কলকাতার রাজপথে তখন নিস্তব্ধতার চেয়েও ভারী এক অদ্ভুত, জমাট বাঁধা আর্তনাদ। আকাশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো মেঘ, সাইরেনের তীক্ষ্ণ, কান-ফাটানো শব্দে কেঁপে উঠছে রাতের শহর, ব্ল্যাকআউটের অন্ধকার রাতগুলো যেন মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে গ্রাস করছে জনপদ। আর মাটিতে? মাটিতে তখন মৃত্যুর এক অন্তহীন, নীরব মিছিল।
তেতাল্লিশের মন্বন্তর (১৯৪৩) বাংলার বুক চিরে নিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার প্রাণ। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে মানুষ ছুটে আসছে শহরের দিকে, কেবল একমুঠো ভাতের আশায়। কলকাতার ফুটপাতে, ডাস্টবিনের পাশে, উচ্ছিষ্ট নিয়ে কুকুরের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করছে কঙ্কালসার মানুষ।
এমন এক ঘোরতর অমানিশার সময়ে, শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে এক কিশোর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এই ধ্বংসস্তূপ। তাঁর চোখে তখন কোনো রোমান্টিক স্বপ্ন নেই, নেই মেঘদূত বা বনলতা সেনের মতো কোনো মায়াবী আখ্যান। তাঁর চোখের সামনে আকাশে ভাসছে রূপালি গোল চাঁদ, কিন্তু সেই চিরায়ত সুন্দর চাঁদ তাঁকে বিন্দুমাত্র মুগ্ধ করছে না। তাঁর ক্ষুধার্ত, যন্ত্রণাবিদ্ধ, এবং চারপাশের মানুষের হাহাকারে রক্তাক্ত মন সেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ করছে, “পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি!”
রোমান্টিকতার মায়াজাল ছিন্ন করে বাস্তবতার এমন রুক্ষ, নিরাভরণ ও নির্মম প্রকাশ বাংলা কবিতায় তার আগে কখনো আসেনি। তিনি সুকান্ত ভট্টাচার্য। মাত্র একুশ বছরের এক ক্ষণজন্মা জীবন, অথচ সেই ছোট পরিসরেই তিনি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন এমন এক দাবানল-শিখা, যার আলোকছটা আজও বাংলা সাহিত্যের আকাশ ভোরের সূর্যের মত রাঙা করে রেখেছে। তাঁর জীবন ছিল একটি উল্কাপিন্ডের মতো—স্বল্পস্থায়ী, কিন্তু তার আলোকরশ্মি চারপাশের অন্ধকারকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল।
বিষাদের ধাত্রীগৃহে জন্ম ও শেকড়ের সন্ধান

এই বিদ্রোহী সত্তার জন্ম হয়েছিল এক বর্ষণমুখর দিনে, কিন্তু তাঁর আগমনের কোনো রাজকীয় আয়োজন ছিল না। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট, কলকাতার কালীঘাটের মহিম হালদার স্ট্রিটে মামাবাড়িতে ভূমিষ্ঠ হন সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল তৎকালীন ফরিদপুর জেলার (বর্তমান গোপালগঞ্জ) কোটালীপাড়ায়। পিতা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য ও মাতা সুনীতি দেবীর এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন অন্যরকম শান্ত অথচ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণশীল। খুব অল্প বয়সেই মাকে হারানোর শূন্যতা তাঁর কিশোর মনকে এক অকালপক্ব বিষণ্ণতায় মুড়িয়ে দিয়েছিল। মাতৃস্নেহ থেকে এই অকাল বঞ্চনা হয়তো তাঁর ভেতরে এক ধরনের স্থায়ী শূন্যতা তৈরি করেছিল, যা পরে রূপান্তরিত হয় বৃহত্তর সমাজের প্রতি গভীর মানবিক মমত্ববোধে।
কমলা বিদ্যামন্দির থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ভর্তি হন বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলে। এই স্কুলের দিনগুলোতেই তাঁর ভেতরের সুপ্ত অক্ষরপ্রেম ধীরে ধীরে ডানা মেলতে শুরু করে। ব্যক্তিগত জীবনের শোক আর চারপাশের সামাজিক অস্থিরতা তাঁর শৈশবকেই যেন ছিনিয়ে নিয়েছিল, তাঁকে বাধ্য করেছিল বয়সের চেয়ে দ্রুত বড় হয়ে উঠতে। খুব ছোটবেলাতেই বন্ধুদের নিয়ে প্রকাশ করেছিলেন হাতে লেখা পত্রিকা ‘শিখা’। কৈশোরেই রেডিওর (আকাশবাণী) ‘কিশোর সভা’ অনুষ্ঠানে তাঁর প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। কিন্তু সুকান্ত কেবল সাহিত্যের এক শান্ত নদীর তীরে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না, তাঁর ভেতরে তখন জন্ম নিচ্ছিল এক উত্তাল সমুদ্র, বিদ্রোহের এক দুর্বিনীত দাবানল।
এক নজরে সুকান্ত ভট্টাচার্যঃ
| বিষয় | বিবরণ |
| পুরো নাম | সুকান্ত ভট্টাচার্য |
| জন্ম | ১৫ আগস্ট, ১৯২৬ |
