ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা আধুনিক সময়ের সবচেয়ে সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি । বাংলাদেশে ১৮.৭ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, যার মধ্যে বিষণ্নতা অন্যতম । অনেকেই মনে করেন এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে জটিল চিকিৎসা বা দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি প্রয়োজন। কিন্তু সুখবর হলো, ঘরে বসেই কিছু সহজ এবং কার্যকর ডিপ্রেশন কাটানোর উপায় অনুসরণ করে আপনি আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারেন।
এই লেখায় আমরা বিজ্ঞানসম্মত এবং প্রমাণিত ১০টি পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব যা আপনার দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম ।
ডিপ্রেশন কী এবং কেন এটি হয়?
ডিপ্রেশন বা মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার একটি গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যা আপনার অনুভূতি, চিন্তাভাবনা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব ফেলে । এটি শুধুমাত্র সাময়িক দুঃখবোধ নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা যা সঠিক যত্ন এবং পদক্ষেপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে ৫৭.৯ শতাংশ বিষণ্নতায় ভুগছেন, যা উদ্বেগজনক ।
ডিপ্রেশনের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রমাগত মন খারাপ থাকা, কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব এবং আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া । আধুনিক জীবনযাত্রার চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, জৈবিক কারণ এবং জীবনের নেতিবাচক ঘটনা ডিপ্রেশনের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই অবস্থার উন্নতি সম্ভব ।
ঘরে বসে ডিপ্রেশন কাটানোর ১০টি কার্যকর উপায়
১. নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও যোগব্যায়াম
শারীরিক ব্যায়াম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। গবেষণায় দেখা গেছে যে, নিয়মিত ব্যায়াম করলে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার দিন ৪০ শতাংশেরও বেশি কমে যায় । ১,১৫৮টি গবেষণার মধ্যে ৮৯ শতাংশ ইতিবাচক সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে শারীরিক কার্যকলাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে ।
ব্যায়াম মস্তিষ্কে এন্ডরফিন নামক রাসায়নিক নিঃসরণ করে, যা প্রাকৃতিক মুড বুস্টার হিসেবে কাজ করে । এটি স্ট্রেস কমায়, ঘুমের মান উন্নত করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। সকালে ৩০ মিনিট হাঁটা, ঘরে হালকা ব্যায়াম, যোগব্যায়াম বা নাচের মতো কার্যক্রম খুবই কার্যকর। মাঝারি থেকে উচ্চ তীব্রতার ব্যায়াম সপ্তাহে কয়েকবার করলে সবচেয়ে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় ।
| ব্যায়ামের ধরন | সুবিধা | সময়কাল |
| হাঁটা বা দৌড় | হৃদস্বাস্থ্য ও মুড উন্নতি | দিনে ৩০ মিনিট |
| যোগব্যায়াম | মন শান্ত ও নমনীয়তা বৃদ্ধি | দিনে ২০-৩০ মিনিট |
| রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং | শক্তি বৃদ্ধি ও আত্মবিশ্বাস | সপ্তাহে ২-৩ বার |
| নাচ বা জুম্বা | আনন্দদায়ক ও সামাজিক | দিনে ২০-৩০ মিনিট |
২. সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন
আপনার খাবার আপনার মানসিক স্বাস্থ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড ডিপ্রেশনের লক্ষণ কমাতে সাহায্য করে । দৈনিক ৪ গ্রাম ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে বিষণ্নতা, প্রেরণা এবং মানসিক কার্যক্ষমতার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয় ।
