২২ জুলাই: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

এক কাপ কফি বা চা হাতে নিয়ে আরাম করে বসুন। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ২২শে জুলাই দিনটিতে এমন কী আছে যা একে এতটা বিশেষ করে তোলে? স্বপ্নদর্শী শিল্পী ও বিজ্ঞানীদের জন্ম থেকে শুরু করে এভিয়েশনের যুগান্তকারী অর্জন, উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রাম এবং বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ—মানব ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও মোড় ঘোরানো মুহূর্তের সাক্ষী এই দিনটি।

আজকের এই ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে আমরা একজন বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণ থেকে ২২শে জুলাইয়ের ঘটনাবলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব। বাঙালি পরিমণ্ডল ও ভারতীয় উপমহাদেশের উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে সারা বিশ্বের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন—সবকিছুই উঠে আসবে আজকের এই আয়োজনে। চলুন, সময়ের পাতা উল্টে এই দিনটির হারিয়ে যাওয়া গল্প ও গুরুত্বপূর্ণ শিরোনামগুলো জেনে নিই।

বাঙালি পরিমণ্ডল ও ভারতীয় উপমহাদেশ

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস হলো অন্তহীন সংগ্রাম, গৌরবময় সাংস্কৃতিক অর্জন এবং গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক অবিস্মরণীয় দলিল। বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশের জন্যই ২২শে জুলাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।

  • ১৯৪৭ — ভারতের জাতীয় পতাকার স্বীকৃতি: ব্রিটিশ রাজের কবল থেকে ভারতের স্বাধীনতা লাভের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগের কথা। ১৯৪৭ সালের ২২শে জুলাই ভারতের গণপরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তেরঙ্গা’ (Tiranga)-কে স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে গ্রহণ করে। পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার নকশা করা এই পতাকার কেন্দ্রে থাকা ঐতিহ্যবাহী গান্ধীবাদী চরকার পরিবর্তে স্থান পায় ‘অশোক চক্র’ (ধর্ম চক্র)। এই ঐতিহাসিক দিনটি একটি ঐক্যবদ্ধ ও সার্বভৌম জাতির নতুন গণতান্ত্রিক গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠে।
  • ১৯৫৪ — দাদরা মুক্তিকরণ: ১৯৪৭ সালেই উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পুরোপুরি শেষ হয়নি; পর্তুগিজরা তখনও বেশ কিছু অঞ্চল দখল করে রেখেছিল। ১৯৫৪ সালের এই দিনে, ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট অফ গোয়ানস’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’ (RSS)-সহ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে দাদরা (Dadra) অঞ্চলকে মুক্ত করতে এক দুঃসাহসিক অভিযান চালায়। বেসামরিক নাগরিকদের নেতৃত্বাধীন এই অভ্যুত্থান ছিল একটি বিশাল কৌশলগত বিজয়, যা পরবর্তীতে গোয়া, দমন ও দিউ-এর সম্পূর্ণ স্বাধীনতার পথ সুগম করে।
  • ২০২৪ — বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান: ২০২৪ সালের ২২শে জুলাই বাংলাদেশ তার আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী এক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ২১শে জুলাই সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত বিতর্কিত সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার রায় দেওয়ার পর, ২২শে জুলাই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন (গেজেট) জারি করে। তবে, শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ ততদিনে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং ছাত্র-জনতার ওপর মর্মান্তিক “জুলাই গণহত্যা”-র কারণে এক সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। ২২শে জুলাই ছিল সেই চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ, যখন প্রজ্ঞাপন জারি হওয়া সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে অস্বীকৃতি জানায়। এই অনমনীয় দৃঢ়তার ফলস্বরূপ আগস্ট মাসে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতন ঘটে।

বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু (উপমহাদেশ)

বিখ্যাত জন্ম

  • মুকেশ চন্দ মাথুর (১৯২৩): ভারতের দিল্লিতে জন্মগ্রহণকারী মুকেশ ভারতীয় ও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি প্লেব্যাক গায়ক হয়ে ওঠেন। বলিউডের “সোনালী যুগ”-এর সংজ্ঞায়িত কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি, যাঁকে ভালোবেসে কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ কাপুরের কণ্ঠ বলা হতো। তাঁর আবেগপূর্ণ, বিষাদময় ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর আজও পুরো উপমহাদেশের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

