ক্ষুধা, মানুষ আর শিল্প — শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের শিল্পচেতনার উপাখ্যান

সর্বাধিক আলোচিত

বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে একটি নাম বারবার ফিরে আসে — শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সেই মর্মান্তিক দৃশ্যপট — রাস্তার পাশে পড়ে থাকা কঙ্কালসার মানুষ, ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর মায়ের কোলে মুমূর্ষু শিশু। জয়নুল শুধু একজন চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবতার কণ্ঠস্বর, সমাজের বিবেক এবং বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের পথপ্রদর্শক।​​

তার তুলিতে উঠে এসেছে বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, নদী-নৌকা, কৃষক-জেলে, সাঁওতাল নারীর গর্বিত পদচারণা । তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প শুধু নান্দনিক আনন্দের বিষয় নয়, বরং সমাজের প্রতিফলন, মানুষের জীবন-সংগ্রামের দলিল। আজও তার সৃষ্টি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে একটি তুলি হয়ে উঠতে পারে প্রতিবাদের হাতিয়ার, আর একজন শিল্পী হতে পারেন জাতির পথপ্রদর্শক।​

শৈশব ও প্রভাব — ব্রহ্মপুত্রের কোলে বেড়ে ওঠা শিল্পী

জয়নুল আবেদীন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা তমিজউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, আর মা জয়নাবুন্নেছা । নয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন জয়নুল।​

ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় শৈশব কাটানো জয়নুলের শিল্পবোধ গড়ে ওঠে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মধ্যে । নদীর ঢেউয়ের দোলা, জেলেদের জীবনযাত্রা, মাঝিদের সংগ্রাম, গ্রামীণ প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্য — সবই তার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তিনি নিজেই বলতেন, “নদীই আমার শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক”। এই প্রকৃতিঘেঁষা শৈশব তার পরবর্তী শিল্পকর্মে বিশেষ ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি করেছিল।​

ছোটবেলা থেকেই তার ছবি আঁকার প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ । মাত্র ষোল বছর বয়সে বন্ধুদের সাথে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন শুধু গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখার জন্য । সেখান থেকে ফিরে আসার পর সাধারণ পড়াশোনায় আর মন বসছিল না তার । ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই স্কুলের পড়ালেখা ছেড়ে কলকাতায় চলে যান এবং মায়ের অনুসমর্থনে গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসে ভর্তি হন । তার মা নিজের গলার হার বিক্রি করে ছেলেকে শিল্পশিক্ষায় সহায়তা করেছিলেন।​

১৯৩৮ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৩৮ সালে অল ইন্ডিয়া এক্সিবিশনে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর তার জলরঙের একটি সিরিজ গভর্নরের স্বর্ণপদক লাভ করে। এই পুরস্কারই তাকে নিজস্ব ভিজ্যুয়াল স্টাইল তৈরির আত্মবিশ্বাস যোগায় ।​

পঞ্চাশের মন্বন্তর — মানবতার অশ্রুগাঁথা

Bengal famine

১৯৪৩ সালের মন্বন্তর ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের এক ভয়াবহ অধ্যায় । লাখো মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছিল। এই মানবিক বিপর্যয় জয়নুল আবেদীনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল । দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পরপরই তিনি ময়মনসিংহের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন এবং দুর্ভিক্ষের মর্মান্তিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। কলকাতায় ফিরে এসে তিনি সেই দুস্থ মানুষদের রাতদিন স্কেচ করতে শুরু করেন।​​

চারকোল পুড়িয়ে নিজে কালি তৈরি করে সাধারণ প্যাকিং পেপারে তিনি এঁকেছিলেন সেইসব ক্ষুধাকাতর মানুষের ছবি । রাস্তার পাশে পড়ে থাকা মানুষ, শিশুকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় ক্লান্ত মা, মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা কঙ্কালসার দেহ। তার এই স্কেচগুলো শুধু দুর্ভিক্ষের ডকুমেন্ট ছিল না, বরং মানবতার অপমান ও যন্ত্রণার জীবন্ত সাক্ষ্য ছিল।​​

