বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী অ্যাপ্লায়েন্স: কেন কিনবেন এবং এর আসল সুবিধাগুলো কী?

সর্বাধিক আলোচিত

মাসের শেষে যখন বিদ্যুৎ বিলের কাগজটা হাতে আসে, তখন আমাদের অনেকেরই কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। আমরা প্রায়ই ভাবি, ফ্যান তো কমই চালিয়েছি, এসিও তো সারাদিন চলেনি, তাহলে এত বিল আসলো কোথা থেকে? সত্যি বলতে, সমস্যাটা আমাদের ব্যবহারের চেয়ে আমাদের ঘরের পুরোনো ইলেকট্রনিক জিনিসপত্রের ওপর বেশি নির্ভর করে। প্রযুক্তি এখন অনেক দূর এগিয়েছে, আর পুরনো আমলের ভারী এবং বেশি ওয়াটের জিনিসপত্রের জায়গা দখল করে নিচ্ছে নতুন সব প্রযুক্তি। এই সমস্যার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর সমাধান হলো ঘরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী অ্যাপ্লায়েন্স ব্যবহার করা।

অনেকেই মনে করেন নতুন জিনিস কেনা মানেই শুধু পকেট থেকে বাড়তি খরচ। কিন্তু একটু হিসাব করলে দেখবেন, এই নতুন প্রযুক্তিগুলো মূলত আপনার ভবিষ্যতের টাকা বাঁচানোর একটা দারুণ বিনিয়োগ। আজ আমরা শুধু ভাসা ভাসা কথা বলবো না, বরং একদম ভেঙে হিসাব করে দেখাবো কেন আপনার পুরনো জিনিসগুলো পাল্টে ফেলা উচিত। এতে আপনার ঠিক কতটা লাভ হবে, পরিবেশের কী উপকার হবে এবং বাজার থেকে সঠিক জিনিসটা কীভাবে বেছে নেবেন, তার সবকিছুই থাকছে এই গাইডলাইনে।

বিদ্যুৎ বিল কমাতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী অ্যাপ্লায়েন্স এর ম্যাজিক

Advantages of Using Energy Efficient Appliances

প্রতিদিনের জীবনে আমরা টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন থেকে শুরু করে মাইক্রোওয়েভ ওভেন—নানা রকম জিনিস ব্যবহার করি। সাধারণ জিনিসগুলো তৈরি করা হতো শুধু কাজ করার জন্য, কারেন্ট বাঁচানোর কথা ভেবে নয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী অ্যাপ্লায়েন্স এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যেন এগুলো সবচেয়ে কম কারেন্ট টেনে সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দিতে পারে। এর ভেতরে থাকা উন্নত সার্কিট, ইনভার্টার প্যানেল এবং স্মার্ট সেন্সরগুলো অপ্রয়োজনীয় পাওয়ার অপচয় একদম বন্ধ করে দেয়। ফলে আপনি একই কাজ করছেন, কিন্তু মাস শেষে আপনার পকেট থেকে টাকা কম বের হচ্ছে। এটি যেন জাদুর মতো কাজ করে, যেখানে আপনার আরামের কোনো ঘাটতি হচ্ছে না, অথচ খরচ কমে আসছে অর্ধেকেরও বেশি।

অ্যাপ্লায়েন্সের ধরন সাধারণ বিদ্যুৎ খরচ (মাসিক) সাশ্রয়ী মডেলের খরচ (মাসিক) সম্ভাব্য মাসিক সাশ্রয়
সিলিং ফ্যান ৭০-৮০ ওয়াট ২৮-৩৫ ওয়াট (BLDC) প্রায় ৫০%
রেফ্রিজারেটর ৬০-৮০ ইউনিট ৩০-৪০ ইউনিট প্রায় ৪০%
ওয়াশিং মেশিন বেশি পানি ও কারেন্ট সেন্সর ভিত্তিক কম কারেন্ট প্রায় ৩০%
টেলিভিশন ১০০-১৫০ ওয়াট (LCD/Plasma) ৪০-৬০ ওয়াট (LED) প্রায় ৬০%

দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক লাভ

শুরুতে একটি এনার্জি-এফিশিয়েন্ট জিনিস কিনতে আপনার সাধারণ মডেলের চেয়ে হয়তো একটু বেশি টাকা লাগতে পারে। কিন্তু কেনার পর থেকে প্রতি মাসে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল বাঁচবে, তাতে মাত্র এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই আপনার ওই বাড়তি টাকাটা উঠে আসবে।

