বাংলাদেশে সোনা ও রুপার দাম ক্রমাগত ওঠানামা করছে এবং ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে । বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ টাকায় পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম উচ্চতম মূল্য । আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে স্থানীয় বাজারেও এই প্রভাব পড়েছে । রুপার দামও একইভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ক্রেতাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
বাংলাদেশে সোনার বর্তমান দাম (১৭ ডিসেম্বর ২০২৫)
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) দেশের সকল স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে নিয়মিত স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করে । সর্বশেষ ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বাজুস প্রতি ভরি সোনার দাম ৩ হাজার ৪৫৩ টাকা বৃদ্ধি করেছে, যা ১৫ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে । আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫,২৩,৬৯৪.২২ টাকায় পৌঁছেছে, যা গত ২৪ ঘণ্টায় ২,৯০৪ টাকা কমেছে । তবে স্থানীয় বাজারে দাম স্থিতিশীল রয়েছে এবং ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত একই হারে বিক্রি হচ্ছে ।
বিভিন্ন ক্যারেটের সোনার দাম তালিকা
| ক্যারেট | প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) | প্রতি গ্রাম | প্রতি আনা (০.৭২৯ গ্রাম) | প্রতি রতি (০.১২১৫ গ্রাম) |
|---|---|---|---|---|
| ২২ ক্যারেট | ২,১৫,৫৯৭ টাকা | ১৮,৪৮১ টাকা | ১৩,৪৭৫ টাকা | ২,২৪৬ টাকা |
| ২১ ক্যারেট | ২,০৫,৭৮৪ টাকা | ১৭,৬৪০ টাকা | ১২,৮৬১ টাকা | ২,১৪৩ টাকা |
| ১৮ ক্যারেট | ১,৭৬,৩৮৬ টাকা | ১৫,১২০ টাকা | ১১,০২৪ টাকা | ১,৮৩৭ টাকা |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৪৬,৩৫৫ টাকা | ১২,৫৪৫ টাকা | ৯,১৪৭ টাকা | ১,৫২৫ টাকা |
রুপার বর্তমান বাজারমূল্য
সোনার পাশাপাশি রুপার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে । বাজুসের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্যারেটের রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে যা ১৫ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর এবং ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত একই রয়েছে । আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার চাহিদা বৃদ্ধি এবং শিল্প ব্যবহারের কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে ।
রুপার দাম বিস্তারিত
| ক্যারেট/ধরন | প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) | প্রতি গ্রাম | প্রতি আনা | প্রতি রতি |
|---|---|---|---|---|
| ২২ ক্যারেট রুপা | ৪,৫৭২ টাকা | ৩৯২ টাকা | ২৮৬ টাকা | ৪৮ টাকা |
| ২১ ক্যারেট রুপা | ৪,৩৬২ টাকা | ৩৭৪ টাকা | ২৭৩ টাকা | ৪৫ টাকা |
| ১৮ ক্যারেট রুপা | ৩,৭৩২ টাকা | ৩২০ টাকা | ২৩৩ টাকা | ৩৯ টাকা |
| সনাতন রুপা | ২,৮০০ টাকা | ২৪০ টাকা | ১৭৫ টাকা | ২৯ টাকা |
স্বর্ণের ওজন পরিমাপের বাংলাদেশী পদ্ধতি

বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে স্বর্ণ পরিমাপের জন্য ভরি, আনা, রতি এবং পয়েন্ট পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় । এই পদ্ধতি শত বছরের পুরনো এবং এখনও জুয়েলারি ব্যবসায়ে প্রচলিত রয়েছে । আন্তর্জাতিক মেট্রিক পদ্ধতির সাথে তুলনা করলে এক ভরি সমান ১১.৬৬৪ গ্রাম, যা বাজুস কর্তৃক স্বীকৃত মান ।
