আমাদের ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালে প্রতিটি দিনই যেন ইতিহাসের এক একটি অমূল্য রত্নভাণ্ডার হয়ে ধরা দেয়। আর ১০ই জুলাইও এর বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম নয়। সময়ের স্তরগুলো একটু একটু করে উন্মোচন করলে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি এই দিনটিতে মানবজাতির বিজয়, সাংস্কৃতিক বিপ্লব, প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য উল্লম্ফন এবং একই সাথে কিছু হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির এক অপূর্ব ও রোমাঞ্চকর উপাখ্যান খুঁজে পাওয়া যায়। পৃথিবীর বুকে রেকর্ড করা সবচেয়ে উষ্ণতম দিনের হাঁসফাঁস করা গরম থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রথম সক্রিয় কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার মতো ঘটনা—১০ই জুলাই বারবার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে নতুন করে সাজিয়েছে।
আপনি যদি একজন ইতিহাসপ্রেমী হন, নির্দিষ্ট কোনো যুগ নিয়ে গবেষণা করা একজন শিক্ষার্থী হন, অথবা স্রেফ নিজের জন্মদিনে ঘটে যাওয়া চমৎকার সব ঘটনা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী একজন মানুষ হন—তবে আপনি একেবারেই সঠিক জায়গায় এসেছেন। অত্যন্ত বিশদ এবং তথ্যবহুল এই লেখায় আমরা সময়ের টাইমমেশিনে চড়ে বিশ্বভ্রমণে বের হবো। আমরা আজকের দিনের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করব, আমাদের পৃথিবী বদলে দেওয়া স্বপ্নদ্রষ্টাদের জন্মদিন উদযাপন করব এবং এই দিনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা কিংবদন্তিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করব।
বাঙালি পরিমণ্ডল ও ভারতীয় উপমহাদেশ
অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাসের অধিকারী আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশ ১০ই জুলাইয়ে বেশ কিছু যুগান্তকারী ও নির্ণায়ক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক প্রতিরোধের প্রাথমিক স্ফুলিঙ্গ থেকে শুরু করে আধুনিক ভাষা ও সংস্কৃতিকে রূপ দেওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক মহীরুহদের জন্ম—এই অঞ্চলের অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য।
ঐতিহাসিক ঘটনা: বিদ্রোহের বীজ বপন
-
১৯৪২ (ঔপনিবেশিক প্রতিরোধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ): এই দিনটিতে মহাত্মা গান্ধী বাংলায় ব্রিটিশ রাজের নিষ্ঠুর ও অমানবিক “পোড়ামাটি” (scorched-earth) নীতির এক ঐতিহাসিক ও তীব্র নিন্দা জানান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ভারতের পূর্ব সীমান্তে জাপানি আগ্রাসনের ভয়ানক হুমকি দেখা দিলে, দিশেহারা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এক ধ্বংসাত্মক কৌশল হাতে নেয়। তারা পদ্ধতিগতভাবে স্থানীয় হাজার হাজার নৌকা ধ্বংস করে এবং শত্রুর হাতে পড়ার ভয়ে বিপুল পরিমাণ মজুত চাল বাজেয়াপ্ত করে। গান্ধীজি অত্যন্ত সঠিকভাবে অনুধাবন করেছিলেন যে, এই নীতি শত্রুকে নয়, বরং স্থানীয় সাধারণ মানুষকে অনাহারে মারছে। এই বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তটি স্থানীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়, পরিবহন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে এবং ১৯৪৩ সালের ভয়ংকর ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’-এর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে প্রায় ত্রিশ লাখ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়।
-
