বাংলার আধুনিক শিল্পকলার ইতিহাসে এস এম সুলতান (শেখ মোহাম্মদ সুলতান) এক ব্যতিক্রমী, রহস্যময় ও কালজয়ী নাম। বিংশ শতাব্দীতে এই জনপদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর (১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ), ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল সব ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। এই ঘটনাপ্রবাহ তৎকালীন শিল্পকলায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বা পটুয়া কামরুল হাসানের ক্যানভাসে যখন দুর্ভিক্ষের তীব্রতা, অনাহারী মানুষের কঙ্কালসার দেহ এবং শোষণের করুণ চিত্র প্রবল বাস্তবতায় মূর্ত হয়ে উঠছিল, ঠিক সেই একই ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে এস এম সুলতানের ক্যানভাসে দেখা গেছে এক সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। তাঁর ছবিতে গ্রামীণ নর-নারী রুগ্ন, ক্ষুধার্ত বা দুর্বল নয়; বরং তারা অতিকায়, পেশিবহুল, শক্তিশালী এবং প্রবল আত্মবিশ্বাসী।
এস এম সুলতানের এই স্বতন্ত্র শিল্পদর্শন কেবল বাহ্যিক নান্দনিকতার বিষয় বা কল্পনাপ্রসূত ছিল না; এটি ছিল শত বছরের উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ এবং ঐতিহাসিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবাদ। তাঁর চিত্রকর্মগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ এবং আবহমান বাংলার নিজস্ব আত্মপরিচয়ের এক অনন্য ও মহাকাব্যিক আখ্যান খুঁজে পাওয়া যায়।
আবহমান বাংলার পেশিবহুল কৃষক: বাস্তবতার মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর
এস এম সুলতানের ছবির সবচেয়ে আলোচিত ও স্বতন্ত্র দিক হলো তাঁর আঁকা মানব-মানবীর অতিকায় ও পেশিবহুল শারীরিক গঠন। তৎকালীন বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত, রোদ-বৃষ্টিতে পোড়া ও হাড্ডিসার কৃষকদের বাস্তব শারীরিক অবস্থার সঙ্গে এই চিত্রগুলোর চাক্ষুষ কোনো মিল ছিল না। একজন শিল্পী যিনি নিজেই গ্রামীণ পরিবেশে বড় হয়েছেন, তিনি কেন বাস্তবতাকে অস্বীকার করে শোষিত কৃষকদের এত শক্তিশালী ও পেশিবহুল রূপে আঁকতেন—তা নিয়ে শিল্পসমালোচকদের আগ্রহের শেষ নেই।
এই রূপান্তরের উত্তর লুকিয়ে আছে সুলতানের উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, নীলচাষের বাধ্যবাধকতা এবং ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন শত শত বছর ধরে বাংলার গ্রামীণ মানুষকে দুর্বল, অসহায় ও অবদমিত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। সুলতান তাঁর তুলির আঁচড়ে সেই ঔপনিবেশিক হীনম্মন্যতার ধারণাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। তাঁর মতে, যে কৃষক কঠিন মাটি চিরে ফসল ফলায়, যার উৎপাদিত ফসলের ও শ্রমের ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ সভ্যতা টিকে থাকে, সে কখনো দুর্বল হতে পারে না।
তাঁর ক্যানভাসের পেশিবহুল মানুষেরা কোনো নির্দিষ্ট কালখণ্ডের ফ্রেমে বা বাস্তবতার ফ্রেমে বন্দি নয়। তারা আবহমান বাংলার চিরন্তন জীবনীশক্তির প্রতীক। এই বিশাল পেশি মূলত কৃষকের ভেতরের অদম্য স্পৃহা, মানসিক জোর এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইকে নির্দেশ করে। ইউরোপীয় রেনেসাঁ শিল্পীরা (যেমন মাইকেলেঞ্জেলো) যেখানে নিখুঁত শারীরবৃত্তীয় অনুপাত বা ঐশ্বরিক সৌন্দর্যের দিকে ছুটেছেন, সুলতান সেখানে পেশিকে ব্যবহার করেছেন শ্রমজীবী মানুষের মহিমা কীর্তনের হাতিয়ার হিসেবে। মাটির সঙ্গে মানুষের যে আদিম, জৈবিক ও আত্মিক সম্পর্ক, তাকেই তিনি এক বিশাল ও মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছেন।