ওজন রূপান্তর সারণি
| একক | সমতুল্য | গ্রামে পরিমাণ |
|---|---|---|
| ১ ভরি | ১৬ আনা = ৯৬ রতি = ৯৬০ পয়েন্ট | ১১.৬৬৪ গ্রাম |
| ১ আনা | ৬ রতি = ৬০ পয়েন্ট | ০.৭২৯ গ্রাম |
| ১ রতি | ১০ পয়েন্ট | ০.১২১৫ গ্রাম |
| ১ পয়েন্ট | সবচেয়ে ছোট একক | ০.০১২১৫ গ্রাম |
সোনার দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণসমূহ
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে । বাংলাদেশে টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির ফলে আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে । বিশ্বের কেন্দ্রীয় বাংকগুলো তাদের মজুদ বাড়াতে স্বর্ণ কেনায় আগ্রহী হওয়ায় চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে ।
মূল্য নির্ধারণের প্রভাবক
-
আন্তর্জাতিক বাজার: লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের (LBMA) নির্ধারিত দাম বাংলাদেশের বাজারকে প্রভাবিত করে
-
বিনিময় হার: ডলার-টাকার বিনিময় হারের পরিবর্তন সরাসরি স্থানীয় মূল্যকে প্রভাবিত করে
-
সরকারি কর: প্রতিটি বিক্রয়ে ৫% ভ্যাট এবং ন্যূনতম ৬% মেকিং চার্জ যোগ করা হয়
-
বিশুদ্ধতা: তেজাবি স্বর্ণের দামের ওঠানামা বাজারমূল্যকে নিয়ন্ত্রণ করে
স্বর্ণ ক্রয়ের সময় যা মনে রাখবেন
বাংলাদেশে স্বর্ণ কেনার সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখা উচিত। প্রথমত, অবশ্যই বাজুস স্বীকৃত দোকান থেকে কেনা উচিত যেখানে সঠিক ক্যারেট এবং ওজনের নিশ্চয়তা থাকে । দ্বিতীয়ত, ক্রয়ের সময় হলমার্ক সার্টিফিকেট চেক করা অত্যন্ত জরুরি, যা স্বর্ণের বিশুদ্ধতার প্রমাণ । তৃতীয়ত, মেকিং চার্জ সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে নেওয়া উচিত, কারণ এটি সাধারণত ৬% থেকে ২৫% পর্যন্ত হতে পারে ।
ক্রেতাদের জন্য পরামর্শ
-
সবসময় বাজুস নির্ধারিত দাম চেক করুন
-
হলমার্ক এবং সার্টিফিকেট দাবি করুন
-
মেকিং চার্জ এবং ভ্যাট সম্পর্কে স্পষ্ট জেনে নিন
-
ডিজিটাল স্কেলে ওজন যাচাই করুন
-
রসিদ এবং ওয়ারেন্টি কার্ড সংরক্ষণ করুন
বিভিন্ন ক্যারেটের মধ্যে পার্থক্য
স্বর্ণের বিশুদ্ধতা ক্যারেট দিয়ে পরিমাপ করা হয়, যেখানে ২৪ ক্যারেট হলো শুদ্ধতম রূপ । ২২ ক্যারেট স্বর্ণে ২২ ভাগ খাঁটি সোনা এবং ২ ভাগ অন্য ধাতু (সাধারণত তামা বা রূপা) থাকে, যা গহনা তৈরির জন্য উপযুক্ত কারণ এটি শক্ত এবং টেকসই । ২১ ক্যারেট স্বর্ণে ২১ ভাগ খাঁটি সোনা থাকে এবং এটি মাঝারি মানের বলে বিবেচিত । ১৮ ক্যারেট স্বর্ণে ১৮ ভাগ খাঁটি সোনা থাকে এবং এটি তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়া যায়, তবে বিশুদ্ধতাও কম ।
ক্যারেট অনুযায়ী ব্যবহার
২২ ক্যারেট: বিয়ের গহনা, বিনিয়োগের জন্য গয়না, ঐতিহ্যবাহী অলংকারের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়
২১ ক্যারেট: দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত, মাঝারি দামে ভালো মানের গহনা
১৮ ক্যারেট: ফ্যাশন জুয়েলারি, পশ্চিমা ডিজাইনের গহনার জন্য বেশি ব্যবহৃত
সনাতন পদ্ধতি: ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় পদ্ধতিতে তৈরি, গ্রামাঞ্চলে জনপ্রিয়
স্বর্ণের দামের প্রবণতা