  • হিসাবের খাতা: ধরুন, আপনি সাধারণ ফ্যানের বদলে একটি BLDC ফ্যান কিনলেন। সাধারণ ফ্যান যেখানে মাসে ৩০০ টাকার কারেন্ট টানে, নতুন ফ্যান টানবে ১৫০ টাকার। বছরে বাঁচবে ১,৮০০ টাকা।
  • বিনিয়োগ ফেরত: ফ্যানটির বাড়তি দাম যদি ১,৫০০ টাকা হয়, তবে এক বছরের আগেই আপনার টাকা উঠে আসছে। এরপর থেকে ফ্যানটি যতদিন চলবে, পুরোটাই আপনার নিট লাভ।

কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো

আমরা হয়তো প্রতিদিন খেয়াল করি না, কিন্তু আমাদের ব্যবহার করা প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রচুর পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো হয়। আপনি যখন কম কারেন্ট টানে এমন ডিভাইস ব্যবহার করছেন, তখন পরোক্ষভাবে আপনি পরিবেশ দূষণ কমাতে সাহায্য করছেন।

  • এটি শুধু আপনার একার লাভ নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্থ পৃথিবী রেখে যাওয়ার ছোট একটা পদক্ষেপ।
  • গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব কমাতে আমাদের প্রতিটি পরিবারের এই ছোট উদ্যোগগুলোই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

ঘর আলোকিত করতে LED লাইটের কোনো বিকল্প নেই

একসময় আমাদের সবার ঘরেই হলুদ আলোর বাল্ব বা প্যাঁচানো টিউব লাইট (CFL) জ্বলতো। ওগুলো প্রচুর গরম হতো আর কারেন্ট টানতো দেখার মতো। এখন সেই জায়গা পুরোপুরি নিয়ে নিয়েছে LED (Light Emitting Diode) প্রযুক্তি। অন্য যেকোনো ডিভাইসের সাথে যদি আপনি পুরো বাসার লাইটগুলো পাল্টে ফেলেন, তাহলে বিলের পার্থক্যটা আপনি প্রথম মাসেই টের পাবেন। এগুলো আকারে ছোট, দেখতে সুন্দর এবং চোখের জন্য বেশ আরামদায়ক। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই লাইটগুলো ঘরের তাপমাত্রাও স্বাভাবিক রাখে, ফলে ফ্যান বা এসির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে না।

লাইটের ধরন পাওয়ার খরচ গড় আয়ু (ঘণ্টা) তাপ উৎপাদন
সাধারণ বাল্ব (Incandescent) ৬০ ওয়াট ১,০০০ অত্যন্ত বেশি
সিএফএল (CFL) ১৫ ওয়াট ৮,০০০ মাঝারি
এলইডি (LED) ৭-৯ ওয়াট ২৫,০০০ – ৫০,০০০ খুবই কম
টিউব লাইট (পুরোনো) ৪০ ওয়াট ৫,০০০ বেশি

আলো বেশি, খরচ কম

এলইডি লাইটের সবচেয়ে বড় ম্যাজিক হলো এর লুমেন (Lumen) বা আলোর তীব্রতা। একটি ৬০ ওয়াটের সাধারণ বাল্ব যে পরিমাণ আলো দেয়, ঠিক একই পরিমাণ আলো পেতে আপনার মাত্র ৭ থেকে ৯ ওয়াটের একটি এলইডি লাইট দরকার।

  • অর্থাৎ, প্রায় ৮০-৯০ ভাগ বিদ্যুৎ সরাসরি বেঁচে যাচ্ছে।
  • আপনার ড্রয়িংরুমে যদি ৪টি সাধারণ বাল্ব থাকে, তবে সেগুলো পাল্টে এলইডি লাগালে আপনার বিলের খাতায় বিশাল একটা পরিবর্তন আসবে।

দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ

প্যাঁচানো সিএফএল লাইটে পারদ বা মার্কারি ব্যবহার করা হতো, যা ভেঙে গেলে স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকর।

