সুরের আকাশে স্তব্ধতাঃ অমর কণ্ঠের অনন্ত যাত্রা

সর্বাধিক আলোচিত

আজকের দিনটা অন্য আর দশটা সাধারণ দিনের মতো নয়। ১২ এপ্রিল, ২০২৬—দিনটি ক্যালেন্ডারের পাতায় হয়তো একটি সাধারণ তারিখ হয়েই থাকতো, কিন্তু আজ চারপাশের পৃথিবীটাকে বড্ড বেশি শান্ত, বড্ড বেশি নিস্তব্ধ মনে হচ্ছে। রেডিওতে কিংবা মোবাইলের প্লেলিস্টে হয়তো বেজে উঠেছে সেই চিরচেনা, প্রাণবন্ত একটি কণ্ঠস্বর, কিন্তু শোনার সাথে সাথেই বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছে এক অদ্ভুত শূন্যতায়। বাতাসে কান পাতলে যেন আজ কেবলই একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। 

৯২ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে আমাদের ছেড়ে এক অনন্ত যাত্রায় পাড়ি জমিয়েছেন কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলে। যে কণ্ঠস্বর আট দশকেরও বেশি সময় ধরে আমাদের হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে, প্রেমে পড়তে শিখিয়েছে এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উদযাপন করতে শিখিয়েছে, সেই কণ্ঠস্বর আজ শারীরিকভাবে নীরব। 

কিন্তু সত্যি কি তিনি চলে গেছেন? একজন শিল্পী যখন তার সৃষ্টির মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেন, তখন মৃত্যু কেবলই একটি জাগতিক শব্দ হয়ে দাঁড়ায়। আজকের এই দিনটি কেবলই শোকের নয়, বরং এক বর্ণাঢ্য, জাদুকরী জীবনের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের দিন।

এই শোকের আবহের মাঝেই আমাদের ফিরে তাকাতে হয় সেই বর্ণাঢ্য অতীতের দিকে, যেখান থেকে এই কিংবদন্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং কীভাবে তিনি নিজেকে এক অমর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন।

ছায়া থেকে আলোয়: নিজের পথ খোঁজার এক রূপকথার সংগ্রাম

Asha Bhosle Eternal Legacy - At a Glance

আশা ভোঁসলের জীবনের গল্পটা কোনো মসৃণ রাজপথের গল্প ছিল না। ১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলিতে পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকরের মতো এক প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীর ঘরে তার জন্ম। কিন্তু খুব ছোটবেলাতেই পিতৃহীন হওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের কাঁধে। লতা যখন ধীরে ধীরে ভারতীয় সঙ্গীতের বিশাল আকাশ দখল করে নিচ্ছেন, তখন সেই বিশাল বটবৃক্ষের ছায়ায় নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা আশার জন্য মোটেই সহজ কাজ ছিল না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু সেই বৈবাহিক জীবন সুখের হয়নি। তিন সন্তানকে নিয়ে একপর্যায়ে তাকে ফিরে আসতে হয় মায়ের কাছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে এবং সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য শুরু হয় তার এক অভাবনীয় জীবন সংগ্রাম।

প্রথম দিকের দিনগুলো ছিল প্রত্যাখ্যান আর উপেক্ষার। তখনকার দিনের প্রথম সারির নায়িকাদের জন্য তার কণ্ঠকে খুব একটা বিবেচনা করা হতো না। তাকে দেওয়া হতো পার্শ্বচরিত্র, ক্যাবারে ড্যান্সার কিংবা ভ্যাম্পদের জন্য তৈরি গানগুলো। গীতা দত্ত বা শমশাদ বেগমের মতো শিল্পীদের পাশাপাশি বড় বোনের প্রবল আধিপত্যের মাঝে অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি হয়তো কেবলই ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকবেন। কিন্তু এখানেই লুকিয়ে ছিল আশা’র জীবনের সবচেয়ে বড় ম্যাজিক। তিনি এই অবহেলাকেই নিজের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করলেন। যে গানগুলো অন্য কেউ গাইতে চাইতো না, সেই গানগুলোতেই তিনি প্রাণ ঢেলে দিলেন। তার কণ্ঠে এমন এক অদ্ভুত মাদকতা, এমন এক অনায়াস আবেদন ছিল যা খুব দ্রুতই শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলল।

