রেকর্ড ভাঙল সোনার দাম! ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ বাংলাদেশে ভরি প্রতি ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেল – এক নজরে সম্পূর্ণ মূল্য তালিকা

সর্বাধিক আলোচিত

বাংলাদেশে স্বর্ণের বাজার নতুন মাত্রা স্পর্শ করেছে ডিসেম্বর ২০২৫-এ । বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) কর্তৃক ঘোষিত সর্বশেষ মূল্য তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৭ টাকায় উন্নীত হয়েছে । আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ স্বর্ণের (‘তেজাবি’ বা পিওর গোল্ড) দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে । রূপার দামও একইভাবে বেড়েছে, যা দেশের জুয়েলারি বাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে ।

১৯ ডিসেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশে সোনার বর্তমান মূল্য

বাজুস কর্তৃক ঘোষিত সর্বশেষ মূল্য তালিকা অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে । এই মূল্যের মধ্যে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস কর্তৃক নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মেকিং চার্জ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে । তবে অলংকারের ডিজাইন ও মানভেদে স্বর্ণকাররা অতিরিক্ত মেকিং চার্জ আরোপ করতে পারেন ।

সোনার দাম (সকল একক হিসাবে)

ক্যারেট প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) প্রতি গ্রাম প্রতি আনা (১৬ আনা = ১ ভরি) প্রতি রতি (৬৪ রতি = ১ ভরি)
২২ ক্যারেট ২,১৭,০৬৭ টাকা ১৮,৬০৬ টাকা ১৩,৫৬৭ টাকা ৩,৩৯২ টাকা
২১ ক্যারেট ২,০৭,২১১ টাকা ১৭,৭৬০ টাকা ১২,৯৫১ টাকা ৩,২৩৮ টাকা
১৮ ক্যারেট ১,৭৭,৬৪৩ টাকা ১৫,২৩০ টাকা ১১,১০৩ টাকা ২,৭৭৬ টাকা
সনাতন পদ্ধতি ১,৪৭,৯০০ টাকা ১২,৬৭৬ টাকা ৯,২৪৪ টাকা ২,৩১১ টাকা

 

রূপার মূল্য তালিকা ২০২৫

স্বর্ণের পাশাপাশি রূপার দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে বাংলাদেশের বাজারে । বাজুস কর্তৃক নির্ধারিত রূপার মূল্য তালিকা বিভিন্ন ক্যারেটের জন্য আলাদাভাবে প্রযোজ্য ।

রূপার দাম (সকল একক হিসাবে)

ক্যারেট প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) প্রতি গ্রাম প্রতি আনা (১৬ আনা = ১ ভরি) প্রতি রতি (৬৪ রতি = ১ ভরি)
২২ ক্যারেট ৪,৫৭২ টাকা ৩৯২ টাকা ২৮৬ টাকা ৭১ টাকা
২১ ক্যারেট ৪,৩৬২ টাকা ৩৭৪ টাকা ২৭৩ টাকা ৬৮ টাকা
১৮ ক্যারেট ৩,৭৩২ টাকা ৩২০ টাকা ২৩৩ টাকা ৫৮ টাকা
সনাতন পদ্ধতি ২,৭৯৯ টাকা ২৪০ টাকা ১৭৫ টাকা ৪৪ টাকা

 

স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির কারণ

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে । বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মার্কিন ডলারের ওঠানামা, এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা স্বর্ণের দামকে প্রভাবিত করে । বাংলাদেশে স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ স্বর্ণের সরবরাহ সীমিত থাকায় এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে ।

মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণসমূহ

  • আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের প্রতি আউন্স মূল্য ৫ লাখ ২৯ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে

  • বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি

  • স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ স্বর্ণের (‘তেজাবি’) দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি

  • সরকারি নিয়ন্ত্রণের অভাবে বাজুস কর্তৃক ঘন ঘন মূল্য সমন্বয়

বাজুসের ভূমিকা ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) দেশের স্বর্ণ বাজারে কার্যকরভাবে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাখে । সংগঠনটি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত স্বর্ণের দাম সমন্বয় করে থাকে । ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে একাধিকবার স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি করেছে বাজুস, যার মধ্যে সর্বশেষ বৃদ্ধি ছিল ১৩ ডিসেম্বর, যখন ভরি প্রতি ৩ হাজার ৪৫৩ টাকা বাড়ানো হয় ।

