আমার যতদূর মনে পড়ে, এই ঢাকা শহরে একজন মানুষ সবসময় আমার ঘরে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকেন। তাঁর বয়স এখন ৬৩। শরীরে এত রকম অসুখ বাসা বেঁধেছে যে, আমি আর ওসবের হিসাব রাখতে চাই না। তবুও, প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি আমাদের রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে দরজার আওয়াজের অপেক্ষায় থাকেন। আর মনে মনে ভাবেন—ভাতটা কি এখনই গরম করবেন, নাকি আরেকটু অপেক্ষা করবেন।
তিনি আমার মা। বয়স যত বাড়ছে, ততই বুঝতে পারছি—একজন ভালো মানুষ হওয়ার যত সমীকরণ আমি জানি, তার সবই তাঁকে দেখে শেখা। তিনি আমাকে ডেকে বসিয়ে কখনো কোনো উপদেশ দেননি, বরং নিজের জীবন দিয়েই সব শিখিয়েছেন।
এই মা দিবসে আমি সেই না-বলা শিক্ষাগুলোর মধ্যে পাঁচটা অন্তত লিখে রাখতে চাই। এই জন্য নয় যে, আমি খুব শিখে ফেলেছি বা পারদর্শী হয়ে গেছি; বরং এ কারণে যে, এই লেখাটা হয়তো সেই বিশাল ঋণের বিনিময়ে একটা ছোট্ট ধন্যবাদের মতো অনুরণিত হবে—যে ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।
১. ভালোবাসা মাঝে মাঝে হয়ত বিরক্তিকর, তবে সেভাবেই বোঝা যায় এটা খাঁটি
মা আমাকে দিনে অসংখ্যবার ফোন করেন। আমি খেয়েছি কি না, জানতে চান। ঠিক বিশ মিনিট পর আবার একই কথা জিজ্ঞেস করেন। রাস্তায় জ্যাম, আবহাওয়া, কিংবা হালকা শীতের সন্ধ্যায় আমি গরম কাপড় পরতে ভুলে গেছি কি না—এসব নিয়ে তাঁর চিন্তার কোনো শেষ নেই।
একটা সময় পর্যন্ত এগুলো আমার কাছে খুব বিরক্তিকর লাগত। কিন্তু এখন আমি বুঝি, ভালোবাসার যখন আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না, তখন তার রূপটা ঠিক এমনই হয়। বাবার মৃত্যুর পর আমিই হয়ে উঠেছি তাঁর গোটা পৃথিবী। তাঁর এই অতিরিক্ত খেয়াল রাখাটা আসলে কোনো অযাচিত হস্তক্ষেপ নয়। এটা এমন একজনের মানসিক শক্তির প্রকাশ, যিনি প্রতিদিন এই সিদ্ধান্ত নেন যে, নিজের চেয়ে অন্য একজনের ভালো থাকাটা তাঁর কাছে অনেক বেশি জরুরি। তাঁর এই অতিরিক্ত চিন্তা থেকে জন্ম নেয়া আমার বিরক্তিটাই আসলে আমার প্রতি তাঁর ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
২. আত্মত্যাগ যত বড়, তার নীরবতা ততটাই গভীর
আমার মা একসময় খুব ভালো গান গাইতেন। এতটাই ভালো যে, গানকে ঘিরেই তাঁর সামনে চমৎকার একটা ভবিষ্যৎ আর ক্যারিয়ারের হাতছানি ছিল। কিন্তু তিনি তাঁর গান এবং গানকে ঘিরে সকল সম্ভাবনা ও স্বপ ছেড়ে দিয়েছিলেন পরিবারের জন্য। আমাদের জন্য।
আমি কোনোদিন তাঁকে এই নিয়ে আক্ষেপ করতে বা তিক্ততা প্রকাশ করতে শুনিনি। একবারও না। পারিবারিক আড্ডায় তিনি কখনোই এটাকে কোনো ‘ক্ষত’ হিসেবে তুলে ধরেন না। এমনকি ঝগড়ার সময়ও এটাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন না। তিনি আত্মত্যাগ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু এরপর বিষয়টা এমনভাবে আড়ালে রেখে দিলেন—যেন একটা ভারী পাথর টুপ করে জলে ডুবে গেল কোন আলোড়ন ছাড়াই।