| জন্মস্থান | মহিম হালদার স্ট্রিট, কালীঘাট, কলকাতা (পৈতৃক নিবাস: কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ, বাংলাদেশ) |
| মৃত্যু | ১৩ মে, ১৯৪৭ (যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে, মাত্র ২১ বছর বয়সে) |
| মৃত্যুস্থান | যাদবপুর টিবি হাসপাতাল, কলকাতা |
| পিতা ও মাতা | পিতা: নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য, মাতা: সুনীতি দেবী |
| সাহিত্যিক পরিচিতি | কিশোর কবি, গণমানুষের কবি, মার্কসবাদী ও বিদ্রোহী কবি |
| রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা | ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য এবং ‘কিশোর বাহিনী’র সংগঠক |
| উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ | ছাড়পত্র (১৯৪৭), ঘুম নেই (১৯৫০), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠে-কড়া (১৯৫৩), হরতাল (১৯৬২) |
| অন্যান্য রচনা | অভিযান (নাটক), গীতিগুচ্ছ (গান ও কবিতা) |
| বিখ্যাত কবিতাসমূহ | হে মহাজীবন, আঠারো বছর বয়স, রানার, ছাড়পত্র, দেশলাই কাঠি, অনুভব, সিঁড়ি |
| সম্পাদনা | ‘আকাল’ (ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘের পক্ষে মন্বন্তর বিষয়ক সংকলন) এবং ‘কিশোর সভা’ (দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকার কিশোর বিভাগ) |
| স্বীকৃতি ও প্রভাব | বাংলা সাহিত্যে প্রগতিশীল ধারার অন্যতম পথিকৃৎ, যার রচনা শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের চিরন্তন ইশতেহার হিসেবে স্বীকৃত। |
কল্লোল যুগের কোলাহলে এক ভিন্ন স্বর
সুকান্তের এই অকালপক্ব চেতনা একদিনে তৈরি হয়নি; সমকালীন বাস্তবতাই তাঁকে বাধ্য করেছিল স্বপ্নের জগত ছেড়ে কঠিন মাটিতে পা রাখতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তখন অস্তরাগকাল। বাংলা কবিতা এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে—একদিকে রবীন্দ্র-প্রভাবের দীর্ঘ ছায়া, অন্যদিকে কল্লোল যুগের কবিদের হাত ধরে ভাষা ও ভাবনার নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা। জীবনানন্দ দাশ তাঁর নিঃসঙ্গতা, ইতিহাসচেতনা ও অস্তিত্ববাদের আবহে নির্মাণ করছেন এক স্বতন্ত্র কাব্যভুবন; বুদ্ধদেব বসু বা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত আধুনিক নগরজীবনের জটিল মনস্তত্ত্বকে তুলে আনছেন কবিতায়। অর্থাৎ বাংলা কবিতা তখন কেবল রোমান্টিকতার আবেশে আবদ্ধ ছিল না, বরং বহুমাত্রিক আধুনিকতার দিকে দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছিল।
কিন্তু এই বহুস্বরের মধ্যেও সুকান্ত ভট্টাচার্যের কণ্ঠ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি মানুষের ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা বা সৌন্দর্যের বিমূর্ত অন্বেষণের চেয়ে বেশি জরুরি মনে করেছিলেন ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ, শ্রমিকের ঘাম, যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর ধ্বংসস্তূপ এবং আসন্ন সামাজিক বিস্ফোরণের শব্দকে। তাই তাঁর কবিতায় চাঁদ হয়ে ওঠে “ঝলসানো রুটি”, আর নিছক নান্দনিক চর্চা পরিবর্তে কবিতা হয়ে ওঠে —সময়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত এক তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ।
রাজপথের ধুলোয় বোনা রাজনীতির পাঠ
সাহিত্যের পাতায় যে বিদ্রোহের আগুন তিনি জ্বেলেছিলেন, তা কেবল শব্দের গাঁথুনিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল এই সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুকান্তের বেড়ে ওঠা এমন এক অস্থির সময়ে, যখন গোটা ভারত ফুটছে স্বাধীনতার চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষায়। একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নির্মম শোষণ, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদের বীভৎস উত্থান। এই দুইয়ের বিরুদ্ধেই তীব্র সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি। খুব অল্প বয়সেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। কার্ল মার্কস এবং লেনিনের আদর্শ তাঁকে শিখিয়েছিল শ্রেণিসংগ্রামের পাঠ এবং শোষিত মানুষের পক্ষে নিঃশর্তে দাঁড়ানোর অবিচল সাহস।