১৯৪৪ সালে এই দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার প্রদর্শনী তাকে রাতারাতি খ্যাতি এনে দেয় । এই স্কেচগুলো মানব দুর্দশার আইকনিক ইমেজে পরিণত হয়েছিল । ব্রিটিশ সরকার এই ছবিগুলোকে সংবেদনশীল মনে করে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শিল্পের শক্তি এমনই যে, তা কোনো শাসকের ক্ষমতাকেও চ্যালেঞ্জ করে ।​

জয়নুল নিজে এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “বন্যা প্রকৃতির। তাই এর বিরুদ্ধে করবার কিছুই নেই। দুর্ভিক্ষ মানুষের সৃষ্টি। মানবতার অপমান আমাকে ব্যথিত করেছিল। তাই দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকেছি” । এই উক্তিতে ফুটে ওঠে তার শিল্পচেতনার মূল ভিত্তি — মানবতা, সত্য এবং প্রতিবাদ।​

শিল্পদর্শন ও শিল্পচেতনা — মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি

জয়নুল আবেদীন মনে করতেন, শিল্পীর দায়িত্ব শুধু সুন্দর ছবি আঁকা নয়, বরং সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রকাশ করা। তার শিল্পচেতনার মূল ভিত্তি ছিল মানবতাবাদ । তিনি চেয়েছিলেন শিল্পের মাধ্যমে মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সংগ্রাম ও সম্মানকে তুলে ধরতে।​

বিশিষ্ট শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, “উনি যে শিল্পচর্চা করতেন তার মূল ক্ষেত্র ছিলো মানবতা। তাঁকে মানবতার শিল্পী বলা হয়” । জয়নুল বিশ্বাস করতেন, শিল্পী হলেন সমাজের চোখ, যে দেখে, অনুভব করে এবং তা প্রকাশ করে । তিনি ইউরোপীয় একাডেমিক স্টাইলের সীমাবদ্ধতায় সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন বাস্তবতাবাদ, যেখানে মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রা ও সংগ্রাম স্থান পায়।​

তিনি অনুকরণকে প্রশ্রয় দেননি, বরং ফর্মগুলোকে সহজ করে এক ধরনের আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন । বিষয় বাছাইয়ে তিনি পূর্ব বাংলার বৈশিষ্ট্য, গ্রামীণ জীবন ও লোকশিল্পের উপাদানকে প্রাধন্য দিয়েছেন। গুণটানা, প্রসাধন, পাইন্যার মা, চারটি মুখ, দুই মহিলা — এসব ছবিতে তার এই দর্শন স্পষ্ট।​

লন্ডনের স্লেড স্কুল অব ফাইন আর্টস থেকে দুই বছরের প্রশিক্ষণের পর তিনি তৈরি করেছিলেন ‘বেঙ্গলি স্টাইল’ — যেখানে লোকজ ফর্ম, জ্যামিতিক আকার, অর্ধ-বিমূর্ত উপস্থাপনা এবং প্রাথমিক রঙের ব্যবহার ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে পরে তিনি বুঝতে পারেন লোকশিল্পের সীমাবদ্ধতা এবং ফিরে যান প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন ও মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের দিকে।​

প্রতিষ্ঠান নির্মাতা — বাংলার শিল্পশিক্ষার পথিকৃৎ

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর জয়নুল আবেদীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ঢাকায় তখন কোনো শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। কলকাতা, মুম্বাই, মাদ্রাজ বা দিল্লিতে যেতে হতো শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করতে। এই প্রয়োজন অনুভব করে ১৯৪৮ সালে জয়নুল আবেদীন শিল্পী আনোয়ারুল হক, কামরুল হাসান, খাজা শফিক আহমেদ, সফিউদ্দীন আহমেদ এবং হাবিবুর রহমানকে নিয়ে জনসন রোডের একটি বিল্ডিংয়ে শুরু করেন সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউট।​