  • অন্যদিকে এলইডি লাইটে কোনো ক্ষতিকারক গ্যাস বা রাসায়নিক থাকে না।
  • এগুলো সহজে কাটে না বা ফিউজ হয় না। একবার ভালো ব্র্যান্ডের একটি লাইট লাগালে কয়েক বছর ওটা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হয় না। ফলে বারবার বাল্ব কেনার ঝামেলা ও খরচ—দুটোই বাঁচে।

ইনভার্টার এসি এবং স্মার্ট ফ্রিজ: আধুনিক জীবনের সঙ্গী

আমাদের বাসার সবচেয়ে বড় “বিদ্যুৎ খাদক” হলো এসি আর ফ্রিজ। এগুলো যেহেতু দীর্ঘক্ষণ একটানা চলে, তাই বিলের বড় অংশটা এদের কারণেই আসে। নন-ইনভার্টার এসি বা ফ্রিজের কম্প্রেসার সবসময় ফুল স্পিডে চলে এবং ঘর ঠান্ডা হলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। আবার যখন তাপমাত্রা বাড়ে, তখন সজোরে চালু হয়। এই বারবার চালু হওয়া আর বন্ধ হওয়ার কারণে প্রচুর কারেন্ট পোড়ে এবং যন্ত্রের ওপর চাপ পড়ে। কিন্তু ইনভার্টার প্রযুক্তির বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী অ্যাপ্লায়েন্স একদম অন্যভাবে কাজ করে। এদের কাজের ধরন এতটাই মসৃণ যে আপনি বুঝতেই পারবেন না কখন এগুলো স্পিড কমাচ্ছে বা বাড়াচ্ছে।

ফিচারের নাম নন-ইনভার্টার প্রযুক্তি ইনভার্টার প্রযুক্তি
কম্প্রেসারের গতি নির্দিষ্ট (ফিক্সড স্পিড) পরিবর্তনশীল (ভেরিয়েবল স্পিড)
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ওঠানামা করে একদম স্থির থাকে
শব্দ ও ভাইব্রেশন বেশি প্রায় শব্দহীন
স্টার্ট-আপ কারেন্ট অনেক বেশি প্রয়োজন হয় খুব অল্প কারেন্টে চালু হয়

ইনভার্টার কম্প্রেসারের কাজ

ইনভার্টার প্রযুক্তিতে কম্প্রেসার কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয় না। এটি ঘরের তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে নিজের গতি নিজে থেকেই কমিয়ে বা বাড়িয়ে নেয়।

  • ধরুন, ঘরের তাপমাত্রা আপনার রিমোটের সেটিং অনুযায়ী ঠান্ডা হয়ে গেছে, তখন এসিটা একদম অল্প স্পিডে চলতে থাকে শুধু তাপমাত্রাটা ধরে রাখার জন্য।
  • এতে কোনো ধাক্কা লাগে না, আর বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ৪০-৬০% পর্যন্ত কমে যায়।

স্মার্ট সেন্সরের সুবিধা

আজকালকার আধুনিক ফ্রিজ বা এসিতে নানা রকম ইন্টেলিজেন্ট সেন্সর থাকে।

  • ফ্রিজে কতটুকু খাবার আছে বা আপনি কতবার ফ্রিজের দরজা খুলছেন, তার ওপর ভিত্তি করে এটি কুলিং লেভেল নিজে থেকেই ঠিক করে।
  • রাতে যখন বাইরে ঠান্ডা থাকে, তখন স্মার্ট এসি নিজে থেকেই স্লিপ মোডে গিয়ে কারেন্ট বাঁচায় এবং আপনার ঘুমের যেন ব্যাঘাত না ঘটে সেই অনুযায়ী তাপমাত্রা সেট করে নেয়।

রান্নাঘরের আধুনিকায়ন: ইন্ডাকশন কুকার ও মাইক্রোওয়েভ

রান্নাঘরে আমরা সাধারণত গ্যাসের চুলা ব্যবহার করি। কিন্তু আধুনিক সময়ে ইন্ডাকশন কুকার এবং মাইক্রোওয়েভ ওভেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরোনো মডেলের ইলেকট্রিক হিটার বা কয়েল চুলাগুলো প্রচুর বিদ্যুৎ টানতো এবং সেগুলোতে শর্ট সার্কিটের ভয় থাকতো। কিন্তু আধুনিক ইন্ডাকশন প্রযুক্তি সরাসরি পাত্রকে গরম করে, আশেপাশের বাতাসকে নয়। ফলে খুব কম সময়ে এবং অনেক কম বিদ্যুতে রান্না শেষ হয়। অন্যদিকে, খাবার গরম করার জন্য বারবার চুলা জ্বালানোর চেয়ে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের সঠিক ব্যবহার আপনার সময় ও শক্তি—দুটোই বাঁচায়।