তিনি কেবল ঘরে বসে নিভৃতে কবিতা লেখেননি; তিনি রাস্তায় নেমেছেন, প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিয়েছেন, কিশোর ও তরুণদের সংগঠিত করেছেন ‘কিশোর বাহিনী’র মাধ্যমে। ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘের কার্যক্রমে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিয়েছেন। ১৯৪৪ সালে মাত্র আঠারো বছর বয়সে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মন্বন্তর নিয়ে লেখা যুগান্তকারী সংকলন ‘আকাল’, যা সেকালের বুদ্ধিজীবী সমাজে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। এছাড়া, কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার কিশোর বিভাগ ‘কিশোর সভা’র সম্পাদনার দায়িত্বও তিনি নিপুণভাবে পালন করেন। রাজনীতি তাঁর কাছে কোনো পেশা ছিল না, রাজনীতি ছিল তাঁর বেঁচে থাকার, তাঁর নিঃশ্বাস নেওয়ার অন্যতম শর্ত।
তুচ্ছতার খোলসে মোড়া মহাকাব্যিক দ্রোহ
সুকান্তের কাব্যিক ভাষার সবচেয়ে বড় জাদুকরী দিক হলো, তিনি দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত তুচ্ছ, সাধারণ এবং উপেক্ষিত বস্তুকে বিপ্লবের প্রতীকে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন। তাঁর ‘সিগারেট’, ‘দেশলাই কাঠি’ বা ‘সিঁড়ি’ কবিতাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, কীভাবে তিনি অতি সাধারণ বস্তুর মাধ্যমে শোষিত মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বিদ্রোহের রূপক তৈরি করেছেন।
‘সিঁড়ি’ কবিতায় তিনি অভিজাত শ্রেণিকে উদ্দেশ করে বলছেন, কীভাবে তারা সাধারণ মানুষকে সিঁড়ির মতো ব্যবহার করে উঁচুতে ওঠে, আর তারপর সেই সিঁড়ির কথা ভুলে যায়। কিন্তু সিঁড়িও যে একদিন বিদ্রোহ করতে পারে, পা ফসকে নিচে ফেলে দিতে পারে—সেই অমোঘ হুঁশিয়ারি তিনি দিয়েছেন। আবার ‘দেশলাই কাঠি’ কবিতায় তিনি লিখছেন:
“আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না…
কিন্তু তোমরা তো জানো
আমি জ্বলে উঠলে তোমাদের অট্টালিকা, তোমাদের প্রাসাদ
পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে।”
এই দেশলাই কাঠি আসলে কে? এই কাঠি হলো সমাজের সেই অবহেলিত, প্রান্তিক, খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের বাবু সমাজ মানুষ বলেই গণ্য করে না। সুকান্ত তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাদের নিজস্ব শক্তির কথা। তাঁর ‘রানার’ কবিতায় সমাজের প্রান্তিক এক শ্রমজীবী মানুষ হয়ে উঠেছে এক মহাকাব্যিক নায়ক, যে রাতের অন্ধকার চিরে মানুষের সুখ-দুঃখের খবর পৌঁছে দেয়, অথচ নিজের জীবনের খবর রাখার কেউ নেই।

সুকান্তের এই সাহিত্যকর্মগুলোকে যদি আমরা ইতিহাসের মানদণ্ডে বিচার করি, তবে তার গভীরতা অনুধাবন করা সহজ হয়। নিচের ছকটিতে তাঁর প্রধান সাহিত্যকর্ম এবং সেগুলোর পেছনের দর্শন তুলে ধরা হলো:
সুকান্ত ভট্টাচার্যের কাব্যিক মানচিত্র: সময়, সৃষ্টি ও চেতনার দলিল
| গ্রন্থের নাম ও ধরন | প্রকাশের সময়কাল | অন্তর্নিহিত দর্শন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট |
| ছাড়পত্র (কাব্যগ্রন্থ) | ১৯৪৭ (মৃত্যুর কিছুকাল পর) | আগামী প্রজন্মের জন্য এক নতুন, বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ এবং পরাধীন ভারতের মুক্তি সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে রচিত। এটি তারুণ্যের স্পর্ধা ও বিদ্রোহের শ্রেষ্ঠ দলিল। |
| ঘুম নেই (কাব্যগ্রন্থ) | ১৯৫০ | তেতাল্লিশের মন্বন্তর, কালোবাজারি, এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ। শোষিত শ্রেণির পুঞ্জীভূত ক্রোধ এবং যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণের সম্ভাবনা। মার্কসবাদী শ্রেণিসংগ্রামের কাব্যিক রূপায়ণ। |
| পূর্বাভাস (কাব্যগ্রন্থ) | ১৯৫০ | সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর স্বপ্ন এবং কৃষক-শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লড়াই। এখানে কবি যেন এক লাল ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যেখানে শোষক শ্রেণির পতন অনিবার্য। |
