বাংলাদেশে ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এর সোনা ও রুপার দাম: ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্য রেকর্ড

সর্বাধিক আলোচিত

বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে পরপর অষ্টমবারের মতো দাম বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকায় পৌঁছে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রুপার দাম অপরিবর্তিত রয়েছে, যেখানে ২২ ক্যারেট রুপা প্রতি গ্রাম ৫২০ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে।

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ সোনার সর্বশেষ দাম

বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি রবিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি ১ হাজার ৫৭৫ টাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কমিটির চেয়ারমান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এর আগে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল প্রতি ভরি ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৫৬ টাকা। বর্তমান বৃদ্ধিতে শতাংশের হিসাবে ০.৬৯% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে এই মূল্যবান ধাতুর সর্বোচ্চ মূল্য।

সোনার ভরি, গ্রাম, আনা ও রতি অনুযায়ী দাম

নিম্নলিখিত সারণিতে বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণের বিস্তারিত মূল্য তালিকা উপস্থাপন করা হলো:

স্বর্ণের ধরন প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) প্রতি গ্রাম প্রতি আনা (০.৭২৯ গ্রাম) প্রতি রতি (০.১২১৫ গ্রাম)
২২ ক্যারেট ৳২,২৯,৪৩১ ৳১৯,৬৭০ ৳১৪,৩৩৯.৪৩ ৳২,৩৮৯.৯০
২১ ক্যারেট ৳২,১৮,৯৯১.৬০ ৳১৮,৭৭৫ ৳১৩,৬৮৬.৯৮ ৳২,২৮১.১৬
১৮ ক্যারেট ৳১,৮৭,৭৩২.০৮ ৳১৬,০৯৫ ৳১১,৭৩৩.২৫ ৳১,৯৫৫.৫৪
সনাতন পদ্ধতি ৳১,৫৬,৫৩০.৮৮ ৳১৩,৪২০ ৳৯,৭৮৩.১৮ ৳১,৬৩০.৫৩

 

এই মূল্য তালিকা থেকে স্পষ্ট যে ২২ ক্যারেট স্বর্ণ বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সর্বাধিক ব্যবহৃত হয় গহনা তৈরিতে। হলমার্কযুক্ত স্বর্ণের চাহিদা বাজারে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে কারণ এটি ক্রেতাদের বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। বাজুসের নির্দেশনা অনুযায়ী, সকল স্বর্ণালংকারে ক্যাডমিয়াম হলমার্ক থাকা বাধ্যতামূলক।

স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বর্ণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই দাম বৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে। ১২ ডিসেম্বর প্রতি ভরি ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৫ টাকা ছিল যা ১৫ ডিসেম্বরে বেড়ে ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ টাকায় উন্নীত হয়। এরপর ১৬ ডিসেম্বরে ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা এবং ২৫ ডিসেম্বরে বিশাল লাফ দিয়ে ২ লাখ ২৬ হাজার ২৮২ টাকায় পৌঁছায়। সর্বশেষ ৩০ ডিসেম্বর থেকে এটি ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকায় স্থিতিশীল হয়েছে।

রুপার বর্তমান বাজারমূল্য

রুপার দাম বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে এবং কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাজুস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে রুপার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য স্থিতিশীল থাকায় স্থানীয় বাজারেও দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। রুপা সাধারণত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের কাছে জনপ্রিয় কারণ এটি স্বর্ণের তুলনায় সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য।

রুপার ভরি, গ্রাম, আনা ও রতি অনুযায়ী দাম

নিচের সারণিতে বিভিন্ন ক্যারেটের রুপার বিস্তারিত মূল্য তালিকা প্রদান করা হলো:

রুপার ধরন প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) প্রতি গ্রাম প্রতি আনা (০.৭২৯ গ্রাম) প্রতি রতি (০.১২১৫ গ্রাম)
২২ ক্যারেট ৳৬,০৬৫.২৮ ৳৫২০ ৳৩৭৯.০৮ ৳৬৩.১৮
২১ ক্যারেট ৳৫,৭৭৩.৬৮ ৳৪৯৫ ৳৩৬০.৮৬ ৳৬০.১৪
১৮ ক্যারেট ৳৪,৯৫৭.২০ ৳৪২৫ ৳৩০৯.৮২ ৳৫১.৬৪
সনাতন পদ্ধতি ৳৩,৭৩২.৪৮ ৳৩২০ ৳২৩৩.২৮ ৳৩৮.৮৮