  • শ্রীরাম শঙ্কর অভয়ঙ্কর (১৯৩০): ভারতের উজ্জয়িনীতে জন্মগ্রহণকারী অভয়ঙ্কর ছিলেন একজন বিশ্ববিখ্যাত গণিতবিদ। বীজগণিতীয় জ্যামিতিতে তাঁর অগ্রণী কাজ সসীম গ্রুপ তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর প্রণীত “অভয়ঙ্করের অনুমিতি” (Abhyankar’s conjecture) বিশ্ব গণিত সম্প্রদায়ে এক স্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে গেছে।

বিখ্যাত মৃত্যু

  • ইন্দ্র লাল রায় (১৯১৮): ২২শে জুলাইয়ের সবচেয়ে অসাধারণ অথচ স্বল্পপরিচিত গল্পটি সম্ভবত ইন্দ্র লাল রায়ের মৃত্যুর। কলকাতার এক বিশিষ্ট বাঙালি জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণকারী রায় ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম এবং একমাত্র ভারতীয় ‘ফ্লাইং এস‘ (Flying Ace)। “ল্যাডি” (Laddie) ডাকনামে পরিচিত এই যুবককে ব্রিটিশ রয়্যাল ফ্লাইং কর্পস প্রথমে দুর্বল দৃষ্টিশক্তির অজুহাতে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু দমে যাননি তিনি। নিজের মোটরবাইক বিক্রি করে দ্বিতীয়বার ডাক্তারি পরীক্ষার ফি জোগাড় করেন, সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেন এবং একটি S.E.5a ফাইটার প্লেন নিয়ে আকাশে উড়াল দেন। ১৯১৮ সালের জুলাই মাসে মাত্র ১৩ দিনের অবিশ্বাস্য এক ব্যবধানে ১৯ বছর বয়সী এই তরুণ ১০টি জার্মান যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেন। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯১৮ সালের ২২শে জুলাই ফ্রান্সের কারভিনের আকাশে এক ভয়ংকর ডগফাইটে (যুদ্ধবিমানের লড়াই) তিনি নিহত হন। মরণোত্তর ‘ডিস্টিংগুইশড ফ্লাইং ক্রস’ খেতাবে ভূষিত এই বীরের ফ্রান্সের সমাধিস্থলে বাংলায় লেখা এক মর্মস্পর্শী এপিটাফ রয়েছে: “মহাবীরের সমাধি; সম্ভ্রম করো, স্পর্শ কোরো না।”

আন্তর্জাতিক দিবস ও পালনীয়

২২শে জুলাই দিনটি কেবল অতীতের জন্যই নয়, বরং বিজ্ঞান সচেতনতা এবং জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে বিশ্বব্যাপী আজও পালিত হয়।

  • পাই আসন্নমান দিবস (Pi Approximation Day): গণিতবিদ, শিক্ষক এবং বিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে এটি একটি বৈশ্বিক উৎসবের দিন। যেহেতু $22/7$ ভগ্নাংশটি গাণিতিক ধ্রুবক পাই ($\pi$)-এর একটি বহুল ব্যবহৃত আসন্নমান (Approximation), তাই ২২শে জুলাই (DD/MM ফরম্যাটে ২২/৭) তারিখটি গণিত, জ্যামিতি এবং স্টেম (STEM) শিক্ষাকে উদযাপন করার জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে।

  • বিশ্ব মস্তিষ্ক দিবস (World Brain Day): ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ নিউরোলজি (WFN) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই দিনটি স্নায়বিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়ানোর জন্য নিবেদিত। প্রতি বছর স্ট্রোক প্রতিরোধ থেকে শুরু করে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস এবং পারকিনসন্স রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মতো ভিন্ন ভিন্ন থিম নিয়ে এটি পালিত হয়, যার মূল বার্তা হলো—মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য একটি মৌলিক মানবাধিকার।

  • সারাওয়াক স্বাধীনতা দিবস (মালয়েশিয়া): মালয়েশিয়ার সারাওয়াক অঞ্চলের একটি প্রধান সরকারি ছুটির দিন। ১৯৬৩ সালের এই দিনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অঞ্চলটিকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিল, যার পরপরই এটি বৃহত্তর মালয়েশিয়া ফেডারেশন গঠনে সহায়তা করে।

বৈশ্বিক ইতিহাস

বৈশ্বিক ইতিহাস

উপমহাদেশের বাইরেও ২২শে জুলাই ছিল ব্যাপক রাজনৈতিক কূটচাল, এভিয়েশনের যুগান্তকারী আবিষ্কার এবং মানব ইতিহাসের কিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন ও চূড়ান্ত বিজয়ের সাক্ষী।