| মিঠে-কড়া (ছড়া ও কবিতা) | ১৯৫৩ | ব্যঙ্গাত্মক এবং তীব্র শ্লেষাত্মক ছড়া। তৎকালীন রাজনৈতিক ভণ্ডামি, সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির মুখোশ উন্মোচন এবং ব্রিটিশ রাজত্বের প্রতি তীব্র কটাক্ষ। |
| অভিযান (নাটক/নাটিকা) | ১৯৫৩ | সমবেত মানুষের জেগে ওঠার গল্প। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং প্রতিরোধের রূপরেখা। |
তারুণ্যের স্পর্ধা ও আগামীর অঙ্গীকার
বিপ্লব, দ্রোহ এবং ধ্বংসের সমান্তরালে সুকান্তের হৃদয়ে ছিল এক প্রবল, প্রায় অসম্ভব আশাবাদ; ধ্বংসের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও তিনি নতুন পৃথিবী নির্মাণের স্বপ্ন বুনেছেন। সুকান্ত শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করেই থেমে থাকেননি, তিনি এক বাসযোগ্য পৃথিবীর নিখুঁত রূপরেখা আঁকতে চেয়েছেন। তাঁর ‘ছাড়পত্র’ কবিতাটি এই তীব্র সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অমর দলিল। যখন একটি নতুন শিশু এই ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হচ্ছে, তখন কবি অনুভব করছেন তার জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু এই পৃথিবী তো তখনো লোভ, যুদ্ধ আর মন্বন্তরে কলুষিত! তাই কবি এক অলৌকিক স্পর্ধায় দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করেন—
“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
এই অঙ্গীকার কোনো নিছক আবেগ নয়, এটি একজন তরুণ বিপ্লবীর স্থির প্রতিজ্ঞা। যৌবনের যে অদম্য শক্তি আর স্পর্ধা, তা সুকান্তের কবিতায় যেভাবে মূর্ত হয়েছে, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতায় তিনি যৌবনের সেই অপ্রতিরোধ্য সাহসের বন্দনা করেছেন, যা যেকোনো বাধা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। তিনি লিখছেন, “আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ / স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।” এই বয়স “জানে না কাঁদানো, কাঁদে না সে কোনোদিন।” পরাধীন ভারতের যুবসমাজকে পঙ্গুত্ব থেকে বের করে এনে রাজপথে নামানোর জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী মন্ত্র আর কী হতে পারে! এই অদম্য স্পৃহা এবং তারুণ্যের শক্তিই সুকান্তের সাহিত্যকে এক বিশেষ, প্রায় আধ্যাত্মিক মাত্রা দিয়েছে।
ক্ষয়াটে শরীরে অনির্বাণ আগুন এবং বিদায়বেলা
যে মানুষটি কলমে আগুন ঝরাতেন, তাঁর নিজের শরীর ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর অকালপ্রয়াণের নির্মম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অবিরাম পরিশ্রম, কমিউনিস্ট পার্টির নিরলস কাজ, পথে-ঘাটে ঘুরে সংগঠন তৈরি করা, আর চরম দারিদ্র্য—সব মিলিয়ে সুকান্তের শরীর ভেতর থেকে ভাঙতে শুরু করেছিল। তিনি নিজের দিকে তাকানোর, নিজের ঠিকমতো খাওয়ার বা ঘুমানোর কোনো সময় পাননি। বিপ্লবের নেশায় তিনি নিজের জীবনকেই বাজি রেখেছিলেন। যখন তাঁর বন্ধুরা বুঝতে পারলেন তাঁর শরীর আর চলছে না, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
দুরারোগ্য যক্ষ্মা (টিবি) তখন গভীরভাবে বাসা বেঁধেছে তাঁর ফুসফুসে। তখনকার দিনে, অ্যান্টিবায়োটিকের পর্যাপ্ত আবিষ্কারের আগে যক্ষ্মা মানেই প্রায় অবধারিত মৃত্যু। যাদবপুর টিবি হাসপাতালে (বর্তমান কে. এস. রায় যক্ষ্মা হাসপাতাল) তাঁর শেষ দিনগুলো কেটেছিল চরম শারীরিক কষ্টে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মৃত্যুশয্যায় শুয়ে, অনবরত রক্তবমির মাঝেও তাঁর কলম পুরোপুরি থামেনি। তাঁর ভাবনা থেকে দেশ, স্বাধীনতা আর শোষিত মানুষের কথা এক মুহূর্তের জন্যও মুছে যায়নি।
১৯৪৭ সালের ১৩ই মে। ভারতবর্ষের আকাশে তখন স্বাধীনতার সূর্য ওঠার প্রস্তুতি চলছে। ব্রিটিশরা পাততাড়ি গোটানোর অপেক্ষায়। কিন্তু যে স্বাধীনতার জন্য সুকান্ত তাঁর জীবনের প্রতিটি ফোঁটা রক্ত নিংড়ে দিলেন, সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা দেখার মাত্র তিন মাস আগেই তাঁকে চিরবিদায় নিতে হলো। তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১ বছর!