প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে মাত্র ছয়জন শিক্ষক ও আঠারো জন ছাত্র নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু । ১৯৫১ সালে সেগুনবাগিচায়, ১৯৫৬ সালে শাহবাগে এটি স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৩ সালে এটি প্রথম শ্রেণির সরকারি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় । স্বাধীনতার পর এর নাম হয় বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়, আর ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চারুকলা অনুষদে পরিণত হয়।​

জয়নুল আবেদীন ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী, হামিদুর রহমান, মনিরুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়াসহ অনেকেই । তিনি ছাত্রদের শেখাতেন, ছবি আঁকতে গেলে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, চোখ, মন, হৃদয় সব শিল্পের মধ্যে ঢেলে দিতে হয়।​

শিল্পী রফিকুন নবী তার স্মৃতিচারণে বলেন, জয়নুল আবেদীন ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে গরু এঁকেছিলেন — লেজ থেকে শুরু করে পেছন দিক, ঘাড়, মাথা, চারটা পা দিয়ে। এই অভিজ্ঞতা তার জীবনে অমলিন হয়ে আছে।​

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার জয়নুল আবেদীনকে দায়িত্ব দেন বাংলাদেশের সংবিধানের অলংকরণের জন্য। তিনি অত্যন্ত উৎসাহের সাথে এই কাজ সম্পন্ন করেন।​

প্রধান শিল্পকর্ম ও শৈলী — রেখায় বাংলার প্রাণ

জয়নুল আবেদীনের শিল্পকর্মের বেশিরভাগই ছিল গ্রামীণ পটভূমিতে আঁকা । তার প্রিয় বিষয় ছিল নৌকা, নদী, গরু, গরুর গাড়ি, কৃষক, মাঝি, জেলে, সাঁওতাল নারী। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা ছাড়াও তার বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে নৌকা (১৯৫৭), সংগ্রাম (১৯৫৯), বীর মুক্তিযোদ্ধা (১৯৭১), ম্যাডোনা।​

১৯৭০ সালে তিনি গ্রামবাংলার উৎসব নিয়ে আঁকেন বিখ্যাত ৬৫ ফুট দীর্ঘ স্ক্রল পেইন্টিং ‘নবান্ন’। কালো কালি, মোম ও জলরঙে আঁকা এই চিত্রকর্মে উঠে এসেছে গ্রামীণ বাংলার ফসল উৎসবের আনন্দ ও আশা। এটি ছিল তৎকালীন অসহযোগ আন্দোলনের প্রতীক।​

এর পরপরই ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকায় তিন লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। জয়নুল আবেদীন তখন এঁকেছিলেন ‘মনপুরা ৭০’ শীর্ষক ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের আরেকটি স্ক্রল চিত্র। কালো কালি ও রেখায় এঁকেছিলেন ধ্বংসযজ্ঞ, জীবনের ভাঙন ও নতুন জীবনের ইঙ্গিত।​

তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে সাঁওতাল দম্পতি (১৯৬৩), দুই সাঁওতাল নারী, মই দেওয়া, বিদ্রোহী গরু, কাদায় পড়া গরুর গাড়ি, বুড়িগঙ্গা নদী, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, ব্যাম্বু ফোর্ট অব তিতুমীর। ১৯৭৬ সালে তার মৃত্যুর অল্প আগে আঁকা শেষ ছবি ছিল ‘দুই মুখ’।​

তার শিল্পকর্মে মোটা দাগের সাহসী রেখা, জলরঙ, গোয়াশ, তেলরং, টেম্পেরার ব্যবহার দেখা যায় । লোকশিল্পের মোটিফ হুবহু ব্যবহার না করে তিনি তা সহজীকরণ ও আধুনিকীকরণ করেছিলেন ।​