রান্নাঘরের গ্যাজেট কাজের ধরন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কারণ
ইন্ডাকশন কুকার ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড সরাসরি পাত্র গরম হয়, তাপ অপচয় হয় না।
মাইক্রোওয়েভ ওভেন মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন নির্দিষ্ট অংশ গরম করে, সময় কম লাগে।
ট্রেডিশনাল কয়েল হিটার রেজিস্ট্যান্স হিটিং প্রচুর তাপ বাতাসে ছড়িয়ে নষ্ট হয়।

দ্রুত রান্না, বিদ্যুৎ সাশ্রয়

ইন্ডাকশন কুকারে রান্নার সময় তাপ সরাসরি পাত্রের তলায় পৌঁছায়। এতে তাপের কোনো অপচয় হয় না।

  • একটি সাধারণ গ্যাসের চুলায় যেখানে ১ লিটার পানি ফোটাতে সময় লাগে প্রায় ৭-৮ মিনিট, সেখানে একটি ভালো মানের ইন্ডাকশন কুকারে তা ৩-৪ মিনিটেই হয়ে যায়।
  • সময় কম লাগার অর্থ হলো, আপনার বিদ্যুতের ব্যবহারও কম হচ্ছে।

সঠিক পাত্র ও পদ্ধতি

ইন্ডাকশন কুকার ব্যবহারের প্রধান শর্ত হলো সমতল তলার এবং ম্যাগনেটিক পাত্র ব্যবহার করা।

  • আপনি যদি সঠিক পাত্র ব্যবহার না করেন, তবে এটি কাজ করবে না।
  • মাইক্রোওয়েভের ক্ষেত্রে খাবার ছোট ছোট টুকরো করে রাখলে এবং ঢেকে গরম করলে তা দ্রুত গরম হয়, যা পরোক্ষভাবে বিদ্যুৎ বিল কমাতে সাহায্য করে।

স্মার্ট প্লাগ এবং হোম অটোমেশন দিয়ে বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ

অনেক সময় দেখা যায় আমরা টিভি, কম্পিউটার বা চার্জার বন্ধ করেছি ঠিকই, কিন্তু সুইচ বোর্ডের সুইচটা অফ করতে ভুলে গেছি। এই অবস্থায় ডিভাইসগুলো যে পরিমাণ বিদ্যুৎ টানে, তাকে বলা হয় ‘ফ্যান্টম লোড’ বা স্ট্যান্ডবাই পাওয়ার। একটি বাড়ির মোট বিদ্যুৎ বিলের প্রায় ৫-১০% আসতে পারে শুধু এই ফ্যান্টম লোড থেকে। এই সমস্যা সমাধানের দারুণ উপায় হলো স্মার্ট প্লাগ বা হোম অটোমেশন সিস্টেম ব্যবহার করা। এগুলো আপনার পুরোনো ডিভাইসগুলোকেও স্মার্টলি নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

প্রযুক্তির নাম মূল কাজ কীভাবে সাশ্রয় করে
স্মার্ট প্লাগ ওয়াইফাই দিয়ে কন্ট্রোল ভুলে যাওয়া ডিভাইস মোবাইল থেকে অফ করা যায়।
মোশন সেন্সর লাইট নড়াচড়া শনাক্ত করে ঘরে কেউ না থাকলে নিজে থেকে লাইট বন্ধ করে।
স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট এসির তাপমাত্রা অটো-কন্ট্রোল আবহাওয়া বুঝে এসির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে।

রিমোট কন্ট্রোল ও শিডিউলিং

স্মার্ট প্লাগগুলো আপনার ওয়াইফাইয়ের সাথে যুক্ত থাকে। আপনি চাইলে মোবাইল অ্যাপ দিয়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে এগুলো অন বা অফ করতে পারেন।

  • আপনি রাতে ঘুমানোর আগে টাইমার সেট করে দিতে পারেন, যেন নির্দিষ্ট সময় পর আপনার ফোন চার্জিং বা এসির সুইচ নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়।
  • এতে একদিকে যেমন ডিভাইস ওভারচার্জিং থেকে বাঁচে, অন্যদিকে কারেন্টও সাশ্রয় হয়।