রুপার গহনা বিশেষত নবজাতক শিশু, কিশোর-কিশোরীদের জন্য এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য জনপ্রিয়। এছাড়া অনেকে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যেও রুপা ক্রয় করে থাকেন কারণ দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে।

স্বর্ণ ও রুপার দাম বৃদ্ধির কারণসমূহ

বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে যা স্থানীয় বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন।

আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (LBMA) কর্তৃক নির্ধারিত হয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে বৈশ্বিক স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্সে ২,০০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, যা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য হ্রাস পাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর যা আমদানি খরচ বাড়ায়।

স্থানীয় বাজারের গতিশীলতা

স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ (পিউর গোল্ড বা ২৪ ক্যারেট স্বর্ণ) এর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজুস প্রতিটি ক্যারেটের স্বর্ণের দাম সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে স্বর্ণ আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যা চাহিদার উচ্চতার ইঙ্গিত দেয়। বিবাহ মৌসুম এবং বিভিন্ন উৎসবের সময় চাহিদা আরও বেড়ে যায়।

মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থা

দেশের সার্বিক মুদ্রাস্ফীতির হার ২০২৫ সালে ৯-১০ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে যা সকল পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। মানুষ তাদের সঞ্চয় রক্ষার জন্য স্বর্ণে বিনিয়োগ করছেন কারণ ইতিহাস বলে যে স্বর্ণ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি কার্যকর হেজ হিসাবে কাজ করে।

ভ্যাট ও মেকিং চার্জ সংক্রান্ত তথ্য

স্বর্ণ ও রুপা ক্রয়ের সময় ক্রেতাদের মূল মূল্যের সাথে অতিরিক্ত কিছু খরচ বহন করতে হয়। সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মেকিং চার্জ প্রযোজ্য হয়। মেকিং চার্জ গহনার ডিজাইন ও মানের ওপর নির্ভর করে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে ১৫-২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

ভ্যাট ও মেকিং চার্জ গণনার উদাহরণ

যদি কোনো ক্রেতা ১০ গ্রাম ২২ ক্যারেট স্বর্ণ ক্রয় করতে চান, তাহলে খরচের হিসাব হবে নিম্নরূপ:

  • মূল মূল্য: ১৯,৬৭০ × ১০ = ১,৯৬,৭০০ টাকা

  • ভ্যাট (৫%): ১,৯৬,৭০০ × ০.০৫ = ৯,৮৩৫ টাকা

  • মেকিং চার্জ (ন্যূনতম ৬%): ১,৯৬,৭০০ × ০.০৬ = ১১,৮০২ টাকা

  • মোট খরচ: ২,১৮,৩৩৭ টাকা (আনুমানিক)

তবে মনে রাখতে হবে যে বিভিন্ন স্বর্ণালংকার প্রতিষ্ঠানে মেকিং চার্জের হার ভিন্ন হতে পারে। জটিল ডিজাইনের ক্ষেত্রে এই চার্জ স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়। ক্রেতাদের ক্রয়ের পূর্বে সম্পূর্ণ খরচের বিস্তারিত জেনে নেওয়া উচিত।

হলমার্ক স্বর্ণের গুরুত্ব

হলমার্ক স্বর্ণের গুরুত্ব

হলমার্ক হলো স্বর্ণের বিশুদ্ধতার একটি সার্টিফিকেশন যা সরকার অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) এবং বাজুস যৌথভাবে হলমার্ক প্রদান করে থাকে। হলমার্কযুক্ত স্বর্ণ ক্রয় করলে ক্রেতা নিশ্চিত হতে পারেন যে তিনি যে ক্যারেটের স্বর্ণ কিনছেন তা প্রকৃতপক্ষে সেই বিশুদ্ধতার।