বিষয় বিবরণ
জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ (সাঙ্গলি, মহারাষ্ট্র)
মৃত্যু ১২ এপ্রিল, ২০২৬ (মুম্বাই, মহারাষ্ট্র)
পিতা-মাতা পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর এবং শেবন্তী (সুধামতী)
সঙ্গীত পরিবার লতা মঙ্গেশকর, ঊষা মঙ্গেশকর, মীনা খাড়িকার, হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর
কর্মজীবনের সূচনা ১৯৪৩ সাল (মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল’-এর গান “চলা চলা নব বালা” দিয়ে)
হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিষেক ১৯৪৮ সাল (ছবি: ‘চুনরিয়া’, গান: “সাওন আয়া”)

 

জীবনের এই কঠিন সংগ্রামগুলোই তাকে আরও ইস্পাতকঠিন করে তুলেছিল, যা তার পরবর্তী সাঙ্গীতিক জীবনে এক অভূতপূর্ব বিবর্তনের সূচনা করে।

কণ্ঠের জাদুকরী বিবর্তন ও সাফল্যের শিখর

আশা ভোঁসলের কণ্ঠের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার অবিশ্বাস্য বহুমুখিতা। ভারতীয় সঙ্গীত জগতে তার মতো এত ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে এবং এত সাবলীলভাবে গাইতে পারার ক্ষমতা খুব কম শিল্পীরই ছিল। নিজেকে বারবার ভেঙে নতুন করে গড়ার এক নিরন্তর প্রক্রিয়া ছিল তার পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে। বিভিন্ন সুরকারের হাতে পড়ে তার কণ্ঠের এই বিবর্তনগুলো যেন এক একটি নতুন যুগের জন্ম দিয়েছিল।

ও.পি. নাইয়ার এবং নিজস্ব পরিচিতি

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সুরকার ও.পি. নাইয়ারের সাহচর্যে আশা ভোঁসলে তার নিজস্ব পরিচিতি খুঁজে পান। ‘নয়া দৌড়’, ‘হাওড়া ব্রিজ’ বা ‘কাশ্মীর কি কলি’র মতো ছবিতে তার গাওয়া গানগুলো রীতিমতো ঝড় তুলেছিল। আপনি যখন তার কণ্ঠে “আইয়ে মেহেরবাঁ” বা “ইশারোঁ ইশারোঁ মে” শোনেন, তখন মনে হয় যেন এক মুক্ত বিহঙ্গ ডানা মেলে উড়ছে আকাশে। নাইয়ার সাহেবের সেই বিখ্যাত ঘোড়ার খুরের ছন্দের সাথে আশার উচ্ছল কণ্ঠ মিলে এক অদ্ভুত জাদুকরী আবহের সৃষ্টি করত, যা সেকেলে বিষণ্ণ গায়কী থেকে হিন্দি গানকে মুক্তি দিয়েছিল।

আর. ডি. বর্মন এবং পপ ঘরানার উন্মেষ

এরপর এলো সেই বিখ্যাত আর. ডি. বর্মন (পঞ্চম) যুগ। ভারতীয় সঙ্গীতে পশ্চিমা সুরের ছোঁয়া, জ্যাজ, রক এবং পপের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটল এই সময়ে। ‘তিসরি মঞ্জিল’, ‘ক্যারাভান’ কিংবা ‘হরে রামা হরে কৃষ্ণা’-তে তাদের জুটি কেবল সিনেমাকেই হিট করেনি, বরং গোটা একটি প্রজন্মের কাছে বিদ্রোহ আর তারুণ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। “পিয়া তু আব তো আজা” কিংবা “দুম মারো দুম”-এর মতো গানগুলোর মাধ্যমে আশা ভোঁসলে হয়ে উঠলেন সেই আধুনিক প্রজন্মের মূল কণ্ঠস্বর। তার গলার মধ্যে যে একটা অদ্ভুত হাসি আর প্রশ্বাস লুকিয়ে থাকতো, তা শ্রোতাদের মুহূর্তে চাঙ্গা করে তুলতো।