১৮০৬ (ভেলোর বিদ্রোহ): যদিও এটি বাংলার বদলে দক্ষিণ ভারতে ঘটেছিল, তবুও ভেলোর বিদ্রোহ উপমহাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৮০৬ সালের ১০ই জুলাই, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে কর্মরত ভারতীয় সিপাহিরা একটি বিশাল, সহিংস এবং অত্যন্ত সুসংগঠিত বিদ্রোহের সূচনা করে। এই অভ্যুত্থানের পেছনে মূল কারণ ছিল ব্রিটিশদের চরম সাংস্কৃতিক অসংবেদনশীলতা। তারা নতুন এক ড্রেস কোড চালু করেছিল, যেখানে হিন্দু সৈন্যদের কপালে ধর্মীয় তিলক বা চিহ্ন পরতে নিষেধ করা হয় এবং মুসলিম সৈন্যদের দাড়ি কাটতে ও গোঁফ ছোট করতে বাধ্য করা হয়। মাত্র এক দিনের মধ্যেই এই বিদ্রোহ অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করা হলেও, এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূলে তীব্র কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়। ইতিহাসে এটি ভারতীয় সৈন্যদের দ্বারা প্রথম বড় আকারের বিদ্রোহ হিসেবে স্মরণীয় এবং এটি ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক সিপাহি বিদ্রোহের এক সুস্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ পূর্বসূরি ছিল।
বিখ্যাত জন্ম: ভাষা ও খেলার মাঠের কিংবদন্তি
-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫ – ভাষাবিদ ও গবেষক): প্যারিসের বিখ্যাত সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম ভারতীয় মুসলিম। চর্যাপদ নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা বাংলা ভাষার শেকড় ও ইতিহাসকে নতুনভাবে চিনতে সাহায্য করেছিল। ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
-
সুনীল গাভাস্কার (১৯৪৯ – ক্রিকেটার): ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান (ওপেনার)। নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন এবং টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ১০,০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করার অনন্য গৌরব অর্জন করেন।
উল্লেখযোগ্য মৃত্যু: কূটনীতির পথপ্রদর্শক
-
হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী (২০০১ – কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ): তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রথম এবং আজ পর্যন্ত একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক দিবস ও সরকারি ছুটি
১০ই জুলাই দিনটি বেশ কিছু দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব উদযাপন এবং কিছু অনন্য বৈশ্বিক আয়োজনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত, যা মানুষকে একটি অভিন্ন লক্ষ্যের অধীনে একত্রিত করে।
-
বাহামা (স্বাধীনতা দিবস): ১৯৭৩ সালের ১০ই জুলাই বাহামা আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করে এবং পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে। প্রায় ৩০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই দ্বীপরাষ্ট্রটি কমনওয়েলথের অধীনে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে শান্তিপুর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে এই দিনটি দেশজুড়ে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ জাঙ্কানু (Junkanoo) প্যারেড, চোখ ধাঁধানো আতশবাজি এবং গভীর দেশপ্রেমের সাথে উদযাপিত হয়।
-
যুক্তরাষ্ট্র (ওয়াইওমিং স্টেটহুড ডে): ১৮৯০ সালের এই দিনে ওয়াইওমিং আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। “ইকুয়ালিটি স্টেট” বা ‘সমতার রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত ওয়াইওমিং আমেরিকার ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কোনো ভূখণ্ড বা রাজ্য, যেখানে নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করা হয়েছিল—যা জাতীয়ভাবে ১৯তম সংশোধনী পাস হওয়ার কয়েক দশক আগেই বাস্তবায়িত হয়েছিল।
-
গ্লোবাল এনার্জি ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে (বিশ্ব জ্বালানি স্বাধীনতা দিবস): কিংবদন্তি উদ্ভাবক নিকোলা টেসলার জন্মদিনের সাথে মিলিয়ে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে এই দিনটি পালন করা হয়। বিকল্প এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের জরুরি প্রয়োজন সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। জীবাশ্ম জ্বালানির (fossil fuel) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিনিয়োগ করার জন্য এই দিনে বিভিন্ন দেশের সরকার ও সম্প্রদায়কে উৎসাহিত করা হয়।