দেশভাগের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত এবং শেকড়ের সন্ধান

১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাংলার রাজনৈতিক, ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব আঘাত তৈরি করে। অনেক শিল্পী ও সাহিত্যিক যখন এই রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে স্থানচ্যুত হয়ে শহুরে নাগরিক জীবনে থিতু হচ্ছিলেন, সুলতান তখন বেছে নিয়েছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক যাযাবর জীবন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চা ও শহরের কোলাহল ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। কাশ্মীরের পাহাড় থেকে শুরু করে লাহোর, করাচি এবং পরবর্তীতে ১৯৫০-এর দশকে ইউরোপ ও আমেরিকার নানা শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
লন্ডনের ভিক্টোরিয়া এমব্যাঙ্কমেন্ট গার্ডেনসে পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালির মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের কাজের পাশাপাশি তাঁর চিত্রকর্মও প্রদর্শিত হয়েছিল। পাশ্চাত্যের সেই চোখধাঁধানো শিল্পজগত ও আধুনিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে বসে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর শেকড় পড়ে আছে বাংলার কাদামাটিতে। আধুনিকতার মোড়কে নিজেকে না জড়িয়ে তিনি ফিরে আসেন তাঁর জন্মভূমি নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে।
দেশভাগের ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম রাষ্ট্রীয় সীমানা সুলতানের শিল্পভাবনাকে কখনোই খণ্ডিত করতে পারেনি। তাঁর ছবিতে দেশভাগের প্রত্যক্ষ যন্ত্রণা, উদ্বাস্তু মানুষের সারি, কাঁটাতারের বেড়া বা রাজনৈতিক স্লোগান সরাসরি উঠে আসেনি। এর পরিবর্তে, তিনি দেশভাগের যন্ত্রণাকে অতিক্রম করার মনস্তাত্ত্বিক পথ হিসেবে অখণ্ড, চিরন্তন ও গ্রামীণ বাংলার এক আদর্শ সমাজ (Utopian society) নির্মাণের দিকে মনোযোগ দেন।
যেখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে এক অবিচ্ছিন্ন ও সমবায়ভিত্তিক জীবনযাপন করছে। তাঁর ছবিতে দেখা যায় বিশাল প্রান্তর জুড়ে যৌথ কৃষিকাজ, ধান মাড়াই, লাঙল টানা বা মাছ ধরার মতো সামষ্টিক জীবনের নানা দৃশ্য। এটি ছিল দেশভাগের ফলে খণ্ডিত ভূখণ্ডের বিপরীতে সুলতানের নিজস্ব এক অখণ্ড বাংলার রূপকল্প, যেখানে ধর্ম বা রাজনৈতিক বিভাজনের চেয়ে মানুষের সাংস্কৃতিক ঐক্য ও শ্রমই প্রধান হয়ে উঠেছে।
মুক্তিযুদ্ধের ক্যানভাস: প্রতিরোধের গ্রামীণ আখ্যান
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এস এম সুলতানের চিত্রকর্মে ও দর্শনে এক নতুন ও তীব্র মাত্রা যোগ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম ধ্বংসলীলা, হত্যাযজ্ঞ এবং গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার দৃশ্য তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তবে তাঁর ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের উপস্থাপন তৎকালীন প্রথাগত যুদ্ধচিত্র বা আলোকচিত্রের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
সুলতানের ছবিতে মুক্তিযুদ্ধ মানে কেবল আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের লড়াই, বুলেটের খোসা বা ধ্বংসস্তূপের চিত্র নয়। তাঁর ক্যানভাসে প্রতিরোধ গড়ে তোলে সেই চিরায়ত পেশিবহুল সাধারণ মানুষ। গ্রামীণ জনতা তাদের দৈনন্দিন কৃষিকাজের হাতিয়ার—লাঙল, বর্শা, কাস্তে, কোচ বা ঐতিহ্যবাহী দেশীয় অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়াচ্ছে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত শোষকদের বিরুদ্ধে।
তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘হত্যাযজ্ঞ’ (Massacre)-তে যুদ্ধের নৃশংসতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তা নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে। জ্বলন্ত গ্রামের পটভূমিতে দেখা যায়, অতিকায় ও পেশিবহুল নর-নারী বর্শা ও লাঠি হাতে আক্রমণকারীর দিকে তেড়ে যাচ্ছে। সুলতান এখানে স্পষ্ট করতে চেয়েছেন, বাংলার মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বাহিনীর বিচ্ছিন্ন লড়াই ছিল না; এটি ছিল এ দেশের আপামর মেহনতি মানুষ ও কৃষকের স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রতিরোধ। এখানে মাটি রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে মাটির সন্তানেরাই।
যুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে আঁকা তাঁর ‘প্রথম বৃক্ষরোপণ’ ছবিটি দেশ পুনর্গঠনের এক অনন্য ও কালজয়ী প্রতীক। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নতুন করে বেঁচে ওঠার, পোড়া মাটি থেকে আবার প্রাণ সৃষ্টির যে অদম্য স্পৃহা, তা এই ছবিতে স্পষ্ট। বিশাল অবয়বের এক কৃষক ধ্বংসস্তূপের পটভূমিতে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে একটি নতুন চারাগাছ রোপণ করছে। এই দৃশ্যটি কেবল একটি গাছ লাগানোর সাধারণ ঘটনা নয়, বরং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর এবং ভবিষ্যতের বীজ বপনের শক্তিশালী রূপক।
শিল্প উপাদানে গ্রামীণ আধুনিকতার ছাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রত্যাখ্যান

এস এম সুলতানের শিল্পকর্মের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বৈপ্লবিক দিক হলো তাঁর ব্যবহৃত মাধ্যম ও রং। তিনি পাশ্চাত্যের দামি অয়েল কালার (তৈলচিত্র) বা বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মসৃণ ক্যানভাসের ওপর কখনোই পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলেন না। এর পেছনে কেবল তাঁর আর্থিক অসচ্ছলতা দায়ী ছিল না, বরং এটি ছিল এক ধরনের সচেতন প্রত্যাখ্যান।
তিনি মনে করতেন, বাংলার কৃষকের ঘাম ও মাটির গন্ধ বিদেশি দামি ক্যানভাসে ঠিকমতো ফুটে ওঠে না। তাই অনেক সময় তিনি বাজার থেকে কেনা সস্তা সাধারণ চটের (Jute canvas) ওপর ছবি এঁকেছেন। এই চটকে তিনি নিজেই আঠা ও কাদা লাগিয়ে প্রস্তুত করে নিতেন। রঙের ক্ষেত্রে তিনি বাজারের রাসায়নিক রঙের বদলে বেছে নিয়েছিলেন গাছপালার নির্যাস, লাল মাটি, কাঠকয়লা, হলুদ ও লতাপাতার রস থেকে তৈরি নিজস্ব দেশীয় উপাদান।
এই দেশীয় উপাদানের ব্যবহার ছিল তাঁর সামগ্রিক শিল্পদর্শনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে মাটির মানুষের কথা তিনি তাঁর ক্যানভাসে বলছেন, ঠিক সেই মাটির উপাদান দিয়েই তিনি তাঁদের রূপ দিয়েছেন। তাঁর ছবিতে ব্যবহৃত গাঢ় বাদামি, উজ্জ্বল হলুদ, পোড়ামাটির মতো লাল এবং সবুজ রংগুলো সরাসরি বাংলার প্রকৃতির কথা বলে। পাশ্চাত্যের অ্যাকাডেমিক রীতির বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব এক ‘গ্রামীণ আধুনিকতার’ (Rural Modernism) জন্ম দিয়েছিলেন তিনি, যা বাংলার শিল্পকলাকে পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত এক স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়।
সামষ্টিক শক্তি, নারী ও প্রকৃতির মেলবন্ধন
সুলতানের চিত্রকর্মে নারীর অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়, মর্যাদাপূর্ণ এবং সমকক্ষ। তৎকালীন অনেক চিত্রকর্মে নারীকে কেবল গৃহবন্দী, অবলা, বিষণ্ণ বা কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, সুলতানের ছবিতে নারী প্রবল শক্তির আধার।