হলমার্কের সুবিধাসমূহ

হলমার্কযুক্ত স্বর্ণ ক্রয়ের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে যা প্রতিটি ক্রেতার জানা উচিত। প্রথমত, এটি বিশুদ্ধতার গ্যারান্টি প্রদান করে এবং জালিয়াতি থেকে রক্ষা করে। দ্বিতীয়ত, পুনঃবিক্রয়ের সময় হলমার্কযুক্ত স্বর্ণ অধিক মূল্য পায় কারণ ক্রেতা বিশুদ্ধতা নিয়ে নিশ্চিত থাকেন। তৃতীয়ত, ব্যাংক লোন বা জামানতের ক্ষেত্রে হলমার্কযুক্ত স্বর্ণ সহজে গ্রহণযোগ্য।

স্বর্ণ ক্রয়ের সঠিক সময় ও কৌশল

স্বর্ণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে সঠিক সময় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মূল্য প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিবাহ মৌসুম এবং প্রধান উৎসবের সময় এড়িয়ে ক্রয় করলে অপেক্ষাকৃত ভালো মূল্য পাওয়া সম্ভব। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে নজর রাখা এবং যখন মূল্য সাময়িকভাবে কমে তখন ক্রয় করা বুদ্ধিমানের কাজ।

বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ

স্বর্ণকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থনৈতিক মন্দা বা অস্থিরতার সময়ে স্বর্ণের দাম সাধারণত বৃদ্ধি পায়। তবে শুধুমাত্র গহনা হিসেবে ক্রয় না করে স্বর্ণের বার বা কয়েন ক্রয় করলে মেকিং চার্জ সাশ্রয় হয় এবং পুনঃবিক্রয়ের সময় বেশি মূল্য পাওয়া যায়। অনেক ব্যাংক এখন ডিজিটাল গোল্ড বা সোভারেইন গোল্ড বন্ড সুবিধা প্রদান করছে যা ভৌত স্বর্ণের তুলনায় নিরাপদ এবং সুবিধাজনক।

রুপা: সাশ্রয়ী বিকল্প

স্বর্ণের ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে অনেকেই রুপার দিকে ঝুঁকছেন। রুপা শুধুমাত্র সাশ্রয়ী নয়, বরং এটিও একটি মূল্যবান ধাতু যার নিজস্ব বাজার মূল্য রয়েছে। বিশেষত শিশুদের জন্য রুপার গহনা নিরাপদ এবং হালকা বলে অভিভাবকরা পছন্দ করেন। এছাড়া আধুনিক ফ্যাশনে রুপার গহনার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

রুপার স্বাস্থ্য উপকারিতা

রুপা শুধু অলংকার নয়, এর কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতাও রয়েছে যা প্রাচীনকাল থেকে স্বীকৃত। রুপার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা ত্বকের সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। অনেক সংস্কৃতিতে নবজাতকদের রুপার গহনা পরানোর প্রথা রয়েছে এই বিশ্বাসে যে এটি শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলেন যে এই উপকারিতা সীমিত এবং অতিরিক্ত দাবি করা উচিত নয়।

বাজুস ও স্বর্ণবাজার নিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) দেশের স্বর্ণ ও রুপা ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন যা ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সংগঠনটি স্বর্ণ-রুপার মূল্য নির্ধারণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রেতা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করে এবং সেই অনুযায়ী স্থানীয় মূল্য নির্ধারণ করে।

বাজুসের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া

বাজুস প্রতি সপ্তাহে বা প্রয়োজন অনুযায়ী বৈঠক করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি খরচ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণ করে। সংগঠনটি স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য প্রতিটি মূল্য পরিবর্তনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে যেখানে নতুন দাম এবং পরিবর্তনের কারণ উল্লেখ থাকে। বাজুসের সদস্যরা এই নির্ধারিত মূল্য মেনে চলতে বাধ্য এবং কোনো ব্যতিক্রম পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ভোক্তা সচেতনতা ও সতর্কতা

স্বর্ণ-রুপা ক্রয়ের সময় ভোক্তাদের বেশ কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, সবসময় হলমার্কযুক্ত স্বর্ণ ক্রয় করা উচিত এবং হলমার্ক সিল যাচাই করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ক্রয়ের সময় সম্পূর্ণ বিল এবং গ্যারান্টি কার্ড নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ওজন যাচাই করার জন্য নিজস্ব ইলেকট্রনিক স্কেল ব্যবহার করার সুযোগ চাইতে হবে।

