পৃথিবীর আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ডেলিভারি রুম কাঁপিয়ে নবজাতকের চিৎকার করে কেঁদে ওঠা কেবল একটি সাধারণ শব্দ নয়। এটি একটি নতুন জীবনের স্পন্দন, একটি স্বাধীন অস্তিত্বের ঘোষণা। গর্ভাবস্থায় দীর্ঘ নয় মাস শিশু মায়ের জঠরে জলজ পরিবেশে (Water Environment) বেড়ে ওঠে। কিন্তু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে হঠাৎ করেই বায়বীয় পরিবেশে (Air Environment) খাপ খাইয়ে নিতে হয়। প্রকৃতির এই বিশাল পালাবদলে টিকে থাকার জন্য কান্না অপরিহার্য।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রাই’ বা প্রথম কান্না। এই কান্নার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় শিশুটি সুস্থ কিনা, তার হৃদপিণ্ড সচল কিনা এবং সে নিজে শ্বাস নিতে পারছে কিনা। এই দীর্ঘ আর্টিকেলে আমরা জানব নবজাতকের কান্নার পেছনের গভীর বিজ্ঞান, সি-সেকশন ও নরমাল ডেলিভারির প্রভাব, এবং ‘গোল্ডেন মিনিট’-এর গুরুত্ব সম্পর্কে।
১. নবজাতকের কান্নার গভীর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, নবজাতকের প্রথম কান্না তার সুস্থতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু এই কান্নার পেছনে কাজ করে জটিল শারীরিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া।
ফুসফুসের রূপান্তর (Transition of Lungs)
গর্ভাবস্থায় শিশু যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন সে নিজে শ্বাস নেয় না। তার ফুসফুস থাকে সংকুচিত এবং ‘অ্যামনিওটিক ফ্লুইড’ নামক তরলে পূর্ণ। এ সময় মায়ের প্লাসেন্টা বা অমরা এবং আম্বিলিকাল কর্ড (নাড়)-এর মাধ্যমে মায়ের রক্ত থেকে শিশু অক্সিজেন পায়। একে বলা হয় ‘ফিটাল সার্কুলেশন’ (Fetal Circulation)। এ অবস্থায় শিশুর ফুসফুস অনেকটা ভেজা স্পঞ্জের মতো থাকে এবং রক্তনালীগুলো ফুসফুসকে বাইপাস করে চলে যায়।
জন্মের পর যখন নাড় কেটে দেওয়া হয়, তখন মায়ের শরীর থেকে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। শিশু যখন প্রথমবারের মতো জোরে কেঁদে ওঠে, তখন তার বুকের পেশি সংকুচিত হয় এবং ফুসফুসের ভেতর থাকা তরল বেরিয়ে এসে সেখানে বাতাস প্রবেশের জায়গা করে দেয়। কান্নার ফলে ফুসফুস প্রসারিত হয় (Lung Expansion) এবং লক্ষ লক্ষ ছোট বায়ুথলি বা অ্যালভিওলাই (Alveoli) বেলুনের মতো ফুলে ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘মেকানিক্যাল ক্লিয়ারেন্স অফ লাং ফ্লুইড’। কান্না না করলে এই বায়ুথলিগুলো খুলবে না এবং শিশু শ্বাস নিতে পারবে না।
রাসায়নিক সংকেত (Chemical Trigger)
নাড় কাটার পর শিশুর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়তে থাকে। রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের এই বৃদ্ধি শিশুর মস্তিষ্কের ‘মেডুলা অবলংগাটা’ (Medulla Oblongata)-তে অবস্থিত শ্বাসকেন্দ্রকে (Respiratory Center) শক্তিশালী সংকেত পাঠায়। মস্তিষ্ক তখন শরীরকে নির্দেশ দেয়—”বেঁচে থাকতে হলে এখনই শ্বাস নাও!” এই নির্দেশের ফলেই শিশু চিৎকার করে কেঁদে ওঠে এবং প্রথম বাতাস টেনে নেয়।
২. পরিবেশগত পরিবর্তন ও ‘কোল্ড শক’
মায়ের গর্ভের পরিবেশ এবং বাইরের পৃথিবীর পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই আকস্মিক পরিবর্তন কান্নার অন্যতম কারণ।
- তাপমাত্রার পতন: গর্ভের ভেতর শিশু একটি উষ্ণ (প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস), অন্ধকার এবং শান্ত পরিবেশে থাকে। কিন্তু জন্মের সাথে সাথেই সে একটি অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা (২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পরিবেশে এসে পড়ে। হঠাৎ এই ১০-১৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার পতন শিশুর ত্বকে একধরণের শিহরণ জাগায়, যাকে চিকিৎসকরা ‘কোল্ড শক’ (Cold Shock) বলেন। এই ধাক্কা শিশুকে কাঁদতে বাধ্য করে, যা তার শরীরকে গরম করতে এবং মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়াকে সচল করতে সাহায্য করে।
- আলো ও স্পর্শ: গর্ভের অন্ধকার থেকে হঠাৎ উজ্জ্বল আলো এবং মানুষের স্পর্শ শিশুর সংবেদনশীল ত্বকে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা কান্নার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