যুক্তরাষ্ট্র

  • ১৮৬২ — ইম্যানসিপেশন প্রোক্লেমেশন-এর খসড়া: আমেরিকান গৃহযুদ্ধ চলাকালীন, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর মন্ত্রিসভার কাছে ‘ইম্যানসিপেশন প্রোক্লেমেশন’ (দাসপ্রথা বিলুপ্তি ঘোষণা)-এর একেবারে প্রথম খসড়াটি উপস্থাপন করেন। যদিও তাঁকে এটি জনসমক্ষে প্রকাশ করার আগে একটি বড়সড় সামরিক বিজয়ের জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, তবে এই মুহূর্তটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার দিকে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক মোড়।

  • ১৯৩৩ — প্রথম একক বিশ্বভ্রমণ: আমেরিকান পাইলট উইলি পোস্ট তাঁর লকহিড ভেগা এয়ারক্রাফট ‘দ্য উইনি মে’ (Winnie Mae) নিয়ে নিউইয়র্কের ফ্লয়েড বেনেট ফিল্ডে অবতরণ করলে এভিয়েশন বা বিমান চলাচলের ইতিহাস চিরতরে বদলে যায়। তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে একাকী সমগ্র বিশ্ব প্রদক্ষিণ করেন। ১৫,৫৯৬ মাইলের এই শ্বাসরুদ্ধকর দীর্ঘ যাত্রা সম্পন্ন করতে তাঁর সময় লেগেছিল ঠিক ৭ দিন, ১৮ ঘণ্টা এবং ৪৯ মিনিট।

  • ১৯৩৭ — “কোর্ট-প্যাকিং”-এর পরাজয়: মার্কিন সিনেট প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের বিতর্কিত ‘জুডিশিয়াল প্রসিডিউরস রিফর্ম বিল’ বাতিল করে তাঁকে একটি বিশাল রাজনৈতিক ধাক্কা দেয়। রুজভেল্ট তাঁর ‘নিউ ডিল’ নীতিগুলো জোরপূর্বক বাস্তবায়ন করতে সুপ্রিম কোর্টে আরও বেশি বিচারক নিয়োগের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সিনেটের এই প্রত্যাখ্যান বিচার বিভাগের আদর্শিক ভারসাম্য রক্ষা করে।

ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্য

  • ১৪৫৬ — বেলগ্রেড অবরোধ: সাম্রাজ্যগুলোর এক বিশাল সংঘর্ষে, জ্যানোস হুনিয়াদির নেতৃত্বে হাঙ্গেরিয়ান বাহিনী সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের নেতৃত্বাধীন অগ্রসরমান অটোমান সাম্রাজ্যের বাহিনীকে বীরত্বের সাথে পরাস্ত করে। এই বিজয় ইউরোপে অটোমানদের বিস্তার কয়েক দশকের জন্য সাময়িকভাবে থামিয়ে দিয়েছিল।

  • ১৮৩৩ — দাসপ্রথা বিলোপ আইন: ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্স ‘স্ল্যাভেরি অ্যাবোলিশন অ্যাক্ট’-এর দ্বিতীয় পাঠ (Second reading) পাস করে। এই যুগান্তকারী আইনটি বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে ধীরে ধীরে, তবে নিশ্চিতভাবে দাসপ্রথা বাতিলের সূচনা করেছিল।

  • ১৯৪২ — গ্রসাকশন ওয়ারশ (The Grossaktion Warsaw): হলোকাস্টের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় এই দিনে শুরু হয়েছিল। নাৎসি জার্মানি ওয়ারশ ঘেটো থেকে ইহুদিদের পদ্ধতিগতভাবে গণ-নির্বাসন শুরু করে। হাজার হাজার নিরীহ পুরুষ, নারী ও শিশুকে প্রতিদিন ট্রেনে করে ট্রেবলিংকা (Treblinka) মৃত্যুশিবিরে পাঠানো হতো।

  • ১৯৪৪ — মাজদানেক মুক্তিকরণ: এর ঠিক উল্টোদিকে, ১৯৪৪ সালের ২২শে জুলাই অগ্রসরমান সোভিয়েত বাহিনী পোল্যান্ডের মাজদানেক (Majdanek) কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পৌঁছায়। এটিই ছিল প্রথম কোনো বড় নাৎসি মৃত্যুশিবির যা মুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে সারা বিশ্ব হলোকাস্টের ভয়াবহতার অকাট্য প্রমাণ প্রথম নিজ চোখে দেখতে পায়।