প্রতারণা থেকে বাঁচার উপায়

বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন উপায়ে ক্রেতাদের প্রতারিত করার চেষ্টা করে। কম ক্যারেটের স্বর্ণ বেশি ক্যারেট বলে চালানো, ওজনে কম দেওয়া বা অতিরিক্ত মেকিং চার্জ নেওয়া এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব থেকে বাঁচতে শুধুমাত্র স্বনামধন্য এবং বাজুস স্বীকৃত দোকান থেকে ক্রয় করা উচিত। সন্দেহ হলে সরকারি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করানোর সুযোগ রয়েছে।

ডিজিটাল স্বর্ণ: আধুনিক বিনিয়োগ পদ্ধতি

প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে স্বর্ণে বিনিয়োগের পদ্ধতিও পরিবর্তিত হচ্ছে। ডিজিটাল গোল্ড একটি নতুন ধারণা যেখানে ভৌত স্বর্ণ না কিনেও স্বর্ণে বিনিয়োগ করা সম্ভব। বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ এখন এই সুবিধা প্রদান করছে যেখানে ক্ষুদ্র পরিমাণ থেকে শুরু করে যেকোনো পরিমাণে স্বর্ণ কেনা সম্ভব।

ডিজিটাল স্বর্ণের সুবিধা

ডিজিটাল গোল্ডের প্রধান সুবিধা হলো সংরক্ষণের নিরাপত্তা এবং সুবিধা। ভৌত স্বর্ণ লকারে রাখা বা নিরাপত্তার চিন্তা করতে হয় না। যেকোনো সময় অনলাইনে বিক্রয় করা সম্ভব এবং মেকিং চার্জ লাগে না। এছাড়া বিনিয়োগের পরিমাণ ছোট হতে পারে যা সাধারণ মানুষের জন্য সুবিধাজনক। তবে এই পদ্ধতিতে গহনা তৈরি করা সম্ভব নয় এবং শুধুমাত্র বিনিয়োগ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।

২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম: সম্ভাব্য প্রবণতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম বর্তমান প্রবণতা অনুসরণ করে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলে স্বর্ণের চাহিদা বাড়বে। তবে যদি বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থিতিশীল হয় এবং সুদের হার বৃদ্ধি পায়, তাহলে স্বর্ণের দাম সামান্য কমতেও পারে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ

স্বর্ণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একবারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের চেয়ে নিয়মিত ছোট ছোট বিনিয়োগ (SIP পদ্ধতি) অধিক লাভজনক হতে পারে। এতে মূল্যের ওঠানামার ঝুঁকি কমে এবং গড় ক্রয় মূল্য ভালো পাওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণ একটি ভালো বিকল্প কিন্তু স্বল্পমেয়াদী লাভের জন্য এটি উপযুক্ত নয়। পোর্টফলিও বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে মোট সম্পদের ১০-১৫% স্বর্ণে রাখা যুক্তিসঙ্গত।

স্বর্ণ-রুপার কর ও নিয়মকানুন

বাংলাদেশে স্বর্ণ-রুপা আমদানি এবং বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সরকারি নিয়ম ও কর প্রযোজ্য। আমদানির সময় শুল্ক, কর এবং অন্যান্য ফি পরিশোধ করতে হয় যা চূড়ান্ত মূল্যে প্রতিফলিত হয়। ভ্যাট ছাড়াও নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি স্বর্ণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে TIN সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক এবং লেনদেনের রেকর্ড রাখতে হয়। বিদেশ থেকে স্বর্ণ আনার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা এবং ঘোষণার নিয়ম রয়েছে।

শেষ কথা

বাংলাদেশে ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ২২ ক্যারেট স্বর্ণ প্রতি ভরি ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টানা অষ্টম দফায় মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে, তবে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ সুরক্ষার জন্য স্বর্ণকে এখনও সর্বোত্তম বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন। রুপার দাম স্থিতিশীল থাকায় মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি একটি সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে উপস্থিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের গতিবিধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যতে স্বর্ণের দাম নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করবে। ক্রেতাদের সচেতন থাকা, হলমার্কযুক্ত পণ্য ক্রয় এবং স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে লেনদেন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বর্ণ শুধু অলংকার নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং আর্থিক নিরাপত্তার মাধ্যম যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সম্পদ সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে।

সর্বশেষ