৩. নরমাল ডেলিভারি বনাম সি-সেকশন: কান্নার তারতম্য
শিশুর জন্মের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তার কান্নার ধরন এবং ফুসফুস পরিষ্কার হওয়ার প্রক্রিয়ায় পার্থক্য দেখা যায়। এটি বোঝা অভিভাবকদের জন্য জরুরি।
ভ্যাজাইনাল বা নরমাল ডেলিভারি
নরমাল ডেলিভারির সময় শিশু যখন বার্থ ক্যানেল বা জন্মপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে, তখন মায়ের শরীরের চাপে শিশুর বুকের খাঁচায় (Chest Wall) একটি শক্তিশালী চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপকে বলা হয় ‘ভ্যাজাইনাল স্কুইজ’ (Vaginal Squeeze)।
- সুবিধা: এই প্রাকৃতিক চাপের ফলে শিশুর ফুসফুসে জমে থাকা অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের একটি বড় অংশ মুখ ও নাক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে নরমাল ডেলিভারিতে জন্ম নেওয়া শিশুরা সাধারণত দ্রুত শ্বাস নিতে পারে এবং তাদের কান্না বেশ জোরালো হয়।
সি-সেকশন বা সিজারিয়ান ডেলিভারি
সিজারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুরা বার্থ ক্যানেলের সেই প্রাকৃতিক চাপটি পায় না। ফলে তাদের ফুসফুসে কিছু পরিমাণ তরল থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- ঝুঁকি: একারণে সিজারিয়ান শিশুদের অনেক সময় ‘ট্রানজিয়েন্ট ট্যাকিপনিয়া অফ নিউবর্ন’ (TTN) বা ক্ষণস্থায়ী শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এদের কান্না শুরু করতে বা শ্বাস স্বাভাবিক করতে চিকিৎসকদের অনেক সময় সাকশন (Suction) মেশিনের সাহায্য নিতে হয়।
৪. ‘গোল্ডেন মিনিট’ (The Golden Minute): জন্মের প্রথম ৬০ সেকেন্ড

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং নিওনেটাল রিসাসিটেশন প্রোটোকল অনুযায়ী, জন্মের পর প্রথম এক মিনিটকে ‘গোল্ডেন মিনিট’ বলা হয়। এই ৬০ সেকেন্ড শিশুর জীবন, মৃত্যু বা আজীবনের পঙ্গুত্ব নির্ধারণ করতে পারে।
- প্রথম ৩০ সেকেন্ড: শিশুকে দ্রুত তোয়ালে দিয়ে মুছে শুকানো হয় এবং উষ্ণ করা হয়। এই ঘর্ষণ বা স্টিমুলেশন শিশুকে কাঁদতে সাহায্য করে।
- পরবর্তী ৩০ সেকেন্ড: যদি শিশু না কাঁদে বা শ্বাস না নেয়, তবে ডাক্তাররা আর অপেক্ষা করেন না। তারা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস (Bag and Mask Ventilation) শুরু করেন।
এই এক মিনিটের মধ্যে শিশু কেঁদে শ্বাস শুরু করতে ব্যর্থ হলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব ঘটতে পারে (Hypoxia), যা ভবিষ্যতে ‘সেরিব্রাল পালসি’ বা মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণ হতে পারে।
৫. অ্যাপগার স্কোর: শিশুর সুস্থতার পরিমাপক
শিশুর জন্মের পর চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থা বোঝার জন্য একটি বিশেষ স্কোরিং সিস্টেম ব্যবহার করেন, যার নাম ‘অ্যাপগার স্কোর’ (APGAR Score)। ১৯৫২ সালে ডা. ভার্জিনিয়া অ্যাপগার এই পদ্ধতিটি চালু করেন। জন্মের ১ মিনিট এবং ৫ মিনিট পর এই স্কোর দেখা হয়।
নিচে অ্যাপগার স্কোরের একটি বিস্তারিত টেবিল দেওয়া হলো, যেখানে দেখা যাবে কান্না কতটা গুরুত্বপূর্ণ:
| সূচক (Criteria) | ০ পয়েন্ট (বিপদজনক) | ১ পয়েন্ট (মাঝারি) | ২ পয়েন্ট (সুস্থ/স্বাভাবিক) |
|---|---|---|---|
| Appearance (ত্বকের রঙ) | পুরো শরীর নীল বা ফ্যাকাশে | শরীর গোলাপি, কিন্তু হাত-পা নীল | সম্পূর্ণ শরীর গোলাপি |
| Pulse (হৃদস্পন্দন) | নেই | ১০০-এর নিচে | ১০০-এর উপরে |
| Grimace (প্রতিক্রিয়া) | কোনো প্রতিক্রিয়া নেই | সামান্য মুখভঙ্গি | জোরে কান্না বা হাঁচি/কাশি |
| Activity (পেশির টান) | নিস্তেজ বা শিথিল | সামান্য নড়াচড়া | সক্রিয় হাত-পা ছোঁড়া |
| Respiration (শ্বাস-প্রশ্বাস) | নেই | ধীর বা অনিয়মিত শ্বাস | জোরালো কান্না |
টেবিল থেকে দেখা যাচ্ছে, শিশু যদি জোরে কাঁদে, তবে সে রেসপিরেশন এবং গ্রিমেস—উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ণ নম্বর পায়। অর্থাৎ, জোরালো কান্না শিশুর সুস্থ হার্ট রেট, ভালো পেশিশক্তি এবং সচল স্নায়ুতন্ত্রের নির্দেশক।
৬. শিশু জন্মমাত্রই না কাঁদলে কী ঘটে?