-
সাইলেন্স ডে (নীরবতা দিবস): ভারতীয় আধ্যাত্মিক গুরু মেহের বাবার অনুসারীদের দ্বারা মূলত এই দিনটি পালিত হয়। এটি হলো ২৪ ঘণ্টা ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে নীরবতা পালন করার একটি বৈশ্বিক চর্চা। মেহের বাবা নিজে দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে মৌনব্রত পালন করেছিলেন এবং কেবল একটি অ্যালফাবেট বোর্ড ও হাতের ইশারায় যোগাযোগ করতেন। তিনি মুখের কথার চেয়ে অন্তরের নীরবতার আধ্যাত্মিক শক্তির ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন।
বৈশ্বিক ইতিহাস: ফিরে দেখা অতীত

উপমহাদেশের বাইরেও ১০ই জুলাই দিনটি আধুনিক মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয়, উদ্ভাবনী এবং তাৎপর্যপূর্ণ কিছু ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। চলুন অঞ্চলভেদে এই বৈশ্বিক মাইলফলকগুলো একটু জেনে নেওয়া যাক।
যুক্তরাষ্ট্র: বিজ্ঞানের বিচার এবং মহাকাশে সংকেত
-
১৯২৫ (স্কোপস “মাংকি” ট্রায়াল শুরু): টেনেসির ডেটনের এক ভ্যাপসা গরমের দিনে শুরু হয় আমেরিকান ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত এবং বিতর্কিত এক আইনি লড়াই। জন টি. স্কোপস নামের ২৪ বছর বয়সী এক হাইস্কুল বিজ্ঞান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ‘বাটলার অ্যাক্ট’ লঙ্ঘনের দায়ে মামলা হয়। এই আইনে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত কোনো স্কুলে মানব বিবর্তনবাদ (human evolution) পড়ানো সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছিল। এই বিচারটি রাতারাতি এক বিশাল মিডিয়া সার্কাসে পরিণত হয়, যেখানে মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রখ্যাত ডিফেন্স অ্যাটর্নি ক্ল্যারেন্স ড্যারো এবং পপুলিস্ট রাজনীতিবিদ ও কট্টরপন্থী উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান। স্কোপস শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁকে ১০০ ডলার জরিমানা করা হয়, কিন্তু এই বিচারটি শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান, ধর্ম এবং একাডেমিক স্বাধীনতার ভূমিকা নিয়ে এক তুমুল জাতীয় বিতর্কের জন্ম দেয়, যার রেশ আজও বিদ্যমান।
-
১৯১৩ (পৃথিবীর উষ্ণতম দিন): ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালির ফার্নেস ক্রিকের একটি আবহাওয়া কেন্দ্রে যখন পারদ ১৩৪° ফারেনহাইট (৫৬.৭° সেলসিয়াস)-এ পৌঁছায়, তখন আবহাওয়ার ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে এটিই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ডকৃত সর্বোচ্চ বায়ুর তাপমাত্রা।
-
১৯৬২ (টেলস্টার ১-এর সফল উৎক্ষেপণ): ১৯৬২ সালের ১০ই জুলাই টেলস্টার ১ স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে মহাকাশ যুগ বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসে। এটিএন্ডটি (AT&T), বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিজ, নাসা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এটি ছিল বিশ্বের সর্বপ্রথম সক্রিয় কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বা যোগাযোগ উপগ্রহ।
যুক্তরাজ্য: আকাশযুদ্ধ এবং রক ‘এন’ রোলের রাজত্ব
-