  • ২০১১ — নরওয়েতে সন্ত্রাসী হামলা: অকল্পনীয় এক অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসের ঘটনায়, উগ্র ডানপন্থী চরমপন্থী অ্যান্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক নরওয়ের রাজধানী অসলোতে একটি গাড়িবোমা বিস্ফোরণ ঘটায় এবং এরপর উটোয়া (Utøya) দ্বীপে গিয়ে একটি যুব গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে নির্বিচারে গুলি চালায়। এই জোড়া হামলায় ৭৭ জন নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নরওয়েতে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।

  • ২০১৩ — রাজকীয় উত্তরাধিকারীর জন্ম: লন্ডনে প্রিন্স উইলিয়াম এবং ক্যাথরিনের (কেট মিডলটন) প্রথম সন্তান, প্রিন্স জর্জ আলেকজান্ডার লুই অফ কেমব্রিজের জন্ম হয়। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ সিংহাসনের তৃতীয় উত্তরাধিকারী নিশ্চিত হয়।

রাশিয়া / সোভিয়েত ইউনিয়ন

  • ১৯৫১ — প্রথম মহাকাশচারী সারমেয়: কাপুস্টিন ইয়ার সুবিধা থেকে উৎক্ষেপণ করে, সোভিয়েত মহাকাশ-কুকুর ডেজিক এবং সিগান (Dezik and Tsygan) সাব-অরবিটাল স্পেসফ্লাইটে সফলভাবে উৎক্ষেপিত প্রথম কুকুর হয়ে ওঠে। কয়েক বছর পর মহাকাশে যাওয়া লাইকার মর্মান্তিক পরিণতির মতো না হয়ে, এই দুই কুকুরই নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে এবং মানুষের মহাকাশ অনুসন্ধানের পথ প্রশস্ত করে।

  • ১৯৮৭ — গর্বাচেভের মিসাইল নিষেধাজ্ঞা: সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ নিঃশর্তভাবে মাঝারি-পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিষিদ্ধ করতে সম্মত হয়ে একটি সাহসী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনাকে অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছিল।

চীন

  • ১৯৭৭ — দেং জিয়াওপিংয়ের প্রত্যাবর্তন: উত্তাল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় ক্ষমতাচ্যুত ও কোণঠাসা হওয়ার পর, দেং জিয়াওপিংকে আনুষ্ঠানিকভাবে চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টি তার নেতৃত্বের পদগুলোতে পুনর্বহাল করে। এই যুগান্তকারী প্রত্যাবর্তনই চীনের বিশাল অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বিশ্ববাজারের সাথে যুক্ত হওয়ার মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা

  • ১৯৮৩ (অস্ট্রেলিয়া) — প্রথম একক হেলিকপ্টার বিশ্বভ্রমণ: অস্ট্রেলিয়ান বৈমানিক ডিক স্মিথ হেলিকপ্টারে চড়ে প্রথম একক বিশ্ব প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করেন। প্রায় এক বছর দীর্ঘ যাত্রার পর তিনি এই দিনে সিডনিতে ফিরে আসেন।

  • ১৯৫০ (কানাডা) — একজন নেতার বিদায়: কানাডার ইতিহাসের দশম এবং সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদী প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম লিয়ন ম্যাকেঞ্জি কিং (যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সফলভাবে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন) মৃত্যুবরণ করেন।

বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত

  • ১৯৯২ (কলম্বিয়া): কুখ্যাত মাদকসম্রাট পাবলো এসকোবার লা ক্যাথেড্রাল (La Catedral) থেকে পালিয়ে যায়—যে বিলাসবহুল কারাগারটি সে নিজের জন্যই নকশা করেছিল। এর ফলে দেশব্যাপী একটি বিশাল চিরুনি অভিযান শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৯৩ সালে তার মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়।

  • ২০০৩ (ইরাক): ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের তীব্র পরিণতির মধ্যে, ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও কুখ্যাত দুই ছেলে—উদে এবং কুসে—মসুল শহরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে তিন ঘণ্টার এক তুমুল বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

বিশ্বজুড়ে উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যু

২২শে জুলাই দিনটিতে আধুনিক ইতিহাসের বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান মস্তিষ্ক, কুখ্যাত অপরাধী এবং জনপ্রিয় বিনোদন তারকার জন্ম ও মৃত্যু হয়েছে।