মস্তিষ্কের সঠিক কার্যকলাপের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান যেমন ভিটামিন বি, ডি, ম্যাগনেসিয়াম এবং ট্রিপটোফ্যান যুক্ত খাবার নিয়মিত খান । মাছ (বিশেষত চর্বিযুক্ত মাছ), বাদাম, ডার্ক চকলেট, সবুজ শাকসবজি, ফল এবং সম্পূর্ণ শস্য খাবার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পরিশোধিত চিনি, অতিরিক্ত ক্যাফেইন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন। নিয়মিত খাবার সময়সূচি মেনে চলা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।
| খাদ্য উপাদান | উৎস | মানসিক স্বাস্থ্যে ভূমিকা |
| ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড | মাছ, আখরোট, ফ্ল্যাক্সসিড | প্রদাহ কমায়, মুড উন্নত করে |
| ভিটামিন ডি | সূর্যালোক, ডিম, দুধ | সেরোটোনিন উৎপাদন বাড়ায় |
| ম্যাগনেসিয়াম | পালং শাক, কলা, কালো চকলেট | মস্তিষ্কের কার্যক্রম সহায়তা করে |
| ট্রিপটোফ্যান | মুরগি, ডিম, বাদাম | সেরোটোনিন তৈরিতে সহায়ক |
৩. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম
ঘুমের সমস্যা এবং ডিপ্রেশনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে দুর্বল ঘুমের মান ভবিষ্যতে বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ায় । অপর্যাপ্ত ঘুম আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যা সরাসরি বিষণ্নতার তীব্রতা বৃদ্ধি করে ।
প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অপরিহার্য । একটি নিয়মিত ঘুমের রুটিন তৈরি করুন—প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং জাগুন। শোবার ঘর অন্ধকার, শান্ত এবং ঠান্ডা রাখুন। শোবার অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ করুন। ক্যাফেইন এবং ভারী খাবার সন্ধ্যার পরে এড়িয়ে চলুন। ঘুমের আগে হালকা যোগব্যায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করলে মন শান্ত হয়।
| ঘুমের অভ্যাস | সুবিধা | প্রয়োগ পদ্ধতি |
| নিয়মিত রুটিন | শরীরের ঘড়ি সঠিক রাখে | একই সময়ে ঘুমানো ও জাগা |
| অন্ধকার পরিবেশ | মেলাটোনিন উৎপাদন বাড়ায় | ব্ল্যাকআউট কার্টেন ব্যবহার |
| শোবার আগে শিথিলতা | মানসিক চাপ কমায় | ধ্যান বা হালকা পড়া |
| স্ক্রিন এড়ানো | নীল আলো থেকে সুরক্ষা | শোবার ১ ঘণ্টা আগে বন্ধ |
৪. সূর্যালোক ও প্রকৃতির সাথে সংযোগ
সূর্যালোক ভিটামিন ডি উৎপাদনে সাহায়তা করে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন ডি-র অভাব বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ায়। প্রাকৃতিক আলো শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ি নিয়ন্ত্রণ করে, যা ঘুম এবং মুডের সাথে সম্পর্কিত।
প্রতিদিন সকালে অন্তত ১৫-২০ মিনিট সূর্যালোকে সময় কাটান। বারান্দায় বা ছাদে বসে সূর্যালোক উপভোগ করুন। বাড়িতে গাছপালা রাখলে বাতাসের গুণমান উন্নত হয় এবং মন শান্ত থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রকৃতির সাথে সংযোগ স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল কমায় এবং মানসিক প্রশান্তি বাড়ায়। যদি সম্ভব হয়, সপ্তাহে একবার পার্কে বা প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটান।
| প্রাকৃতিক উপাদান | মানসিক প্রভাব | সহজ উপায় |
| সূর্যালোক | ভিটামিন ডি বৃদ্ধি, মুড উন্নত | সকালে ১৫-২০ মিনিট বাইরে থাকা |
| সবুজ গাছপালা | স্ট্রেস কমায়, বাতাস পরিশোধন | বাড়িতে ইনডোর প্ল্যান্ট রাখা |
| প্রাকৃতিক দৃশ্য | মানসিক প্রশান্তি | জানালার পাশে সময় কাটানো |
| তাজা বাতাস | অক্সিজেন বৃদ্ধি, ক্লান্তি কমে | বারান্দায় গভীর শ্বাস নেওয়া |