১৯৪০ (ব্যাটল অব ব্রিটেন শুরু): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন কয়েক মাসব্যাপী চলা এক ভয়াবহ আকাশযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ১০ই জুলাই। ফ্রান্সের পতনের পর অ্যাডলফ হিটলার তার নজর ঘোরায় যুক্তরাজ্যের দিকে। জার্মান বিমানবাহিনী ‘লুফটওয়াফে’ (Luftwaffe) ইংলিশ চ্যানেলে ব্রিটিশ উপকূলীয় নৌবহর এবং শিপিং সেন্টারগুলোকে লক্ষ্য করে এক নির্মম ও টানা বোমা হামলার অভিযান শুরু করে। এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম বড় কোনো সামরিক অভিযান, যা সম্পূর্ণভাবে কেবল বিমানবাহিনী দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (RAF) পাইলটদের অসীম সাহস—যাদের উইনস্টন চার্চিল বিখ্যাতভাবে “দ্য ফিউ” (The Few) বলে আখ্যায়িত করেছিলেন—শেষ পর্যন্ত জার্মানদের আগ্রাসনের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয় এবং যুদ্ধে এক বিশাল বাঁক বদলের সূচনা করে।
-
১৯৬৫ (রোলিং স্টোনসের আমেরিকা জয়): তুলনামূলক হালকা কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে এক বিশাল মাইলফলকের দিন এটি। ব্রিটিশ রক ব্যান্ড ‘দ্য রোলিং স্টোনস’ তাদের কিংবদন্তিতুল্য গান “(আই কান্ট গেট নো) স্যাটিসফ্যাকশন”-এর মাধ্যমে বিলবোর্ড হট ১০০-এ প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১ নম্বর হিট হওয়ার গৌরব অর্জন করে। কিথ রিচার্ডসের আইকনিক গিটার রিফ এবং মিক জ্যাগারের লেখা তারুণ্যের হতাশা ও বাণিজ্যিকীকরণ বিরোধী কথার জাদুতে এই গানটি ব্যান্ডটিকে বিশ্বব্যাপী সুপারস্টারডমে পৌঁছে দেয় এবং পুরো একটি প্রজন্মের মূল সংগীতে পরিণত হয়।
ইউরোপ: স্বাধীনতার মূল্য
-
১৫৮৪ (উইলিয়াম দ্য সাইলেন্টের গুপ্তহত্যা): নেদারল্যান্ডসের ডেলফটে উইলিয়াম প্রথম (যিনি উইলিয়াম অব অরেঞ্জ বা উইলিয়াম দ্য সাইলেন্ট নামেও পরিচিত) তাঁর নিজের বাড়িতেই ফরাসি ক্যাথলিক সমর্থক বালথাজার জেরার্ডের হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হন। উইলিয়াম ছিলেন স্প্যানিশ হাবসবার্গদের নিপীড়নমূলক শাসনের বিরুদ্ধে ডাচ বিদ্রোহের প্রধান নেতা, যে বিদ্রোহটি পরবর্তীতে ধ্বংসাত্মক ‘আশি বছরের যুদ্ধ’-এর জন্ম দেয়। তাঁর মৃত্যু ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি, কিন্তু তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বই একটি স্বাধীন ডাচ প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। আজ তাঁকে নেদারল্যান্ডসের জাতির পিতা হিসেবে অত্যন্ত সম্মানের সাথে স্মরণ করা হয়।
রাশিয়া: এক গণতান্ত্রিক ভোর
-
১৯৯১ (বরিস ইয়েলৎসিনের ক্ষমতা গ্রহণ): সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্রুত পতনের মধ্যে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে। ১০ই জুলাই বরিস ইয়েলৎসিন আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম লেখান। তাঁর শাসনামলটি ছিল রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত একটি কমিউনিস্ট অর্থনীতি থেকে মুক্তবাজার পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রূপান্তরের এক অত্যন্ত উত্তাল এবং আমূল পরিবর্তনের সময়, যা মূলত বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত: প্রশান্ত মহাসাগরে অন্তর্ঘাত
-
১৯৮৫ (রেইনবো ওয়ারিয়র ডুবে যাওয়া): আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সন্ত্রাসের এক ভয়ংকর ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড হারবারে নোঙর করে থাকা গ্রিনপিসের ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ ‘রেইনবো ওয়ারিয়র’ বোমাবর্ষণের শিকার হয়ে ডুবে যায়। জাহাজটি এবং এর ক্রুরা প্রশান্ত মহাসাগরে ফরাসি পারমাণবিক পরীক্ষার প্রতিবাদ ও তা ব্যাহত করার জন্য মোরুরোয়া অ্যাটলের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। জাহাজের মূল অংশে দুটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার ফার্নান্দো পেরেইরা মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।
উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যু (বৈশ্বিক)
১০ই জুলাই বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং বিনোদন জগতের সবচেয়ে প্রভাবশালী কিছু মানুষের জন্মবার্ষিকী। এটি সেই দিন, যেদিন আমরা এমন সব কিংবদন্তিদের চিরবিদায় জানিয়েছি, যারা তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে রেখে গেছেন এক অমোঘ ছাপ।