অনেক সময় দেখা যায়, জন্মের পর শিশু সঙ্গে সঙ্গে কাঁদে না। এটি বাবা-মা এবং চিকিৎসকদের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ। শিশু না কাঁদার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ থাকতে পারে:
- বার্থ অ্যাসফিক্সিয়া (Birth Asphyxia): এটি এমন একটি অবস্থা যখন জন্মের আগে বা পরে শিশু পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। নাড় গলায় পেঁচিয়ে গেলে বা প্লাসেন্টা আগে আলাদা হয়ে গেলে এমন হতে পারে। এটি দ্রুত চিকিৎসার দাবি রাখে।
- মায়ের ওষুধের প্রভাব: প্রসব বেদনার সময় মা যদি কোনো কড়া ব্যথানাশক বা সিডেটিভ ওষুধ গ্রহণ করেন, তবে তা শিশুর শরীরে প্রবেশ করে তাকে নিস্তেজ করে দিতে পারে।
- প্রিম্যাচিউর জন্ম: সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের ফুসফুস পুরোপুরি গঠিত হয় না এবং তাদের পেশিশক্তি কম থাকে, ফলে তারা জোরে কাঁদতে পারে না।
- শ্বাসনালীতে বাাধা: অনেক সময় মিউকোনিয়াম (শিশুর প্রথম মল) বা অতিরিক্ত তরল শিশুর শ্বাসনালীতে আটকে যায়। চিকিৎসকরা তখন সাকশন দিয়ে তা পরিষ্কার করেন।
৭. সামাজিক ভুল ধারণা বনাম আধুনিক বাস্তবতা
আমাদের সমাজে নবজাতকের কান্না নিয়ে বেশ কিছু কুসংস্কার বা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, যা অনেক সময় ক্ষতিকর হতে পারে।
- ভুল ধারণা: শিশু কাঁদছে মানেই সে কষ্টে আছে বা ক্ষুধার্ত।
- বাস্তবতা: জন্মের প্রথম কান্নাটি কষ্টের নয়, বরং এটি শ্বাস নেওয়ার প্রচেষ্টা। তবে পরবর্তী সময়ে কান্না তার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম (ক্ষুধা, ভেজা ডায়াপার, বা ঘুমের জন্য)।
- ভুল ধারণা: জন্মের পর শিশুকে উল্টো করে ঝুলিয়ে থাপ্পড় দেওয়া হয় যাতে সে কাঁদে।
- বাস্তবতা: এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উল্টো করে ঝোলানো বা আঘাত করার ফলে শিশুর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে চিকিৎসকরা ‘ট্যাকটাইল স্টিমুলেশন’ (Tactile Stimulation) ব্যবহার করেন—অর্থাৎ আলতো করে শিশুর পিঠে ঘষে বা পায়ের তলায় টোকা দিয়ে কান্নার উদ্রেক করেন।
শেষ কথা: কান্নাই যখন জীবনের শুরু
পরিশেষে বলা যায়, নবজাতকের প্রথম কান্না কোনো দুঃখের প্রকাশ নয়, বরং এটি তার জীবনের জয়ধ্বনি। এই কান্নার মাধ্যমেই সে জানান দেয়—সে পৃথিবী জয় করতে এসেছে, সে সুস্থ আছে এবং সে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে প্রস্তুত। প্রকৃতি এবং বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত সমন্বয় ঘটে এই একটি মুহূর্তের মধ্যে।
যদি কোনো শিশু জন্মের পর না কাঁদে, তবে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকদের ওপর আস্থা রাখা উচিত। আধুনিক নিওনেটাল কেয়ার বা নবজাতক পরিচর্যা ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চালু করে শিশুকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। তাই ডেলিভারি রুমে শিশুর সেই গগণবিদারী কান্নার আওয়াজই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর ও স্বস্তিদায়ক শব্দ, যা চিকিৎসক ও বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটায়।