ফ্যান্টম লোড বা স্ট্যান্ডবাই পাওয়ার কমানো

বাসায় যখন কেউ থাকে না, তখন স্মার্ট প্লাগগুলো দিয়ে টিভি, ওভেন বা ডেস্কটপের মেইন পাওয়ার পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যায়।

  • ফলে স্ট্যান্ডবাই মোডে থাকার কারণে যে কারেন্টটা নষ্ট হতো, সেটা আর হয় না।
  • দীর্ঘমেয়াদে এই ছোট ছোট বাঁচানো কারেন্টই মাস শেষে আপনার বিলে বড় পার্থক্য তৈরি করে।

সঠিক পণ্য চেনার উপায়

Check List to Buy Energy Efficient Appliances

বাজারে গেলে বিক্রেতারা অনেক কথাই বলবে। সব জিনিসের গায়েই এখন ‘এনার্জি সেভিং’ স্টিকার বা বড় বড় লেখা থাকে। কিন্তু একজন সাধারণ ক্রেতা হিসেবে আপনাকে একটু স্মার্ট হতে হবে। শুধু বিক্রেতার কথা শুনে বা স্টিকার দেখে ভুলভাল জিনিস কিনে আনলে কিন্তু আপনার কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী অ্যাপ্লায়েন্স পাওয়ার উদ্দেশ্যটা পূরণ হবে না। কিছু নির্দিষ্ট বিষয় আছে যা দেখে আপনি নিজেই যাচাই করতে পারবেন জিনিসটা আসলেই আসল নাকি পুরোটাই মার্কেটিং গিমিক।

যাচাই করার বিষয় কী দেখবেন কেন জরুরি
এনার্জি স্টার রেটিং (BEE) ৩ থেকে ৫ স্টার যত বেশি স্টার, তত বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত।
বিএলডিসি (BLDC) মোটর ফ্যানের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি আছে কি না সাধারণ ফ্যানের অর্ধেক কারেন্ট খরচ হয়।
ক্যাপাসিটি বা সাইজ ঘরের আয়তন অনুযায়ী সঠিক মাপ বড় ঘরে ছোট এসি লাগালে কারেন্ট বেশি পুড়বে।
বার্ষিক বিদ্যুৎ খরচের লেবেল গায়ের লেবেলে ইউনিট লেখা থাকে বছরে কত ইউনিট খরচ হবে তার ধারণা পাওয়া যায়।

এনার্জি স্টার রেটিংয়ের গুরুত্ব

যেকোনো বড় ইলেকট্রনিক্স কেনার আগে অবশ্যই এর গায়ের ‘এনার্জি স্টার লেবেল’ খেয়াল করবেন।

  • সাধারণত সরকারি বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো পরীক্ষা করে এই রেটিং দেয়। ১ থেকে ৫ স্টারের মধ্যে রেটিং দেওয়া হয়।
  • ৫ স্টার মানে হলো ওই জিনিসটা সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ খরচ করবে। ৩ স্টার হলেও তা বেশ সাশ্রয়ী। তবে রেটিং ছাড়া জিনিস কেনা থেকে বিরত থাকাই ভালো।

সঠিক সাইজ এবং ওয়ারেন্টি

আপনার দরকার অনুযায়ী সঠিক মাপের জিনিস কেনা খুব জরুরি।

  • তিনজনের ফ্যামিলির জন্য বিশাল বড় একটা ফ্রিজ কিনে রাখলে বা ছোট রুমের জন্য ২ টনের এসি কিনলে শুধু শুধু বিদ্যুৎ অপচয় হবে।
  • কেনার সময় কম্প্রেসার বা প্যানেলের ওয়ারেন্টি কত বছরের, সেটা দেখে নেওয়া উচিত। ভালো ব্র্যান্ডগুলো সাধারণত ইনভার্টার কম্প্রেসারে ১০ বছরের ওয়ারেন্টি দিয়ে থাকে, যা আপনাকে দীর্ঘদিন নিশ্চিন্ত রাখবে।