বিখ্যাত জন্ম: স্বপ্নদ্রষ্টা এবং তারকারা
-
জন ক্যালভিন (১৫০৯ – ফরাসি): প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারের সময়কার একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ধর্মতাত্ত্বিক এবং যাজক। তাঁর রচিত মৌলিক গ্রন্থ ‘ইনস্টিটিউটস অফ দ্য ক্রিশ্চিয়ান রিলিজিয়ন’ বিশ্বব্যাপী রিফর্মড এবং প্রেসবিটেরিয়ান চার্চকে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছিল।
-
নিকোলা টেসলা (১৮৫৬ – সার্বিয়ান-আমেরিকান): একজন অবিসংবাদিত প্রতিভা, দূরদর্শী উদ্ভাবক, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। অল্টারনেটিং কারেন্ট (AC) বৈদ্যুতিক সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী কাজ আধুনিক বৈশ্বিক পাওয়ার গ্রিডের আক্ষরিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এছাড়াও তিনি রেডিও প্রযুক্তি এবং রোবোটিক্সের ক্ষেত্রে ছিলেন একজন সত্যিকারের পথিকৃৎ।
-
মার্সেল প্রুস্ত (১৮৭১ – ফরাসি): বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তিনি তাঁর সাত খণ্ডের বিশাল উপন্যাস ‘ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম’-এর জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত, যা মানব মন, স্মৃতি এবং সময়ের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আধুনিক সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
-
মেরি ম্যাকলিওড বেথুন (১৮৭৫ – আমেরিকান): আফ্রিকান-আমেরিকানদের জন্য এক অগ্রগামী শিক্ষাবিদ, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেত্রী এবং মানবহিতৈষী। তিনি ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ নিগ্রো উইমেন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং জাতিগত ও লিঙ্গ সমতার জন্য নিরলসভাবে লড়াই করে প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছিলেন।
-
সোফিয়া ভারগারা (১৯৭২ – কলম্বিয়ান-আমেরিকান): অত্যন্ত সফল একজন অভিনেত্রী, প্রযোজক এবং মডেল। তিনি জনপ্রিয় সিটকম ‘মডার্ন ফ্যামিলি’-তে গ্লোরিয়া ডেলগাডো-প্রিচেট হিসেবে তাঁর আইকনিক এবং দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত, যা তাঁকে টেলিভিশনের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেত্রীদের একজনে পরিণত করেছিল।
-
জেসিকা সিম্পসন (১৯৮০ – আমেরিকান): একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী পপ গায়িকা, অভিনেত্রী এবং অত্যন্ত সফল ফ্যাশন উদ্যোক্তা, যার নিজস্ব রিটেইল ব্র্যান্ড ইতিমধ্যে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাজস্ব আয় করেছে।
বিখ্যাত মৃত্যু: কিংবদন্তিদের বিদায়
-
সম্রাট হ্যাড্রিয়ান (১৩৮ খ্রিস্টাব্দ – রোমান): সেই বিখ্যাত রোমান সম্রাট যিনি বিশাল সাম্রাজ্যকে স্থিতিশীল ও সুসংহত করেছিলেন। তিনি ব্রিটেনে হ্যাড্রিয়ানস ওয়াল নির্মাণ, রোমে প্যানথিয়ন পুনর্নির্মাণ এবং তাঁর প্রবল গ্রিক সংস্কৃতি প্রীতির জন্য ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।
-
মেল ব্ল্যাঙ্ক (১৯৮৯ – আমেরিকান): বিশ্বব্যাপী “দ্য ম্যান অফ আ থাউজেন্ড ভয়েসেস” বা হাজার কণ্ঠের মানুষ হিসেবে পরিচিত। বাগস বানি, ড্যাফি ডাক, পোরকি পিগ এবং বার্নি রাবল-এর মতো প্রায় সমস্ত ক্লাসিক লুনি ট্যুনস চরিত্রের পেছনের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ছিলেন তিনি। ৮১ বছর বয়সে কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
-
ওমর শরীফ (২০১৫ – মিশরীয়): একজন অত্যন্ত ক্যারিশম্যাটিক এবং বহু পুরস্কার বিজয়ী অভিনেতা। ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ (১৯৬২) এবং ‘ডক্টর জিভাগো‘ (১৯৬৫)-এর মতো মহাকাব্যিক সিনেমাগুলোতে তাঁর দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য তিনি বিশ্বজোড়া খ্যাতি এবং সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। ৮৩ বছর বয়সে তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।