খৈয়াম এবং গজল গায়িকা হিসেবে নবজন্ম

আবার অন্যদিকে, যখন তিনি সুরকার খৈয়ামের সুরে ১৯৮১ সালের ‘উমরাও জান’ চলচ্চিত্রে গজল গাইলেন, তখন সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। “ইন আঁখোঁ কি মাস্তি” কিংবা “দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়” গাওয়ার সময় তার কণ্ঠের সেই চটুলতা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। সেখানে ভর করলো এক গভীর, শাস্ত্রীয় এবং বিষণ্ণ অনুভূতি। যে সমালোচকরা বলতেন আশা কেবল দ্রুত লয়ের গানই গাইতে পারেন, তারা চিরতরে নীরব হয়ে গেলেন। এই অ্যালবামের জন্যই তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

নব্বইয়ের দশক এবং আধুনিক পপ সংস্কৃতি

বয়স যখন ষাটের কোঠায়, তখন তিনি তরুণ প্রজন্মের সুরকার এ. আর. রহমানের সুরে ‘রঙ্গিলা’ চলচ্চিত্রে “তানহা তানহা” গেয়ে বুঝিয়ে দিলেন বয়স তার কাছে শুধুই একটি সংখ্যা। নব্বইয়ের দশকে এমটিভি (MTV) যুগে লেসলি লুইসের সাথে ইন্ডি-পপ অ্যালবাম ‘জানাম সামঝা কারো’ বের করে তিনি রীতিমতো তরুণদের হার্টথ্রব হয়ে উঠলেন।

তার এই সুবিশাল ও বৈচিত্র্যময় সাঙ্গীতিক কর্মজীবন এক নজরে বোঝার জন্য নিচে তার ক্যারিয়ারের বিভিন্ন যুগ ও উল্লেখযোগ্য গানগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো:

সুরকার/যুগ গানের ধারা উল্লেখযোগ্য গান/অ্যালবাম
ও.পি. নাইয়ার (৫০-৬০ দশক) রোমান্টিক, চটুল সুর আইয়ে মেহেরবাঁ, ইশারোঁ ইশারোঁ মে, জাইয়ে আপ কাহাঁ
আর. ডি. বর্মন (৭০-৮০ দশক) পপ, ক্যাবারে, ফিউশন পিয়া তু আব তো আজা, দুম মারো দুম, চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে
খৈয়াম ও অন্যান্য (৮০ দশক) শাস্ত্রীয়, গজল ইন আঁখোঁ কি মাস্তি, দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়, মেরা কুছ সামান
এ. আর. রহমান (৯০ দশক) আধুনিক, ফিউশন তানহা তানহা, রাধা ক্যায়সে না জলে, মুঝে রঙ দে
লেসলি লুইস ও পপ যুগ পপ, ইন্ডি-পপ জানাম সামঝা কারো, পিয়া রে পিয়া রে (অ্যালবাম)

 

এই দীর্ঘ এবং বহুমুখী কর্মজীবনে তিনি কেবল মানুষের ভালোবাসাই পাননি, বরং ঝুলিতে পুরেছেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মানজনক পুরস্কার ও স্বীকৃতি, যা তাকে ভারতীয় সঙ্গীতের শিখরে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