স্বর্ণ ক্রয়ের সময় বিবেচ্য বিষয়

বাংলাদেশে স্বর্ণ ক্রয়ের সময় ক্রেতাদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা উচিত। হলমার্ক যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ হলমার্কযুক্ত স্বর্ণ বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা প্রদান করে । মেকিং চার্জ অলংকারের ডিজাইনভেদে ৬ শতাংশ থেকে অনেক বেশি হতে পারে, তাই ক্রয়ের পূর্বে স্পষ্টভাবে জেনে নেওয়া প্রয়োজন । নির্ভরযোগ্য জুয়েলারি দোকান থেকে ক্রয় করা এবং সঠিক বিল ও ওয়ারেন্টি কার্ড সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রেতাদের জন্য পরামর্শ

  • স্বর্ণ ক্রয়ের পূর্বে বাজুসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ মূল্য যাচাই করুন

  • হলমার্ক সনদপত্র এবং ক্যারেট নিশ্চিত করুন

  • মেকিং চার্জ, ভ্যাট ও অন্যান্য খরচ বিস্তারিত জেনে নিন

  • বিশ্বস্ত ও প্রতিষ্ঠিত জুয়েলারি দোকান থেকে ক্রয় করুন

  • ক্রয়ের সময় সম্পূর্ণ বিল এবং ওয়ারেন্টি কার্ড সংগ্রহ করুন

ভবিষ্যৎ প্রবণতা ও বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্বর্ণের দাম আগামী মাসগুলোতে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে । বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক টেনশন স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে । বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, যদিও স্বল্পমেয়াদী মূল্যের ওঠানামা ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

স্বর্ণ বনাম রূপা: কোনটি ভালো বিনিয়োগ?

স্বর্ণ এবং রূপা উভয়েরই নিজস্ব সুবিধা রয়েছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। স্বর্ণ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল এবং মূল্যবান থাকে, যা সম্পদ সংরক্ষণের জন্য আদর্শ । রূপা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য উপযুক্ত, তবে এর মূল্যের ওঠানামা স্বর্ণের চেয়ে বেশি । বিনিয়োগকারীদের উচিত তাদের আর্থিক লক্ষ্য, ঝুঁকি সহনশীলতা এবং বাজেট বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

পরিমাপ পদ্ধতি: ভরি, গ্রাম, আনা ও রতি

বাংলাদেশে স্বর্ণ ও রূপা পরিমাপের জন্য প্রধানত চারটি একক ব্যবহৃত হয়: ভরি, গ্রাম, আনা এবং রতি। ১ ভরি সমান ১১.৬৬৪ গ্রাম, যা মেট্রিক পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করা যায় । ১ ভরি = ১৬ আনা এবং ১ আনা = ৪ রতি, অর্থাৎ ১ ভরি = ৬৪ রতি। গ্রাম হচ্ছে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরিমাপের একক, যা বাজুসের অফিসিয়াল মূল্য তালিকায় ব্যবহৃত হয় ।

পরিমাপ রূপান্তর সূত্র

একক সমতুল্য
১ ভরি ১১.৬৬৪ গ্রাম
১ ভরি ১৬ আনা
১ ভরি ৬৪ রতি
১ আনা ০.৭২৯ গ্রাম
১ আনা ৪ রতি
১ রতি ০.১৮২ গ্রাম

 

সরকারি নীতি ও নিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশ সরকার স্বর্ণের উপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছে, যা ক্রেতাদের চূড়ান্ত মূল্যের সাথে যুক্ত হয় । তবে স্বর্ণ বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি তদারকির অভাব রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন । এর ফলে বাজুস নিয়মিত মূল্য বৃদ্ধি করতে পারছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। কার্যকর মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ বাজার মনিটরিং প্রয়োজন বলে অর্থনীতিবিদরা মত প্রকাশ করেছেন।

শেষ কথা

বাংলাদেশে স্বর্ণ ও রূপার বাজার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরি প্রতি ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা অতিক্রম করেছে । আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব, স্থানীয় চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা, এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণের অভাব এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ । ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের উচিত সতর্কতার সাথে বাজার পর্যবেক্ষণ করা, হলমার্কযুক্ত স্বর্ণ ক্রয় করা, এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সর্বশেষ মূল্য তথ্য যাচাই করা। ভবিষ্যতে স্বর্ণের দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, তাই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