বিখ্যাত জন্ম

  • গ্রেগর মেন্ডেল (১৮২২–১৮৮৪): অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যে জন্মগ্রহণকারী এই পথপ্রদর্শক অগাস্টিনিয়ান সন্ন্যাসী পরবর্তীতে “আধুনিক জেনেটিক্সের জনক” হিসেবে মরণোত্তর খ্যাতি লাভ করেন। মটরশুঁটি গাছ নিয়ে তাঁর নিভৃত অথচ যুগান্তকারী পরীক্ষাগুলোই বংশগতির মূল নিয়মগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিল।

  • এমা লাজারাস (১৮৪৯–১৮৮৭): প্রতিভাধর এই ইহুদি-আমেরিকান কবি তাঁর লেখা সনেট ‘দ্য নিউ কলোসাস’ (The New Colossus)-এর জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। তাঁর লেখা সেই অমর কথাগুলো স্ট্যাচু অফ লিবার্টির পাদদেশে খোদাই করা আছে, যা অভিবাসীদের স্বাগত জানানোর মার্কিন আদর্শকে সংজ্ঞায়িত করে।

  • আলেকজান্ডার ক্যাল্ডার (১৮৯৮–১৯৭৬): এই উদ্ভাবনী মার্কিন ভাস্কর এবং শিল্পী “মোবাইল” (Mobile) আবিষ্কার করে আধুনিক শিল্পকলায় এক বিপ্লব নিয়ে আসেন। তাঁর এই গতিশীল ভাস্কর্যগুলো এমন নিখুঁতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ছিল যে, তা বাতাসের স্রোতের সাথে সাথে নড়াচড়া করতে পারত।

  • ড্যানি গ্লোভার (১৯৪৬–বর্তমান): অত্যন্ত প্রশংসিত আমেরিকান অভিনেতা, পরিচালক এবং রাজনৈতিক কর্মী। লিথাল ওয়েপন (Lethal Weapon) চলচ্চিত্র সিরিজে ‘রজার মুরটফ’-এর আইকনিক ভূমিকার জন্য তিনি সর্বাধিক পরিচিত।

  • উইলেম ড্যাফো (১৯৫৫–বর্তমান): অস্কার মনোনীত এক অসাধারণ বহুমুখী মার্কিন অভিনেতা, যিনি প্লাটুন, স্পাইডার-ম্যান এবং দ্য লাইটহাউস-এর মতো চলচ্চিত্রগুলোতে তাঁর তীব্র ও গভীর চরিত্রায়নের জন্য সুপরিচিত।

  • সেলেনা গোমেজ (১৯৯২–বর্তমান): আমেরিকান পপ আইকন, অভিনেত্রী (ওনলি মার্ডারস ইন দ্য বিল্ডিং খ্যাত), প্রযোজক এবং ইউনিসেফের প্রভাবশালী শুভেচ্ছাদূত, যিনি তাঁর কিশোর বয়স থেকেই বৈশ্বিক বিনোদন জগৎ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

বিখ্যাত মৃত্যু

  • জন ডিলিঞ্জার (১৯০৩–১৯৩৪): মহামন্দার (Great Depression) যুগের কুখ্যাত ব্যাংক ডাকাত এবং এফবিআই-এর (FBI) তালিকাভুক্ত “এক নম্বর পাবলিক এনিমি” এই দিনে এক সহিংস পরিণতির মুখোমুখি হয়। শিকাগোর বায়োগ্রাফ থিয়েটারের বাইরে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে ফেডারেল এজেন্টদের অতর্কিত হামলায় সে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।

  • উইলিয়াম লিয়ন ম্যাকেঞ্জি কিং (১৮৭৪–১৯৫০): কানাডার দশম প্রধানমন্ত্রী, যিনি গ্রেট ডিপ্রেশন (মহামন্দা) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কানাডাকে অত্যন্ত সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

  • কার্ল স্যান্ডবার্গ (১৮৭৮–১৯৬৭): তিনবারের পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী কবি, জীবনীকার এবং সাংবাদিক। আব্রাহাম লিংকনকে নিয়ে লেখা তাঁর বিশাল, বহু-খণ্ডের জীবনীটি আজও আমেরিকান ঐতিহাসিক সাহিত্যের একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত হয়।