পুরুষ কৃষকের বিশাল পেশির পাশে নারীর অবয়বও সমানভাবে বলিষ্ঠ। নারী মাঠে কাজ করছে, ফসল তুলছে, ধান ভানছে, আবার সংকটের মুহূর্তে সামষ্টিক প্রতিরোধে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বর্শা হাতে অংশ নিচ্ছে। কৃষিভিত্তিক উৎপাদনশীল সমাজে নারীর যে অগ্রণী ও অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে, সুলতান তাঁর অতিকায় নারী অবয়বগুলোর মাধ্যমে তা ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
একই সঙ্গে, তাঁর চিত্রগুলোতে প্রবলভাবে উপস্থিত রয়েছে প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎ। বলদ, গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি বা কুকুর—এগুলো কেবল অবলুপ্ত প্রাণী নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুলতানের ছবিতে যন্ত্র বা যন্ত্রপাতির (Machine) কোনো স্থান নেই। সেখানে পেশিশক্তি এবং প্রকৃতির এক অপূর্ব সামঞ্জস্য কাজ করে। আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার আগ্রাসনের বিপরীতে এটি ছিল এক পরিবেশবাদী শিল্পদর্শন। শিশুদের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা থেকে নড়াইলে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘শিশুস্বর্গ’ ও ‘চারুপীঠ’, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুদের প্রকৃতির কাছাকাছি না রাখলে তারা কখনোই অখণ্ড বাংলার প্রকৃত আত্মপরিচয় ধারণ করতে পারবে না।
বাউল দর্শন ও ব্যক্তিসত্তার বিলোপ
সুলতানের ব্যক্তিগত জীবন এবং তাঁর শিল্পকর্মকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তিনি ছিলেন মনে-প্রাণে একজন বাউল ও সুফি সাধক। শেষ বয়সে নড়াইলে তিনি অনেকটা সন্যাসীর মতোই জীবনযাপন করতেন। পরনে কালো আলখাল্লা, লম্বা চুল এবং হাতে বাঁশি—এই ছিল তাঁর রূপ।
তিনি বিশ্বাস করতেন ব্যক্তিসত্তার বিলোপ ঘটিয়ে সামষ্টিক সত্তার সঙ্গে একাত্ম হওয়াতেই জীবনের সার্থকতা। তাঁর চিত্রকর্মেও এই দর্শনের প্রতিফলন সুস্পষ্ট। তাঁর ছবিতে কোনো মানুষের মুখের আদল বা পোর্ট্রেট স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। সেখানে ব্যক্তি মানুষের চেহারার চেয়ে মানুষের শারীরিক শক্তি ও সামষ্টিক উপস্থিতি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এটি বাউল দর্শনের সেই চিরায়ত চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ‘আমি’ বা অহংবোধের কোনো স্থান নেই, বরং ‘আমরা’ এবং ‘প্রকৃতি’ই চূড়ান্ত সত্য।
শেষ কথা: এস এম সুলতানের শিল্পদর্শন ও বর্তমানের প্রাসঙ্গিকতা
এস এম সুলতানের চিত্রকর্ম কেবল গ্যালারির দেয়ালে শোভা পাওয়ার মতো সাধারণ শিল্পকর্ম নয়। তাঁর কাজগুলো বাংলার ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান এবং আত্মপরিচয় খোঁজার এক বিশাল ও প্রামাণ্য দলিল। উপনিবেশবাদের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে একটি জাতি কীভাবে তার নিজস্ব শেকড়কে আধুনিক শিল্পে রূপান্তর করতে পারে, এস এম সুলতান তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।
যখনই বিশ্বায়নের দাপটে বা নগর সভ্যতার বিস্তারে বাংলার কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষ বা গ্রামীণ সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়ে, তখনই সুলতানের সেই পেশিবহুল অবয়বগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় এ দেশের প্রকৃত শক্তির উৎস কোথায়। তাঁর রংতুলি কেবল চটের ক্যানভাস রাঙায়নি, বরং দেশভাগ, মন্বন্তর ও মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক বাঁক পেরিয়ে বাংলার সাধারণ মানুষের এক আত্মমর্যাদাপূর্ণ, স্বাধীন ও অখণ্ড পরিচয় নির্মাণ করেছে। এস এম সুলতান তাই কেবল একজন চিত্রশিল্পী নন, তিনি আবহমান বাংলার এক দ্রষ্টা।