শিক্ষাটা এখানেই: সত্যিকারের আত্মত্যাগ কখনো ঢাকঢোল পিটিয়ে হয় না। এটা নীরবে একটা জীবনের গতিপথ বদলে দেয়, আর বিনিময়ে কিচ্ছুটি চায় না। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মা সবসময় আমাদের জন্য সেরাটাই বেছে নিয়েছেন—আর নিজের জন্য রেখেছেন অবশিষ্টাংশটুকু, যদিও তাঁর মুখে সবসময় ছড়িয়ে থাকত আত্মতৃপ্তির হাসি।
৩. দিন শেষে ‘পাশে থাকা’টাই সবচেয়ে বড় কাজ
আমি আর আমার বোন যখন ছোট ছিলাম, মা সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠতেন। সকালের নাস্তা বানাতেন, আমাদের স্কুলের জন্য রেডি করতেন। বছরের পর বছর—হাজার হাজার সকাল—তিনি এই কাজগুলো করে গেছেন। কোনো প্রশংসা ছাড়া, কোনো ওভারটাইম ছাড়া, কিংবা একটা যোগ্য ধন্যবাদেরও আশা না করে।
তিনি এখনও তা-ই করেন। ৬৩ বছর বয়সে এসে এখন তিনি আমার তিন ভাগ্নেকে সামলান। সব রান্নাবান্না করেন। কোনো না কোনোভাবে তিনিই সবসময় রান্নাঘরে থাকেন, সবকিছুর সমাধান তাঁর কাছেই থাকে। কোন ওষুধটা কোথায় রাখা আছে কিংবা কোন বাচ্চাটা পেঁয়াজ খেতে একদম পছন্দ করে না—সব তাঁর নখদর্পণে।
আমি কখনোই—একবারও না—তাঁকে কোনো কাজে ‘না’ বলতে শুনিনি। খুব ক্লান্ত থাকলেও না, অসুস্থ থাকলেও না। এমনকি যখন ‘না’ বললে কেউ তাঁকে একটুও দোষ দিত না, তখনও না।
আমি এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে, জীবনের বেশিরভাগ অংশই হলো নিজের ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব পালনের জন্য বারবার ফিরে আসা। মুখে কোনো কথা না বলেই তিনি আমাকে এই শিক্ষাটা দিয়েছেন।
৪. কষ্ট আর দায়িত্ব—দুটোই সত্যি, এবং তারা একই মানুষের ভেতর দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে
আমার মা বুকে এত কষ্ট চেপে রেখেছেন, যার ভারে বেশিরভাগ মানুষই হয়তো ভেঙে পড়ত। তিনি তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন। শরীরে বাসা বেঁধেছে দীর্ঘস্থায়ী সব অসুখ, যেগুলো তিনি সবার দৈনন্দিন জীবনের আড়ালে নীরবে সামলে চলেন। তিনি এমন কঠিন কিছু সময় পার করেছেন, যার পুরোটা আমি হয়তো কোনোদিন জানতেও পারব না।
কিন্তু এর কোনোটিই তাঁকে কখনো থামাতে পারেনি।
আমি একসময় ভাবতাম, শক্ত মানুষ মানেই হলো যার কোনো কষ্ট নেই বা যে কষ্ট অনুভব করে না। তাঁকে দেখে আমি উল্টোটা শিখেছি: মানসিক শক্তি মানে হলো—সবকিছু গভীরভাবে অনুভব করার পরও, সকাল ছয়টায় রান্নাঘরে গিয়ে প্রিয়জনের জন্য চা তৈরি করার শক্তি রাখা। তিনি যে ভেঙে পড়ার ঊর্ধ্বে, তা কিন্তু নয়। বরং তিনি তার চেয়েও মহৎ কিছু—তিনি ভীষণ দায়িত্ববান। তাঁর আপনজনদের প্রতি, তাঁর প্রাত্যহিক কাজের প্রতি, এবং সেই ছোট ছোট মায়াময় দায়িত্বগুলোর প্রতি—যা একটা সংসারকে পরম মমতায় আগলে রাখে।
