেবল অর্থ নয়। সহায়তা মানে আরও একদিন চেষ্টা করার সুযোগ।

মেসি এই অনুভূতিটি জানেন।

তিনি একসময় এমন একটি শিশু ছিলেন, যার শরীরের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিভার গল্পটিও হয়তো থেমে যেত। বার্সেলোনা তাঁকে শুধু একটি জার্সি দেয়নি। চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য দিয়েছিল। একটি সুযোগ তাঁর উচ্চতা, ক্যারিয়ার, পরিবারের জীবন এবং শেষ পর্যন্ত ফুটবলের ইতিহাস বদলে দিয়েছে।

সম্ভবত এ কারণেই তাঁর কাজের কেন্দ্রে শিশুরা। তিনি নিজের শৈশবের দুর্বলতাকে কিংবদন্তির সাজসজ্জা বানাননি। সেই স্মৃতি দিয়ে অন্যদের জন্য একটি পথ খুলতে চেয়েছেন।

মাঠে তিনি এমন ফাঁক খুঁজে পান, যা অন্যদের চোখে বন্ধ। মাঠের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে মানবিক কাজটি একই—যেখানে একটি শিশুর সামনে সব পথ বন্ধ মনে হয়, সেখানে অন্তত একটি পথ খোলা রাখা।

এটিও এক ধরনের প্রমাণ। মহত্ত্ব শুধু পৃথিবীকে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করার ক্ষমতা নয়। পৃথিবীর এমন মানুষদের দিকে ফিরে তাকানোও মহত্ত্ব, যাদের দেখার সময় অধিকাংশ মানুষের নেই।

একজনই মেসি

সর্বকালের সেরা নির্ধারণের কোনো যন্ত্র নেই, নেই কোন সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি। ফুটবলের যুগ বদলেছে, নিয়ম বদলেছে, মাঠের গতি বদলেছে। পেলে তাঁর সময়কে বদলেছেন। মারাদোনা একটি জাতির কল্পনাকে নিজের শরীরে বহন করেছেন। রোনালদিনহো নান্দনিক ফুটবলের এক জাদুকরী মায়া ছড়িয়েছেন। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো পরিশ্রম, গোল ও দীর্ঘায়ুর এক অসাধারণ মানদণ্ড তৈরি করেছেন।

মেসির মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁদের কাউকে ছোট করার প্রয়োজন নেই।

তাঁর পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ কোনো একটি ট্রফি, একটি গোল বা একটি রেকর্ডও নয়। প্রমাণটি ছড়িয়ে আছে পুরো যাত্রায়।

রোসারিওর ছোট শরীরের ছেলেটি চিকিৎসার অনিশ্চয়তা পেরিয়ে বার্সেলোনায় গিয়েছিল। সেখানে সে গোলের রেকর্ড ভেঙেছে, কিন্তু শুধু গোলদাতা হয়ে থাকেনি। পাস, ছন্দ, ড্রিবল ও কল্পনায় খেলাটির ভাষা প্রসারিত করেছে। দেশের হয়ে বারবার হেরেছে, ভেঙে পড়েছে, অবসর নিয়েছে, আবার ফিরেছে। মারাকানায় মুক্তি পেয়েছে, লুসাইলে শেষ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। ৩৯ বছর বয়সে এসে আবার দেখিয়েছে, গোল না করেও একটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল নিজের হাতে লেখা যায়।

এবং এত কিছুর পরও নিজের শৈশবের অসহায়তাকে ভুলে যায়নি।

সম্ভবত এ কারণেই মেসিকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ধরতে গেলে তিনি বারবার হিসাবের বাইরে চলে যান। সংখ্যাগুলো তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়, কিন্তু তাঁর সম্পূর্ণতা ধারণ করতে পারে না। ট্রফিগুলো তাঁর ক্যারিয়ারকে সাজায়, কিন্তু তাঁর খেলার অনুভূতি ব্যাখ্যা করতে পারে না।

একদিন তাঁর কোনো রেকর্ড ভেঙে যাবে। ভবিষ্যতের কোনো খেলোয়াড় আরও বেশি গোল করতে পারেন, আরও দ্রুত দৌড়াতে পারেন, আরও দীর্ঘ সময় খেলতে পারেন। কিন্তু রেকর্ড ভাঙা এবং একটি খেলার ভাষা বদলে দেওয়া একই বিষয় নয়।

লিওনেল মেসি শুধু ফুটবলের রেকর্ড বদলাননি; তিনি ফুটবল খেলা এবং ফুটবল দেখার ভাষাটাই বদলে দিয়েছেন।

সর্বশেষ