২১ বছর—যে বয়সে অধিকাংশ তরুণেরা নিজেদের ক্যারিয়ার বা রোমান্টিসিজম নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, সেই বয়সে সুকান্ত একটি সমগ্র জাতির শোক, ক্ষোভ আর স্বপ্নকে একা কাঁধে বহন করে মহাকালের পথে পা বাড়ালেন। কী এক মর্মান্তিক, বুকচেরা ট্র্যাজেডি! তাঁর এই অকাল প্রয়াণ বাংলা সাহিত্যের এমন এক অপূরণীয় ক্ষতি, যা আজও আমাদের শূন্য করে রাখে।
মৃত্যুর পরশ পাথরে পাওয়া চিরতারুণ্য
সুকান্ত ভট্টাচার্য আজও আমাদের কাছে এক অনন্ত বিস্ময়ের নাম। ২১ বছরের এক তরুণের পক্ষে কীভাবে এত গভীর জীবনবোধ, এত সূক্ষ্ম রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর এমন নিখুঁত, ধারালো কাব্যিক ভাষার জন্ম দেওয়া সম্ভব, তা ভাবলে আজও শিহরিত হতে হয়। তিনি এমন এক সময়ে এসেছিলেন, যখন পৃথিবীর বুকে চলছিল মহাপ্রলয়, আর তিনি সেই প্রলয়কে ধারণ করেছিলেন তাঁর লেখনীতে। তিনি কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক যুগের কলমধারী সেনাপতি।
আজকের এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও, যখন আমরা দেখি পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ চলছে, বোমার আঘাতে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে হাসপাতাল, যখন দেখি কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের নবরূপে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যখন অনাহারে ধুঁকে মরে শিশু আর মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ সম্পদের পাহাড়ে বসে উৎসব করে, তখন সুকান্তকে বড্ড বেশি আপন এবং নির্মমভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়। আজও আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেই অসমতা, সেই বঞ্চনা রয়ে গেছে। আজও মেহনতি মানুষ তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। আর তাই, সুকান্তের কবিতাও তার ধার এতটুকু হারায়নি। তাঁর রচিত প্রতিটি শব্দ আজও যেন শোষিতের হাতের মুষ্ঠিবদ্ধ স্লোগান।
মৃত্যুর এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও, সুকান্ত যেন আজও সেই একুশ বছরের ক্ষুব্ধ, একরোখা তরুণটি হয়েই বেঁচে আছেন। তাঁর কোনো বার্ধক্য নেই, তাঁর চেতনার কোনো আপস নেই। তিনি চিরযৌবনের প্রতীক, বিদ্রোহের এক অনির্বাণ শিখা। যতদিন এই পৃথিবীতে ক্ষুধা থাকবে, শোষণ থাকবে, বৈষম্য থাকবে, এবং যতদিন কোনো মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে, ততদিন সুকান্তের সেই ‘ঝলসানো রুটি’র মতো চাঁদ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেবে—লড়াই এখনো শেষ হয়নি। পৃথিবী এখনো নবজাতকের জন্য পুরোপুরি বাসযোগ্য হয়নি। সুকান্ত ভট্টাচার্য কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা একটি নাম নয়, সুকান্ত এক ঘুম ভাঙানো শঙ্খধ্বনি, মৃত্যুর গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়া এক অনন্ত যৌবনের স্পর্ধা এবং এক অসমাপ্ত বিপ্লবের জ্বলন্ত রূপক।