স্বীকৃতির মুকুট: সাফল্যের এক অসামান্য খতিয়ান

আশা ভোঁসলে তার দীর্ঘ আট দশকের ক্যারিয়ারে ১২,০০০-এর বেশি গান রেকর্ড করেছেন। কুড়িটিরও বেশি ভারতীয় এবং বিদেশী ভাষায় তার গান রয়েছে। রাশিয়ান থেকে শুরু করে মালয়—এমন কোনো ভাষা নেই যেখানে তিনি তার প্রতিভার ছাপ রাখেননি। তার এই নিরলস সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন, যা তার সাফল্যের বিশালতাকে প্রমাণ করে।

আশা ভোঁসলের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রাপ্ত অজস্র সম্মাননার মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কিছু অর্জনের চিত্র নিচে সারণীভুক্ত করা হলো:

সম্মাননা/পুরস্কার বছর/বিবরণ
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ২০১১ (সঙ্গীত ইতিহাসে সর্বাধিক স্টুডিও রেকর্ডিং (১১,০০০+ গান) এর জন্য স্বীকৃত)
পদ্মবিভূষণ ২০০৮ (ভারত সরকারের প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা)
দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ২০০০ (ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ আজীবন সম্মাননা)
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (ভারত) ২ বার (১৯৮১/১৯৮২: ‘উমরাও জান’, ১৯৮৬/১৯৮৮: ‘ইজাজত’ চলচ্চিত্রের জন্য)
ফিল্মফেয়ার পুরস্কার ৭ বার শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য গায়িকা এবং ১৯৯৬ সালে আজীবন সম্মাননা
বিবিসি সম্মাননা বিশ্বের শীর্ষ ২০ জন সঙ্গীতশিল্পীর তালিকায় অন্তর্ভুক্তি

হিন্দি গানের জগতে এমন একাধিপত্য এবং এতসব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকলেও, ভারতের অন্যান্য ভাষার গান, বিশেষ করে বাংলা গানের সাথে তার এক আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

বাঙালির আবেগে আশা: এক নাড়ির টান

একজন মারাঠি হয়েও আশা ভোঁসলে যেভাবে বাংলা গানকে নিজের করে নিয়েছিলেন, তা এক কথায় অভাবনীয়। বাঙালির পুজো মানেই একসময় ছিল আশা ভোঁসলের নতুন গানের অ্যালবাম। সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত থেকে শুরু করে আর. ডি. বর্মনের সুরে তার গাওয়া বাংলা গানগুলো আজও বাঙালির ড্রয়িংরুমে, চায়ের আড্ডায় কিংবা একলা বিকেলের সঙ্গী হয়ে আছে।

“যেতে দাও আমায় ডেকোনা”, “মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো”, “সন্ধ্যা বেলায় তুমি আমি”, কিংবা “কিনারে কিনারে”—এই গানগুলো ছাড়া বাঙালির রোমান্টিসিজম যেন একেবারেই অসম্পূর্ণ। তার উচ্চারণে যে সামান্য মারাঠি টান ছিল, তা বাংলা গানকে যেন আরও বেশি মিষ্টি, আরও বেশি আপন ও আদুরে করে তুলেছিল। তিনি জানতেন কীভাবে একটি গানের কথার ভেতরের অন্তর্নিহিত আবেগকে ঠিকমতো স্পর্শ করতে হয়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা মান্না দের সাথে তার দ্বৈত গানগুলো আজও যেকোনো সঙ্গীতপ্রেমীর কাছে অমূল্য রত্ন।

তার গানগুলো কেবল ক্যাসেট বা রেকর্ডে কিংবা পুজোর মণ্ডপেই সীমাবদ্ধ ছিল না, সেগুলো প্রতিটি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল।

জীবনের প্রতিটি বাঁকে তাঁর গানের ছোঁয়া

গান কেবল তার পেশা ছিল না, গান ছিল তার বেঁচে থাকার শ্বাস। আশা ভোঁসলের গানগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে এমনভাবে মিশে আছে যে, তাকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। প্রথম প্রেমের সেই লাজুক অনুভূতি থেকে শুরু করে, বিরহের গভীর ক্ষত, বন্ধুদের সাথে বাঁধভাঙা উল্লাস, কিংবা একাকীত্বের বিষাদ—আমাদের জীবনের প্রতিটি আবেগের জন্য তার একটি না একটি গান ঠিকই বরাদ্দ আছে।