আমি অসুস্থ হলে তিনি বিছানার পাশে বসে থেকেছেন। সুস্থ থাকলে দরজায় অপেক্ষায় থেকেছেন। তাঁর এই অবিচল থাকাটা প্রায় জাদুকরী মনে হয়। তিনি সত্যিই আমাদের পরিবারের জাদুকর—যিনি জাদুর মতো খাবার তৈরি করেন, বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটান এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে ঘরকে নিরাপদ করে তোলেন। আর এই সবই তিনি করেন এমন সব নীরব কষ্ট বুকে চেপে, যা আমি এখন কেবল একটু একটু করে বুঝতে শুরু করেছি।
৫. এমন একজন মানুষ হও, সবাই ছেড়ে গেলেও যে পাশে থাকে
এই বিষয়টা নিয়েই আমি সবচেয়ে বেশি ভাবি।
আমার মা এমন একজন মানুষ যিনি সবসময় পাশে থাকেন। যিনি ফোন ধরেন, সবার জন্মদিন মনে রাখেন এবং এমন কোনো আত্মীয়ের জন্যও রান্না করেন, যাকে অন্য কেউ হয়তো একদমই সহ্য করতে পারে না। যখন সবার কাছেই দূরে থাকার কোনো না কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে—তখনও তিনি পাশেই থাকেন।
আমি তাঁর এই গুণটা নিজের মধ্যে ধারণ করতে চাই। চেষ্টাও করছি। তবে এটা আমার ভাবনার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন। এই পৃথিবী চতুর, ব্যস্ত আর তথাকথিত ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মানুষদের পুরস্কৃত করে। সবসময় মানুষের জন্য সহজলভ্য থাকাকে এই পৃথিবী খুব একটা মূল্যায়ন করে না। কিন্তু আমি সারা জীবন ধরে দেখেছি, মানুষের প্রয়োজনে পাশে থাকাটা চারপাশের মানুষদের জীবনে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে। এটা হয়তো খুব চাকচিক্যময় কিছু নয়, কিন্তু দিনশেষে এটাই সবকিছু।
শেষ কথা
এই ধরনের লেখার কোনো গোছানো সমাপ্তি কখনোই সম্ভব হয় না। আমার মা এখনও আছেন, এখনও রান্না করছেন, এখনও ফোন করছেন, এখনও রাতের খাবারের জন্য আমার ঘরে ফেরার অপেক্ষায় দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। মা দিবসে এই লেখাটা যারা পড়ছেন, তাদের অনেকের চেয়েই আমি হয়তো অনেক বেশি ভাগ্যবান; আর আমি এই ভাগ্যকে মোটেও হেলাফেলা করি না।
আপনার মা যদি এখনও আপনার হাতের নাগালে থাকেন, তাঁকে একটা ফোন করুন। তাঁকেও একটু বিরক্ত করুন। তাঁকে জিজ্ঞেস করুন এমন কোনো ত্যাগের কথা, যা তিনি করেছিলেন বলেই আজ আপনি এই অবস্থানে আসতে পেরেছেন। ক্ষুধা না থাকলেও তাঁর হাতের রান্না করা খাবারটুকু অন্তত মুখে দিন।
মা, যদি কোনোদিন এই লেখাটা আপনার চোখে পড়ে—আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার সেই গানের জন্য, যা আমাদের বড় করার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই সকালগুলোর জন্য। এত দীর্ঘ অপেক্ষার জন্য। সর্বোপরি, আমাদের পরিবারের জাদুকর হওয়ার জন্য।
আমি এখনও আপনার কাছ থেকেই শিখছি। আজীবন শিখব।