৫. প্রিয়জনদের সাথে কথা বলুন
সামাজিক সংযোগ এবং মানসিক সাপোর্ট ডিপ্রেশন কাটানোর উপায় হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর। মানুষ সামাজিক প্রাণী, এবং বিচ্ছিন্নতা বিষণ্নতা বাড়ায়। পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা মানসিক সুস্থতার জন্য জরুরি।
নিজের অনুভূতি এবং সমস্যা শেয়ার করা মানসিক চাপ কমায়। আপনি যখন কারো সাথে কথা বলেন, তখন আপনার মস্তিষ্ক অক্সিটোসিন নামক হরমোন নিঃসরণ করে যা বন্ধন এবং বিশ্বাসের অনুভূতি তৈরি করে। প্রতিদিন অন্তত একজন প্রিয়জনের সাথে ফোনে বা সরাসরি কথা বলুন। পরিবারের সাথে খাবার সময় শেয়ার করুন। প্রয়োজনে সাপোর্ট গ্রুপ বা কাউন্সেলিং সেবা নিতে দ্বিধা করবেন না ।
| সামাজিক কার্যক্রম | মানসিক উপকার | বাস্তবায়ন |
| প্রিয়জনের সাথে কথা | আবেগ প্রকাশ, হালকা বোধ | দৈনিক ১৫-৩০ মিনিট |
| পারিবারিক সময় | বন্ধন শক্তিশালী করা | একসাথে খাবার বা খেলা |
| সাপোর্ট গ্রুপ | অভিজ্ঞতা শেয়ার, পরামর্শ | সপ্তাহে বা মাসে একবার |
| স্বেচ্ছাসেবী কাজ | উদ্দেশ্যবোধ, সংযোগ | মাসে কয়েকবার |
৬. শখের কাজ ও সৃজনশীল কার্যক্রম
সৃজনশীল কার্যক্রম এবং শখের কাজ মনোযোগ নেতিবাচক চিন্তা থেকে সরিয়ে ইতিবাচক দিকে নিয়ে যায়। যখন আপনি কোনো আনন্দদায়ক কাজে মগ্ন থাকেন, তখন মস্তিষ্ক ডোপামিন নিঃসরণ করে, যা আনন্দ এবং পুরস্কারের অনুভূতি তৈরি করে।
পড়া, লেখা, আঁকা, গান শোনা, বাগান করা, রান্না করা বা হাতের কাজ করা খুবই উপকারী। নতুন কিছু শেখার উদ্যোগ নিন—যেমন নতুন ভাষা, বাদ্যযন্ত্র বা কারুশিল্প। এই কার্যক্রমগুলো শুধু মন ভালো রাখে না, আপনার দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট আপনার প্রিয় কাজে ব্যয় করুন।
| সৃজনশীল কাজ | সুবিধা | শুরু করার উপায় |
| পড়া বা লেখা | মানসিক উদ্দীপনা, কল্পনাশক্তি | দৈনিক ১৫-২০ পৃষ্ঠা বা জার্নালিং |
| আঁকা বা রঙ করা | আবেগ প্রকাশ, শিথিলতা | রঙিন বই বা স্কেচ প্যাড |
| গান শোনা বা বাজানো | মুড রেগুলেশন | প্রিয় সঙ্গীত তালিকা তৈরি |
| হাতের কাজ | মনোযোগ বৃদ্ধি, অর্জনবোধ | বুনন, সেলাই বা কারুশিল্প |
৭. মাইন্ডফুলনেস ও মেডিটেশন চর্চা
মাইন্ডফুলনেস এবং মেডিটেশন ডিপ্রেশন কাটানোর উপায় হিসেবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত । গবেষণায় দেখা গেছে যে মাইন্ডফুলনেস বিষণ্নতা এবং উদ্বেগের লক্ষণ সরাসরি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কমায় । মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন প্র্যাকটিস বিষণ্নতার লক্ষণে শক্তিশালী উন্নতি আনে ।
মাইন্ডফুলনেস হলো বর্তমান মুহূর্তে সচেতনভাবে উপস্থিত থাকা, বিচার না করে। দৈনিক ১০-১৫ মিনিট মেডিটেশন অভ্যাস করুন। একটি শান্ত জায়গায় আরামদায়কভাবে বসুন, চোখ বন্ধ করুন এবং আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসে মনোযোগ দিন। মন যখন ভাসতে থাকে, আস্তে আস্তে আবার শ্বাসে ফিরে আসুন। মাইন্ডফুলনেস চিন্তা, উদ্বেগ এবং রুমিনেশন (একই চিন্তা বারবার) কমায় । ইউটিউবে গাইডেড মেডিটেশন ভিডিও বা মেডিটেশন অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।
| মেডিটেশন পদ্ধতি | উপকারিতা | অনুশীলন |
| শ্বাস-প্রশ্বাস মেডিটেশন | মন শান্ত, ফোকাস বৃদ্ধি | শ্বাসে মনোযোগ ১০ মিনিট |
| বডি স্ক্যান | শারীরিক টেনশন কমায় | শরীরের প্রতিটি অংশে সচেতনতা |
| লাভিং-কাইন্ডনেস | সহানুভূতি ও ইতিবাচকতা | নিজের ও অন্যের কল্যাণ কামনা |
| গাইডেড মেডিটেশন | সহজ শুরু | অ্যাপ বা অডিও অনুসরণ |
৮. নেতিবাচক চিন্তা কমিয়ে ইতিবাচক চিন্তা বাড়ান
ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই নেতিবাচক চিন্তা প্যাটার্নে আটকে যান। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) এই বিকৃত চিন্তাগুলো চ্যালেঞ্জ করে এবং পরিবর্তন করে । আপনি নিজেও এই কৌশল প্রয়োগ করতে পারেন।
প্রতিদিন একটি কৃতজ্ঞতা জার্নাল লিখুন—তিনটি জিনিস লিখুন যার জন্য আপনি কৃতজ্ঞ। যখন নেতিবাচক চিন্তা আসে, নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন: “এই চিন্তা কি সত্যিই সত্য? এর পক্ষে প্রমাণ কী?” ছোট ছোট, অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করুন এবং প্রতিটি ছোট সাফল্য উদযাপন করুন। ইতিবাচক নিজের সাথে কথা বলুন (পজিটিভ সেলফ-টক)। “আমি পারব না” এর পরিবর্তে “আমি চেষ্টা করব” বলুন।
| চিন্তা পরিবর্তন কৌশল | উদ্দেশ্য | প্রয়োগ |
| কৃতজ্ঞতা জার্নাল | ইতিবাচক ফোকাস | প্রতিদিন ৩টি ভালো জিনিস লেখা |
| থট চ্যালেঞ্জিং | বিকৃত চিন্তা সংশোধন | প্রমাণ চাওয়া ও বিকল্প খোঁজা |
| ছোট লক্ষ্য | আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি | দৈনিক অর্জনযোগ্য কাজ |
| পজিটিভ সেলফ-টক | আত্ম-সহানুভূতি | দয়ালু ভাষা ব্যবহার |
৯. সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার সীমিত করুন
অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এটি তুলনামূলক মানসিকতা তৈরি করে, নেতিবাচক সংবাদে প্রকাশ বাড়ায় এবং ঘুমের মান কমায়। স্ক্রিনের নীল আলো মেলাটোনিন উৎপাদনে বাধা দেয়, যা ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয়।
দৈনিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ১-২ ঘণ্টায় সীমিত করুন। ফোনে স্ক্রিন টাইম ট্র্যাকিং ফিচার ব্যবহার করুন। শোবার অন্তত এক ঘণ্টা আগে সকল ডিভাইস বন্ধ করুন। নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন যখন আপনি সোশ্যাল মিডিয়া চেক করবেন। নেতিবাচক বা তুলনামূলক কন্টেন্ট আনফলো করুন এবং ইতিবাচক, অনুপ্রেরণামূলক অ্যাকাউন্ট ফলো করুন। “ডিজিটাল ডিটক্স” দিনগুলো পালন করুন যখন আপনি সম্পূর্ণরূপে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বিরত থাকবেন।
| ডিজিটাল অভ্যাস | সমস্যা | সমাধান |
| অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম | চোখের ক্লান্তি, মানসিক চাপ | দৈনিক ১-২ ঘণ্টায় সীমিত |
| রাতে ফোন ব্যবহার | ঘুমের ব্যাঘাত | শোবার ১ ঘণ্টা আগে বন্ধ |
| তুলনামূলক কন্টেন্ট | আত্মবিশ্বাস কমে | নেতিবাচক অ্যাকাউন্ট আনফলো |
| ক্রমাগত নোটিফিকেশন | মনোযোগ বিচ্ছিন্ন | নোটিফিকেশন বন্ধ করা |
১০. ছোট ছোট সফলতা উদযাপন করুন
ডিপ্রেশনে ভোগার সময় মানুষ প্রায়ই নিজের অর্জন দেখতে পায় না। প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ এবং উন্নতি স্বীকার করা এবং উদযাপন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আজ আপনি বিছানা থেকে উঠেছেন? এটি একটি জয়। আপনি স্নান করেছেন? আরেকটি অর্জন। আপনি একটি স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়েছেন? চমৎকার! এই ছোট ছোট কাজগুলো যখন ডিপ্রেশনের মধ্যে থাকেন, তখন বড় অর্জন। একটি সাফল্য ট্র্যাকার রাখুন যেখানে আপনি প্রতিদিনের ছোট অর্জন লিখবেন। নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হন এবং বিচার করবেন না। প্রগতি সর্বদা রৈখিক নয়—কিছু দিন ভালো যাবে, কিছু দিন কঠিন হবে, এবং এটি স্বাভাবিক।
| ছোট সফলতা | মানসিক প্রভাব | উদযাপন পদ্ধতি |
| দৈনিক রুটিন সম্পন্ন | নিয়ন্ত্রণবোধ বৃদ্ধি | টিক চিহ্ন বা স্টিকার |
| একটি কাজ শেষ | আত্মবিশ্বাস বাড়ে | নিজেকে পুরস্কৃত করা |
| সামাজিক যোগাযোগ | সংযোগবোধ | জার্নালে লেখা |
| আত্ম-যত্ন কার্যক্রম | আত্ম-সম্মান উন্নত | প্রিয় কিছু করা |
কখন পেশাদার সাহায্য নেওয়া জরুরি?