গত ছয় মাসে বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্য ওঠানামা করেছে । সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ১,৯২,৯৬৯ টাকা, যা থেকে ডিসেম্বরে ২২,৬২৮ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে । অক্টোবর মাসে দাম কিছুটা হ্রাস পেলেও নভেম্বর থেকে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয় । ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে টানা তিনবার দাম বৃদ্ধির পর ১৩ ডিসেম্বর সবচেয়ে বড় লাফ দেখা যায় ।
মূল্য পরিবর্তনের সময়রেখা
-
সেপ্টেম্বর ২০২৫: ২২ ক্যারেট ভরি প্রতি ১,৯২,৯৬৯ টাকা
-
অক্টোবর ২০২৫: দাম ৩,৬৭৪ টাকা হ্রাস পেয়ে ২,০৪,২৮৩ টাকা হয়
-
নভেম্বর ২০২৫: দাম পুনরায় বৃদ্ধি শুরু হয়
-
ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫: একবারে ৩,৪৫৩ টাকা বৃদ্ধি
-
ডিসেম্বর ১৫-১৭, ২০২৫: ২,১৫,৫৯৭ টাকায় স্থিতিশীল
আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে তুলনা
আন্তর্জাতিক বাজারে ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রতি আউন্স (৩১.১ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ৫,২৩,৬৯৪.২২ টাকায় লেনদেন হচ্ছে, যা গত ২৪ ঘণ্টায় ০.৫৫% কমেছে । এই হিসেবে প্রতি গ্রাম আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রায় ১৬,৮৩৭ টাকা, যেখানে বাংলাদেশে ২২ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি গ্রাম ১৮,৪৮১ টাকা । এই পার্থক্যের কারণ হলো আমদানি শুল্ক, পরিবহন খরচ, ভ্যাট এবং ব্যবসায়ীদের মুনাফা ।
স্বর্ণ বিনিয়োগের সুবিধা ও অসুবিধা
বাংলাদেশে স্বর্ণ একটি নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়, বিশেষত মুদ্রাস্ফীতির সময়ে । স্বর্ণের মূল্য দীর্ঘমেয়াদে সাধারণত বৃদ্ধি পায় এবং এটি সহজে তরল করা যায় । তবে গহনা হিসেবে কেনা স্বর্ণে মেকিং চার্জ থাকে যা পুনরায় বিক্রয়ের সময় ফেরত পাওয়া যায় না । এছাড়া স্বর্ণ সংরক্ষণের নিরাপত্তা এবং বীমা খরচ বিবেচনা করতে হয় ।
রুপা বিনিয়োগের সম্ভাবনা
স্বর্ণের তুলনায় রুপা অনেক সাশ্রয়ী বিকল্প এবং শিল্প খাতে এর চাহিদা ক্রমবর্ধমান । বর্তমানে ২২ ক্যারেট রুপার দাম প্রতি ভরি মাত্র ৪,৫৭২ টাকা, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে । ইলেকট্রনিক্স, সৌর প্যানেল এবং মেডিকেল যন্ত্রপাতিতে রুপার ব্যবহার বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করছে ।
শেষ কথা
বাংলাদেশে ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সোনা ও রুপার দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকায় ক্রেতাদের সচেতন হওয়া জরুরি । বাজুস নির্ধারিত ২২ ক্যারেট সোনার দাম ২,১৫,৫৯৭ টাকা প্রতি ভরি, যা আন্তর্জাতিক বাজার এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন । ক্রেতাদের উচিত বাজুস স্বীকৃত দোকান থেকে হলমার্ক যুক্ত স্বর্ণ ক্রয় করা এবং সকল কর ও চার্জ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে কেনাকাটা করা । আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ওঠানামা অব্যাহত থাকায় ভবিষ্যতে স্থানীয় বাজারেও পরিবর্তন আসতে পারে, তাই নিয়মিত দাম পর্যবেক্ষণ করা বুদ্ধিমানের কাজ । স্বর্ণ বা রুপা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং বাজার বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । সঠিক তথ্য এবং সচেতনতার মাধ্যমে ক্রেতারা তাদের বিনিয়োগ থেকে সর্বোচ্চ মূল্য পেতে পারেন এবং প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন ।