সাংস্কৃতিক নেতা ও গুরু — প্রজন্মের পথপ্রদর্শক

জয়নুল আবেদীন শুধু শিল্পী ও শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন শিল্পসংগঠক ও সাংস্কৃতিক নেতা । ১৯৪৮ সালে ঢাকা আর্ট গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন যার সভাপতি তিনি নিজেই ছিলেন। এই সংগঠন বাংলাদেশের শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে।​

১৯৭৫ সালে তিনি সোনারগাঁওয়ে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর এবং ময়মনসিংহে জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নেন। ১৯৫৬ সালে তিনি তার ছাত্র হামিদুর রহমানকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৬৫ সালে তিনি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চারুকলা বিভাগ প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।​

তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়া, হাশেম খান, মামুন কায়সারসহ অসংখ্য বিশিষ্ট শিল্পী। তিনি তাদের শিখিয়েছিলেন শিল্পের মাধ্যমে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। তার গুণমুগ্ধ ছাত্রছাত্রীরাই তাকে ‘শিল্পাচার্য’ উপাধি দিয়েছিলেন।​

বিশিষ্ট শিল্পী মামুন কায়সার বলেন, “আবেদিন স্যার না থাকলে আমরা যারা শিল্পী আছি, আমাদের কারোরই জন্ম হতো না”। তিনি আরও বলেন, “জয়নুল আবেদিন শিল্পচর্চার একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন বলেই আজকে সেখান থেকে অনেক শিল্পী তৈরি হয়েছেন”।​

পুরস্কার ও সম্মাননা — স্বদেশ ও বিদেশে স্বীকৃতি

জয়নুল আবেদীন তার জীবদ্দশায় দেশে-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালে অল ইন্ডিয়া এক্সিবিশনে গভর্নরের স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ পদক প্রদান করে। ১৯৭৪ সালে ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লেটার্স ডিগ্রি পান।​

১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম তিনজন জাতীয় অধ্যাপকদের একজন হবার মর্যাদা অর্জন করেন। তিনি স্বাধীনতা পদক এবং বাংলা একাডেমীর সম্মানসূচক ফেলো সম্মাননা পেয়েছিলেন। তার স্মৃতি রক্ষার্থে চারুকলা মহাবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৭৭ সাল থেকে ‘জয়নুল আবেদীন পুরস্কার’ প্রবর্তন করেছে।​

২০০৯ সালে বুধ গ্রহের একটি ক্রেটারের নাম তার নামে নামকরণ করা হয়। ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুগল তার ১০৫তম জন্মবার্ষিকীতে গুগল ডুডল দিয়ে সম্মান জানায় । সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে লন্ডনের সোথেবিস নিলামে তার ‘আনটাইটেল্ড’ (১৯৭০) চিত্রকর্ম ৬,৯২,০৪৮ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয় — যা বাংলাদেশি শিল্পকর্মের সর্বোচ্চ নিলাম মূল্য ।​

Zainul Abedin Awards

পুরস্কার ও সম্মাননা

সাল পুরস্কার / সম্মাননা স্থান / প্রতিষ্ঠান
১৯৩৮ গভর্নরের স্বর্ণপদক অল ইন্ডিয়া এক্সিবিশন, কলকাতা
১৯৫৬ প্রাইড অব পারফরম্যান্স পাকিস্তান সরকার
১৯৭৪ ডক্টর অব লেটার্স (সম্মানসূচক) দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত
১৯৭৫ বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক বাংলাদেশ সরকার
২০০৯ বুধ গ্রহের একটি ক্রেটারের নামকরণ আন্তর্জাতিক

 

উত্তরাধিকার ও আজকের প্রাসঙ্গিকতা — শিল্প যখন চিরন্তন

জয়নুল আবেদীন ১৯৭৬ সালের ২৮ মে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন । তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয় । তিনি তিন হাজারেরও বেশি ছবি এঁকেছিলেন ।​