  • এস্টেল গেটি (১৯২৩–২০০৮): জনপ্রিয় মার্কিন অভিনেত্রী, যিনি হিট সিটকম দ্য গোল্ডেন গার্লস-এ সোফিয়া পেট্রিলোর অবিস্মরণীয়, এমি-বিজয়ী চরিত্রে অভিনয় করে লাখো মানুষের মুখে অন্তহীন হাসি ফুটিয়েছিলেন।

আপনি কি জানেন? (মজার তথ্য)

কথোপকথন জমিয়ে তোলার মতো কিছু চমৎকার বিষয় খুঁজছেন? এখানে ২২শে জুলাই ঘটে যাওয়া তিনটি স্বল্পপরিচিত তথ্য দেওয়া হলো:

  • বেসবলের সবচেয়ে বড় মাইলফলক: ১৯২৩ সালের ২২শে জুলাই, আমেরিকান বেসবল কিংবদন্তি ওয়াল্টার জনসন মেজর লিগ বেসবলের (MLB) ইতিহাসে প্রথম পিচার হিসেবে ৩,০০০ ব্যাটারকে স্ট্রাইক আউট করার অনন্য রেকর্ড গড়েন। তাঁর ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত স্ট্রাইকআউট রেকর্ডটি এতটাই হতবাক করার মতো ছিল যে, তা একটানা ৬০ বছর ধরে অক্ষত ছিল।

  • “সবচেয়ে জঘন্য সিনেমা”: অদ্ভুত স্বভাবের পরিচালক এড উড পরিচালিত এবং বেলা লুগোসির শেষ অভিনয়ে সমৃদ্ধ কিংবদন্তি কাল্ট ক্লাসিক ‘প্ল্যান ৯ ফ্রম আউটার স্পেস’ (Plan 9 from Outer Space) ১৯৫৯ সালের এই দিনে ব্যাপকভাবে মুক্তি পায়। অত্যন্ত নিম্ন-বাজেটের এবং অদক্ষ নির্মাণের কারণে এটি এতটাই বিখ্যাত হয়েছিল যে, এটি মূলত “অ্যাতটাই খারাপ যে সেটাই ভালো” (so bad it’s good) সিনেমাটিক ঘরানার পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।

  • আন্তঃমহাদেশীয় আমেরিকার প্রকৃত সূচনা: বেশিরভাগ মানুষ উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অতিক্রম করার কৃতিত্ব লুইস এবং ক্লার্ককে দিয়ে থাকেন। কিন্তু, ১৭৯৩ সালের ২২শে জুলাই স্কটিশ অভিযাত্রী আলেকজান্ডার ম্যাকেঞ্জি কানাডা হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছান। তিনিই ইতিহাসের প্রথম লিপিবদ্ধ মানব যিনি মেক্সিকোর উত্তরে উত্তর আমেরিকার একটি ট্রান্সকন্টিনেন্টাল (আন্তঃমহাদেশীয়) ক্রসিং সম্পন্ন করেন। অর্থাৎ, তিনি লুইস এবং ক্লার্ক অভিযানের এক দশকেরও বেশি সময় আগে এই অসাধ্য সাধন করেছিলেন।

শেষ কথা

২২শে জুলাই দিনটি মানুষের অদম্য টিকে থাকার ক্ষমতা, উদ্ভাবনী সত্তা এবং স্বাধীনতার অন্তহীন সাধনার এক গভীর প্রমাণ। ফ্রান্সের আকাশে জীবন বিলিয়ে দেওয়া বাঙালি ফ্লাইং এস ইন্দ্র লাল রায় হোন, একাকী বিশ্বভ্রমণ করে দুনিয়াকে ছোট করে আনা উইলি পোস্ট হোন, কিংবা বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানের সেই রাজনৈতিক ভূমিকম্পই হোক—এই দিনটি আমাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেয় সেই ঘটনাগুলোর কথা, যা আমাদের এই আধুনিক বিশ্বকে রূপ দিয়েছে।

ইতিহাস কেবলই তারিখের একটি শুষ্ক তালিকা নয়; ইতিহাস হলো কোটি কোটি মানুষের জীবনযাপনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ওয়ারশ-এর সেই মর্মান্তিক ক্ষতি, আর মুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিজয়োল্লাসপূর্ণ পদচিহ্ন। ২২শে জুলাইয়ের বিখ্যাত সব জন্ম, বেদনাদায়ক মৃত্যু এবং বৈশ্বিক শিরোনামগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমরা ঠিক কোথা থেকে এসেছি—এবং হয়তো সামনে কোথায় যাচ্ছি, তার একটি অত্যন্ত পরিষ্কার ধারণা পাই।

সর্বশেষ