শেষ কথা

পুরোনো অভ্যাস আর পুরনো জিনিসপত্র আঁকড়ে ধরে থাকলে দিন শেষে আর্থিক ক্ষতিটা আপনারই। বিদ্যুৎ বিলের এই ঊর্ধ্বগতির যুগে একটু সচেতন হয়ে ঘরের লাইট, ফ্যান, এসি বা ফ্রিজগুলো পাল্টে ফেলার সিদ্ধান্তটা অত্যন্ত যৌক্তিক। আপনার পুরো বাসা একবারে পাল্টানোর দরকার নেই। শুরুটা করুন মাত্র কয়েকটা নষ্ট হয়ে যাওয়া বাল্বকে এলইডি দিয়ে রিপ্লেস করে অথবা সাধারণ ফ্যান বদলে একটি বিএলডিসি ফ্যান লাগিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে বড় জিনিসগুলোর দিকে যান।

আসল কথা হলো, একটি সত্যিকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী অ্যাপ্লায়েন্স শুধু আপনার মানিব্যাগকেই স্বস্তি দেয় না, বরং আধুনিক প্রযুক্তির এক দারুণ ও ঝামেলাবিহীন অভিজ্ঞতাও দেয়। সচেতন হোন, সঠিক জিনিস কিনুন এবং নিজের পাশাপাশি পরিবেশের যত্ন নিন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. এলইডি লাইট কি ব্যবহারের সাথে সাথে আলো কমে যায়?

হ্যাঁ, দীর্ঘ সময় ব্যবহারের পর (সাধারণত কয়েক বছর পর) এলইডি লাইটের লুমেন বা উজ্জ্বলতা সামান্য কমে যেতে পারে। তবে এটি সাধারণ বাল্ব বা সিএফএলের মতো হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায় না বা চোখের জন্য ক্ষতিকর পর্যায়ে যায় না।

২. ইনভার্টার এসি কি বারবার অন-অফ করলে কারেন্ট বেশি টানে?

একেবারেই তাই। ইনভার্টার এসি একটানা চলতে দিলে সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় পাওয়া যায়। বারবার রিমোট দিয়ে বন্ধ আর চালু করলে ইনভার্টার প্রযুক্তির মূল সুবিধাই নষ্ট হয়ে যায় এবং বিল বেশি আসে।

৩. এনার্জি-এফিশিয়েন্ট ফ্যান (BLDC) বাতাসে কি কোনো পার্থক্য থাকে?

না, বাতাসের ফ্লো বা স্পিডে কোনো পার্থক্য থাকে না। বরং BLDC ফ্যানগুলোতে সাধারণ ফ্যানের চেয়ে মোটর কম গরম হয় এবং এগুলো রিমোট দিয়ে খুব নিখুঁতভাবে স্পিড কন্ট্রোল করা যায়। বাতাস সাধারণ ফ্যানের মতোই আরামদায়ক থাকে।

৪. ৫ স্টার রেটিংয়ের ফ্রিজ আর ৩ স্টার রেটিংয়ের ফ্রিজের মধ্যে বিলে কতটা তফাত হয়?

সাধারণত ৫ স্টার রেটিংয়ের ফ্রিজ ৩ স্টারের তুলনায় প্রায় ১৫% থেকে ২০% বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। তবে ৫ স্টার ফ্রিজের দাম কিছুটা বেশি হয়। দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের কথা চিন্তা করলে ৫ স্টার কেনাই বেশি লাভজনক।

৫. স্মার্ট প্লাগ কি যেকোনো সাধারণ ডিভাইসে লাগানো যায়?

হ্যাঁ, স্মার্ট প্লাগ যেকোনো সাধারণ সকেটে লাগানো যায় এবং এর ওপরে আপনি যেকোনো সাধারণ ডিভাইস (যেমন: সাধারণ ফ্যান, টিভি বা চার্জার) যুক্ত করতে পারেন। এরপর অ্যাপের মাধ্যমে ওই প্লাগটি নিয়ন্ত্রণ করে আপনি ডিভাইসটির পাওয়ার অন/অফ করতে পারবেন।

৬. ইন্ডাকশন কুকারে কি বিদ্যুৎ বিল অনেক বেশি আসে?

মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে যে ইন্ডাকশনে প্রচুর বিল আসে। আসলে, গ্যাসের সিলিন্ডার বা লাইনের বিলের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, নিয়মিত ইন্ডাকশন ব্যবহারে খরচ প্রায় কাছাকাছি বা কিছু ক্ষেত্রে কমই হয়, কারণ এটি রান্নার সময় অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

সর্বশেষ