“আপনি কি জানেন?” মজার তথ্য
আপনার পরবর্তী আড্ডায় বা ডিনার পার্টিতে শেয়ার করার জন্য কিছু চমৎকার তথ্য খুঁজছেন? ১০ই জুলাইয়ের সাথে জড়িত দারুণ আকর্ষণীয় ও অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ৩টি ঘটনা নিচে দেওয়া হলো:
-
সিটবেল্ট বিপ্লব: ১৯৬২ সালের ১০ই জুলাই, সুইডিশ প্রকৌশলী নিলস বোহলিন গাড়ির জন্য ‘থ্রি-পয়েন্ট সিটবেল্ট’-এর মার্কিন পেটেন্ট পান। ভলভো (Volvo) কোম্পানিতে কাজ করার সময় বোহলিন এই অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু বৈপ্লবিক নকশাটি তৈরি করেছিলেন। জনসাধারণের নিরাপত্তার কথা ভেবে ভলভো এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেয়—তারা এই পেটেন্টটি উন্মুক্ত করে দেয়, যাতে বিশ্বের অন্যান্য সমস্ত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এটি বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারে। ধারণা করা হয়, বোহলিনের এই চমৎকার আবিষ্কারটি বিশ্বজুড়ে আজ অবধি দশ লাখেরও বেশি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।
-
“নিউ কোক” প্রত্যাহার: কর্পোরেট ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত এক মার্কেটিং বিপর্যয়ের ঘটনা এটি। নিজেদের শতাব্দীর পুরনো রেসিপি পরিবর্তন করার পর কোকা-কোলা এক বিশাল ও তীব্র জনরোষের মুখে পড়ে। বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া এবং গ্রাহকদের ব্যাপক প্রতিবাদের পর কোম্পানিটি শেষ পর্যন্ত মাথা নত করতে বাধ্য হয়। ১৯৮৫ সালের ১০ই জুলাই—”নিউ কোক” চালু করার মাত্র ৭৯ দিন পর—কোম্পানির নির্বাহীরা ঘোষণা করেন যে তারা মানুষের সেই প্রিয় আদি ফর্মুলাটিই আবার ফিরিয়ে আনছেন এবং এর নতুন নাম দেওয়া হয় “কোকা-কোলা ক্লাসিক”।
-
ভক্সওয়াগন মাইলফলকের সমাপ্তি: ২০১৯ সালের ১০ই জুলাই মোটরগাড়ির ইতিহাসের একটি যুগের নীরবে অবসান ঘটে। জার্মান অটোমেকার ভক্সওয়াগন মেক্সিকোর পুয়েবলা প্ল্যান্টে তাদের সেই আইকনিক ‘বিটল’ (Beetle) মডেলের সমস্ত উৎপাদন আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়। ১৯৩৮ সালে প্রথম চালু হওয়া এই অরিজিনাল মডেলটি ২ কোটি ১০ লাখেরও বেশি বিক্রি হয়েছিল, যা এটিকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচিত এবং সর্বাধিক বিক্রিত গাড়িগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
শেষ কথা
১০ই জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর দিকে ফিরে তাকালে এটি একেবারে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই তারিখটি মানবজাতির নিরন্তর অগ্রগতি এবং সংগ্রামের এক শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি। ডেথ ভ্যালির সেই হাঁসফাঁস করা রেকর্ডভাঙা গরম থেকে শুরু করে মহাকাশের শীতল শূন্যতায় টেলস্টার ১-এর মাধ্যমে বৈশ্বিক যোগাযোগের যে বিপ্লব—গ্রীষ্মের মাঝামাঝি এই দিনটিতে অর্জিত মাইলফলকগুলো আমাদের আজকের জীবনযাত্রায় এক চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। আমরা দেখতে পাই নিকোলা টেসলার জন্মের মধ্য দিয়ে উদ্ভাবনের উজ্জ্বল স্ফুলিঙ্গ, ব্যাটল অফ ব্রিটেনের সময় আরএএফ (RAF) পাইলটদের অদম্য সাহস এবং বাহামার স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে নিজেদের সার্বভৌমত্ব অর্জনের এক নিরলস সাধনা।
ইতিহাস কেবল ধুলোপড়া আর্কাইভে পড়ে থাকা কিছু তারিখের সমষ্টি নয়; এটি আমাদের আধুনিক বিশ্ব কীভাবে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে, তার এক জীবন্ত উপাখ্যান। ১০ই জুলাইয়ের বিজয়, ট্র্যাজেডি এবং বিশাল সব প্রযুক্তিগত উল্লম্ফনগুলো বুঝতে পারা মানেই আমাদের মানবজাতির এই যৌথ যাত্রার বিশালত্ব ও টিকে থাকার সংগ্রামকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা।