ঘরোয়া ডিপ্রেশন কাটানোর উপায় হালকা থেকে মাঝারি বিষণ্নতার জন্য কার্যকর, তবে কিছু ক্ষেত্রে পেশাদার সাহায্য অপরিহার্য । যদি আপনার আত্মহত্যার চিন্তা আসে, নিজেকে বা অন্যকে ক্ষতি করার ইচ্ছা হয়, অবিলম্বে জরুরি সেবা বা মানসিক স্বাস্থ্য হটলাইনে যোগাযোগ করুন। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গুরুতর লক্ষণ থাকলে—যেমন অবিরাম মন খারাপ, সকল কাজে আগ্রহ হারানো, তীব্র ক্লান্তি—অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটলে, কাজে বা সম্পর্কে সমস্যা হলে, বা ঘরোয়া উপায়ে কোনো উন্নতি না হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকোলজিস্টের সাথে দেখা করুন । বাংলাদেশে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া যায় । ওষুধ এবং সাইকোথেরাপি—বিশেষত সিবিটি—বেশিরভাগ মানুষের জন্য কার্যকর ।
পরিবার ও বন্ধুরা কীভাবে সাহায্য করতে পারেন?
ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য একটি শক্তিশালী সাপোর্ট সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার এবং বন্ধুরা ধৈর্য্যের সাথে শুনতে পারেন, বিচার না করে সহানুভূতি দেখাতে পারেন। “তুমি দুর্বল” বা “সবাই এসব সামলায়” বলার পরিবর্তে, “আমি তোমার পাশে আছি” বা “তুমি যা অনুভব করছ তা বৈধ” বলুন।
দৈনন্দিন ছোট কাজে সাহায্য করুন—রান্না করা, কেনাকাটা করা বা পরিষ্কার করা। একসাথে হাঁটতে যান বা সিনেমা দেখুন। তাদের চিকিৎসা অ্যাপয়েন্টমেন্টে সাথে যান। তবে অতিরিক্ত চাপ দেবেন না বা “ভালো হয়ে যাও” বলে জোর করবেন না। প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নিতে উৎসাহিত করুন। নিজের মানসিক স্বাস্থ্যেরও যত্ন নিন—কারো যত্ন নেওয়া ক্লান্তিকর হতে পারে, তাই আপনিও বিরতি নিন এবং সাপোর্ট খুঁজুন।
শেষ কথা
ডিপ্রেশন কাটানোর উপায় খুঁজতে গিয়ে মনে রাখবেন যে ছোট ছোট পরিবর্তনই বড় প্রভাব ফেলতে পারে । ঘরে বসে নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, প্রকৃতির সাথে সংযোগ, প্রিয়জনদের সাথে কথা বলা, সৃজনশীল কাজ, মেডিটেশন, ইতিবাচক চিন্তা, ডিজিটাল ডিটক্স এবং ছোট সফলতা উদযাপন করলে আপনার মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত হবে। এই পদ্ধতিগুলো বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত এবং জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম ।
তবে মনে রাখবেন, প্রতিটি মানুষের যাত্রা ভিন্ন এবং প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নিতে কোনো লজ্জা নেই । ডিপ্রেশন একটি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। আজই ছোট একটি পদক্ষেপ নিন—হয়তো ১০ মিনিট হাঁটা বা একজন প্রিয়জনকে ফোন করা। প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ আপনাকে সুস্থতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আপনার সুস্থতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