ব্যক্তিগত জীবনে তাকে অনেক ঝড়-ঝাপটা পার করতে হয়েছে। কাছের মানুষদের অকালে হারানো, কন্যা বর্ষার মর্মান্তিক মৃত্যু, পুত্র হেমন্তের চলে যাওয়া এবং স্বামী আর. ডি. বর্মনের প্রয়াণ—সবকিছুই তিনি দেখেছেন খুব কাছ থেকে। এত শোক বুকে নিয়েও তিনি কখনো নিজের কষ্টগুলোকে তার গানের ওপর বা দর্শকদের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি। মঞ্চে উঠলে কিংবা স্টুডিওর মাইকের সামনে দাঁড়ালে তিনি হয়ে উঠতেন সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ। তার ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা যেন গলে গলে সুর হয়ে বের হতো, আর সেই সুর আমাদের হৃদয়ে প্রলেপ লাগাতো।

বয়স তার কাছে কেবলই একটি সংখ্যা ছিল। সত্তরের কোঠায় এসেও তিনি যেভাবে তরুণ প্রজন্মের সাথে পাল্লা দিয়ে মঞ্চে পারফর্ম করতেন, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় ছিল না। সঙ্গীতের পাশাপাশি রান্নার প্রতি তার প্রবল ঝোঁক ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘আশা’স’ (Asha’s) নামে তার সফল রেস্তোরাঁ চেইন প্রমাণ করে যে জীবনকে তিনি কতটা বৈচিত্র্যের সাথে উপভোগ করেছেন। তার এনার্জি, তার প্রাণবন্ত হাসি এবং জীবনের প্রতি তার এই অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে চিরতরুণ করে রেখেছিল।

মহাকালের বুকে এক অনন্ত প্রতিধ্বনি

আজ তিনি নেই। এই চরম সত্যটা মেনে নিতে হয়তো আমাদের অনেকটা সময় লাগবে। সংবাদমাধ্যমের পাতা জুড়ে আজ কেবলই তার বিদায়ের খবর, আর চারদিকে ভক্তদের অশ্রুসজল চোখ। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন তো, এমন একজন শিল্পী কি সত্যিই কখনো চলে যেতে পারেন?

যতদিন পৃথিবীতে প্রেম থাকবে, যতদিন মানুষের বুকে অভিমান জমবে, যতদিন বৃষ্টির বিকেলে এক কাপ চা হাতে মানুষ উদাস হয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকবে, ততদিন আশা ভোঁসলে বেঁচে থাকবেন। তার গান বেঁচে থাকবে আমাদের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে, প্রতিটি হাসিতে এবং প্রতিটি অনুভবে। তিনি আমাদের যে সুবিশাল সুরের উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন, তা এক অমূল্য রত্ন, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত হবে।

আজকের এই বিদায়ে চোখের জল ফেলাটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন তার এই জাদুকরী জীবনটাকে মন থেকে উদযাপন করা। মেঘের আড়ালে হয়তো আজ সূর্যটা ঢাকা পড়েছে, সুরের আকাশে হয়তো আজ সাময়িক এক নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে খুব শিগগিরই কোনো এক ক্যাসেট প্লেয়ারে বা ডিজিটাল স্ক্রিনে বেজে উঠবে তার কোনো চিরচেনা সুর। কারণ, জাগতিক কণ্ঠ হয়তো নীরব হয়, কিন্তু কিংবদন্তিদের সৃষ্টি মহাকালের বুকে এক অনন্ত প্রতিধ্বনি হয়ে বেজে চলে চিরকাল। বিদায়, সুরের রাণী। আপনার এই অনন্ত যাত্রা শান্তিময় হোক। আপনি ছিলেন, আপনি আছেন, এবং আপনি চিরকাল আমাদের সুরের আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলবেন।

সর্বশেষ