আজও তার শিল্পকর্ম প্রাসঙ্গিক কারণ তা মানবতা, ন্যায়বিচার, সত্য ও মর্যাদার কথা বলে । তরুণ শিল্পীরা তার কাছ থেকে শিখতে পারেন কীভাবে শিল্প হতে পারে সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার । তার জীবন শেখায় নিবেদন, কঠোর পরিশ্রম ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ।​

শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, “শিল্পকলাকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে আদরণীয় করা, মানুষের মধ্যে শিল্পকলার বোধ জাগ্রত করা, শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে মানুষের রুচির পরিবর্তনে তার অনেক বড় অবদান রয়েছে” । তিনি আরও বলেন, “তিনি আমাদের শিল্পকলার ক্ষেত্রটিকে সম্মানজনক একটি জায়গায় নিয়ে গেছেন” ।​

ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা, সোনারগাঁওয়ের লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ — এসব প্রতিষ্ঠান তার স্বপ্ন ও কর্মের সাক্ষী । রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভবনটিও তার নামে নামকরণ করা হয়েছে।​

চিরদিনের শিল্পাচার্য

জয়নুল আবেদীন শুধু একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আন্দোলন, একটি দর্শন, একটি প্রতিষ্ঠান । তার তুলিতে বাংলার মানুষ খুঁজে পেয়েছে নিজেদের প্রতিকৃতি, নিজেদের সংগ্রাম, নিজেদের সম্মান । দুর্ভিক্ষের স্কেচে তিনি তুলে ধরেছিলেন মানবতার চরম অবক্ষয়, আর ‘নবান্ন’-এ তুলে ধরেছিলেন বাঙালির আশা ও স্বপ্ন ।​

আজকের বাংলাদেশ তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তার জন্মবার্ষিকী পালিত হয় দেশব্যাপী শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে । তার শিল্পকর্ম বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, জয়নুল সংগ্রহশালা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহে সযত্নে সংরক্ষিত।​

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের উত্তরাধিকার রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব । তার শিল্পদর্শন, মানবতাবোধ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আজকের প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করুক । তার শিল্প আমাদের মনে করিয়ে দিক — শিল্প শুধু আনন্দের জন্য নয়, তা সমাজের আয়না, মানুষের কণ্ঠস্বর, পরিবর্তনের হাতিয়ার।​

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. জয়নুল আবেদীনের সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পকর্ম কোনটি?

জয়নুল আবেদীনের সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পকর্ম হলো ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা, যা মানবিক বিপর্যয়ের জীবন্ত দলিল।​​

২. তাকে ‘শিল্পাচার্য’ উপাধি কে দিয়েছিলেন?

তার গুণমুগ্ধ ছাত্রছাত্রীরাই তাকে ‘শিল্পাচার্য’ উপাধি দিয়েছিলেন এবং তিনি সত্যিই এই সম্মানের যোগ্য ছিলেন।​

৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ কে প্রতিষ্ঠা করেন?

১৯৪৮ সালে জয়নুল আবেদীন ও তার সহযোগীরা ঢাকায় সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ) প্রতিষ্ঠা করেন।​

৪. ‘নবান্ন’ ও ‘মনপুরা’ শিল্পকর্ম কী নিয়ে আঁকা?

‘নবান্ন’ (৬৫ ফুট) গ্রামবাংলার ফসল উৎসবের আনন্দ নিয়ে এবং ‘মনপুরা ৭০’ (৩০ ফুট) ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে আঁকা।​

৫. জয়নুল আবেদীনের শিল্পচেতনার মূল ভিত্তি কী ছিল?

মানবতাবাদ, সত্য, ন্যায়বিচার ও সমাজের প্রতি শিল্পীর দায়বদ্ধতা ছিল তার শিল্পচেতনার মূল ভিত্তি।​

সর্বশেষ